Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৬৫

আমার আলাদিন পর্ব ৬৫

আমার আলাদিন পর্ব ৬৫
জাবিন ফোরকান

কোর্টের নিস্তব্ধতা ভাঙছে শুধুমাত্র ইযানের ক্রন্দনধ্বনি। সবার মনোযোগ এখন বাচ্চাটার উপর আবদ্ধ যে নিজের পিতার কাছে যাওয়ার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছে। ইরাম ছেলেকে বুকে চেপে ধরে শান্ত করতে চাইল,
“না না, আমার আব্বুটা, আমার কুচুপু, এইযে আম্মু এখানেই আছে তোমার সাথে। কাদে না বাবাটা।”
“বা…আম…বা!”
কিন্তু ইযানকে শান্ত করা গেলনা। ছটফট করছে সে, বারংবার হাত পা ছুঁড়ছে। এতক্ষণ যাবৎ দৃশ্যটার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা সাইবান এবার চোখের পলক ফেলল। টের পেল তার চোখে আর্দ্রতা জমেছে। তবে সকল অনুভূতিকে আপাতত তুচ্ছ করে সে কাঠগড়া থেকে নেমে এলো। তাকে কেউ বাঁধা দিলনা। না তো প্রশ্ন করল। দুবাহু বাড়িয়ে ইরামের দিকে ইশারা করল সে। ইরাম এক নজর জজ সাহেবার দিকে চেয়ে কোনো বাঁধা না পেয়ে উঠে গেল। সাইবানের কাছে যেতেই কোলে থাকা ইযান ছোট্ট হাত দুখানা বাড়িয়ে পিতার পরনের টি শার্ট আঁকড়ে ধরল। সাইবান তৎক্ষণাৎ ছেলেকে কোলে নিয়ে বুকে চেপে ধরল। এক হাতে ছোট ঘাড়টা ধরে মাথার উপর গাঢ় একটা চুমু দিয়ে ফিসফিস করল,

“এইতো আব্বু, বাবা এখানে। বাবা তোমার কাছেই আছে। বাবা ভালো আছে, কাঁদেনা আমার আব্বু। তুমি কাঁদলে বাবার কষ্ট কমে না যে, দ্বিগুণ হয়।”
কেউ হস্তক্ষেপ করলনা। সবার দৃষ্টি অদ্ভুত মনোরম দৃশ্যটায় আটকে রইল। যেন আবেগে বোনা কোনো উপন্যাস, যার শব্দচয়ন থেকে চোখ ফেরানো দুষ্কর। এক অযোগ্য পিতা, যার সঙ্গে র*ক্তের সম্পর্ক পর্যন্ত নেই, তার জন্য নিষ্পাপ এক শিশুর নিগূঢ় আবেদন যদি কারো হৃদয়ে নাড়া দেয়, তবে হয়ত সে আসলেই পাথরমানব। প্রত্যেক জোড়া দৃষ্টির অন্তরালে, সিলভার রিমের চশমায় ঢাকা চোখজোড়া একটু বেশিই জ্বলজ্বলে। বেঞ্চে বসা অরণ্য নির্বাক চেয়ে আছে। দেখছে নিজের সন্তানকে অন্য কোনো পুরুষের বুকে পিতার আশ্রয় খুঁজে নিতে। স্থানটা তার হওয়ার কথা ছিল, তার বুকে ওই ছোট্ট শিশুর আদর খোঁজার কথা ছিল। যেদিন সে প্রথম ইযানকে কোলে নিয়েছিল, সেদিনও নবজাতক তারস্বরে কেঁদেছিল। তবে সেই কান্না আর আজকের কান্নার মাঝে সহস্র পার্থক্য। সেদিন বাচ্চাটা কেঁদেছিল তার রুক্ষ স্পর্শের যন্ত্রণায়, আর আজ বাচ্চাটা কাঁদছে পিতা বলে ভাবা এক সম্পর্কহীন পুরুষের মরম ব্যথায়। এটাই কি ভাগ্য? ভাগ্য এত নিষ্ঠুর কেন? অরণ্য জানেনা তার চোখদুটো হুট করে কেন ঝাপসা হলো। কি আশ্চর্য্য! সে তো ইরামকে হাসিল করতে এসেছিল! তাহলে বুকের ভেতর এমন শক্ত টানের অর্থ কি? বাম পাশটায় এত ব্যথা হচ্ছে কেন?

