অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৭
তেজরিন উম্মীদ
ভোরবেলা, তিন দিনের দীর্ঘ ট্রিপ শেষে যখন আহাদ আর ফারাজ ফিরল, ফারাজ আর আহাদকে বাড়ি যেতে দিল না। বন্ধু,বোন জামাই তথা সহকর্মীকে এক প্রকার জোর করেই নিজের সঙ্গে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো সে। প্রিমাও খবর পাওয়া মাত্রই সকাল সকাল চলে এসেছে ওর মামার বাড়িতে।
এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলের আবছা ছায়া নামতে শুরু করেছে চারদিকে। দুপুরের আহার পর্ব চুকিয়ে ড্রয়িং রুমের সোফায় আড্ডায় মেতেছে সবাই। ফারাজ, আহাদ আর প্রিমা তো আছেই, সাথে যুক্ত হয়েছে রুশদী। রুশদীর সঙ্গে প্রিমার পরিচয়টা এর মধ্যেই বেশ জমে উঠেছে। বড় সোফাটায় প্রিমা আর আহাদ পাশাপাশি বসেছে, সিঙ্গেল সোফায় আয়েশ করে বসেছে ফারাজ। আর পাশের সোফাটায় পাশাপাশি বসে রুশদী ও শের।
কিন্তু এই আড্ডার আমেজ শেরের ভেতরে নেই। সে ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছে। তার ক্রদ্ধ দৃষ্টি বারবার গিয়ে পড়ছে ফারাজের কোলের দিকে। সেখানে বেশ আয়েশ করে বসে আছে পিচ্চি প্রিমরোজ। শেরের ছোট্ট মনে ঝড়ের বেগে অভিমান আর বিরক্তি আছড়ে পড়ছে—পাপা কেন এই পচা মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে আছে? এই প্রিমরোজ মেয়েটাকে তার দু-চোখের বিষ মনে হয়।
শেরের মনে হচ্ছে, এই মেয়েটা এলেই পাপা তাকে ভুলে যায়। শুধু পাপা কেন, শান চাচু থেকে শুরু করে দাদু—সবাই তাকে ফেলে এই প্রিমরোজকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার আদরের ভাগে কেউ থাবা বসাবে, এটা শের কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। পাপা কেন অন্যকে আদর করবে? পাপা তো শুধু তার! অথচ প্রিমরোজ এলেই পাপা তাকে চকলেট দেয়, কোলে বসিয়ে গল্প করে।
শেরের বিরক্তি চরমে পৌঁছাল যখন দেখল রুশদীও ফারাজের কোল থেকে প্রিমরোজকে নিজের কাছে টেনে নিল। রুশদী যেন প্রিমরোজের মায়ায় পড়ে গেছে। সে বাচ্চাদের মতো আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল,”হেই কিউটি, নাম কি তোমার?”
প্রিমরোজ তার আধো আধো বুলি আর চপলতায় উত্তর দিল,”আমাল নাম পিমলোজ।”
বাচ্চা মেয়েটার এমন আধো আধো বোল শুনে রুশদীর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা দেখতে সত্যিই মাশাল্লাহ্! গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, আর দুই গাল যেন পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে। তার চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত মায়া, আর এইটুকু বয়সেই মাথার চুলগুলো হালকা বাদামী রঙের—সব মিলিয়ে প্রিমরোজকে দেখতে কোনো জীবন্ত পুতুলের চেয়ে কম লাগছে না। রুশদী ভাবল, সব বাচ্চাই তো সুন্দর,প্রিমরোজকে বিশেষ নজরে দেখছে সে। এ ছাড়া কিছুই নয়।
প্রিমরোজের কথা বলার ধরন শুনে ড্রয়িং রুমে হাসির রোল পড়ে গেল। শুধু একজন বাদে—শের। সবার সমস্বরে হাসির মাঝে প্রিমা রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “রুশদী, ওর পুরো নাম প্রিমরোজ আমনা।”
রুশদী আলতো করে প্রিমরোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর ওর সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু এই দৃশ্যটা শেরের সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেল। ঠিক তখনই প্রিমরোজের প্রতি রুশদীর ভালোবাসা আরও উপচে পড়ল। রুশদী প্রিমরোজের তুলতুলে গাল দুটোর দিকে তাকিয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। মেয়েটার গালের লালচে আভা তাকে যেন বারবার কাছে টানছে।
রুশদী প্রিমরোজকে আরেকটু নিবিড়ভাবে আদর করতে করতে আলতো স্বরে বলল,”এই রোজ, তুমি তো ভারী কিউট! তোমাকে একটা ছোট্ট করে চুমু দিই?”
