Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১২

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১২

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১২
নুসরাত ফারিয়া

-“কাজ কতদূর?”
-“আঙ্কেলের সাথে কথা বলা শেষ। উনি খুব শীঘ্রই ডিভোর্স পেপার নিয়ে আসবেন। জরুরী কাজের জন্য শহরের বাহিরে গিয়েছেন। তাই কিছুটা দেরি হচ্ছে।”
-“আচ্ছা, সমস্যা নেই।”
-“যা করছিস ভেবে করছিস?”
-“হুম। তোর ভাবী চায় না আমার সাথে সংসার করতে। আমি ওকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ও এক কথাতেই আঁটকে আছে। প্রতিদিন অশান্তি আর ভালো লাগে না। রাতবিরেতে ক্লাবে গিয়ে পার্টি করা থেকে সবকিছু করে। ওকে বহুবার বলেছি ভালো হয়ে যেতে, কিন্তু ও আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম ওকে ডিভোর্সই দিবো। তারপর দেখি ও কী করে বা কার কাছে যায়।”
ইয়াসিনের কথা শুনে আধার কফির মগে চুমুক দিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“কিছু কিছু মানুষ বড্ড বেইমান। এরা কখনোই ভালোবাসা ডিজার্ভ করে না।”
ইয়াসিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, -“দিনশেষে আমরা ভুল মানুষকেই ভালোবেসে ফেলি। তারপর পস্তাতে হয়!”
-“এইজন্যই আই হেট লাভ।”
ইয়াসিন কফির মগে ঠোঁট ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করল, -“শুনলাম বিয়ে করেছিস?”
-“হু!”
-“সংসার টিকবে?”
-“জানি না!”
-“মেয়ে কেমন? না মানে তোর ভাবীর মতো না তো আবার…!”
-“উঁহু! সে সবার থেকে আলাদা।”
ইয়াসিনের যুক্তিকে নাকচ করে কাঠকাঠ গলায় জবাব দিল আধার। তারা একটা ক্যাফেতে বসে থেকে কফি খাচ্ছে আর কথাবার্তা বলছে। মূলত আজ ইয়াসিন-ই ডেকেছে স্কুল, কলেজ জীবনের বন্ধু আধারকে। ভার্সিটি শেষে সন্ধ্যার দিকে এখানে এসে উপস্থিত হয় আধার। ইয়াসিনের দাম্পত্য জীবনে ঝামেলা চলছে। তাই সে যেটুকু পারছে ওইটুকু সাহায্য করার চেষ্টা করছে। যেখানে তার নিজের সংসারটাই এলোমেলো হয়ে আছে।

-“ভালোবাসাতে বিশ্বাস করিস না, অথচ বিয়ে করে ঠিকই বসে আছিস। এটা কেমন লজিক হুহ্?”
বন্ধুর কথা শুনে ঠোঁট প্রসারিত করে হালকা হাসল আধার। তারপর বলল, -“কী করব বল? দাদাজান জোকের মতো পিছনে লেগে ছিল। শেষমেশ উনার ইচ্ছেটাকেই পূরণ করলাম।”
-“ভালো করেছিস। আর কতদিন একা থাকতিস। জীবনে চলার পথে একটা সঙ্গী থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটা যদি হয় সঠিক মানুষ!”
আধার প্রতিত্তোরে কিছু বলল না। তার চোখের দৃষ্টি তো এখন অন্য এক জায়গায় নিবদ্ধ।
-“আপু এটা না, এটা না! এটা আমি খাবো।”
ছায়া তড়িঘড়ি করে লাস্ট পিস চকলেট ব্রাউনি নিতে যাবে তার আগেই আলো চিলের মতো ছো মে’রে ওটা নিয়ে মুখে পুরে নিল। সঙ্গে সঙ্গে তার গালদুটো ফুলে উঠলো। বড় বোনের কান্ড দেখে মায়া ফিক করে হেঁসে দিল। ছায়া গোমড়া মুখে বলল,