ইযান সাইবানের বুকে যেতেই অনেকখানি শান্ত হয়েছে। তার কাঁধের উপর নিজের ছোট মাথাটা রেখে ক্ষণে ক্ষণে নাক টানছে। ইরাম পিছন থেকে নিজের ওড়না তুলে ছেলের মুখ মুছিয়ে দিল সযত্নে। তার নিজের চোখজোড়াও কেমন যেন ভেজা ভেজা ঠেকছে। অদ্ভুত! এই অনুভূতি এত অদ্ভুত কেন? সমস্ত কোর্টে হয়ত এমন একটা মানুষ এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার অন্তর বিষণ্নতা ছোঁয়নি। গাঢ় আর্দ্র নীরবতা ভাঙল সাইবান। ইযানকে বুকে চেপেই এক পা সামনে এগোল সে। দৃষ্টি রাখল জজ সাহেবার উপর। তার কণ্ঠ সামান্য একটু কাঁপল, যখন সে বলতে শুরু করল,
“ইওর অনার, আমি দোষী। আমার দোষ এটাই যে আমি আইনের আগে নিজের পরিবারের পরোয়া করেছি। হ্যাঁ, আমি এই বাচ্চাটার জৈবিক পিতা নই। আমি ওকে জন্ম দেইনি। ওর শরীরে আমার একফোঁটা র*ক্ত নেই। অথচ যদি নিজের বুকটা চিরে দেখানো যেত, তবে আমি আপনাদের সবাইকে দেখাতাম এই নাজুক বাচ্চাটাকে আমি কত ভালোবাসি।”

শক্ত একটি ঢোক গিলল সাইবান। তার বুকে ইযান আসতেই ভেতরের দানবটা শান্ত হয়ে পড়েছে। শীতলতা অনুভূত হচ্ছে, সঙ্গে নিগূঢ় প্রশান্তি। তাকাল সে অর্চির দিকে, যে বিনা বাক্য ব্যয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ কিছুক্ষণ আগেও যুক্তি তর্কের বাঁধনে সাইবানকে ফাঁদে ফেলতে তৎপর ছিলেন। সাইবান এবার দৃঢ় গলায় বলল,
“যদি শুধু জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যেত তাহলে পৃথিবীর শত সহস্র বাচ্চা ভাঙাচোরা শৈশব পেতনা। নয় মাস! নয়টা মাস এই শিশুটি বাবা বলে অন্য এক পুরুষকে চিনেছে। কেন? এটা কার দোষ? আমার নাকি সমাজের? কার? কোথায় ছিল ওর বাবা যখন ওর মা সামান্য খাবার আর ওষুধ জোগাড়ের আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে চাকরি ভিক্ষা চাইছিল? কোথায় ছিল ওর বাবা যখন ওর মাকে আশ্রয় না পেয়ে নিজের ভাইয়ের বাড়ি থেকেই বাচ্চা বুকে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে হয়েছিল? কোথায় ছিল ওর বাবা যখন ওর মা বাচ্চার ভরণপোষণের জন্য নিজের অতীতের আঘাত বুকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছিল? কোথায় ছিল অরণ্য মির্জা সওদাগর? হোয়্যার? আই ডিড নট সি হিম দেয়ার!”
তীক্ষ্ণ চোখে অরণ্যর দিকে তাকাল সাইবান। অথচ অরণ্য মাথা কাত করে কোনো এক অজানা দিকে চেয়ে আছে। তবে প্রত্যেকটা কথাই তার কানে গিয়েছে স্পষ্ট। সাইবান কর্কশ গলায় যা বলল তা প্রতিধ্বনিত হলো পুরাতন ফাইলের ঘ্রাণযুক্ত বাতাসে,

