অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯ (২)
তোনিমা খান
ওয়াহেদ নিঃশব্দে সদর দরজা খুলে ঢুকলো। দরজা আঁটকে লিভিং রুমে পা রাখতেই আঁধারে এক জোড়া শকুনি দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললো। ওই দৃষ্টিতে এখন আর হিংস্রতা দেখা যায় না। বরং সব শেষ করে দেয়ার বিজয়ের নীরব উল্লাস দেখা যায়।
– আজ ও তোমার প্রিয়তমা স্ত্রী তোমায় জায়গা দিল না বুঝি?
– জায়গা চাইতে তো যাই না। ক্ষমা চাইতে যাই। কিন্তু তুমি আমায় এত যত্ন করে শেষ করলে যে সেটুকু না নিয়েই বোধহয় আমায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে।
ওয়াহেদ চলতে চলতে বলল। নিঝামের চোখেমুখে বিশ্ব জয়ের হাসি। এখন আর তার ভয় নেই ওয়াহেদকে হারানোর। কারণ, সে বুঝে গিয়েছে নিলীমা মরে যাবে তবুও ওয়াহেদকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেবে না।
এবার শুধু তাকে তার জীবনটা সুন্দর করতে হবে। সে উঠে গিয়ে আঁকড়ে ধরল ওয়াহেদের হাত। বলল,
– এমন কথা বলো না। ওদের ভুলে যাও। আমরা আগে যেমন সুখে ছিলাম তেমনি থাকব।
– কারোর সুখ ছিনিয়ে নিয়ে কেউ সুখে থাকতে পারে না, নিঝাম।
– আমরা সুখে থেকে সকলকে দেখিয়ে দেব। শুধু তুমি একটু সুখী হতে চাইলেই হবে।
ওয়াহেদ স্মিত হাসল। প্রিয় স্ত্রী আর সন্তানের ঘৃণা নিয়ে এক একটা নিঃশ্বাস নিতে কতটা কষ্ট হয় তা কী নিঝাম বোঝে?
সে হাত মুখ ধুয়ে পোশাক বদলে ঘুমন্ত নিহামকে এক পলক দেখে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। ধীর কদমে নিজের কামরায় আসতেই সম্মুখের দৃশ্যটি দেখে গা রি রি করে উঠল ঘৃণায়। সেই ঘৃণাভরা চাহনিতে নিঝামের আবেদনময়ী সত্তা মিইয়ে গেল। তবে কী ওয়াহেদ ওষুধ খায়নি?
ওয়াহেদ দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। কাবার্ড থেকে একটা কম্ফোর্টার নিয়ে পুনরায় দরজার দিকে পা বাড়াতেই নিঝাম ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
– কোথায় যাচ্ছ?
– নিহামের কাছে।
– কেন?
– ঘুমাতে।
– এখানে কী সমস্যা?
– তোমার আশেপাশে থাকলেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসে নিঝাম।
– তুমি কী তোমার ওষুধগুলো খাওনি? তোমার বুকে ব্যথা হচ্ছে না এখন আর?
– খেয়েছি।
নিঝামের ফুঁসে উঠল। ওয়াহেদ তার সাথে চালাকি করছে তবে। সে নিজের আবেদনময়ী রূপের দিকে এক পলক চেয়ে শুধাল,
– প্রত্যাখ্যান করছ?
বলেই নিঝাম তাচ্ছিল্য হাসল। পুনরায় বলল,
-কতদিন করবে? আগেও চেষ্টা করেছ। তখনো পারোনি এখনো পারবে না।
ওয়াহেদের পা দু’টো থামলো। পিছু ফিরে তাকিয়ে বলল,
– কখনো গ্রহণ করলে তো প্রত্যাখ্যান করব।
নিঝাম প্রহসনের সুরে বলল,
– ছেলেটা তোমার এটা মানো তো ওয়াহেদ? তুমি নাকি একজন ভালো বাবা?
