Home এক মুঠো চাঁদের আলো এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৩

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৩

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৩
নুসরাত ফারিয়া

খুব ভোরবেলায় উঠে আধার সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যায় খান বাড়ির উদ্দেশ্যে। আলো তখনো ঘুমে ছিল। নামাজ আদায় করে একটু শুয়েছিল, তখনই আবার ঘুমের দেশে হারিয়ে যায়। তাদের এখান থেকে ভার্সিটি খুব বেশি দূরে না। দুই-আড়াই ঘন্টার মতো রাস্তা। তবে শশুর বাড়িটা একটু দূরেই। ওখান থেকে ভার্সিটি ঘন্টাখানেকর মতো দূরত্ব। প্রাইভেট কার ইউজ করলে কম সময়ের মধ্যেই পৌঁছানো যায়। যদি রাস্তায় জ্যাম না থাকে তবেই।
সকাল দশটার দিকে ঘুম থেকে উঠার পর যখন জানতে পারল আধার স্যার চলে গিয়েছে, তখন একটু হলেও আলোর মনটা বিষাদে ভরে যায়। আহ্! সে মানুষটাকে দেখতে পারল না। আলো মনে মনে তাচ্ছিল্য হেঁসে খাবার খেতে বসে। পরীক্ষার আগে আর সে ভার্সিটিতে যাবে না। একেবারে পরীক্ষার দিনই হাজির হবে। বন্ধুমহলকেও এই বিষয়ে জানানো হয়েছে। তারাও যায় না, বরং নিজ নিজ বাড়িতে মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করছে এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের মেসেঞ্জারে একটা গ্রুপ রয়েছে। সেখানেই মাঝেমধ্যে ভিডিও কলে সবাই মিলে গ্রুপ স্যাডি করে।

-“এটা কি হলো? তুমি মাংস কেঁড়ে নিলে কেন মা? আমি খাব না?”
বড় মেয়ের কথা শুনে মিসেস আলেয়া রহমান অন্য একটি বোলে মুরগির মাংস তুলে দিয়ে বললেন,
-“তোমার না হাঁসের মাংসে এলার্জি আছে? তাহলে কোন শরমে ওইটা আবার খেতে চাও?”
আলো মুখ ভেঙচিয়ে বলল, -“ওটা আমার প্রিয় খাবার।”
-“দুনিয়ায় যত রকমের খাবার তোমার জন্য নিষিদ্ধ রয়েছে, সেগুলোই তোমার প্রিয় খাবার তাই না?”
-“হু তাই।”
-“মুখে মুখে তর্ক না করে, যেগুলো দিয়েছি ওগুলো চুপচাপ খাও।”
আলো হতাশ হয়ে পরোটার টুকরো ছিঁড়ে মাংসের ঝোলে ডুবিয়ে মুখে দিতে দিতে জানতে চাইল,
-“স্যার নাস্তা করেছিলেন?”
-“হুম।”
-“আমাকে ডাকলে না কেন?”

-“ছায়া ডেকেছিল তোমায়। কিন্তু তুমি নাক ডেকে আরামসে ঘুমাচ্ছিলে। তাই আর বিরক্ত করেনি।”
আলো আর কিছু না বলে চুপচাপ নাস্তা করতে থাকল। সবাই অনেক আগেই নাস্তা করে যে যার মতো কাজে চলে গিয়েছে। ছায়া, মায়া স্কুল-কলেজে গিয়েছে আর রহিত ভাই মেঘলা আপুকে ড্রপ করতে গিয়েছে কক্সবাজার। রাতে ঝড়বৃষ্টির জন্য যেতে পারেনি মেয়েটা। তাই সকালে রওনা দিয়েছে।
নীলিমা রহমান আলোর প্লেটে আরো দুটো গরম গরম পরোটা দিয়ে পাশের চেয়ার টেনে বসলেন। তারপর সবজি তুলে দিয়ে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
-“সব ঠিক আছে তো মামণি?”
আলো খেতে খেতে বলল, -“কেন? কী হবে?”
-“না মানে, আমাদের কোথাও একটা কিছু ঠিক লাগছে না।”
-“ঠিক থাকার মতো কিছু হয়েছে? তোমরা জানো সবটা। অথচ না জানার ভান করছো।”
-“হ্যাঁ মানছি, তোমাদের বিয়েটা আর পাঁচ জনের মতো স্বাভাবিকভাবে হয়নি। আর কোনো সম্পর্কই একদম হুট করে হয় না। সবকিছু ঠিক হওয়ার জন্য একটু হলেও তো সময় লাগবে।”

