অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৬
রিদিতা চৌধুরী
ঘরের ভেতর বাতাসের চাপ যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। মেঝেতে ল্যাপটপ আছড়ে পড়ার কর্কশ শব্দটা নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিল, কিন্তু সৌহার্দ্যর স্থির দৃষ্টি অচল—সে রিদির ওপর থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। তার চোয়াল পাথরের মতো শক্ত, কিন্তু চোখের গভীরে ধিকিধিকি জ্বলছে এক আদিম, অবদমিত আগ্নেয়গিরি।
ল্যাপটপের শব্দে সম্বিৎ ফিরতেই রিদির চোখে পড়ল সৌহার্দ্যর সেই ভয়ঙ্কর চাহনি। আতঙ্কিত রিদি এক পা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে শরীরটা সেঁটে দিল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন খাঁচায় বন্দী কোনো আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে, দম আটকে আসছে তার। কাঁপা কাঁপা গলায় কোনোমতে রিদি বলল, “আপ… আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? ক- কি হয়েছে?”
রিদির করা প্রশ্নটি সৌহার্দ্যের কানে পৌঁছাল কি না, বোঝা গেল না। তার দৃষ্টি এখন এক শিকারির মতো প্রখর—নিখুঁত নিপুণতায় সে শিকারের প্রতিটি স্পন্দন মেপে নিচ্ছে। ভয়ে রিদি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে গুটিয়ে রইল, মনে হচ্ছে যেন দেয়ালের সাথে মিশে একাকার হয়ে যাবে।
বিছানা ছেড়ে সৌহার্দ্য উঠে দাঁড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন এক অদ্ভুত ধীরস্থির ভয়ের ছন্দ। এক পা, দুই পা করে সে এগিয়ে এল রিদির দিকে, আর সেই প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে রিদির হৃৎপিণ্ড যেন ছাতি ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। একদম নিকটে এসে সৌহার্দ্য তার এক হাত রিদির মাথার পাশে দেয়ালে রাখল, এরপর শরীরটা ঝুঁকে আনল রিদির ঠিক সামনে। এই মুহূর্তে সৌহার্দ্য যেন নিজের ভেতর নেই; তার অবাধ্য চাহনি, তপ্ত নিঃশ্বাস আর সর্বাঙ্গে এক আদিম আকুলতার নেশা ভর করেছে।
ভয়ে রিদি চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলল। গলার কাছে আটকে থাকা দমটা যেন বেরিয়ে আসতেই চাইছে না, শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। সৌহার্দ্য তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যখন রিদির কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটোর দিকে ঝুঁকে পড়ল, ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতাকে চুরমার করে দিয়ে সশব্দে বেজে উঠল তার ফোনটা।
তীক্ষ্ণ সেই ফোন টোনে সৌহার্দ্যের মোহভঙ্গ হলো, যেন এক প্রচণ্ড ঝটকায় সে ফিরে এল রূঢ় বাস্তবে। দ্রুত চোখ মেলে রিদির দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত শীতলতা। রিদির ভয়ার্ত, জড়োসড়ো দেহলতা আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ করে তার কণ্ঠস্বরে নেমে এল একরাশ বিরক্তি আর তাচ্ছিল্যের প্রলেপ। নিজেকে সামলে নিয়ে সে এক ঝটকায় নিজেকে সরিয়ে নিল রিদির কাছ থেকে। গম্ভীর অথচ কর্কশ গলায় ধমকের সুরে বলে উঠল, “যাও, চেঞ্জ করো। এটা পরতে হবে না!”
রিদি তখনো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথায় কিছু ঢুকছে না; এই লোকটাই আলমারি ভর্তি শাড়ি এনে দিয়েছে, আবার এখন নিজেই বলছে পরতে হবে না!” শাড়ি খুললে সে পড়বেই বা কী? কেমন অদ্ভুত এক লোকের পাল্লায় পড়ল সে!
সৌহার্দ্য পিছিয়ে যেতেই রিদি আটকে রাখা শ্বাসটা ফেলে মিনমিনে গলায় কেন রকম কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “তা – তাহলে এখন আমি কী পরব? আপনি তো শুধু শাড়িই এনেছেন!”
সৌহার্দ্য এবার রিদির দিকে তাকালই না। চোয়াল শক্ত করে গমগমে স্বরে বলল, “কিছু পরতে হবে না। বের হও রুম থেকে, পোশাকের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আউট!” একটু কাছে গেলে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলে স্টুপিড!
