আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩২
সাবিলা সাবি
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সিআইডির রেসকিউ টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় নিল না। রাতের অন্ধকার কেটে একের পর এক গাড়ির হেডলাইট যখন দুর্ঘটনাস্থলটাকে আলোকিত করে তুলল, তখন রাস্তার ওপর ছড়িয়ে থাকা কাঁচের টুকরো, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ধাতব অংশ আর বাতাসে ভেসে থাকা পোড়া গন্ধ দেখে বোঝা যাচ্ছিল সংঘর্ষটা কতটা ভয়াবহ ছিল।
রেসকিউ টিমের কয়েকজন সদস্য সঙ্গে সঙ্গে লিওনের গাড়ির দিকে ছুটে গেল। গাড়ির সামনের অংশ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে, আর স্টিয়ারিংয়ের ওপর মাথা এলিয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে লিওন। কপালের একপাশ বেয়ে রক্ত নেমে এসে মুখের ওপর জমে আছে, শরীরেও বেশ কয়েকটি আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
একজন প্যারামেডিক দ্রুত তার পালস পরীক্ষা করে বলল,
“পালস আছে, কিন্তু হেড ইনজুরি গুরুতর। দ্রুত বের করতে হবে।”
কাটার মেশিনের শব্দে রাতের নীরবতা আবার কেঁপে উঠল। কয়েক মিনিটের চেষ্টায় গাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সরিয়ে লিওনকে সাবধানে বের করে আনা হলো। তার ঘাড় ও মাথা স্থির রেখে স্ট্রেচারে তোলা হলো এবং প্যারামেডিকরা সঙ্গে সঙ্গেই জরুরি চিকিৎসা শুরু করে দিল।
“হাসপাতালে আগে থেকেই জানিয়ে দিন। ট্রমা টিম প্রস্তুত রাখতে হবে।”
লিওনকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যাওয়ার পরও ঘটনাস্থলে থাকা অফিসারদের কাজ শেষ হলো না। রাস্তার অন্য পাশে উল্টে পড়ে থাকা স্পোর্টস কারটির দিকে এগিয়ে গেল তারা। গাড়িটা এমনভাবে দুমড়ে-মুচড়ে গেছে যে ভেতরে কেউ জীবিত আছে কি না, সেটাই প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না।
একজন অফিসার ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে টর্চের আলো ফেলতেই চিৎকার করে উঠল,
“ভেতরে একজন নারী আছে!”
সবাই সেদিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির ভেতরে র*ক্তাক্ত অবস্থায় আটকে আছে হিয়া। মুখের একাংশ র*ক্তে ঢাকা, চুল এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর ছড়িয়ে আছে, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। এতক্ষণ যে নারী মৃ*ত্যুর গতিতে গাড়ি চালিয়ে একজন সিআইডি অফিসারের কাছে পৌঁছাতে ছুটে এসেছিল, সেই দুর্ধর্ষ অপরাধী এখন নিজেরই গাড়ির ধ্বংসস্তূপে নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।
প্যারামেডিক তার পালস পরীক্ষা করে কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “পালস খুব দুর্বল। বেশি সময় নেওয়া যাবে না।”
“বের করুন ওকে।”
আবার শুরু হলো উদ্ধারকাজ। গাড়ির ধাতব অংশ কেটে একে একে সরিয়ে ফেলার পর অবশেষে হিয়াকে বের করা হলো। অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে তার রক্তচাপ পরীক্ষা করা হলো, কিন্তু রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকদের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।
“ব্লি*ডিং হচ্ছে। হেড ই*নজুরিও আছে।”
“হাসপাতালে নিয়ে চলুন দ্রুত।”
হিয়াকেও দ্বিতীয় একটা অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো।
একই দু/র্ঘটনা থেকে দুইটি অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলল শহরের দুই প্রান্তের রাস্তা পেরিয়ে একই হাসপাতালের দিকে।
একটিতে অচেতন অবস্থায় লিওন, আর অন্যটিতে মৃত্যু/র সঙ্গে লড়াই করছে হিয়া।
কিন্তু বাইরে তখনও কেউ জানে না, এই দুই মানুষের সম্পর্কটা আসলে কী।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দুজনকেই আলাদা ট্রমা ইউনিটে নিয়ে যাওয়া হলো। জরুরি বিভাগের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, চিকিৎসক ও নার্সরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের কাজে। লিওনের চিকিৎসা শুরু করার পাশাপাশি হিয়ার অবস্থাও দ্রুত স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলতে লাগল।
হিয়ার অবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি সংকটজনক হওয়ায় তাকে নিয়ে চিকিৎসকদের তৎপরতাও ছিল বেশি।
“বিপি ধরে রাখুন।”
“অক্সিজেন বাড়ান।”
“ওটি প্রস্তুত আছে?”
“জি, ডাক্তার।”
অন্যদিকে লিওনের ক্ষেত্রেও শুরু হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা। মাথায় আঘাতের মাত্রা জানতে স্ক্যানের ব্যবস্থা করা হলো এবং তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হলো।
কয়েক ঘণ্টা আগেও যে রাতটা ছিল লিওন ও হিয়ার নিজ নিজ জীবনের স্বাভাবিক একটি রাত, সেই রাতই এখন তাদের দুজনকে হাসপাতালের দুটি আলাদা কক্ষের দরজার ওপারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে জীবন আর মৃ/ত্যুর মাঝখানে।
আর হাসপাতালের বাইরে তখন শুরু হয়ে গেছে আরেক ধরনের তৎপরতা।
খবর পৌঁছে গেছে মিডিয়ার কাছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ল—“সিআইডি অফিসার লিওন গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনার শিকার!”
“লিওনের গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী!”
হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের ভিড় বাড়তে লাগল। প্রত্যেকের মুখে একই প্রশ্ন— অফিসার লিওনের গাড়ির ব্রেক কীভাবে ফেল করল এবং তা সামনে থাকা গাড়িতে ওই নারী আসলে কে?
প্রথমদিকে পুলিশের কাছ থেকেও সেই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। কারণ স্পোর্টস কারের ভেতরের নারীটির মুখ দুর্ঘটনার কারণে এতটাই আঘাতপ্রাপ্ত ও র/ক্তাক্ত যে ঘটনাস্থলেই তার পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এর মধ্যেই তদন্তকারীদের হাতে আসে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ।
একটি ফুটেজে দেখা গেল, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ আগে একটি কালো স্পোর্টস কার দ্রুতগতিতে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়িটি লিওনের গাড়ির কাছাকাছি আসার পর তাকে পেছনে ফেলে আরও সামনে চলে যায় এবং প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে।
পরের ফুটেজে দেখা যায়, লিওনের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেই স্পোর্টস কারটির দিকে এগিয়ে আসছে এবং শেষ পর্যন্ত প্রচণ্ড সংঘর্ষে দুটি গাড়িই ধ্বংস হয়ে যায়। ফুটেজটি সংবাদমাধ্যমের হাতে পৌঁছাতেই আলোড়ন সৃষ্টি হলো।
একজন রিপোর্টার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“নতুন পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, দুর্ঘটনার আগে স্পোর্টস কারটি ইচ্ছাকৃতভাবে রাস্তার মাঝখানে অবস্থান নিয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত কোনো ঘটনা?”
এরপর আরও কিছু ফুটেজ প্রকাশ করা হলো।
সেগুলোতে দেখা গেল, দুর্ঘটনার পর ধ্বংসস্তূপের পাশে অস্বাভাবিক কিছু একটা নড়াচড়া করছে। ক্যামেরার জুম বাড়ানো হলে দেখা গেল, আকাশ থেকে একটি বিশাল সোনালী ঈগল নেমে এসে ভাঙা স্পোর্টস কারটির পাশে বসেছে।
রিপোর্টার কিছুক্ষণ ফুটেজটির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“এই ঈগলটির পরিচয় নিয়েও ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধজগতের বহুল আলোচিত এক অপরাধীর সঙ্গে এমন একটি ঈগলকে এর আগে দেখা গেছে।”
স্ক্রিনে পুরোনো কিছু ফুটেজ দেখানো হলো। সেদিন হিয়াকে সিআইডি হেডকোয়ার্টার থেকে দানিয়েল নিয়ে যাওয়ার সময়, এমন একটা ঈগলকে দেখা গিয়েছিলো
সবার সন্দেহের লিস্টে এবার ভাইপার।
রিপোর্টার তখন বলল, “তবে দু/র্ঘটনায় আহ*ত নারীটি ভাইপার কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তার পরিচয় প্রকাশ করেনি।”
মিডিয়া এখনো জানে না, গাড়ির ভেতরে থাকা নারীটি আসলে কে। কিন্তু যাদের কাছে শ্যাডো অপরিচিত নয়, তাদের জন্য এই ফুটেজই যথেষ্ট ছিল।
মেক্সিকোতে তখন দানিয়েল একটি বৈঠক শেষ করে নিজের ব্যক্তিগত জেটের দিকে যাচ্ছিল। তার ফোনে একের পর এক কল আসছিল, কিন্তু সে প্রথমদিকে সেগুলোর দিকে কোনো মনোযোগ দেয়নি। মেক্সিকোর ডিল শেষ করেছে তবে আরেকটু কাজ বাকি তারপর পুনরায় দুবাইয়ের সারপেন্ট পেন্টহাউসে ফেরার প্রস্তুতিই তখন তার প্রধান কাজ।
ঠিক সেই সময় তার বিশ্বস্ত একজন লোকের কল এলো। দানিয়েল ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে বলা হলো, “বস, লন্ডনে একটা বড় দুর্ঘটনা হয়েছে।”
দানিয়েলের পা থেমে গেল। “কার?”
