অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৬
তেজরিন উম্মীদ
বাতাসের ভারী স্তব্ধতা ভেঙে ফারাজের কণ্ঠস্বর তীরের মতো বিঁধল। সে থামল না, বরং একরাশ জমাট বাঁধা ক্ষোভ নিয়ে একনাগাড়ে বলে চলল,
“আর ফুপা, আপনি? আপনিও ড্যাডের কথায় এভাবে প্রভাবিত হলেন? ড্যাড তার ছেলেকে ফুটবলার বানাবে নাকি অন্য কিছু, সেটা তার একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু সিফাত তো আপনার রক্ত, আপনার সন্তান! ওর জীবনে হস্তক্ষেপ করার অধিকার একমাত্র আপনারই সাজে, অন্য কারো নয়।”
একটু দম নিয়ে ফারাজ আবার শুরু করল, কণ্ঠস্বর এবার আরও ধারালো, “সিফাত ভবিষ্যতে কী হবে—ডাক্তার নাকি মন্ত্রী—সেটা ঠিক করার দায়িত্ব ছিল আপনার। অথচ ড্যাড আপনাকে দু’টো কথা বোঝালো আর আপনি বিনা বাক্যব্যয়ে সায় দিয়ে দিলেন? এই নয়টা মাসে ছেলেটার ভেতরের যে পরিবর্তন, সেটা কি একবারও আপনার চোখে পড়েনি? নাকি এখন আমাকে চোখপ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে যে—আগের সেই প্রাণোচ্ছ্বল সিফাত শিকদার আজ কোন অন্ধকারে তলিয়ে গেছে?”
সাজিদ শিকদার স্ত্রীর পাশে পাথর হয়ে বসে রইলেন। একটা শব্দও তাঁর মুখ দিয়ে সরল না, শুধু মাথাটা অপমানে আর অনুশোচনায় আরও নুয়ে পড়ল। ফারাজ মিথ্যে বলেনি। এই নয় মাসে তিনি নিজের চোখের সামনে এক নক্ষত্রের পতন দেখেছেন। তাঁর উজ্জ্বল, মেধাবী ছেলেটা যেন কোনো এক গভীর ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে গেছে।
একটা সময় যে ছেলেটা দিনরাত ফুটবল নিয়ে পড়ে থাকত, যার কাছে একটা সিগারেটের ধোঁয়াও ছিল অচেনা, আজ সে নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। সাজিদ শিকদার নিজেই ছেলের ঘর থেকে ইনজেকশন, কোকেন আর বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার করেছেন। শাসন, বারণ কিংবা আকুতি—কোনো কিছুই সেই পতন ঠেকাতে পারেনি। তিনি যেন নিজের হাতে ধ্বংস করা নিজের ছেলের জীবনের সামনে বসে আছেন।
সাজিদ শিকদার নিশ্চুপ থাকলেও শেহজাদ খান গর্জে ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ফারাজ! তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ। বড়দের সাথে কথা বলার ধরনটা অন্তত সংযত করো। আমি যখন একবার বলে দিয়েছি যে শান আর সিফাত ফুটবলার হবে না, তার মানে হবে না। এসব ফালতু ফুটবলের নেশা নিয়ে আমি ওদের পড়ে থাকতে দেব না। ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আমিই নির্ধারণ করব।”
ফারাজ দমবার পাত্র নয়। স্বভাবজাত জেদ আর তাচ্ছিল্যের হাসি মুখে ফুটিয়ে সে পাল্টা জবাব দিল, “ফুটবলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে লাভ নেই। আমিও স্পষ্ট বলে দিচ্ছি—আমার ভাই ফুটবলারই হবে। ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে এবং সুযোগ পেলে বিশ্বকে দেখিয়ে দেবে ও কী করতে পারে। আপনি চাইলেও ওদের আটকে রাখতে পারবেন না।”
শেহজাদ খানের চোখ দুটো রাগে ছোট হয়ে এল। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি শুধালেন, “তুমি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো?”
“অবশ্যই! আমি আপনাকে ওপেন চ্যালেঞ্জ করছি। আমার ভাইয়েরা ফুটবল খেলেই এমন কিছু করে দেখাবে, যা আপনি মন্ত্রী হয়েও এই দেশের জন্য করতে পারেননি। ওরা হবে এই দেশের কোটি মানুষের আইডল। ওদের গন্তব্যে পৌঁছানোর পথে যত বাধা আসবে, আমি পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে সে সব সরিয়ে দেব। যা যা করা লাগে, আমি একা হাতে তাই করবো।”
“ফারাজ!” শেহজাদ খানের বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর ড্রয়িংরুমের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ল।
ফারাজ বিন্দুমাত্র কুঁকড়ে গেল না। সে তপ্ত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“ধমক দেবেন না ড্যাড! আমি এখন আর সেই ছোট ছেলেটি নেই যে আপনার এক ধমকে ভয়ে সিঁটিয়ে যাব। মনে রাখবেন, আমি আপনারই রক্ত। আপনি যদি নিজের আভিজাত্য আর অহংকার ধরে রাখতে জেদ ধরেন, তবে আমিও আমার দাবিতে অটল থাকব।”
“ওরা ফুটবল খেলবে না। এটাই আমার শেষ কথা,” শেহজাদ খান দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।
ফারাজ দ্বিগুণ তেজে গর্জে উঠল, “ওরা ফুটবল খেলবে!”
“আমি বলছি খেলবে না!”
“আর আমি বলছি খেলবে!”
ফারাজের শেষ বিষ্ফোরণে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমের উপস্থিত সকলের মানুষের সঙ্গে যেন আসবাবপত্রগুলো ও থরথর করে কেঁপে উঠল। তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে আগুনের পিণ্ড হয়ে আছে। বাবার চোখের মনিতে সরাসরি চোখ রেখে কথা বলছে সে। ফারাজের এমন রুদ্রমূর্তি উপস্থিত সবার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিল। শান সোফার এক কোণে বসে অশ্রুসজল চোখে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভাইকে এর আগে অনেকবার রেগে যেতে দেখেছে, শাসন করতে দেখেছে, এমনকি বাবার সাথে তর্ক করতেও দেখেছে—কিন্তু এমন ভয়ানক রূপ আগে কখনো দেখেনি। আজ শুধু ছোট ভাইদের স্বপ্নের জন্য ফারাজ যেভাবে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা সত্যিই অভাবনীয়।
শেহজাদ খানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। মুষ্টিবদ্ধ হাতে তিনি নিজের সীমাহীন রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। ছেলের এই অবাধ্যতা তাঁর কাছে শুধু বিস্ময়কর নয়, বরং এক চরম অপমান। তিনি শীতল কণ্ঠে বললেন,
“ফারাজ, তুমি কিন্তু এবার অনেক বেশি বাড়িয়ে করছ।”
“হয়তো করছি। কারণ কম করলে সেটা আমার ভাইদের প্রতি অন্যায় হতো ড্যাড। আপনিই আমাকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। দয়া করে এমন কিছু করবেন না যাতে আমি আরও বেশি অবাধ্য হয়ে উঠি।”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাইমা খান শাঁসিয়ে উঠলেন, “ফারাজ, অনেক হয়েছে, এবার থামো! ড্যাড এর সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তুমি কি ভুলে গেছো? গলার স্বর নামাও। আগে তো কখনো তুমি এতটা অভদ্র আচরণ করোনি!”
