Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ৩

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৩

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৩
তেজরিন উম্মীদ

ঢাকার ব্যস্ত শহরের এক অভিজাত রেস্টুরেন্ট। বাইরের রাজপথে গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলো আর হর্নের কানফাটানো আওয়াজ রেস্টুরেন্টের ভিতরেও শোনা যাচ্ছে।মৃদু হলুদাভ আলোয় চারপাশটা বেশ সুন্দর লাগছে।এর মাঝে, মুখোমুখি রাইমা খান এবং রুশদী। রাইমা খানের চোখেমুখে আভিজাত্যের ছাপ আর।রুশদী রাইমা খানের সমানে নিজেকে ভদ্র মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।
দুপুরের ঘটনায় ফারাজ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে রাইমা খানকে সব বলেছে। ছেলের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে রাইমা খান স্থির থাকতে পারেননি। তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন এই মেয়েটির সাথে সরাসরি কথা বলবেন। কেন সে ফারাজের মতো সুপাত্রকে বারবার প্রত্যাখ্যান করছে, তা জানা দরকার। কিন্তু সন্ধ্যায় রুশদীর মুখোমুখি বসে রাইমা খান কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। মেয়েটির শান্ত চাহনি আর মার্জিত আচরণ তাকে মুগ্ধ করছে। তবে কেন সে ফারাজের সাথে এমন করছে? বিয়ে ভাঙার জন্য কি এত অভিনয়?

রাইমা খান কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“রুশদী, আমার ছেলেকে নিয়ে তোমার কোনো অভিযোগ থাকলে বলতে পারো।”
রুশদী দীর্ঘক্ষণ টেবিলের এককোণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ছিল। রাইমা খানের কথায় সে ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার কণ্ঠস্বর বিকেলের ঝরা পাতার শব্দের মতোই মৃদু এবং করুণ শোনাল। সে নিচু সুরে বলল,
“না আন্টি, ওনার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র কোনো অভিযোগ নেই। তিনি যথেষ্ট ভালো মানুষ।”
“তাহলে? তুমি কি অন্য কাউকে পছন্দ করো?”
রুশদী এবারও মাথা নিচু করে নিল। তার দীর্ঘ চোখের পাতাগুলো যেন অশ্রুর ভার সইতে না পেরে নুয়ে পড়ছে। সে ধীরস্থিরভাবে বলল,

“না আন্টি, আপনি ভুল ভাবছেন। তেমন কোনো কারণ নেই। আসলে… আমি এই মুহূর্তে বিয়েটাই করতে চাচ্ছি না।”
রাইমা খান কিছুটা অধৈর্য হয়ে জানতে চাইলেন, “কারণটা কী? ফারাজের মতো ছেলে তো বারবার তোমার দ্বারে আসবে না।”
রুশদী দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার ভেতরের পাথরচাপা কষ্টটাকে বের করে আনল। কম্পিত ঠোঁটে বলল,”আমার বিয়ে হয়ে গেলে… আমার বাবা আর বাঁচবেন না।”
কথাটা শুনে রাইমা খান কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে তিনি বললেন,

“আমি যতটুকু জানি, তোমার বাবার সাথে তোমার সম্পর্ক খুব একটা মধুর নয়। এই যে তোমার মা তোমার কপালটা ফাটিয়ে দিল, তোমার বাবা তো নিশ্চয়ই প্রতিবাদ করেননি? তোমার চেয়ে তোমার সৎ মায়ের প্রতিই তার টান বেশি। তোমার বিয়ে হলে তো তিনি বরং খুশিই হবেন। মরার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?”
রুশদী এবার রাইমা খানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকাল। তার চোখে যেন অতীতের ধুলো জমা স্মৃতির মিছিল ভেসে উঠল। তার চোখের কোণে জমে থাকা জল চিকচিক করছে। একটু সময় নিয়ে সপবলতে শুরু করল সে,
“আন্টি, আমার সৎ মা মানুষ নন, তিনি এক জঘন্য লোভী মহিলা। আমি বাড়িতে আছি বলেই বাবা আজও অন্তত দুবেলা দুমুঠো ঠিকমতো খেতে পারছেন। আমি না থাকলে অযত্নে আর অবহেলায় তিনি না খেয়েই মারা যাবেন। আমি নিশ্চিত জানি, নাহিদা বেগম তাকে কোনোদিন নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবেন না। তিনি প্রচন্ড লোভী এক মহিলা, শুধু টাকার জন্য আমার বাবাকে বিয়ে করেছেন।ব্যবসায় লস করায় এখন বাবার প্রতি তার ব্যবহার রুঢ়। আজ আমাকেও টাকার জন্যই আপনার ছেলের হাতে তুলে দিতে চাইছেন। কাল যদি আমার বাবার চেয়ে আরও বিত্তবান কাউকে পান, তবে বাবাকে ছেড়ে যেতেও তিনি দ্বিধাবোধ করবেন না।”