“আজ যখন বাচ্চাটা সুখে আছে, ওর মা সুখে আছে, সমাজে মাথা উঁচু করে নিজেদের পরিচয় নিয়ে গৌরবে বাঁচতে পারছে, তখনি ওনার মনে পড়ল যে বাচ্চাটা ওনার? ওনারও অধিকারবোধ আছে? এই অধিকারবোধ এতকাল কোথায় ছিল যখন ওনার বাচ্চা আর তার মাকে সমাজে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাওয়া হচ্ছিল? এই শিশুর জন্মপরিচয় কি? তার বাবা কোথায়? মা কেমন সন্তান জন্ম দিয়েছে যে বাবা খোঁজ পর্যন্ত নেয়না? জার*জ বাচ্চা নয়তো! এত সব আঘাতে জর্জরিত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য ওনাকে কোনোদিন পাওয়া যায়নি। তবুও আজ তিনি এই বাচ্চার জৈবিক পিতা আর আমি অযোগ্য কারণ একটা সার্টিফিকেট! যা করেছি তা নিয়ে আমার গর্ববোধ নেই। ওই সময়ে দাঁড়িয়ে এই বাচ্চাটার বর্তমান, ভবিষ্যৎ, জন্মপরিচয় নিশ্চিত করতে আমার কাছে লিগ্যাল ওই একটাই উপায় ছিল। বিরাট ভুল করেছি, হয়ত করেছি। ইওর অনার যে সিদ্ধান্ত দেবেন তা আমি মাথা পেতে নেব। তবে এটুকু বলতে চাই, শুধু জন্ম দিলেই বাবা হওয়া যায়না। আর বাবা শুধুমাত্র একটা শব্দও না বরং দায়িত্ব। উকিল ম্যাম ঠিকই বলেছেন, বাবা শব্দটা সবার জন্য নয়, জৈবিক পিতার জন্যও নয়! দ্যাটস অল, ইওর অনার।”
একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল সাইবান। দুহাতে বুকের ভেতর ইযানকে আরেকটু শক্তভাবে চেপে মুখ নত করে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রথম কয়েক সেকেন্ড কেউ টু শব্দ অবধি করলনা। অতঃপর ফারহানা নিজের কন্ঠ পরিষ্কার করলেন। দমবন্ধকর উত্তেজনার মাঝে সবার প্রায় নাজেহাল হলেও তিনি প্রথমটায় যেমন শান্ত ছিলেন এখনো তেমন আছেন। চোখে নিগূঢ় নিরীক্ষণ ছাড়া কোনো সহানুভূতি বা মায়া দেখা গেলনা তার। চশমা খুলে কাগজে কিছু লিখতে লিখতে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

“দ্যা কোর্ট হ্যায টেকেন নোট অব দ্যা চাইল্ড’স রেসপন্স।”
এরপর এক লহমা থেমে তিনি যুক্ত করলেন,
“আদালতের নিকট উপস্থাপিত নথি ও উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনার পর সংশ্লিষ্ট জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হলো, শিশুটির জন্মনিবন্ধনে পিতার নাম সংক্রান্ত তথ্য আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। শিশুটিকে পরবর্তী শুনানিতে উপস্থিত করার প্রয়োজন হবে না।”
পরবর্তী শুনানির তারিখ দেয়া হলো এক মাস পরের। বেশ লম্বা একটা সময়। কোর্টের পরবর্তী মামলাগুলো ডাকা হলো একের পর এক, অথচ ইরাম আর অরণ্যর মামলার প্রভাব থেকে বেরোনো যেন দুষ্কর।

কিছুক্ষণ পর।
শিশির চৌধুরী ইরাম আর সাইবানের সঙ্গে বেশকিছু আলোচনা করে বিদায় নিলেন। কথাগুলো এমন ছিল যে সাইবান বিশাল বড় ভুল করেছে আর আজ শুধুমাত্র ইযানের প্রতিক্রিয়ায় বেঁচে গিয়েছে। অন্যথায় বাদী পক্ষ খুব সহজেই সাইবানকে ফুঁসলিয়ে উত্তেজিত করে বেফাঁস তথ্য আদায় করে নিতে পারত। ইরাম আর সাইবান কিছুই বললনা। শুধু চুপচাপ হজম করল সবকিছু। এটুকু বুঝল, এখন থেকে তাদের পা ফেলতে হবে খুব সাবধানে। শিশির চলে যাওয়ার পর অনুরাগ আর নীরব তাদের সঙ্গে সঙ্গে এগোল গাড়ির দিকে। তখনি অপ্রত্যাশিত এক ব্যক্তিকে দেখা গেল। কোর্টের বাইরে নিজের বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলে লাফাচ্ছে আফনান। বাইক নতুন কিনেছে সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বন্ধুদের আসতে দেখে সে ছুটে এলো,

“কি ব্যাপার? কেমন হলো?”
সকলের চেহারায় কালো ছায়া দেখে আফনানের উচ্ছ্বাস চাপা পড়ল। অনুরাগ এগিয়ে বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে সামনে এগিয়ে নিল,
“চল, আমি বলছি। তাছাড়া তুই কাজ ফেলে এসেছিস কেন?”
বলতে বলতে অনুরাগ, আফনান আর নীরব সামনে এগোল। পিছনে ইরাম আর সাইবান। ইযান এখনো সাইবানের কোলেই আছে। সকাল থেকে এতকিছু হয়ে যাওয়ার পর কেঁদেকেটে এখন ক্লান্ত সে। তাই পিতার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুঁজে আছে। তার ছোট শরীরটা ভারী লাগছে, বোধ হয় ঘুমিয়েছে। তাই সাইবান সাবধানে তাকে বুকের ভেতর আরেকটু নরমভাবে আগলে নিল।
“কবিতা?”