মায়ের ধমকেও ফারাজ আজ দমল না। সে স্থির দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে বলল, “আম্মি, ড্যাডও আগে কখনো এমন কোনো কাজ করেননি যার জন্য আমাকে গলা উঁচিয়ে কথা বলতে হয়। আজ তিনি বাধ্য করেছেন বলেই আমি আমার সীমা অতিক্রম করছি।”
রাইমা খান অবিশ্বাসের চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই যুবক কি সত্যিই তাঁর সেই ফারাজ? নাকি ক্ষোভের আগুনে পুড়ে যাওয়া অন্য কেউ? আজ যেন ফারাজের পরিচিত রূপটি কোনো এক অচেনা অভদ্রতার চাদরে ঢাকা পড়ে গেছে।
শেহজাদ খান এবার বড়ই ধূর্ততার সাথে মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। তিনি ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সাজিদ শিকদারের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়লেন, “সাজিদ, তুমিও কি চাও তোমার ছেলে ফুটবলার হোক? তুমিও কি ফারাজের এই পাগলামিতে সায় দিচ্ছ?”
সাজিদ শিকদার আজ আর নয় মাস আগের সেই মানুষটি নেই। সময়ের ঘাত-প্রতিঘাত আর ছেলের ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবন তাঁকে এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তিনি মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলেন। গলায় এক অদ্ভুত স্থিরতা নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ ভাইজান! আমার ছেলে যা চায়, আমি এখন সেটাই চাই। আমার ছেলে যদি ফুটবলার হতে চায়, সে ফুটবলার হবে। যদি সে মিউজিশিয়ান হতে চায়, তবে তাই হবে। এমনকি সে যদি সাধারণ একজন মানুষ হতে চায়, তবে আমি তাতেই খুশি। ওর স্বপ্নের পথে আমি আর কোনোদিন কাঁটাতার হয়ে দাঁড়াবো না।”
সিফাত বিস্ময়ে বিষ্ফোরিত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। নিজ কানে শোনা কথাগুলোই বিশ্বাস করতে পারছে না সে। এই কি সেই মানুষটা? যে মাত্র নয় মাস আগে ফুটবল খেলবো বলায় তাকে কুকুরের মতো পিটিয়েছিল? ফুটবল থেকে দূরে রাখতে তাকে অন্ধকার ঘরে পশুর মতো বন্দি করে রেখেছিল? সিফাত অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল,বাবার চেহারায় কি তবে সত্যি অনুশোচনার ছাপ ফুটে উঠেছে?
সাজিদ শিকদারের উত্তরটা শেহজাদ খানের অহংকারে সজোরে আঘাত করল। তিনি নিজেকে অপমানিত বোধ করলেন, কিন্তু দমে গেলেন না। এবার তিনি তাঁর বোনের দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করলেন, “তোরও কি একই মত, শানজানা?”
শানজানা বললেন, “হ্যাঁ ভাইজান। আমার ইচ্ছা আমার ছেলে যা হতে চায়, সে তাই হোক। ওর খুশিতেই আমার সুখ।”
চোখের ওপর বৈদুতিক আলোটা ঠিকরে পড়তেই রুশদীর তন্দ্রা টুটে গেল। ভোরের ঘুমটা যেন জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সে চোখের পাতা মেলাবার চেষ্টা করল, কিন্তু তীব্র আলোর ঝটকায় বারবার চোখ মুখ কুঁচকে আসছে।
ধীরে ধীরে ঝাপসা ভাবটা কাটলে রুশদী দেখতে পেল, ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ফারাজ চুল ঠিক করছে। পরনে পাইলটের ধবধবে সাদা ইউনিফর্ম। পাশের খাটে রুশদীর কোল ঘেঁষে ছোট্ট শের তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রুশদী কোনোমতে আলস্য ভেঙে উঠে বসল। তার নড়াচড়ার শব্দে ফারাজ আয়নায় একবার রুশদীর প্রতিবিম্ব দেখে নিল, তবে কথা না বাড়িয়ে নিজের সাজ সজ্জায় মন দিল।
রুশদী হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, “এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন?”
ফারাজ পেছনে না ফিরেই নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল, “ফ্লাইট আছে।”
“এই দুই-তিন মাসে তো আপনাকে একবারও কাজে যেতে দেখলাম না। হুট করে আজ?”
“চার মাস আমার লাইসেন্স সাসপেন্ড ছিল, আজই জয়েন করছি।”
“ওহ! এখনই বেরিয়ে যাবেন?”
“হুম, ভোর পাঁচটার ফ্লাইট।”
রুশদী আর কথা বাড়াল না।বলতে গেলে কাল থেকে তার পরীক্ষা শুরু, এখন একটু না পড়লে নয়। সে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ফারাজের ঘরের কোণের টেবিলটাতে গিয়ে বসল। টেবিলটা আদতে ফারাজের হলেও, এখন সেখানে রুশদীর বইখাতার একচ্ছত্র রাজত্ব। রুটিন অনুযায়ী কাল বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা। সে মনোযোগ দিয়ে বইয়ের পাতায় ডুব দিল।
“এই মেয়ে, শোনো!”
হঠাৎ ফারাজের গম্ভীর ডাকে রুশদীর ধ্যান ভাঙল। সে কিছুটা চমকে পেছনে তাকাতেই কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ইউনিফর্মে ফারাজকে আজ যেন চেনাই যাচ্ছে না। কাঁধের ওপর সোনালি স্ট্রাইপওয়ালা সাদা শার্ট, কুচকুচে কালো প্যান্ট আর সটান ভঙ্গি—সব মিলিয়ে এক নিখুঁত ক্যাপ্টেন! রুশদী আগে মাঝেমধ্যেই খোঁচা দিয়ে বলত, ফারাজের মধ্যে নাকি ‘পাইলট পাইলট’ ভাব নেই। কিন্তু আজ পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফারাজকে দেখে মনে হচ্ছে, আভিজাত্য আর গাম্ভীর্য যেন তার এই পোশাকের ভাঁজেই লুকিয়ে ছিল। হাতে নেভি ব্লু রঙের ক্যাপ, পাশে রাখা নীল রঙের একটি ট্রলি লাগেজ।
মুহূর্তের ঘোর কাটিয়ে রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “বলুন!”
ফারাজ তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রুশদীর ওপর স্থির রেখে বলল,
“আমি তিন দিন পর ফিরব। এই ক’দিন আমার ছেলের খেয়াল রেখো। আর সাবধান, ভুলেও ওকে উল্টোপাল্টা কিছু শেখাবে। ঠিক আছে?”
রুশদী কোনো উত্তর না দিয়ে ঠোঁট উল্টে এক বিশাল ভেংচি কেটে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ফারাজ ভুরু কুঁচকে গম্ভীর গলায় শুধাল, “কথাটা কি কানে ঢুকেছে?”
রুশদী এবার ঝাঝালো গলায় পালটা জবাব দিল, “আমি কালা নই যে শুনতে পাব না। একবার বললেই মাথায় ঢোকে। শুনেছি তো!”