রুশদীর গলার স্বর কিছুটা বুজে এল, তবুও সে থামল না।”আর আমার বাবা? তিনি তো ওই মহিলার মোহে অন্ধ, এক প্রকার পাগলই বলা চলে। বউ যদি আজ তাকে বলে নিজের কিডনি বিক্রি করে টাকা এনে দিতে, তিনি বোধহয় সেটাই করবেন। এই পৃথিবীতে আমি ছাড়া বাবার আর কোনো আপনজন নেই। তিনি আমাকে ভালোবাসুক বা না বাসুক, আমার আমার শরীরে তো তার রক্ত বইছে। এই অসহায় লোকটাকে এমন এক নরপিশাচির হাতে একা ফেলে দিয়ে আমি নিজের সুখের কথা চিন্তা করতে পারি না আন্টি। আমি তাকে একা ফেলে যেতে পারব না।বাবা না বাসলেও আমি তাকে বড্ড ভালোবাসি।”

রাইমা খান নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়েটির দিকে। তার মনে হলো, যে মেয়েটি নিজের জীবন তুচ্ছ করে এক স্বার্থপর বাবার কথা ভাবছে, সে তো সাধারণ কোনো মেয়ে নয়।সে এক অন্যরকম ত্যাগের প্রতিচ্ছবি।
রাইমা খান রুশদীর কথা শুনে এটুকু বুঝতে পারলেন, বাবার প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর। বাবা যেমনই হোক না কেন, তার প্রতি রুশদীর ভালোবাসা সীমাহীন। রাইমা খান রুশদীর এই ভালোবাসা দেখে কিছুটা সংশয়ে বললেন,
“কিন্তু রুশদী, তোমার বাবা কি তোমাকে ঠিক ততটা ভালোবাসেন যতটা তুমি তাকে বাসো?”
রুশদীর মুখে হালকা বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,

“বাবাকে ভালো না বেসে থাকতে পারি না। মাঝে মাঝে খুব রাগ হলেও বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারি না। তিনি যখন মা বলে ডাকেন, তখন মনে হয় বাবা চাইলে নিজের কলিজাও বের করে দিতে পারি। আমার বাবা ছাড়া আমার আপন আর কেউ নেই। তিনি যতই খারাপ হোক না কেন, আমি তাকে ঘৃণা করতে পারি না। জানেন কেন?আগের কথাগুলো খুব মনে পড়ে। এখন বাবা যেমনই হোক না কেন, আগে তো এমন ছিলেন না। আমার কিছু হলে পাগল হয়ে যেতেন। ঘুম না এলে সারারাত মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। কিছু চাওয়ার আগেই হাজির করে দিতেন। সেই বাবা বদলে গেলেও তার ভালোবাসাগুলো আজও আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে। আমি আমার বাবাকে অনেক ভালোবাসি।”

রাইমা খান রুশদীর দিকে তাকিয়ে সরাসরি বললেন, “তোমার বাবাকে আমি যতটুকু চিনেছি, তুমি যা বলছ তা সত্যি। তোমার সৎ মা যদি টাকার আবদার করে, তবে তোমার বাবা কিডনি বিক্রি করেও টাকার ব্যবস্থা করে দেবেন। তেমনি তোমার সৎ মায়ের কথা রাখতে তোমাকে বিক্রি করতেও তিনি হয়তো পিছু পা হবেন না। আমি তোমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড জানি, তাই সরাসরি বলছি। এই বিয়েটা হলে তুমি এবং তোমার তথাকথিত স্বার্থপর বাবা দুজনেই সুখে থাকবে।”
রাইমা খানের কথায় রুশদীর খারাপ লাগলেও এটাই বাস্তব। সে চুপ করে রইল। রাইমা খান বুঝতে পারলেন রুশদীর মনের অবস্থা। এত অল্প বয়সে এমন পরিস্থিতিতে থেকেও মেয়েটি নিজেকে অনেক সামলে রেখেছে। বয়সের তুলনায় অনেক ম্যাচিউরড হয়েছে। যে বাবা তাকে নিয়ে ভাবে না, তার বিয়ে হয়ে গেলে সে খেতে পারবে কিনা তা নিয়েও মেয়েটা চিন্তিত। রাইমা খান রুশদীর টেবিলের উপর রাখা ডান হাতটা ধরলেন। সেটা ছিল ভরসার হাত। তিনি বললেন,

