এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪১
আসিফা খান
সূর্য ঢলে পড়েছে পুব আকাশে। চারিদিকে এক মনোরম প্রকৃতি। হালকা গরমের মাঝেও শীতল হাওয়া বইছে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে কলেজের মেন গেটের বাহিরে কদম ফেলতেই চোখ পড়ে ওপাসের রাস্তায়। এক সুন্দর পুরুষ। গোল ফ্রেমের চশমা চোখে। পিঠ ঠেকিয়ে রেখেছে গাড়ির দরজায়। বুকে হাত গুজে আছে আবার মাঝে মধ্যেই হাত ঘড়ি দেখছে। ধৈর্য নিয়ে করছে কারোর অপেক্ষা।ইয়ানা দেখে সবটা। ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠে তৃপ্তিময় হাসি।। রিফাত গেট এর দিকে তাকাতেই দেখে ইয়ানা তাকিয়ে আছে তার দিকেই। হাত উঠিয়ে ওখানেই থামতে বলে ইয়ানাকে। নিজে রাস্তা পেরিয়ে ইয়ানার সম্মুখে দাঁড়ায়।। কোন রকম কথা না বাড়িয়ে আপন প্রেয়সীর হাতের মাঝে হাত গলিয়ে গাড়ির সামনে নিয়ে আসে। দরজা খুলে তাকে বসিয়ে দিয়ে নিজে বসে ড্রাইভিং সিটে।।
ইয়ান া সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ কোরে হাতের ব্যাগটা পিছনের সিটে রেখে অস্পষ্ট শব্দ করে,,,”উফফ”
রিফাত এসি চালায়। সমস্ত জানালা বন্ধ কোরে হাত রাখে ইয়ানার তপ্ত গালে। বলে ওঠে,,,”বেশি ক্লান্ত?”
“কোমড়ে ব্যথা হচ্ছে।”
গ্লান কন্ঠে বলে ইয়ানা।তিন ঘণ্টা একই জায়গায় বসে পরীক্ষা দিয়েছে। ব্যাথা হওয়া সাভাবিক। রিফাত কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে আসে একদম ইয়ানার সামনে। দুই হাত কাপড় ভেদ করে রাখে উন্মুক্ত কোমড়ে। ইয়ানা বিচলিত হয়। ত্বরিত ঘটে যাওয়া ঘটনার সে কিছুটা অবাক। রিফাত এর বিশাল হাতের হালকা স্পর্শে পীড়া উপশম হয়।
বেশ কিছুক্ষণ স্ত্রীর আদুরে সেবা করে রিফাত।
ইয়ানা ও বাঁধা না দিয়ে উপভোগ করে সব টা।
“ঠিক আছে এখন! নাকি বেশি ব্যাথা।
ব্যাথা আগের তুলনায় অনেক কম লাগছে। ইয়ানা ভারী শ্বাস টেন ে রিফাতের দাড়ি ছুঁয়ে দিয়ে ধীমে কণ্ঠে বলে,,,”উম,হু। আপনার শরীর কেমন আছে? জ্বর এসেছিল আর?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“নাহ। কি খাবে বলো।”
“কিছুই না,,,ইচ্ছে করছে না।”
রিফাত কাঁধ নাচিয়ে বলে,,,”আচ্ছা,,,তাহলে কি করা ,না খেয়ে থাকতে হবে দেখছি আজকে।”
ইয়ানা ঝটপট বলে,,,”কিই,,,আপনি দুপুরে খাননি?”
“বউ এর সাথে খাবো ভেবেছিলাম কিন্তু তার তো ইচ্ছেই নেই।”
“এই পাগল আপনি। একে অসুস্থ শরীর তার উপরে দুপুরে কিছু খাননি!?”
“আমি তো পাগল ছিলাম না তুমিই বানালে।”
“আহা,,,কথা দেখো,,,কোথাথেকে শিখেছেন এই রকম ডায়ালগ?”
“প্রেমে পড়লে এইরকম ডায়লগ আপনা আপনি বেড়ায়। বুঝলেন ম্যাডাম!”
