Home আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৩

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৩

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৩
suraiya rafa

ঘরের মধ্যে পিনপতন নীরবতা। রাতের বৈরী হওয়াকে গ্রাস করে উদয় হয়েছে সূর্যরাজ। প্রত্যুষের সোনারঙা আলো তীর্যক হয়ে ঠিকড়ে পড়ছে স্বচ্ছ জানালার গরাদে। নির্ঘুম পরিশ্রান্ত চোখদুটো চকচকে আলোর সংস্পর্শ পেতেই মুখমণ্ডল কুঁচকে গেলো তুষারের। ফ্লোরা এগিয়ে গিয়ে পর্দা টেনে দিলো চুপচাপ।
সেই তখন থেকে মৌনচর্চা করছে ওরা দু’জন। রুমে আসার পর থেকেই নির্বিকারে কোনোপ্রকার বাক্যবিনিময় ছাড়াই শুধুমাত্র চোখের ইশারায় ফ্লোরাকে একের পর ফরমায়েশ দিয়ে যাচ্ছে তুষার। কোট, টাই, ওয়ালেট এমনকি আত্ম সুরক্ষার জন্য নিজের সঙ্গে রাখা বুলেট আর রিভলবারটাও তুলে দিয়েছে ফ্লোরার হাতে। এখনো নিজেকে সামলানোর সময় হয়ে ওঠেনি ফ্লোরার, অথচ তুষারের প্রতিটি জিনিস সামলে রেখেছে পরম যত্নসহকারে।
সবকিছু গুছিয়ে রাখার পর কার্বাডের দরজা আঁটকে ঘুরে তাকালো ফ্লোরা, তুষার তখনও ফোন নিয়ে ব্যস্ত, সহসাই ম্লান কণ্ঠে অনুমতি চাইলো মেয়েটা,

— আমি এবার আসছি।
চকিতে ঘাড় ঘোরালো তুষার। যেন খুব অপ্রত্যাশিত একটা কথা বলে ফেলেছে ফ্লোরা, বরঞ্চ বহুযুগ ধরে তাদের সাংসারিক বোঝাপড়া বিদ্যমান, তেমন করেই
দ্রীপ্ত গলায় প্রশ্ন ছুড়লো সে,
— কোথায় যাবে?
দৃষ্টি তুললো ফ্লোরা। সবিনয়ে প্রত্যুত্তর করলো,
— আমার ঘরে।
— কেন! ঘরে কি আছে?
— ক্লান্ত লাগছে, ঘুমাবো একটু।
ফ্লোরার কথার পাছে তপ্তশ্বাস ফেললো তুষার। শীতল গলায় জানতে চাইলো,
— সকাল বেলা ঘুমাবে?

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

বিপরীতে নিঃশব্দে উপর নিচ মাথা দোলালো ফ্লোরা। গত একটা রাতের ধকলে গোলাপি চেহারায় অবসাদ জমেছে তার। চকচকে স্যাটিন মেকআপের আবরণে ঢাকা নিটোল নয়নে নিভু নিভু ক্লান্তির ছাঁপ। অতি সন্তোর্পণে আড় চোখে একবার মেয়েটাকে পরখ করলো তুষার। চিবুকের ডগায় তর্জণী বুলিয়ে ভীষণ নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে উঠলো ,
— তুমি কি জানো? মিশনের সময় মাঝেমধ্যে গোটা একসপ্তাহও না ঘুমিয়ে থাকতে হয় আমাদের ।
— তাহলে বাঁচেন কিভাবে?
অবচেতন মনে প্রশ্নটা করেই ফেললো ফ্লোরা। অবশ্য উত্তরের আশা করেনি, তবে তুষার জবাব দিলো,
— ড্রাগ নিয়ে।
— আপনিও ড্রাগ এডিক্টেড!

ফের কৌতূহলে মুখ খুললো মেয়েটা। বিপরীতে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তুষার।যা দেখা মাত্রই মনে মনে অসংখ্যবার জিভ কাটলো ফ্লোরা। প্রসঙ্গ পাল্টে কিছু একটা বলতে যাবে, তক্ষুনি প্রত্যুত্তর করলো যন্ত্রমানব,
— আমি নই, এরীশ ড্রাগে আসক্ত। ছোট বেলা থেকেই ওর শরীরে একটু একটু করে ড্রাগ পুশ করা হতো কিনা। যদিও ব্যাপারটা নিজ উদ্যোগে কমিয়ে এনেছিল এরীশ, কিন্তু…
কথাগুলো বলতে গিয়ে অকস্মাৎ অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো তুষারের। সর্বদা সাবলীল কপালে জেগে উঠলো চিন্তার বলিরেখা।
ফ্লোরা জানতে চাইলো,

— কিন্তু কিই ?
— ঈশানী চলে যাওয়ার পরে সবকিছু আবার রিপিট হয়েছে,ড্রাগের মাধ্যমে নিজেকে টর্চার করতে করতে আবারও ডিপেন্ডেবল হয়ে পড়েছে এরীশ। রাইট নাও হি ইজ টোটালি ড্রাগ এডিক্টেড।
ভাবনায় নিমজ্জিত তুষার। ফ্লোরা নিজেও ডুবে আছে হাজারো প্রশ্নের সমাহারে। অগত্যা কি ভেবে যেন আনমনে বলে উঠলো সে,
— এরীশ কখনো অনুভূতিতে বিশ্বাসী ছিল না । সর্বদা দাম্ভিক গলায় বলতো, আমার কোনো দূর্বলতা নেই। এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ডে কারোর দূর্বলতা তৈরি হলে তাকে নিঃশেষ করে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠতো সে। ওর জীবনে রিভেঞ্জ ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ। যাকে একবার টার্গেট করতো তাকে বি’ধ্বস্ত করে তবেই ছাড়তো। সেবার ড্যালিয়েলের গার্ল ফ্রেন্ডটাকেও চোখের সামনে ঝাঁঝরা করে দিলো, কি নির্মম সেই মৃ”ত্যু! লা”শটা পর্যন্ত পিস পিস করে বোজোকে খাইয়েছে। পুরো পৃথিবীর ত্রাস, যে রাশিয়াতে ব্লাডিবিস্ট নামে খ্যাত। যার নাম শুনলেও মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে । সে কেন ঈশানীর মতো একটা ভিনদেশী মেয়েকে বারবার ছেড়ে দিল ? না মানে অনুভূতি তো আর একদিনে তৈরি হয়নি। তাহলে অচেনা অজানা একটা মেয়ের প্রতি হঠাৎ দয়া দেখানোর উদ্দেশ্যটা কি?
কথা গুলো বলতে বলতেই চোখের রঙ পাল্টে গেলো ফ্লোরার। কিছু একটা ভেবে জিভের জগায় অধর ভেজালো তুষার। কপালটা কুঞ্চিত করে ভাবুক হয়ে বললো,