-“চাচী আমি বুঝতে পারছি না তুমি কী বলতে চাচ্ছো। আর বুঝতেও চাই না। শুধু এইটুকু জেনে রাখো, কিছু কিছু এমন সম্পর্ক রয়েছে যেটা কখনোই স্বাভাবিক হওয়ার নয়। সেখানে আমরা কেউই একে-অপরকে পছন্দ করি না। আর আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্কের বাঁধন খুব শীঘ্রই ছিঁ’ড়তে চলেছে। সেটার জন্য প্রস্তুত থেকো।”
একথা বলে আলো আর খাবার না খেয়ে উঠে গেল। তার কেন জানি সবকিছু গোলমেলে হয়ে গেছে। কিছুতেই স্বস্তি, শান্তি পাচ্ছে না! মনে হচ্ছে এই বুঝি দমটা আঁটকে আসবে।
অন্যদিকে মেয়েটার কথা শুনে দুই জা-কে বেশ চিন্তিত দেখা গেল। আলেয়া রহমান বিচিলিত কণ্ঠে বললেন,
-“আমার বড় মেয়ের বুঝি আর সংসার করা হলো না আপা।”
নীলিমা রহমান আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, -“চিন্তা করিস না। কিচ্ছু হবে না। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। আর খুব শীঘ্রই আমাদের মেয়েটারও একটা সুখের সংসার হবে ইনশাআল্লাহ।”

বাপের বাড়ি থেকে তাহমিনা খান অনেক আগেই ফিরেছিলেন। শশুর বাড়িতে এসে যখন জানতে পারে তার বড় বউমা বাপের বাড়িতে গিয়েছে এবং বেশকিছু দিন ওখানেই থাকবে সেটা নিয়ে উনার শশুর মশাইয়ের সাথে হালকা কথা-কাটাকাটি হয়৷ সোবহান খান সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যদি বাপের বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারে তাহলে নাতবউ তার বাড়িতে থাকতে পারবে না কেন? বিয়ে হয়ে গেছে মানে এই নয় যে, নিজের বাবার বাড়ির সবাই পর হয়ে গেছে। সোবহান খান কখনোই চান না, মেয়েটা বন্দী জীবন পার করুক। তিনি যথাসম্ভব মেয়েটাকে মুক্ত পাখির মতো রাখতে চান। কারণ তিনি ওই মেয়েটাকে শুধু বাড়ির বউ মনে করেন না, নিজের নাতনির মতোই ভালোবাসেন এবং স্নেহ করেন।
তাহমিনা খান যখন শশুরের কথার যুক্তির সাথে পেরে উঠলেন না, তখন তিনি আধারের কাছে গিয়েছিলেন। বাড়ির বউ কেন এতদিন বাহিরে থাকবে? তারওপর তিনি খবর পেয়েছেন, আলো তার কাজিনদের সঙ্গে কক্সবাজার গিয়েছে। এটা নিয়ে তিনি ভীষণ নারাজ। এখন যদি মেয়েটার হাত-পায়ে লাগাম না টানা হয়, তাহলে তাদের সংসার দু’দিন পর রসাতলে যাবে।
আধার চুপচাপ ছোট মায়ের করা অভিযোগ গুলো শুনেছিল। সর্বশেষে শুধু এইটুকুই বলে—মেয়েটার যখন মন চাইবে তখন এখানে আসবে। সে এই বিষয় নিয়ে কখনোই জোরাজোরি করবে না। আর না অহেতুক নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিবে। মেয়েটা থাক না নিজের মতো। এতে সমস্যা কোথায়?
দাদা-নাতির জবাব মোটেও পছন্দ হয়নি তাহমিনা খানের। তবে তিনি আর কিছু না বলে চুপচাপ সবটা হজম করে নেন। সময় এলে তিনিও ওই মেয়েটার আসল রূপ সবার সামনে নিয়ে এসে তবেই ছাড়বেন। নয়তো তিনিও খান বাড়ির বউ নয়!