“কার প্রেমে পড়েছেন আপনি?”
“আমার বউ এর।”
কথাটি একদম ইয়ানার মুখের সামনে ঝুঁকে বলে। ইয়ানা গলা কাশে। রিফাত এর বুকে হাত দিয়ে তাকে দূরে ঠেলে দিতে দিতে নার্ভাস হেসে বলল,,,
“খিদে পেয়েছে। চলুন খাবো।”
রিফাত অগোচরে বাঁকা হাসলো। গাড়ি স্টার্ট দিলো। এক হাত স্টেয়ারিংএ রেখে অপর হাত বাড়িয়ে মুঠোয় নিল ইয়ানার ঊরূতে রাখা চিকন হাত। ইয়ানা কেপে উঠল খানিক। রিফাত সেথায় চাপ দিতেই ইয়ানা ঠোঁট ফাঁক করে শাস টানে। ইয়ানা কিছু উচ্চারিত করার আগেই রিফাত বলে,,,”ডোন্ট ম্যাক এনি উইয়ার্ড সাউন্ড ইনু নাহলে ভুল হয়ে যাবে।।”
ইয়ানা ঢেঁকুর গিলে কোলের উপর নজর সীমাবদ্ধ রাখে। রিফাত আবারও বললো,,,
“পরীক্ষা কেমন হলো?”
“ভা ভালো।”
রিফাত আর কিছুই বললো না। একটা সময় গাড়ি থামে রেস্তোরার পাশে। ইয়ানার হাত ধরে রেস্তোরার ভেতরে প্রবেশ করে। টেবিলে বসে নানান পদের খাবার অর্ডার করে। ইয়ানা রীতিমত অবাক হয়ে বলে,,,”এত খাবার কে খাবে।”
রিফাত পকেট থেকে মোবাইল বের করতে করতে বলে,,,”কেনো? তোমার এই হার্ডি হাসবেন্ড কে চোখে পড়ে না। সে খাবে,,,তোমার মত একটুখানি খাবার তার পেটের এক কোনায় থাকবে।”
ইয়ানা খানিক লজ্জা পায়। চোখ ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকাতেই দেখলো তাদের থেকে কিছুটা দূরে দুই মেয়ে বসে আছে। এক কথায় তারা সুন্দরী। নাক খাড়া,চোখ টানা, বদনে ওয়েস্টার্ন পোশাক, অননে প্রসাধনীর প্রলেপ। তাদের নজর রিফাত এর পানে,,,খুবিই মন দিয়ে রিফাত কে দেখছে তারা। মাঝে মধ্যে রিফাত এর দিকে তাকিয়ে কি নিয়ে যেন বলা বলি করছে। রাগ হয় ইয়ানার। ইর্ষা হয় প্রচুর। ইয়ানা সামনের কালো থাই গ্লাসে নিজেকে একবার পরখ করে। সাধারণ একজন মেয়ে সে। শরীর ঢাকা লং গাউনে,মাথায় হিজাব। প্রসাধনী বলতে চোখের কাজল যা সময়ের সাপেক্ষে হালকা পাতলা লেপটে গেছে, শুভ্র চেহারায় হালকা ক্লান্ত ভাব, ঠোঁটের লিপবাম নেই হয়তো পরীক্ষার হলে নার্ভাসনেসে বার বার জীভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানোর কারণে সবটা পেটে। ইয়ানা কোণা চোখে তাকায় রিফাত এর দিকে। মানুষটা সর্বসময় সুন্দর,,,নিখুঁত পারফেক্ট। এক কথায় সুদর্শন পুরুষ। যার দিকে একবার কেউ তাকালে দ্বিতীয়বার ঘুরে তাকাতে বাধ্য হবে।।
ইয়ানা ঠোঁট গোল করে নিশ্বাস ত্যাগ করে।কেমন অস্থির লাগছে তার। রিফাত এর উদ্দেশ্যে বলে,,,” আমি একটু ওয়াশরুমে যাচ্ছি।”
রিফাত সম্মতি দেয়। ইয়ানা ওয়াশরুমের বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে আওড়ায়,,,”ইয়াহ আল্লাহ। মানুষটার সাথে যেনো আমাকেই মানায়। আমার প্রতিচ্ছবি যেন তার মনে ভাসে।আমিই যেনো তার শেষ হই। তাকে আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমার করেই রেখো।”