রুশদীর এমন আবদার শুনে উপস্থিত সবাই বেশ মজা পেল। কিন্তু শেরের কাছে মনে হলো, তার পৃথিবীর শেষ সম্বলটুকুও বোধহয় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মম এর ভালোবাসা এভাবে ভাগ হতে দেখে সে যেন পাথর হয়ে গেল।বাচ্চাদের মতো কান্না জুরে বসল সে।
বিকেলের শেষভাগে আহাদ আর প্রিমা বিদায় নিয়েছে। জানালার বাইরে অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। সন্ধ্যার হিমেল হাওয়া পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে জানান দিচ্ছে—দিন শেষ।
আগামীকাল শান আর সিফাত চলে যাবে ক্লাবে। দুটি প্রাণ ফিরে যাবে তাদের নিজস্ব পৃথিবীতে, যেখানে ঘাসের গন্ধ আর ফুটবলের উন্মাদনা মিশে আছে। ফুটবলারদের জগৎটা বড্ড বিচিত্র। সাধারণ মানুষ একটা গোল বা একটা জয় দেখে আনন্দ পায়, কিন্তু যারা মাঠে নামে, তাদের কাছে ফুটবল মানে কেবল খেলা নয়—বরং নিজেদের অস্তিত্ব, স্বপ্ন আর ব্যক্তিত্বের লড়াই। শৈশবে যখন অন্য বাচ্চারা সাইকেল বা দামি ঘড়ির বায়না ধরত, শান আর সিফাত তখন বাবার কাছে আবদার করত একটা নতুন জার্সি বা এক জোড়া স্পোর্টস শু-র জন্য। অনেক বাধা আর প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ তারা ফুটবলের সাথে নিজেদের পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছে। দেশের জন্য ট্রফি জেতার স্বপ্ন যাদের চোখে, তাদের ফুটবল থেকে বিচ্ছিন্ন করা মানে যেন দেহ থেকে প্রাণ কেড়ে নেওয়া।
এদিকে রুশদীর আগামীকাল ম্যাথমেটিক্স এক্সাম। প্রস্তুতি তার বেশ ভালোই, তবুও আজ রাতে বইয়ের পাতায় মন বসানো দায় হয়ে পড়েছে। পড়ার টেবিলে সামনে খোলা অংকের খাতা, হাতে কলম। একটা অংক নিয়ে সে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বসে আছে। অংকটা সে পারবে, কিন্তু মস্তিষ্ক আজ যেন অবাধ্য হয়ে উঠেছে। দুই-তিন মিনিট পরপর অলসভাবে এক একটা লাইন লিখছে সে। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে বাঁ হাতটা টেবিলের ওপর রেখে তার তালুতে মাথা ঠেকিয়ে আনমনে খাতার ওপরের দিকে মান্ডালা আঁকতে শুরু করল।
ফারাজ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছিল রুশদীকে। তার অমনোযোগ, তার ক্লান্তি আর অবুঝ পেনসিলের আঁচড়—সবই ফারাজের নজর এড়াল না। ধীরপায়ে সে এগিয়ে এলো পড়ার টেবিলের পাশে। এক হাতের ভর টেবিলের ওপর রেখে সে স্থির হয়ে দাঁড়াল রুশদীর খুব কাছে।রুশদী তার খাতার পাতায় মান্ডালা আঁকায় যখন ব্যস্ত, ঠিক তখনই ফারাজের হাতের স্পর্শে সে কিছুটা সম্বিত ফিরে পেল। তবে তার চোখেমুখে কোনো বিস্ময় নেই, বরং এক অদ্ভুত অনুভূতিহীনতা নিয়ে সে তাকালো ফারাজের দিকে।
ফারাজ কিছুক্ষণ ওর খাতার দিকে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল,“পড়াশোনা কিছু পারো আদৌ?”
