আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৮
সাবিলা সাবি
পরদিন সকালবেলা।
গতকাল বিকেল পর্যন্ত একটার পর একটা কাজ শেষ করার পর অবশেষে হিয়ার মাথায় লিওনের জন্মদিনকে ঘিরে পুরো পরিকল্পনাটা পরিষ্কার হয়ে গেছে।
কী উপহার দেবে, কোথায় সারপ্রাইজটা হবে, কীভাবে জায়গাটা সাজাবে—সবকিছুই হিয়া আগেই ঠিক করে ফেলেছে। আকাশ থেকে সাদা ফুলের বৃষ্টি নামবে, ড্রোনে ভেসে উঠবে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। পুরো রাতটার প্রতিটি মুহূর্ত সে নিজের মতো করে সাজিয়ে রেখেছে।
এখন শুধু বাকি বাস্তবায়ন। তবে সেই বাস্তবায়ন শুরু হবে আগামীকাল।
২২ আগস্ট রাত থেকে।
আজকের দিনটা মূলত শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি আর সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।
হিয়া নিজের কক্ষের বিশাল জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সকালের আলো কাচের জানালা পেরিয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়েছে। তার হাতে ফোন, স্ক্রিনে খোলা রয়েছে লিওনের একটি ছবি।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“আর মাত্র দুই দিন…”
কথাটা বলেই সে নিজেই থেমে গেল।
না।
দুই দিন পর নয়। ২২ আগস্ট রাত পেরোলেই ২৩ আগস্ট।
আর ২৩ আগস্ট রাত বারোটায় শুরু হবে তার বাজপাখির জন্মদিন।
হিয়া আবার ছবিটার দিকে তাকাল।
“আর মাত্র একটা রাত।”
তার চোখে তখন উচ্ছ্বাস। লিওনের জন্য এত বড় কিছু করার পরিকল্পনা সে আগে কখনো করেনি। এত বছর তার জন্মদিন এলে দূর থেকেই শুধু তার কথা ভেবেছে। কখনো একা বসে কেক কেটেছে, কখনো তার পুরোনো ছবি দেখেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা।
এবার লিওন তার সামনে থাকবে। আর হিয়া নিজের হাতে তার জন্মদিনের প্রথম মুহূর্তটাকে বিশেষ করে তুলবে। ভাবতেই তার ঠোঁটের কোণে আবার হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ তার কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল। একটা সমস্যার কথা এতক্ষণ সে ভাবেইনি। লিওনকে সেখানে নিয়ে যাবে কীভাবে? হিয়া ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
“সবকিছু ঠিক করে ফেলেছি…” সে নিজের মনেই বলল,
“কিন্তু বাজপাখিটাকে নিয়ে যাব কীভাবে?”
টাওয়ার ব্রিজে তাকে সরাসরি ডেকে নেওয়া যাবে না। লিওনকে যদি বলা হয় সেখানে আসতে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে কারণ জানতে চাইবে। আর হিয়া যদি নিজে তাকে নিয়ে যেতে চায়, তাহলে জন্মদিনের সারপ্রাইজের পুরো রহস্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
হিয়া কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে কক্ষের ভেতর হাঁটতে শুরু করল।
কয়েকটা উপায় মাথায় এলেও একে একে সেগুলো বাদ দিল হিয়া। কোনোটাই ঠিক মনে হচ্ছে না।
“কোনো কেসের অজুহাত দিলে ও সন্দেহ করবে।”
আরেকটু ভেবে বলল, “ব্যক্তিগত কোনো কারণ দেখালে তো আরও বেশি প্রশ্ন করবে।”
হিয়া থেমে গেল। তারপর দুই হাত বুকের সামনে ভাঁজ করে কিছুক্ষণ ভাবল।
লিওনকে হিয়া ভালো করেই চেনে। সামান্য অস্বাভাবিকতাও তার চোখ এড়ায় না। তাই তাকে সরাসরি কিছু বললে সন্দেহ জাগবেই।
বিশেষ করে হিয়ার ব্যাপারে তো নয়ই। হিয়ার ঠোঁটে এবার মৃদু বিরক্তির হাসি ফুটল।
“এত বুদ্ধিমান কেন তুমি হিয়া?”
কয়েক সেকেন্ড পর আবার নিজের কথাতেই হেসে ফেলল সে।
“লিওন তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়াটাই তো কঠিন হয়ে গেল।”
হিয়া আবার ফোনটা হাতে তুলে নিল। লিওনের নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই তার চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে গেল।
সে কিছুক্ষণ শুধু নামটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর খুব আস্তে বলল, “তোমাকে আমি নিজে থেকে বলব না।”
ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।
“তোমাকেই এমনভাবে আসতে হবে, যাতে তুমি বুঝতেই না পারো তোমার জন্য কী অপেক্ষা করছে।”
হিয়া ফোনটা নামিয়ে ফেলল। পরিকল্পনার বাকি সবকিছু সে ঠিক করে ফেলেছে।এখন শুধু একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে—যে পথে লিওন নিজে থেকেই ২২ আগস্ট রাতে টাওয়ার ব্রিজে পৌঁছে যাবে। আর হিয়া ঠিক সেই মুহূর্তটার অপেক্ষায় থাকবে, যখন ঘড়ির কাঁটা বারোটায় পৌঁছাবে।
তারপর রাতটা বদলে যাবে। আকাশ থেকে ঝরে পড়বে সাদা ফুল, চারপাশ ভরে উঠবে আলোয়। হিয়ার জীবনে আনন্দের মুহূর্ত খুব বেশি আসেনি। কিন্তু লিওনের জন্মদিনের এই রাতটা সে অন্যরকম করে তুলতে চায়। অন্তত এই একটা রাত—শুধু লিওনের জন্য।
অন্যদিকে, সিআইডি হেডকোয়ার্টারে লিওনের কেবিনে তখনও নেমে এসেছে অস্থির নীরবতা।
তার সামনে খোলা কয়েকটি ফাইল। পাশে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনে থেমে আছে একটি সিসিটিভি ফুটেজের খালি সময়ের তালিকা।
লিওন বেশ কিছুক্ষণ ধরে একই বিষয় নিয়ে ভাবছিল।
হিয়াকে নিয়ে যাওয়ার পরের ঘটনাগুলো সে যতবার মনে করার চেষ্টা করছে, ততবারই একটা প্রশ্ন তার মাথায় ফিরে আসছে। কাগজটা হিয়ার হাতে এলো কীভাবে?
সেদিন ইন্টারভিউ রুমে হিয়া নিজেই তার সব অপরাধের কথা লিওনকে বলেছিল। লিওন প্রতিটি তথ্য নিজের হাতে নোট করেছিল। হিয়ার কাছ থেকে পাওয়া সেই স্বীকারোক্তিগুলোই ছিল তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু পরের ঘটনাটা আরও অদ্ভুত। হিয়া অচেতন হয়ে পড়েছিল। তাকে যখন চিকিৎসার জন্য মেডিকেল টিমের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনও তার কাছে ওই কাগজ থাকার কোনো কথা নয়। অথচ দানিয়েল যখন তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আসবে তার আগেই হিয়ার হাতে সেই কাগজটা ছিল।
আর লিওনের চোখের সামনে হিয়া কাগজটা চিবিয়ে গিলে ফেলেছিল।
লিওন ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল “কিন্তু কাগজটা ওর হাতে এলো কীভাবে?”
নিজের মনেই সে প্রশ্নটা করল।
সেদিন হিয়াকে ইন্টারভিউ রুম থেকে বের করার পর তার সঙ্গে যারা ছিল, তাদের তালিকা লিওন বহুবার দেখেছে।
কেউ কাগজটা তার হাতে দেয়নি। অন্তত বাইরে থেকে কেউ দেওয়ার সুযোগও পায়নি।
তাহলে?
লিওন আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
মেডিকেল রুমের সিসিটিভি ফুটেজ এমনকি হিয়াকে নিয়ে যাওয়ার পর ইন্টারভিউ রুমের কিছু মুহুর্তের ফুটেজ নেই।
শুধু ফুটেজ নেই তা নয় সেই অংশটি সিস্টেম থেকে এমনভাবে সরানো হয়েছে, যেন কেউ ইচ্ছা করেই সেটাকে মুছে দিয়েছে। লিওনের চোখ ধীরে ধীরে সরু হয়ে এল।
“কেউ ফুটেজ মুছে দিয়েছে।”
সে এবার নিশ্চিত। কিন্তু ফুটেজ মুছে ফেললেই তো প্রমাণ মুছে যায় না। বরং কখন, কেন এবং কার স্বার্থে ফুটেজটা সরানো হয়েছে সেটাও একটা প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
লিওন সঙ্গে সঙ্গে সেদিনের মেডিকেল টিমের তালিকাটা আবার সামনে টেনে নিল। একজন একজন করে সবার নাম, দায়িত্ব আর অবস্থান মিলিয়ে দেখতে লাগল।
তারপর হঠাৎ তার আঙুল থেমে গেল একটি নামের ওপর। একজন ডাক্তার। সেদিন ওই মেডিকেল টিমের সঙ্গেই ছিল। লিওন দ্রুত তার বিস্তারিত তথ্য খুলল।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
“এটা কী…?”