—একবার মাতভেইয়ের কাছে শুনেছিলার এরীশের মাও নাকি বাঙালি রমণী ছিলেন, শুধু যে বাঙালি তা-ও নয়,অভূতপূর্ব ভাবেই ভদ্রমহিলার চোখের রঙ ছিল গাঢ় নীল।
— এটা নিশ্চয়ই একটা কারণ হতে পারে। কিন্তু এরীশ যে বলে তার দূর্বলতা নেই? হতে পারে নিজের দূর্নলতাকে অগ্রাহ্য করার জন্যই তার এই নিষ্ঠুরতা।
বুদ্ধিমতীদের মতোই ঝটপট একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থমকালো ফ্লোরা। ভাবুক তুষার তখনও বিভ্রমে নিমজ্জিত। ফলস্বরূপ বেখেয়ালেই বলে উঠলো,
— এরীশের গোটা জীবনটাই রহস্য! যার উদ্ঘাটন কেউ কখনো করতে পারেনি, আমিও না। তবে প্রথমবার ঈশানী মেয়েটাকে দেখার পর মাতভেই একটা কথ বলেছিল, যা আমার এখনো মনে আছে,

— কি!
—হিস্ট্রি রিপিট ইটসেল্ফ।
আশ্চর্য গলায় কথাটা বলে পাশ ফিরে তাকাতেই তুষার দেখলো খাটের হেডবোর্ডের সঙ্গে গা এলিয়ে দিয়ে হাই তুলছে ফ্লোরা, সহসাই নিরেট স্বরে বাক্য ছুড়লো তুষার,
— তোমার বোধ হয় ঘুম পেয়েছে।
তন্দ্রাভাব কেটে যেতেই চমকে উঠলো রমণী। তাড়াহুড়ো নিজেকে সামলে প্রত্যুত্তর করলো,
— হ্যা, যাচ্ছি এখনই।
কোনোরূপ ভণিতা না করে স্পষ্ট আদেশের স্বরে তুষার বললো,
— ঘরে যেতে হবে না, এখানেই ঘুমিয়ে পড়ো।
ফ্লোরা অবুঝ নয়, বিয়ের পরে স্বামী স্ত্রী এক ঘরে থাকে সেটা ও ভালো করেই জানে। তারপরেও কোথাও যেন একটা কিন্তু রয়ে গেছে। সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না কিছুতেই। পুরোটাই যেন কৃত্রিম এক নিয়মের বেড়াজাল। তুষারের এই দ্বায়িত্ববোধ, মেপে মেপে কর্তব্য পালন সবকিছুই কেন যেন অসহ্য লাগছে ওর। যেন সবকিছুই কৃত্রিম আর সাজানো, কোথাও কোনো ভালোবাসার ছিটেফোঁটা নেই, নেই কোনো অনুভূতির প্রফুল্লতা। কেবল সহানুভূতি দেখানোর জন্যই বিয়ে করা।
হটাৎ করেই নিজেকে ফেলনা মনে হতে লাগলো ফ্লোরার। রাগে, দুঃখে, অস্থিরতায় বেদনার রঙে ছেঁয়ে গেলো তার মনাকাশ। বুকের কান্না গিলে গিলে মেয়েটা বিপর্যস্ত গলায় বললো,

— এতো ভারী পোশাক পড়ে ঘুমাতে পারবো না। চেঞ্জ করতে হবে।
কথাটা বলে একপ্রকার মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল ফ্লোরা। তন্মধ্যে ওপাশ থেকে ভেসে এলো তুষারের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
— মিসেস জাওয়াদের পোশাক বয়ে আনার জন্য এই পেন্ট হাউজে লোকের অভাব নেই আই গেইজ।
স্তম্ভিত ফ্লোরা ঘুরে তাকালো এবার। জলে ভেজা টলমলে চোখ দু’টো তুলতেই কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো তুষার, চোখের চাহনিতে হৃদয় বিদগ্ধ করে আওড়ালো,
— যা বলেছি সেটাই করো, চুপচাপ বিছানায় এসে শুয়ে পড়ো।
— আর আপনি?
ফ্লোরা বোধ হয় বিশেষ কোনো উত্তরের আশা করেছিল, তবে যন্ত্রমানব নিজ উদ্যেগে মাটিচাপা দিয়ে দিলো সেই প্রত্যাশা। পুরন্তু কাউচের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে উদাসীন কণ্ঠে আওড়ালো,