“সিআইডি অফিসার লিওন।”
কয়েক সেকেন্ড দানিয়েল কোনো কথা বলল না।
তারপর জিজ্ঞেস করল, “অবস্থা?”
“গুরুতর। হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।”
দানিয়েলের মুখের অভিব্যক্তি বদলাল না, কিন্তু চোখের দৃষ্টি আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠল।
“আর কিছু?”
ওপাশের লোকটি এবার কণ্ঠ নিচু করল।
“অফিসার লিওনের সঙ্গে একটি স্পোর্টস কারের সংঘর্ষ হয়েছে। গাড়িটা ইচ্ছা করে রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করানো হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে।”
দানিয়েল এবার সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল।
“গাড়ির ভেতরে কে ছিল?”
“একজন নারী। এখনো পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি।”
দানিয়েল কিছু বলার আগেই লোকটি আবার বলল,
“কিন্তু দুর্ঘটনার পর একটা জিনিস ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।”
“কী?”
“শ্যাডো।”
শব্দটা শুনেই দানিয়েলের চোখ স্থির হয়ে গেল।
ওপাশের লোকটি বলল, “ঈগলটা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই গাড়ির পাশে বসেছিল।”
দানিয়েল আর কোনো প্রশ্ন করল না। তার কাছে আর কোনো পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিল না।
“হিয়া…”
তার কণ্ঠে শব্দটা এত নিচু ছিল যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সহযোগীরাও ঠিকমতো শুনতে পেল না।
পরের কথাটা অবশ্য সবাই শুনতে পেল।
“জেট প্রস্তুত করো রাইট নাও।”
সহযোগী অবাক হয়ে তাকাল “বস, মেক্সিকোর বাকি কাজ—”
“বাকি কাজ পরে হবে।”
দানিয়েলের কণ্ঠে এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে আপত্তির সুযোগ থাকে।
“আমি এখন লন্ডনে যাচ্ছি।”
সে আর একবারও পেছনে তাকাল না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ব্যক্তিগত জেটের দরজা বন্ধ হয়ে গেল এবং মেক্সিকোর আকাশ ছেড়ে সেটি লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। অন্ধকারের সম্রাটের কাছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডিল, রাজপরিবার, সাম্রাজ্য—কোনোটারই মূল্য নেই।
কারণ সে জানে, হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এমন একজন মানুষ আছে, যার জন্য তার সমস্ত হিসাব বারবার ভেঙে যায়।
হিয়া।
অন্যদিকে টাউন হাউসেও খবর পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগল না।
টেলিভিশনের পর্দায় তখন দুর্ঘটনার ফুটেজ চলছে। ইভানা, মার্ক আর জ্যাক তিনজনই সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রথমে তারা শুধু লিওনের দুর্ঘটনার খবর শুনছিল। কিন্তু স্পোর্টস কারের ফুটেজ সামনে আসার পর ইভানার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
গাড়িটা সে চিনতে পেরেছে। ওটা হিয়ার গাড়ি যেটা তার সামনে দিয়েই হিয়া নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলো।
কিন্তু তবুও শেষ পর্যন্ত নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। এরপর যখন দুর্ঘটনার পর আকাশ থেকে একটি সোনালী ঈগল নেমে আসার দৃশ্যটি পর্দায় দেখানো হলো, ইভানার মুখ থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো,
“শ্যাডো…”
মার্ক আর জ্যাক দুজনেই তার দিকে তাকাল।
ইভানার চোখে তখন আতঙ্ক।
“ওটা মিস্ট্রেস।”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। কারণ সবাই বুঝে গেছে।
শ্যাডো কখনো হিয়াকে ছেড়ে দূরে থাকে না।
টেলিভিশনের পর্দায় অজ্ঞাতপরিচয় একজন নারী দেখানো হলেও তাদের কাছে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ইভানা দ্রুত ফোনটা হাতে তুলে নিল।
“হাসপাতালে যেতে হবে।”
মার্ক ইতিমধ্যেই দরজার দিকে এগিয়ে গেছে।
জ্যাকও তার পেছনে বেরিয়ে এলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই টাউন হাউসের গাড়িগুলো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে চলল। কেউ জানে না হিয়া এখন কেমন আছে। শুধু একটা কথাই সবার মাথায় ঘুরছে—
অন্ধকারের সম্রাজ্ঞী আজ নিজের জীবন বাজি রেখে যে মানুষটাকে বাঁচাতে ছুটেছিল, সে কি নিজে বেঁচে ফিরতে পারবে?
লিওনের পরিবারের কাছেও খবর পৌঁছে গেছে ইতিমধ্যে। সংবাদটা শোনার পর বাড়িটা যেন মুহূর্তেই কান্নায় ভারী হয়ে উঠল।
মায়া খবরটা শোনার পর কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তার চোখের সামনে শুধু লিওনের মুখটা ভেসে উঠছিল।
“আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো।”
লিওনের মা শিরিন হায়াস তখন বলল, “মায়া, তুই হুইলচেয়ারে তোর এখন যাওয়া উচিত হবে না।”
মায়ার চোখ বেয়ে পানি নেমে এলো।
“আমার লিও ভাইয়া।”
কণ্ঠটা কেঁপে উঠল তার “সে হাসপাতালে পড়ে আছে আর আমি এখানে বসে থাকব?”
এরপর আর কেউ তাকে আটকানোর চেষ্টা করল না।
হুইলচেয়ারেই তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হলো। পরিবারের অন্য সদস্যরাও সঙ্গে রওনা দিল।
একই হাসপাতালের দিকে ছুটে চলল দুটি দল।
একদিকে লিওনের পরিবার। অন্যদিকে হিয়ার মানুষগুলো। আর আকাশপথে ছুটে আসছে দানিয়েল।
হাসপাতালের ভেতরে তখনও দুইটি দরজা বন্ধ।
একটির ওপাশে লিওন। অন্যটির ওপাশে হিয়া।
বাইরে পৃথিবী তাদের নিয়ে প্রশ্ন করছে, আর ভেতরে চিকিৎসকরা দুজনের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। আর তখনও হাসপাতালের বাইরে আকাশের কোনো এক অন্ধকার কোণে চক্কর কাটছে শ্যাডো।
মেক্সিকো থেকে লন্ডনের আকাশপথ দীর্ঘ। কিন্তু সেই দীর্ঘ পথটাও সেদিন দানিয়েলের কাছে অসহ্যভাবে ধীর মনে হচ্ছিল।
ব্যক্তিগত জেটের কেবিনে বসে সে একবারও চোখ বন্ধ করেনি। প্রায় এগারো ঘণ্টার যাত্রা সামনে থাকলেও তার সমস্ত মনোযোগ ছিল একটাই জায়গায়—লন্ডনের সেই হাসপাতাল, যেখানে মৃ/ত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে হিয়া।
জেটের ভেতরে কেউ কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলার সাহস করেনি। দানিয়েলের মুখে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছিল না, কিন্তু তার ল্যাভেন্ডার চোখজোড়ার স্থিরতা এতটাই কঠিন হয়ে উঠেছিল যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বিশ্বস্ত সহযোগীরাও বুঝতে পারছিল, এই নীরবতার ভেতরে কতটা ঝড় জমে আছে।
অবশেষে দীর্ঘ যাত্রার পর লন্ডনের আকাশে জেটটি নামার প্রস্তুতি নিল। অন্যদিকে, দানিয়েলের পৌঁছানোর অনেক আগেই ইভানা, মার্ক এবং জ্যাক হাসপাতালে পৌঁছে গেছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে তখনও সিআইডি সদস্যদের ব্যস্ততা। দুর্ঘটনার তদন্ত, নিরাপত্তা এবং আহত দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ একসঙ্গে চলছিল। ইভানা, মার্ক ও জ্যাককে দেখে প্রথমে কয়েকজন সিআইডি অফিসার ধরে নিয়েছিল, হয়তো ওই অজ্ঞাতপরিচয় নারীর পরিবারের লোকজন তারা।
কেউ তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল না।
ইভানা কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায়ও ছিল না। হাসপাতালের করিডোরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে বারবার শুধু অপারেশন থিয়েটারের দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
“মিস্ট্রেসকে বাঁচতে হবে…” তার কণ্ঠ এতটাই নিচু ছিল যে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মার্ক ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না।
মার্ক তার কাঁধে হাত রেখে বললো “বাঁচবে, ইভানা।”
কিন্তু নিজের কথাটাই যেন নিজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না।
কিছুক্ষণ পর হাসপাতালের বাইরের নিরাপত্তা হঠাৎ আরও কঠোর হয়ে উঠল। কয়েকটি কালো গাড়ি এসে হাসপাতালের সামনে থামল। গাড়ির দরজা খুলতেই সিআইডির কয়েকজন অফিসার স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়ে উঠল।
তারপর যে মানুষটি গাড়ি থেকে নামল, তাকে দেখে চারপাশের কথাবার্তা একসঙ্গে থেমে গেল। কালো পোশাকে আবৃত রাজকীয় ব্যক্তিত্ব। ঠান্ডা, স্থির মুখ। আর সেই পরিচিত ল্যাভেন্ডার চোখ—ফ্যান্টম কিং দানিয়েল।
সিআইডির কয়েকজন অফিসার একে অপরের দিকে তাকাল। মিডিয়ার ক্যামেরাগুলোও একই সঙ্গে তার দিকে ঘুরে গেল। দানিয়েল কারও দিকে তাকাল না।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ কিংবা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সিআইডি সদস্য—কোনো কিছুই তার দৃষ্টিতে অস্তিত্ব রাখছিল না।
সে সোজা হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে গেল।
একজন সিআইডি অফিসার তাকে থামানোর জন্য এক পা এগিয়েও থেমে গেল। কারণ দানিয়েলের মুখে এমন এক অভিব্যক্তি ছিল, যেখানে তাকে থামানোর অর্থ পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলা।
করিডোর পেরিয়ে দানিয়েল সরাসরি জরুরি বিভাগের সামনে এসে দাঁড়াল। সেখানে একজন চিকিৎসক দাঁড়িয়ে ছিলেন। দানিয়েল তার সামনে গিয়ে থামল।
“হিয়া কোথায়?”