রুশদী নিরাসক্ত স্বরে জবাব দিল, “পারি।”
ফারাজ এবার নিজের বিরক্তিটা একটু স্পষ্ট করে বলল, “একটা অংক করতে এতক্ষণ লাগছে, কাল খাতায় লিখবে কী?”
রুশদী কলমটা হাতে ঘুরিয়ে টিপ্পনী কাটল, “আপনার মাথা আর আমার মুণ্ডু।”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে একপলক রুশদীর দিকে তাকালো। তার চোখেমুখে তখন ‘এসব কী বলছে’ টাইপ একটা ভাব। সে পাল্টা প্রশ্ন করল, “পরীক্ষায় কি আমার মাথা
আর তোমার মুণ্ডু নিয়ে কোশ্চেন আসবে?”
রুশদী উত্তর দেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করল না। শুধু উপর-নিচ মাথা নেড়ে সায় দিল। ফারাজ খানিকটা থতমত খেয়ে গেল ওর এই নিস্পৃহতায়। তার মেজাজ এখন খিটখিটে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু রুশদীর অদ্ভুত লজিকের কাছে সে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলছে। সে আবার প্রশ্ন করল, “পরীক্ষায় ফেল করার ইচ্ছা আছে নাকি?”
রুশদী এবারও চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ফারাজ এবার ব্যঙ্গ করে বলল, “ফেল করলে তোমাকে গার্মেন্টসে চাকরি দিয়ে দেব। শাহফারাজ খানের বউ এইচএসসি ফেল করেছে—ইস কথাটা কেমন শোনায়। নিজের সাথে সাথে আমার মান-সম্মানটাও ডুবাবে।”
রুশদী একবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, “আমি তো দেখতে পাচ্ছি না।”
ফারাজ অবাক হয়ে বলল, “কী দেখতে পাচ্ছ না?”
“আপনার মান-সম্মান।”
ফারাজ ক্ষুব্ধ হয়ে বলল, “মজা করছ আমার সাথে?”
“আপনার মনে হয়?”
“হ্যাঁ।”
“তবে করছি।”
ফারাজের ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে যাচ্ছে। সে আর্তনাদ করার মতো গলায় বলল, “তুমি কি পাগল?”
রুশদী নির্লিপ্ত, “আপনার মনে হয়?”
“হ্যাঁ।”
“হবে তাই।”
ফারাজ এবার তুরুপের তাস ছাড়ল, “পাবনা যেতে চাও?”
রুশদী এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল, “একবার ঘুরে এসেছি।”
ফারাজ ভিরমি খেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথা থেকে?”
“পাবনা মেন্টাল হসপিটাল থেকে।”
ফারাজ এবার নিজের কপাল চাপড়ে বলল, “রুশদী, জানো তুমি একটা 5পি?”
রুশদী কৌতূহলী চোখে তাকাল, “৫-পি মানে?”
“পাবনা পাগলা গারদের পলাতক পাগল!”
রুশদী যেন একটা বড় প্রশংসাপত্র পেয়েছে, এমনভাবে বলল, “আপনার ব্রেন ভালো, সঠিক ধরতে পেরেছেন।”
ফারাজ আর পারল না। সে বলল, “তোমার সাথে আর কিছুক্ষণ কথা বললে এই ভালো ব্রেনটাও খারাপ হয়ে যাবে।”
রুশদী মৃদু হেসে জয়ের ভঙ্গিতে বলল, “আপনি আসলেই বুদ্ধিমান! আমি যে আপনাকে পাগল করার মিশনে নেমেছি, সেটা শেষমেশ ধরতে পারলেন। গুড।”
ফারাজ আর তর্কে গেল না। টেবিলের ওপর ছোট্ট একটি মখমলের বক্স রেখে বলল, “কথা কম বলো। দেখো, এটা পছন্দ হয়েছে কি না।”
রুশদী একবার বক্সটার দিকে, আবার ফারাজের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী আছে এতে?”