-“এটা তুমি ঠিক করলে না আপু। যাও তোমার সাথে কথা বলব না।”
আলো খেতে খেতে হেঁসে দেয়। তারা কক্সবাজার থেকে তিনদিন আগে ফিরে এসেছে। কারণ আলোর আর দু’দিন পরই পরীক্ষা। আজ রাতে মেঘলা চলে যাবে, তাই রহিত সবাইকে নিয়ে রাতের শহর ঘুরতে বেড়িয়েছিল। পাশের এলাকার এই ক্যাফের কফি ও ডেজার্ট আইটেম বেশ ফেমাস হওয়ায় এখানে আসা হয়েছে। অফিসে কাজের চাপের জন্য মাহিন আসতে পারেনি। তারা দু’জন সমবয়সী-ই!
-“আচ্ছা এখন চলি! অনেক রাত হয়ে এল। আকাশটাও ভালো নেই। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।”
ইয়াসিনের কথা শুনে আধার সামনে থেকে নজর সরিয়ে বাহিরে তাকায়। হালকা বাতাস বইছে! মাঝেমধ্যে আকাশ গর্জেও উঠছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। হঠাৎই আধারের চোখের সামনে সেই দিনের অপ্রত্যাশিত কিছু দৃশ্য ভেসে উঠলো। এমনই একটি বৃষ্টিময় রাতে ছাঁদে গান গাইতে গাইতে নৃত্য করছিল এক স্নিগ্ধ রমণী। যাকে দেখে না চাইতেও সে এক মূহুর্তের জন্য নিজেকে হারিয়েছিল! এবং থেমেছিল অশান্ত হৃদয়…
আধার তপ্ত শ্বাস ফেলে সব চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে এক চুমুকে কফি খেয়ে নিল। তারপর বিল মিটিয়ে ইয়াসিনের সঙ্গে উঠে গেল।

-“আসসালামু আলাইকুম দুলাভাই। আপনি এখানে?”
ছায়া বড় বোনের ওপর রাগ করে বাহিরে চলে এসেছিল। উদ্দেশ্য ছিল রিকশা ধরে চলে যাওয়ার। তখন দুলাভাইয়ের মতো কাউকে দেখতে পায়। তাই সে কৌতূহল হয়ে রাস্তার পাশে এগিয়ে আসে। তারপর উপরোক্ত বাক্যটি বলে।
ইয়াসিন চলে যাওয়ার পর আধার পার্কিং প্লেসের দিকে যাচ্ছিল। তখন পিছন থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর শুনে থেমে যায়। এবং পিছনে ফিরে দেখে তার শালী সাহেবা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আধার সালামের জবাব দিয়ে বলল,
-“কিছু কাজ ছিল। কিন্তু তুমি এখানে?”
-“আপুদের সাথে ঘুরতে এসেছি।”

আধার কপাল স্লাইড করতে করতে আশেপাশে তাকিয়ে বলল, -“আইসক্রিম খাবে?”
আইসক্রিমের কথা শুনে ছায়ার চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো। আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল, -“এসো।”
আলো, মায়া, মেঘলা ও রহিত বাহিরে এসে ছায়াকে খুঁজতে লাগল। ততক্ষণে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। আলো মনে মনে ছোট বোনকে বকাবকি করে নিজের ফোনটা বের করল ব্যাগ থেকে। এই মেয়েটা আবার কোথায় গেল কে জানে! আলো পাশে ফিরতেই দেখতে পায়—ছায়া হাতে করে এক গুচ্ছ চকলেট, চিপস, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে আসছে। এতকিছু দেখে আলোর কপাল কুঁচকে গেল। সে খ্যাক করে বলল,
-“কার পকেট মে’রেছিস হুহ্? নাকি কোনো দোকান লুট ক…!”
বাকী কথা বলতে পারল না আলো। তার আগেই অতি পরিচিত একখানা সুদর্শন চেহারা দেখতে পেয়ে চমকে উঠলো। ঠিক কতদিন, কত রাত পর এই মানুষটাকে দেখছে? উমম…..১১ দিন, ১১ রাত, ১৫,৮৪০ মিনিট এবং ৯,৫০,৪০০ সেকেন্ড পর মানুষটাকে দেখছে আজ।