“আমার ছেলেটা অনেক ভালো রুশদী। একটু জেদি, কিন্তু ওর জেদের জন্য তুমিই পারফেক্ট। ওর একগুঁয়েমির সাথে কেউ পারে না, সেখানে তুমি এখনই ওর অবস্থা নাজেহাল করে দিয়েছো। ওর অগোছালো জীবনটা তুমি চাইলে গুছিয়ে দিতে পারবে। সাধারণ মেয়ে হলে ওর উপর কথা বলতে পারবে না, কিন্তু তুমি পারবে।তোমাদের কেমিস্ট্রি টা হবে ইট পাটকেলের মত ।”
রাইমা খানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। রুশদীও কিছুটা অনিচ্ছার সঙ্গেই মৃদু হাসল। তারপর অভিযোগের সুরে বলল,
“আপনার ছেলে কিন্তু বড্ড ঝগড়াটে!”
রাইমা খান তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন,
“তুমিও তো কম যাও না বাপু। শের আমাকে সব বলেছে।”
ভদ্রমহিলার অকপট স্বীকারোক্তিতে রুশদী খানিকটা লজ্জা পেল। সেই বিব্রত ভাব কাটাতে সে মৃদু হেসে কফির কাপে চুমুক দিল।

“শোনো রুশদী,” রাইমা খান শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন,
“আমাদের লাইফটা অনেক ছোটো। আমরা হর হামেশা আমাদের লাইফের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত নি।আমরা প্রায়ই বর্তমানের মোহে আগামিকে হারিয়ে ফেলি। কখনো কখনো আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন পথে পা বাড়াই, যা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাড়ায় ফিউচারে। কিন্তু রুশদী, মনে রেখো মানুষ হিসেবে ভুল করা আমাদের স্বভাব। সবচেয়ে বড় ভুল সেটা নয় যা আমরা করে ফেলি, বরং সবচেয়ে বড় ভুল হলো সেই ভুল থেকে শিক্ষা না নেওয়া। আমরা হয়তো সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারব না, কিন্তু প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত আমাদের নতুন করে চিনতে শেখায়,কাকে বিশ্বাস করতে হয়, আর কোন পথে হাঁটলে নিজের শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। দিনশেষে, আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের যোগফলই আমাদের জীবন। ”

রুশদী খুব মনোযোগ দিয়ে রাইমা বেগমের কথাগুলো শুনছিল। পঁয়তাল্লিশ ছুঁইছুঁই এই নারী অসম্ভব গুছিয়ে কথা বলেন। তার ব্যক্তিত্বে এক ধরনের আভিজাত্য আছে। পরনের মিষ্টি রঙের শাড়িটা নিখুঁতভাবে কুচি দিয়ে পরা। মাঝখানে সিঁথি করা চুলে ছিমছাম খোঁপা। চোখে টানা কাজল। রুশদী মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। মানুষটা আর তার কথাবার্তা দুটোই ভীষণ পরিপাটি।
এর মাঝেই রাইমা খান কৌতুক মেশানো কণ্ঠে বললেন, “ভয় পেয়ো না, আমি কিন্তু একদম শাশুড়ি মেটেরিয়াল আছি বস!”

রাইমা খানের কথা শুনে এবার রুশদী আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। খিলখিল করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। মেয়েটার হাসি মারাত্মক সুন্দর। ঝরনার স্বচ্ছ জলের মতো সেই হাসি।মুক্তোর দানার মতো শুভ্র দাঁতের ঝিলিক আর চোখের কোণে জমে থাকা হাসির রেখা তাকে এক মায়াবী রূপ দান করল।
হাসি থামলে রাইমা খান প্রশ্ন করলেন, “কী ভাবলে তবে? তোমার মত কী?”
রুশদী সরাসরি রাইমা খানের চোখের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরকণ্ঠে বলল, “আমি বাবাকে একা ফেলে যেতে পারব না।”
রাইমা খান পরম মমতায় রুশদীর মাথায় হাত রাখলেন। স্নিগ্ধ হেসে বললেন, “ঠিক আছে, এখন বাসায় যাও। সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে ভাবো। আমার নম্বরটা নিয়ে যাও, যদি মত বদলাও তবে ফোন কোরো।”
রুশদী অপলক তাকিয়ে রইল রাইমা খানের দিকে। মহিলাটির সান্নিধ্যে কেমন যেন একটা ‘মা মা’ ভাব মিশে আছে। সন্তান অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেললে মা যেমন প্রদীপ হাতে এসে পথ দেখান, রাইমা খানকেও ঠিক তেমন মনে হচ্ছে। আজ রুশদীর মা বেঁচে থাকলে হয়তো তিনিও তাকে এভাবেই আগলে ধরতেন, দেখিয়ে দিতেন সঠিক কোনো পথ।