আধার আজ একটা ক্লাস শেষ করে ভার্সিটি থেকে ছুটি নিয়ে চলে এসেছে। বাড়িতে বসে থেকেই সব কাজ কমপ্লিট করবে। পরন্ত দুপুর বেলা ছাঁদে ওয়ার্কআউট ও পুশআপ করছে আধার। নিয়মিত শরীরচর্চা করা সম্ভব না হলেও সপ্তাহে দুএকবার করার চেষ্টা করে। সে আবার নিজের ফিটনেস নিয়ে বেশ সচেতন। বয়স ত্রিশের দোরগোড়ায় পৌঁছালেও দেখে মনে হয়না। আচ্ছা ওই মেয়েটার বয়স কত হবে? উমমম….তার জানা মতে বিশ মেবি৷ আধার হান্ড্রেড বার পুশআপ করে ঘামার্ত শরীর নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। পরণে শুধু ট্রাউজার ও কালো সেন্ডো গেঞ্জি! যেটা গৌড় বর্ণের সুঠাম দেহে একদম নিখুঁতভাবে লেপ্টে আছে। কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। সে বোতল থেকে এক নিঃশ্বাসে পানি খেয়ে দরজার দিকে আড়চোখে তাকায়। আজকাল আর কাউকে দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে দেখা যায় না। নয়তো একজন প্রায়শই লুকিয়ে লুকিয়ে তার এক্সারসাইজ করা দেখত। একবার তো হাতেনাতে চোরকে ধরেও ছিল। ওইদিন কড়া রোদ্দুরের মাঝে পঞ্চাশ বার কান ধরে ওঠবস করিয়ে নিয়েছিল। ভেবেছিল আর এমনটা করবে না। কিন্তু বেহায়া মেয়েটা বারবার ওমনটাই করবে। আর সেও একসময় সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করে নিজের কাজ করত। কারণ ওই মেয়েটাকে কিছু বলা মানে কলাগাছকে বলা একই কাজ।

আধার তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। আজ মনটা বড়ই অস্থির তার। কোনোকিছুতেই মন বসছে না। হুট করে এমনটা কেন হচ্ছে, সেটাও বুঝতে পারছে না। আধার আবারো পানি খেয়ে সামনে ফিরতেই বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেললো। তাদের সামনের বিল্ডিংয়ের ছাঁদে দু’জন মেয়ে হা করে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে লাজেলজ্জায় ম’রে যাচ্ছে।
-“আসসালামু আলাইকুম স্যার! কেমন আছেন?”
দু’ জন মেয়ের মধ্যে থেকে একজন মিষ্টি সুরে বলে উঠলো। আধার দোলনা থেকে তোয়ালে নিয়ে ধীর কণ্ঠে আওরাল,
-“ওয়ালাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
ব্যস! এতটুকু বলেই আধার আর না দাঁড়িয়ে হনহন করে ছাঁদ থেকে চলে গেল। আর মেয়েটার মন কিছুটা খারাপও হলো বটে! তবে সেটা মুখে প্রকাশ করল না। কারণ তারা জানে এই মানুষটা কেমন আর কতটা গাম্ভীর্য!
আধার রুমে এসে লম্বা একটা শাওয়ার নিল। গায়ে টিশার্ট জড়িয়ে সোফায় বসল। তখন শেফালি চাচি এসে এক মগ কফি দিয়ে গেলেন। দুই উরুর ওপর ল্যাপটপ রেখে চোখে রিডিং গ্লাস পড়ে কোয়শ্চন পেপারগুলো রিচেক দিতে লাগল। এর মাঝে কিছু একটা মনে হতেই সে নিজের ফোনটা নিয়ে কাউকে একটা কল দিল। কয়েক মিনিট পর অপর প্রান্ত থেকে কল রিসিভ হতেই আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