ফারাজ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বিরক্তি মাখা গলায় বলল, “ঘোড়ার ডিম আছে, ভেজে খেয়ে নাও।”
ফারাজের এমন উত্তুরে রুশদীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। অনেক কষ্টে সেই হাসি চেপে রেখে সে বক্সটা হাতে নিল। ঢাকনা খুলতেই তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। ভেতরে একটি চমৎকার আংটি। এটা কি স্বর্ণের, সিটি গোল্ড নাকি হীরা—তা বোঝার মতো বিশেষজ্ঞ সে নয়। তবে আংটির ওপর বসানো টকটকে লাল পাথরটা যেন আগুনের মতো জ্বলছে। অসাধারণ তার কারুকাজ।আংটিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে সে দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, “কোথায় পেলেন এটা?”
ফারাজ আড়াল থেকেই জবাব দিল, “তোমার মামা রাস্তায় ফেলে গিয়েছিল, আমি কুড়িয়ে নিয়ে এসেছি।”
রুশদী মুচকি হেসে বলল, “আমাকে গিফট করলেন?”
“নাহ!” ওপাশ থেকে সংক্ষিপ্ত উত্তর এলো।
রুশদী আংটিটার দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখল। লাল পাথরের প্রতিফলন তার চোখের মনিতে এসে লাগছে। এমন নিখুঁত আর রুচিশীল একটা জিনিস ফারাজ তার জন্য পছন্দ করে এনেছে ভেবে মনের কোণে এক ফালি ভালো লাগার রোদ এসে পড়ল। সে মৃদুস্বরে নিজে নিজেই বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর গিফট।”
বহুদিন পর সেই অদ্ভুত ছেলেটার কাছ থেকে আবার মেসেজ এলো তিথির ফোনে। প্রায় দুই ঘণ্টা আগে পাঠানো ছোট্ট একটি বার্তা। ইনবক্সে ক্লিক করতেই স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠল শানের সেই চিরচেনা পাগলামি। তিথি এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলল পুরোটা,
“বেয়াইন, অনেক বিরক্ত করলাম আপনাকে ক’দিন, তবে এবার আপনার ছুটি। হয়তো কয়েক দিন কিংবা কয়েক মাসের জন্য। এই আইডি থেকে আর কোনো মেসেজ আপনার কাছে যাবে না। ভাববেন না হারিয়ে যাচ্ছি, আসলে ক্যারিয়ার গড়তে যাচ্ছি। আমি জানি, আমি খুব উদ্ভট একটা ছেলে। কোনো কিছু চেপে রাখতে পারি না, পরিস্থিতি কিংবা পরিবেশ—কিছুই আমার মাথায় ঢোকে না। যা আসে, বলে ফেলি। আমার আচরণে হয়তো আপনি আমাকে খারাপ ভেবেছেন কিংবা আমি আপনার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না, কারণ মানুষকে বিরক্ত করতে আমার দারুণ লাগে। আপনি যদি সত্যিই বিরক্ত হয়ে থাকেন, তবেই আমি সফল।
আপাতত কিছুদিন বিরতি দিলাম। তবে মনে রাখবেন, আমি আবার ফিরব আর আপনাকে আগের মতোই জ্বালিয়ে মারব। ততদিন অব্দি বিরক্ত করব, যতদিন না আপনি আমার হচ্ছেন। আমি এত সহজে পিছু ছাড়ার পাত্র নই। আবারও দেখা হবে, কথা হবে, আর হাজারবার আপনাকে প্রপোজ করা হবে। আপাতত বিদায় বেয়াইন।
লাভ ইউ। মনে মনে ‘লাভ ইউ টু’ বলতে ভুলবেন না কিন্তু!”