— তুমি ভালো করেই জানো বিছানায় শোয়ার অভ্যাস নেই আমার। ওটা খালিই থাকে সবসময়।
সদ্য বিবাহিতা রুশ রমণীর বক্ষপিঞ্জরে যে অভিমানের ঝড় উঠেছিল তা এবার মাত্রা ছাড়ালো। সেই দশ বছর বয়স থেকে তিলে তিলে গড়া অনুভূতির শক্ত প্রাচীরটাকে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো সে। মনে মনে ভাবলো তাহলে এই লোক দেখানো বিয়েটার দরকার কি ছিল? ফ্লোরা তো করতে চায়নি। তুষার এক অদ্ভুত রহস্যময় মানুষ, যে ফ্লোরাকে সারাক্ষণ আকর্ষন করে নিজের দিকে। যাকে ও ছাড়তেও পারে না আবার ঠিক ভাবে আঁকড়ে ধরতেও পারেনা। অনিশ্চিত এই অনুভূতির সাথে যুদ্ধ করতে থাকা ফ্লোরার জীবনে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিয়ে নামক আরেক যাতনাময় অধ্যায়। ভেবেছিল সবকিছু বদলে যাবে, ফ্লোরার মতোই তুষারের মনাকাশে অনুভূতির সূর্যদয় হবে। কিন্তু সেসব কিছু যেন ভাবনাই রয়ে গেলো। যন্ত্রমানব তো বদলানোর নয়। মরিচীকার কলুষে আবর্তিত তার জীবন, পাথরের মতো রুক্ষ তার হৃদয়। তাহলে এরীশ কিভাবে পারলো? কেমন করেই ঈশুকে রেখে দিলো নিজের অনিশ্চিত কালো দুনিয়ার সঙ্গী করে ? প্রশ্নটা রয়েই গেলো ফ্লোরার মনে। ঠিক তখনই ফের ধ্বনিত হলো যন্ত্রমানবের অনাকাঙ্ক্ষিত কণ্ঠস্বর,

—তুমি কি দাঁড়িয়ে ঘুমানোর প্ল্যান করছো?
মাথা নাড়িয়ে না জানালো ফ্লোরা। আত্নবিশ্বাসী ভাবটা ধরে রেখে চুপচাপ নিটোল পায় এগিয়ে গিয়ে কাত শুয়ে পড়লো বিছানায়। তুষার নির্লিপ্ত। কাপড় বদলানোর কথা মুখে আনলো না একটাবার। স্ত্রীর অস্বস্তি হচ্ছে কিনা সেসবও জানতে চাইলো না, শুধু মুখ খুলে বললো,
— আজ আর লাইট অফ করার দরকার নেই।
আরেকদফা অসংশোধনীয় বাক্যে ভেতর ভেতর বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়লো ফ্লোরা। তার আত্মাভিমানী মনটা ফুঁসে উঠলো হঠাৎ । তুষারের নির্দেশ অবজ্ঞা করার অহেতুক জেদ চেপে বসলো মস্তিষ্কে। ফলস্বরূপ জেদ টাকে প্রশ্রয় দিয়ে তরতর করে এগিয়ে গেলো সুইচবোর্ডের দিকে। তুষার ততক্ষণে টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছে বিস্তৃত কাউচের উপর।
সুইচবোর্ডটা কাউচের কাছেই, হাত বাড়িয়ে সেটাকে অফ করতে নিলে ঝট করে ওর কব্জিটা ধরে ফেললো তুষার। হ্যাচকা টান দিতেই ভারী গাউনের তারতম্য সামাল দিতে না পেরে অসাবধানতায় তুষারের বুকের উপর ছিটকে পড়লো রমণী।

ধনুকের মতো বাঁকানো নারী দেহখানি অজান্তেই পিষে গেলো স্বামীর প্রশস্ত বুকের ভাঁজে। নিজের অবস্থান টের পেয়ে তৎক্ষনাৎ ধড়ফড়িয়ে উঠলো ফ্লোরা, তড়িঘড়ি করে উঠতে নিয়ে পোশাকের সঙ্গে পা আঁটকে হোঁচট খেলো আবারও। এবার আর চুপ হয়ে রইলো না তুষার, সতর্ক হাতে ধরে ফেললো মেয়েটাকে, কোনোপ্রকার দৃষ্টি বিনিময় না করেই অতি সন্তোর্পণে টেনে এনে অবলীলায় ঠায় দিলো স্বীয় বুকের উপর।

রাগে, দুঃখে, হতাশায় কান্না পেয়ে গেলো ফ্লোরার। এক অভূতপূর্ব বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া স্বামী নামক ব্যক্তির বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করলো খুব । কিন্তু মানুষটা যে পাষাণ, হৃদয় তার পাথরের মতো অসার। ফ্লোরার অভিমানী মনের এতো এতো দায় কেন মাথা পেতে নিবে সে?কিসের এতো প্রয়োজন তার? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই প্রবল আড়ষ্টতায় গুটিয়ে গেলো রমণী। শরীরের সবটুকু ভার তুষারের উপর ছেড়ে দিয়ে চোখদুটো বন্ধ করে ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইলো সে।

অসহনীয় নীরবতার মাঝেও তুষার টের পেলো ওর অস্থির হৃদয়ের বেসামাল ধুকপুকানি। কয়েক মূহুর্তের জন্য ভয় পেয়ে গেলো যন্ত্রমানব, দরদর করে ঘেমে উঠলো তার সমস্ত শরীর, পাছে না আবার এই অপ্রতিরোধ্য শব্দধ্বনি রুশ রমণীর কান অবধি পৌঁছে যায়। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো তুষার। জিভের ঢগায় অধর ভিজিয়ে মুখের মাঝে নির্লিপ্ত একটা ভাব ধরে রেখেই বলে উঠলো,

— কি করছিলে এটা?
ভাবনার সুতো ছিড়লো ফ্লোরার, ধীরে ধীরে মাথা তুলে দু’হাতে ভর করে চোখ রাখলো সে তুষারের প্রাণহীন নির্লিপ্ত নেত্রপটে। জীবনে প্রথমবার ফ্লোরার চোখে চোখ রাখতে গিয়ে ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো তুষার, তাইতো নিঃশব্দে দৃষ্টি ঘোরালো সে।
এতোক্ষণে নিজের মাঝে ফিরে এলো ফ্লোরা, ক্ষণকালের মৌনতা ভেঙে সপ্রতিভ গলায় বলে উঠলো,
— পড়ে যেতে দিতেন? ধরতে কে বলেছে?
— তুমি আমার দ্বায়িত্ব, আর দ্বায়িত্বে কখনো অবহেলা করেনা তুষার জাওয়াদ ।
আবারও সেই দায়সারা দ্বায়িত্বের দোহাই। প্রতিবার এই কথাগুলো শুনলে নিজেকে চরম অবহেলিত আর মূল্যহীন মনে হয় ফ্লোরার। বুকের ভেতর মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে এক গা শিউড়ানো ভয়ংকর অতীত। যা ও ভুলে যেতে চায়,সবকিছুর পরেও একটা সুখের জীবন চায়।