-“তুমি আমার খাবার মে’রেছো। তাই আমিও তোমার বরের পকেট মে’রেছি। হিসাব বরাবর আপু!”
ছায়া বোনের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে। আলো নিজেকে সামলিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায়। ছায়া মুখ ভেংচি কেটে সরে গেল। ছোট বোনের স্বামীকে দেখে রহিত এগিয়ে এসে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল। আধারও ভদ্রতার খাতিরে টুকটাক কথাবার্তা বলল।
মুষলধারে বৃষ্টি পড়তেই মেঘলা হকচকিয়ে উঠে বলল,
-“তাড়াতাড়ি রিকশা ডাকো। নয়তো আজ রাত এখানেই থাকতে হবে।”
রিকশা করে ঘুরে বেড়ানোর জন্য রহিত আজ গাড়ি নিয়ে আসেনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, না নিয়ে এসেই ভুল করেছে। তার ভাবনার মাঝেই তাদের সামনে এসে একটা কালো রঙের গাড়ি থামে। জানালার কাঁচ নামিয়ে আধার সকলের উদ্দেশ্যে বলল,

-“গাড়িতে উঠে এসো। আমি তোমাদেরকে ড্রপ করে দিচ্ছি।”
ছায়া আর মায়া গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটে ঢুকে পড়ল। কারণ তারা এত রাতে ভিজতে চায় না। অলরেডি অর্ধেক ভিজেই গেছে। মেঘলা থমথমে মুখে রহিতের দিকে তাকায়। রহিত কিছু একটা ভেবে ইশারা করে ভেতরে বসতে বলল। মেঘলা চুপচাপ গিয়ে মায়ার পাশে উঠে বসল। এখন বাকী আলো ও রহিত। কিন্তু সিট ফাঁকা মাত্র একটা। তাও আধারের পাশের সিট।
-“তুই গিয়ে বস। আমি রিকশায় করে যাচ্ছি।”
ভাইয়ার কথা শুনে আলো চটপট করে বলে উঠলো, -“তুমি গিয়ে বসো ভাইয়া। আমি রিকশায় করে যাচ্ছি।”
-“মাথা ঠিক আছে তোর? ক’টা বাজে দেখেছিস? এত রাতে কি-না তুই ওই নির্জন পথ দিয়ে একা ফিরবি? সিরিয়াসলি?”
রহিতের ধমকে কেঁপে উঠলো আলো। বিরবির করে বলল,

-“তাহলে তুমি একা ফিরতে চাচ্ছো কেন?”
-“কারণ আমি ছেলে আর তুই মেয়ে।”
-“আমাদের দু’জনের শরীরেই কিন্তু কিডনি, লিভার, হার্ট আছে।”
রহিত দাঁত কিড়মিড় করে তাকায়। আলো গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে রইল। আধার কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মেঘলা কিছু একটা ভেবে রহিতের উদ্দেশ্যে ফট করে বলে উঠলো,
-“আপনি বরং ড্রাইভ করুন। আর আলো দুলাভাইয়ের কোলে বসুক। তাহলেই আর কাউকে রিকশায় করে যেতে হবে না।”
একথা শুনে আলোর চোখদুটো কপালে উঠে গেল। সে কিছু বলতে যাবে তখনই রহিত ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল, -“নাইস আইডিয়া মেঘ।”
তারপর দুলাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“নিজের বউকে কোলে নিতে আপনার কোনো অসুবিধা আছে দুলাভাই? আমরা কিন্তু…মাইন্ড করব না প্রমিস!”
আধার ঠোঁট কামড়ে আশেপাশে তাকায়। ধীরে ধীরে আবহাওয়াটা খারাপ হচ্ছে। সে কিছু না বলে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে পাশের সিটে এসে বসল৷ রহিত মনে মনে হেঁসে ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। আধার সিট বেল্ট বেঁধে আলোর ভেজা চেহারার দিকে তাকিয়ে আওরায়,