কথাটা বলেই সে বাথরুমে ঢুকে দরজায় এক প্রচণ্ড ধাক্কা দিল। ‘ঠাস’ করে বন্ধ হওয়া দরজার শব্দে কেঁপে উঠল রিদি। সে অবাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, সে কোনো পৃথিবীর মানুষের সাথে নয়, বরং কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর সাথে ঘর করছে। মানুষের মেজাজ যে এতটা অস্বাভাবিক হতে পারে, তা সৌহার্দ্যকে না দেখলে সে কল্পনাও করতে পারত না।
রিদি নিজের জমাটবদ্ধ রাগটুকু কোনোমতে গিলে ফেলল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এরপর থেকে আর ভুলেও সৌহার্দ্যর সামনে যাবে না। নিজের ইচ্ছা যখন হবে কাছে টানবে, আবার যখন ইচ্ছা ছুড়ে ফেলবে— এই লোক কি মনে করে নিজেকে? রিদি রাগে আভিমানে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল!
এদিকে বাথরুমের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে সৌহার্দ্য নিজের পরনের শার্টটা খুলে এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলে দিলো। তার চোখ দুটো রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে প্রবল বেগে পড়তে থাকা শীতল জলের ঝাপটায় সে নিজের ভেতরের এই অবিন্যস্ত অস্থিরতাকে ধুয়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। প্রায় এক ঘণ্টা পার হওয়ার পর ভেজা শরীর নিয়ে বেরিয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে তার চোখদুটো ঘর জুড়ে হন্যে হয়ে বউকে খুঁজলো, কিন্তু রুমটা একদম নিঝুম—তার ‘স্টুপিড’ বউটা নেই। রাগটা যেন দিগুন বেড়ে গেল, বের হতে বললে বের হয়ে যাবে? আর একটু কাছে গেল এমন করতে হবে কেন? তার স্পর্শ কি এই মেয়ের ভালো লাগেনা?
তীব্র রাগ আর অস্বস্তি নিয়ে সৌহার্দ্য হাতের ফোনটা তুলে কললিস্ট চেক করলো। সুজনের নামটা ভেসে উঠতেই তার মেজাজটা মুহূর্তেই বিগড়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করলো, “সব সময় একদম ভুল সময়ে ফোন দেয় এই গাধাটা!”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে সুজনকে কল দিলো। ওপাশ থেকে সুজন কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই সৌহার্দ্য রাগে গর্জে ওঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো, “ইডিয়েট, তোর টাইমিং সেন্স এত খারাপ কেন? আমার কাছে আর কখনো কল দিবি না!”
বলেই ঢাস করে ফোনটা কেটে দিল!কেন ফোন করেছিল, তা জানার সামান্যতম আগ্রহও সে দেখালো না।
ওদিকে ফোনটা কানে নিয়ে সুজন তখনো স্থবির হয়ে বসে আছে। একটা জরুরি কথা বলার জন্যই ফোন করেছিল সে, কিন্তু এভাবে অপমানিত হবে ভাবেনি। স্তব্ধতা কাটিয়ে সুজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললো, “ফারিস ঠিকই বলে, এটা একটা অদ্ভুত প্রোডাক্ট ভাই!”
গভীর রাত, ঘড়ির কাঁটা প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই। গত দুই দিনে সৌহার্দ্যর ঘুমের রুটিন পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছে। বউটাকে পাশে না পাওয়ার শূন্যতা যেন প্রতিটা মুহূর্তে তাকে অস্থির করে তুলছে।শরীর আর মনের এই একগুঁয়ে জেদের কাছে হার মেনে অবশেষে সে বিছানা ছাড়ল। টলমল পায়ে, অনেকটা ঘোরের মধ্যে সে এসে দাঁড়াল রিদির ঘরের দরজায়।
রিদি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সৌহার্দ্য নিঃশব্দে গিয়ে বসল তার পাশে।ঘরের আবছা অন্ধকারে রিদির ঘুমন্ত মুখটার দিকে সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। যেন তৃষ্ণার্ত কোনো পথিক ঝরনার ধারায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছে। হাঠাৎ একটু ঝুঁকে রিদির সারা মুখে অজস্র চুম্বনের চিহ্ন এঁকে দিল সৌহার্দ্য। তাতেও যেন তার দীর্ঘদিনের জমানো শূন্যতা মিটছিল না। উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছাতে সৌহার্দ্য রিদির গ্রীবায় মুখ গুঁজল; আলতো করে নিজের দাঁত বসিয়ে দিল তার নরম ত্বকে।
সৌহার্দ্যের এই আকস্মিক ও এলোমেলো স্পর্শে রিদি ঘুমের ঘোর কাটিয়ে ব্যথায় ককিয়ে উঠল। যন্ত্রণায় তার শরীরটা একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠল। রিদির সেই আর্তিতে সৌহার্দ্য মুহূর্তেই সম্বিৎ ফিরে পেল। সে দ্রুত মাথা তুলে কামড়ের সেই লালচে দাগটিতে পরম মমতায় পরপর ছোট ছোট কয়েকটা চুমু খেল—যেন ব্যথার চেয়ে প্রশান্তিটাই বেশি গাঢ় হয়।
রিদিকে এতটা কাছে পেয়ে ও সৌহার্দ্যের অস্থিরতা কমলো না, বরং তা যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। নিজেকে আর বেশি সময় আটকে রাখা দায় হয়ে পড়ছিল। প্রবল ইচ্ছাশক্তি দিয়ে নিজেকে সামলে সে চোখ-মুখ কুঁচকে উঠে দাঁড়াল। রিদির দিকে আর দ্বিতীয়বার তাকাল না, যেন তাকালেই সে নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না। দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে, বাইরে থেকে দরজাটা লক করে দিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ল!
ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে একা দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট, একটানা বিষাক্ত ধোঁয়াগুলো নিজের ভেতরে টেনে নিচ্ছে সে। কিন্তু মনের অস্থিরতা কি আর তাতে কমে? বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড চাপে পিষ্ট হচ্ছে।সৌহার্দ্যর ইচ্ছে করছে অবাধ্য স্টুপিড বউটা এই মুহূর্তে নিজের সাথেই পিষে ফেলতে। সিগারেটের ধোঁয়ায় তো তার মনের এই দহন শান্ত হওয়ার নয়, বরং যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ করেই রাগে আর বিরক্তিতে হিসহিসিয়ে উঠল, “স্টুপিট বেয়াদব মহিলা!”
সে আবার সিগারেটে একটা গভীর টান দিল, যেন ধোঁয়ার আড়ালে নিজের অসহায়ত্ব লুকাতে চাইছে। বিড়বিড় করে চলল তার ক্ষোভ, “বাচ্চা গুলোর পড়ার বয়স চলে যাচ্ছে, এভাবে চলতে থাকলে ওরা স্কুলে যেতে যেতে তো আমাকে দাদার কাতারে পড়তে হবে! এই স্টুপিড বেয়াদব মহিলা সেটা বুঝতে পারছে না কেন?”
সকাল প্রায় ৯টা। রিদি ঘুম থেকে উঠে বিছানার পাশে কয়েকটা থ্রিপিস গুছিয়ে রাখা দেখে বুঝল সৌহার্দ্যই এনেছে। রিদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে শাড়িটা বদলে একটা থ্রিপিস পরে নিল। এরপর রান্নাঘরের দিকে গিয়ে দুজনের জন্য অল্পস্বল্প নাস্তা তৈরি করে ফেলল। সৌহার্দ্যকে ডাকতে গিয়ে সে হঠাৎ থেমে গেল। রাতের কথা মনে পড়তেই অভিমান আর ক্ষোভে তার মুখটা ভার হয়ে এল। মনে মনে ভাবল, “মানুষটা নিজের ইচ্ছেমতো যা খুশি করবে, আর সবটা আমাকেই কেন সহ্য করতে হবে?”
রিদি যখন এমন এলোমেলো ভাবনায় বিভোর, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য এসে চেয়ার টেনে বসল। রিদি তাকে দেখেই মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। রিদির সেই চাহনি আর মুখভঙ্গি দেখেই সৌহার্দ্য বুঝে গেল, তার বউ বেশ অভিমান করে গাল ফুলিয়ে আছে। সৌহার্দ্য কিছু একটা ভেবে চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে কপাল কুঁচকে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “এমন গাল ফুলিয়ে রাখার কারণ? রেগে আছ মনে হচ্ছে?”
সৌহার্দ্যর কথার কোনো জবাব দিল না রিদি। সে মুখ ভার করে চুপচাপ সৌহার্দ্যর সামনে নাস্তার প্লেট এগিয়ে দিল।সৌহার্দ্য এবার গলা খাকারি দিয়ে রিদির দিকে তাকিয়ে খোঁচা মেরে বলল, “আদর করিনি বলে এভাবে রেগে আছ? তখন বললেই তো হতো তোমার আদর চাই! তাহলে নিজেকে এত কষ্টে কন্ট্রোল করতে হতো না। ওকে, দেন রুমে চলো—রাতেরটা দিনে পুষিয়ে দিচ্ছি!”
রিদি যেন আহাম্মক বনে গেল। সে কখন বলেছে যে ওসব না পাওয়ার কারণে সে রাগ করছে! লজ্জায় তার দুগাল দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। কেমন ঠোঁটকাটা মানুষ এই লোকটা! রাতে অপমান করে রুম থেকে বের করে দিয়ে এখন নির্লজ্জের মতো নাটক করছে। রিদি মনে মনে ভাবল, ‘ডাক্তার না হয়ে এই লোকটার অভিনেতা হওয়াই উচিত ছিল!’
রিদির সেই রাগী ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই সৌহার্দ্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল, “দিনের বেলাটা কিন্তু রাতের চেয়ে বেটার হবে, তুমি চাইলে রা…”
সৌহার্দ্যর বাক্য শেষ হওয়ার আগেই রিদি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তার হাত দিয়ে সৌহার্দ্যর মুখ চেপে ধরল।লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠা মুখে বলল, “চুপ করুন নির্লজ্জ পুরুষ? দোহাই লাগে,! মুখটা বন্ধ করুন!”