ডাক্তারের সাম্প্রতিক গতিবিধির তথ্য সামনে আসতেই লিওনের সন্দেহ আরও গভীর হলো। সেদিনের ঘটনার পরপরই লোকটা লন্ডন ছেড়ে চলে গেছে। শুধু তাই নয়, তার বর্তমান অবস্থানও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
লিওন সঙ্গে সঙ্গে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“এত তাড়াতাড়ি?”
তার চোখে এবার স্পষ্ট সতর্কতা। সে সঙ্গে সঙ্গে রওশনকে নিজের কেবিনে ডাকল। কিছুক্ষণ পর রওশন ভেতরে ঢুকতেই লিওন কোনো ভূমিকা না করে বলল,
“সেদিন হিয়ার চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা মেডিকেল টিমের সবাইকে আবার যাচাই করেছ?”
রওশন অবাক হয়ে তাকাল।
“জি, স্যার। কেন?”
লিওন তার দিকে একটি ফাইল এগিয়ে দিল।
“এই ডাক্তারটা কোথায়?”
রওশন ফাইলটা খুলে নামটা পড়ল। তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,
“স্যার… উনি তো লন্ডনে নেই।”
“কোথায়?”
“সঠিক লোকেশন পাওয়া যায়নি। তবে সেদিনের ঘটনার পরপরই উনি লন্ডন ছেড়ে চলে গেছেন।”
লিওন ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর বলল,
“এখন বুঝতে পারছি।”
রওশন কিছু বুঝতে না পেরে তাকিয়ে রইল।
লিওন ধীরে ধীরে জানাল, “হিয়া ইন্টারভিউ রুমে আমার সামনে তার সব অপরাধের কথা বলেছিল। আমি সবকিছু নোট করেছিলাম। পরে যখন ও অচেতন হয়ে যায়, তখন কাগজটা ওর হাতে থাকার কথা নয়।”
সে টেবিলের ওপর আঙুল রাখল।
“কিন্তু দানিয়েল যখন ওকে ছাড়াতে আসবে, তখন কাগজটা হিয়ার হাতে ছিল।”
রওশনের চোখ বড় হয়ে গেল। “মানে…”
“মানে, ওটা হিয়ার কাছে কেউ পৌঁছে দিয়েছে।”
লিওনের কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ়। “আর সেটা ঘটেছে মেডিকেল রুমে।”
রওশন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। “কিন্তু স্যার, ওই রুমের এই সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ তো নেই।”
“সেটাই সমস্যা।” লিওন শান্তভাবে বলল,
“আর সেটাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।”
রওশন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
লিওন ব্যাখ্যা করল, “যদি কাগজটা কেউ চুরি করে নিয়ে যেত, তাহলে ফুটেজ মুছে ফেলার দরকার ছিল না। কিন্তু কেউ যদি জানত, ওই ফুটেজে এমন কিছু আছে যা তাকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে, তাহলে ফুটেজটাই সরিয়ে দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পথ।”
সে কিছুক্ষণ থামল “আর এখন সেই মেডিকেল টিমের একজন ডাক্তারও নিখোঁজ।”
রওশন ধীরে ধীরে বুঝতে পারল।
“দানিয়েল…”
লিওনের চোখ কঠিন হয়ে উঠল “হ্যাঁ।”
লিওন এবার নিজের কথাগুলো আরও পরিষ্কার করে বলল, “ওই ডাক্তার দানিয়েলের হয়ে কাজ করছিল।”
রওশন অবিশ্বাসের সঙ্গে তাকিয়ে রইল। “তাহলে ডাক্তারই ভাইপারের কাছে কাগজটা পৌঁছে দিয়েছিল?”
“ঠিক সেটাই হয়েছে।”
লিওন এবার ঘটনাগুলো একটার পর একটা সাজিয়ে বলতে লাগল। “হিয়া অচেতন হয়ে গেলো। তাকে মেডিকেল রুমে নেওয়া হলো। আর আমি নিজেই তাকে মেডিকেল রুমে নিয়েছি আর তখনই আমি ওই নোটবুকটা ইন্টারভিউ রুমের টেবিলেই ফেলে রেখেছিলাম। ওই সময় মেডিকেল টিমের একজন ডাক্তার দানিয়েলের নির্দেশে কাগজটা ছিঁড়ে নিজের কাছে নেয় আর তারপর হিয়ার হাত পৌঁছে দিল।”
সে কিছুক্ষণ থেমে বললো “আর পরে হিয়া সেই কাগজটা ছিঁড়ে গিলে ফেলল।”
রওশন ধীরে বলল, “আর পুরো ব্যাপারটা লুকানোর জন্য সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
লিওন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
তারপর সে ল্যাপটপের দিকে তাকাল। “কিন্তু দানিয়েল একটা ভুল করেছে।”
রওশন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী ভুল?”
লিওনের চোখে ধীরে ধীরে সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফিরে এলো।
“সে ভেবেছে, ফুটেজ মুছে ফেললেই ঘটনাটাও মুছে যাবে।”
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে লিওন বলল, “কিন্তু সে ভুলে গেছে সিআইডি শুধু ক্যামেরার ওপর নির্ভর করে তদন্ত করে না।”
রওশনের মুখে এবার কোনো হাসি নেই। কারণ এতদিন তারা ভেবেছিল দানিয়েল শুধু হিয়াকে বাঁচানোর জন্য বাইরে থেকে ব্যবস্থা করেছিল।
আজ তারা বুঝল—দানিয়েলের হাত তাদের নিজেদের ব্যবস্থার ভেতরেও পৌঁছে গেছে।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, যে ডাক্তার তাদের সঙ্গে কাজ করছিল, সে কাজ শেষ করে শুধু পালিয়েই যায়নি সিসিটিভির গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজও সঙ্গে নিয়ে উধাও হয়েছে।
লিওন ধীরে ধীরে ফাইলটা বন্ধ করে বললো “এখন থেকে কোনো তথ্য সিআইডির ভেতরেও নিরাপদ ধরে নেওয়া যাবে না।”
রওশন গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়ল। লিওন জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে এবার শুধু হিয়াকে ঘিরে সন্দেহ নেই। আছে দানিয়েলকে ঘিরে নতুন এক উপলব্ধি। ফ্যান্টম কিং এতদিন তাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য ছিল। কিন্তু আজ প্রথমবার তার ছায়াটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে শুধু হিয়াকে বাঁচাতে সিআইডির বাইরে থেকে খেলেনি। সে তাদের নিজেদের ঘরেই একজন খেলোয়াড় বসিয়ে রেখেছিল।আর সেই খেলোয়াড় কাজ শেষ করে লন্ডন ছেড়ে চলে গেছে।
লিওন খুব নিচু স্বরে বলল, “দানিয়েল… এবার তোমাকে শুধু খুঁজব না।”
তার চোখে কঠিন দৃঢ়তা ফুটে উঠল “তুমি কীভাবে খেলছ, সেটাও খুঁজে বের করব।”
সকাল থেকেই সিআইডি হেডকোয়ার্টারের ব্যস্ততা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি।
পুরোনো কেসের ফাইল নিয়ে একদিকে তদন্ত চলছিল, অন্যদিকে গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো নিয়ে আলাদা টিম কাজ করছিল। হিয়াকে গ্রেফতার, রিমান্ডে নেওয়া, জিজ্ঞাসাবাদ এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দেওয়ার পরও লিওনের মাথা থেকে একটা বিষয় কিছুতেই সরছিল না।
দানিয়েল।
হিয়া নয়।
এই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল সেই মানুষটাকে নিয়ে, যে সিআইডির বাইরে থেকেও তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সম্পর্কে অস্বাভাবিকভাবে অবগত।
ঠিক সেই সময়েই হেডকোয়ার্টারের ইলেকট্রনিক সিস্টেমে সামান্য একটি সমস্যা দেখা দিল। প্রথমে করিডোরের কয়েকটি আলো একবার ঝিলমিল করে উঠল তারপর লিওনের কেবিনের পাশের অংশে দুটো কম্পিউটার আচমকা বন্ধ হয়ে আবার চালু হয়ে গেল।
কয়েকজন অফিসার বিষয়টাকে সাধারণ বিদ্যুৎ বিভ্রাট ভেবেই নিজেদের কাজে ফিরে গেল। কিন্তু মিনিট কয়েক পর একই সমস্যা আবার দেখা দিল হেডকোয়ার্টারের অন্য একটি অংশে। এবার বিষয়টা মেইনটেন্যান্স টিমের নজরে এলো।
ইলেকট্রনিক সিস্টেমের দায়িত্বে থাকা নিয়মিত কর্মীকে খবর দেওয়া হলো। কিন্তু সে তখন অন্য একটি জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকায় সঙ্গে সঙ্গে আসতে পারল না।
ফলে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হলো। প্রায় বিশ মিনিট পর হেডকোয়ার্টারের নিরাপত্তা গেটের সামনে এসে থামল একটি ছোট সার্ভিস ভ্যান।
ভ্যান থেকে একজন লোক নামল। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। গায়ে ধূসর রঙের কাজের পোশাক, হাতে ভারী সরঞ্জামের ব্যাগ। বুকের সামনে ঝোলানো পরিচয়পত্রে তার ছবি, নাম এবং অনুমোদিত টেকনিক্যাল সার্ভিসের তথ্য স্পষ্টভাবে লেখা।
গেটের নিরাপত্তারক্ষী পরিচয়পত্রটি স্ক্যান করল।
লোকটি শান্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল। কোনো অস্থিরতা নেই। কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। সিস্টেমে তার অনুমোদন ঠিকঠাকই দেখাল।
“ইলেকট্রনিক সেকশনে সমস্যা হয়েছে?”