চোখে মুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে এল। নিজ টেবিলে দিকে যাওয়ার আগেই পা দুটি থমকে গেলো। সেই মেয়ে দুটির মধ্যে একজন রিফাতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আবেদময়ী ভাবে। রিফাত দেখছে না তার দিকে কিন্তু কথা হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে ইয়ানা।।
মুহূর্তে চোখ দুটো টলমল করে ওঠে তার। রিফাত তার দিকে তাকাতেই দীর্ঘ হাসি দেয়। উঠে এসে তার হাত ধরে মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে বলে,,,
“মাই ওয়াইফ।”
কথাটি শোনা মাত্র চুপসে যায় মেয়েটির মুখশ্রী। হাসার চেষ্টা করে বলে,,,”ওহহ।”
বলেই চলে যায়। রিফাত ইয়ানাকে বসিয়ে নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে তার আদ্র অনন মুছে দিতে থাকে। স্ত্রীর চোখের পানি নজর এড়ায়না তার। ইয়ানার অশান্ত ভাবও ঠাওর করতে পেরেছে।। রিফাত নিজ থেকেই বলে,,,
“টিস্যু পেপারে নিজের নাম্বার লিখে আমাদের টেবিলে রাখে। জিজ্ঞাসা করতেই বলে, সে আমার প্রতি ইন্টারেস্টেড। she is wanna date me.”
“আপনি কি বললেন?”(নাক টেনে জিজ্ঞাসা করে ইয়ানা)
“আমি বললাম,,,আমিও ইন্টারেস্টেড।”
ইয়ানা এবার হুহু করে কেঁদে ওঠে। নাক লাল রাঙা হয় মুহূর্তেই। হিচকি উঠা শুরু হলেই রিফাত হাত বাড়ায় তার দিকে। ইয়ানা ঝামটা দিয়ে তাহ সরিয়ে নেয়। রিফাত ফিচলে হাসে। জোর করে ইয়ানার দুই বাহু ধরে চিয়ার সহ নিজের কাছে টেনে আনে।। ইয়ানা আবারও নিজেকে ছাড়াতে চায়,,,বোকা মেয়েটা ভুললো যেনো রিফাত এর সব কথা,সমস্ত ওয়াদা। ইয়ানা ঠোঁট ফুলিয়ে ভাঙ্গা কন্ঠে বলল,,,
“আমাকে ছাড়ুন,,,যান তার কাছেই।”
“সত্যি যাবো!”
সাভাবিক কন্ঠ রিফাত এর। ইয়ানা এবার রেগে দেয় রিফাত এর পেটে এক গুতা। রিফাত আহ করে মৃদু শব্দ তুললে ইয়ানা বিচলিত হয়। ত্বরিত বলে,,,
“ব্যাথা পেলেন! সরি।”
রিফাত ইয়ানার হাত নিজের বুকের বা পাশে রেখে সহসা বলে,,,”এখানে ব্যাথা পেয়েছি।”
“বাজে পুরুষ।”
ইয়ানা এবার মাথা নিচু করে ফ্লোরের দিকে নজর যেতেই দেখে তার পায়ের কাছেই টিসু পেপার কুটি কুটি হয়ে পড়ে আছে। ইয়ানা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করতেই মাথায় কিছু আসে। ইয়ানা কে ইচ্ছা করেই ক্রুদ্ধ করেছে লোকটা। এতক্ষণে অর্ডার করা সমস্ত খাবার টেবিলে এসে হাজির হয়েছে। ইয়ানার ঠোটে বাঁকা হাসি। এর প্রতিশোধ সে নেবে,,,একদম অন্য ভাবে।। দুই জনে চুপ চাপ খাওয়া শুরু করলে ইয়ানা দেখে কিছু ফুটপাতের বাচ্চা গেটের ওই পাশ থেকে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ইয়ানার মায়া হয়।মনে পড়ে তার মায়ের কথা। ইয়াসমিন বেগম বলেন,,,”গরিব দুঃখীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে আল্লাহ মন নরম করে।। এতিম দুঃখী দের সাথে ভালো আচরণ আল্লাহর কাছে ভীষণ প্রিয়।”
ইয়ানা রিফাত এর বাহু ধরে নিজের সান্নিধ্যে টেনে তাদের দিকে ইশারা করে বললো,,,”ওদের ডাকি?”