বলেই রিদি হাত সরিয়ে নিয়ে সরে আসতে চাইলে তার আগেই সৌহার্দ্য বিদ্যুৎগতিতে রিদির কোমরে হাত জড়িয়ে তাকে টেনে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে নিল। তারপর এক টুকরো পরোটা ছিঁড়ে রিদির মুখে পুরে দিয়ে আলতো স্বরে বলল, “কাল তো আমরা ঢাকায় চলে যাবো, যাওয়ার আগে এখানে কোথাও ঘুরতে যেতে চাও?”
ঘুরতে যাওয়ার কথায় রিদির রাগের মেঘ মুহূর্তেই যেন হালকা হতে শুরু করল। সে দুহাতে সৌহার্দ্যর গলা জড়িয়ে ধরে একরাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সি-বিচে নিয়ে যাবেন? সমুদ্র দেখতে ইচ্ছে করছে আমার!”
রিদির এমন শিশুলভ আবদার দেখে সৌহার্দ্যর চোখেমুখে ফুটে উঠল মুগ্ধতার আভা। রিদিকে খাইয়ে দিতে দিতে সে বলল, “ওকে, বিকেলে রেডি থেকো। হাসপাতালে কিছু ইমার্জেন্সি কাজ আছে, সেগুলো সেরে আসি? দেন নিয়ে যাব!
রিদি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সায় দিল। সৌহার্দ্য রিদিকে খাইয়ে সাথে নিজেও অল্প খেয়ে বেরিয়ে পরলো!
দুপুর প্রায় দেড়টা। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে সুমির শরীরটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি, রোদের তেজ আর দীর্ঘ ক্লান্তিতে হঠাৎই তার মাথাটা ঘুরে উঠল। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে এক জোড়া শক্তপোক্ত হাত তাকে জড়িয়ে ধরল। সুমি চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নীল চোখের এক সুদর্শন যুবক, যে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অপরিচিত কারো এমন নিবিড় স্পর্শে সুমির অস্বস্তি বেড়ে গেল। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সামান্য নড়াচড়া করল, কিন্তু অপর পাশে থাকা যুবকটির যেন হুঁশই নেই। তার দৃষ্টি যেন সুমির মুখাবয়বে আটকে আছে।
শাহাবীর নিজের ওপর যেন নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিল না। জীবনের এই প্রথম কোনো মেয়ের রূপের মায়ায় সে এভাবে আকৃষ্ট হলো। অন্যদিকে, সুমির মেজাজ এমনিতেই খিটখিটে, সামান্যতেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে তার রাগের পারদ চরমে উঠল। সে দুই হাতে জোর করে শাহাবীরকে নিজের থেকে সরিয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল, ” বাজে লোকের মতো! মেয়ে দেখলে গায়ে পারতে ইচ্ছে করে? আর এভাবে হাবলার মতো তাকিয়ে আছেন কেন?”
শাহাবীর যেন খানিকটা চমকে গেল। অথচ মেজাজি মানুষ হয়েও আজ সে অদ্ভুত এক কারণে নিজেকে শান্ত রাখল। গম্ভীর আর শীতল স্বরে সে বলল, “ভুল অপবাদ দেবে না, মেয়ে। তোমাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছি মাত্র।”
সুমির তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তার রাগ যেন আরও দ্বিগুণ হলো। সে তেতে উঠে বলল, “আমি আপনাকে বলেছি আমাকে বাঁচাতে? সরেন! পথ ছাড়ুন আমার।” বলেই সে হনহন করে হাঁটা ধরল। শাহাবীর গম্ভীর কন্ঠে, গলা ঝাড়ল, ” তোমার নামটা বলে যাও মেয়ে!”
সুমি ঘুরে দাঁড়িয়ে শাহাবীরের দিকে তাকিয়ে একটা ভেংচি কেটে চলে গেল। শাহাবীর সেখানে দাঁড়িয়ে রইল, তার দৃষ্টি তখনও সুমির যাওয়ার পথের দিকে। নিজের বুকে হাত দিয়ে সে বিড়বিড় করে বলল, “একত্রিশ বছরের রেকর্ড যখন তুমি ভেঙে দিলে, মেয়ে—তখন তোমার নামটা আমাকে জানতেই হচ্ছে!” বলেই সানগ্লাস টা চোখে লাগিয়ে সে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
পার্টি অফিসে বসে আছে ফারিস ও সুজন। সুজন এতক্ষণ ফারিসকে গত রাতের ঘটনা বলছিল—কীভাবে সৌহার্দ্যের সাথে জরুরি কাজে কথা বলতে গিয়ে সে অপমানিত হয়েছে।
”বেচারা ফোন দিয়েছি একটা রোগীর হিস্ট্রি সম্পর্কে জানতে! তা তো বললোই না, উল্টে ফোন কেটে দিয়ে ব্লক করে দিয়েছে!”