-“সারারাত কী এখানেই থাকবে? নাকি তোমার জন্য প্লেন বুক করব?”
আলো থম মে’রে দাঁড়িয়ে আছে। সে চাচ্ছে না ওই লোকটার কোলে বসতে। দু’দিন পর তাকে ডিভোর্স দিবে, আর এখন কিনা কোলে উঠতে হবে। এইদিকে আধার গম্ভীর মুখে বসে থাকল। রহিত রাগান্বিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আলোকে ধমক দিতেই মেয়েটা চুপচাপ এগিয়ে এল।
গাড়ির ভেতর উঠে স্যারের কোলে বসতেই নিঃশ্বাস আঁটকে গেল আলোর। কোনোমতে দাঁত খিঁচে চোখমুখ বুঁজে মটকা মে’রে বসে থাকল। লজ্জায় তার বাতাসের সাথে ফুড়ুৎ করে উড়ে যেতে ইচ্ছে করছে। এমন পরিস্থিতিতে যে পড়তে হবে, সেটা কখনো কল্পনাও করেনি। আধার হাত বাড়িয়ে ডোর লাগিয়ে দিতেই রহিত গাড়ি স্টার্ট দিল। পিছনে বসা ছায়া, মায়া ও মেঘলা মিটমিট করে হাসছে আর ফাসুরফুসুর করে কিছু একটা বলাবলি করছে। তারা আজ আচ্ছা মতো জব্দ করতে পেরেছে ত্যাড়া মেয়েটাকে।
আলোকে লজ্জা পেতে দেখে রহিত ভেতরের বাতি নিভিয়ে বলল, -“নে এখন আর লজ্জা পেতে হবে না।”
আলো নিভে যেতেই মেয়েটার হার্টবিট বেড়ে গেল। সে হাসফাস করতেই কোমরের কাছে শক্তপোক্ত, বলিষ্ঠ হাতের কঠিন ছোঁয়া অনুভব করল। একই সাথে কানের কাছে গরম নিঃশ্বাসের অস্তিত্ব টের পেতেই জমে বরফ হয়ে গেল মেয়েটা। দূরে সরে আসার চেষ্টা করতেই শুনতে পেল হিসহিসিয়ে বলা কিছু বাক্য,
-“চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মতো বসে থাকো। নয়তো চলন্ত গাড়ি থেকে রাস্তায় ছুঁ’ড়ে মা’রব মিস. কালো!”

কথায় আছে বিপদে পড়লে বাঘ ঘাসও খায়। ঠিক তেমনই আজ আলো বিপদে পড়ে পুরো রাস্তা স্যার ওরফে স্বামীর কোলে বসে থেকে এসেছে। তখন রাত বাজে সাড়ে বারোটা।
শহর জুড়ে ঝড়ঝাপটার তান্ডব শুরু হয়েছে। তার মাঝে রহমান বাড়ির সামনে এসে থামে একটি কার! সবার আগে আলো বেরিয়ে এল। তারপর মেঘলা, ছায়া ও মায়া বেরিয়ে আসে। তারা তিনজন ভেতরে চলে যায়। রহিত আবহাওয়া দেখে বলল,
-“আবহাওয়াটা খুব খারাপ দুলাভাই। আপনি বরং আজ রাতটা আমাদের এখানেই থেকে যান।”
আধার সিট বেল্ট খুলতে খুলতে বলল, -“উঁহু, সমস্যা নেই রহিত। আমি যেতে পারব।”
তবুও রহিত অনেকবার বলল থেকে যেতে। কিন্তু আধার এক কথায় অনড় ছিল। তাই হাল ছেড়ে রহিত বিদায় নিয়ে সাবধানে যেতে বলে চলে যায়। আধার ড্রাইভিং সিটে বসে দু’হাতে ভেজা চুলগুলো ঝাড়ল। চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিতে চেয়েও কিছু একটা অনুভব করে দিল না। পাশের জানালার কাঁচ নামাতেই দেখতে পেল—বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা এক অতিব সুন্দরী রমণীকে।