অলস এক বিকেল। জানলার পর্দা ঠেলে আসা রোদে ফারাজ নিজের ঘরে কার রেসিং গেমে বুঁদ হয়ে আছে। পাশে বসে ছোট শের মনোযোগ দিয়ে ট্যাবে কার্টুন দেখছে। দুজন মহাব্যস্ত নিজ নিজ কাজে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় দেখা দিল এক ছায়া। পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকল ফারাজের ছোট ভাই শাহনান খান, যাকে সবাই ভালোবেসে ‘শান’ বলে ডাকে। শানের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে বাবা শেহজাদ খান ওকে পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কাউকে কিছু না জানিয়ে আজ সে হঠাৎ দেশে হাজির। এসেই কানে এসেছে বড় ভাইয়ের বিয়ে ভাঙার খবর। সেই খবর নিয়েই সে সোজা হাজির হয়েছে ফারাজের ঘরে।
ফারাজ কানে হেডফোন গুঁজে টিভির স্ক্রিনে স্টিয়ারিং ঘোরাতে ব্যস্ত। শান নিঃশব্দে পেছনে দাঁড়িয়ে হুট করে ফারাজের কান থেকে হেডফোনটা টেনে সরিয়ে নিল। চমকে উঠে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল ফারাজ। ছোট ভাইকে সামনে দেখে বিস্ময়ে তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
বিস্ময় সামলে নিয়ে গম্ভীর গলায় ফারাজ শুধাল,

“তুই বাড়ি আসলি কখন? ড্যাড জানে?”
শান সেসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ধার ধারল না। বরং গালভরা হাসি নিয়ে খিকখিক করে হেসে বলল,
“তোমাকে নাকি হবু ভাবি রিজেক্ট করে দিয়েছে? সত্যি নাকি ভাইয়া?”
মুহূর্তেই ফারাজের মুখের ভঙ্গি পাল্টে গেল। আত্মসম্মানে ঘা লাগায় চটা গলায় জবাব দিল, “কে বলেছে তোকে এসব আজেবাজে কথা? এই ফারাজ কি এতই সস্তা যে একটা সাধারণ মেয়ে তাকে রিজেক্ট করবে? আমিই ওই মেয়েকে রিজেক্ট করেছি, বুঝেছিস?”
শান পাক্কা খবর নিয়েই এসেছে। এসব ভুজং ভাজং বুঝ সে আর নিবে না। শান টিপ্পনী কেটে বলল,
“ভাইয়া পাট নিও না তো। আমি সব খবর জেনেই এসেছি।”
“কচু জানিস তুই! আমার রুম থেকে যা এখন,”

ফারাজ প্রায় ধমক দিয়ে উঠল।
শান ভাইয়ের ধমক গায়ে না মেখে বিছানায় বসে থাকা শেরের দিকে এগিয়ে গেল। শের এতক্ষণ কার্টুনে মগ্ন ছিল, হঠাৎ কাউকে সামনে দেখে মাথা উঁচু করে তাকাল। শান চাচুকে দেখতে পেয়েই তার কচি মুখটা এক চমৎকার হাসিতে ভরে উঠল। মুহূর্তেই সে ঝাঁপিয়ে পড়ল শানের ওপর। শানও হেসে তাকে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ চাচা-ভাতিজার এই নীরব ভালোবাসার পালা চলল।
তারপর শানের গলা ছেড়ে বিছানায় উঠে দাঁড়াল শের। আধো আধো গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কখন আসলে চাচু?”

শান হাতের পাঁচ আঙুল মেলে ধরে বলল, “এই তো মাত্র পাঁচ মিনিট আগে।”
শের এবার শানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “দাদু জানে?”
শানও নাটকীয় ভঙ্গিতে ফিসফিস করে উত্তর দিল, “উঁহু, জানে না।”
শের চোখ বড় বড় করে বলল, “তবে তো তোমার খবর আছে! দাদু এবার তোমাকে পিটনি দিয়ে একদম চাটনি বানিয়ে ফেলবে।”
শান হাসতে হাসতে বলল, “নো প্রবলেম! চাটনি তো তোর খুব পছন্দ। তুই না ইয়াম ইয়াম করে খেয়ে নিস।”
শের হাসি দিয়ে চাটনি খাওয়ার অভিনয় করে বলল, “ইয়াম! ইয়াম! ইয়াম!”
ছোট্ট শেরের কথা শুনে শান হেসে কুটিপাটি হলো। শেরের কপাল আর গালে গোটা পাঁচেক চুমু খেয়ে তাকে আবার বুকে টেনে নিল সে। ঘরটা ভেসে গেল এই দুই দুষ্টু-মিষ্টির খুনসুটিতে।