নিজের জীবনের নাটকীয়তা দেখতে দেখতে ওয়াহেদ ভীষণ ক্লান্ত। বলল,
– ভুল সজ্ঞানে হোক কিংবা অজ্ঞানে হোক, হয়েছে তো আমার দ্বারাই। নিজের সন্তানকে না মানার মতো পিশাচ হলে দশটা বছর তোমার সাথে থাকতাম না।
– তাহলে এখন ঢং করছ কেন?
– ঢং? নিজের উপর কখনো করুণা হয় না তোমার নিঝাম? নারী হিসেবে লজ্জা হয় না তোমার? আমি যেখানে সজ্ঞানে কখনো তোমায় ছুইনি সেখানে তুমি কী করে এই কথা বলতে পারো?
– অজ্ঞানে তুমি আমায় ছোঁয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে থাকো ওয়াহেদ। আর সেটাই তোমার আসল রূপ,যেটা লুকিয়ে রাখো।
ওয়াহেদ শ্রান্ত নয়নে চেয়ে বলল,
– মানুষ সেটাই লুকিয়ে রাখে যেটা অনুচিত। ছলচাতুরি করা এখন বন্ধ করো, নিঝাম। আমি ভীষণ ক্লান্ত।
নিঝাম বিছানা ছেড়ে এগিয়ে আসে। ওয়াহেদের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
– তুমি ভালোয় ভালোয় আমার কথা মেনে চললে তো আর ছলচাতুরি করতে হয় না ওয়াহেদ। এসব রাখো। এসো আমরা সব ভুলে নিজেদের জীবনটা উপভোগ করি। এভাবে করে তুমি কয়টা জীবন নষ্ট করছ? এদিক ও নষ্ট করছ, ওদিক তো কিছুই নেই তোমার।
ওয়াহেদ গলা থেকে নিঝামের হাত ছাড়িয়ে নিলো। ধিমি কণ্ঠে বলল,
– আকাশসম ঘৃণা নিয়ে বাঁচব কিন্তু তোমায় কখনো সজ্ঞানে গ্রহণ করব না, আর না তোমার সাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখব।
নিঝামকে এক প্রকার ছুঁড়ে ফেলে দিল ওয়াহেদ। গটগট করে বেরিয়ে যেতে নিলে নিঝাম হাতের কাছে থাকা শোপিস ছুঁড়ে মেরে বলল,
– আমি ছাড়া তোমার আর কোনো পথ খোলা নেই ওয়াহেদ।
ছেলের পাশে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দেয় ওয়াহেদ। চোখের সামনে ভাসে রূপকথা আর শুকতারার স্নিগ্ধ মুখ দুটি। কার্নিশে নোনাজল জমে নিলীমার বিধ্বস্ত মুখটি মনে করে। ফিসফিসিয়ে বলল,
– কে বলেছে আর কোনো পথ খোলা নেই। আছে…আমি জানি সেই পথ শিঘ্রই খুলে যাবে। নশ্বর জীবনে মৃত্যুই যে আমাদের একমাত্র পথ।
রোজকার ন্যায় আজ ও অসহনীয় বুকের ব্যথা ওয়াহেদকে জানান দেয় তার দেহ, মন বড্ড ক্লান্ত। এবার একটু স্বস্তি চায়। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেয় ওয়াহেদ। ললাটে গভীর চুম্বন দিয়ে চোখ বন্ধ করে। সাথে সাথে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। শারীরিক দুঃখে নাকি মানসিক…জানা নেই।
সময়ের দৌড় আরো চার সপ্তাহ এগিয়ে গেল।
মৃত্যু পর্যন্ত পথচলার জন্য যার হাত ধরেছিল, সেই মানুষটাই খুব যত্ন সহকারে তাকে মৃত্যুর দুয়ারে রেখে হারিয়ে গিয়েছে রঙিন জীবনের সন্ধানে।
চোখের সামনে দিনের পর দিন জীবনসঙ্গীকে অচেনা হতে দেখা, নিজের অবুঝ সন্তানকে পিতৃহারা হতে দেখা, ভালোবাসার বিনিময়ে মৃত্যু যন্ত্রণা পাওয়া এক বিধ্বস্ত ভঙ্গুর নারীর মাঝে তখন বিন্দুমাত্র শক্তি নেই আরো একবার কাউকে ভালোবাসা, ভরসা করার। বদলে যাওয়া পুরুষ মানুষ কতটা ভয়ঙ্কর তা মৌনতার থেকে কেই বা ভালো জানে।
আমরা আপেক্ষিক দিকে থেকে কারোর গল্প শুনি এবং বিচার করি। কিন্তু কখনো উক্ত ব্যক্তির জায়গায় দাঁড়িয়ে তার গল্পটা অনুভব করি কী?