-“কী চাই?”
-“ভেতরে আসুন।”
-“উঁহু যাবো না।”
-“কেন?”
-“কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি।”
আলোর চোয়াল শক্ত হলো। রেগেমেগে তেড়ে এসে খেঁকিয়ে বলল,
-“কী চাচ্ছেন আপনি হ্যাঁ? এত ঝড়ঝাপটার মধ্যে গাড়ি চালিয়ে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে যেতে? নাকি উপরে যেতে হুহ্?”
-“হাসপাতালে যাই কিংবা আকাশে! এতে আপনার কী সমস্যা??”

আলো দাঁতে দাঁত পিষলো। মানুষটা তো ঠিকই বলেছে। তার কী এতে? সে কেন এত ভাবছে মানুষটাকে নিয়ে? কই তাকে নিয়ে তো মানুষটা কিছু ভাবে না। তাহলে কেন সে বারবার এই মানুষটাকে নিয়ে ভাবে? কেনোওও?
কোনো জবাব পেল না আলো। শুধু জানে এই খারাপ আবহাওয়ার মধ্যে মানুষটার যাওয়া একদম ঠিক হবে না। তারা যখন ফিরছিল তখনই গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ছিল গাড়ির ছাঁদে! রহিত ভাইয়া অনেক কষ্টে ড্রাইভ করে নিয়ে এসেছে। আর মানুষটা কিনা এর মধ্যেই বাড়িতে ফিরতে চাচ্ছে। এখান থেকে খান বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় তিন-চারটে বেজে যাবে। তারওপর রাস্তা কোনোভাবে ব্লক থাকলেই মাঝপথে আঁটকা পড়বে। অথচ মানুষটা এখনো নিজের ইগোর ড্রাম নিয়ে বসে আছে।
আলো জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল, -“দেখুন আ…!”
-“যা দেখছি এতেই এনাফ! এর বেশি কিছু আর দেখতে চাই না।”
মানুষটার এমন কথা শুনে ও নজর খেয়াল করে আলো ভ্রু কুঁচকে নিজের দিকে তাকায়। সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে তো ভুলেই গেছিল আজ সাদা পরেছে৷ বৃষ্টিতে ভেজার ফলে শরীরের বেশির ভাগই ফর্সা ত্বক দৃশ্যমান। মূহুর্তেই লজ্জায় লাল, নীল, হলুদ হয়ে গেল আলো। সে চট করে পিছনে ফিরে ওড়না টেনেটুনে শরীর ভালো করে ঢেকে নিল। মনে মনে অসভ্য লোকটাকে ইচ্ছে মতো বকাবকি করতেও ভুললো না।

-“ভেতরে যাও।”
-“আপনিও আসুন।”
আধার চোখমুখ কুঁচকে ফেললো। এই বাচাল মেয়েটা তার কথা শুনে না কেন?
সে কিছু না বলে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে গেল। সোজা পথ ধরে চলে যাওয়ার সময় সাইট মিনারে নজর আটকালো। আলো বাহিরে এসে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার চলন্ত গাড়িটার দিকেই নিবদ্ধ!
কালো রঙের গাড়িটা চোখের সামনে থেকে আড়াল হতেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আলো। একটা রাতের-ই তো ব্যাপার ছিল! থাকলে কী এমন ক্ষতি হত মানুষটার? সে কী খুব বেশি কিছু আবদার করে ফেলেছে? যেটা পূরণ করতে হিমশিম খেত হত?