ফারাজ আড়চোখে চাচা-ভাতিজার এই ভালোবাসার দৃশ্যটি দেখছিল। শেরের ছোট পৃথিবীতে বাবার পরেই যদি কাউকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তবে সে শান। শানও এই ছোট্ট মানুষটিকে ভীষণ ভালোবাসে। কোথাও বের হলে শেরের জন্য উপহার আনাটা শানের কাছে অনেকটা অভ্যাসের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত ছয়টা মাস শান দেশের বাইরে ছিল।প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েকশ বার ফোন করে শেরের খোঁজ নিয়েছে।ওদের এই আত্মার টান দেখে ফারাজ মাঝে মাঝে অবাক হয়।

ম্যাথমেটিক্স ক্লাস চলছে। লুৎফর স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে খড়খড় শব্দে জটিল সব সমীকরণ কষে যাচ্ছেন, কিন্তু রুশদীর মন সেখানে নেই। সে জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে আছে।একদম শেষ বেঞ্চে বসার স্যার তাকে দেখতে পাচ্ছে না। লাস্ট বেঞ্চে বসার এই এক মজা।
রুশদীর মাথায় সারাক্ষণ রাইমা খানের কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জানে, বাবার মায়াজালে আটকে থাকলে তার নিজের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বাবার প্রতি অন্ধ টানে নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দেওয়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। তবুও টান সে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছে না। এক অদ্ভুত দোটানায় তার ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।

“রুশদী!”
লুৎফর স্যারের কর্কশ কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল সে। ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যেতেই সে হচকচিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। স্যারের চোখের দিকে তাকিয়েই তার বুকটা ধক করে উঠল,নিশ্চয়ই তার অমনোযোগ ধরা পড়ে গেছে। লুৎফর স্যার এই কলেজের সবচেয়ে রাগী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।তাঁর ক্লাসে কেউ অন্যমনস্ক থাকলে তাকে চরম শাস্তি পেতে হয়। স্যারের রক্তিম চেহারার দিকে তাকিয়ে রুশদীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে কোনোমতে ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“জি… জি স্যার!”
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে লুৎফর স্যার হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন। বিদ্রুপের হাসি নাকি আনন্দের, তা বোঝার আগেই স্যার প্রশ্ন করলেন,

“তুমি বিবাহিত রুশদী? আর তোমার বাচ্চাও আছে? কই, আগে তো কখনও বলোনি!”
স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই পুরো ক্লাস যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার কৌতূহলী ও বিস্ময় ভরা চাউনি এখন রুশদীর ওপর। সে নিজেও যেন আড়াইশ ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক খেল। অবিবাহিত একটা মেয়ে ক্লাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুনছে সে নাকি বিবাহিত এবং তার এক সন্তানও আছে! মাশাআল্লাহ, বিয়ের আগেই সে মা হয়ে গেল! বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে রুশদী নিজেকে সামলে নিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ক্লাসের দরজার কাছ থেকে একটা ছোট্ট কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“হেই মম, হোয়াটসঅ্যাপ!”
মুহূর্তেই ক্লাসের সবার চোখ দরজার দিকে ঘুরে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে পুঁচকে শের, যার মুখে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি।
শেরের কণ্ঠস্বর শুনে রুশদী দরজার দিকে তাকাতেই দ্বিতীয় দফায় বড়সড় এক ঝটকা খেল। এই পিচ্চি এখানে এল কী করে? আর এসেই যেভাবে সবার সামনে ওকে মম বলে ডাকল, তাতে রুশদীর মান-সম্মানের বারোটা বেজে গেছে। লজ্জায় আর অস্বস্তিতে কান-মাথা গরম হয়ে উঠল ওর। ক্লাস থেকে দ্রুত বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই এক সহপাঠী টিপ্পনী কেটে বলে উঠল,