কিন্তু এরোজ? চমৎকার এই ব্যক্তিত্বধারী পুরুষটি কাউকে শুধু ভালোইবাসেনি— তার দুঃখ, অসহায়ত্ব, বিধ্বস্ত অন্তঃস্থলকেও নিজের ভালোবাসার অংশ করে নিয়েছে। সে নিজেকে মৌনতার জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, অনুভব করেছে এই দুঃখি নারীটির এখন একটু ভালোবাসার প্রয়োজন। খুব প্রয়োজন!
কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সেই সুযোগ দেবে তো? বিভূঁইয়ের আকাশে মিঠে রোদের হাতছানি। সেই মিঠে রোদে পাহাড়ের বুকে থাকা সবুজ ঘাসের শিরে থাকা শিশির কনাগুলো যেন ঠিক মুক্তো দানার ন্যায় জ্বলজ্বল করছে।
কিন্তু সেই অপদার্থীব সৌন্দর্যে কারোর ক্ষিপ্র পদাঘাতে মূর্ছে দেয়া যেন এক গুরুতর অন্যায়।
পাহাড়ের ঢালুতে ঘাসে পা মাড়িয়ে হন্য হয়ে ছুটতে থাকা পুরুষটি হাঁক ছেড়ে ডাকল,
– মৌন? মৌন আপনি কোথায়?
এবারেও জবাব আসল না। এরোজ উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে অবলোকন করে পাহাড়ি জায়গাটা। বিপদের আশঙ্কায় চোখমুখ বিবর্ণ হতে লাগল। সে পুনশ্চ ছুটলো। ছুটতে ছুটতেই নাসারন্ধ্রে বারি খেল ল্যাভেন্ডার এর সতেজ সুবাস। এরোজ চকিতে খাদের একদম কিনারায় এক ঝাঁক হলুদ ক্রোকাস ফুলের দিকে তাকাল। তীব্র সুবাস অনুসরণ করে ছুটে যেতেই কদম গতি হারালো। অজস্র ক্রোকাস ফুলের মাঝে হাত পা ছেড়ে শুয়ে থাকা দেহটি বদ্ধ নেত্রে হাঁপাচ্ছে।
এরোজ এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলল। ভয়গুলো লুকিয়ে ফেলল অনাদরে। লম্বা লম্বা কদম ফেলে এগিয়ে গিয়ে পা গুটিয়ে বসল। টুপি পড়া মাথাটায় হাত রেখে শুধাল,
– ঠিক আছেন? ভেজা ঘাসে শুয়ে পড়েছেন কেন? ডাক দেবেন না?