ফারিস এতক্ষণ সুজনের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনে দুষ্টু হেসে সুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার মনে হচ্ছে বেজাল প্রোডাক্ট বউকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাসরটা সেরে ফেলতে চেয়েছিল, তোর জন্য পারেনি। সত্যি, তোর টাইমিং সেন্স জঘন্য!”
সুজন নাক-মুখ কুঁচকে নিয়ে বলল, “তোর বাজে কথা রাখ। সৌহার্দ্য করবে বাসর? সেটা স্বপ্নে হবে, বাস্তবে না!”
ফারিস বাঁকা হেসে বলল, “ওই শালা কি চিজ, সেটা তোর মতো নাদান শিশু বুঝবে না। আমি তো চিন্তা করছি, বাচ্চা মেয়েটা ঠিক আছে কিনা!”
সুজন বিরক্ত হয়ে উঠে যেতে যেতে বলল, “তোরা দুটোই নির্লজ্জ!”
সুজন চলে যেতেই ফারিসের ফোনটা টুং করে বেজে উঠল। ফারিস ফোন হাতে নিতেই দেখল রিভার মেসেজ—যা দেখে তার চোখ কপালে উঠে গেছে:
”নির্লজ্জ এমপি, আপনি আমার ফোন ধরছেন না কেন? আমাকে রেখে পরকীয়া করার কথা ভাবছেন? ওরকম কিছু ভাবলে আপনার টুনটুনি কেটে দিব একদম। আপনি আমাকে চেনেন না, হুম?!!”
মেসেজটা দেখে ফারিসের হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল। বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল ফারিস। এটা তার কপালে কী জুটল! তার থেকে এক কাঠি উপরে! ফারিস হতভম্ব হয়ে নিচে পড়ে যাওয়া মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঘড়ির কাটায় বিকেল চারটে ছুঁইছুঁই। রিদি দরজার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ সময় বসে আছে, অথচ সৌহার্দ্যর আসার নামগন্ধ নেই। শেষমেশ রিদি ধরেই নিয়েছে যে আজকের ঘোরাঘুরিটা আর হচ্ছে না। মন খারাপ করে যখন সে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই বেজে উঠল তার ফোন। স্ক্রিনে “হার্টলেস ডাক্তার” নাম দেখে রিদি দ্রুত কানে ফোনটা তুলল। ওপাশ থেকে ভেসে এল সৌহার্দ্যর ক্লান্ত কণ্ঠস্বর, “নিচে ওয়েট করছি হার্ট, দ্রুত নিচে নামো!” কথা শেষ করেই সে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল! রিদির ঠোঁটের কোণে মুহূর্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
দ্রুত একটা থ্রি-পিস জড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল সে। ওড়না ঠিক করতে গিয়েই হঠাৎ নজর গেল গলার কাছে কিছুটা লালচে ফুলে থাকা দাগটার ওপর। জায়গাটা আলতো করে ছুঁতেই হালকা ব্যথা অনুভব করল রিদি। তার মনে হলো, হয়তো কোনো বিষাক্ত পোকা কামড়েছে, যার কারণে সামান্য অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া হয়েছে। তাই সে সৌহার্দ্যের মেডিসিন বক্স থেকে সাধারণ অ্যালার্জির জন্য ব্যবহৃত একটি অ্যান্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট খেয়ে নিল। সৌহার্দ্য সবসময় প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো গুছিয়ে রাখে, তাই সেগুলো খুঁজে পেতেও বেগ পেতে হলো না। এরপর আর দেরি না করে ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে দ্রুত নিচে নেমে গেল।
নিচে নামতেই রিদি চোখ পড়ল সৌহার্দ্যর দিকে, সৌহার্দ্য ড্রাইভিং সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে বসে আছে। ওর ফ্যাকাশে মুখে একরাশ অস্পষ্ট ক্লান্তি, যেন অনেকগুলো উত্তাল রাতের ধকল তার দুচোখে জমা হয়েছে। রিদির পায়ের শব্দে সে চোখ মেলল; রিদির দিকে এক পলক তাকিয়েই কোনো কথা না বলে যান্ত্রিকভাবে গাড়ির দরজাটা খুলে দিল।রিদি ভেতরে বসেই চিন্তিত গলায় বলে উঠল, “দেখুন না, ডাক্তার সাহেব, আমাকে একটা বিষাক্ত পোকা কামড়েছে মন হচ্ছে! জায়গাটা কেমন লাল হয়ে ফুলে আছে দেখুন তো।” বলেই সে গলার ওড়নাটা একটু নামিয়ে দেখাল।
নিজের বউয়ের মুখে ‘বিষাক্ত পোকা’-র কথা শুনে সৌহার্দ্য উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠল। পরক্ষণেই খুকখুক করে কেশে উঠল সে। তার ‘স্টুপিড’ বউ যে তাকেই আক্ষরিক অর্থে বিষাক্ত পোকা বানিয়ে দিয়েছে, তা বুঝতে পেরে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সে থমথমে মুখে সামনের দিকে তাকিয়ে ড্রাইভ করতে লাগল।
কিন্তু রিদি নাছোড়বান্দা! সে পোকাটার ‘চোদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার’ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সৌহার্দ্যর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে রিদি বিরক্ত হয়ে আবার বলল, “কি বেয়াদব পোকা! কোথায় কামড়টা দিয়েছে দেখেছেন? ইনফেকশন হয়ে গেলে কী হবে?”