পিছন থেকে ডাকটা কানে যেতেই জমে গেল ইরাম। সাইবানও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উভয়ে ঘুরে তাকাতেই অদূরে দন্ডায়মান অরণ্যকে দেখতে পেল। প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো কেমন এলোমেলো। চশমার আড়ালে চোখজোড়া ক্ষীণ লালচে দেখাচ্ছে। সুদর্শন চেহারায় সূক্ষ্মতর মলিনতার ছাপ। আশেপাশে অর্চি কিংবা বাদী পক্ষের কোনো উকিল নেই। অরণ্য একাই দাঁড়িয়ে আছে, ঝড়ে ভেঙে পড়া বিধ্বস্ত উদ্ভিদের মতন। সাইবানের ভ্রু কুঁচকে গেল। তীব্র রাগ অনুভব করল সে। তবে এবার তাকে ওই লোককে মোকাবেলা করতে দিলনা ইরাম। সাইবানের বাহুতে হাত রেখে ইশারায় শান্ত থাকতে বলল। এগিয়ে গেল নিজে, পায়ে পায়ে, কোনো দ্বিধা ছাড়াই। ইরামের মধ্যকার নমনীয় ভাবটা গায়েব হয়ে গিয়েছে। তাতে এখন আত্মপ্রত্যয় প্রকাশ পাচ্ছে। অরণ্যও এগিয়ে এলো, মাঝপথে মিললো দুজনে। ইরাম এক হাতের বেশি দূরত্ব রেখে দাঁড়াল অরণ্যর সামনে। চোখে চোখে তাকাল দ্বিধাহীন। বলল,

“আরেকবার ওই নামে ডাকুন, মামলা শুধু কাস্টাডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না।”
ইরামের কন্ঠে কোনো কোমলতা নেই। গাঢ় শীতলতা। অরণ্যর শুষ্ক ঠোঁটে পরিহাসের হাসি ফুটল। সে ইরামের উপর হাসল নাকি নিজের উপর বোঝা গেলনা।
“আমার উপর এত রাগ তোমার? এত ঘৃণা? যদি ভাঙারই থাকে তবে সংসারটা গড়েছিলে কেন?”
ইরাম ভ্রু তুলল।
“ভেঙেছি? আমি? দিবাস্বপ্ন দেখছেন মিস্টার মির্জা?”
“স্বপ্ন আর দেখতে দিলে কই? দেখার আগেই ভেঙে চুরমার করে দিলে।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইরাম কথা খুঁজে পেলনা। অরণ্য এক হাতের দূরত্ব ঘুচিয়ে তার কাছে এসে দাঁড়াল। ওই চোখের দৃষ্টিটা কেমন অস্বাভাবিক লাগল রমণীর। তাতে মিশ্রিত চাপা ক্ষোভ এবং অভিমান। কি অদ্ভুত! অভিমান করা উচিত ইরামের। উল্টোটা কেন হচ্ছে? অরণ্য কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,

“তুমি আমার কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতেই এমন করছ। বারবার আমাকে পরাস্ত করতে চাইছ, আঘাত দিতে চাইছ। এরপরও বেহায়ার মতন তোমাকে চাই আমি। ইফ ইউ কাম ব্যাক, ইভেন নাউ, আই সোয়্যার আই উইল ম্যারি ইউ অ্যাগেইন।”
এতক্ষণ পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলেও এবার আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারলনা সাইবান। লম্বা দুই পদক্ষেপে ইরামের কাছে পৌঁছে গেল। এক হাতে অরণ্যর বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। ভ্রু কুঞ্চিত হলো তার তিক্ততায়,
“স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম মাই ফ্যামিলি!”

অরণ্য সামান্য টললো। ইরামের উপর থেকে দৃষ্টি করে গেল তার, আপতিত হলো সাইবানের উপরে। অজান্তেই আর্দ্র চোখজোড়া তার বুকে নামল, যেখানে লেপ্টে আছে ছোট্ট ইযান। নিদ্রাচ্ছন্ন এক সত্তা, কি শান্তির ঘুম দিচ্ছে ওই প্রশস্ত বুকে! যেন এর চাইতে নিরাপদ জায়গা তার পৃথিবীতে কোথাও নেই। অরণ্যর মস্তিষ্ক জ্বলে উঠল। দুহাতের মুঠো শক্ত হলো। তাচ্ছিল্যভরে খানিক হেসে সে বলল,
“ফ্যামিলি? ওটা আমার বাচ্চা! ওর শরীরে আমার র*ক্ত, আমার ডি এন এ, আমার সবকিছু! পারলে চোখগুলো ভালো করে দেখ, একদম আমার মতন!”
সাইবানের চোয়াল শক্ত হলো। অরণ্য বাঁকা হেসে বলল,
“তোর নাম শীঘ্রই মুছে যাবে।”