“তা কথাটা কি একটু ভদ্রভাবে বলা যায় না?” ফারাজের শান্ত প্রশ্ন।
রুশদী তড়িৎ বেগে ঘুরে বসে বলল, “কেন? আপনি কি কথাটা খুব ভালোমতো বলতে পেরেছেন? আপনার বলা উচিত ছিল— ‘রুশদী, আমি যাচ্ছি, তিন দিন পর ফিরব। তুমি দয়া করে ওর একটু খেয়াল রেখো। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে ফোন করো।’ এভাবে বলতে পারতেন না?”
ফারাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সুর নরম করে বলল, “আচ্ছা বাবা, যাও বললাম— রুশদী, আমি যাচ্ছি, তিন দিন পর ফিরব। তুমি আমার ছেলের একটু খেয়াল রেখো, কোনো সমস্যা হলে জানিও। হয়েছে তো? তবুও বলছি, ওকে উল্টোপাল্টা কিছু শেখাবে না।”
রুশদী এবার কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ল, “কী উল্টোপাল্টা শেখাব শুনি?”
“তোমার মাথায় তো সারাদিন উদ্ভট সব আইডিয়া ঘোরে। আমার মাথায় থাকলে হয়তো বলতে পারতাম ঠিক কী কী শেখাতে পারো।তুমি যদি ভুলেও ওকে উল্টাপাল্টা কিছু শিখাও, তবে তোমার খবর আছে।”
রুশদী বেশ দম্ভের সাথেই বলল, “এই যে আমাকে হুমকি দিলেন না, এবার দেখবেন আমি শেরকে কী শিখিয়ে রাখি। আমার খুব একটা কষ্ট হবে না, কারণ ও খুব দ্রুত শিখতে পারে। তিন দিনেই ওকে এমনভাবে বদলে দেব যে আপনি ফিরে এসে ওকে চিনতেই পারবেন না। ”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে,আঙুল উঁচিয়ে হুঁশিয়ারি দিল, “খবরদার! ভুলেও শেরকে ফালতু কিছু শেখাবে না।”
“শেখাবোই, আপনি তাতে কি করবেন শুনি?” রুশদীর কণ্ঠে চ্যালেঞ্জ।
“তোমাকে মাথায় তুলে এক আছাড় দেব!
“আপনার হুমকিতে আমি ভয় পাই না,বুঝেছেন মিস্টার ম্যানারলেস খাম্বা ওরফে ক্যাপ্টেন শারফারাজ খান?”
ফারাজ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল পাঁচটা বাজতে প্রায় দেড় ঘণ্টা বাকি। এয়ারপোর্ট যেতেই এক ঘণ্টার ওপর লেগে যাবে। রুশদীর সাথে তর্কে জেতা অসম্ভব বুঝে সে শুধু শেষবারের মতো শাসিয়ে বলল, “আমি ফিরে আসি, তারপর তোমার সাথে কথা আছে।”
রুশদী মুখটা ফিরিয়ে এক ভেংচি কাটল। ফারাজ সেদিকে আর ভ্রুক্ষেপ না করে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল খাটের পাশে। সেখানে নিস্পাপ ঘুমে আচ্ছন্ন ছোট্ট শের। পরম মমতায় ছেলের কপালে একটি বিদায়চুমু এঁকে দিয়ে সে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল।
ফারাজের চলে যাওয়ার পথের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল রুশদী। মনের ভেতর অদম্য এক ইচ্ছে জাগল পিছু ডেকে বলতে— ‘জানেন, পাইলটের ইউনিফর্মে আপনাকে একদম অন্যরকম লাগছে, বড্ড সুন্দর!’ কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। যদি লোকটা কিছু উল্টোপাল্টা ভেবে বসে? যদি ভাবে—রুশদী নামের এই মেয়েটি খাম্বা মার্কা লোকটার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে? তবে তো প্রেস্টিজের বারোটা বেজে যাবে!
এক চিমটি অভিমানও যেন মনের কোণে দানা বাঁধল। মনে মনে গাল ফুলিয়ে সে ভাবল, ‘ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিলেন, আর আমার বেলা বুঝি কিছু নেই?’ রুশদী আর অবুঝ বালিকা নেই, সে জানে এই অভিমান প্রকাশের কোনো মানে হয় না। তাই তুচ্ছ ভেবেই অভিমানটুকু ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। তার কাছ থেকে বিদায় না নিলে কী এমন ক্ষতি হবে?
কিন্তু মন তো শাসনে থাকে না। নিজের অজান্তেই পড়ার টেবিল ছেড়ে সে ছুটে গেল বারান্দায়। ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ফোটেনি, চারদিকে এক মায়াবী অন্ধকার। রুশদী দেখল গেটের সামনে ফারাজের গাড়িটা অপেক্ষা করছে। ড্রাইভার ফারাজের লাগেজটা ডিকিতে তুলে রাখল। ফারাজ তখন গাড়ির পাশে সটান দাঁড়িয়ে।
রুশদী নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। বুক চিরে ডাক বেরিয়ে এল, “এই যে ক্যাপ্টেন…!”
ফারাজ কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে ওপরের বারান্দার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি স্থির হতেই রুশদী দুই হাত নেড়ে হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে বলল, “গুডবাই! হ্যাভ আ সেফ ট্রিপ।”
ফারাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। কোনো উত্তর না দিলেও সেই হাসিটুকুই যেন অনেক কথা বলে দিল। সে গাড়িতে গিয়ে বসল, আর চোখের পলকে গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে ধুলো উড়িয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।
রুশদী কিছুক্ষণ সেদিকে অপলক তাকিয়ে থেকে আবার নিজের পড়ার টেবিলে ফিরে এল। অদ্ভুত এক শান্তি এখন তার মনে। বুকের ভেতর চেপে বসা পাথরটা যেন নিমিষেই নেমে গেল। ফারাজ বিদায় না জানালে হয়তো দমবন্ধ হয়েই মরে যেত সে। এখন সবটুকু ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গিয়ে মনটা তার পড়ার টেবিলে স্থির হলো।
ভোর থেকে একনাগাড়েই বইয়ের পাতায় ডুবে ছিল রুশদী। সকালে শের জেগে ওঠার পর তাকে পরিপাটি করে দেওয়া, খান বাড়ির সবার সাথে সকালের নাস্তা শেষ করা—সবটাই সেরেছে ঘড়ির কাঁটা মেপে। আজ শুক্রবার বলে শের-এর স্কুল নেই।কিন্তু ছোট মানুষটাও আজ তার মমকে একটুও বিরক্ত করেনি। বরং সারাটা সময় সিফাত আর শানের সাথে খুনসুটিতে মেতে থেকে রুশদীকে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল। রুশদী তখনও সেই পড়ার টেবিলেই পাথরের মতো বসে। পড়ালেখার নেশায় সে আজ দুপুরের খাবারের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। রাইমা খান নিজে ঘরে এসে যখন তাকে খাওয়ার জন্য ডাকলেন, রুশদী তার একনিষ্ঠ মনোযোগের দোহাই দিয়ে যেতে চাইল না। রাইমা খান তখন কৌতুক করে বললেন, “অত না খেয়ে পড়তে হবে না বাপু! ফেল করলে কী এমন ক্ষতি? ঘরের বউ ঘরেই তো থাকবে।”
শেষমেশ রুশদী উঠতে না চাইলে রাইমা খান নিজে পরম মমতায় প্রতিটি লোকমা নিজের হাতে তার মুখে তুলে দিতে লাগলেন। সেই মুহূর্তে রুশদীর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। কড়া মেজাজের রাইমা খানের আবরণে সে যেন বারবার নিজের জন্মদাত্রী মাকে খুঁজে পাচ্ছিল। শেষ কবে মায়ের হাতের ছোঁয়ায় তৃপ্তির সাথে খেয়েছিল, তা আজ আর মনে পড়ে না। মায়ের গায়ের সেই চেনা গন্ধটাও সময়ের সাথে ফিকে হ হয়ে আসছে। প্রতিটি লোকমা মুখে দেওয়ার সময় রুশদীর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।মুহূর্তের জন্য রুশদীর চোখের কোণে দু-ফোঁটা নোনা জল জমা হলেও খুব কৌশলে সে তা আড়াল করে নিল।
“ভাবি, আসব?”