রিফাত ইয়ানার ইশারা অনুসরণ করে বাইরের দিকে তাকাতে তারও হৃদয় নরম হয়। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতেই ইয়ানা তিন বাচ্চাদের ভেতরে নিয়ে আসে। রিফাত আরো খাবার অর্ডার দেয়। দুই জন ছেলে বয়স তাদের আট থেকে দশ এর মধ্যে,,,আর এক জন মেয়ে তার বয়স প্রায় পাঁচ কিংবা ছয় হবে,,,ইয়ানা অনুমান করে। রিফাত তাদের সাথে কথা বলে মিষ্টি সুলভ ভাবে। নানান প্রশ্নের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে তারা এতিম। মা বাবা কে চোখেই দেখিনি। তিন ভাই বোন তারা। নাম না জানা ঠিকানায় থাকে। কাপড় চোপড়ের অবস্থা কাহিল। নোংরা,ময়লা যুক্ত শরীর। ইয়ানার কান্না পায় ভীষণ। ইসস,,,জীবন টা কতই কঠিন তাদের জন্য।
আহিল অস্থির। তার পাশে বসে থাকা মায়াবী নারীটি তার দিকে তাকাচ্ছে পর্যন্ত না। সেই প্রণয়ময় রাতের পর কেটেছে বেশ কিছুদিন। আতিকাকে সেই রাতের পরের দিনই তার বাবার বাড়ি রেখে আসে। তারপর থেকে মেয়েটা কেমন চুপ হয়ে গিয়েছে। ফোন করলে বেশি কথা বলে না, মেসেজের রিপ্লাই দেয় না, দেখা হলেও কেমন নিরব হয়ে থাকে মেয়েটা।। আজ কলেজ থেকে তাকে পিক করতে আসলেও মেয়েটা নিঝুম হয়ে তার পাশের সিটে বসে পড়ে।। অপরাধবোধ কাজ করছে আহিলের মাঝে। জোর আওয়াজে হঠাৎ গাড়ি ব্রেক করে সে। আতিকা চমকে উঠলো। আহিলের দিকে তাকাতেই দেখে ছেলেটা ভারিক্কি নিঃশ্বাস নিতে নিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আতিকা কে অবাক করে দিয়ে আহিল তার হাত আকড়ে ধরে,,,অসহায় ভঙ্গিতে বলে,,,
“আমি কি কোনো ভুল করেছি আতু? বিশ্বাস করো,,,সেদিন রাতে আমি নিজের মাঝেই ছিলাম না। আমার সময় নেওয়া উচিত ছিল।”
আতিকা স্তব্ধা হয়ে তাকিয়ে রইল আহিল এর দিকে। আতিকা আহিল এর কথার অর্থ ঠাওর করতে পারে,,, অতিশয় লজ্জিত হয়। চোখে মুখে চকিত ভাব ফুটিয়ে বলে,,,
“এইসব আপনি কি বলছেন আহিল! আপনি ভুল ভাবছেন আমাকে।”
“সেদিনের পর থেকে কথা বলছো না আমার সাথে। ইগনোর করছো,ফোনে জবাব দিচ্ছ না, মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছ না, আমার কাছে আসলে কেমন জড়োসড় হয়ে বসে থাকো।”
“আপনি,,,,আপনি। মানে,,,আমি”
আহিল এবার দুই হাতের মাঝে আতিকার মোলায়েম মুখশ্রী আগলে ধরে, চোখে চোখ রেখে বলে,,,”দ্বিধাহীন ভাবে সব বল আতিকা। আমি অস্থির।”
“আসলে আমি,,,, মানে,,, আমার ভীষণ লজ্জা পাচ্ছিল। আপনার গলার আওয়াজ শুনলে, আপনার কাছে আসলে আমার অনেক লজ্জা করত তাই,,,”
কথাটি বলেই মাথা নিচু করে নেয় আতিকা। এদিকে আহিল অবাক হয়ে কিছুক্ষণ আতিকার দিকে তাকিয়ে থেকে হু হা করে হেসে ফেলে উচ্চ স্বরে। শরীর কাঁপিয়ে হাসছে সে। হাসতে হাসতে কপাল ঠেকায় গাড়ির স্টেয়ারিংএ বলে,,,
“আল্লাহ,,, এ কোন লজ্জাবতী বউ দিলে আমায়!