ডাক্তার কিছুটা বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালেন।
“আপনি—”
দানিয়েলের কণ্ঠ এবার আরও নিচু হলো। “হিয়া কোথায়?”
ডাক্তার পরিস্থিতি বুঝে বললেন, “ওটিতে আছে। অবস্থা গুরুতর। মাথায় আঘাত রয়েছে, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর ইনজুরি হয়েছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।”
দানিয়েলের চোখের দৃষ্টি আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“বাঁচাতে হবে।”
ডাক্তার কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সে আবার বলল,
“যেকোনো মূল্যে।”
করিডোরের চারপাশের মানুষগুলো নিঃশব্দ হয়ে গেল।
দানিয়েলের কণ্ঠে এবার এমন এক শীতলতা নেমে এলো, যা শুনে উপস্থিত প্রত্যেকেই বুঝে গেল—এটা কোনো অনুরোধ নয়।
“ওর কিছু হলে এই হাসপাতালের কোনো নাম-গন্ধ থাকবে না এই লন্ডন শহরে।”
ডাক্তার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। দানিয়েল এক মুহূর্তও চোখ সরাল না তার দিক থেকে।
“আপনারা পৃথিবীর সেরা চিকিৎসক নিয়ে আসুন। যা যা দরকার করুন। যত খরচ লাগে লাগুক। কিন্তু ওকে বাঁচাতে হবে।”
তারপর সে আর কিছু বলল না। শুধু অপারেশন থিয়েটারের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই প্রথম সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সিআইডি অফিসাররা বুঝতে পারল—হাসপাতালে ভর্তি অজ্ঞাতপরিচয় সেই নারী কোনো সাধারণ কেউ নয়।
কারণ আন্ডারওয়ার্ল্ডের ফ্যান্টম কিং নিজে থেকে ছুটে এসেছে তার জন্য। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সাংবাদিকদের কাছেও ছবিটা এক মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে গেল। কয়েকদিন আগেই যে নারীকে সিআইডি রিমান্ডে নিয়েছিল, যে নারীকে লন্ডনের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে সবাই চেনে—সেই নারীই আজ গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে।
আর তার জন্য ছুটে এসেছে ফ্যান্টম কিং দানিয়েল।
ক্যামেরাগুলো আরও জোরে ফ্ল্যাশ করতে শুরু করল।
একজন সাংবাদিক প্রায় চিৎকার করে বলল, “মিস্টার দানিয়েল! আপনি কি নিশ্চিত যে দুর্ঘটনায় আহত নারীটি ভাইপার?”
অন্য একজন সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “ভাইপারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কী?”
“একজন সিআইডি অফিসারের জন্য সে কেন নিজের জীবন বিপন্ন করল?”
“কয়েকদিন আগেই যাকে সিআইডি রিমান্ডে নিয়েছিল, সেই অপরাধী আজ একজন সিআইডি অফিসারকে বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রাখল কেন?”
প্রশ্নগুলো একের পর এক ছুটে আসতে লাগল।
দানিয়েল কোনো প্রশ্নের উত্তর দিল না। তার চোখ তখনও অপারেশন থিয়েটারের দরজায় স্থির।
কিন্তু মিডিয়ার হাতে এখন একটি নতুন গল্প এসে গেছে। এতদিন তারা ভাইপারকে দেখেছে একজন নির্মম অপরাধী হিসেবে।আজ প্রথমবার তারা সেই একই নারীর আরেকটি পরিচয় দেখতে পাচ্ছে—একজন নারী, যে নিজের জীবনকে মৃত্যুর সামনে ঠেলে দিয়েছে একজন সিআইডি অফিসারকে বাঁচানোর জন্য।
আর সেই সিআইডি অফিসারই সেই মানুষ, যার হাতে কয়েকদিন আগেও ছিল ভাইপারের হাতকড়া।
প্রশ্নটা তাই শুধু ভাইপার কে—তা নয়।
প্রশ্ন হলো—যে নারী আইনের চোখে একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী, সে কেন একজন সিআইডি অফিসারের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হলো?
আর তার থেকেও বড় প্রশ্ন—লিওন আর হিয়ার মধ্যে আসলে এমন কী সম্পর্ক, যার উত্তর পেতে হয়তো পুরো লন্ডনের আন্ডারওয়ার্ল্ডকেই নতুন করে নড়ে উঠতে হবে?
দানিয়েলের উপস্থিতির পর পরিস্থিতিটা আর গোপন রইল না।
সিআইডির অভিজ্ঞ কয়েকজন অফিসার একে অপরের দিকে তাকাল। দুর্ঘটনাস্থলে পাওয়া শ্যাডোর উপস্থিতি, স্পোর্টস কারের ফুটেজ এবং এখন দানিয়েলের নিজের মুখে হিয়ার নাম উচ্চারণ—সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে নিতে তাদের আর কোনো সংশয় রইল না।
অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে যে অজ্ঞাতপরিচয় নারী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, সে আর কেউ নয়।
ভাইপার।
নূজহাত হিয়া।
কয়েকদিন আগেও যাকে সিআইডি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, সেই নারীই আজ একই সিআইডি অফিসার লিওনের জীবনের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছে।
একজন সিনিয়র অফিসার সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দিলেন,
“পুরো হাসপাতালের সিকিউরিটি বাড়াও। কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না।”
আরেকজন অফিসার দ্রুত ওয়াকিটকিতে নির্দেশ পাঠিয়ে দিল।
“মিডিয়াকে জরুরি বিভাগের এলাকা থেকে সরিয়ে দিন। হাসপাতালের ভেতরের সব প্রবেশপথ সিল করে দিন। অনুমতি ছাড়া কোনো ক্যামেরা, কোনো সাংবাদিক—কেউ যেন এক ধাপও ভেতরে না আসে।”
কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাসপাতালের পরিবেশ বদলে গেল। প্রবেশপথে অতিরিক্ত সিআইডি সদস্য মোতায়েন করা হলো। হাসপাতালের করিডোরে টহল বাড়ানো হলো। জরুরি বিভাগের সামনে নিরাপত্তা আরও কঠোর করা হলো।
ক্যামেরাগুলো একে একে হাসপাতালের সীমানার বাইরে সরিয়ে দেওয়া হলো। সাংবাদিকরা বাইরে দাঁড়িয়ে যতই প্রশ্ন ছুড়ে দিক, ভেতর থেকে কোনো উত্তর এল না।
“ভাইপার কি সত্যিই ওই নারী?”
“ মিস্টার দানিয়েল কেন এখানে?”
“লিওনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?”
কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য কেউ থামল না।
সিআইডি এখন জানে, এই হাসপাতালের ভেতরে শুধু দুজন আহত মানুষ নেই। এখানে আছে এমন এক সত্য, যা প্রকাশ্যে এলে লন্ডনের আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ড—সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
তাই এই মুহূর্তে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে না।
শুধু দুটো জীবন বাঁচানো হবে।
হাসপাতালের অন্য একটি করিডোরে তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। সেখানে অনেক্ষণ আগে থেকেই বসে আছে লিওনের পরিবার।
কেউ জানে না পাশের কয়েকটি দরজার ওপাশে আসলে কী ঘটছে। তারা শুধু জানে, তাদের লিওন গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে এবং চিকিৎসকরা তার জীবন বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছেন।
মায়া হুইলচেয়ারে বসে আছে। চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে গেছে। বারবার সে হাসপাতালের দরজার দিকে তাকাচ্ছে।
“ডাক্তার এখনো বের হলো না কেন?”