এবার একটুও উত্তেজিত হলোনা সাইবান। বরং তার ঠোঁটেও কুটিল হাসি ছড়িয়ে গেল। সূঁচালো দাঁত দুটো দেখা গেল যখন সে বলল,
“নামটা নাহয় মুছে ফেলবি। জানটা মুছবি কীভাবে? আমার নাম যে ওর জানের ভেতর ছাপা।”
অরণ্য ক্রুব্ধ চোখে চেয়ে রইল। হাসিটা উধাও হলো সহসাই। ইরাম মধ্যখানে হস্তক্ষেপ করল। সাইবান আর অরণ্যর মাঝখানে দাঁড়ালো। ততক্ষণে অনুরাগ, নীরব আর আফনান তিনজন টের পেয়ে ফিরে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেকের চোখেমুখে আগ্রাসী দৃষ্টি। পুরো একটা দলকে একসাথে দেখে অরণ্যর মাঝে আক্রোশ আরও বাড়ল। ইরাম বলল,
“আপনার কি মনে হয়, মিস্টার মির্জা? এসব করে আপনার সম্মান বাড়ছে? উঁহু, বরং ধুলোয় গড়াগড়ি খাওয়া কিঞ্চিৎ সম্মানটুকুও উবে গিয়েছে। আমায় বিয়ে করবেন আবার? এতই সহজ? এত সহজ ভুলে যাওয়া সকল দুঃখ, যন্ত্রণা, আঘাত। যে ছেলের জন্মের দিন আপনি পরনারীর বুকে সুখ খুঁজেছেন, আজ সেই ছেলেকে কাছে নিতে এত টালবাহানা? জি না। সত্যিটা আমাকে বলতে দিন। সত্যি এটাই যে আপনি আপনার ইগো স্যাটিসফাই করতে এসেছেন। যেই দেখেছেন, আপনাকে ছেড়ে আমি আর আমার ছেলে দুজন দিব্যি সুখে আছি, সেই আপনার গায়ে লেগেছে।”

“সুখ? সুখে আছো আমাকে ছেড়ে? এটাই তো প্রমাণ করতে চাইছিলে তুমি, বলো? যে আমার দুয়ার ছাড়াও তোমার যাওয়ার আরো জায়গা আছে?”
“না।”
ইরাম দৃঢ় গলায় বলল। দুহাত মুঠো করে বড় দম টেনে জানাল,
“আপনি কে, আমার কে ছিলেন, আমার ছেলের কি হোন সেসব নিয়ে আর বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না আমার। আমি শুধু চিনি আমার পরিবারকে। আমার কুচুপু, আমার স্বামী আর একটা আদুরে শ্বশুরবাড়ি। তাই আপনার ভালো এটাতেই হবে যে মাথা থেকে বেদখলের ভূত ঝেড়ে নিজের জীবনে মনোনিবেশ করুন। জাস্ট মুভ অন!”
হুট করে হেসে উঠল অরণ্য। এক হাত কোমরে রেখে আর অন্য হাতে কপাল ঘষে সে খিলখিল করে হাসতে লাগল। এমন মুহূর্তে তার সেই হাসিটা লাগল ভীষণ বেমানান। অবাক হলো সকলে। সাইবান এক হাত বাড়িয়ে ইরামের কব্জি চেপে ধরল,

“লেটস গো। পাগলের পাগলামি দেখে কাজ নেই।”
উভয়ে উল্টো ঘুরল চলে যাওয়ার জন্য। যত কদম এগোল তত অরণ্যর হাসির জোর বাড়ল। এতটাই অস্বাভাবিক সেই আচরণ যে আশেপাশের মানুষজনও ফিরে ফিরে তাকাতে লাগল।
“সত্যিটা তুমি ওকে বলবে নাকি আমি বলব ইরাম?”
অরণ্যর দরাজ কণ্ঠে থমকাতে বাধ্য হলো সবাই। সটান ঘুরে গেল ইরাম। ভ্রুজোড়ার কুঞ্চনে কুঁচকে উঠল তার কপাল অব্দি। অরণ্য চিবুক ঘষতে ঘষতে তাকে দেখছে। ইরাম শক্ত এক ঢোক গিলল,
“মানে?”
অরণ্যর হাসিটা দ্বিগুণ বিস্তৃত পেল। পায়ে পায়ে কাছে এসে পৌঁছাল সে। ইরামের চোখে চোখ রেখে বলল,
“সব আছে তোমার কাছে। ছেলে, স্বামী, আদুরে শ্বশুরবাড়ি…উপস! অওর শুড আই সে, বাপের বাড়ি?”
যে ইরাম এতক্ষণ যাবৎ বিনা আতঙ্কে অরণ্যকে দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করে এসেছে, সেই ইরাম এবার টললো। দৃশ্যমানভাবে তার শরীর কেঁপে উঠল। উজ্জ্বল শ্যামলা মুখ থেকে সমস্ত রং বিদায় নিল। সাইবান, অনুরাগ, আফনান আর নীরব সকলেই অবোধ্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কারোই মাথায় ঢুকছেনা অরণ্য কিসের কথা বলছে। এমনকি ইরামও বুঝলনা। আমতা আমতা কন্ঠে শুধাল,