শানের কণ্ঠস্বর শুনে রুশদী পেছনে ফিরল। হাসি মুখে বলল, “আসুন ভাইয়া।”
শান ঘরে ঢুকে আয়েশ করে বিছানায় বসল, তার পিছু পিছু খুদে শয়তান শের-ও এসে চাচার দেখাদেখি জাঁকিয়ে বসল। শান সরাসরি কাজের কথায় এল, “ভাবি, তুমি না মার্কেটে যাবে? তাহলে রেডি না হয়ে বসে আছো কেন? তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও।”
রুশদী অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল, “আপনাকে কে বলল আমি মার্কেটে যাব?”
“ওই যে আপনার গুণধর স্বামী! ভাইয়া কল করে বলল তুমি নাকি কী সব কিনবে, তাই তোমাকে যেন মার্কেটে নিয়ে যাই। টাকাও পাঠিয়ে দিয়েছে।”
“আচ্ছা, দশ মিনিট দিন। আমি চট করে রেডি হয়ে আসছি।”
রুশদী পড়ার টেবিল ছাড়তে নিলেই শান খুব মধুর সুরে ডাকল, “ভাবি…!”
“হুম?”
“বলছিলাম কি, তোমার সেই বেস্ট ফ্রেন্ডটাকেও সাথে নিলে কেমন হয়?”
রুশদী হাসল, “তাকে এখন কোথায় পাবেন?”
“তুমি একটু কল করে ম্যানেজ করো না ভাবি! প্লিজ!”
“সরি ভাইয়া, পারব না। ও ওর মামার বাসায় থাকে, এই অসময়ে মামা-মামি বোধহয় ওকে বের হতে দেবে না।”
শান নাছোড়বান্দা, “দেখো না ভাবি, যদি একটু ম্যানেজ করা যায়।”
রুশদী এবার বাঁকা হেসে বলল, “আমি কি মেয়ে সাপ্লাই দিই যে আপনাকে মিস তিথিকে সাপ্লাই করে দেব?”
শান আবদারের সুরে বলল, “আহারে ভাবি! ছোট দেবরটার জন্য এটুকু করতে পারবে না?”
“আচ্ছা বাবা, ট্রাই করছি।”
ঠিক তখনই পাশ থেকে পুচকি শের ফোঁড়ন কাটল, “বুঝেছি! তুমি তিথি খালামণির সাথে লাইন মারো? দাঁড়াও, আমি পাপা ফিরলে সব বলে দেব!”
শান থতমত খেয়ে বলল, “আরে তুই কি তোর চাচুকে একটুও ভালোবাসিস না শের? এভাবে আমার ভালোবাসায় বিড়ালের মতো বাগড়া দিচ্ছিস কেন? দেখ, তোর তিথি খালামণি যদি এই বাড়ির বউ হয়ে আসে, তোরই তো লাভ। সারাদিন খেলার জন্য একটা সঙ্গী পাবি।”
শের বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, “লাভ তো আছেই, কিন্তু লসও আছে।”
রুশদী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “লস কেন?”
শের নিজের বুদ্ধি খরচ করে উত্তর দিল, “কারণ তিথি খালামণির অন্য কোথাও বিয়ে হলে আমি নতুন একজন আংকেল পাব, যে আমাকে অনেক গিফট কিনে দেবে। আবার শান চাচু অন্য কোথাও বিয়ে করলে আমি আরেকটা নতুন চাচি পাব। সো, দুই দিক থেকেই ডাবল লাভ! আমি কেন ডাবল গিফট মিস করব? তাই আমি মন থেকে দোয়া করছি তোমাদের যেন বিয়ে না হয়। ফু! ফু! আমিন!”
শানের তো রাগে চুল খাড়া হয়ে যাওয়ার দশা! “তোর তো আজকে খবর আছে শের! আমার বিয়ের বারোটা বাজিয়ে দিলি বদদোয়া দিয়ে? তোকে আজকে কাঁচা চিবিয়ে খাব!”
বলেই শান মজা করে শের-এর গলা টিপে ধরার অভিনয় করল। শের-ও গলায় ব্যথা পাওয়ার ভান করে হাসতে হাসতে বলল, “আমাকে মারলে আমি আরও বড় বদদোয়া দেব! তখন দেখবে তোমার চোখের সামনেই তিথি খালামণির বিয়ে অন্য কারো সাথে হয়ে গেছে, আর তুমি দূরে দাঁড়িয়ে রাগে লুচির মতো ফুলবে!”
“শের…!” শান গর্জাল।
”
চাচু…!” শের-ও পালটা হুংকার দিল।
রুশদী এই চাচা-ভাতিজার খুনসুটি দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার জোগাড়। তাদের এই মজার যুদ্ধ থামিয়ে শেষমেশ সবাই মিলে মার্কেটের উদ্দেশ্যে বের হলো। তবে রুশদী শত চেষ্টা করেও তিথিকে ম্যানেজ করতে পারল না। ফোনে অনেক সাধ্যসাধনা করল, এমনকি তিথির মামা-মামির সাথেও কথা বলল, কিন্তু কোনো লাভ হলো না। অগত্যা রুশদী, শের, শান আর সিফাতকে নিয়েই কেনাকাটা সেরে রাতে ঘরে ফিরল।
আগামীকাল থেকে রুশদীর জীবনের এক বড় যুদ্ধ,এইচএসসি পরীক্ষা শুরু। রুশদীর স্নায়ুচাপ আজ চরমে থাকার কথা থাকলেও সে নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সন্ধ্যা অবধি যা পড়েছিল, সেটুকুই যথেষ্ট মনে করে বইখাতা গুছিয়ে রেখেছে সে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ নিলেই রুশদীর মাইগ্রেনটা চাড়া দিয়ে ওঠে, আর একবার সেই তীব্র যন্ত্রণায় ঘায়েল হলে পরীক্ষার হলে কলম চালানো দায় হবে। তাই আজ রাতে সে মনটাকে একদম ফুরফুরে রাখার চেষ্টা করল।
কিন্তু কেউ বোধহয় তার এই প্রশান্তিটুকু সইতে পারলেন না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল, অথচ ঘুমের দেখা নেই। একটা অদ্ভুত শূন্যতা বুকের ভেতরটা কুরে কুরে খাচ্ছে। প্রতিটি নিশ্বাসের সাথে যেন একটা হাহাকার মিশে আছে। রুশদী ঠিক বুঝতে পারছে না, এই রিক্ততা কিসের? কার অভাবে আজ সবটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে? ফারাজের?