পাশে থাকা অ্যামেলিয়া তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
“মায়া ডাক্তাররা চেষ্টা করছে তো। লিওন ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করিস না।”
মায়া চোখ মুছে আবার দরজার দিকে তাকালো।
“আমার লিও ভাইয়া তো কোনোদিন নিজের যত্ন নেয় না। সবসময় কাজ আর কাজ…”
কণ্ঠটা শেষের দিকে ভেঙে গেল। পরিবারের অন্য সদস্যরাও কেউ চুপ করে বসে আছে, কেউ ফোনে আত্মীয়দের খবর দিচ্ছে, কেউ আবার হাসপাতালের কর্মীদের কাছে লিওনের চিকিৎসার খবর জানার চেষ্টা করছে। তাদের পৃথিবী এই মুহূর্তে একটাই মানুষকে ঘিরে।
লিওন।
তারা জানে না, একই হাসপাতালের অন্য প্রান্তে এমন একজন নারী মৃ/ত্যুর সঙ্গে লড়ছে, যার নাম তাদের ছেলের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে সেই সম্পর্কের সত্যিটা জানলে হয়তো তাদের এই রাত আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠত।
তারা জানে না, তাদের ছেলেকে বাঁচাতে ছুটে আসা সেই নারীই সিআইডির কাছে বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত অপরাধী।
তারা জানে না, সেই নারীর জন্য হাসপাতালের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ফ্যান্টম কিং।
তারা শুধু অপেক্ষা করছে।একটা দরজা খুলবে।
একজন ডাক্তার বেরিয়ে আসবে। আর কেউ একজন এসে বলবে—“লিওন বিপদমুক্ত।”
এই মুহূর্তে তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য এটাই।
অন্যদিকে, হাসপাতালের আরেক প্রান্তে অপারেশন থিয়েটারের লাল আলো এখনো জ্বলছে।
তার নিচে দাঁড়িয়ে আছে দানিয়েল। কিছুটা দূরে ইভানা, মার্ক আর জ্যাক। আর করিডোরের বাইরে কঠোর নিরাপত্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সিআইডি সদস্যরা।
অবশেষে দুটো দিন পেরিয়ে গেছে।
হাসপাতালের কেবিনে সকালের নরম আলো জানালার পর্দা ভেদ করে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে। চারপাশে এক ধরনের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। শুধু মনিটরের নিয়মিত শব্দ আর করিডোর দিয়ে যাওয়া মানুষের ক্ষীণ পদশব্দ সেই নীরবতাকে মাঝে মাঝে ভেঙে দিচ্ছে।
দুদিন ধরে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা লিওন নিস্তেজ হয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। কপালের একপাশে ব্যান্ডেজ, মুখে ক্লান্তির ছাপ, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় দুর্ঘটনার আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।
তার বিছানার পাশে বসে ছিলেন তার মা শিরিন হায়াস।
দুদিন ধরে ছেলের কাছ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেননি তিনি। চোখের নিচে জমে থাকা ক্লান্তি আর কান্নার দাগেই বোঝা যাচ্ছে, এই দুই রাত তার কাছে কতটা দীর্ঘ ছিল।
অন্য পাশে বসে ছিল অ্যামেলিয়া। ভাইয়ের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে নিঃশব্দে বসে ছিল সে। মাঝেমধ্যে লিওনের মুখের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন চোখের সামনে থাকা মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার ভয় এখনো তার ভেতর থেকে পুরোপুরি কাটেনি।
হঠাৎ লিওনের আঙুল সামান্য নড়ে উঠল। অ্যামেলিয়ার দৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের দিকে চলে গেল। পরের মুহূর্তেই লিওনের চোখের পাতায় ক্ষীণ একটা কাঁপন দেখা দিল।
অ্যামেলিয়া দ্রুত উঠে দাঁড়াল।
“মা…”
তার কণ্ঠে উত্তেজনা আর আতঙ্ক একসঙ্গে মিশে ছিল।
“মা, লিওন…”
শিরিন হায়াস চমকে ছেলের দিকে তাকালেন।
লিওনের চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেল। প্রথমে সবকিছু তার কাছে ঝাপসা মনে হলো। সাদা ছাদ, উজ্জ্বল আলো, অপরিচিত একটা গন্ধ—কিছুই যেন ঠিকভাবে চিনতে পারছিল না সে।
কয়েক সেকেন্ড পর দৃষ্টি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হলো।
লিওন খুব ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকাল।
তার চোখ প্রথমেই গিয়ে থামল মায়ের মুখে।
শিরিনের চোখ দুটো কান্নায় ভেজা। ছেলের চোখ খুলতে দেখেই তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। দ্রুত তার হাতটা দুহাতে ধরে ফেললেন।
“লিওন…”
কণ্ঠটা কেঁপে গেল। “আমার ছেলে…”
লিওন ঠোঁট নাড়ল। গলা শুকিয়ে যাওয়ায় প্রথমে কোনো শব্দ বের হলো না। অ্যামেলিয়া দ্রুত পাশে রাখা পানির গ্লাসটা তুলে নিল।
“আস্তে, লিওন।”
লিওন সামান্য পানি পান করল। তারপর আবার মায়ের দিকে তাকাল।
“মা…”
একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দটুকুই শিরিনের চোখের পানি আবার নামিয়ে দিল।
তিনি ছেলের কপালে হাত রাখলেন। “আমি এখানে আছি বাবা।”
কণ্ঠে মায়ের সেই পরিচিত মমতা, অথচ তার ভেতরে লুকিয়ে আছে দুদিনের জমে থাকা আতঙ্ক।
“তুই আমাদের কতটা ভয় পাইয়ে দিয়েছিস জানিস?”
লিওন কিছুক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আমি… হাসপাতালে?”
অ্যামেলিয়া মাথা নাড়ল “হ্যাঁ। দুদিন ধরে তুই অচেতন ছিলি।”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“দুদিন?”
“হ্যাঁ।”
অ্যামেলিয়ার কণ্ঠ এবারও নরম। “ডাক্তাররা বলেছিল জ্ঞান ফিরতে একটু সময় লাগতে পারে। আমরা শুধু অপেক্ষা করছিলাম।”
লিওন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ তার মাথার ভেতর দুর্ঘটনার আগের মুহূর্তগুলো একে একে ফিরে আসতে শুরু করল।
গাড়ির ব্রেক কাজ করছিলো না। কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ। সামনে রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কালো স্পোর্টস কার।
তারপর—একটা প্রচণ্ড ধাক্কা।
লিওনের চোখ মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
“আমার গাড়ি…”
শিরিন সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা চেপে ধরলেন।
“এসব এখন ভাবিস না। তুই আগে সুস্থ হয়ে ওঠ।”
কিন্তু লিওনের দৃষ্টি তখন অন্য কোথাও। হঠাৎ তার মনে পড়ল দুর্ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তটা।
সেই স্পোর্টস কার। তারপর সংঘর্ষ। তারপর আর কিছু মনে নেই। লিওন ধীরে ধীরে অ্যামেলিয়ার দিকে তাকাল।
“আর…”
কথাটা বলতে গিয়ে সে থেমে গেল। অ্যামেলিয়া ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। লিওনের কণ্ঠ এবার আরও নিচু হয়ে এলো।
“ওই গাড়িতে যে ছিল…”
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে জিজ্ঞেস করল,
“সে বেঁচে আছে?”
প্রশ্নটা শুনে শিরিন আর অ্যামেলিয়া একে অপরের দিকে তাকাল। তাদের মুখে উত্তর নেই। লিওনের চোখে তখন অদ্ভুত একটা উৎকণ্ঠা ফুটে উঠেছে।
সে বুঝতে পারছে না কেন ওই অজ্ঞাত মানুষটির কথা তার মাথা থেকে যাচ্ছে না। শুধু মনে হচ্ছে, দুর্ঘটনার সেই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো একটা অংশ এখনো তার অজানা।
অ্যামেলিয়া ধীরে বলল,“তুই এখন এসব নিয়ে চিন্তা করিস না, ভাই। ডাক্তারকে আগে জানাই যে তোর জ্ঞান ফিরেছে।”
কিন্তু লিওনের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল। “আপু…”
“হুম?”
“ওই মানুষটা… বেঁচে আছে তো?”
অ্যামেলিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। শিরিন ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
“সব জানতে পারবি। এখন শুধু শান্ত থাক।”
লিওন চোখ বন্ধ করল। কিন্তু তার মাথায় তখনও একটা দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছে।
অন্ধকার রাস্তাটা আর আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে থাকা স্পোর্টস কার। আর সেই গাড়ির ভেতরে থাকা অজ্ঞাত মানুষটি।
সে জানে না সেই মানুষটি কে। জানে না কেন সে নিজের জীবন বিপন্ন করে তার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিল।শুধু একটা অনুভূতি বারবার বুকের ভেতর প্রশ্ন তুলছে— সেই মানুষটা কি সত্যিই শুধু একজন অজ্ঞাতপরিচয়ের ছিল?
অন্যদিকে, হায়াস পরিবারের বাড়িতে তখনও ভারী নীরবতা। লিওনের বাবা গত দুদিন ধরে হাসপাতাল আর বাড়ির মধ্যে ছুটে বেড়াচ্ছেন। আজ কিছু জরুরি কাজের জন্য সাময়িকভাবে বাড়িতে ছিলেন তিনি।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। তিনি দ্রুত কল রিসিভ করলেন। ওপাশের খবরটা শুনে কয়েক সেকেন্ড তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে বললেন,
“জ্ঞান ফিরেছে?”
ওপাশ থেকে নিশ্চিত উত্তর আসতেই তার বুকের ওপর থেকে যেন একটা বিশাল ভার নেমে গেল।
“আলহামদুলিল্লাহ…”
তিনি আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। ফোনটা হাতে নিয়েই বেরিয়ে পড়লেন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
দুদিন পর অবশেষে তার ছেলে চোখ খুলেছে। এবার তাকে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত তার শান্তি নেই।
লিওনের জ্ঞান ফেরার খবর সিআইডি হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগল না। দুর্ঘটনার পর থেকেই ঘটনাটাকে ঘিরে তদন্ত চলছিল, আর তার জ্ঞান ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল সেই রাতের অজানা ঘটনাগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসিপিসহ কয়েকজন কর্মকর্তা হাসপাতালে এসে পৌঁছালেন।
কেবিনে ঢুকে এসিপি প্রথমেই লিওনের শারীরিক অবস্থার দিকে তাকালেন। কপালে ব্যান্ডেজ, মুখে ক্লান্তির ছাপ, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন—দুর্ঘটনাটা যে কতটা ভয়াবহ ছিল, তা তার বর্তমান অবস্থাই বলে দিচ্ছিল। তবুও চোখের সেই তীক্ষ্ণতা একটুও কমেনি।
“কেমন লাগছে এখন লিওন?”