“তুমি যে বিবাহিত রুশদী, আগে তো কখনও বলোনি?”
রুশদী না থমকেই দাঁতে দাঁত চেপে জবাব দিল,
“বিশ্বাস করো, আমিও এই মাত্র জানলাম!”
রুশদী দ্রুত পায়ে শেরের কাছে পৌঁছাল। এই ছেলেটা আজ সবার সামনে ওর সম্মানের চাটনি বানিয়ে ছাড়ল! সে নিচু হয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় শেরকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে কী করছ, শের?”
ফের সোজা হয়ে লুৎফর স্যারের দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে বলল, “স্যার, আমি কি একটু আসছি?”
স্যারও সম্মতি জানালে রুশদী ক্লাস থেকে বের হয়ে আসলো।
করিডরে বের হয়েই রুশদী শেরকে নিজের সামনে দাঁড় করাল। হাত নেড়ে কড়া গলায় বলল, “এবার বলো, তুমি এখানে কেন এসেছ?”
শের দাঁত বের করে হাসল। তারপর পাশের একজনকে ইশারা করে বলল, “ঝিংকু তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে।”
রুশদী ভ্রু কুঁচকে শুধাল, “ঝিংকু? কে এই ঝিংকু?”

“ভাবি, এই যে আমিই ঝিংকু!”
করিডরের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক নিজের দিকে ইশারা করে বলে উঠল।
রুশদী সরু চোখে তার দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবল,এই আবার কোন ক্ষেতের মুলা? একে তো আগে কখনও দেখেনি। শান তখন রুশদীর সামনে এসে দাঁড়াল এবং একটা বড় করে সালাম দিয়ে বলল,
“ভাবি, আমি শান।”
“কে আপনি? আর আমাকে ভাবি ডাকছেন কেন?”
রুশদী বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল।
শান জবাব দিল, “আমি আপনার একমাত্র দেবর, শাহনান খান।”
‘খান’ পদবিটা শুনে রুশদী বুঝতে পারল, এই ছেলেই নিশ্চয়ই ফারাজের ছোট ভাই। রুশদী শুকনো গলায় বলল, “তাতে আমি কী করব?”
শান একটু হেসে বলল, “শুনলাম আপনি নাকি বড় ভাইয়াকে রিজেক্ট করে দিয়েছেন? কোন সেই মহীয়সী নারী যে ফারাজ খানকে না বলার সাহস রাখে, তাকে এক নজর দেখতেই চলে এলাম।”
রুশদী এবার চরম বিরক্ত হয়ে বলল, “দেখা তো হলো? এখন দয়া করে যান এখান থেকে। এটা আমার কলেজ, এখানে আমার একটা আলাদা মান-সম্মান আছে, সেটা আর ডুবাবেন না প্লিজ।”

“ওকে, শের চলো,”
শান মাথা নেড়ে সায় দিল।
তবে শের যাওয়ার আগে রুশদীর দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করল, “তুমি একটু নিচু হও তো।”
রুশদী একটা বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু হলো। মুহূর্তেই শের ওর গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “লাভ ইউ মম! উম্মাহ!”
বলেই রুশদীর নরম গালে একটা কড়া করে চুমু বসিয়ে দিল সে। রুশদী কিছু বুঝে ওঠার আগেই শের খিলখিল করে হাসতে হাসতে শানের হাত ধরে লাফাতে লাফাতে করিডর দিয়ে চলে গেল। রুশদী স্তব্ধ হয়ে গালে হাত দিয়ে ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
ছেলেটা অদ্ভুত! ওর ওই নিস্পাপ ভালোবাসাটা যেন এক নিমিষেই রুশদীর সব বিরক্তি ধুয়ে মুছে দিল। মাতৃহীন এই শিশুটা অবলীলায় এক অপরিচিতাকে মা ডেকে তার আঁচলে আশ্রয় খুঁজছে। এই দৃশ্যটা রুশদীর হৃদয়ের কোনো এক কোণে চিনচিনে এক বেদনার জন্ম দিল। ছেলেটার জন্য অদ্ভুত এক মায়া আর হাহাকার তার বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে এল। ওর ওই ছোট্ট বুকটা হয়তো সারাক্ষণ এভাবেই একটু মায়ের স্পর্শের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে।

রাত বাড়ার সাথে সাথে রুশদীর ব্যস্ততাও পাল্লা দিয়ে বাড়ে। নাহিদা বেগমের ফরমায়েশের অত্যাচারটা ইদানীং যেন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। রুশদী একটু পড়ার বই নিয়ে বসলেই ওনার হাজারটা নাটক শুরু হয়।কখনও মাথা ব্যথা, কখনও পা ব্যথা। পা টিপে দেওয়া থেকে শুরু করে অবেলায় রান্না বসানো, সবটা যেন রুশদীকে তটস্থ রাখার জন্য। রুশদীর মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ওই মহিলার গলাটাই টিপে দিতে, কিন্তু পরক্ষণেই বাবার মুখটা মনে পড়তেই সব রাগ জল হয়ে যায়।