নিজে লজ্জা পেয়ে আমায় বিশ্রামহীন বানায়।”
হাসি চেপে রেখে গভীর চোখে আতিকার দিকে তাকিয়ে,,মাধুর্য কন্ঠে বলে,,,”তাহলে এর পর যতবার তোমার সাথে রোমান্টিক নাইট স্পেন্ড করবো, ততবার তুমি আমায় ইগনোর করবে! একই বাড়িতে থেকে পালিয়ে বেড়াবে!”
আতিকা ভাষা হারায়। কান ঝালাপালা হয়ে যায় তার। মানুষটা তো তাকে আরও বেশি লজ্জায় ফেলছে। আতিকা খানিক রাগ দেখিয়ে বলে,,,”বাড়ি যাবো আমি।”
“উম হুঁ,,,আমাকে ইগনোর করার পানিশমেন্ট বাকি আছে।”
আহিল এর কণ্ঠ কেমন যেনো। আতিকা ভড়কে যায়। শুকনো ঢোক গিলে মনে মনে বলে,,”এই রে,,,এবার কোথায় যাবো আমি।”
আতিকা দরজা খোলার চেষ্টা করলেই আহিল তার দিকে এগিয়ে এসে বলে,,,”লক করা,,, জান।”
আতিকা মিন মিন কন্ঠে বলে,,,”পানি,,,”
আহিল পানির বোতলে এগিয়ে দিতে আতিকা ঢক ঢক করে সব পানি গলায় চালান করে। পানি খাওয়ার ফলে ঠোঁটে লেগে আছে বিন্দু বিন্দু জলের ফোঁটা যাহ আহিলকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে। সময় নষ্ট না করেই আতিকাকে নিজের সান্নিধ্য টেনে এনে হাত রাখে পৃষ্ঠদেশে। মুহূর্তেই অধরের মালিকানা হারায় আতিকা। হাত পৌঁছায় আহিলের বুকের উপর। দীর্ঘ শক্ত ব্যথাতুর চুম্বনে রক্তিম হয় আতিকার নরম অধর।
নীরবতা বিরাজ করেছে গাড়ির মধ্যে। ইয়ানা কে মন মরা হয়ে বসে থাকতে দেখে রিফাত বলে,,,
“কি হলো! মন খারাপ কেনো?”
“ওই বাচ্চা গুলোর জন্য। আমার খুব খারাপ লাগছে। তাদের জীবনটা ওরকম না হলেও পারতো।”
রিফাত এক হাত বাড়িয়ে ইয়ানার হাত ধরে টেনে এনে হাতের পিঠে চুম্বন একে দিয়ে বলে,,,”আমার এক ফ্রেন্ডের একটা এতিমখানা আছে। ছোট কিন্তু সেখানে বাচ্চাদের যত্ন খুব ভালোই হয়। আমি গিয়েছি সেখানে অনেক বার। ওই বাচ্চা গুলো যেখানে প্রায় থাকে আমি ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে সেই ফ্রেন্ড কে বলে দিয়েছি। খুব দ্রুতই তারা একটা থাকার জায়গা পাবে, মাথার উপরে ছাদ পাবে, আর আমরা মাঝেমধ্যে গিয়ে তাদের সাথে দেখা করে আসবো। ঠিক আছে!