তাইতো কথাগুলো শোনা মাত্রই মস্তিষ্কটা দপদপ করে উঠলো ওর । কোনো এক অজানা কারনে এই মূহুর্তে তুষারকে অসহ্য লাগছে ভীষণ , সেই সঙ্গে এই দয়া দেখানো বিয়েটাকেও। ফলস্বরূপ চোখের তারায় পাহাড় সমান অভিমান ধরে রেখে ভারী হেয়ালির স্বরে বাক্য ছুড়লো মেয়েটা ,
—- নিজেকে খুব মহামানব আর সুপুরুষ ভাবলেও আপনি তা মোটেই নন, আপনি আসলে একজন দাম্ভিক, আত্ম অহংকারী পাষাণ লোক!
তুষারের যেন ভাবোদয় হলো, তেমন করেই দৃষ্টির মিলন ঘটালো সে । মেয়েটার চোখে মোহাবিষ্টের ন্যায় দৃষ্টি তাক করে হিমবাহের মতো শীতল কণ্ঠে জবাব দিলো,
— কে বললো আমি নিজেকে মহামানব ভাবছি? আর সুপুরুষ?
কথাটা বলে কয়েকমূহুর্ত নীরব রইলো তুষার, পরক্ষণেই অদ্ভুত এক হাসির রেখা ফুটে উঠে ফের মিলিয়ে গেলো তার ঠোঁটের আগায়, গভীর স্বরে আওড়ালো,
— আমি সুপুরুষ নই ফ্লোরা,বিশ্বাস করো আমি সুপুরুষ নই। আর সুপুরষ নই বলেই তোমাকে লাইট অফ করতে বাঁধা দিচ্ছি।

উত্তাল সমুদ্রের ভয়াল গর্জনে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো ঈশানীর। চোখ খুলে নিজেকে আবিষ্কার করলো আরামদায়ক কম্ফোর্টারের ভাঁজে।একটা লম্বা চওড়া অবচেতন হাত ভীষণ কতৃত্ব নিয়ে জড়িয়ে রেখেছে ওর শীর্ণকায় তনুখানি। ঘুম ভাঙতেই মরীচিকার সম্রাটের বাহুর আবর্তনে নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুরক্ষিত রমণী বলে মনে হতে লাগলো ঈশানীর। মাফিয়া বসের বুকের ওমে ডুবে গিয়ে কয়েকমূহুর্ত সেভাবেই দিবাস্বপ্নে বিভোর হয়ে রইলো মস্তিষ্ক। তৃপ্তির আবেশে বুঁজে এলো দু’নয়ন।সেই সাথে অদ্ভুত এক সুখ সুখ সায়রণ্যে ভরে উঠলো তার নাজুক অবাধ্য অন্তঃকরণ ।
ততক্ষণে নরম কুয়াশার ছাকনি ভেদ করে আলো ঝলমলে আবহে ভরে উঠেছে চারিপাশ। পায়ের কাছে সুড়সুড়ি দিচ্ছে প্রত্যুষের সোনারোদ।

আড়মোড়া ভেঙে পাশ ঘুরতেই এরীশকে দেখতে পেলো ঈশানী। ওর পাশেই উপুড় হয়ে কুশনের নিচে দু’হাত রেখে পুরুষালী ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে মাফিয়া বস। অনুশীলনকৃত চওড়া পৃষ্ঠের পেশীবহুল রেখাগুলোকে প্রজাপতির ডানার মতো দেখাচ্ছে । ভীষন আকর্ষনীয় সেই শোয়ার ভঙ্গিমা। হাত থেকে শুরু করে তার অনাবৃত চওড়া পৃষ্ঠের অনেকাংশ জুড়ে কালচে রঙের অদ্ভুত আঁকিবুঁকি।বাকিটা অংশ কাটাছেঁড়া আর অজস্র আঘাতের চিহ্ন দিয়ে ভরা। কয়েকমূহুর্ত নিস্প্রভ চেয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে সেই কাটাছেঁড়া দাগগুলো ছুঁয়ে দেখলো ঈশানী। এর আগে এরীশকে কখনো এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেনি ও। বিগত দিনগুলোতে যতবারই অন্তরঙ্গ হয়েছে, প্রতিবারই ঈশানীর সঙ্গে একই ঘটনা ঘটেছে, এরীশ কখনোই ঘুমায়নি ওর পাশে।

আজকেই প্রথমবার মানুষটাকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলো এভাবে । ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় জানোয়ারকেও নিস্পাপ লাগে, এরীশও তার ব্যতিক্রম নয়। ক্লান্তিমাখা ফর্সা মুখে অদ্ভুত তৃপ্তির ছোঁয়া , যেন ঘুমটুকু ওর বহু আকাঙ্খিত প্রাপ্তি। সৌম্যকান্ত উন্নত নাসা,সুডৌল কপাল, আইভ্রুর কোল ঘেষে চকচকে পিয়ার্সিং, কালচে বাদামী রঙের পুরন্তু ওষ্ঠাধর, তার ঠিক নিচে কুচকুচে কালো তিলক। দেখে মনে হয় উপরওয়ালা খুব যত্নকরে বানিয়েছিল এই মুখ। দু’হাতের অঞ্জলিতে চিবুক ঠেকিয়ে কিয়ৎক্ষণ মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইলো ঈশানী। বড় আগ্রহ নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো মানুষটাকে। আজকাল এরীশের কোনো অপরাধ, কোনো খারাপ বৈশিষ্ট্যই ছুঁতে পারেনা ওকে, সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে অন্ধের মতো ভালোবাসে এই মানুষটাকে। যতটা ভালোবাসালে মানুষ ভালোমন্দের তফাৎ ভুলে যায় ঠিক ততটা।