বিকট শব্দ তুলে বাজ পড়তেই আলোর ভেজা শরীর কেঁপে উঠলো। তড়িঘড়ি করে পিছনে ফিরে সামনে পা বাড়াতেই ধপাস করে পিছলে পড়ল। এতে হতবাক হয়ে যায় মেয়েটা। পর মূহুর্তে চোখমুখ কুঁচকে কোমর চেপে ধরে কাদামাটিকে বকাবকি করল। দু’পায়ের জুতা খুলে হাত নিয়ে আস্তে-ধীরে উঠে দাঁড়ায়। ভাগ্যিস মানুষটা চলে যাওয়ার পরই আছাড় খেয়েছে, নয়তো আজও তার মানসম্মান চলে যেত অসভ্য লোকটার সামনে।
তার ভাবনার মাঝেই হুট করে এক জোড়া তীব্র লাইটের হলদেটে আলো এসে পড়ল তার সর্বাঙ্গ জুড়ে। আলো চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। অপ্রত্যাশিত কিছু দেখেও নড়ল না। বরং বিস্ময়ে চেয়েই রইল।
মেয়েটাকে পাশ কাটিয়ে গাড়িটা ভেতরে চলে যায়। তারপর বেরিয়ে এল স্যুটবুট পরিহিত একজন যুবক। ততক্ষণে আলোও গুটিগুটি পায়ে ভেতরে এসেছে। আধার একপলক মেয়েটাকে দেখে নিয়ে গায়ের কোট খুলে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আশা করছি আমার কোট নিতে তোমার কোনো অসুবিধা নেই।”
আলো চুপচাপ কোট নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিল। আধার আর কথা না বাড়িয়ে সামনে চলতে থাকল। আলো কিছুক্ষণ থম মে’রে দাঁড়িয়ে থেকে সেও পিছু পিছু ছুটল।

অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে মেয়ে জামাইকে এত রাতে দেখে বাড়ির সবাই চমকে ওঠে। পর মূহুর্তে জানতে পারে, রহিতদের ড্রপ করতে এসে ঝড়বৃষ্টির কারণে আটকে পড়েছে। সবাই এতে কিছুই বলে না, বরং নতুন জামাইকে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অতিথি আপ্যায়নের জন্য।
রাতের খাবার খেয়ে একটু হাটাহাটি করে রুমে এল আধার। রুমটা খুব বেশি বড় না। তবে খুব সুন্দর করে পরিপাটি করা এবং সবকিছু গুছিয়ে রাখা। একপাশে বই ভর্তি বুকশেলফ।
আলো ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে শুয়েছে। কারণ তার বেড সিঙ্গেল! আর লম্বা সোফাও নেই ভেতরে। তাই সে নিচেই শুয়েছে। আধার ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের লাইট নিভিয়ে ড্রিম লাইট জ্বা’লিয়ে দিল। তারপর বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে থেকে আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকায়।

-“কিছু কথা ছিল।”
আলো চাদরের নিচ থেকে মাথা বের করে সোজা হয়ে বলল, -“জানি কী বলবেন। ডিভোর্সের কথা তাই তো?”
আধারের কপাল কুঁচকে গেল। আলো পুনরায় বলল,
-“চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো। আপনি শুধু কাগজটা পাঠিয়ে দিয়েন।”
-“এখানে ডিভোর্সের কথা কেন উঠছে?”
-“কারণ আপনি চান আমাকে ডিভোর্স দিতে।”
-“শুধু আমি-ই?”
আলো কিছুটা সময় নিয়ে বলল, -“উঁহু, আমিও।”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে জানতে চাইল, -“তুমি কী সত্যিই ডিভোর্স চাও?”
আলো কি জবাব দিবে বুঝতে পারল না। কারণ সে এখন চায় না ডিভোর্স হোক তাদের মধ্যে। সে তো ওই ছোট্ট সংসারটা করতে চায়। কিন্তু….কিন্তু এই মানুষটা যে তাকে চায় না। তাহলে সে কীভাবে একা সংসার সামলাবে? যেখানে নেই কোনো ভালোবাসা, বিশ্বাস, ভরসা, সেখানে আদৌ কোনো সংসার টিকে? উঁহু, মোটেও না। আলো জোরে শ্বাস ছেড়ে ধীর কণ্ঠে বলল,