ইয়ানা অবাক চোখে চেয়ে রয় রিফাতের দিকে। আবেগ উৎফুল্ল হয়ে এক প্রকার লাফিয়ে রিফাত এর গলা জড়িয়ে ধরে। রিফাত হালকা হেসে এক হাতে ধরে ইয়ানা কে,,,দ্রুত বলে,,,”আরে,,, ড্রাইভ করছি তো।”
ত্বরিত ইয়ানা সরে আসে। রিফাতের হাতের তালুতে একটা চুমু দিয়ে বলে,,,”অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমি বলে বোঝাতে পারবো না আমি কত খুশি হয়েছি। আল্লাহ আপনাকে কবুল করুক রিফাত।”
রিফাতের হৃদয়ে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া এরকম সুন্দর হেদায়েতময় দোয়া কে পছন্দ করে! ইয়ানা রিফাতের জীবনে আল্লাহর দেওয়া রিজিক। রিফাত এটা মানে, হাজারো শুকরিয়া জানায় আল্লাহ কে প্রতি মুহূর্তে।
একটা সময় গাড়ি ব্রেক করে, ইয়ানা আশে পাশে তাকাতেই দেখে কোন এক হসপিটালের সামনে আছে তারা। ইয়ানা ভ্রু কুঞ্চিত করে। রিফাতের উদ্দেশ্যে বলে,,, “আমরা এখানে কেন?”
রিফাত উত্তর দেয় না। সে গাড়ি থেকে বেরিয়ে ইয়ানাকে বের করে। হাতের মাঝে হাত গলিয়ে দিয়ে সামনের দিকে হাটা দিতে দিতে বলে,,,”হাত ছাড়বে না।”
“কে অসুস্থ?
রিফাত,,,,,,কিছু বলুন।
দাদু! দাদু ঠিক আছে তো!”
ইয়ানা এরকম আরো নানা রকম প্রশ্ন করে কিন্তু রিফাত কোনো উত্তর দেয় না। ইয়ানার মনের মাঝে ঝড় বয়ে চলেছে। এক অজানা আশঙ্কা ঘিরে ধরেছে তাকে। একটা সময় লিফট থেকে বেরিয়ে একটা কেবিনের সামনে দাঁড়ায়।। ইয়ানা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রিফাত এর পানে চাহিলে রিফাত বলে,,,
“চলো,,,”
ইয়ানা দুরু দুরু বুকে এগিয়ে যার। সামনে তাকাতেই দেখে এক লোক বসে আছে ,তার সামনের বেডে শুয়েছে এক বয়স্ক মহিলা। হাতে সেলাইন,মুখে অক্সিজেন মাস্ক। ইয়ানা তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করতেই তার মস্তিষ্ক চাগাড় দিয়ে ওঠে, সেই লোকটা আর কেউ নয় তার আপন চাচা আর বেটে শুয়ে থাকা মৃত্যুর সাথে লড়াই করা মহিলাটি তার আপন দাদী।ইয়ানা বুক ভরে শ্বাস টানে,,, তার দমের কষ্ট হচ্ছে। চেপে ধরে রিফাত এর হাত।। ইয়ানা চেনে এই মানুষগুলোকে,, ইয়াসমিন বেগম চিনিয়েছে। ইয়ানা জানে এই মানুষগুলোর নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড, তার মায়ের প্রতি করা অবিচার। ইয়ানা দাতে দাঁত পিষে চয়াল শক্ত করে। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা জল বিন্দু।।