মৌনতা তখনো ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার প্রয়াস করছে। বদ্ধ নেত্রে হাতে থাকা স্টপ ওয়াচটি এগিয়ে দিল এরোজের দিকে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
– আর পারিনি।
এরোজ স্টপ ওয়াচটি হাতে নিলো। পঁয়তাল্লিশ মিনিট সাতান্ন সেকেন্ড দেখে ঠোঁটের কোনে প্রসন্নতার রেশ দেখাগেল। ঘাড় ঘুরিয়ে ভীষণ আকাঙ্খাভরা চাহনিতে দেখল শরীরের সাথে যুদ্ধ করা নারীটিকে। বিজয় হোক বা না হোক এইযে প্রচেষ্টাটুকু এতটুকুই যেন ছেলেটির জন্য একটু প্রশান্তির কারণ।
মৌনতার শরীর রিকভারি করছে। সকল কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে আসছে। আগামী সপ্তাহে তার কনসোলিডেশন কেমো শুরু হবে। তিন থেকে চার সপ্তাহের ব্যবধানে দীর্ঘ ছয় মাস এই সারকেল চলবে।
সে জানে, এই কনসোলিডেশন কেমো মৌনতার শরীরের জমানো অবশিষ্ট মরণব্যাধি রোগ নিঃশেষের শেষ চেষ্টা—হয় জয়, নয়তো চূড়ান্ত পরাজয়। যেটাই হোক না কেন তাদের মেনে নিতে হবে।
এরোজ নড়েচড়ে উঠল। এডামস এপলটি আলতো উপড়নিচ হলো। যেথায় ভয়ের আভাস, হারিয়ে ফেলার আভাস। বদ্ধ নেত্রে শুয়ে থাকা নারীটিকে এক পলক দেখে নিজেও তার ঠিক পাশে এক ঝাঁক হলুদ ক্রোকাস ফুলের মাঝে শুয়ে পড়ল।
উষ্ণ এক নিঃশ্বাস ফেলে চোখটা বন্ধ করতেই মস্তিষ্কে দাপিয়ে বেড়ালো নৈকট্যের ক্ষীণ সময়সীমা। এক সপ্তাহ! মনে পড়তেই এরোজের মনে হলো সময় যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে। সে তড়াক চোখ মেলে তাকায়। রৌদ্রজ্জ্বল অম্বরপানে চেয়ে কণ্ঠ খাদে এনে শুধাল,
– ডু ইউ হ্যাভ এনি ড্রিম?
– লাস্ট ড্রিম?
মৌনতার পাল্টা প্রশ্নে এরোজ অনিমেষ চেয়ে রইল নীলাভ আকাশপানে। বলল,
– নো। দ্যাট ওয়ান ড্রিম, হুইচ ইউ ওয়ান্ট টু ফুলফিল ইন ইয়োর এন্টায়ার লাইফ।
মৌনতা চোখ খুলে তাকালো। ঠিক আকাশপানে। যেই দৃষ্টিতে কেবল ধূসর মৃত আকাঙ্ক্ষার হাতছানি। মৃদু হেসে বলল,
– ইয়েস।
– হোয়াট ইজ ইট?
– ওয়ান্ট টু গো আ প্লেস, হোয়্যার ড্রিমস আর নো লঙ্গার নিডেড।
এরোজের দৃষ্টি মলিন হয়। তবুও আশা ছাড়ে না। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
– আই উইল টেক ইউ সামহোয়্যার, ইভেন ডেথ ওয়েকস আপ টু ড্রিম অফ লাইফ।
– এমন কোনো জায়গা নেই।
– আছে। যেখানে একটু ভালোবাসার বিনিময়ে একবুক ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়া হয়, যেখানে আপনাকে সুখী দেখাই সবার স্বপ্ন।
মৌনতা জানে এই একটু ভালোবাসার বিনিময়ে একবুক ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়ার মতো মানুষটা কে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পুরুষালী মুখপানে। দৃষ্টি বড্ড গভীর। ধূসর চোখ, অস্বাভাবিক ফর্সা মুখশ্রীতে কালো কুচকুচে দাঁড়ি যেন অন্যরকম এক গুরুগম্ভীর সৌন্দর্য প্রকাশ করে। এই এক অবয়বকে দেখার জন্য কত অস্থিরতা, কত রাত কত কৌশল করেছে কিন্তু মানুষটা কতটা চতুরতার সাথে একটা বছর তাকে লুকিয়ে ভালোবেসে গিয়েছে। যদি তখন দেখা পেত, তবে কী হতো? প্রশ্নটি নিজেকে করতেই মৌনতা আড়ষ্ট হলো। দৃষ্টি এলোমেলো হলো। ভাবনা ঘুরাতে ক্ষীণ স্বরে নিজেও শুধাল,
– ডোন্ট ইউ হ্যাভ এনি ড্রিম?
এরোজ ঘাড় কাত করে তাকাল। চোখে চোখ রেখে বলল,
– ইয়েস।
– হোয়াট ইজ ইট?