নিরাপত্তারক্ষী জিজ্ঞেস করল।
লোকটি মাথা নাড়ল “জি। মেইনটেন্যান্স থেকে আমাকে পাঠানো হয়েছে।”
“কোন এরিয়া?”
“সেন্ট্রাল পাওয়ার এবং নেটওয়ার্কিং সেকশন।”
নিরাপত্তারক্ষী আবার পরিচয়পত্রের দিকে তাকিয়ে গেট খুলে দিল। লোকটি ভেতরে ঢুকে পড়ল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল স্বাভাবিক। এমনকি করিডোরে কয়েকজন অফিসার তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ও সে হালকা মাথা নেড়ে অভিবাদন জানাল।
পরিচয়পত্রে কোনো সমস্যা ছিল না। অনুমতিও সিস্টেমে বৈধ দেখাচ্ছিল। তাই তাকে আর কেউ আটকানোর প্রয়োজন মনে করল না।
অথচ কেউ জানত না, বৈধ পরিচয়ের আড়ালে লোকটার আসল উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অন্য।
নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে লোকটি সরঞ্জামের ব্যাগ খুলল।
প্রথমে সত্যিই সে সিস্টেম পরীক্ষা করতে শুরু করল।
একটি প্যানেল খুলল। কিছু তার পরীক্ষা করল।
তারপর একটি ছোট ডিভাইস বের করে সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করল।
দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, সে নিছক একজন ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে নিজের কাজ করছে। কিছুক্ষণ পর একজন অফিসার সেখানে এসে দাঁড়াল।
“সমস্যাটা কোথায়?”
লোকটি নিচু হয়ে কাজ করতে করতে বলল,
“পাওয়ার লাইন আর সিকিউরিটি নেটওয়ার্কের মধ্যে সামান্য অসামঞ্জস্য হচ্ছে।”
“ঠিক হতে কতক্ষণ লাগবে?”
“আর দশ মিনিট।”
অফিসার মাথা নেড়ে চলে গেল। লোকটি তার চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল।তারপর ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। করিডোর ফাঁকা। ক্যামেরা আছে।
কিন্তু সেই ক্যামেরাগুলোর দিক সে আগেই জেনে এসেছে। তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
তারপর ব্যাগের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটি ছোট কালো যন্ত্র। মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
যন্ত্রটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্থাপন করে সে আবার আগের কাজের ভঙ্গিতে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর সবকিছু আগের মতো করে দিয়ে প্যানেল বন্ধ করল।
“হয়ে গেছে।”
নিজেকেই খুব নিচু স্বরে বলল সে।
ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে সে হেডকোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে গেল। গেটে আবার তার পরিচয়পত্র পরীক্ষা হলো।
সিস্টেমে সবুজ সংকেত জ্বলল। লোকটি বাইরে বেরিয়ে ভ্যানে উঠে বসল। গাড়ি চলে যাওয়ার আগে তার ফোনে একটি বার্তা এলো।
“কাজ শেষ?”
সে মাত্র একটি শব্দ লিখল।
“হ্যাঁ।”
তারপর ফোনটি বন্ধ করে দিল।
সে জানত না—লন্ডনের অন্য প্রান্তে বসে একজন মানুষ তখন নিশ্চিন্তে নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছে।
ফ্যান্টম কিং।
দানিয়েল।
প্রায় ত্রিশ মিনিট কেটে গেল।
হেডকোয়ার্টারের ভেতরে তখনও সবকিছু স্বাভাবিক।
লিওন নিজের কেবিনে বসে একটি পুরোনো কেসের ফাইল পড়ছিল। হঠাৎ তার কম্পিউটার স্ক্রিন একবার ঝিলমিল করে উঠল। লিওন ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। একটি সতর্কবার্তা ভেসে উঠেছে।
UNAUTHORIZED SIGNAL DETECTED
লিওনের চোখ সরু হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম টিমকে কল করল।
“আমার সিস্টেমে অস্বাভাবিক সিগন্যাল এসেছে। তোমরা কি কিছু পাচ্ছ?”
ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর উত্তর এলো, “জি, স্যার। আমরাও পাচ্ছি।”
“লোকেশন?”
“নির্দিষ্ট না, স্যার। সিগন্যালটা এক জায়গায় স্থির থাকছে না।”
লিওন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল “সব সিস্টেম একসঙ্গে স্ক্যান করো।”
“জি, স্যার।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই কেবিনের দরজা খুলে একজন অফিসার দ্রুত ভেতরে ঢুকল।
“স্যার!”
লিওন তার দিকে তাকাল “কী হয়েছে?”
“সিকিউরিটি সিস্টেমে আবার সতর্কবার্তা এসেছে।”
“লোকেশন?”
“সেন্ট্রাল সেকশনের দিকে।”
লিওনের মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল “সব সেকশন স্ক্যান করো।”
কয়েকজন অফিসার সঙ্গে সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে বসে গেল। একটার পর একটা স্ক্রিনে হেডকোয়ার্টারের ডিজিটাল ম্যাপ ভেসে উঠল।
একবার সবুজ।
তারপর হলুদ। আর তারপর—একটি নির্দিষ্ট অংশ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল।
কক্ষের ভেতর নেমে এলো নিস্তব্ধতা। একজন অফিসার ধীরে ধীরে বলল, “স্যার…”
লিওন তার দিকে তাকাল “বল।”
“আমরা একটা বিস্ফোরক ডিভাইসের সিগন্যাল শনাক্ত করেছি।”
লিওনের চোখ সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে স্থির হয়ে গেল।
“কোথায়?”
“সেন্ট্রাল সেকশনের কাছাকাছি।”
“সঠিক লোকেশন?”
“সিগন্যালটা খুব শক্তভাবে এনক্রিপ্ট করা। তবে আমরা লোকেশন লক করার চেষ্টা করছি।”
লিওন কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ আরেকটি সতর্কবার্তা স্ক্রিনে ভেসে উঠল।
লাল সংকেতের পাশে এবার একটি ডিজিটাল কাউন্টডাউন দেখা গেল। একজন অফিসার চমকে উঠে সামনে ঝুঁকে পড়ল।
“স্যার…”
লিওন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
“কী?”
“আমরা ডিভাইসটার কাউন্টডাউনও ধরে ফেলেছি।”
“কত সময়?”
অফিসারটি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর তার মুখের রঙ ধীরে ধীরে বদলে গেল।
“স্যার…”
লিওনের কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“কত সময়?”
অফিসারটি শুকনো গলায় বলল, “প্রায় ত্রিশ মিনিট।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো কন্ট্রোল রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
লিওনের চোখ তখনও স্ক্রিনে। ডিজিটাল কাউন্টডাউন ধীরে ধীরে কমছে।
29:59…
29:58…
লিওন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। তাড়াতাড়ি আদেশ করলো “পুরো হেডকোয়ার্টার খালি করো তবে কেউ লিফট ব্যাবহার করবেনা।”
পরের মুহূর্তেই জরুরি সাইরেন বেজে উঠল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই হেডকোয়ার্টারের ভেতরে তীব্র বিশৃঙ্খলা শুরু হয়ে গেল। অফিসাররা নিজেদের ডেস্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। কেউ সহকর্মীদের খুঁজছে।
কেউ গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সিস্টেম সুরক্ষিত করছে। কেউ নিশ্চিত করছে পুরো ভবন খালি হয়েছে কি না।
এর মধ্যেই হেডকোয়ার্টারের সামনে এসে থামল বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের গাড়ি। বিশেষ নিরাপত্তা পোশাক পরা কয়েকজন সদস্য দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল।
লিওন তাদের সঙ্গে রইল।
“লোকেশন?”
টিম লিডার জানতে চাইল। একজন অফিসার তাকে ডিজিটাল ম্যাপ দেখাল।
“সেন্ট্রাল সেকশনের নিচের দিকে।”
টিম লিডার মাথা নাড়ল। “সবাই বাইরে চলে যান।”
লিওন স্থির গলায় বলল, “আমি থাকছি।”
“স্যার, আপনাকেও বের হতে হবে।”
লিওন তার দিকে তাকিয়ে আদেশের স্বরে বললো “কাজ শুরু করুন।”
টিম আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর তারা ডিভাইসের কাছে পৌঁছাল। একজন সদস্য ডিভাইসটি পরীক্ষা করে সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের সতর্ক করল।
“কেউ কাছে আসবেন না।”
আরেকজন জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছেন?”
“ডিভাইসটা অত্যন্ত জটিল।”
“নিষ্ক্রিয় করা যাবে?”
কয়েক সেকেন্ড কেউ উত্তর দিল না। তারপর টিম লিডার ধীরে মাথা নাড়ল।
“চেষ্টা করতে হবে।”
তারা কাজ শুরু করল। সময় এগিয়ে যেতে লাগল।
পনেরো মিনিট।
চৌদ্দ।
তেরো।
বারো।
কিন্তু যতই তারা পরীক্ষা করতে লাগল, ততই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠল। একসময় টিম লিডার হেডসেট খুলে লিওনের দিকে তাকাল। তার মুখ এবার আর পেশাদার আত্মবিশ্বাসে ভরা নেই। বরং সেখানে স্পষ্ট উদ্বেগ।
“স্যার…”
“কী?”