মেসেজটা পড়া শেষ করে তিথি দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রবাদ আছে—মানুষ অভ্যাসের দাস। অপছন্দের কোনো কাজ যদি কেউ প্রতিনিয়ত করতে থাকে, তবে অজান্তেই তা একদিন পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নেয়। রোজ ঘটে যাওয়া বিরক্তির বিষয়গুলো যখন হঠাৎ থেমে যায়, তখন মনের কোনো এক কোণে এক প্রকার হাহাকার জন্ম নেয়।
তিথির ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনটাই ঘটছে। শানের পাঠিয়ে যাওয়া সেই অদ্ভুত মেসেজগুলো কিংবা কলেজের গেটে অতন্দ্র প্রহরীর মতো তার দাঁড়িয়ে থাকা—এসবই এতদিন ছিল চরম বিরক্তির উৎস। কিন্তু আজ এই বিদায়বেলায় সেই বিরক্তিগুলোই যেন সূক্ষ্ম এক ভালো লাগার রঙ মেখে বিষণ্নতায় রূপ নিয়েছে। শান তার লক্ষ্যে সফল হয়েছে কি না জানা নেই, তবে তিথি যে ছেলেটাকে মিস করতে শুরু করেছে—তা আজ স্পষ্ট।
বসুন্ধরা কিংসের বিশাল চত্বরের বাইরে তখন ফারাজ এর গাড়ি দাঁড়িয়ে। দরজা খুলে শান আর সিফাত একসাথে গাড়ি থেকে নামল।গাড়ির ডিকি থেকে নিজেদের লাগেজটা বের করে,বিদায় নিয়ে তারা ক্লাবে ঢুকতেই যাচ্ছিল ঠিক তখনই সিফাত ফিরে এসে হুট করে ফারাজকে জড়িয়ে ধরল। সিফাতের কণ্ঠে একরাশ অপরাধবোধ আর জড়তা। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“সরি ভাইয়া! তখন নেশার ঘোরে ছিলাম বলে তোমাকে যা নয় তা শুনিয়ে দিয়েছি। আমি সত্যিই খুব দুঃখিত ভাইয়া। বিশ্বাস করো, তখন আমার নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।”
ফারাজ সিফাতের পিঠে ভরসার হাত রাখল। বড় ভাইয়ের মতো প্রশান্তির হাসি টেনে সে খুব স্বাভাবিক স্বরে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
“আরে ব্যাপার না! ছোটরাই তো ভুল করবে, তাই বলে কি সেটা মনে ধরে রাখতে হয়? কিচ্ছু হয়নি। ওসব ভুলে যা, একদম চিল থাক।”
পরীক্ষার হল থেকে বের হতেই যেন এক দলা তাজা বাতাস শরীরে এসে লাগল। করিডোরেই রুশদীর দেখা হয়ে গেল তিথির সাথে। দু’জনের সিট আলাদা রুমে পড়েছে। দেখা হতেই দুজনের সেই চেনা আড্ডা শুরু হলো। পরীক্ষার প্রশ্ন কেমন ছিল, কোন অংকটা মেলাতে গিয়ে ঘাম ছুটেছে—এসব বকর বকর করতে করতে দু’জনে পা বাড়াল গেটের দিকে।
হাঁটতে হাঁটতে আচমকা তিথি একটু আমতা আমতা করে বলে উঠল,”ওই রুশদী, শান ভাইয়া আসলে কেমন রে?”
রুশদী এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে তিথির দিকে আড়চোখে তাকাল। তারপর ঠোঁট উল্টে একটা ভেংচি কেটে বলল,”ভাইয়া? তা ভাইয়া থেকে হঠাৎ সাইয়া বানানোর কোনো ইচ্ছা জেগেছে নাকি রে তোর?”
তিথি গাল ফুলিয়ে ধমক দিয়ে বলল, “ধ্যাত! আমি তোকে সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করছি, আর তুই ইয়ার্কি মারছিস?”