দেখতে দেখতেই ঈশানীর চোখ গিয়ে আটকালো দক্ষিণ দিকের স্বচ্ছ কাচের দেওয়ালে। ওপাশে বিশালাকৃতির ইনফিনিটি সুইমিং পুল, তারপর থেকে কোনো স্থল নেই বিস্তৃত বালুচর শেষে প্রগাঢ় নীল সমুদ্র। দোতলার এই মাস্টার বেডরুম থেকে গোটা সিবিচ টাকে পাখির চোখে দেখা যায়। বেলাভূমির গায়ে ঝাপিয়ে পড়া সাগরের বেপরোয়া উদ্যাম ঢেউ গুলো যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে ওকে।

সহসা নিশ্চল কদমে মেয়েটা এগিয়ে গেলো সেদিকে, শরীরের সাথে মোমের মতো লেগে থাকা কালো রঙা সিল্ক শার্টটা পাতলা ভীষণ। এতোটাই স্বচ্ছ আর মসৃণ যেন মাখনের মতো মিশে যেতে চাইছে রমণীর পেলব ত্বকের ভাঁজে। আনমনেই কলার টেনে শার্টের ভাঁজে নাক ডোবালো ঈশানী,সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম সুগন্ধি মিশ্রিত পুরুষালি ক্লোনের গন্ধটা নাকে এসে সুড়সুড়ি দিলো ওর। এরীশের শরীরের এই সুগন্ধটা আশ্চর্য রকম ভালো লাগে ঈশানীর, নাকে এসে লাগলেই কেমন মাতাল মাতাল মনে হয় নিজেকে। আর এখন ওর সর্বাঙ্গ জুড়ে লেপ্টে তার সুবাস।
রোদের রোশনাইয়ে ঝলমল করতে থাকা দেওয়ালের গায়ে আলতো ছুয়ে দিতেই মৃদু উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো ঈশানীর সর্বাঙ্গে, ব্যথা শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভূত হলো অদ্ভুত এক মিঠেমধুর শিহরণ।
কিছু একটা ভেবে আনমনে হেসে উঠলো রমণী। অতঃপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে অবলোকন করতে আরম্ভ করলো গোটা সমুদ্রতট।

এভাবে নিজের মনে ঠিক কতটা সময় অতিবাহিত করেছিল জানা নেই ওর, তবে ভাবনার ছেদ ঘটলো তখনই যখন অনুভব করলো হিমবাহের ন্যায় একজোড়া ঠান্ডা শীতল হাত নৈঃশব্দ্যে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর বাঁকানো কটিদেশ। তারচেয়েও বেশি বিস্মিত হলো যখন মনে হলো ওই ঠান্ডা শীতল হাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ততোধিক ঠান্ডা কোনো ধাতব অলংকার নীরবে পেঁচিয়ে ধরেছে ওর শীর্ণ কোমর।
এহেন আচানক স্পর্শে শিউরে উঠে কাচের দেওয়ালের সঙ্গে মিশে গেলো ঈশানী। কোমড়ের চারপাশে আবর্তিত হয়ে উদরনালীর সঙ্গে মিশে থাকা শীতল বস্তুটিকে কাঁপা হাতে স্পর্শ করতেই পেছন থেকে ভেসে এলো স্বতঃস্ফূর্ত নিষেধাজ্ঞা,

— উহু, ডোন্ট টাচ্
— রীশ!
রমণীর উদগ্রীব কণ্ঠস্বর।
— ইয়েস বেইব,
দমকা হাওয়ার মতো কানের খুব কাছে হিসহিসিয়ে উঠলো মাফিয়া বস। বিচলিত হলোনা ঈশানী, উল্টো কোমরে জড়ানো অলংকারখানা স্পর্শ করে সপ্রতিভ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— এটা ভীষণ ভারী। কি এটা?
— ওয়েষ্ট চেইন!
ফের হিমশীতল আওয়াজে প্রত্যুত্তর করলো মাফিয়া বস।
এতোক্ষণে আড়ষ্টতা ভেঙে নিজের শরীরের দিকে দৃষ্টিপাত করলো ঈশানী। রাজহংসীর মতো গমরঙা পাতলা কোমরে জ্বলজ্বল করছে কোমর বন্ধণীটা। সোনালু কারুকাজের উপর সুনিপুণ হাতে বসানো প্রতিটি সুক্ষ্ম হীরের টুকরো সদম্ভে ঠায় নিয়েছে রমণীর লতানো শরীরে। যা দেখা মাত্র হৃদযন্ত্র ছলকে উঠলো ঈশানীর। চোখের তারায় ফুটে উঠলো অভাবনীয় বিস্ময়। কয়েকমূহুর্ত স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে থেকে অবশেষে ঠোঁট নাড়িয়ে ধ্বণিত হলো,

— কিন্তু এরীশ এটাতো….
বাকি কথা শেষ করার আগেই ঝটিকা প্রবাহের মতো ওকে টান মে’রে নিজের দিকে ঘোরালো মাফিয়া বস। দৃষ্টির মিলন ঘটিয়ে আচ্ছন্ন গলায় বলে উঠলো,
— এবার থেকে যতবার তুমি নিজেকে দেখবে, ঠিক ততবারই এটা তোমাকে মনে করিয়ে দিবে, ইউ্য বিলোংস টু অনলি মি।
তারপর কোমর বন্ধণীটাকে ইশারা করে বললো,
— লুক, মাই নেইম ইজ হেয়ার।
নিজ শরীরের সঙ্গে লেগে থাকা অলংকারটিকে আরেকদফা বিস্ময় নিয়ে পরখ করলো ঈশানী, দেখতে পেলো হীরের গায়ে ইংরেজি অক্ষরে লেখা সেই নামের ফলক,
” RISH”
নামটাকে খুব যত্ন নিয়ে স্পর্শ করলো ঈশানী, তারপর চোখ তুলে ছলছলে দৃষ্টি তাকিয়ে বললো,