“ম…মা…মানে?”
অরণ্য তীর্যক হাসল। এক হাত বাড়িয়ে ইরামের কপালে গড়িয়ে নামা চুলগুলো ছুঁয়ে দিতে গেলেও দিলনা। চকচকে চোখে উত্তেজনা ফুটিয়ে বলল,
“মানেটা তুমি জানো না? জানো কি?”
“একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না। আলাদিন, চলো তো, ওনার মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে সবাই অপেক্ষা করছে।”
আবারও পিছন ঘুরল ইরাম। তবে হাঁটতে পারলনা। অরণ্য পিছন থেকে বলে বসল,
“বাড়ির সবাই? কে? তোমার খালামণি…নাকি মা?”
বরফখন্ডে পরিণত হলো ইরাম। শ্বাস আটকে গেল বুকের মাঝে। মস্তিষ্কের ভেতরটা দপদপ করতে লাগল ভীষণ চাপে। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো চোখের সামনে সমস্ত পৃথিবীটা বুঝি দুলে উঠেছে। আর এই অনুভূতিতে সে একলা নয়। পাশে দাঁড়ানো সাইবান বাকরুদ্ধ চেয়ে আছে। এক পলক অরণ্য, আরেক পলক ইরামের দিকে। ঘুমন্ত ইযান সামান্য নড়চড় করছে তার বুকে, তবে সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই সাইবানের। তার চোখজোড়ায় অবিশ্বাস, কৌতূহল এবং তীব্র আতঙ্ক।
“হোয়াট…ডিড…ইউ সে?”

রীতিমত ফিসফিস কন্ঠে উচ্চারণ করল সাইবান। অরণ্য প্যান্টের পকেটে দুহাত ভরে বিজ্ঞের ভঙ্গিতে তার দিকে তাকাল,
“তোর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। তার আগে একটা কথা বল। ফ্যামিলি অ্যালবামে তোর মায়ের প্রেগন্যান্সির ছবি আছে নিশ্চয়ই, যখন উনি তোর বোনকে পেটে রেখেছিল? তোর সময়ের আছে কি? নেই? থাকলে কোনোদিন জিজ্ঞেস করিসনি কেন নেই?”
বজ্রাহত হলো বুঝি সাইবান। তার চেহারা সাদা পৃষ্ঠার মতন ধবধবে হয়ে উঠল। অরণ্য পাগল? না না! সাইবান নিজেই পাগল হয়ে গিয়েছে। উল্টাপাল্টা শুনছে। বুকের ভেতর হৃদপিন্ড তার এত জোরে স্পন্দিত হচ্ছে যে রীতিমত ব্যথা হতে শুরু করেছে। হাঁপাতে লাগল সে। অরণ্যর ফাঁদ! এই মিথ্যাচারে পা দেয়া যাবে না। কিছুতেই না! তার চিন্তাটা বুঝি ধরতে পারল অরণ্য, তাই শেষ দফায় বলল,

“কখনো ভাবিসনি, এক বাচ্চার মায়ের সাথে তোর মতন অবিবাহিত জোয়ান ছেলেকে কীভাবে বিয়ে দিল, তোর আদরের মা জননী?”
টলে উঠল সাইবান। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সে পা হড়কে পরে যাবে। অনুরাগ পাশে থাকায় তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে বন্ধুকে ধরে ফেলল। ইযানকে নিজের কোলে নিয়ে ফেলল নীরব। অরণ্যর দিকে তাকিয়ে কঠোর কন্ঠে বলল,
“আপনি সব সীমা লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন! পরের শুনানিতে এর বিরুদ্ধে আমরা অবশ্যই অভিযোগ জানাব! এক্ষুণি নিজের পথ দেখুন, অন্যথায়!”
দুহাত তুলে সমর্পণের ভঙ্গিতে খিলখিল করে হাসতে লাগল অরণ্য। স্তব্ধ ইরাম, স্তব্ধ সাইবান। শঙ্কিত বাকি সবাই। কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা কাটল। এরপরই যেন ঝড় উঠল প্রকৃতিতে। খুব শান্তভাবে আফনানের দিকে নিজের কাঁপা কাঁপা একটা হাত বাড়িয়ে দিল সাইবান,