লিওন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “ব্যথা আছে। তবে সহ্য করতে পারছি। স্যার, দুর্ঘটনার পর কী হয়েছে?”
এসিপি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না। পাশে থাকা একজন কর্মকর্তাকে ইশারা করতেই সে ল্যাপটপ খুলে সামনে নিয়ে এল।
“আগে এটা দেখো।”
স্ক্রিনে রাতের রাস্তার সিসিটিভি ফুটেজ ভেসে উঠল। অন্ধকারের বুক চিরে দ্রুত এগিয়ে আসছে লিওনের গাড়ি। তার কিছুক্ষণ আগেই আরেকটি কালো স্পোর্টস কার সেই একই রাস্তা ধরে এগিয়ে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়িভাবে থেমে গেল। গাড়িটা এমনভাবে দাঁড় করানো, যেন পেছন থেকে আসা কোনো যানবাহনের সামনে সেটাকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগই না থাকে।
লিওন নিঃশব্দে ফুটেজের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের দৃশ্যে দেখা গেল সংঘর্ষ। মুহূর্তের মধ্যে দুটো গাড়ি একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেল। লিওনের গাড়ি ছিটকে গিয়ে থেমে গেল, আর স্পোর্টস কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকবার উল্টে রাস্তার ওপর দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে রইল।
এরপরের ফুটেজে দেখা গেল দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে আসা রেসকিউ টিম। ধোঁয়ার আড়ালে উল্টে থাকা গাড়িটির ভাঙা অংশ থেকে কাউকে বের করে আনার চেষ্টা চলছে।
লিওন গভীর মনোযোগে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ পরের ফুটেজটা চালু হতেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
রেসকিউ টিম আসার আগেই আকাশের অন্ধকার থেকে বিশাল একটি ঈগল ডানা মেলে নিচের দিকে নেমে আসছিলো। দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এসে সেটি কয়েকবার চক্কর দিয়ে অবশেষে ভাঙা গাড়ির ওপর নেমে দাঁড়াল।
লিওনের ঠোঁট নড়ে উঠল।
“শ্যাডো…”
এই ঈগলকে চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
এসিপি এবার ধীরে ধীরে বললেন, “এখন বুঝতে পারছো, ওই স্পোর্টস কারে কে ছিল?”
লিওন স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে তাকাল। বুকের ভেতর অজানা একটা আশঙ্কা জমে উঠেছে।
“কে?”
এসিপি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “ আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল ভাইপার।”
শব্দটা কানে পৌঁছাতেই লিওন কয়েক মুহূর্ত
স্থির হয়ে গেল।
হিয়া।
তার চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে দুর্ঘটনার আগের দৃশ্যগুলো ফিরে এলো। ব্রেক কাজ করছিল না। গাড়ির গতি কমছিল না। তারপর হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সেই স্পোর্টস কার।
তখন সে জানত না, ওই গাড়ির ভেতরে কে আছে।
এখন জানল। তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
“ওর কী অবস্থা এখন বেঁচে আছে তো?”
কণ্ঠটা আগের তুলনায় অনেকটা নিচু হলো।
এসিপির মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
“অবস্থা ভালো নয়। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। গাড়িটা এতটাই দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল যে ওকে বের করতেই রেসকিউ টিমের অনেক সময় লেগেছে। ডাক্তাররা জানিয়েছে, আঘাতটা সরাসরি মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলেছে।”
লিওনের চোখে উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হলো।
“তারপর?”
এসিপি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “ও এখন কোমায়।”
লিওনের মুখের সমস্ত অভিব্যক্তি মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
“কোমায়?”
“হ্যাঁ।”
আর কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে।
দুদিনের অচেতনতা থেকে মাত্র কিছুক্ষণ আগে জেগে উঠেছে সে। অথচ জ্ঞান ফেরার পর প্রথম যে খবরটা শুনল, সেটাই তার বুকের ভেতর নতুন এক শূন্যতা তৈরি করে দিল।
হিয়া তার সামনে নিজের গাড়ি দাঁড় করিয়েছিল।
সে জানত, তার নিজের গাড়ির ব্রেক কাজ করছে না। জানত, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কী হতে পারে। তবুও সরে যায়নি। বরং নিজের গাড়িটাকেই তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
লিওন ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল। হিয়া তাকে বাঁচাতে গিয়েছিল। ইচ্ছে করেই। নিজের জীবনের বিনিময়ে।
“আমি ওকে দেখতে চাই।”
কথাটা এবার স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
এসিপি মাথা নেড়ে বললেন “এখন সেটা সম্ভব নয়।”
লিওন সঙ্গে সঙ্গে তাকাল।
“কেন?”
এসিপি কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, “ওকে যে কেবিনে রাখা হয়েছে, সেখানে কঠোর নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। আমাদের কাউকেও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।”
“কার নির্দেশে?”
এক মুহূর্তের নীরবতার পর উত্তর এলো,“দানিয়েলের।”
নামটা শুনতেই লিওনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
চোখের দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল।
এসিপি বললেন, “ভাইপারের জ্ঞান ফিরলে আমরা ওর কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারতাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো জবানবন্দি নেওয়া সম্ভব হয়নি। ওই কেবিনের নিরাপত্তা পুরোপুরি দানিয়েলের লোকজনের নিয়ন্ত্রণে।”
লিওন কিছু বলল না। তার ভেতরে রাগ জমছিল, কিন্তু সেই রাগের চেয়েও বড় হয়ে উঠছিল অন্য একটা অনুভূতি।
হিয়ার কথা মনে পড়ছিল।
সেই বেপরোয়া অপরাধী মেয়েটা চাইলে তাকে এড়িয়ে যেতে পারত। তার গাড়ির সামনে না দাঁড়িয়েও থাকতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। কয়েক মুহূর্তের সিদ্ধান্তে নিজের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, শুধু তাকে বাঁচানোর জন্য।
লিওনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
“ও আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিল…”
কথাটা এত নিচু স্বরে বলা হলো যে কেবিনে থাকা সবাই প্রায় নিঃশব্দে শুনল।
সে চোখ বন্ধ করল। দুর্ঘটনার আগের মুহূর্তটা আবার মনে পড়ল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়ি।
ব্রেকহীন তার গাড়ি। তারপর প্রচণ্ড সংঘর্ষ। যদি সেই গাড়িটা সেখানে না থাকত, তাহলে আজ তার পরিণতি কী হতো—সেটা ভাবতেই লিওনের বুক কেঁপে উঠল।
অথচ সেই মানুষটা এখন হাসপাতালের অন্য একটি কেবিনে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
লিওন ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
“ওর সঙ্গে সিআইডি টিমের যতো সমস্যা থাকুক, ও যা করেছে তার পর আমি ওকে একবারও না দেখে থাকতে পারব না।”
এসিপি শান্ত গলায় বললেন, “লিওন, তোমার নিজের শরীরের অবস্থাও ভালো নয়।”
“আমি জানি।”
“তাহলে এখন বিশ্রাম নাও।”
লিওন মাথা নাড়ল।
“বিশ্রাম নেব। কিন্তু ওকে দেখার পর।”
তার কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছিল না। বরং ছিলো একটা স্থিরতা।
“ও আমার জীবন বাঁচিয়েছে, স্যার। নিজের জীবন দিয়ে।”
কথাটা বলতে গিয়ে তার গলা সামান্য ভারী হয়ে এলো।
“আমি অন্তত ওর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।”
এসিপি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আর কিছু বললেন না।
লিওন জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাইরে সকালের আলো ধীরে ধীরে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। অথচ তার মনে রাতের সেই দুর্ঘটনাস্থলটাই এখনো আটকে আছে।
একটা কালো স্পোর্টস কার। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকা একটি রক্তাক্ত হাত। আর আকাশ থেকে নেমে আসা একটি ঈগল।
হিয়া এখন কোমায়। আর লিওন জানে, সে যতক্ষণ জেগে আছে, ততক্ষণ নিজের কাছে একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারবে না—যে মেয়েটা তার জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে দ্বিধা করেনি, তার কাছে না গিয়ে সে কীভাবে শান্তিতে থাকবে?
না।
যে বাধাই সামনে আসুক, এবার তাকে হিয়ার কাছে যেতেই হবে।
কেবিনের ভেতর কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইল।
শিরিন হায়াস এতক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ক্রিমিনাল ভাইপারের কথা শোনার পর তার চোখে যে উদ্বেগ ছিল, তার সঙ্গে এবার মিশে গেল এক ধরনের বিস্ময়। তিনি ধীরে ধীরে লিওনের কাছে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসলেন।
“কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, লিওন।”
লিওন মায়ের দিকে তাকাল। শিরিনের কণ্ঠে এবার অস্থিরতা স্পষ্ট।
“ওই কুখ্যাত অপরাধীটা তোকে বাঁচাতে নিজের জীবন এভাবে ঝুঁকির মধ্যে ফেলল কেন?”
অ্যামেলিয়াও এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সেও মায়ের কথায় ভাইয়ের দিকে তাকাল।
“সত্যিই তো, লিওন। ওর মতো অপরাধী যে কিছুদিন আগে তোর জন্য অ্যারেস্ট হলো উল্টো তোকে মেরে ফেলতে চাইবে কিন্তু সে নিজের গাড়ি তোর গাড়ির সামনে নিয়ে গিয়ে এমন কাজ করল কেন?”