নাহ, মোটেই না! যে লোকটার সাথে দেখা হওয়া মানেই কথার লড়াই, তার জন্য রুশদীর মন খারাপ হবে কেন? এক বেলা দেখা না হলে আকাশ কি ভেঙে পড়বে? নিজের মনকে এই নিয়ে হাজার বার বুঝিয়েছে সে। অথচ সত্যি বলতে, এই মন খারাপের আর কোনো দ্বিতীয় কারণও তার খুঁজে পাওয়া নেই।
পাশে ছোট্ট শের তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। রুশদী বুঝতে পারছে, ওর চোখেও আজ ঘুম নেই। রোজ ঘুম না এলে শের কতশত আজব প্রশ্ন করে রুশদীকে অতিষ্ঠ করে তোলে, কিন্তু আজ রুশদী নিজেই বিরক্ত হয়ে অদ্ভুত সব প্রশ্ন শুরু করল।
“শের!” খুব নরম স্বরে টেনে টেনে ডাকল রুশদী।
“হ্যাঁ মম,” চটজলদি উত্তর দিল শের।
“গরু কেন ঘাস খায় রে?” রুশদীর এমন প্রশ্নে শের-এর গোল গোল চোখ দুটো বিস্ময়ে আরও বড় হয়ে গেল। এই প্রশ্নটা তো তার নিজের মনেও কতবার এসেছে, কিন্তু কেউ বোকা ভাববে ভেবে সে কাউকে জিজ্ঞেস করেনি। শের বিজ্ঞের মতো উত্তর দিল, “গরুর খিদে লাগে তাই।”
“আমাদেরও তো খিদে লাগে, তাহলে আমরা ঘাস খাই না কেন?পাখি আাশে উড়ে গেল?মাছ আকাশে উড়ে না কেন? পাখি পানিতে সাঁতার কাটে না কেন? ”
“পাখির মা হয়তো মানা করেছে তাই। ”
রুশদী এবার আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করল, “পাখির মা কেন পাখিকে মানা করল? কেনই বা পানির নিচে শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিল না?”
শের এবার আর কোনো কুলকিনারা খুঁজে পেল না। সে ড্যাবড্যাব করে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, ‘মম কি আজ পাগল হয়ে গেল? বাচ্চারাও তো এত উদ্ভট আর ফালতু প্রশ্ন করে না!’ রুশদী আসলে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আছে। যখন মন খারাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন সেই কারণ না জানা’টাই যেন আরও বড় মন খারাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রুশদী সেই বিষণ্ণতা ঢাকতেই শিশুর মতো এসব আবোলতাবোল বকে যাচ্ছে।
নিস্তব্ধ রাতে হঠাৎ বালিশের নিচে রাখা ফোনটা তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। সেই রিংটোনের শব্দে রুশদীর ঝিমিয়ে পড়া স্নায়ুগুলো এক নিমেষে সজাগ হয়ে গেল। সে প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা আর এক বুক আশা নিয়ে ফোনটা হাতে নিল। বুকের ভেতরটা তখন দুরুদুরু কাঁপছে—তবে কি ফারাজ কল দিল?
কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই মূহূর্তে সব উত্তেজনা জল হয়ে গেল। মুখটা কালো করে সে দেখল কলটি এসেছে ‘এমপি’ নাম্বার থেকে। একরাশ বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে ফোনটা পাশে সরিয়ে রাখল সে। নিজের ওপরই রাগ হলো তার,আজব তো! ওই জেদি লোকটা কল দিলে তার এত রোমাঞ্চিত হওয়ার কী আছে? সে কি তবে সত্যিই সেই খাম্বা লোকটার অভাব বোধ করছে?
নিজেকে সামলাতে না পেরে, শেষমেশ কৌতূহল দমন করতে পারল না রুশদী। পাশে শুয়ে থাকা শেরকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা শের, পাপার সাথে কি তোমার কথা হয়েছে?”
শের আধোঘুমে চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, “হুম হয়েছে তো। পাপা দাদুকে কল করেছিল, তখন আমি কথা বলেছি।”
“ওহ!” রুশদীর কণ্ঠে এক চিমটি নিরাশা ঝরে পড়ল। মনে মনে ভাবল—‘সবার সাথেই কথা হলো, শুধু আমার বেলাতেই বুঝি সময় হলো না মিস্টার ক্যাপ্টেন!’
ফারাজের ট্রিপে যাওয়ার আজ তিন নম্বর রাত। ট্রিপ শেষে সম্ভবত আগামীকালই ফারাজের ফেরার কথা। ভোরের আবছা আলো ফুটতে তখনও বেশ দেরি, চারদিকে শেষ রাতের মায়াবী নিস্তব্ধতা। রুমে শের আর রুশদী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শের বরাবরের মতোই হাত-পা ছড়িয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে।
তন্দ্রার ঘোরে রুশদী হঠাৎ অনুভব করল, তার ওপর কারো একটি হাতের ভার। স্পর্শটা পরিচিত মনে হলেও পরক্ষণেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বয়ে গেল। এ হাত শের-এর হতে পারে না,এ অনেক বেশি বড় এবং ভারী। একপাশে কাত হয়ে শুয়ে থাকায় রুশদী শুধু হাতটাই দেখতে পেল, মানুষটাকে নয়। আতঙ্কে তার হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এল।
রুশদী ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। তার মনে পড়ে গেল পুরোনো সব ভৌতিক গল্পের কথা। অনেক আগে একবার তার জ্বীন নিয়ে সমস্যা হয়েছিল তার; যদিও ক্ষতি করেনি, তবে ভয় দেখিয়েছিল বিস্তর। লোকমুখে শুনেছে, সুন্দরী মেয়েদের ওপর নাকি আশিক জ্বীন-এর নজর থাকে বেশি। এখনও ফজরের আজান পড়েনি—এই সময়টাতেই নাকি ওদের উপদ্রব বাড়ে। রুশদী আর দেরি না করে মনে মনে কাঁপতে কাঁপতে আয়াতুল কুরসি পাঠ করতে শুরু করল।
কিন্তু এ কেমন জ্বীন! আয়াতুল কুরসি আর দরুদ শরীফ পড়ার পরেও হাতটা সরছে না। রুশদী এবার ভয় ছাপিয়ে মরিয়া হয়ে আরও জোরে জোরে দোয়া পড়তে লাগল। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। সে তো আর জানে না, এ কোনো সাধারণ বংশের জ্বীন নয়—এ হলো খোদ খান বংশের জ্বীন ক্যাপ্টেন ‘শারফারাজ খান!’ যার ওপর এসব দোয়ার চেয়ে ঘুমের ঘোর বেশি কার্যকর।রুশদী কি জানত ফারাজ আজই ফিরবে? তার জানা মতে ফারাজের ফেরার কথা ছিল আগামীকাল। তাই গভীর রাতে নিজের ওপর কারো ভারী হাতের স্পর্শ পেয়ে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঘুমের ঘোরেই ভেবে নেয় নির্ঘাত কোনো জিন-ভূতের কারবার! ভয় তাড়াতে সে জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করে।
রুশদীর আয়াতুল কুরসির শব্দে ফারাজের কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। গত তিনদিন টানা ট্রিপ আর দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি শরীরে জেঁকে বসেছে। আচ্ছন্নভাবে পাশ ফিরতে গিয়ে ভুলবশত হাতটা রুশদীর ওপর চলে গিয়েছিল। সচেতন হতেই হাত সরিয়ে নিয়ে ওপাশ ফিরে শুলো ফারাজ। তন্দ্রাচ্ছন্ন কণ্ঠে বিড়বিড় করল, “এত রাতে দোয়া-দুরুদ পড়ছ কেন?”
পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে রুশদীর বুকের ভেতর ধক করে ওঠা ভয়টা মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। চোখ মেলে পাশে তাকিয়ে দেখল ফারাজ শুয়ে আছে। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কখন আসলেন?”
“এই তো একটু আগে,” ফারাজের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
রুশদী কিছুক্ষণ ওভাবেই স্তব্ধ হয়ে শুয়ে রইল। একবার ঘুম ভেঙে গেলে তার আর সহজে ঘুম আসে না। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে যখন ভোরের আজান কানে এলো, তখন সে উঠে দাঁড়াল। বিছানা ছাড়ার শব্দে ফারাজ চোখ মেলে আধোঘুমে শুধাল, “কোথায় যাচ্ছ?”
“নামাজ পড়ব!”” রুশদী শান্ত গলায় জানাল।
“ওহ!” মৃদু শব্দে সায় দিয়ে ফারাজ আবার চোখ বুজল।বলে ফারাজ অসীম ক্লান্তি নিয়ে বালিশে মাথা রাখল।আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতেই, রুশদী শিয়রে এসে দাঁড়াল। তপ্ত কণ্ঠে ডাকল, “উঠুন!”
ফারাজ কোনোমতে এক চোখ খুলে তাকাল। ঘুমের ঘোরে ধরা গলায় শুধাল, “কেন?”
“নামাজ পড়বেন, তাই।”
“ইচ্ছে নেই। তুমি পড়ো, আমাকে ঘুমাতে দাও।”
ফারাজ আাবার পাশ ফিরে শুলো।রুশদী এবার জেদ ধরে তেজালো গলায় বলল, “উঠুন বলছি!”
ফারাজ এবার সত্যিই বিরক্ত হলো। কপালে হাত রেখে বলল, “উফ! ডিস্টার্ব করো না তো রুশদী। শরীর চলছে না, একটু শান্তিতে ঘুমাতে দাও।”
“নামাজ পড়ুন, শরীর-মন দুই-ই শান্ত হবে।”
” তুমি পড়ে আমার জন্য দোয়া করে দিও, তাতেই হবে। এখন যাও তো এখান থেকে!”
“আপনাকে উঠতে বলছি!” রুশদী এবার ফারাজের গায়ে ধাক্কা দিয়ে তাকে জাগানোর চেষ্টা করল।
“আর কতবার ডাকতে হবে? উঠুন!”
ফারাজ এবার চটে গিয়ে উঠে বসল। চোখের মণি লাল হয়ে আছে ক্লান্তিতে। সে ধমকের সুরে বলল, “আরেকবার ডাকলে জানালা দিয়ে ছুড়ে নিচে ফেলে দিব!! বলেছি না ঘুমাব? যাও এখান থেকে!”
রুশদী দাঁত কিড়মিড় করে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা যে পরিমাণ একগুঁয়ে, এখন আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। সে গটগট করে ওয়াশরুমে চলে গেল ওযু করতে। ওযু সেরে জায়নামাজ বিছিয়ে যখন সে সুন্নত নামাজের দ্বিতীয় রাকাতে রুকুতে গেল, তখন পাশ থেকে একটা ছায়া এসে দাঁড়াল। স্পষ্ট না তাকালেও রুশদী অনুভব করল—ফারাজ এসে তার পাশেই নামাজে দাঁড়িয়েছে। ওই তপ্ত ধমকের আড়ালে যে এক টুকরো অপরাধবোধ কাজ করছিল, তা ফারাজের জায়নামাজে আসা দেখেই বোঝা গেল।
মা-বাবার নড়াচড়ায় ছোট্ট শের-এর ঘুমও ততক্ষণে টুটে গেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে সে দেখল তার পাপা আর মম পাশাপাশি দাঁড়িয়ে পরম স্রষ্টার ইবাদতে মগ্ন।সাড়ে চার বছরের শিশুটি আর দেরি করল না। সে নিজেই ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ওযু সেরে নিল। তারপর নিজের ছোট্ট ওয়ার্ডরোব থেকে টুপি আর খুদে জায়নামাজটা বের করে ঠিক ফারাজের পেছনে এসে দাঁড়াল।
ফারাজ ছোটবেলা থেকেই ছেলেকে নামাজের প্রতি অনুরাগী করে তুলেছে। তাই শের এখন নিজেই নিজের সূরা-কালাম পড়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতে পারে।যদি সূরা গুলো তেমন পারে না বিশেষ করে বড় গুলো, তবে ছোট্ট বাচ্চা অনুযায়ী যতটুকু পারে আলহামদুলিল্লাহ!জায়নামাজে দাঁড়িয়ে ছোট্ট হাত দুটো তুলে যখন সে নিয়ত বাঁধল, ফারাজ ও রুশদী দুজনেই টের পেল তাদের পেছনে এক খুদে মুসল্লি যোগ দিয়েছে।
নিঃসন্দেহে এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রশান্তিময় ও সুন্দরতম একটি দৃশ্য। বাইরের অন্ধকার চিরে ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতে শুরু করেছে, আর ভেতরে একটি পরিবারের তিন প্রজন্ম—বাবা, মা এবং সন্তান—একই স্রষ্টার সামনে মস্তক অবনত করে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের গুমোট ভাবটা কেটে গিয়ে সেখানে এক স্বর্গীয় পবিত্রতা ছড়িয়ে পড়ল। যেন এই নামাজের কাতারই তাদের তপ্ত মান-অভিমান আর দূরত্বের মাঝে এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন তৈরি করে দিল।
গত কয়েকদিন ধরে সিফাত খান বাড়ির গণ্ডিতেই নিজেকে আটকে রেখেছে। সেই ঝোড়ো বিকেলের ঝামেলার পর ফারাজ তাকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিল—বাড়ি থেকে এক পা-ও নড়া চলবে না। সেদিন শেহজাদ খান নিজের কর্তৃত্ব ফলানোর চেষ্টা করলেও ফারাজের দৃঢ়তার সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিলেন। ফারাজ একাই যেন ছোট ভাইদের স্বপ্নের চারপাশে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।ফারাজের কড়া বারণের পেছনে কারণও ছিল। শান ও সিফাত দুজনেই দেশের অন্যতম সেরা ক্লাব বসুন্ধরা কিংস এর হয়ে খেলত। হুট করে ক্লাব ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে পুনরায় ফেরাটা এখন আর সহজ হবে না। হয়তো ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এর সাথে কথা বলতে হবে, নয়তো নতুন করে ট্রায়াল দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। ফারাজ কথা দিয়েছে, সে ট্রিপ থেকে ফিরলেই সব ব্যবস্থা করে দেবে। সিফাতও বড় ভাইয়ের ওপর আস্থা রেখে আর ক্লাবে ফেরার তাড়া দেখায়নি।
বেলা এগারোটা নাগাদ। সকালের নাস্তা সেরে সিফাত বাড়ির লনের আরামদায়ক প্লাস্টিক সোফায় হেলান দিয়ে ফোন টিপছিল। এমন সময় এক চেনা কণ্ঠের ডাকে সে মুখ তুলল।
“কিরে লেডি কিলার! তুই কবে এলি এখানে?”