“চা…চাবিটা দে..”
আফনান ভড়কে গেল।
“কিসের চাবি?”
“বা…বাইকের…”
“কেন? আমার বাইকের চাবি দিয়ে তুই কি…”
“চাবি দে!”
গর্জে উঠল সাইবান। তার ভয়ংকর দানবিক কন্ঠে লাফিয়ে উঠল আফনান। নিজেকে আটকানোর আগেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পকেট থেকে চাবি বের করে সাইবানকে দিয়ে দিল। কারো দিকে বিন্দুমাত্র নজর ফেললনা সাইবান। এক ছুটে গিয়ে আফনানের বাইকে চড়ে বসল। হেলমেট মাথায় চড়িয়ে ইঞ্জিন অন করতেই গর্জন তুলল বাইক। ঘটনাটা কয়েক সেকেন্ডের ভেতর এত তড়িৎ গতিতে ঘটল যে বাকিরা প্রতিক্রিয়া করতেই ভুলে বসল। সাইবান বাইকের হ্যান্ডেল চেপে এগোল। বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটল তার বাইক, উদ্দেশ্য অজানা। শেষ মুহূর্তে অনুরাগ দৌঁড়ে গেল। চিৎকার করে ডাকল,

“সাইবান, দাঁড়া! সাইবান!”
বিপরীতে শুধু শক্তিশালী ইঞ্জিনের হুংকার ভেসে এলো। প্রচন্ড ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেল চারপাশে। যেন এলোমেলো করে দিয়ে গেল সযত্নে গড়া এক তাসের ঘরকে।
“গাড়িতে ওঠো, জলদি। আলাদিন বাড়িতে গেছে!”
ইরামের আতঙ্কিত কন্ঠস্বর ভেসে এলো। এতক্ষণে বোধ ফিরে পেয়েছে রমণী। আশেপাশের কোনোদিকে আর পরোয়াই করলনা সে। নীরবের কাছ থেকে ইযানকে নিয়ে দ্রুত গাড়িতে চেপে বসল। ঘুমন্ত ইযান এই উত্তেজনায় জেগে গিয়েছে। কুইকুই করে তাকাল সে এদিক সেদিক, ভীষণ বিস্মিত হয়ে। তবে তার বিস্ময় মিটলনা। একে একে অনুরাগ, আফনান আর নীরবও উঠে গেল গাড়িতে। তারপরই গাড়িটা কোর্ট প্রাঙ্গণ ছেড়ে দ্রুত এগোল, সাইবানের বাইক ছোটানো পথের পিছনে। উধাও হলো সবাই, শুধু রয়ে গেল অরণ্য। ঠোঁট সরু করে আলতো আঁচে শীষ বাজাতে বাজাতে সে দেখে গেল যতক্ষণ না গাড়িটা তার চোখের আড়াল হয়। অতঃপর জিভে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে গদগদ কন্ঠে বলল,
“চেকমেট।”

সামিয়া বেশ চিন্তায় আছেন আজ কেন যেন। টেবিলে বসে কুশিকাটার কাজ করার চেষ্টায়ও লাভ হচ্ছেনা। বুকটা ধড়ফড় করছে। প্রেশারের সমস্যা হলো নাকি? এমন কেন লাগছে হঠাৎ? তার পাশের চেয়ারে বসে সারিকা নিজের ফোন ঘাটছে। সুগন্ধা দুপুরের খাবারের জন্য সবজি কাটছে। আর হলের সোফায় বসে আহমদ এবং মিসির ব্যবসায়িক আলাপ করছেন। জামাইকে ভীষণ পছন্দ আহমদের। মেয়ের পর এই একটা মানুষ যার সঙ্গে তিনি বন্ধুসুলভ আচরণ করেন। মিসির এলে তাই তিনি খুশিই হন। কথা বলতে বলতে দাবা খেলছে জামাই শ্বশুর জুটি। ঠিক এমন সময়েই বিকট ইঞ্জিনের শব্দ ভেসে এলো বাইরে থেকে। গুঞ্জন থামতেই খোলা সদর দরজায় দেখা মিলল সাইবানের। পরনের টি শার্ট এলোমেলো হয়ে কাঁধ বেরিয়ে আছে, চুলগুলো ঝাঁকড়া হয়ে কপালে ছড়িয়ে আছে। অদ্ভুত এক অবয়ব। মুখটা পাথরের মতন শক্ত।
“সাই!”
সবার আগে ভাইকে দেখে উঠে দাঁড়াল সারিকা। অথচ কারো দিকে একটুও নজর দিলনা সাইবান। দৌঁড়ে গেল সিঁড়ির দিকে। কয়েক লাফে সিঁড়ি পেরিয়ে উঠে গেল উপরে। হতবিহ্বল হয়ে রইল সবাই। সুগন্ধা আলু ছেলা মাঝপথে থামিয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে বলল,
“পেত্নী দেখছে মনে হয়।”