– আই ওয়ান্ট টু বি সামওয়ান’স লাস্ট উইশ।
মৌনতার স্তব্ধ। হাঁসফাঁস করে উঠল কারোর একমাত্র চাওয়ায় নিজেকে খুঁজে পেয়ে। অন্তঃস্থল মিইয়ে গেল! সে যে মানুষটার ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে পারছে না।
এরোজ স্পষ্ট দেখল মৌনতার অস্থিরতা। ম্লান হেসে শুধাল,
– ছয় বছর আগে হন্য হয়ে খুঁজতেন কেন?
মৌনতা নিরুত্তর, নির্বাক দৃষ্টি লুকাচ্ছে। এরোজ পুনরায় শুধাল,
– এক মুহুর্তের জন্যও ভালোবেসেছিলেন?
মৌনতার মনে হলো এটা তার জীবনের কঠিন এক প্রশ্ন। অশ্রু রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
– সেই ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই যেই ভালোবাসা কবুল বলার সাথে সাথে হারিয়ে যায়। তাই ওই অনুভূতির কোনো মূল্য নেই।
– তারমানে এক মুহুর্তের জন্য হলেও ভালোবেসেছিলেন, তাই তো?
মৌনতা এবারেও নিরুত্তর। এরোজ হাসল তার নীরবতায়। কঠিন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত নারীটির দ্বন্দ্ব কাটাতে বলল,
– ‘কবুল’ ভীষণ শক্তিশালী এবং পবিত্র এক শব্দ। যার শক্তির কাছে কোনো অনুভূতি টিকতে পারে না। তাই হয়তো আমি কখনোই এই শব্দটা উচ্চারণ করিনি। তবে হয়তো আমিও ভুলে যেতাম আপনাকে।
মৌনতা গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছে নেয়। এরোজ শুধাল,
– কাঁদছেন কেন?
– এক জীবনে দুইবার ভালোবাসা যায় না। আমি এক মৃতপ্রায় মানুষ। আমায় ভুলে যান। আপনার ভালোবাসা আর যত্নের যোগ্য আমি নই। শুধু শুধু আবেগে নিজের জীবন নষ্ট করবেন না। ভালো কাউকে দেখে জীবন শুরু করুন। আনি…আনি একটা ভালো মেয়ে। আপনাকে খুব ভালোবাসবে।
এরোজ স্মিত হাসল। বলল,
– মাত্রই তো বললেন, এক জীবনে দুইবার ভালোবাসা যায় না। আমি কী করে অন্য কাউকে ভালোবাসব? একজনকে ভালোবাসার রেশ এখনো কাটাতে পারিনি।
– এভাবে জীবন চলে না।
– আমি তো দিব্বি বত্রিশটা বছর কাটিয়ে দিয়েছি।
– আর কতদিন?
– যতদিন না আপনি আমার হচ্ছেন।
– তার আগে যদি আমি আল্লাহর প্রিয় হয়ে যাই?
এরোজ চোখে চোখ রাখল। মলিন সুরে বলল,
– সাতটা বছরের অসহনীয় যন্ত্রণার পর আপনি আমায় এতটা যন্ত্রণা একদম দিতে পারেন না, মৌন।
মৌনতা চোখের পানি মুছে নেয়। আকুতি ভরা কণ্ঠ উপেক্ষা করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
– আপনি নিজেই নিজেকে যন্ত্রণা দিচ্ছেন আমার মতো একজন মানুষকে ভালোবেসে। নতুন করে জীবন শুরু করুন। দেখবেন এগুলো সব একদিন ভুল মনে হবে।
এরোজ চোয়াল শক্ত করে নিলো। এইধরণের কথা সে শুনতে পারে না। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– এই ধরণের কথা নেক্সট টাইম আর কখনো বলবেন না। ভালোবাসা দিতে পারলে দেবেন নয়তো না কিন্তু নতুন জীবন শুরুর কথা বলবেন না একদম।