-“হ্যাঁ!”
-“ঠিক আছে।”
অতঃপর রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেল। আধার দু-চোখ বুঁজে একসময় সমস্ত নীরবতা ভেঙে শান্ত গলায় জানতে চাইল,
-“ভালোবাসার মানুষ থাকা সত্ত্বেও কেন এই বিয়ে করলে?”
আলোর ভ্রু কুঁচকে গেল। সে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“ভালোবাসার মানুষ যদি থাকত তাহলে আর আপনাকে বিয়ে করতাম না। আর যাইহোক, বেইমান নই আমি। ভালো না বাসলেও ভালোবাসার কদর করতে জানি।”
আধার চট করে চোখ মেলে তাকায়। কৌতূহল কণ্ঠে শুধায়,
-“ওইদিন ফুল কে পাঠিয়েছিল?”
-“কে আবার? আমার বোন ছায়া পাঠিয়েছে। ও জানে তার আপু ঠিক কতটা ফুল পছন্দ করে। আর ও মাঝেমধ্যেই আমাকে সারপ্রাইজ দেয়। শুধু ও না, আমার খচ্চর বন্ধুমহলের সদস্যরাও। তবে তারা এখনো জানে না আপনি আমার স্বামী। নাহলে এতদিনে আপনাদের বাড়িতেও হামলা দিত।”
আধার ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবতে লাগল। পরক্ষণে বলল, -“তারমানে বলতে চাচ্ছো তুমি কখনো প্রেম করোনি, তাই তো?”
আলো চোখ দুটো বুজে ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে বিরবির করে বলল,

-“আমি যদি প্রেম করতাম, তাহলে কখনোই ভালোবাসার মানুষ বর্তিত অন্য কাউকে বিয়ে করতাম না। কিন্তু আপনি হঠাৎ করে আমার প্রেমকাহিনী নিয়ে পড়লেন কেন বলুন তো?”
-“উঁহু, কিছু না। ঘুমাও!”
-“আপনি কী প্রেম করে ছ্যাকা খেয়ে বাঁকা হয়ে আছেন স্যার?”
-“প্রেম কিংবা ভালোবাসা—এসবের কোনোটাতেই বিশ্বাসী নই আমি। এগুলো কেবল ধ্বংস করতেই জানে। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসের নাম হলো এই ‘ভালোবাসা’ নামক অসুখ। যার এক রূপ সুখ হলেও দ্বিতীয় রূপটা চরম অভিশাপ। ​একটা জলজ্যান্ত হাসিখুশি মানুষকে কীভাবে নিমিষেই জীবন্ত লা’শে পরিণত করা যায়, সেটা এই ভালোবাসার আগুনকে না দেখলে জানতামই না! জীবনে আর যাই করো, কখনো কাউকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে যেয়ো না। নয়তো এই প্রেমের দহনে একদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে তুমিসহ, তোমার পুরো অস্তিত্ব!”
আলো মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনে প্রতিত্তোরে বলল,

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১১

-“ভালোবাসা কোনো অভিশাপ নয় স্যার, বরং খুব সুন্দর। এটা যেমন কাউকে মে’রে ফেলতে পারে, ঠিক তেমনি কাউকে দিতে পারে নতুন জীবন। সবকিছুরই ভালো-মন্দ দুটো দিক থাকে। এক জীবনে যদি সবকিছু পেয়েই যাই, তবে আর কিসের আফসোস থাকবে? ​কিছু মানুষ অতি সুখে নিজের সৃষ্টিকর্তাকেই ভুলে বসে, অথচ বিপদ এলে সর্বপ্রথম তাঁকেই স্মরণ করি আমরা। জীবন মানেই তো সুখ-দুঃখের মিশেল, স্যার। হাজারো সুখের মাঝেও কিছুটা বেদনা থাকা দরকার—যা আমাদের সবসময় না-পাওয়ার আফসোসটা মনে করিয়ে দেবে। ​আই উইশ…আপনার মরুভূমির ন্যায় রুক্ষ জীবনেও কোনো একদিন বৃষ্টির শীতল ধারার মতো প্রশান্তির প্রেম নেমে আসুক। সেদিন আপনি বুঝবেন, আসল ভালোবাসার মানে কী এবং এর স্বাদ কেমন!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৩

1 COMMENT

Comments are closed.