রুশদী মুরগির মাংস রান্না করে রেখেছে, এখন ঘাম ঝরিয়ে রুটিগুলো সেঁকছে।
সবাই যখন ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবার নিয়ে খোশগল্পে মত্ত, রুশদী তখন একা হাতে রান্নাঘরের হাড়ি-পাতিল মাজছে। খিদের জ্বালায় পেটটা কামড়াচ্ছে ওর, শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে চাইছে। রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ও একবার ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। সবাই খুব আয়েশ করে গরম গরম রুটি আর মাংস দিয়ে তৃপ্তিভরে খাচ্ছে।
বাবার দিকে তাকিয়ে রুশদীর বুকটা হু হু করে উঠল। বাবাও সবার সাথে দিব্যি গল্প করতে করতে খাচ্ছেন। অথচ একবারও কি মনে পড়ল না তার মেয়েটার কথা? বাড়ির কাজের মেয়ের মতো যে মেয়েটা সারাদিন খাটল, সে কিছু মুখে দিয়েছে কি না, এই সামান্য প্রশ্নটাও কি বাবার মস্তিষ্কে একবারের জন্য খেলল না? নিজের শৎ ছেলে, নতুন স্ত্রী আর শাশুড়িকে নিয়ে বাবা আজ বড় সুখী, অথচ সেই সুখের ভিড়ে রুশদী যেন এক অবহেলিত অস্তিত্ব। অপমানের বিষে ওর মনটা তেতো হয়ে গেল। তবে খারাপ লাগতে লাগতে এখন অভ্যাস হয়ে গেছে, খারাপ লাগাটাও আজকাল বেশি খারাপ লাগে না।

কাজ শেষ করে রুশদী ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। ততক্ষণে সবাই খাওয়া শেষ করে উঠে গেছে। নাহিদা, আনাস আর ওনার মা মিলে ড্রয়িংরুমে বসে আয়েশ করে টিভি দেখছেন। রুশদী খাবারের পাত্রের ঢাকনা তুলে দেখল একদম শূন্য! অবশিষ্ট কিছুই নেই, কেবল তলায় সামান্য ঝোল আর কিছু এঁটো থালাবাসন পড়ে আছে। ওর হাত-পা রাগে কাঁপতে শুরু করল।
ও বুঝতে পারল, নাহিদা বেগম ইচ্ছে করেই রুশদীকে অভুক্ত রাখার পরিকল্পনা করেছেন। বাবার চোখের সামনে এমন অন্যায় অত্যাচার সহ্য করাটা অসহ্য হয়ে উঠছে ওর কাছে। শুধু বাবার কথা ভেবে ও চুপ করে আছে, কিন্তু আজ যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে রুশদী নিজের খিদের চেয়েও বেশি অনুভব করল এক গভীর একাকিত্ব। এই বাড়িতে সে যেন থেকেও নেই।

রুশদী শূন্য পাতিলটার দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পেটের ক্ষুধাটা তখন যেন হৃদয়ের হাহাকারের কাছে হার মেনেছে। ঝাপসা চোখে সে একবার ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল, যেখানে হাসাহাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। অথচ এই হাসির রাজ্যে সে যেন এক পরিত্যক্তা। রুশদীর খুব ইচ্ছে করল চিৎকার করে বাবাকে বলতে,’বাবা, আমি কি এই বাড়ির কেউ না? কাজ শেষে আমার জন্য কি এক টুকরো রুটিও জুটবে না?’ কিন্তু কথাগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে এল। চোখের কোণে এক ফোঁটা লোনা জল জমা হলো, যা গড়িয়ে পড়ার আগেই সে মুছে ফেলল।
ক্ষুধার চেয়েও রুশদীর ভেতরে এখন রাগটা তীব্র হল। সে অনেক কষ্টে নিজের রাগ দমিয়ে রাখল।পাথরের মতো স্থির হয়ে বসে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তে ডাইনিং টেবিলে পানি খেতে এলেন নাহিদা। রুশদী শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করল, “আমার খাবার কোথায়?”