এতক্ষণ বিরক্তি নিয়ে বউয়ের সব অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনে আসছিল সৌহার্দ্য। কিন্তু শেষমেশ নিজেকে এভাবে অপমানিত হতে দেখে সে আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। বিরক্তিতে ফেটে পড়ে রিদিকে জোরে ধমকে উঠল, “স্টুপিড মহিলা, চুপ করবে তুমি? কামড় দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে পোকাটা বিষাক্ত না, বরং বেশ ভদ্রভাবেই কামড় দিয়েছে! সো, আজেবাজে কথা না বলে মুখটা দয়া করে বন্ধ করো!”
রিদি যেন তাতেও থামল না পোঁকা আবার ভদ্র ভাবে কামড় দেই কিভাবে তা রিদির মাথায় ঢুকলো না,। সে আবার বলতে গেল, “পো…”
এবার আর কথা শেষ করতে দিল না সৌহার্দ্য। রাগে গর্জে উঠে বলল, “স্টুপিড! আবার যদি ওই পোকা শব্দটা তোমার মুখে শুনি, আমি তোমাকে চলন্ত গাড়ি থেকে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেব!”
রিদি অভিমানে মুখ ফুলিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “উল্লুক একটা! এমন করছে যেন আমি পোকাকে না, তাকেই বলছি! বলেই মুখ বাঁকিয়ে নিলো!
সৌহার্দ্য আড়চোখে একবার বউয়ের দিকে তাকাল। বুঝতে পারছে অভিমানে মুখটা ফুলিয়ে আছে, তবুও সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। এই মেয়েকে একটু প্রশ্রয় দিলেই সে মাথায় চড়ে বসে। মাথার ভেতর হাজারটা টেনশন নিয়ে, কেবল রিদির মন ভালো করতেই সে এই ঘোরার প্ল্যানটা করেছে; অথচ সৌহার্দ্যর নিজের এসব ঘোরার প্রতি কোনো আগ্রহ বা সময়—কোনোটিই নেই। আজ চট্টগ্রামে শেষ দিন, অনেকগুলো রোগীর সিরিয়াল ছিল। সব সামলাতে গিয়ে সে অসম্ভব ক্লান্ত, তবুও রিদির সকালের অভিমানী মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে সে তাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছে।
প্রায় আধঘণ্টার পথ পেরিয়ে তাদের গাড়ি এসে থামল সি-বিচের সামনে। আকাশ আর সমুদ্রের মিতালি দেখার অপেক্ষায় রিদির মনটা তখন চঞ্চল। গাড়ি থেকে নামার পর সৌহার্দ্য ওর ছোট্ট হাতটা নিজের বড় হাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে নিল। সমুদ্রের নোনা হাওয়া যেন এক নিমেষেই রিদির মনের সবটুকু ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দিল। সৌহার্দ্যর হাত আলতো করে ছাড়িয়ে রিদি দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল জলরাশির ঠিক কিনারায়, পায়ের জুতোটা খুলে পা ডুবিয়ে দিলো সমুদ্রের নোনা জলে। দুই হাত মেলে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে সে। সাগরের উদ্দাম বাতাসে রিদির এলোমেলো চুলগুলো তার মুখাবয়বে লুটোপুটি খাচ্ছে, সমুদ্রের নীল আভা তার চোখের তারায় এসে ঠিকরে পড়ছে—রিদিকে আজ যেন বড্ড বেশি মায়াবী আর জীবন্ত দেখাচ্ছে।
সৌহার্দ্য একটু দূরে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে দেখছিল রিদির এই শিশুসুলভ পাগলামিগুলোর দিকে। তার ঠোঁটের কোণে লেগে ছিল এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি। কিন্তু হঠাৎ করেই তার ফোনের যান্ত্রিক শব্দ সেই মুহূর্তের মায়াজাল ছিন্নভিন্ন করে দিল। বিরক্তির এক তীব্র ঢেউ খেলে গেল তার চোখে-মুখে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও রিদির দিক থেকে চোখ সরিয়ে একটু দূরে দাঁড়িয়ে সে ফোনটা ধরল। ওপাশের কথাগুলো শোনার সময় তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, গম্ভীর কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি আর অপার অনিচ্ছা মিশিয়ে সে শুধু বলল, “আই’ল বি দেয়ার ইন হাফ অ্যান আওয়ার।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই রিদির একটা তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বাতাসে ভেসে এল। সৌহার্দ্যর বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল; ফোনের ওপাশের গুরুত্ব তখন এক নিমেষেই তুচ্ছ হয়ে গেল তার কাছে। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল, রিদি বালি কামড়ে বসে পড়েছে, যন্ত্রণায় তার মুখটা কুঁকড়ে আছে। সৌহার্দ্য এক মুহূর্ত দেরি না করে, কানে ফোন থাকা অবস্থাতেই কোনো দিকে না তাকিয়ে দৌড়ে গিয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, ব্যাকুলতা ঝরিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড, সুইটহার্ট?”