বলেই সে গটগট করে উঠে চলে গেল অদূরে পার্কের বাচ্চাদের সাথে খেলতে থাকা নায়েলের কাছে। মৌনতা তাকিয়ে রইল তার গমনের পানে। চোখের সামনে একটা মানুষকে নিজের জন্য গোটা জীবন নষ্ট করতে দেখতে তার অনুশোচনা হচ্ছে।
মাসের শেষ সপ্তাহ। আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রমজান শুরু হবে। তাই যতদ্রুত সম্ভব রূপকথার মিড টার্ম এক্সাম নেয়া হয়েছে। তিনদিন হয়েছে রূপকথার এক্সাম শেষ হয়েছে। স্বামী আর সন্তানের কথামতো রূপকথা জানিয়েছে সে টপ টেনের ভেতরেও থাকবে। এখন শুধু রেজাল্টের অপেক্ষা।
পরীক্ষা শেষ হতেই রূপকথার মাঝে নিদারুণ অলসতা ছুঁয়ে গিয়েছে। যেন মাথার উপর থেকে বিশাল এক বোঝা নেমে গিয়েছে সাময়িকের জন্য। দিনের বেশিরভাগ সময়, অসময়ে এখন তাকে নিদ্রাচ্ছন্ন দেখা যায়। তপোবন ও তাকে একটুও বিরক্ত করে না। মাঝেমধ্যে ঘরের গিন্নিকে ছুটি দেয়া প্রয়োজন। দায়িত্ব পালন করতে করতে তাদের ও ক্লান্তি অনুভব হয়।
জবা বিশাল চাকতিতে সদ্য আনা বাজার ঢাললো।হরেক রকমের মাছ দেখতেই সহসা রূপকথা নাকমুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে তাকাল তপোবনের দিকে। অস্ফুট স্বরে বলল,
– আবার এত মাছ?
তপোবন বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বলল,
– কেন মাছে কী সমস্যা? তুমি তো মাছ পছন্দ করো। আজ তাজা মাছ পেলাম নিয়ে এলাম। সবসময় পাওয়া যায় না তো। ওখানে দু’টো ডিম ওয়ালা মাছ ও আছে।
রূপকথা মুখে কাপড় চেপে বলল,
– মাছে খুব বাজে গন্ধ। খাওয়া যায় না। ডিম ও খাওয়া যায় না, বমি আসে।
জবা এঁটো হাতে কপাল কুঁচকে তাকালো রূপকথার পানে।
– এই ভাবিজান, আফনের হইছে কী কন দেহি? ভাইজান ভাবিজান রোজ রোজ মাছ, ডিম নিয়ে এমন প্যাচাল করে আমার সাথেও। আমি নাকি ভালো কইরা ধুই না। এহন কী মাছ সাবান দিয়া ধুইতে হইবে? রান্নাঘরে বইসা ধুইতেও দেয় না, নিজেও খায় না।
তপোবন ভ্রু কুঁচকে তাকায় স্ত্রীর বিরক্তি মিশ্রিত মুখপানে। শুধায়,
– তুমি মাছ খেতে পারো না?
– নাহ, খেতে পারছি না অনেকদিন ধরে। খুব বাজে গন্ধ আসে। আপা ভালো করে পরিষ্কার করে না মাছ।
– আমি ভালো কইরাই পরিস্কার করি। সমস্যা আফনের।
জীবনের এই দোরগোড়ায় থাকা তপোবন অভিজ্ঞ এক মানুষ। তৎক্ষণাৎ মস্তিষ্কে উজ্জীবিত হয় পুরোনো একই কিছু স্নিগ্ধ স্মৃতি। তবে সর্বদা স্মৃতির পুনরাবৃত্তি আমাদের প্রসন্ন করে না। তপোবনের মুখশ্রী আচমকা দুশ্চিন্তায় মিইয়ে যেতে লাগল।
মাজেদা চাচি সবজি গোছাতে গোছাতে আড়চোখে চাইল রূপকথার পানে। রান্নাঘরের এক কোনায় নাকমুখ চেপে দাঁড়িয়ে আছে। পরপরই তপোবনের দিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
– তপোবন, বড় বউরে একটু ডাক্তারের কাছে লইয়া যাইয়ো। সুখবর টুখবর ও হইতে পারে।
নিজ ভাবনায় বিভোর তপোবন চমকালো মাজেদা চাচির কথায়। চমকালো রূপকথাও। তপোবন অপ্রস্তুত দৃষ্টি ফেলল। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারল না। চোখের সামনে শুধু ভাসছে কিছু দূর্বিসহ স্মৃতি।