ইয়ানার চাচার নজর যেই না তাদের দিকে পড়ে অমনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। এক প্রকার ছুটে এসে ইয়ানাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতে,,,কিন্তু তার কর্মের আগেই ইয়ানা দুই পা পিছিয়ে যায় হাত দিয়ে থামায় তাঁকে।। থমথমে খেয়ে যায় সেই লোকটা,, লজ্জায় পড়ে যায় কিছুটা। ভাঙ্গা কন্ঠে বলে,,,
“আমাদের কর্ম মাফ করার মতো নয় আমি জানি রে মা। বিশ্বাস কর যবে থেকে আমাদের ভুল স্বীকার করেছি ,,তবে থেকে অনুতপ্ত আমরা। অপরাধবোধে ধুকে ধুকে মরছি। দেখ তোর দাদিকে,, একেই হয়তো বলে পাপের ফল। আজ আমরা নিঃস্ব আমাদের কাছে কিচ্ছু নেই।। যেই টাকা, সম্পত্তির জন্য তোর মাকে আমরা বাড়িছাড়া করেছি আজ সেই টাকা সম্পত্তি বালুর মতো উড়ে গিয়েছে আমার জীবন থেকে। না আছে সংসার না আছে মাথার উপর ছাদ,,,সত্যি এটা পাপের ফল।”
ইয়ানা চুপ চাপ শোনে,,,কোনো প্রকার উত্তর করে সে। এদিকে কথোপকথনের আওয়াজে ইয়ানার দাদি চোখ খুলে, হাতের ইশারায় ইয়ানাকে কাছে ডাকে। ইয়ানা রিফাতের দিকে তাকায় অসহায় ভঙ্গিতে,, রিফাত আশ্বাস দিয়ে তাকে যেতে বলে তার দাদীর কাছে।। ইয়ানা ধীরে ধীরে কদম বাড়ায়। দাদের কাছে যেতেই,,,মহিলা টি তার হাত আঁকড়ে ধরে,,, অক্সিজেন মাস টেনে খুলে দিয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠে। অসুস্থ স্বরে বলে,,,
“আমাকে মাফ কর রে,,, তোর এই অসহায় দাদীকে মাফ করে দে।। দুনিয়ায় এত বেশি হারিয়ে গিয়েছিলাম যে আখিরাতের কথা মনে ছিল না ,,আর যখন মনে হল তখন অনেক দেরি হয়ে গেল।। আমি আর বেশি দিন নেই রে,,,আমাকে মাফ করে দে। ইয়াসমিনকে বলিস এই পাপি শাশুড়ি মা কে মাফ করে দিতে,,, তোরা মাফ না করলে যে আমার মরেও শান্তি হবে না।
তোর মায়ের সাথে করা অন্যায় অত্যাচার, তোর সাথে করা অবিচারের সাজা এটা।। কিভাবে পারলাম সেই নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে! কিভাবে পারলাম নিজের ছেলের অংশ আপন নাতনিকে খাদে ঠেলে দিতে!”
তিনি আর বলতে পারলেন না। শাস ভারী হচ্ছে তার ধীরে ধীরে। ইয়ানা ঘাবড়ে যায়,,,চাচা জোরে জোরে ডঃ কে ডাকলে,,, রিফাত ঝটপট এগিয়ে এসে অক্সিজেন মাস্ক মুখে লাগিয়ে দেয়।। ইয়ানা দৌড়ে বেরিয়ে যায় হসপিটাল থেকে। রিফাত ও তার পিছনে ছুটে যায়।
আকাশ আজ ঝলমলে। রাতের অন্ধকারে প্রদীপ এর মত জ্বলজ্বল করছে শুভ্র চাঁদ। ইয়ানা দাড়িয়ে ব্যালকনির রেলিং ধরে। উদাস মন তার। হসপিটাল থেকে রিফাত তাকে বাড়িতে ছেড়ে কোনো এক কাজের জন্য বেরিয়ে যায়। সারা রাস্তা কেউ কারোর সাথে কথা বলেনি বললে ভুল হবে,,,রিফাত কথা বলতে চেয়েছে কিন্তু ইয়ানা বলেনি।।
“রাতে খাওনি কেনো?”