কণ্ঠস্বর শুনেই সিফাত ফোনটা পাশে রেখে সামনে তাকাল। দেখল থ্রিপিস পরা চনমনে এক তরুণী দাঁড়িয়ে—প্রিমা। সে ফারাজের ফুপাতো বোন আর সিফাতের খালাতো বোন। সম্পর্কে সিফাতের বড় বোন হলেও তাদের কেমিস্ট্রি টা সব সময় বন্ধুর মতো।
সিফাত এক গাল হেসে বলল, “আরে আপু! তুমি? কখন আসলে?”
প্রিমা আয়েশ করে সিফাতের সামনের সোফাটায় বসল। “এই তো একটু আগে! তোর দুলাভাই গতকাল ফারাজের সাথে ফিরেছে, তাই ভাবলাম এই সুযোগে খান বাড়িতে একটা চক্কর দিয়ে যাই।তোর দুলাভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে তোর?”
“হ্যাঁ, ব্রেকফাস্টি টেবিলে দেখা হলো।”
“তা তোর খবর কী শুনি?” প্রিমা কৌতূহলী চোখে তাকাল।
সিফাত ঘাড় বাঁকিয়ে হালকা মেজাজে বলল, “আমি তো অলটাইম বিন্দাস! তুমি ঠিক কোন খবরটা শুনতে চাইছ আপু?”
প্রিমার মুখটা এবার একটু গম্ভীর হলো, “কানে এল তুই নাকি ইদানিং ড্রাগ নিচ্ছিস? নেশাটেশা করছিস খুব?”
সিফাত বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সপ্রতিভ ভঙ্গিতে হাসল।
“একদম পিওর খাঁটি খবর আপু! বিন্দুমাত্র ভেজাল নেই এতে।”
প্রিমা চোখ রাঙিয়ে বলল, “এমন গাঁজাখোর হলে তো কোনো মেয়ে তোকে বিয়ে করবে না রে!”
সিফাতের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল। সে চোখের পাতা কিছুটা ছোট করে অন্যরকম দৃষ্টিতে প্রিমার চোখের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কাছে তর্জনী রেখে আলতো স্বরে বলল, “অন্য কেউ না করলে তুমি করো!”
প্রিমা চমকে উঠে চেঁচিয়ে বলল, “এই বেয়াদব! আমি তোর বড় বোন!”
সিফাত এবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
“আরে আপু, প্রেম যদি খাঁটি হয়, তবে সিনিয়র আপুও রাজি হয়!”
“থাপ্পড় খাবি একটা! আমি তোর চেয়ে পাক্কা চার বছরের বড়!”
“তো কী হয়েছে? সিনিয়র আপু বিয়ে করা তো সুন্নত!”
সিফাত যেন আজ ফ্লাটিংয়ের মুডে আছে।প্রিমা কপালে হাত দিয়ে বলল, “হায়রে সিফাত! তুই শেষমেশ আমার সাথেও ফ্লাটিং করছিস? আমার একটা মেয়ে আছে রে বেয়াদব, ভুলে গেছিস?”
সিফাত বিন্দুমাত্র না দমে বাঁকা হেসে বলল, “তাতে সমস্যা কী? দুনিয়ায় কত মানুষ বাবা হতে গিয়ে মামা হয়ে যায়, আমি না হয় এক লাফে মামা থেকে বাবা হয়ে গেলাম!”
সিফাত ছোটবেলা থেকেই বড় হয়েছে ভিনদেশি হাওয়ায়। পশ্চিমা সংস্কৃতির রঙ তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। রিলেশনশিপ কিংবা ফ্লার্টিং—এসব তার কাছে ডাল-ভাতের মতো সহজ। তার পোশাকের ধরণ থেকে শুরু করে চুলের কাট, এমনকি কথা বলার ভঙ্গিটুকুও যেন নিখুঁত কোনো আমেরিকান তরুণের প্রতিচ্ছবি। তবে এই সুদর্শন যুবকের একটা বিশেষ খেতাব আছে, যা আড্ডার মহলে বেশ পরিচিত,’লেডি কিলার’। একটা চোখের পলক কিংবা বাঁকা হাসিতেই দশটা মেয়ে কুপোকাত! মেয়ে পটানো তার বাঁ হাতের খেল। এই ফ্লার্টিংয়ের নেশাটা তার রক্তে এমনভাবে মিশে আছে যে, নিজের আপন খালাতো বোন প্রিমার সাথেও রসিকতা করতে তার বাধে না।
সিফাতের বেপরোয়া কথা শুনে প্রিমা ওর পিঠে এক মৃদু থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ”
‘কুত্তার বাচ্চা! তোর দুলাভাই কিন্তু এই বাড়িতেই আছে। কথাবার্তা একটু মেপে বল।”
সিফাত দমবার পাত্র নয়। সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “তোমার ওই জামাইকে ভয় পাই নাকি আমি? ওটা তো আমার সতিন! তোমাকে তো আমার বিয়ে করার কথা ছিল আপু, অথচ ওই বিমানের ড্রাইভার বেটা এসে আমার হবু বউটাকে মাঝ আকাশ থেকে ছিনতাই করে নিয়ে গেল!”
“সিফাত!” প্রিমা এবার সত্যিই দাঁত কিড়মিড় করে উঠল।
সিফাত সশব্দে এক চোট হেসে নিল। হাসির রেশটুকু মুখে রেখেই হঠাৎ গলার স্বর নামিয়ে গভীর স্বরে ডাকল, “আপু!”
“আবার কী হলো?” প্রিমা বিরক্তি মাখা চোখে তাকাল।
সিফাত চোখের মনিতে দুষ্টুমি ফুটিয়ে বলে উঠল, “আই লাভ ইউ!”
“হারামজাদা! কুত্তার বাচ্চা!”—প্রিমা আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। রাগে পা থেকে জুতোটা খুলে সজোরে সিফাতের দিকে ছুড়ে মারল। সিফাত অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় মাথা সরিয়ে নেওয়ায় জুতোটা তাকে স্পর্শ করতে পারল না। সে লনের ঘাসে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসতে শুরু করল। প্রিমা এবার মারমুখী হয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই সিফাত এক লাফে অনেকটা দূরে সরে গেল।
“লাভ ইউ টু বলো, না রাগ করব। ”
বলেই সিফাত এক দৌড়ে লনের ওপাশে চলে গেল। পেছনে প্রিমা জুতো হাতে নিয়ে তর্জন গর্জন করতে থাকলেও সিফাত বেহায়ার মতন হাসছে।
শের হেলেদুলে দোতলার করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। পরনে তার ঢিলেঢালা বেগি প্যান্ট আর নীল-সাদা চেক শার্ট, যার বোতামগুলো খোলা থাকায় ভেতরের সাদা টি-শার্টটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে একেবারে হিরো স্টাইলে এগোচ্ছিল সে। আচমকা তার চোখে পড়ল আড়াই বছরের ছোট্ট প্রিমরোজকে। গোলাপী রঙের ফ্রক পরা পিচ্চিটা টই টই করে হেঁটে এদিকেই আসছে। এই মেয়েটাকে দেখলে কেন জানি শেরের পিত্তি জ্বলে যায়; অসহ্য লাগে তার উপস্থিতি।
শের মুখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে পড়ল। প্রিমরোজ আধো-আধো পায়ে এগিয়ে এসে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, “হেলু বায়া!”