রূপকথা দেখল সুঠামদেহী সুশ্রী গড়নের পুরুষটা কেমন মিইয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত চিন্তায় তপোবনের ধূসর চোখ কেমন বিবর্ণ হয়ে যায়। আজ ও তেমনি হলো। রূপকথা শুকনো ঢোক গিলে এক পা এগিয়ে যেতেই তপোবন চোখ তুলে তাকাল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
– একটু ঘরে এসো।
ছোট্ট রূপকথাকে পরিস্থিতি বড় বড় দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য করলেও এহেন অপ্রস্তুত অনাকাঙ্ক্ষিত অদ্ভুত পরিস্থিতিতে সে নিজেকে সামলাতে পারছে না। এলোমেলো আচরণ করে বসছে। সে তড়িঘড়ি করে রান্নাঘর থেকে বের হতেই তপোবন বলল,
– আস্তে, ছোটাছুটি করার কিছু নেই।
ছোট্ট একটা বাক্য অথচ গোটা রূপকথাকে এলোমেলো করে দিলো। এ কেমন অদ্ভুত মুহূর্ত। সবকিছুতে এত অদ্ভুত অনুভূতি কেন হচ্ছে! সে হাঁটার গতি কমালো।
রূপকথাকে রুমে পাঠিয়ে তপোবন ফিরে এলো দশ মিনিট বাদ। রুমে ঢুকতেই আড়ষ্ট রূপকথা চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে বলল,
– আপনি কী চাচির কথা বিশ্বাস করেছেন? সে আন্দাজে বলেছে। এসব কিছু না। এত চিন্তিত হবেন না।
তপোবন নির্বাক। ছোট্ট মেয়েটি জানে না যে এই অনুভূতিগুলো আজ নতুন নয়। এই সুখময় অনুভূতি তার জীবনজুড়ে কতটা ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। এই অনুভূতি একবার তাকে জীবন দিয়েছে, আর একবার তার জীবন নিঃস্ব করে দিয়েছে। তাই এখন আর সুখ অনুভব হয় না বরং ভয় কুঁকড়ে যায় অন্তঃস্থল।
সে জোরপূর্বক হেসে বলল,
– এ মাসে তোমার রেগুলার চেকআপ তো করা হয়নি। করা উচিৎ ছিল। যাক, আগামীকাল যাব। আপাতত এটা একটু টেস্ট করো। এখানে নিয়ম বলে দেয়া আছে।
একটা প্রেগনেন্সি কিট এগিয়ে দিতেই রূপকথা হতবুদ্ধি হয়ে তাকাল। ভয়, আড়ষ্টতায় কুঁকড়ে গেল। বৈবাহিক জীবনের এই কয়মাসে তারা কখনোই এই আলোচনায় যায়নি। যেন এটা ভাবনার বাইরের একটা বিষয়। কিন্তু…জীবন যে আমাদের ভাবনাতীত অনাকাঙ্ক্ষিত নিয়মে চলে।
মেয়েটির শির নত হয়ে যেতে দেখে তপোবন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
– যাও, দেরি করো না।
রূপকথা ওয়াশরুমে যেতেই তপোবন অস্থির চিত্তে পায়চারি করতে লাগল। মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে অজস্র অসংলগ্ন চিন্তা। যেই চিন্তার একটাই কারণ, তার মাঝে আর একটুও শক্তি নেই কাউকে হারানোর।
রূপকথার সময় লাগল বেশ খানিকটা। মেয়েটি স্তব্ধ মুখে নত শির বের হতেই তপোবন দ্রুত এগিয়ে গেল। কীটটা নিতেই দেহ সর্বশান্ত হয়ে আসল। ঘেমেনেয়ে একাকার দেহটি অবসাদগ্রস্ত হয়ে বসে পড়ল বিছানায়।
যেই বার্তা সকলকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধ সুখের সাথে পরিচয় করায়, সেই বার্তা তপোবনকে যন্ত্রণাদায়ক দুঃখের সাথে পরিচয় করায়।