লিওন কোনো উত্তর দিল না। চোখ দুটো ধীরে ধীরে নেমে গেল তার হাতের দিকে। মায়ের প্রশ্নের উত্তর তার কাছে আছে কি না, সে নিজেও জানে না। কিংবা হয়তো উত্তরটা জানে, কিন্তু উচ্চারণ করার মতো অবস্থায় এখনো পৌঁছায়নি।
হিয়া তাকে বাঁচিয়েছে। এই সত্যিটা যতবার মনে পড়ছে, ততবারই তার বুকের ভেতর একটা চাপ অনুভূত হচ্ছে।
শিরিন ছেলের নীরব মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে ছেলেকে চাপ দিয়ে কোনো উত্তর বের করা যাবে না।
“ঠিক আছে। এখন এসব নিয়ে ভাবিস না।”
লিওন ধীরে ধীরে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মা, তুমি অ্যামেলিয়া আপুকে নিয়ে বাড়িতে চলে যাও।”
শিরিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ, যাব। তবে বিকেলে আবার আসব।”
একটু থেমে তিনি মৃদু গলায় বললেন, “মায়াকেও সঙ্গে নিয়ে আসব। মেয়েটা সারারাত একটুও ঘুমায়নি। তোর জন্য এত কান্নাকাটি করেছে যে চোখ দুটো ফুলে গেছে।”
লিওনের চোখে মুহূর্তের জন্য কোমলতা ফুটে উঠল।
“ওকে বলো চিন্তা না করতে।”
অ্যামেলিয়া উঠে দাঁড়িয়ে লিওনের দিকে তাকাল।
“তুই ঠিকমতো বিশ্রাম নিবি, লিওন।”
লিওন মৃদু মাথা নাড়ল “হুম।”
শিরিন ছেলের কপালে আলতো করে হাত রাখলেন।
“আমরা যাচ্ছি। ডাক্তার যা বলবে, সব শুনবি। নিজের শরীরের ওপর জোর করবি না।”
“ঠিক আছে, মা।”
মা আর বোন ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজাটা বন্ধ হওয়ার আগে শিরিন আরেকবার ফিরে তাকালেন। ছেলের মুখে অদ্ভুত একটা স্থিরতা দেখে তার বুকের ভেতর আবার অস্বস্তি জেগে উঠল। কিন্তু আর কিছু বললেন না।
কিছুক্ষণ পর এসিপিও উঠে দাঁড়ালেন “তোমার বিশ্রাম দরকার। আমরা বাইরে আছি। কোনো প্রয়োজন হলে জানাবে।”
লিওন মাথা নাড়ল। “জি, স্যার।”
এসিপি বেরিয়ে গেলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
হঠাৎ পুরো কেবিনটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। এতক্ষণ যারা পাশে ছিল, সবাই চলে গেছে। এখন শুধু লিওন আর তার চিন্তাগুলো।
সে ধীরে ধীরে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল। চোখের সামনে আবার সেই রাতটা ভেসে উঠল।
লিওন চোখজোড়া বন্ধ করলো।
“কেন?”
প্রশ্নটা এবার নিজের কাছেই। কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ পর সে চোখ খুলে কেবিনের দরজার দিকে তাকাল। ওই দরজার ওপাশে হাসপাতালের করিডোর।
আর সেই করিডোরের অন্য প্রান্তে কোথাও হিয়া।
কোমায় শুয়ে আছে। দানিয়েলের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে। তার কাছে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
লিওনের চোখ ধীরে ধীরে সরু হয়ে এল। তার ভেতরের তদন্তকারী মনটা আবার কাজ করতে শুরু করল।
দানিয়েল কেন কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না? আর সবচেয়ে বড় কথা—লিওন নিজে কীভাবে ওই কেবিনে ঢুকবে?
সে একবার দরজার দিকে তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে হাসপাতালের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা মাথায় সাজাতে শুরু করল।
কোন পথে কেবিনে যাওয়া যায়? কোন করিডোরে সিআইডির নিরাপত্তা আছে? দানিয়েলের লোকেরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
হিয়াকে দেখতে যাওয়ার জন্য তাকে কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই—এই সিদ্ধান্তটা তার মাথায় ইতিমধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছে।
কিন্তু সরাসরি গেলে তাকে আটকে দেওয়া হবে।
তাই অন্য কোনো পথ খুঁজতে হবে। লিওন ধীরে ধীরে নিজের চোয়াল শক্ত করল। তার শরীর এখনো দুর্বল। মাথায় ব্যথা করছে। কয়েকদিন আগের দুর্ঘটনার আঘাত পুরোপুরি সেরে ওঠেনি।
তবুও তার মনে এখন একটাই চিন্তা। যেভাবেই হোক, তাকে ওই কেবিনে পৌঁছাতে হবে।
কারণ হিয়ার চোখ এখন বন্ধ। কিন্তু লিওনের মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে তার নিজের চোখও বন্ধ করে বসে থাকার অধিকার নেই।
কিছুক্ষণ পর কেবিনের দরজায় হালকা শব্দ হলো। একজন নার্স হাতে কিছু ওষুধ নিয়ে ভেতরে ঢুকল। লিওন তখন জানালার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বসে ছিল। নার্সকে দেখেই তার দৃষ্টি ঘুরে এলো।
“একটা কথা বলব?”
নার্স ওষুধগুলো টেবিলের ওপর রেখে এগিয়ে এলো। “জি, স্যার।”
লিওন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “পাশের করিডোরের কেবিনে যেতে চাই।”
নার্সের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল। সে মাথা নেড়ে বলল, “স্যার, ওই কেবিনে এখন যাওয়া যাবে না।”
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“কেন?”
“ওই কেবিনের জন্য আলাদা নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। কাউকে ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। এমনকি হাসপাতালের স্টাফদেরও প্রয়োজন ছাড়া যেতে নিষেধ করা হয়েছে।”
লিওন ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে বসার চেষ্টা করল। মাথায় এখনো ব্যথার ভার, শরীরজুড়ে দুর্ঘটনার ক্ষতচিহ্ন। তবু তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো দুর্বলতা নেই।
“লিসেন,” কণ্ঠটা এবার কঠিন হয়ে উঠল, “আমি একজন সিআইডি অফিসার। এই হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনি যতটা জানেন, তার চেয়ে বেশি আমি জানি। আমার কথা অমান্য না করে যা বলছি, সেটা করুন।”
নার্স একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। “কিন্তু স্যার…”
“সরাসরি ওই কেবিনে যাব না।”
নার্স অবাক হয়ে তাকাল।
লিওন এবার ধীরে ধীরে বলল, “আমি ছদ্মবেশে যাব।”
“ছদ্মবেশে?”
“হ্যাঁ।”
তারপর এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল, “আমার জন্য একজন ডক্টরের ড্রেস আনুন।”
নার্সের চোখ বড় হয়ে গেল। “স্যার, আপনি এই অবস্থায় ডক্টর সেজে যাবেন?”
লিওনের ঠোঁটে ক্ষীণ একটা কঠিন হাসি ফুটে উঠল।
“আমার শরীরের কন্ডিশন নিয়ে চিন্তা করবেন না।”
“কিন্তু স্যার, আপনার মাথায় এখনো আঘাত আছে। আপনি ঠিকমতো হাঁটতেও পারছেন না। ডক্টরের ড্রেস পরে ওই কেবিন পর্যন্ত যাওয়াটাও আপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”
লিওন কয়েক মুহূর্ত নার্সের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর, অথচ এমন এক দৃঢ় কণ্ঠে বলল, যার পর আর কোনো যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন—“I’m fine.”
একটু থেমে আবার বলল, “বাট যা বলছি, সেটা করুন।”
নার্স চুপ করে রইল। লিওনের চোখে তখনও একটা অস্থিরতা। পাশের করিডোরের সেই কেবিনের দরজার ওপারে শুধু একজন আহত নারী শুয়ে নেই—তার নিজের সমস্ত অস্থিরতার উত্তর সেখানে অপেক্ষা করছে।
“আমি ডক্টর সেজেই ওই কেবিনে যাব।”
নার্স এবার নিচু গলায় বলল, “স্যার, যদি কেউ দেখে ফেলে?”
লিওনের চোখ দুটো আরও কঠিন হয়ে উঠল।
“দেখলে সামলানোর দায়িত্ব আমার।”
নার্স আর কিছু বলল না। কয়েক সেকেন্ড দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে, স্যার।”
নার্স দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক বের হওয়ার আগে আবার ফিরে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকবেন না।”
লিওন কোনো উত্তর দিল না। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
কেবিনে আবার নীরবতা নেমে এলো। লিওন ধীরে ধীরে নিজের হাতের দিকে তাকাল। তারপর চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
সামনের সেই গাড়ি…রক্তাক্ত হাত…
দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া স্পোর্টস কার…আর সেই ঈগল—
সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা আবার ভারী হয়ে উঠল। হিয়া ইচ্ছে করে তার সামনে গাড়িটা থামিয়েছিল। নিজেকে মৃত্যুর সামনে দাঁড় করিয়ে তাকে বাঁচিয়েছিল। এখন সেই মেয়েটাই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।
আর লিওন এই কেবিনে শুয়ে থেকে শুধু অপেক্ষা করবে?