— এরপরেও বলবে তুমি আমায় ভালোবাসো না?
— আ’ম এডিক্টেড।
একহাতে মেয়েটার কোমর জড়িয়ে অন্যহাতের তর্জণীর ডগায় চোখের জলটুকু মুছে অনুভূতিহীন গলায় কথাটা বললো এরীশ। পরপরই ভেসে এলো তার রুক্ষ কণ্ঠস্বর,
— আই হেইট ইউওর টিয়ার্স।
— তুমি আমাকে চেনোনা এরীশ , চিনতেই পারোনি।
কথাটা বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো ঈশানী। অবাধ্য জলের চিকন স্রোতে মোমরাঙা কপোল ভিজে গেলো তার। যা দেখা মাত্রই চোয়ালের পেশী শক্ত হয়ে উঠলো মাফিয়া বসের । দপদপিয়ে জ্বলে উঠলো নিস্প্রাণ শান্ত চোখেরমনি, নিজের চিরাচরিত সত্তায় ডুবে গিয়ে হঠাৎ করেই মেয়েটাকে শক্ত হাতে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষলো সে,

— স্টপ দ্যা ফাকিং ক্রায়িং সাকুরা, অর ইউ্য’ল রিগরেট ইট ব্যাডলি। আমার চেয়ে বেশি তোমাকে আর কেউ চেনেনা, কেউ না! তুমি নিজেও না!
রূঢ় গলায় কথাটা বলতে গিয়ে ঈশানীর মুখের দিকে ঝুঁকে গেলো মাফিয়া বস। যা দেখে চোখে জল নিয়ে তাচ্ছিল্য করে হাসলো ঈশানী, তৎক্ষনাৎ ওকে আরেকদফা হতবুদ্ধি করে দিয়ে প্রত্যুত্তর করতে লাগলো মানুষটা,
— তোমার পিঠের ঠিক মাঝখানে তিন সেন্টিমিটারের একটা জন্মদাগ আছে, যা তুমি নিজেও জানতে না। ডান চোখে দু’শো পঁচিশটি পাপড়ি আছে, আর বাম চোখে দু’শো বারোটি। দু’চোখ মিলিয়ে মোট চারশো সাইত্রিশটি, এছাড়া তোমার শরীরে মোট ২৭ টি তিল আছে,
প্রতিটি বাক্যে এক’পা করে ঈশানীর দিকে এগিয়ে এলো এরীশ, এরীশের হিংস্র, জেদি সত্তাটা জাগ্রত হতেই কুণ্ঠিত পদক্ষেপে পেছাতে লাগলো রমণী। অবশেষে যখন পায়ের গতিরোধ হলো, পিঠ গিয়ে দেওয়ালে ঠেকলো, সেই মূহুর্তে এরীশ বলে উঠলো,

— যার মধ্যে দু’টো তিল তোমার …
বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই সংবেদনশীল হাতে ওর মুখ চেপে ধরলো ঈশানী।কান্নাকাটি থেমে গিয়েছে অনেকক্ষণ, সহসা চোখ দিয়ে ইশারা করে বোঝালো, আর না। রমণীর আলতো স্পর্শ পেতেই নিভে এলো হিংস্রতা। মুখ থেকে ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিতেই প্রশ্ন চোখে তাকালো এরীশ। আচ্ছন্ন গলায় জানতে চাইলো,
— এবার বলো আমার চেয়ে কে বেশি চেনে তোমায়?
উত্তর খুঁজে পেলোনা রমণী, বিপরীতে স্বীকারোক্তির মতো করে আওড়ালো,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি এরীশ। গোটা পৃথিবী তোমাকে যতটা ঘৃণা করে তারচেয়েও বেশি ভালোবাসি আমি তোমায় মাফিয়া বস ।
ঈশানী যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, মাফিয়া বসটার বরফ হৃদয়ে প্রণয়ের বারিধারা ঝরাবেই ও। ফলস্বরূপ কথাগুলো বলতে বলতে দু’হাতের অঞ্জলিতে তার তীক্ষ্ণ পুরুষালি চিবুকখানা আঁকড়ে ধরে কপাল ঠেকালো সেখানটায়।
ব্যাকুল হয়ে বললো,

— ভালো নাই-বা বাসলে আমায়, একটাবার মুখে বলো, আমি শুনতে চাই প্লিইইজ।
রমণীর হৃদয়ভাঙা আকুতিতে টললো না হিমালয়। মেয়েটার চুলের ভাঁজে আঙুল ঢুকিয়ে স্বভাবসিদ্ধ গলায় জবাব দিলো,
— বলবো, সময় হলে বলবো।
হিমবাহের ন্যায় হু হু করে অবর্ণনীয় ব্যথায় ভরে উঠলো ঈশানীর বুক । এক আকাশ সমান অব্যক্ত অভিমান নিয়ে উদ্দেশ্যহীন আহত স্বরে জবাব দিলো মেয়েটা,
— তোমার সময় হতে হতে আবার আমার না সময় ফুরিয়ে আসে এরীশ!
ঈশানীর জিভ খসে নিসৃত হওয়া বাক্যটা যেন এরীশের শরীরে গিয়ে বিঁধলো। তৎক্ষণাৎ প্রচন্ড ক্রোধে দপদপ করে উঠলো মস্তিষ্কটা,
সঙ্গে সঙ্গে ঈশানীর নাজুক কব্জিটাকে পেছন দিক দিয়ে মুচড়ে ধরলো এরীশ,অন্য হাতে গালদুটো শক্ত করে চেপে ধরে কোপদৃষ্টিতে তাকালো ওর পানে। রাগে রক্তিম হয়ে ওঠা চোয়ালের পেশী শক্ত করতেই ভেসে এলো তার ক্রুদ্ধস্বর ,