“আমাদের বের হতে হবে।”
লিওনের চোখ শক্ত হয়ে গেল। “কেন?”
“ডিভাইসের সিস্টেম আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।”
“তাহলে নিষ্ক্রিয় করুন।”
“আমরা চেষ্টা করেছি।”
“আরও চেষ্টা করুন।”
“সময় নেই।”
লিওন চুপ করে রইল। টিম লিডার এবার আরও নিচু গলায় বলল, “আমরা এটা এখানে নিষ্ক্রিয় করতে পারছি না।”
লিওনের চোখ ধীরে ধীরে ডিভাইসটির দিকে গেল।
“মানে?”
“মানে এই মুহূর্তে নিরাপদভাবে এটাকে নিষ্ক্রিয় করার কোনো নিশ্চিত উপায় আমাদের হাতে নেই।”
আরেকজন সদস্য বলল, “স্যার, সবাইকে বের হতে হবে। এখনই।”
লিওন কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলল না।
তারপর চারপাশে তাকাল।
“সবাই বেরিয়ে যান।”
টিমের সদস্যরা একে একে পেছনে সরে গেল।
লিওনও তাদের সঙ্গে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
কয়েক পা।
তারপর—দরজার ঠিক সামনে এসে থেমে গেল সে।
পেছনে ফিরে তাকাল একবার। তার চোখ আবার ডিভাইসটির ওপর গিয়ে স্থির হলো। তারপর খুব ধীরে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
লিওনের মুখে না কোনো ভয় আর না কোনো দুশ্চিন্তা দেখা গেলো বরং অদ্ভুত একটা জেদ ফুটে উঠলো।
দানিয়েলের মুখটা তার মনে ভেসে উঠল।
হিয়াকে ঘিরে তার পরিকল্পনা। সিআইডির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ দেখানোর চেষ্টা। আর আজ—এই বোমা।
লিওনের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। সে বুঝে গেল।
দানিয়েল শুধু হেডকোয়ার্টারে বোমা রাখেনি। সে লিওনকে একটা বার্তা দিয়েছে।
“তুমি আমাকে হারাতে পারবে না।”
লিওনের চোখে হঠাৎ কঠিন আগুন জ্বলে উঠল।
সে ধীরে দরজার দিকে তাকাল। তারপর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের টিমকে বলল,
“আপনারা সবাই নিরাপদে দূরে সরে যান।”
“স্যার?”
“আমি বলেছি, সবাই বেরিয়ে যান।”
“কিন্তু আপনি—”
“আমি আসছি।”
একজন অফিসার সন্দেহভরা চোখে তাকাল।
“স্যার, আপনি তো বের হচ্ছিলেন…”
লিওন সামান্য হাসল। সেই হাসিতে কোনো ভয় ছিল না।
ছিল শুধু চ্যালেঞ্জ।
“আমি মত বদলেছি।”
“কেন?”
লিওন পেছনে তাকাল না। শুধু বলল,
“কারণ আমি দানিয়েলের কাছে হারতে রাজি নই।”
“স্যার!”
“বেরিয়ে যাও।”
সবাই বাধ্য হয়ে পেছনে সরে গেল। লিওন ধীরে দরজার ভেতরে ঢুকল। তারপর— মুহুর্তেই ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই হতবাক।
“স্যার!”
দরজায় ধাক্কা পড়ল।
“অফিসার লিওন! দরজা খুলুন!”
কোনো উত্তর এলোনা ভেতর থেকে
“স্যার, এটা কোনো সমাধান নয়!”
ভেতর থেকে এবার লিওনের কণ্ঠ শোনা গেল।
শান্ত। অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
“আমি সমাধান করতে যাচ্ছি।”
বাইরে সবাই একে অপরের দিকে তাকাল।
আর ভেতরে—লিওন ধীরে ধীরে ডিভাইসটির সামনে ফিরে গেল।তার চোখে তখন আর কোনো দ্বিধা নেই।
সে হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল।
সময়—অল্প। ভীষণ অল্প। লিওন গভীর শ্বাস নিল।
তারপর খুব নিচু স্বরে বলল, “ফ্যান্টম কিং…”
তার ঠোঁটের কোণে কঠিন হাসি ফুটে উঠল।
“খেলা শুরু করেছ তুমি।” সে ডিভাইসটির দিকে ঝুঁকে পড়ে বললো “কিন্তু শেষটা আমার ইচ্ছেমতোই হবে।”
বাইরে তখন সাইরেনের শব্দ। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠেছে। লোকজনের চিৎকার। উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড়।
আর ভেতরে—একজন সিআইডি অফিসার একা দাঁড়িয়ে আছে মৃ/ত্যুর কাউন্টডাউনের সামনে।
কারণ সে পালাতে চায় না। সে সিআইডি হেডকোয়ার্টার বাঁচাতে চায়।এবং তার থেকেও বেশি—সে দানিয়েলকে হারাতে চায়।
আর মাত্র দশ মিনিট।
হেডকোয়ার্টারের চারপাশে তখন আর কোনো সাধারণ মানুষ নেই।
নিরাপত্তা বাহিনী পুরো এলাকাকে ঘিরে ফেলেছে। একের পর এক ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। সবাইকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসারদের চোখ বারবার চলে যাচ্ছে বিশাল ভবনটির দিকে।
কারণ তারা সবাই জানে— ভবনের ভেতরে এখনও একজন মানুষ আছে।
লিওন।
আর সেই মানুষটা নিজের ইচ্ছায় বের হবে না। রওশন দাঁড়িয়ে ছিল নিরাপত্তা বলয়ের ঠিক সামনে।
তার চোখ ভবনের দিকে স্থির। “আমি শেষবারের মতো চেষ্টা করছি।”
সে দ্রুত কয়েকজন অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেল। কিন্তু নিরাপত্তা বলয়ের কাছেই তাকে থামিয়ে দেওয়া হলো।
“স্যার, আর সামনে যাওয়া যাবে না।”
রওশন দাঁত চেপে বলল, “ভেতরে আমার অফিসার আছে।”
“আমরা জানি, স্যার। কিন্তু এখন কাউকেই ভেতরে যেতে দেওয়া যাবে না।”
রওশন আর কিছু শুনল না। সে নিরাপত্তা বলয় পেরিয়ে ভবনের প্রবেশপথের কাছে চলে গেল।
“লিওন স্যার!”
কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া গেলো না। রওশন দরজায় জোরে ধাক্কা দিল।
“স্যার দরজা খুলুন!”
ভেতর থেকে কোনো সারা শব্দ এলো না।
রওশন আবার দরজায় ধাক্কা দিল।
“আপনি শুনতে পাচ্ছেন? বের হয়ে আসুন প্লিজ!”
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে লিওনের কণ্ঠ ভেসে এলো।
“রওশন, সবাইকে নিয়ে দূরে চলে যাও।”
রওশন চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল।
সে এই কণ্ঠ চেনে। এই শান্ত কণ্ঠের অর্থও সে জানে।
লিওন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
“দরজা খুলুন স্যার।”
“নো।”
রওশন এবার রাগে দরজায় মুষ্টাঘাত করল। রওশনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“বের হয়ে আসুন স্যার। বাকিটা আমরা দেখব।”
ভেতরে আবারও কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর লিওন বলল, “আমি এটা নিষ্ক্রিয় না করে বের হব না।”
রওশন বুঝে গেল, কথায় তাকে বের করা সম্ভব নয়।
ঠিক তখনই পেছন থেকে এসিপির কণ্ঠ শোনা গেল।
“রওশন!”
রওশন ঘুরে তাকাল। এসিপি দ্রুত এগিয়ে আসছে।
“এখান থেকে সরে আসো।”
“আমি লিওন স্যারকে বের করব।”
“পারবে না।” এসিপি কঠিন গলায় জবাব দিলো।
“আমি চেষ্টা করছি।” রওশন বললো
এসিপি এবার তার হাত শক্ত করে ধরে বললো ।
“সময় নেই।”
রওশন হাত ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করল। “ছাড়ুন স্যার!”
এসিপি এবার প্রায় জোর করেই রওশনকে পেছনে টেনে নিয়ে এলো। রওশন শেষবারের মতো ভবনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “লিওন স্যার!”
ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না।শুধু কয়েক সেকেন্ড পর দরজার ওপাশ থেকে খুব নিচু স্বরে একটি কথা শোনা গেল—“আমার ওপর বিশ্বাস রাখ তোমরা।”
রওশনের শরীর কেঁপে উঠল। কিন্তু এবার তাকে আর দাঁড়িয়ে থাকতে দেওয়া হলো না। এসিপি তাকে টেনে নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে গেল।
“লিওনকে আমরা চিনি,” এসিপি কঠিন গলায় বলল। “ও ভীষণ জেদি। কিন্তু এখন আমাদের কাজ হলো সবাইকে নিরাপদে রাখা।”
রওশন অসহায় চোখে ভবনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মুখে তখন একটাই কথা—“সব যেনো ঠিক হয়ে যায়…”
অন্যদিকে—
ঘটনাটি ততক্ষণে পুরো লন্ডনে ছড়িয়ে পড়েছে।
নিউজ চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ চলছে।
একটি সংবাদ চ্যানেলের পর্দায় বড় অক্ষরে লেখা—
BREAKING NEWS
CID HEADQUARTERS UNDER BOMB THREAT
সাংবাদিক ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দ্রুত বলছে,
“আমরা এই মুহূর্তে সিআইডি হেডকোয়ার্টারের সামনে রয়েছি। প্রায় ২০ মিনিট আগে ভবনের ভেতরে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বিস্ফোরক ডিভাইস শনাক্ত হওয়ার পর পুরো এলাকা খালি করে দেওয়া হয়েছে।”
ক্যামেরা ভবনের দিকে ঘুরে গেল।
“নিরাপত্তার কারণে সাধারণ মানুষ ও সিআইডির সদস্যদের ঘটনাস্থল থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
সাংবাদিক কিছুক্ষণ থামল।তারপর বলল,
“তবে আমাদের কাছে আসা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সিআইডির শীর্ষ কর্মকর্তা লিওনার্দো এখনও ভবনের ভেতরে আছেন।”
পর্দায় তখন লিওনের একটি ছবি ভেসে উঠল।
সেই ছবি দেখেই—লন্ডনের অন্য প্রান্তে একটি বিশাল বাড়ির ড্রয়িংরুমে হঠাৎ সবাই থমকে গেল।
টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকিয়ে ছিল পরিবারের সবাই। এক মুহূর্ত। দুই মুহূর্ত। তারপর—
“লিওন!” চিৎকার করে উঠলেন লিওনের মা।
তার হাত থেকে রিমোটটা পড়ে গেল। তিনি টেলিভিশনের সামনে এগিয়ে আসতে গিয়েও হঠাৎ টলতে শুরু করলেন।
“না… না… আমার ছেলে…”
অ্যামেলিয়া দ্রুত ছুটে এসে তাকে ধরে ফেলল।
“মম! মম, বসো!”
“লিওন ভেতরে…” তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“ওকে বের করো… কেউ ওকে বের করো…”
অ্যামেলিয়া তাকে সোফায় বসিয়ে দিল।
“মম, প্লিজ শান্ত হও।”
“লিওনের কিছু হবে না।”
কিন্তু নিজের কথাই যেন নিজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য লাগছিল না অ্যামেলিয়ার।লিওনের মা কাঁপতে কাঁপতে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
পর্দায় তখন সাংবাদিক বলছে—“আমরা এখনও নিশ্চিত নই, অফিসার লিওনার্দো ভবন থেকে নিরাপদে বের হতে পারবেন কি না। পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ।”
“না…” লিওনের মা চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
“আমার ছেলেটা…” তার শরীর আবার নিস্তেজ হয়ে আসতে লাগল। অ্যামেলিয়া তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“মা, আমার দিকে তাকাও।”
কিন্তু ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা লিওনের বাবা তখন একদম নিশ্চুপ। তার চোখ টেলিভিশনের পর্দায়।
মুখের প্রতিটি রেখায় চাপা আতঙ্ক। হঠাৎ তিনি পকেট থেকে ফোন বের করলেন। একটি নম্বরে কল করলেন।
ফোন রিসিভ হওয়া মাত্র তিনি কঠিন গলায় বললেন,
“এখনই আমাকে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি বলুন।”
ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো। তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আমার ছেলেকে বের করুন।”
কিছুক্ষণ শুনে আবার বললেন, “আমি জানি প্রটোকল কী।”
তার কণ্ঠ এবার আরও কঠিন হয়ে উঠল। “কিন্তু আমার ছেলের যদি কিছু হয়, তার দায় কেউ এড়াতে পারবে না।”
ওপাশে থাকা এসিপি কিছু বলতেই তিনি থামিয়ে দিলেন।
“আমি আসছি।” বলেই আর্থার হায়াস ফোন কেটে দিলেন।
বাড়ির সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। অ্যামেলিয়া বলল, “ড্যাড আপনি ওখানে যাবেন?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু সেখানে—”
“আমার ছেলে সেখানে।” এর বেশি কোনো কথা বললেন না তিনি।
সোজা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক তখনই পেছন থেকে কান্নাভেজা কণ্ঠ ভেসে এলো—
“মামা…”
তিনি থেমে গেলেন।
মায়া।
হুইলচেয়ারে বসে থাকা মায়ার চোখ দিয়ে তখন অঝোরে পানি পড়ছে।
“আমিও যাব।”
লিওনের বাবা তার দিকে তাকালেন। মায়া হুইলচেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরে রেখেছে।
“আমি লিও ভাইয়াকে দেখতে চাই।”
তার কণ্ঠ ভেঙে এলো কান্নায়। “আমিও যাব…”
লিওনের বাবা কয়েক সেকেন্ড মায়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব নরম গলায় বললেন,
“মায়া, এখন সেখানে যাওয়া সম্ভব না।”
“কেন?”
“এলাকাটা সম্পূর্ণ নিরাপত্তার মধ্যে আছে।”
মায়া মাথা নাড়ল। “আমি দূরে থাকব।”
“না, মায়া।”
“আমি কিছু করব না…” তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“শুধু তাকে একবার দেখব।”
লিওনের বাবা কাছে এসে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“তুই এখানে থাক মায়া।”
“আমি লিওনকে নিয়ে ফিরে আসব।”
মায়া তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
“মামা…”
“যেভাবেই হোক লিও ভাইয়াকে নিয়ে আসবেন।”
“অবশ্যই।”
তিনি মায়ার হাতটা আলতো করে চেপে ধরলেন।
তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বেরিয়ে গেলেন। গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ শোনা গেল।
গাড়ি দ্রুত বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।আর মায়া হুইলচেয়ারে বসে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দুই হাত জোড় করে চোখ বন্ধ করল।
“আল্লাহ…”
কাঁপতে থাকা ঠোঁট থেকে শব্দ বের হলো। “আমার লিও ভাইয়াকে রক্ষা করুন।”
তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। “তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন…”
অন্যদিকে—এই পুরো ঘটনার কিছুই জানে না হিয়া।
সে তখন অন্য একটি জায়গায় নিজের টিমের সঙ্গে ব্যস্ত। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু নথি, কয়েকটি ছবি এবং একটি ল্যাপটপ। হিয়ার মনোযোগ সম্পূর্ণ অন্য একটি মিশনের দিকে।
“এই রুটটা ঠিক না।”
হিয়া ছবির দিকে তাকিয়ে বলল।
তার পাশে থাকা একজন বলল, “তাহলে?”
“এখান দিয়ে গেলে নজরে পড়ব।”
সে আঙুল দিয়ে অন্য একটি জায়গা দেখাল।
“এই পথটা ব্যবহার করব।”
হিয়া জানে না—লন্ডনের অন্য প্রান্তে ঠিক এই মুহূর্তে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির জীবন-মৃত্যুর লড়াই চলছে।
আর তার সবকিছুর পেছনে রয়েছে একজন মানুষ।
দানিয়েল।
সে ইচ্ছা করেই হিয়াকে অন্য একটি মিশনে ব্যস্ত রেখেছে। তার পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত। হিয়াকে যদি আজকের ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে হয়, তাহলে অনেক কিছুই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তাই সে হিয়াকে দিয়েছে অন্য একটি কাজ।
আর নিজে—নিজের ঘরে বসে শান্তভাবে মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে সিআইডি হেডকোয়ার্টারের লাইভ নিউজ ফুটেজ। ক্যামেরায় দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বিশাল ভবনটি। দানিয়েল চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল। তার হাতে এক কাপ কফি।
চোখে রয়েছে প্রশান্তি। স্ক্রিনে যখন লিওনের ছবি ভেসে উঠল—দানিয়েলের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।
“মাত্র ৫ মিনিট…”
সে ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,
“দেখি, অফিসার লিওনার্দো…”
তার চোখে তখন নিখাদ চ্যালেঞ্জ। “তুমি সত্যিই কতটা জেদি।”
অবশেষে সময় গড়িয়ে আর মাত্র ষাট সেকেন্ড। লিওনের সামনে রাখা ঘড়ির কাউন্টডাউন তখন নির্মম গতিতে নেমে যাচ্ছে।
01:00
তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। দুই হাতের আঙুল শক্ত হয়ে আছে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এত জোরে ধুকপুক করছে, সেই শব্দটাও এই নিস্তব্ধ ঘরের মধ্যে শোনা যাচ্ছে। সে একবার চোখ তুলে সময়ের দিকে তাকাল।