আচানক কারোর কণ্ঠে ভাবনায় বিভোর থাকা ইয়ানা চমকে উঠলো। চিরচেনা ঘ্রাণে অনুভব করলো মানুষ টি কে। ইয়ানা তাকালো না,,,শুধুই বললো,,,”ইচ্ছে হয়নি।”
রিফাতের পাশ কাটিয়ে ইয়ানা যেতে নিলে রিফাত খপ করে ধরে তার বহু,,,টেনে আনে নিজের কাছে।
ইয়ানা মুচরামুচরি করতে করতে বলে,,,”ছাড়ুন,,,”
রিফাত অস্থির হয়। রুক্ষ ইয়ানা তার অন্তরের অচিন ব্যাথা। ইয়ানা ছুটতে চাইলে পারে না ততক্ষণে রিফাত নিজের বুকের সহিত আগলিয়ে নিয়েছে। ইয়ানা লম্বা শাস টানে। রিফাত ইয়ানার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,,,
“গত ১০ দিন তোমার চাচা আমার নার্সিংহোমের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করত। আমি এড়িয়ে গেলেও বারবার আমাকে অনুরোধ করত তোমাকে একবার যাতে তোমার দাদীর সাথে দেখা করাতে নিয়ে যাই। একটা মানুষের এতবার করা অনুরোধ আমি ফেলতে পারিনি ইয়ানা। তোমার চাচা সত্যি বলছেন কিনা,,সে কথাটা যাচাই করতে আমি হসপিটাল পর্যন্ত যাই কিন্তু তোমার দাদীর সিরিয়াস সিচুয়েশন দেখে তোমাকে নিয়ে যেতে বাধ্য হই।”
ইয়ানা এবার ডুকরে কেঁদে ওঠে। চোখ তার ভাসমান। আজ বাবার কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। মন খারাপ তার ভীষণ। রিফাত এর বুকের কাছের শার্ট আঁকড়ে ধরে। রিফাত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ইয়ানার কান্না তার অসহ্য ঠেকছে এখন। কিন্তু ইয়ানা কে সে থামাতেও চায় না। কাদুক,,, মন হালকা হবে। ইয়ানা কাঁদদে কাঁদদে বলে,,,
“রিফাত তারা কত সহজেই ক্ষমা চেয়ে নিল,, কিন্তু তারা কি জানে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর আমার মায়ের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল! দাদু যদি আশ্রয় না দিত তাহলে আজ আমরা কোথায় হতাম! কি হতো আমাদের!
আমি কি তাদের ক্ষমা করতে পারবো?”
“কেন পারবে না? অবশ্যই পারবে। যারা ক্ষমা করে তারা শ্রেষ্ঠ। আমরা তো কতই গোনাহ করি কিন্তু আমাদের একবার বলাতে আল্লাহ কি আমাদের মাফ করে দেয় না,,!ইয়ানা!,,, যদি সৃষ্টির কর্তার কাছে ক্ষমা থাকতে পারে তাহলে আমাদের কাছে কেন নয়!,,, তোমার দুঃখ, খালা মার কষ্ট কেউ কখনো উপলব্ধি করতে পারবে না। তোমার ইচ্ছাই আমার কাছে মুখ্য।”
ইয়ানা অশ্রুসিক্ত নয়নের রিফাতের দিকে তাকায়। ছেলেটার বলা এক একটা কথা যেন পাথরে টানা দাগের মতো। সত্য,, নিদারুণ সত্য।। রিফাত আলতো স্পর্শ করে মুছে দেয় চোখের পানি। ললাটে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দেয়। ইয়ানা সবটা অনুভব করে।।
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪০
“মানুষ দুঃখ কেনো দেয়! সুখ কি অনেক দামী!”
ইয়ানার প্রশ্নে রিফাত হালকা হেসে বলল,,,”দুঃখ না আসলে সুখের মর্ম বুঝবে কি করে?”
ইয়ানা চুপটি হয়ে পড়ে রয় রিফাত এর বুকে। কিছুক্ষন পর হতেই রিফাত ইয়ানা কে পাঁজা কোলে তুলে নেয়। বিছানায় শুইয়ে ইয়ানা কে টেনে নিজের সত্তায় মিশিয়ে ফেলে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। একটা সময় ইয়ানার ভারী নিশ্বাস এর শব্দ পাওয়া যায়।