সামিয়া চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের পিছু পিছু যেতে পা বাড়ালেন তবে দরকার পড়লনা। এর আগেই দেখা মিলল সাইবানের। তার হাতে ইয়া মোটা মোটা চার পাঁচটা পুরাতন ফ্যামিলি অ্যালবাম। লাফিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গোড়ায় মেঝেতেই বসে পড়ল সে। উন্মাদের মতন উল্টেপাল্টে অ্যালবামগুলো দেখতে শুরু করল। তার এমন কান্ডে যারপরনাই অবাক সকলে। সামিয়া দ্রুত এগিয়ে গেলেন, ছেলের বাহু চেপে ধরলেন,
“এই ছেলে! কি হয়েছে তোর? মমকে বল!”
সাইবান উত্তর তো দিলোই না বরং ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে যা করছিল তা করতে লাগল। এমনভাবে একের পর এক অ্যালবামের পাতা ওল্টাচ্ছে সে যেন এতে গুপ্তধন লোকানো আছে। তার স্পর্শের জোরে কিছু পাতা ছিঁড়েও যাচ্ছে, তবুও বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই। অস্থির হলেন সামিয়া,

“সাইবান!”
“সাই, কি হয়েছে ভাই?”
“এই সাইবান, কি সমস্যা?”
সামিয়া, সারিকা, মিসির সকলে একত্রে জমায়েত হলো। অথচ কেউই কোনো কূলকিনারা করতে পারলনা। কারো দিকে চোখ তুলে অব্দি তাকাচ্ছে না সাইবান। আহমদই শুধু শান্তভাবে সোফায় বসে হট্টগোল দেখে যাচ্ছেন। এমন সময়েই বাইরে গাড়ি থামল। সর্বপ্রথম ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে ভেতরে ঢুকল নীরব আর আফনান। এরপর ইরাম, কোলে ইযান। তাদের পিছু পিছু হতবিহ্বল অনুরাগ। সবাইকে দেখেই ছুটে গেলেন সামিয়া।
“এই! কি হয়েছে? আমার ছেলেটা এমন পাগলামি করছে কেন?”
“নেই!”

কেউ প্রতিক্রিয়া করার আগেই সাইবানের উন্মাদ কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে। মেঝেতে বসে থরথর করে কাঁপছে সে। অবিশ্বাসমাখা জ্বলজ্বলে চোখে সে মুখ তুলে তাকাল সরাসরি সামিয়ার দিকে। অদ্ভুত গলায় বলল,
“আমার জন্মের দিনের কোনো ছবি নেই!”
সামিয়া বরফখন্ডে পরিণত হলেন। ছেলের দিকে বিস্ফারিত নয়নে চেয়ে রইলেন। সাইবান অতি ধীরে উঠে দাঁড়াল। অ্যালবামগুলো তার কোল থেকে মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খেল অথচ সে পরোয়াই করলনা। নিষ্পলক দেখল সে মাকে,
“ব্রো, তুমি না ছবি তুলতে অনেক পছন্দ করো? সিসকে নিয়ে প্রেগন্যান্সির সময়ের ছবি আছে, ওর জন্মের পরপর হাসপাতালের বেডে দেয়ার ছবি আছে। ড্যাড নিজের হাতে তুলেছে সব। আমারগুলো নেই কেন ব্রো? ক্যামেরা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়ই? কিংবা সেকেন্ড চাইল্ড বলে কম আদরের ছিলাম? নাহয় অন্য কোনো অ্যালবামে রেখেছ যেটা আমি দেখিনি?”
সামিয়া দৃশ্যমানভাবে কেঁপে উঠলেন। তার চেহারা সমস্ত রং হারালো। কাঁপা কাঁপা হাত তুলল সাইবান,

আমার আলাদিন পর্ব ৬৪

“একটা আহাম্মকের মতন প্রশ্ন করি? জানি মিথ্যা, তবুও উত্তর দেবে?”
এক লহমা বিরতি দিয়ে পুনরায় সাইবান ইরামকে দেখিয়ে কম্পিত গলায় অবুঝ শিশুর মতন শুধাল,
“উনি কি তোমার মেয়ে? তাহলে আমি কে ব্রো?”

আমার আলাদিন পর্ব ৬৬