00:52
আবার ডিভাইসটির দিকে ঝুঁকে পড়ল। একটার পর একটা সম্ভাবনা পরীক্ষা করছে।
একবার ভুল হলেই—সব শেষ।
00:40
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে এসে কপাল থেকে গালে পড়ল। সে হাতের পেছন দিয়ে ঘাম মুছে আবার কাজে মন দিল।
“আর একটু …”
নিজেকেই ফিসফিস করে বলল লিওন।
00:30
বাইরে তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। এক কিলোমিটার দূরে নিরাপত্তা বলয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই নিঃশব্দ। কারও মুখে কথা নেই। সবাই শুধু হেডকোয়ার্টারের দিকে তাকিয়ে আছে। রওশনের চোখ বারবার ঘড়ির দিকে যাচ্ছে। এসিপি দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছেন। বোম্ব ডিসপোজাল টিমের সদস্যরা উদ্বিগ্ন মুখে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে।
আর কিছু দূরে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরাগুলো এখনও লাইভ। সাংবাদিকের কণ্ঠও এবার নিচু হয়ে এসেছে।
“আমরা এখন অত্যন্ত সংকটপূর্ণ মুহূর্তের মধ্যে রয়েছি। বিস্ফোরণের সম্ভাব্য সময় খুব কাছাকাছি চলে এসেছে…”
ক্যামেরার সামনে কেউ জানে না— ভেতরে লিওন এখনও লড়াই করছে।
সময় বাকি 00:20
লিওনের বুক আরও দ্রুত উঠানামা করতে লাগল।
এক মুহূর্তের জন্য তার হাত থেমে গেল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারল—আর মাত্র বিশ সেকেন্ড।
তার চোখে এক ঝলক জেদ ফিরে এলো।
“না।”
সে মাথা নাড়ল। “আমি হারব না।”
00:15
তার আঙুল আবার নড়ল।
00:10
বাইরে সবাই নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করছে।
রওশন চোখ বন্ধ করে ফেলল। “প্লিজ গড…”
00:08
লিওনের বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল।
00:07 তারপর 00:06
তার চোখ তখনও স্থির হয়ে আছে ।
00:05
আর মাত্র পাঁচ সেকেন্ড। লিওন শেষবারের মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল।
00:04
তার হাত এগিয়ে গেল। 00:03
এক মুহূর্ত।
00:02
তারপর—ক্লিক করে একটা শব্দ হলো কাউন্টডাউন থেমে গেল। স্ক্রিনের লাল সংকেত মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেল।
DEVICE DISARMED
লিওন কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইল।
সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। তারপর ধীরে ধীরে ডিভাইসটির দিকে তাকাল।
ডিভাইসটা একদম নিঃশব্দ হয়ে গেলো। কোনো বিস্ফোরণ নেই। কোনো শব্দ নেই। কিছুই নেই।
লিওন হঠাৎ পেছনে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল।
তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। সে হাঁপাচ্ছে। কপাল থেকে ঘাম ঝরছে। দুই হাতের তালু এখনও কাঁপছে।
কয়েক সেকেন্ড পর সে চোখ বন্ধ করল।তারপর খুব ধীরে নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। হৃদস্পন্দন এখনও প্রচণ্ড।কিন্তু—সে পেরেছে।
লিওনের চোখে তখন অবিশ্বাস। সে নিচু স্বরে বলল,
“আমি… পেরেছি।”
তারপর ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
“দানিয়েল…”
সে নিষ্ক্রিয় ডিভাইসটির দিকে তাকাল। “তুমি আমাকে এত সহজে হারাতে পারবে না।”
—
অন্যদিকে—সময় শেষ। সবাই প্রস্তুত ছিল বিস্ফোরণের জন্য। নিরাপত্তা বাহিনী আরও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রওশনের চোখ হেডকোয়ার্টারের দিকে। এসিপি হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে। কেউ কথা বলছে না। কেউ নড়ছে না।কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল।কিন্তু—কিছুই হলো না।
কোনো বিস্ফোরণ নেই।কোনো আগুন নেই।কোনো বিকট শব্দ নেই।
শুধু—হঠাৎ হেডকোয়ার্টারের প্রধান দরজাটা খুলে গেল।
সবাই একসঙ্গে সেদিকে তাকাল। দরজার সামনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শার্ট ঘামে ভিজে গেছে। চুল এলোমেলো হয়ে আছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। বুক এখনও দ্রুত ওঠানামা করছে। কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে।
লিওন।
তার এক হাতে রয়েছে সেই নিষ্ক্রিয় করা ডিভাইসটি।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো এলাকা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। রওশনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“স্যার…?”
লিওন কোনো উত্তর দিল না।শুধু ক্লান্ত চোখে সবার দিকে তাকাল। তারপর ডিভাইসটা একটু উঁচু করে ধরল।
নিষ্ক্রিয়। সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।
একজন বোম্ব ডিসপোজাল অফিসার হতবাক হয়ে বলল, “স্যার… আপনি এটা…”
লিওন ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
রওশন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
সে দ্রুত লিওনের দিকে এগিয়ে গেল।
“আপনি পাগল!”
লিওন ক্লান্তভাবে তাকাল “জানি।”
রওশন তার কাঁধ চেপে ধরল। “আমরা ভেবেছিলাম—”
কথাটা শেষ করতে পারল না সে। লিওন শুধু হালকা হাসল। তারপর একবার পেছনে তাকাল সেই ভবনের দিকে। চোখে তখনও সেই একই জেদ।
“দানিয়েল ভেবেছিল আমি পালিয়ে যাব।”
ফিসফিস করে বললো লিওন “কিন্তু সে ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছে।”
দূরে তখনও ক্যামেরাগুলো চলছে।সাংবাদিকের কণ্ঠ কেঁপে উঠল—“আমরা এইমাত্র নিশ্চিত হলাম—সিআইডি কর্মকর্তা লিওনার্দো নিরাপদে ভবন থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এবং আমাদের চোখের সামনে তিনি একটি নিষ্ক্রিয় করা বিস্ফোরক ডিভাইস হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন!”
লিওন বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে বেরিয়ে আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই খবরটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
শুধু সিআইডি হেডকোয়ার্টার কিংবা আশপাশের এলাকায় নয়—পুরো লন্ডনজুড়ে।
নিউজ চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজে তখন একটাই খবর।
“CID OFFICER DISARMS DEADLY BOMB WITH SECONDS TO SPARE!”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে লাগল লিওনের ছবি। কেউ বলছে, এটা অসম্ভব। কেউ বলছে, লিওন নিজের জীবন বাজি রেখে পুরো হেডকোয়ার্টারকে বাঁচিয়েছে। আর কেউ কেউ তাকে ইতিমধ্যেই শহরের সবচেয়ে সাহসী অফিসার হিসেবে আখ্যা দিতে শুরু করেছে।
হেডকোয়ার্টারের সামনে সাংবাদিকদের ভিড় আরও বেড়ে গেল।ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক ঝলসে উঠছে।
কিন্তু— লন্ডনের অন্য প্রান্তে এক বিশাল, অন্ধকার ঘরে তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য।
ঘরের বড় স্ক্রিনে এখনও লাইভ নিউজ চলছে।
স্ক্রিনে লিওন।
তার হাতে নিষ্ক্রিয় করা সেই ডিভাইস।
দানিয়েল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক সেকেন্ড ধরে সে কোনো কথা বলল না। তার চোখ শুধু স্ক্রিনের ওপর স্থির।তারপর—তার হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল।
আবার স্ক্রিনে তাকাল।
লিওনকে।
সেই একই মানুষকে, যাকে সে ভেবেছিল কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ করে দেবে। দানিয়েলের মুখে প্রথমবারের মতো কোনো হাসি নেই। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিও নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।কেউ কথা বলার সাহস করছে না।
কারণ সবাই জানে—দানিয়েলের এই বোমা কখনো ব্যর্থ হয়নি।
সে যেখানেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে, শেষ ফলাফল সবসময় তার পক্ষেই গেছে। আজ পর্যন্ত কেউ তার তৈরি করা এই মৃ/ত্যুফাঁদকে শেষ মুহূর্তে থামাতে পারেনি।
কিন্তু আজ—একজন করেছে।
একজন সিআইডি অফিসার।
লিওনার্দো।
দানিয়েল ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়ল। তার চোখ এখনও টেলিভিশনের পর্দায়। লিওনের মুখে তখন ক্লান্তি, কিন্তু চোখে বিজয়ের জেদ।দানিয়েল খুব ধীরে মাথা নাড়ল।তারপর প্রথমবারের মতো স্বীকার করল—
এই মানুষটাকে সে ভুলভাবে হিসাব করেছিল।
তার ঠোঁট নড়ল। খুব নিচু স্বরে বলল,
“He is unbelievable.”
ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকাল। দানিয়েল আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
তার চোখে এবার রাগ নেই। আছে শুধু কৌতূহল।
আছে এক ধরনের মুগ্ধতা। এতদিন দানিয়েলের কাছে লিওন ছিল আর দশজন CID অফিসারের মতোই একজন প্রতিপক্ষ। কিন্তু আজকের ঘটনার পর সেই ধারণাটা আর থাকল না। লিওনকে সে এবার সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখছে।
দানিয়েল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
“এই বোমা…”
সে একটু থামল। “আমি আজ পর্যন্ত যতবার ব্যবহার করেছি, একবারও হারিনি।”
তার চোখ সরু হয়ে গেল।“কিন্তু আজ…”
স্ক্রিনে লিওনের ছবির দিকে তাকিয়ে সে বলল, “প্রথমবার কেউ আমাকে টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল।”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর দানিয়েল খুব শান্ত গলায় বলল, “অফিসার লিওন…”
তার চোখে এবার স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ। “তুমি যতটা সহজ ছিলে বলে ভেবেছিলাম…”
সে মৃদু হাসল “ততটা সহজ নও।”
স্ক্রিনে তখনও লিওনের ছবি।আর দানিয়েলের চোখে জন্ম নিল নতুন এক আগ্রহ। এবার হিয়াকে ঘিরে নয়।
এবার লিওনকে ঘিরে। কারণ আজ প্রথমবারের মতো ফ্যান্টম কিং এমন একজন প্রতিপক্ষ পেয়েছে—যে তার মৃ/ত্যুফাঁদে পা দিয়েও বেঁচে ফিরেছে।
লিওন হেডকোয়ার্টারের বাইরে আসার কিছুক্ষণ পরই একটি কালো গাড়ি দ্রুত এসে থামল। গাড়ির দরজা খুলেই নেমে এলেন লিওনের বাবা আর্থার হায়াস।
এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক নিয়ে তিনি ছুটে এলেন ছেলের দিকে।দূর থেকেই যখন দেখলেন লিওন অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে—তখন যেন বুকের ওপর থেকে বিশাল একটা পাথর নেমে গেল।
“লিওন…”
কণ্ঠটা কেঁপে উঠল তার। লিওন বাবার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
“আমি ঠিক আছি, ড্যাড।”
লিওনের বাবা আর কিছু বললেন না।সোজা ছেলের কাছে গিয়ে তার হাত শক্ত করে ধরে ফেললেন।
কিছুক্ষণ সেই হাতটা ধরে রইলেন তিনি। যেন নিজের হাতে ছেলেকে ছুঁয়ে নিশ্চিত হতে চাইছেন—
সত্যিই সে নিরাপদ।
“চল।”
শুধু এই একটি কথাই বললেন। লিওন কিছু বলল না।
বাবা তার হাত ধরে গাড়ির দিকে নিয়ে গেলেন। গাড়িতে ওঠার আগে লিওন একবার পেছনে তাকাল।
সিআইডি হেডকোয়ার্টার।
তারপর ধীরে গাড়িতে উঠে বসল।বাবাও পাশে এসে বসলেন। গাড়ি চলতে শুরু করতেই তিনি বললেন,
“তোর মা টেলিভিশনে সব দেখেছে।”
লিওনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“মা কেমন আছে?”
“খুব একটা ভালো নেই।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন,
“তোকে নিয়ে ওর অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল।”
লিওন চোখ বন্ধ করল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ অন্যরকম একটা অপরাধবোধ জমে উঠল।
বোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা নিয়ে তার কোনো ভয় ছিল না।কিন্তু মায়ের কান্নার কথা শুনে—সে প্রথমবার সত্যিই অস্বস্তি অনুভব করল।
“আমি তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে চাই।”
বাবা ছেলের দিকে তাকালেন। “আমিও সেটাই চাই।”
গাড়ি দ্রুত ছুটে চলল।
প্রায় কিছুক্ষণ পর গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামল।
গাড়ি পুরোপুরি থামার আগেই লিওন দরজা খুলে নেমে গেল। বাবা তাকে থামালেন না। লিওন দ্রুত বাড়ির ভেতরে ঢুকল। ড্রয়িংরুমে তখন সবাই অপেক্ষা করছিল।
লিওনকে দেখামাত্র অ্যামেলিয়া ছুটে এলো।
“ভাই!”
কিন্তু লিওন থামল না। তার চোখ শুধু একজনকে খুঁজছে।
“মা কোথায়?”
অ্যামেলিয়া কাঁপা গলায় বলল,
“রুমে।”
লিওন এক মুহূর্তও দেরি না করে মায়ের ঘরের দিকে ছুটে গেল।দরজা খুলতেই দেখল—তার মা বিছানায় বসে আছেন। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মুখে আতঙ্কের ছাপ এখনও স্পষ্ট। লিওনকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই তিনি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইলেন।
তারপর—
“লিওন…”
লিওন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।সে এগিয়ে গিয়ে মাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল।
“মা…”
মায়ের চোখ দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“তুই আমাকে মেরে ফেলেছিলি আজ…”
কাঁপা কণ্ঠে বললেন তিনি।
“এমন কাজ আর কখনো করবি না।”
লিওন মায়ের মাথায় হাত রাখল। “আমি ঠিক আছি তো, মা।”
“তুই যদি…” কথাটা শেষ করতে পারলেন না তিনি।
লিওন আরও শক্ত করে মাকে জড়িয়ে ধরল।
“কিছু হয়নি।”
“আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।”
মা ছেলের মুখ দুহাতে ধরে বারবার দেখলেন। যেন বিশ্বাস করতেই পারছেন না।
“সত্যিই কিছু হয়নি?”
লিওন হালকা হেসে বলল, “না।”
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যামেলিয়ার চোখেও পানি চলে এসেছে। কিছুক্ষণ পর সে এগিয়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরল।
“তুই একদম পাগল।”
লিওন মৃদু হেসে তার মাথায় হাত রাখল।
“জানি আমি পাগল।”
অ্যামেলিয়া চোখ মুছতে মুছতে বলল, “আমাদের সবাইকে মেরে ফেলেছিলি ভয়ে।”
“সরি।” লিওন নিচু গলায় বলল।
কিন্তু ঘরের এক কোণে তখনও একজন চুপচাপ কাঁদছিল।
মায়া।
হুইলচেয়ারে বসে থাকা মায়ার চোখ লাল হয়ে গেছে।
লিওন মায়ের কাছ থেকে সরে আসতেই তার চোখ মায়ার দিকে গেল। মায়া সঙ্গে সঙ্গে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। লিওন কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে মায়ার কাছে এগিয়ে গেল।
“মায়া…”
কোনো উত্তর নেই। লিওন তার সামনে এসে দাঁড়াল।
“কী হলো?”
মায়া মুখ ফিরিয়ে রাখল। লিওন একটু নিচু হয়ে তার চোখের সমান হওয়ার চেষ্টা করল।
“আমার ওপর রাগ করেছিস?”
মায়া এবারও কোনো উত্তর দিল না।
লিওন হালকা হাসল। “এত রাগ?”
মায়া এবার হঠাৎ হুইলচেয়ারের হাতল শক্ত করে ধরল।
তারপর কোনো কথা না বলে—নিজেই হুইলচেয়ারটা ঘুরিয়ে নিল। ধীরে ধীরে লিওনের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। লিওন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
তার মুখের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মায়া প্রচন্ড অভিমান করেছে, তার পুরো পরিবার আজকে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেয়েছে আর এই অপরাধবোধ লিওনের কাছে যেকোনো বোমার চেয়েও বেশি কঠিন মনে হলো।
এদিকে—মিটিং শেষ হতেই ইভানা প্রায় দৌড়ে হিয়ার কাছে চলে এলো। হিয়া তখন টাউন হাউসের বসার ঘরে বসে ছিল। তার সামনে কয়েকটি ফাইল খোলা। ইভানার মুখের অস্বাভাবিকতা দেখেই হিয়া ভ্রু কুঁচকাল।
“কী হয়েছে?”
ইভানা কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি টেলিভিশনের রিমোট তুলে নিল। নিউজ চ্যানেল চালু করতেই পর্দায় ভেসে উঠল—
BREAKING NEWS
CID OFFICER LEONARDO SURVIVES DEADLY BOMB ATTACK
হিয়া প্রথমে বুঝতে পারল না। তারপর—
পর্দায় লিওনের ছবি ভেসে উঠল। হিয়ার চোখ স্থির হয়ে গেল। তার শরীর যেন এক মুহূর্তে জমে গেল।
“লিওন…”
ইভানা ধীরে বলল,
“মিস্ট্রেস…”
হিয়া কোনো উত্তর দিল না। পর্দায় তখন সংবাদ উপস্থাপক ঘটনার বিস্তারিত বলছে। লিওন কীভাবে শেষ মুহূর্তে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করেছে। কীভাবে সে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে পুরো হেডকোয়ার্টারকে রক্ষা করেছে। কীভাবে সে নিষ্ক্রিয় ডিভাইস হাতে নিয়ে ভবন থেকে বেরিয়ে এসেছে। প্রতিটি শব্দ যেন হিয়ার বুকের ভেতর আঘাত করছিল। হঠাৎ তার বুকের মাঝখানে তীব্র চাপ অনুভূত হলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হাত ঠান্ডা হয়ে আসছে। হিয়ার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেল। সে বুকের ওপর হাত রাখল।
“কি হলো মিস্ট্রেস!” ইভানা সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে এগিয়ে এল।
“শ্বাস নিন।”
হিয়া চোখ বন্ধ করল। কিন্তু তার শ্বাস আরও দ্রুত হয়ে গেল।ইভানা বুঝে গেল—হিয়া আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
“মিস্ট্রেস, আমার দিকে তাকান।”
হিয়া কোনোভাবে চোখ খুলল। “লিওন…” তার ঠোঁট কাঁপল। “ও… ভেতরে ছিল…”
ইভানা তার হাত ধরতে গেল। হিয়া হঠাৎ ইভানার হাত সরিয়ে দিল। হিয়ার চোখের আতঙ্কটা ধীরে ধীরে বদলে গেল। ভয়ের জায়গা নিল তীব্র রাগ। লিওনের কিছু হয়ে যেতে পারত এই চিন্তাটাই যেন তাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলেছে।
“বস কোথায়?”