রিদির চোখের কোণে তখন ব্যথার জল চিকচিক করছে। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “দেখুন না ডাক্তার সাহেব, পায়ে কী যেন বিঁধে গেছে, অনেক ব্যথা করছে!”
সৌহার্দ্য আলতো করে রিদির বালি যুক্ত পা-টা তুলে নিল নিজের হাঁটুর ওপর। সূক্ষ্ম একটা কাঁটা বিঁধে আছে সেখানে। সৌহার্দ্য রিদির কপালে আলতো হাত রেখে অভয় দিয়ে বলল, “একটু কষ্ট করো লক্ষীটি, জান আমার, এক্ষুনি ঠিক করে দিচ্ছি, ওকে?”
রিদি মাথা নেড়ে সায় দিতে,সৌহার্দ্য তার কথার চলে রিদির মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রেখে খুব নিপুণ হাতে কাঁটাটা বের করে নিল। এরপর আর তাকে নিচে নামতে দিল না, পাঁজা কোলে তুলে নিল। রিদি পড়ে যাওয়ার ভয়ে সৌহার্দ্যর কলার জড়িয়ে ধরে মন খারাপ করে মিনমিনিয়ে বলল, “আমার তো ঘোরা হলো না, এক্ষুনি চলে যাব?”
সৌহার্দ্য ওর দিকে তাকিয়ে চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “এই পা নিয়ে তুমি হাঁটতে পারবে? স্টুপিড মহিলা!”
রিদি অভিমানে গাল ফুলিয়ে সৌহার্দ্যর বুকের ভেতর মুখ গুঁজে দিল। সবটুকু আশা যেন এক লহমায় ফিকে হয়ে গেল। সৌহার্দ্য ওকে গাড়ির সিটে বসিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিছু খাবে? নিয়ে আসব?”
দূরে ঝালমুড়িওয়ালার পসরা দেখে রিদির চোখদুটো যেন ফের ঝিলিক দিয়ে উঠল। সৌহার্দ্যর শার্টের কোনা টেনে আবদারের সুরে বলল, “ডাক্তার সাহেব, আমি ঝালমুড়ি খাব!” এনে দিন প্লিজ! বলেই মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে!
সৌহার্দ্য ঝালমুড়িওয়ালার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে কিছু বলতে চাইল, “এসব খেলে প্র…”
কিন্তু বউয়ের মায়াবী চোখ আর অভিমানি মুখ দেখে কথা মাঝ পথে থেমে গেল। সৌহার্দ্য এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেষ পর্যন্ত ঝালমুড়িওয়ালার দিকেই এগিয়ে গেল। কাগজে মোড়ানো দুটো ঝালমুড়ি নিয়ে এসে রিদির হাতে দিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। ব্যস্ততার ছাপ স্পষ্ট ওর কণ্ঠে, “দ্রুত শেষ করো। তোমাকে বাসায় নামিয়েই একবার হার্ট ফাউন্ডেশনে যেতে হবে।”
বলেই গাড়িতে উঠে সৌহার্দ্য রিদির পা দুটো আলতো করে নিজের উরুর ওপর তুলে নিল, কাঁটা ফোটা জায়টায় গভীর মনোযোগ দিয়ে আলতে করে নিজের বৃদ্ধা আঙ্গুলের সাহায্যে ছুঁয়ে দিচ্ছে। রিদি নিজের হাত থেকে এক চামচ ঝালমুড়ি সৌহার্দ্যের দিকে এগিয়ে দিতে সৌহার্দ্য কোনো বাক্য ব্যায় না করে ওর দিকে এক ফলক তাকিয়ে তা মুখে পুরে নিল। তারপর রিদির খাওয়া শেষ হতেই সৌহার্দ্য নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব যত্নে রিদির ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা মশলাটুকু মুছে দিয়ে বাসার উদ্দেশ্য গাড়ি স্টার্ট দিলো!