— আমার সামনে মরার কথা বলিস, বুক কাঁপে না তোর? কাঁপে না বুক!
এরীশের প্রবল হুংকারে সত্যি সত্যিই কেঁপে উঠলো ঈশানী। প্রচন্ড ব্যথায় ককিয়ে উঠে চোখের জল ছেড়ে দিয়ে বললো,
— ব্যথা লাগছে এরীশ!
মূহুর্তের জন্য শিথিল হলো মাফিয়া বসের ধারালো চোয়াল।রক্তিম চেহারায় আবারও ক্রোধের ঝলক ফুটে উঠতেই তা মিলিয়ে নীলাম্বরীর আহত চেহারা দেখে। ঝট করেই মেয়েটাকে নিজের অনাবৃত বুকে এনে ফেললো এরীশ। শক্ত করে চেপে ধরে মিশিয়ে ফেললো নিজের সঙ্গে। চুলের ভাঁজে এলোমেলো চুমু খেতে খেতে উন্মাদের মতো আওড়ালো,
— প্রেম আমার! লেট মি মেইক ওয়ান থিং ক্লিয়ার, ওকেহ? ইফ ইউ্য এভার লিভ মি,ইউ্য উইল ডাই! এ্যান্ড ইফ ইউ্য ডোন্ট লেট মি টাচ ইউ্য, আই উইল ফাকিং ডাই !

পাইথন প্যারাডাইস,
মধ্য রাতের ঝিমধরা নীরবতাকে সঙ্গী করে হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় অশুভের আস্ফালন। মরিচীকার দুনিয়ায় প্রজ্জলিত হয় পাপাচারের বিভীষিকা। নাইট ক্লাব গুলো সব একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, নিভে যায় কত জীবনের আলো। এমনই এক সন্ধিক্ষণে অফিসরুমের কাচের দেওয়ালের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোটা মস্কো শহরটাকে নিরীক্ষণ করছিল এরীশ। তার বাজপাখির মতো ধারালো দৃষ্টিতে জ্বলজ্বল করছে কতৃত্বের অগ্নিশিখা। যেন হেরফের হলেই চোখের ইশারায় ভস্ম করে দিবে সব।
কোনো এক অযাচিত ভাবনার অতলে সেই সন্ধ্যা থেকে ডুবে আছে মাফিয়া বস। কপালে তার দুশ্চিন্তার বলিরেখা, ঠিক সেসময় দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো তুষার। পোশাক পরিচ্ছদ ফর্মাল তার, মুখে নিদারুণ থমথমে অভিব্যক্তি, হাতে চিরাচরিত আইপ্যাড। নিঃশব্দে এগিয়ে এসে মাফিয়া বসের পাশ ঘেষে দাঁড়ালো সে। এরীশের দৃষ্টি অনুসরণ করে দূর শহরের বুকে টিমটিমিয়ে জ্বলতে থাকা রাত বাতির পানে লক্ষ্য স্থীর রেখে বললো,
— আমেরিকা থেকে শীপমেন্ট এসেছে, দশলড়ি অরগ্যান সঙ্গে দু’টো ট্রলি ভর্তি সব ক্রিস্ট্যাল ডায়মন্ড। চেকিং শেষ, এবার শুধু ডার্ক ওয়েভের মাধ্যমে মার্কেটে ঢোকানোর পালা।

— ড্রাগ আসেনি কেন?
স্বীয় পকেটে দু’হাত আবদ্ধ করে থমথমে গলায় প্রশ্ন করলো এরীশ। তুষার জবাব দিলো,
— টমেটো প্রিন্সকে মা’রা’র পর থেকে লোকাল ড্রাগ সাপ্লাইয়ার গুলো পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে ডিল করা প্রয়োজন। কিন্তু ইতালিয়ান গ্যাং গুলো ভালোই উৎপাত করছে ইদানীং।
সঙ্গে সঙ্গে মুখ দিয়ে তাচ্ছিল্যের শব্দ নিসৃত করলো এরীশ। পরপরই ভীষণ হিমশীতল আওয়াজে ধ্বনিত হলো,
— গ্যাং গুলোকে কিনে নাও,রাজি না হলে একযোগে শুইয়ে দাও। জাস্ট রিমেম্বার ওয়ান থিংক,ইটালি ইজ নট আ ক্রিমিন্যাল জোন, বাট রাশিয়া ইজ দ্যা ডেসটিনেশন অফ মাফিয়া । আন্ডারওয়ার্ল্ডে এমন কোনো মাফিয়া গ্রুপ নেই যারা রাশিয়াকে ভয় না পায়। আই নো ভেরী ওয়েল দ্যাট ইউ’ল ম্যানেজ এভরিথিং।
নিঃশব্দে মাথা নাড়ালো তুষার , পরপরই প্রশ্ন ছুড়লো,
— আর ইউ্য আপসেট?
এতোক্ষণে নিজের পূর্বের ভাবনায় ফিরে এলো এরীশ। পাখির চোখে গোটা শহরটাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতেই তপ্তশ্বাস ফেলে বললো,
— পাইথন লিডারের পাওয়ার নিয়ে কারোর সন্দেহ নেই। এই যে শহরটা দেখছো, এখানকার প্রতিটি মানুষ আমার ভয়ে তটস্থ। এ্যান্ড আই ফাঁকিং এনজয় ইট, বাট….
কথার মাঝখানে থেমে গেলো এরীশ, তুষার একই সুরে বলে উঠলো,