অসম্ভব।
যেভাবেই হোক, তাকে হিয়ার কাছে পৌঁছাতেই হবে।
নার্স কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সরাসরি হাসপাতালের এক ডাক্তারের কাছে গেল। কয়েক মিনিট পর দুজনকে করিডোরের একপাশে নিচু গলায় কথা বলতে দেখা গেল।
নার্স পুরো বিষয়টা ডাক্তারকে জানাতেই তিনি কিছুক্ষণ নীরবে ভাবলেন। তারপর দৃষ্টি তুলে নার্সের দিকে তাকালেন।
“উনি লন্ডনের একজন পরিচিত টপ সিআইডি অফিসার। নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছাড়া এমন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।”
নার্স ধীরে মাথা নাড়ল। ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন।
“ঠিক আছে। তবে উনার শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় রাখবেন। বেশি সময় যেন দাঁড়িয়ে না থাকেন।”
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার নিজের সাদা কোট খুলে দিলেন। সঙ্গে নিজের হাসপাতাল আইডি কার্ড এবং একটি সার্জিক্যাল মাস্কও এগিয়ে দিলেন নার্সের হাতে।
“এগুলো নিয়ে যান।”
নার্স দ্রুত সেগুলো নিয়ে লিওনের কেবিনে ফিরে এলো।
লিওন কোনো কথা না বলে ডাক্তারের পোশাকগুলো হাতে নিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজের পোশাক বদলে সাদা কোটটা গায়ে চাপিয়ে নিল সে। বুকের কাছে হাসপাতালের আইডি কার্ডটা লাগিয়ে নিল। তারপর মাস্কটা মুখে পরতেই তার চেহারার বেশিরভাগটাই আড়াল হয়ে গেল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজেকে দেখে নিল লিওন। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বের হওয়ার ঠিক আগে সে থেমে নার্সের দিকে তাকাল।
কণ্ঠটা নিচু, কিন্তু সতর্কতায় কঠোর। “একটা কথা মনে রাখবেন।”
নার্স চুপচাপ তাকিয়ে রইল। “এই ব্যাপারটা আপনি, আমি আর ডাক্তাররা ছাড়া আর কারও কানে গেলে ভালো হবে না ফল।”
নার্সের মুখে সামান্য ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল।
“জি, স্যার। কাউকে বলব না।”
লিওন আর কোনো কথা বলল না। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো সে। হাসপাতালের পাশের করিডোরে তখনও নিরাপত্তা কড়া। দানিয়েলের পুরো টিম আর গার্ডরা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। লিওন মাথা সামান্য নিচু করে স্বাভাবিক ডাক্তারের মতো ধীর পায়ে এগিয়ে চলল।
মাস্কের আড়ালে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। বুকের ভেতর শুধু অস্বাভাবিক দ্রুততায় হৃদস্পন্দন চলছে।
আর কয়েক পা এগোলেই সেই কেবিন।যেখানে শুয়ে আছে হিয়া। অবশেষে কেবিনের সামনে এসে থামল লিওন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নিরাপত্তারক্ষীদের দিকে একবার তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। তারপর দরজার হাতলে হাত রাখল।
এক মুহূর্তের জন্য তার হাত থেমে গেল।
কী অবস্থায় আছে হিয়া?
এই প্রশ্নটাই বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী করে তুলল।
লিওন ধীরে ধীরে দরজাটা খুলল। খুব আস্তে পা বাড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গেল সে। দরজাটা পেছনে নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল। কেবিনের ভেতরটা অস্বাভাবিক শান্ত। শুধু মেশিনের নিয়মিত শব্দ ভেসে আসছে।
লিওনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে সামনে উঠল।আর পরের মুহূর্তেই সে থমকে দাঁড়াল। সাদা বিছানার ওপর নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে হিয়া। মাথায় কড়া ব্যান্ডেজ। কপালের একপাশে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে হয়ে আছে আর চারপাশে বিভিন্ন মেডিক্যাল যন্ত্র, শরীরের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য তার আর নল।
লিওন কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল। তার চোখের সামনে থাকা এই মেয়েটাই কয়েক ঘণ্টা আগে নিজের জীবনকে বাজি রেখে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছে।
আজ সেই হিয়া নিজেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। লিওনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ধীরে ধীরে আরও কয়েক পা এগিয়ে গেল। তার চোখ আটকে রইল হিয়ার মুখে। মাস্কের আড়াল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো একটা দীর্ঘশ্বাস।
“হিয়া…”
কণ্ঠটা এতটাই নিচু যে মেশিনের শব্দের মধ্যেও প্রায় হারিয়ে গেল।
লিওন বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী আজ এতটা অসহায় হয়ে তার সামনে শুয়ে আছে—এই দৃশ্যটা কোনোভাবেই তার পরিচিত বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।
আর তখনই তার মনে হলো, হিয়ার সঙ্গে তার যত হিসাব, যত রাগ, যত প্রশ্নই থাকুক না কেন—এই মুহূর্তে সেসবের কোনোটারই মূল্য নেই।
কারণ তার সামনে শুধু একজন আহত মানুষ শুয়ে আছে। আর সেই মানুষটা তাকে বাঁচাতে নিজের জীবনটাই দিয়ে দিয়েছে।
লিওন ধীরে ধীরে পাশের চেয়ারটা টেনে বিছানার কাছে নিয়ে বসল। তারপর মুখের মাস্কটা খুলে পাশে রেখে দিল। কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা না বলে শুধু তাকিয়ে রইল হিয়ার দিকে।
যে মুখটা সবসময় তীক্ষ্ণ আত্মবিশ্বাসে ভরা থাকে, সেই মুখ আজ অস্বাভাবিক শান্ত। চোখ দুটো বন্ধ। কপালজুড়ে ব্যান্ডেজের নিচে লুকিয়ে আছে দুর্ঘটনার নির্মম চিহ্ন। মেশিনের নিয়মিত শব্দই কেবল জানান দিচ্ছে—সে এখনো এই পৃথিবীর সঙ্গে কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।
লিওনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। কিন্তু হিয়া কিছুই জানে না। সে তখন বাস্তব পৃথিবীর অনেক দূরে, নিজের কোমার অন্ধকারে ডুবে আছে।
সেখানে কোনো হাসপাতাল নেই। নেই মেশিনের শব্দ।
নেই রক্তাক্ত শরীর। আর নেই লিওন। শুধু একটা দীর্ঘ নীরবতা সেখানে।
আর সেই নীরবতার ভেতর ধীরে ধীরে ভেসে উঠল কয়েকটা পরিচিত মুখ।
বাবা…
মা…
আর তার ছোট ভাই অন্তর…
হিয়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
এত বছর পরও সেই মুখগুলো তার স্মৃতিতে এতটাই জীবন্ত। মনে হলো, একটু হাত বাড়ালেই হয়তো ছুঁয়ে দিতে পারবে তাদের। হিয়া কোমায় থাকা অবস্থাতেই যেন নিজের ভেতর ফিসফিস করে উঠল—
‘হয়তো এবার সময় হয়েছে।’
হয়তো এবার সত্যিই ফিরে যাওয়ার সময়।
যাদের জন্য এত বছর বেঁচে ছিল, যাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিজের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য করে নিয়েছিল, তাদের কাছেই হয়তো এবার ফিরে যাওয়া উচিত।
তার বাবা। একজন আদর্শ সিআইডি অফিসার।
যে মানুষটা নিজের কর্তব্য আর সততার জন্য জীবন দিয়েছিল।
তার মা। আর ছোট ভাই অন্তর।
যাদের কাউকেই সে বাঁচাতে পারেনি।
হিয়া পারেনি। সে সেদিনও পারেনি তাদের মৃত্যুকে থামাতে। আজও পারেনি নিজের জীবনটাকে স্বাভাবিক করতে। তার ভেতর থেকে একটা ভাঙা স্বর উঠে এলো—
‘আমি তোমাদের বাঁচাতে পারিনি।’
‘আমি একজন অক্ষম মেয়ে ছিলাম।’
‘তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি সেদিন আমি।’
কিন্তু পরক্ষণেই আরেকটা স্মৃতি তার ভেতর আলো হয়ে জ্বলে উঠল। সেদিন সে নিজে বেঁচে গিয়েছিল।
কেন?
হয়তো আল্লাহ তাকে সেদিন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন একটা উদ্দেশ্য নিয়ে। তার বাবার অসমাপ্ত লড়াই শেষ করার জন্য। তার পরিবারের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। যারা তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল, তাদের একে একে শেষ করার জন্য।
সেই কারণেই হয়তো মৃত্যুও সেদিন তাকে নিতে পারেনি। হিয়া এত বছর ধরে সেই বিশ্বাস নিয়েই বেঁচে ছিল।
প্রতিশোধ। একটা একটা করে হিসাব মেলানো।
একটা একটা করে শত্রুকে শেষ করা। আর আজ?
আজ মনে হচ্ছে সেই হিসাবের শেষ পাতাটাও হয়তো প্রায় লেখা হয়ে গেছে। তাহলে আর কী বাকি?