শের তাকে পাত্তা না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আড়াই বছরের প্রিমরোজ কি আর অবহেলা বোঝে? সে উল্টো ছোট ছোট কদমে শেরের পিছু নিল। এক সময় কাছে এসে জামা টেনে ধরে আবদার করল, “বায়া, চলকেট দাও।”
শের ঝটকা মেরে তার হাত সরিয়ে দিয়ে ধমকে উঠল, “এই পিচ্চি! চকলেট বলতে পারিস না? চলকেট আবার কী? আমি কি চকলেটের দোকান খুলে বসেছি যে তোকে কিনে দেব? যা তোর আম্মুর কাছে যা। আমার পিছু পিছু আসবি না একদম, আসলে কিন্তু মারব!”
শের গটগট করে আবার হাঁটতে শুরু করল। এতগুলো কড়া কথা বললেও বাচ্চা মেয়েটা তার বিন্দুবিসর্গ বুঝল না। সে নাছোড়বান্দার মতো আবার শেরের পেছনে ছুটল চকলেটের জন্য। তিতিবিরক্ত হয়ে শের কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“উফ, যা না এখান থেকে! আমার পিছু নিচ্ছিস কেন? তোকে কিন্তু ট্যাটোর কামড় খাওয়াবে।”
প্রিমরোজ এবার দুই হাত বাড়িয়ে বলল, “বায়া, কোলে নাও!”
সে যখন শেরের কোলে উঠতে চাইল, শের মেজাজ হারিয়ে তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বসল। টাল সামলাতে না পেরে পিচ্চিটা মেঝেতে পড়ে গিয়েই তারস্বরে কান্না জুড়ে দিল। বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনেই শেরের কলিজা শুকিয়ে গেল; ধরা পড়ার ভয়ে সে এক দৌড়ে সেখান থেকে চম্পট দিল। মেয়ের কান্নার আওয়াজ পেয়ে প্রিমা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে প্রিমরোজকে কোলে তুলে নিতেই শের তখন অদৃশ্য।প্রিমা মেয়েকে শান্ত করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল।
রাতের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে বারান্দায় কফির ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছে। ফারাজ রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরলয়ে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। একটু আগেই সে বসুন্ধরা কিংস-এর প্রেসিডেন্টের সাথে দীর্ঘ বৈঠক শেষ করে ফিরেছে। শান ধীরপায়ে ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়াল, তার চোখেমুখে রাজ্যের উৎকণ্ঠা আর একরাশ প্রশ্ন।
নিস্তব্ধতা ভেঙে শান প্রশ্ন করল, “ভাইয়া, প্রেসিডেন্ট কী বললেন?”
ফারাজ কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে শানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“পরশু থেকেই প্র্যাকটিসে যাচ্ছিস তুই। কোনো দেরি করার দরকার নেই।”
শানের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক খেলে গেল।মুহূর্তেই আবার, সে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কত টাকা দিতে হলো ভাইয়া? অনেক ঝামেলা হয়েছে নিশ্চয়ই?”
ফারাজ আদুরে ধমক দিয়ে বলল, “তোর ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তুই শুধু তোর ড্রিমে ফোকাস কর। বাকিটা আমি সামলে নেব।”
শান খুশিমনে চলে যেতে নিলে ফারাজ তাকে থামাল। “একটু দাঁড়া, কথা আছে। সিফাত কোথায়?”
“বোধহয় আমার রুমেই আছে ভাইয়া।”
ফারাজ একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “ফুপি আর ফুপার সাথে কথা হলো। উনারা চাচ্ছেন সিফাতের বিয়ে দিয়ে দিতে। ভাবছেন সংসারী হলে হয়তো ছেলেটা একটু লাইনে আসবে, নেশাটেশা ছাড়বে। আমি বললাম, বিয়ে যখন দেবেনই, তখন ওর যদি কোনো পছন্দ থাকে তবে সেটা জেনে নেওয়া ভালো। নইলে জোর করে বিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তুই কি জানিস সিফাতের কোনো গার্লফ্রেন্ড টার্লফ্রেন্ড আছে কি না?”
শান এবার খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল। আমতা আমতা করে বলল, “জি ভাইয়া… আছে।”
“নাম কী?” ফারাজ সরাসরি জানতে চাইল।
“ভাইয়া, সবগুলোর নাম তো আমার ঠিক জানা নেই।”
শানের উত্তর শুনে ফারাজ আকাশ থেকে পড়ল।
“সবগুলোর নাম জানিস না মানে? ওর গার্লফ্রেন্ড কয়টা?”
শান আঙুল গুনে মনে করার চেষ্টা করল।
“পরশুদিন পর্যন্ত ১৫টা ছিল। গতকাল দুটোর সাথে ব্রেকআপ হয়েছে, তার মানে ১৩টা। আবার কাল রাতে নতুন চারটার সাথে রিলেশন শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন বোধহয় ১৯টা। সঠিক সংখ্যা বলা মুশকিল, বাড়তে বা কমতে পারে।”
ফারাজ হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“বলিস কী! এতগুলো মেয়ে ও একসাথে ম্যানেজ করে কীভাবে?”
শান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আরে ভাইয়া, ওর যে লুক, যে ফিটনেস—মেয়েরা তো লাইন ধরে বসে থাকে ওর সাথে প্রেম করার জন্য। ওর ইনস্টাগ্রাম চেক করলে দেখবে প্রতিদিন শয়ে শয়ে প্রপোজাল আসছে। আল্লাহ যদি ওর মতো চেহারা আর কপাল আমাকেও দিত! ও যে এ পর্যন্ত কতগুলো প্রেম করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।আমি আজ পর্যন্ত এতগুলা মেয়ের চোখে দেখি নাই, যতগুলোর সাথে প্রেম করেছে। ”
অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৫
ফারাজ কপালে হাত দিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। “আমি ভেবেছিলাম পছন্দের কোনো মেয়ে থাকলে তার সাথেই বিয়েটা ঠিক করব, কিন্তু তুই যা শোনালি তাতে তো আমার নিজেরই মাথা ঘুরে যাচ্ছে! বুঝলাম, ওর সাথে আমাকে সরাসরিই বসতে হবে। তবে সাবধান শান, তুইও কি ওর মতো প্রেমের টেম্পু চালানো শুরু করেছিস নাকি?”
শান আকাশ পানে হাত তুলে তওবা পড়ার ভঙ্গিতে বলল, “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! এসব অপবিত্র কাজে আমি নেই ভাইয়া। আমি হলাম খাঁটি পবিত্র পাপী!”
ফারাজ বাঁকা হেসে শানের কাঁধে হাত রাখল। “হুম, মনে রাখিস—অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ!”