রুশদী এবার একটু নরম হয়ে হাসল, “ভাইয়া তো ভালোই, খারাপ হতে যাবে কেন? এখন তুই ঠিক কোন ধরনের ‘ভালো’র কথা শুনতে চাচ্ছিস সেটা বল, আমি সেভাবেই উত্তরটা সাজাচ্ছি।”
তিথি এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটু নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “উনি আমাকে প্রপোজ করেছেন।”
শুনে রুশদী মোটেও অবাক হলো না, বরং বেশ আয়েশ করে বলল, “তো সমস্যা কী? প্রেম কর! প্রেম কর, তারপর বিয়ে কর—ব্যাস! আমরা দু’জন দুই জা হয়ে এক বাড়িতে রাজত্ব করব।”
“মজা করছিস রুশদী? হঠাৎ করে কারো সাথে কি অমনি প্রেম করা যায়?”—তিথির কণ্ঠে সংশয়।
রুশদী এবার বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, “প্রেম কি আর বলে-কয়ে আসে রে? প্রেম তো হুটহাট জীবনে আসে। আস্ত একটা ঝড়ের মতো দেখবি উড়ে এসে জুড়ে বসবে তোর মনে, তারপর আর ছাড়ার নামগন্ধ নেই।”
তিথি তার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর বিড়বিড়িয়ে বলল, “তাহলে কি হ্যাঁ বলে দেব?”
রুশদী একগাল হেসে উৎসাহ দিয়ে বলল, “বলে দে! জিতে যাবি।”
তিথি এবার চোখ কপালে তুলে বলল, “তুই কি দালালি করছিস ওর হয়ে?”
রুশদী ফিক করে হেসে দিয়ে জবাব দিল, “আরে না! দালালি না, আমি তো ফ্রিতে ঘটকালি করছি।”
[প্লট চেঞ্জ করাই অনেক জায়গায় এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। এরপরে যা লিখবো, ভুলভাল লাগলেও মানিয়ে নিও দয়া করে।ধরে নাও এটাই গল্পের সুচনা।]
০-সূচনা-০
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঘড়ির কাঁটা নয়টার ঘর ছুঁইছুঁই। ফারাজ বাড়িতে নেই, বাইরে থেকে আসা এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছে। শোবার ঘরের বিছানায় কয়েক কার্টুন চকলেট নিয়ে রীতিমতো রাজ্য জয় করে বসেছে শের। এক এক করে অতি যত্নে চকলেটগুলো দেখছে সে।
এতগুলো চকলেট দেখে রুশদীর চক্ষু চড়কগাছ। ফারাজ সাধারণত শেরকে খুব বেশি চকলেট খেতে দেয় না, সেখানে আজ রীতিমতো কার্টুন ভর্তি উপহার! রুশদী কৌতূহল সামলাতে না পেরে বিছানার একপাশে বসল। একটা চকলেট হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
“বাপরে! এতগুলো চকলেট? পাপা কেন দিল হঠাৎ?”
শের বেশ গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে বলল, “পাপা সিঙ্গাপুর থেকে আমার জন্য স্পেশালি এনেছে।”
“হঠাৎ এত চকলেট? কোনো বিশেষ কারণ আছে নাকি?” রুশদীর কণ্ঠে তখনো সন্দেহের রেশ।
শের এবার একটু রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল, “আসলে আমি পাপার একটা মস্ত বড় কাজ করে দিয়েছি—সো এটা আমার পেমেন্ট। পাপার সাথে আমার আগেই কন্টাক্ট হয়েছিল যে, যদি আমি কাজটা ঠিকঠাক করতে পারি, তবে পাপা আমাকে এতগুলো চকলেট দেবে।”
রুশদী এবার আরও অবাক হয়ে বলল, “কী এমন কাজ করেছ যার জন্য এত বিশাল উপহার মিলল?”
শের একটু ভাব ধরে বলল, “উম হু! বলা যাবে না, এটা টপ সিক্রেট!”