হিয়ার ভেতরের অন্ধকারটা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে এলো ‘হয়তো আল্লাহ এবার আমাকে ফিরিয়ে নিতে চাইছেন।’
‘হয়তো বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে।’
কোনো ভয় নেই। কোনো কান্নাও নেই।
শুধু এক ধরনের ক্লান্তি। অসংখ্য বছর ধরে বয়ে নিয়ে চলা ক্লান্তি। তারপর হঠাৎ একটা মুখ সেই অন্ধকারের ভেতর এসে দাঁড়াল।
লিওন।
হিয়ার বুকটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। তারপর নিজের মনেই যেন একটা তিক্ত হাসি ফুটল।
‘লিওন তো আমাকে ভালোবাসে না।’
‘সে আমাকে ঘৃণা করে।’
‘আমি তার চোখে একজন অপরাধী।’
‘আমার মতো কাউকে সে কোনোদিন ভালোবাসবে না।’
এই একটা চিন্তাই তার ভেতরের শেষ আশাটুকুও নিভিয়ে দিল।
তাহলে?
যদি পৃথিবীতে তার জন্য ভালোবাসা না থাকে…
যদি প্রতিশোধের পথও প্রায় শেষ হয়ে যায়…যদি যাদের জন্য এতদিন বেঁচে ছিল, তারা ওপারে অপেক্ষা করে থাকে—তাহলে এই পৃথিবীতে ফিরে আসার কারণটা কী?
হিয়ার চারপাশের অন্ধকার ধীরে ধীরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিতে লাগল।
একদিকে জীবন। অন্যদিকে মৃত্যু। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। কোনটা বেছে নেবে?
হিয়া জানে না। তবু অন্ধকারের ভেতর থেকে বাবা-মায়ের মুখগুলো যেন তাকে ডাকছে।
‘ফিরে আয় মা…’
হিয়ার মনের গভীর থেকে একটা অস্ফুট উত্তর বেরিয়ে এলো—‘আমি আসছি বাবা।’
ঠিক তখনই অন্ধকারের সেই স্বপ্নের ভেতর আবার লিওনের মুখটা ভেসে উঠল।
কঠোর চোখজোড়া। অভিমানী মুখ। আর সেই মানুষটাকেই বাঁচানোর জন্য তো সে নিজের জীবনটাকে মৃত্যুর সামনে রেখে দিয়েছিল।
হিয়া কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মনে হলো—হয়তো শেষবারের মতো একটা কাজ সে ঠিকই করেছে।
যাকে সে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো, যে তাকে ঘৃণা তীব্র করত—সেই মানুষটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
এবার হয়তো তার নিজের ফিরে যাওয়ার পালা।
জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে হিয়ার মন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকেই ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু কোথাও খুব গভীরে, অন্ধকারের একেবারে শেষ প্রান্তে, ক্ষীণ একটা আলো এখনো জ্বলছিল। সে আলো হয়তো কোনো অসমাপ্ত প্রতিশোধের নয়।
হয়তো কোনো অপ্রকাশিত ভালোবাসার। হয়তো এমন একজন মানুষের, যে এখন তার বিছানার পাশে বসে নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু হিয়া সেই আলোটা এখনো দেখতে পাচ্ছে না।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজাটা ধীরে খুলে গেল। ডাক্তার হাতে কয়েকটা রিপোর্ট নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
লিওন সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এতক্ষণ যে স্থিরতা ছিল, মুহূর্তেই সেখানে উৎকণ্ঠা নেমে এলো।
—ডক্টর…
ডাক্তার থেমে তার দিকে তাকালেন। লিওনের গলা শুকিয়ে এসেছে।
—ওর কি জ্ঞান ফিরবে না?
কয়েক সেকেন্ড ডাক্তার কোনো উত্তর দিলেন না। তারপর ধীরে ধীরে রিপোর্টগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন—
—কোমায় থাকা কোনো রোগীর জ্ঞান ফেরার নির্দিষ্ট সময় আমরা বলতে পারি না, মিস্টার লিওন। কারও একদিনে জ্ঞান ফিরে আসে, কারও কয়েকদিন লাগে। আবার কেউ মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও কোমায় থাকতে পারে।
লিওনের ভ্রু কুঁচকে গেল। —তাহলে ওর ক্ষেত্রে?
ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সমস্যাটা সেখানেই।
লিওন নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল।
—কোমায় যাওয়ার পর থেকে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ওনার শারীরিক অবস্থা আমরা যতটা সম্ভব স্থিতিশীল রাখছি। কিন্তু একটা বিষয় আমাদের চিন্তায় ফেলছে।
—কী?
—উনি নিজের থেকে কোনো নিউরোলজিক্যাল রেসপন্স দিচ্ছেন না।
লিওনের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। —মানে?
—মানে, মস্তিষ্কের কিছু কার্যকলাপ আমরা পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু উনি আমাদের প্রত্যাশামতো কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিচ্ছেন না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াগুলোও খুব দুর্বল।
ডাক্তার একটু থামলেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
—আমি আপনাকে একটা কঠিন কথা বলব। তবে এটা এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
লিওন চুপ করে রইল।
—আমাদের মনে হচ্ছে, ওনার ভেতরে বেঁচে থাকার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াটা হারিয়ে গেছে।
লিওনের চোখ ধীরে ধীরে হিয়ার দিকে চলে গেল।
—আপনি বলতে চাইছেন…?
ডাক্তার এবার নিচু স্বরে বললেন—
—কখনো কখনো গুরুতর মানসিক আঘাত, দীর্ঘদিনের ট্রমা কিংবা তীব্র মানসিক ক্লান্তির সঙ্গে শারীরিক অবস্থাও জড়িয়ে যেতে পারে। আমরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে এটাকে ব্যাখ্যা করি না। কিন্তু এই পেশেন্টের ক্ষেত্রে তার শরীর এবং মস্তিষ্ক যেভাবে চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছে না, তাতে আমাদের মনে হচ্ছে… তার ভেতরে ফিরে আসার কোনো উদ্দীপনাই নেই।
লিওন স্থির হয়ে গেল।
ডাক্তার আবার বললেন—
—সহজ ভাষায় বললে,সে এখন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে আটকে আছে। আর তার ভেতরের পুরো অংশ যদি মৃত্যুর দিকেই ঝুঁকে থাকে, তাহলে আমাদের কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়।
লিওনের গলা ভারী হয়ে এলো। —তাহলে আমরা কী করতে পারি?
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
—চিকিৎসা আমরা চালিয়ে যাব। কিন্তু শুধু ওষুধ, মেশিন আর মেডিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে সবসময় একজন মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না আর উনি নিজেই সালভাইব করতে চাচ্ছেনা যার করালে সে পর্যাপ্ত রেসপন্স করছেনা।
লিওন তাকিয়ে রইল বুঝতে পারছেনা কি বলবে সে এই মুহূর্তে। ডক্টর পুনরায় বললেন
—কখনো কখনো রোগীর বেঁচে থাকা জন্য একটা কারণ দরকার হয়। এমন একটা কারণ, যার জন্য তার মস্তিষ্ক, তার শরীর… ফিরে আসার চেষ্টা করবে।
ডাক্তারের দৃষ্টি এবার হিয়ার দিকে গেল।
—আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, তার সেই কারণটাই খুঁজে বের করা খুব জরুরি।
লিওনের বুকের ভেতর যেন কথাটা গিয়ে আঘাত করল।
—কী ধরনের কারণ?
—যেকোনো কিছু।
ডাক্তার ধীরে বললেন—
—কোনো মানুষ। কোনো অসমাপ্ত কাজ। কোনো স্মৃতি। কোনো প্রতিশ্রুতি। বা কোনো ভালোবাসা। এমনকি কোনো একটা কথাও হতে পারে।
একটু থেমে তিনি যোগ করলেন—
—যে কারণটা তাকে মনে করিয়ে দেবে, তার জীবনের গল্পটা এখনো শেষ হয়নি।
লিওনের চোখ আবার হিয়ার মুখে আটকে গেল।
নিস্তব্ধ সেই মুখ, বন্ধ চোখজোড়া আর শান্ত ঠোঁট।
মনে হচ্ছে পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গেই তার আর কোনো সম্পর্ক নেই।
ডাক্তার ধীরে বললেন—
—আর একটা কথা… এই বিষয়টা এখন পর্যন্ত আমি ওনার টিমের কাউকে বলিনি।
লিওন জিজ্ঞেস করলো —কেন?
ডক্টর তখন জানালো —কারণ ওনার লোকজন এমনিতেই প্রচণ্ড উত্তেজিত অবস্থায় আছে। তার ওপর আমাকে ইতিমধ্যে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তারা যদি জানতে পারে যে রোগীর অবস্থা আমাদের প্রত্যাশামতো উন্নতি করছে না, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ডাক্তার রিপোর্টগুলো গুছিয়ে নিলেন।
—তাই আপাতত শুধু এটুকুই বলছি—আমরা চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তাকে শুধু মেডিক্যালি নয়, মানসিকভাবেও ফিরে আসার একটা কারণ দিতে হবে।
লিওন কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি তখনও হিয়ার ওপর। ডাক্তারের শেষ কথাটা তার মাথার ভেতর বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—‘ওর জীবনের গল্প এখনো শেষ হয়নি।’
লিওন ধীরে ধীরে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল।
হিয়ার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিল। ঠান্ডা আঙুলগুলো শক্ত করে ধরে খুব নিচু স্বরে বলল—
আম ইন লাভ উইথ আ ক্রিমিনাল পর্ব ৩১
—তাহলে তোমাকে একটা কারণ দিতেই হবে, হিয়া।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। —তুমি ফিরে আসবে।
—যেভাবেই হোক… তোমাকে ফিরে আসতেই হবে।
কারণ এবার প্রথমবারের মতো লিওনের মনে হলো—
হিয়াকে বাঁচানোর লড়াইটা শুধু ডাক্তারদের নয়। এটা তার নিজেরও যুদ্ধ।