ইভানা থমকে গেল। “বস…”
“দানিয়েল কোথায়?” এবার হিয়া সরাসরি নাম ধরেই চিৎকার করে উঠলো।
“আমি—” ইভানা কথাটা শেষ করতে পারলো না।
হিয়া আর অপেক্ষা করল না। সে সামনে থাকা টেবিলের ওপর রাখা একটি গ্লাস তুলে মেঝেতে ছুড়ে মারল। ঝনঝন! শব্দে গ্লাসটা টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
ইভানা চমকে উঠল। কিন্তু হিয়া থামল না। টেবিলের ওপর থাকা কয়েকটি জিনিস একে একে মেঝেতে ছুড়ে ফেলতে লাগল। একটি ফুলদানি দেয়ালে আছড়ে পড়ল। একটি ল্যাম্প মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেল।
চারপাশের গার্ডরা শব্দ শুনে ছুটে এলো।
“মিস্ট্রেস!”
কেউ এগিয়ে আসতেই হিয়া চিৎকার করে উঠল,
“কেউ আমার কাছে আসবে না!”
সবাই থেমে গেল। হিয়া দাঁত চেপে বলল,
“দানিয়েল কোথায়?”
একজন গার্ড ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, “বস… বাঙ্কারে গেছেন।”
হিয়ার চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। সে আর কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল।
বাঙ্কারের সামনে এসে হিয়া এক মুহূর্তও থামল না।
দরজাটা ছিল ভারী এবং নিরাপত্তাবেষ্টিত। সাধারণত এই দরজা খোলার জন্য নির্দিষ্ট অনুমতি প্রয়োজন হয়।
কিন্তু আজ—হিয়া পেছনে সরে গিয়ে দরজায় সজোরে লাথি মারল। দরজাটা কেঁপে উঠল। ভেতরের সবাই চমকে তাকাল।
দ্বিতীয় লাথি মারার আগেই ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। ভেতরে বসে থাকা দানিয়েল ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার সামনে এখনও মনিটরে নিউজ চলছে।
হিয়া ঝড়ের গতিতে ভেতরে ঢুকল। দানিয়েল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“হিয়া—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই হিয়া পকেট থেকে একটি ছুরি বের করল। এক ঝটকায় দানিয়েলের কাছে গিয়ে ছুরির ধার তার গলায় ঠেকিয়ে দিল। ঘরে থাকা সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল। কিন্তু দানিয়েলের মুখে কোনো ভয় নেই। কোনো আতঙ্ক নেই। সে শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে আছে হিয়ার দিকে। এদিকে গার্ডরা এগিয়ে আসতে চাইলে দানিয়েল তাদের ইশারায় আদেশ করলো এখান থেকে চলে এতে। হিয়ার চোখ তখন লাল হয়ে আছে।
শ্বাস ভারী তার। হাতে ধরা ছুরিটা সামান্য কাঁপছে।
“আপনি এটা কীভাবে করলেন?”
দানিয়েল চুপ করে থাকলো । হিয়া ছুরিটা আরও শক্ত করে গলায় চেপে ধরল। “কেন করলেন?”
দানিয়েলের কণ্ঠ একদম শান্ত। “তুমি ভালো করেই জানো আমি আমার কাজের এক্সপ্লেইন করি না কাউকে।”
হিয়ার চোখ এবার আরও কঠিন হয়ে গেল।
“জানি।” সে ঠান্ডা গলায় বলল, “আর আমি আপনার কাছে কোনো এক্সপ্লানেশন চাইছিও না।”
দানিয়েল ভ্রু সামান্য তুলল। হিয়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি শুধু একটা ওয়ার্নিং দিতে এসেছি।”
এক মুহূর্ত থামল সে। তারপর প্রতিটি শব্দ আলাদা করে উচ্চারণ করল—“আপনি আমার কলিজায় হাত দিয়েছেন।”
দানিয়েলের চোখে এবার সামান্য বিস্ময় ফুটে উঠল।
সে প্রথমবার হিয়ার মুখটা ভালো করে দেখল। এটা শুধু রাগ নয় এখানে স্পষ্ট আতঙ্কও আছে।
কাউকে হারানোর ভয় আছে।আর সেই ভয়ের গভীরতা—দানিয়েল এতদিনে প্রথমবার দেখল।
সে ধীরে বলল, “তুমি এতটা রেগে আছ কেন?”
হিয়া কিছু বলল না। দানিয়েল সামান্য মাথা কাত করল।
“অফিসার লিওনের জন্য?”
হিয়ার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
দানিয়েল শান্তভাবে বলল, “সে তো শুধু তোমার ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ছিল।”
তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল। “তার জন্য তুমি আমার গলায় ছুরি ধরেছ? আসলে কি হয় সে তোমার?”
কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।হিয়ার চোখে তখন এমন এক দৃষ্টি—যার উত্তর সে কাউকে দিতে বাধ্য নয়। সে ছুরিটা সরাল না। বরং আরও কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আমিও কাউকে কোনোকিছু এক্সপ্লেইন করি না।”
দানিয়েলের চোখ সরু হয়ে এল। দানিয়েলের গলায় ঠেকানো ছুরিটা হিয়া এবার আস্তে করে সরিয়ে নিল।
দানিয়েল ভেবেছিল, হয়তো এবার হিয়া চলে যাবে।
কিন্তু—হিয়া ছুরিটা নিজের ডান পাশের বুকের কাছে ধরলো।
দানিয়েলের চোখ প্রথমবারের মতো স্থির হয়ে গেল।
“হিয়া…”
হিয়া তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,“আপনি জানেন…”
তার কণ্ঠে এবার কোনো রাগ নেই শুধু ছিলো দৃঢ়তা।
“আমি আপনাকে আঘাত করতে পারব না।”
দানিয়েল চুপ করে রইল। হিয়া ছুরিটা শক্ত করে বুকের ডানপাশে চেপে ধরলো তার দৃষ্টি তখনও দানিয়েলের দিকে স্থির।
“কিন্তু নিজের ব্যাপারে আমি কাউকে কোনো গ্যারান্টি দিইনি।”
পরের মুহূর্তেই হিয়া ছুড়িটা শক্ত করে ধরে সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরলো সাথে সাথে তার বুকের ডানপাশে ছুড়ির অনেকটা অংশ গেঁথে গেলো।
দানিয়েল এক পা-ও এগোল না। তার মুখ এখনও শক্ত।
একদম নির্লিপ্ত।
কিন্তু হিয়ার বুকের ডানপাশে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতেই দানিয়েলের চোখে প্রথমবারের মতো এক মুহূর্তের বিস্ময় দেখা গেল। হিয়া ব্যথায় চোখ বন্ধ করেও দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে দানিয়েলের দিকে তাকাল।
“আজ শেষবারের মতো বলছি।”
দানিয়েল নিশ্চুপ তখনও। হিয়া ছুরিটা সরিয়ে নিল।
তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু কথাগুলো ছিল স্পষ্ট।
“আপনি যদি আর কখনো লিওনের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন…”
সে এক মুহূর্ত থামল।“ওর যদি একটা আঁচড়ও লাগে…”
“তাহলে তার দায় আপনার না।”
দানিয়েলের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল।
হিয়া বাক্যটা সম্পুর্ন করলো ,“আমি আমার নিজেকেই শেষ করে দেব আপনার চোখের সামনেই।”
চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দানিয়েল এবারও কোনো কথা বলল না। হিয়া ছুরিটা এক টানে বুকের ডানপাশ থেকে বের করে শক্ত করে মুঠোয় ধরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে পৌঁছে শেষবারের মতো পেছনে তাকাল।
“লিওনের কাছ থেকে দূরে থাকবেন বস।”
তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দানিয়েল একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ স্থির হয়ে আছে দরজার দিকে। হিয়ার চলে যাওয়ার পরও যেন তার কথাগুলো ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
“ওর যদি একটা আঁচড়ও লাগে…”
দানিয়েল ধীরে নিজের গলা থেকে হাত সরাল।
তার মুখে এবার কোনো হাসি নেই। কোনো ব্যঙ্গ নেই।
শুধু গভীর বিস্ময়। কারণ সে হিয়াকে রাগতে দেখেছে।
হিয়াকে মানুষকে হত্যা করতে দেখেছে। হিয়াকে নিজের সিদ্ধান্তের জন্য পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেখেছে। কিন্তু আজ—প্রথমবার সে বুঝল,
লিওন নামের মানুষটা হিয়ার কাছে শুধু একজন পরিচিত মানুষ নয়।সে এমন একজন—যার জন্য হিয়া নিজের জীবনকেও তুচ্ছ করতে প্রস্তুত।
দানিয়েল ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার ঠোঁট থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো,
“হিয়া…”
কিন্তু ততক্ষণে সে অনেক দূরে চলে গেছে।আর দানিয়েল—প্রথমবারের মতো হিয়ার কোনো সিদ্ধান্তের পর তাকে থামানোর চেষ্টা করল না। শুধু স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দরজার দিকে, যেদিক দিয়ে হিয়া চলে গেছে। কারন দানিয়েল নিজেই ভেবে পাচ্ছেনা তার আসলে কি প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত এই মুহূর্তে?
তার আসলে কী অনুভব করা উচিত। রাগ? বিস্ময়? নাকি অন্য কিছু?
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ২৭
দানিয়েল নিজের অজান্তেই বুকের ওপর হাত রাখল। তার বুকটা হঠাৎই চিনচিন করে ব্যাথা করছে।
হিয়ার রাগের আড়ালে লিওনকে হারিয়ে ফেলার আতঙ্কিত মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অদ্ভুত এক অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরেছে। সে নিজেকে বোঝাতে চাইল—এটা শুধু হিয়ার রাগ।
কিন্তু কেন যেন নিজের কাছেই কথাটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।