নাহিদা গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে নির্লিপ্ত মুখে বললেন, “খাবার কোথায় মানে? শেষ হয়ে গেছে।”
“মানে কী? আমি কী খাব তবে?”
রুশদীর কণ্ঠস্বরে এবার ক্ষোভ ফুটে উঠল।
নাহিদা এক চুমুক পানি খেয়ে অবহেলার স্বরে বললেন,
“সবাই খেয়ে ফেলেছে, তুই এখন মুড়ি-টুরি কিছু একটা খেয়ে নে। না হলে নতুন করে ভাত রাঁধ।”
এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না রুশদী। সে চিৎকার করে উঠল, “মজা করছেন আমার সাথে? রাত একটা বাজে এখন, আমার কি ক্ষুধা লাগে না? আমার কি পেট নেই? সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখন খেতে বসলাম, তখন বলছেন খাবার নেই! আমার ভাগের খাবারটা কি আলাদা করে রাখা যেত না? আমি কি এখন এই মাঝরাতে মুড়ি খেয়ে থাকব?”
রুশদীর চিৎকারে নাহিদা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, “তুই আমার ওপর চড়া গলায় কথা বলিস! তোর সাহস তো কম না। খেতে মন চাইলে নিজে রেঁধে খা, না হলে পানি খেয়ে ঘুমিয়ে যা। আমাকে বিরক্ত করবি না।”

রুশদী এবার করুণ চোখে ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল। বাবা সেখানে আয়েশ করে বসে টিভি দেখছেন। রুশদীর কানফাঁটা চিৎকার নিশ্চয়ই তার কানে পৌঁছেছে, অথচ তিনি পাথরের মতো নির্বিকার। রুশদী চিৎকার করে বলল, “আব্বু! তুমি কি কিচ্ছু বলবে না?”
আানাস হক অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। কোনো মমতার ছিটেফোঁটাও নেই সেই দৃষ্টিতে। তিনি রুক্ষ গলায় বললেন, “তোর মা তো বললই ভাত নেই। ক্ষুধা লাগলে রান্না করে খা, চিল্লাচিল্লি করছিস কেন?”
“আব্বু!” এক বুক হাহাকার নিয়ে আর্তনাদ করে উঠল রুশদী। বাবার এমন নির্দয় আচরণ তার কলিজায় তীরের মতো বিঁধল।
নাহিদা এবার রাগে ফুসে উঠলেন,
“তোর আব্বু আমাকে কী বলবে শুনি? তুই দিন দিন বড্ড বেয়াদব হয়ে যাচ্ছিস। তোর একটা উচিত শিক্ষা হওয়া দরকার!”

বলেই তিনি আশেপাশে রুশদীকে মারার জন্য কিছু খুঁজতে লাগলেন। শেষমেশ রান্নাঘর থেকে রুটু বেলার বেলুনটা হাতে নিয়ে রুশদীকে আঘাত করতে শুরু করলেন।
রুশদী প্রথমে হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি হঠাৎ আটকে গেল বাবার দিকে। আানাস হক নির্বিকারভাবে টিভির পর্দায় তাকিয়ে আছেন। নিজের মেয়েকে চোখের সামনে সৎ মা এভাবে মারছে, অথচ তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রুশদী হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল।সে বাধা দেওয়া বন্ধ করে দিল। নাহিদার প্রতিটি আঘাত তার পিঠে নয়, যেন তার বাবার প্রতি জমে থাকা শেষ মায়াটার ওপর পড়ছে।

নাহিদ এসে অবশেষে মাকে থামাল, কিন্তু আানাস হক তখনও শান্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে বাবার প্রতি রুশদীর হৃদয়ে এক চরম ঘৃণার জন্ম নিল। এই লোকটার মায়ার জন্য সে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিতে চেয়েছিল? ছিঃ! নিজের ওপর ধিক্কার জন্মালো ওর। রুশদী বুঝতে পারল, সে এক ভুল মানুষের পেছনে আবেগের অপচয় করছিল। যে বাবা তার সন্তানকে রক্ষা করতে পারে না, সেই বাবার প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকার মানে হয় না।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ২

রুশদী দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল সে ফারাজকে বিয়ে করবে। এই বন্দিশালা থেকে সে মুক্তি চায়। তারও তো একটা জীবন আছে, তারও তো একটু হাসিখুশি থাকার অধিকার আছে। এই পাথুরে মায়ার চেয়ে ফারাজ খানের ওই জেদি সংসারটাই বোধহয় তার জন্য অধিক নিরাপদ। রুশদী স্থির চোখে বাবার দিকে শেষবারের মতো তাকাল এই দৃষ্টিতে আর মায়া নেই, আছে কেবল এক বিদঘুটে ঘৃণা। সে এবার নিজের জীবন নিজের মতো করে সাজিয়ে নেবেই।
আচ্ছা আমার লেখাটা কি বেশি অগোছালো লাগছে? তোমাদের কি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? জানাবে।

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৪