— বাট?
— কেউ তো একজন আছে যে আমাকে ভয় পায়না। ভয় পায়না বলেই সে আমাকে শেষ করতে চায়, আমার দূর্বলতাকে পুঁজি করতে চায়। কিন্তু তার উদ্দেশ্য কি?
এরীশ যে সেই অজ্ঞাত সাইকোপ্যাথের বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত তা এতোক্ষণে অনুধাবন করলো তুষার। তৎক্ষনাৎ বেগবান হয়ে বললো,
— লেট মি ক্লিয়ার ওয়ান থিং ফার্স্ট, ওই ব্যক্তির টার্গেট শুধু আপনি একা নন, মিস ব্লু আইড এ্যাঞ্জেল আলসো।
এতোক্ষণে দৃষ্টি ঘোরালো মাফিয়া বস। নিস্পৃহ কণ্ঠে জবাব দিলো,

— আমার দূর্বলতা বলে কথা।
— আমার মনে হয়, ম্যানশনে শিফট করার সিদ্ধান্তটা এভাবে তাড়াহুড়ো নেওয়া উচিৎ হয়নি এরীশ।
সতর্ক গলায় কথাটা বললো তুষার। মূহুর্তেই নিজের অপারগতাটুকু আড়াল করে তুষারের দৃষ্টি এড়িয়ে ঘাড় সোজা করে সামনে তাকালো এরীশ।কিয়ৎক্ষণ নীরব থেকে জিভের ডগায় গাল ঠেলে এই প্রথমবার কথার মাঝে একটা অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ টেনে আনলো মাফিয়া বস,
— তুমি কখনো অনুভূতি আঁটকে রাখতে পারবে না তুষার। ফ্লোরা মেয়েটাকে অযথা কষ্ট দেওয়া বন্ধ করো।
সুকৌশলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছে মাফিয়া বস, ব্যাপারটা উপলব্ধি করে চোখে হাসলো তুষার। অথচ নিস্প্রাণ গলায় প্রত্যুত্তর করলো,

— ফ্লোরা আমার দ্বায়িত্ব। ওর দাদী খুব ভরসা করে আমার হাতে তুলে দিয়েছে মেয়েটাকে। আমার মতো নিকৃষ্ট একটা অমানুষকে যে বিশ্বাস করেছে, তাকে কিভাবে ঠকাই? অনুভূতি, কিংবা দূর্বলতা প্রকাশ করে শুধু শুধু মেয়েটাকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে চাইছি না।
— আটকাতে পারবেনা! যদি সত্যিই তোমার হৃদয়টা বেইমানী করে থাকে, তাহলে হাজার চেষ্টা করেও আটকাতে পারবেনা নিজেকে।
বিদ্রুপাত্তক স্বরে বাক্যকটা উগড়ে দিয়ে থামলো এরীশ। এই পর্যায়ে দেওয়ার মতো ঠিকঠাক যুক্তি খুঁজে পেলোনা যন্ত্রমানব। হঠাৎ করেই যেন শব্দহীন হয়ে পড়লো তার মস্তিষ্কটা। ঠিক সেই মূহুর্তে অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো মাফিয়া বসের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর,

— হৃদয়কে যদি শক্তি দিয়ে আটকানো যেতো, তাহলে এরীশ ইউভানের ট’র্চার সহ্য করতে না পেরে ঈশানী তুজ কর্ণিয়া এতোদিনে মাটির সঙ্গে মিশে যেতো তুষার। পৃথিবী ভুলে যেতো তার অস্তিত্ব। অথচ দেখো বেইমান হৃদয়ের কারণে আমি আজ নিজেকেই ভুলতে বসেছি।
এরীশের শেষ কথাটা ভীষণ করুন শোনালো তুষারের কানে, মনে প্রশ্ন জাগলো, সত্যিই কি হৃদয় নামক যন্ত্রটিকে আটকানো এতোই কঠিন?কই তুষার কখনো উপলব্ধি করেনি তো!
বিষন্ন মনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চলেই যাচ্ছিল তুষার। তখনই পেছন থেকে ডেকে উঠলো মাফিয়া বস। তুষার এগিয়ে এলে, ওর হাতে দু’টো হোটেল চেক-ইন এর টিকিট ধরিয়ে দিয়ে বললো,
— আমার তরফ থেকে তোমাদের ওয়েডিং গিফট। এনজয় ইউওর টাইম টুগেদার।

অফিস কক্ষ থেকে বেড়িয়ে সরাসরি নিজের রুমে ফিরেছে তুষার। ঘরের ভেতর পা রাখতেই ওর তৃষ্ণার্থ চোখ দু’টো ফ্লোরাকে খুঁজলো কয়েকবার। কিন্তু পেলোনা কোথাও। মেয়েটা এদিকে নেই, কিন্তু কিচেনেও তো ছিলনা, মাত্রই লাউঞ্জ থেকে হেটে এসেছে তুষার সেখানেও নেই, তাহলে হঠাৎ গেলোটা কোথায়?

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬২

অবচেতন মনে ফ্লোরাকে খুঁজতে খুঁজতে এদিক ওদিক তাকাতেই তুষারের দৃষ্টি গিয়ে আটকালো কফি টেবিলের উপর ভাঁজ করে রাখা একটা চিরকুটের উপর। যা দেখা মাত্রই ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে গেলো মানবের। চিরকুটটাকে লক্ষ্য করে নিঃশব্দে এগিয়ে গেলো কফি টেবিলের দিকে। যেন ওটা কোনো শত্রু পক্ষের মা’রণা’স্ত্র, তেমন করেই সর্তক হাতে তুলে নিয়ে ভাজ খুললো ওটার।
অতঃপর চিরকুটের ভেতরে যা লেখা ছিল তা পড়া মাত্রই মস্তিষ্কে খু’ন চেপে বসলো যন্ত্রমানবের।তৎক্ষনাৎ আসন্ন ক্রোধে হুংকার দিয়ে উঠলো সে,
— ফ্লোরা জাওয়াদ মিকাইইইল!

আমি শুধু চেয়েছি তোমায় পর্ব ৬৪