সে দিনের পর কেটে গেল এক সাপ্তাহ! ঢাকা আসার এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। রিদিদের সাথে রিভা ও এসেছ। রিভা আসার পর থেকেই ফারিসের সাথে দেখা করার জন্য ছটফট করছে, কিন্তু ফারিস যেন পাথর হয়ে গেছে। সে মেয়েটিকে পাত্তাই দিচ্ছে না—উল্টো তার মনে জ্বলছে তীব্র ক্ষোভ। ফারিসের এখনও মনে পড়ে, রিভা তাকে ভালোবাসেনি, ভালোবেসেছে অন্য কাউকে, তার মধ্য বার বার এই মেয়ে তাকে ঈগানোর করেছে। সেই স্মৃতি ফারিসের মস্তিষ্কে আগুনের মতো জ্বলে ওঠে। সে মনে মনে পণ করে—তাকে যেমন দহনের আগুনে পুড়িয়েছে রিভা, ঠিক তেমন করেই সে মেয়েটিকেও জ্বালাবে। শশুরের বেয়াদব মেয়ের কাছ থেকে ভালোবাসি শব্দটা শোনে তারপর এই মেয়েকে কাছে টানবে তার আগে নয়!
ওদিকে ড্রয়িংরুমে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। ডাইনিং টেবিলে রিভা, পৃথা আর রিদি বসে গল্পে মশগুল। বাড়ির বড়রা সোফায় বসে টিভির খবরে ব্যস্ত, আর সারহান চৌধুরী তার ভাইয়ের সাথে জরুরি কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লান্ত শরীরে ঘরে প্রবেশ করল সৌহার্দ্য।
দরজা দিয়ে ঢুকেই তার চোখের দৃষ্টি স্থির হলো ডাইনিং টেবিলের দিকে। সে যেন ঘরের আর সব কিছুকে উপেক্ষা করে নিজের ‘স্টুপিড’ বউকে খুঁজছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল রিদির হাসিমুখের দিকে—পৃথার কোনো কথায় সে খিলখিল করে হেসে উঠছে। রিদির সেই হাসিতে মুগ্ধতা থাকলেও সৌহার্দ্যর মনটা যেন কেমন বিরক্তিতে ভরে উঠল।
সে গটগট করে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর, গমগমে স্বরে ডাকল, “সুইটহার্ট, রুমে এসো। ইয়োর হাসব্যান্ড নিডস ইউ রাইট নাও।”
সৌহার্দ্যর এই অকপট ঘোষণা শুনে ড্রয়িংরুমের বাতাসে মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে এল। বড়রা ইতস্তত বোধ করে খুকখুক করে কেশে উঠলেন। সারহান চৌধুরী রাগে লাল হয়ে গর্জে উঠলেন, “লজ্জা-শরম কি সব বাজারে বিক্রি করে দিয়েছো? নির্লজ্জ বেয়াদব ছেলে! বড়রা সামনে, তোমার কি একটুও কাণ্ডজ্ঞান নেই?”
বাবার কথায় সৌহার্দ্যর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বিরক্তিকর এক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আশ্চর্য! আমি আমার বউকে ডাকছি, এতে লজ্জা পাওয়ার কী আছে? তোমার এত সমস্যা হলে তুমিও তোমার বউকে ডাকো না, আমার পিছু কেন লেগেছ?”
সারহান চৌধুরী রাগে লাল হয়ে গর্জে উঠলেন, “বেহায়া নির্লজ্জ ছেলে! যাও আমার চোখের সামনে থেকে!”
বাবার ক্রোধে সৌহার্দ্যর চোখেমুখে কোনো বিকার নেই। সে নির্বিকার কন্ঠে বলল, “তোমার চোখের সামনে থাকার আপাতত আমার প্রয়োজন নেই, আমার বউ প্রয়োজন—বউ নিয়ে চলে যাচ্ছি।”
সৌহার্দ্যর এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথায় সারহান চৌধুরী চরম বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে বিড়বিড় করে বললেন, “লাজ-লজ্জাহীন বেয়াদব একটা!” এরপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রাগে গজগজ করতে করতে তিনি সোফা ছেড়ে উঠে চলে গেলেন।
এদিকে ডাইনিং টেবিলে বসা রিদির অবস্থা তখন কাহিল। লজ্জায় তার মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে; তার ইচ্ছে করছে মাটি দুই ভাগ হয়ে যাক আর সে তার ভেতর ঢুকে পড়ুক। চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পর থেকে লোকটার যেন মুখের ওপর কোনো লাগামই নেই! যেখানে-সেখানে তাকে এভাবে লজ্জায় ফেলে! সারাদিন এই ‘সুইটহার্ট’ বলতে বলতে যেন মুখের ফেনা তুলে ফেলে। বড়-ছোট,—কোনো কিছুরই তোয়াক্কা নেই তার। রিদির মনে হচ্ছে, আগের সৌহার্দ্যই বোধহয় ভালো ছিল; অন্তত ‘দেড় ব্যাটারি’ বলে রাগারাগি করলে এভাবে প্রকাশ্য লজ্জিত তো হতে হতো না!
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৫
রিদির ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার ভেসে এল সৌহার্দ্যর সেই গমগমে কণ্ঠস্বর, “স্টুপিড মহিলা, কথা কানে যাচ্ছে না? রুমে এসো!”
এইটুকু বলেই কারোর দিকে না তাকিয়ে সে হনহন করে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