ধূসর অক্ষিপটে ভাসছে শুধু রূপকথার জটিল শারীরিক রিপোর্টের দৃশ্য আর হাতে প্রেগন্যান্সির পজিটিভ রেজাল্ট। গর্ভাবস্থায় সিস্ট দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়। মানুষ বোধহয় হারানোর সেই লগ্নে অনুভব করে ভালোবাসার পরিমাণ আর তীব্রতা। তপোবন ঠিক ওই মুহূর্তে এসে তীব্রভাবে অনুভব করল, জীবনের মাঝপথে পাওয়া এই ছোট্ট সুখটুকু তার খুব প্রিয়। যাকে সে হারাতে ভয় পায়।
রূপকথার ছোট্ট মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে পড়েছে। নিজের মাঝে নতুন কোনো প্রাণের সঞ্চারে অনুভূতি বড্ড অগোছালো। মাতৃত্ব কী? কেমন তার অনুভূতি তা তানশান তাকে অনুভব করালেও কাউকে নিজের গর্ভে ধারণ করার মতো এই বিস্ময়কর অনুভূতি যে ভিন্ন।
রূপকথা অনুভব করতে চাইল কিন্তু পারল না। তার সদ্য অনুভব করা অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বের অনুভূতি মুখ থুবড়ে পড়ল তপোবনের মুখ অস্বাভাবিক বিবর্ণ হতে দেখে। ওই মুখে একটুও সুখের ছোঁয়া নেই। মেয়েটি লাল হয়ে উঠল অস্বস্তি আর জড়তায়। তানশানের পাপা কী তবে গ্রহণ করতে পারছে না তার প্রেগন্যান্সির কথা?
চোখ টলটল করে উঠল রূপকথার। বুঝে উঠতে পারল না কী বলবে, কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
নয়া অনুভূতির অদ্ভুত বিরূপ উৎপীড়নে রূপকথা ঠোঁট চেপে কান্না আটকালো। শুধাল,
– তানশানের পাপা ভুল হয়ে গিয়েছে কী?
তিরতির করে কেঁপে ওঠা ওষ্ঠদ্বয় পুনরায় কামড়ে ধরে রূপকথা। উপচে পড়া নোনাজল আটকে ফের বলে,
–“আপনি কী রাগ করেছেন? আমি তো ইচ্ছাকৃত ভাবে কিছু করিনি। আল্লাহর ইচ্ছা ছিল বোধহয়। আমি কি করে আটকাবো বলুন? আমি কখনোই এমন কিছু ভাবিনি।”
রূপকথার কথা শেষ হতেই স্থবির তপোবন স্থবিরতা ভাঙলো। টলটলে নেত্রে মেয়েটির পানে তাকায়। কোনোরূপ বাক্যব্যয় করল না বরং হঠাৎ করেই সে মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে নিলো।
শক্ত বাহুবন্ধন, রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। রূপকথা ভড়কে যায়। আরো ভড়কে গেল যখন কাঁধে টুপটাপ করে কয়েক ফোঁটা উষ্ণ নোনাজল পড়ার আভাস পেল। অস্থির হয়ে পড়ে রূপকথা। মানুষটা কাঁদছে কেন? সে নড়েচড়ে উঠতেই তপোবন আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে তাকে। হারানোর ভয়ে একটুও সুখ অনুভব হলো না আর না বোঝার চেষ্টা করল, সামনের মেয়েটির জন্য এই অনুভূতি বড্ড বিশেষ।
সে ক্ষীণ স্বরে ডেকে উঠল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯
– রূপকথা?
– হুঁ।
– কখনো বলা হয়নি, অপরাহ্নে আঁছড়ে পড়া এই ছোট্ট সুখটাকে আমি ভীষণ ভাবে ভালোবেসে ফেলেছি। নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই সুখটুকু আঁকড়ে বাঁচতে চাই। প্লিজ রূপকথা, ডোন্ট লিভ মি এলোন।