“আমাকেও বলা যাবে না?” রুশদী একটু আদুরে গলায় আবদার করল।
শের সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলল, “পাপা বিশেষ করে তোমাকে বলতে একদম বারণ করে দিয়েছে।”
রুশদী এবার কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে মুখ ভার করল। “শের, ঘটনা তো বেশ সন্দেহজনক! আমাকে বলবে না তুমি? ঠিক আছে, তবে আমি তোমার ওপর অনেক রাগ করব।”
রুশদীর রাগ দেখে শের একটু ভড়কে গেল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আশ্বস্ত হয়ে সে বলল, “উফ বাবা, বলছি! কিন্তু খবরদার, পাপাকে কিন্তু বলবে না যে আমি তোমাকে বলেছি। প্রমিজ?”
রুশদী তড়িঘড়ি করে সায় দিল, “ওকে, প্রমিজ! এবার বলো।”
শের এবার অতি সন্তর্পণে রুশদীর একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “বলত তোমাদের বিয়ের ঘটক কে?”
রুশদী ভ্রু কুঁচকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কে?”
শের নিজের ছোট্ট বুকটা ফুলিয়ে বেশ গর্বের সাথে বলল, “আমি!”
“তুমি? কিন্তু কীভাবে?” রুশদীর বিস্ময় যেন কাটছেই না।
শের এবার একটু ভাব নিয়ে মাথা নাড়ল, “উঁহু… ওটা বলা যাবে না।”
রুশদী নাছোড়বান্দা। সে শেরের গাল টেনে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “লক্ষ্মী সোনা আমার, বলো না কী হয়েছিল?”
“না না, একদম বলব না!”
শের চকলেটের কার্টুন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ার ভান করল।
“আরে বলো না শের! আমি কি কাউকে বলব নাকি?”
শের এবার চকলেট ছেড়ে একটু নড়েচড়ে বসল। রুশদীর চোখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় গলায় জিজ্ঞেস করল, “আমাদের প্রথম দেখার কথা মনে আছে তোমার?”
রুশদী একটু ভেবে বলল, “কেন, ওই যে রেস্টুরেন্টে?”
শের হোহো করে হেসে উঠল, যেন রুশদী খুব বড় কোনো ভুল করেছে।
“আরে না! তুমি তো দেখছি সব ভুলে যাও। ওই যে ওই পচা ভাইয়াটা… কী যেন নাম তার? তোমার ক্লাসমেট…” শের কপালে হাত দিয়ে জোর করে মনে করার চেষ্টা করল, তারপর উজ্জ্বল মুখে বলল, “ফাহাদ! মনে পড়েছে? ওই পচা ভাইয়াটা যখন ক্যান্টিনে তোমাকে ডিস্টার্ব করছিল, তুমি আমাকে দেখিয়ে বলেছিলে না যে—আমি তোমার ছেলে? মনে আছে?”
রুশদী স্মৃতি হাতড়ে অবাক হয়ে বলল, “ওটা তুমি ছিলে নাকি?”
“হুম!” শের মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।
“ওহ! আমার তো একদম খেয়াল নেই। তারপর কী হলো বলো…?” রুশদী এবার বেশ উৎসুক হয়ে উঠল।
শের এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
“তারপর আর বলা যাবে না। তোমাকে বললে পাপা আমাকে বকুনি দেবে। ইটস টপ সিক্রেট!”
রুশদী তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “আরে, আমি কি তোমার পাপাকে বলে দেব নাকি? বলো না আমাকে।”
শের এবার এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিল, যেন ঘরের দেয়ালেও কান আছে। তারপর রুশদীর একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
অস্তরাগের রঙ পর্ব ১৬
পাপা লাইকড ইউ ফ্রম বিফোর। হি হায়ারড মি অ্যাজ আ ম্যাচমেকার টু অ্যারেঞ্জ হিজ ম্যারেজ উইথ ইউ।”(এই ব্রিটিশের ভাষায় ভুল টুল থাকলে বলে দিও। আমি বাঙালি, ব্রিটিশ নই।)
শেরের মুখে এমন তুখোর সত্য শুনে রুশদী যেন পাথর হয়ে গেল।