-“হোয়াটসঅ্যাপে একটা নাম্বার পাঠিয়েছি। ওটার পুরো ডিটেইলস চাই আমার। তাও আজই!”
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গোপন খবর পেয়েছে ছায়া। আজ রাতের ফ্লাইটে মোস্ট পপুলার গায়ক মি. মৃন্ময় আহমেদ রাজ বাংলাদেশে ফিরছে। এটা জানার পর থেকে মেয়েটা খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেছে। অবশেষে সে তার স্বপ্নের পুরুষকে বাস্তবে, সচক্ষে দেখবে। এটাই বা কম কিসের?
-“এ্যাই আপু? তাড়াতাড়ি রেডি হও। নয়তো আমরা লেট হয়ে যাবো তো।”
ছোট বোনের তাড়া দেখে বিরক্তিতে নাকমুখে শব্দ করল আলো। এই মেয়েটা আবার গায়ক মৃন্ময়ের বিশাল-বড় ফ্যান। যাকে বলে ক্রেইজি ফ্যান! বিগত চার বছর যাবত মেয়েটা এই একটা দিনের জন্য অপেক্ষায় ছিল। শুধু সে নয়, মৃন্ময়ের মারাত্মক সুন্দর গানের ফ্যান যারা তারা সবাই চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করছিল, কবে মানুষটা নিজ দেশে ফিরে আসবে। এবং চোখের সামনে তার কনসার্ট দেখবে, অটোগ্রাফ নিবে, সেলফি তুলবে….ইত্যাদি ইত্যাদি। ছোট বোনের পাগলামিতে মাঝেমধ্যে সে ভীষণ রেগে যায়। এই মেয়েটার পুরো রুম জুড়ে শুধু ওই লোকটারই ছবি। মানুষটার গানের যতগুলো অ্যালবান বেরিয়েছে, সবগুলো কিনে রেখেছে। একটু সময় পেলেই ফোনে নয়তো টেপরেকর্ডারে গান ছেড়ে দিয়ে মুগ্ধতার সাথে শোনে। বড় বোনের কণ্ঠস্বরের থেকেও বেশি ওই অচেনা ব্যক্তিটার কণ্ঠস্বর উপভোগ করে। আলো পারে না তার পাগল বোনটাকে ওই লোকটার গলায় বেঁধে দিতে। তাহলে হয়তো ব্রেনটা ঠিক জায়গায় আসত।
-“না গেলে হয় না? না মানে নিউজটা যেহেতু ভাইরাল হয়েছে, সেহেতু অনেক মানুষজনই থাকবে। এত ভিড়ের মধ্যে গিয়ে কী করব বল? তারচেয়ে বরং কনসার্ট শুরু হলে যাস। তখন একটুও বারণ করব না প্রমিস!”
বড় বোনের কথাকে নাকচ করে জেদি গলায় বলল,

-“না আপু। আমি আজই যাবো মানে আজই।”
-“তুই এত শিওর হচ্ছিস কীভাবে ওই লোকটা আজ রাতেই বিডিতে আসবে? এটা ফেইক নিউজও তো হতে পারে।”
-“না আপু। এটা ফেইক না। আর আমার মন বলছে উনি আজই আসবেন।”
-“তোর মনের গুষ্ঠি কিলাই আমি।”
আলো দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে। আগামীকাল তার পরীক্ষা, অথচ এই মেয়েটার জন্য এখন তাকে এয়ারপোর্টে যেতে হবে। তাও পরিবারকে না জানিয়ে। ছায়া অসহায় চোখে বড় বোনের দিকে তাকায়।
-“প্লিইইজ আপু। শুধু আমার জন্য আজ এইটুকু করো। তুমি না গেলে আম্মুও আমাকে একা যেতে দিবে না। আর রহিত ভাইয়াও নেই যে, আমি তার সাথে যাবো। ওইদিকে মায়াও অসুস্থ। তুমি প্লিজ চলো আমার সাথে।”
আলো চকলেট মুখে পুরে বিরবির করে বলল,
-“ঠিক আছে, যাবো। কিন্তু….ওখানে গিয়ে যদি দেখি তোর ওই গায়ক-ফায়ক আসেনি, তাহলে তোর একদিন কী আমার দশদিন!”

রাত বাজে দশটা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে ছোট্টখাট্টো একটা হট্টগোল শুরু হয়েছে। উপস্থিতি ব্যক্তি বেশিরভাগই তরুণ-তরূণী। সবাই এসেছে গায়ক মৃন্ময়কে সচক্ষে একঝলক দেখার জন্য। অনেক রমণীর হাতে চিঠি থেকে শুরু করে ছোট্ট ছোট্ট গিফটসও রয়েছে। সবার হাতেই নোটপ্যাড, স্মার্টফোন নয়তো ক্যামেরা রয়েছে। আবার কেউ কেউ ফুলও নিয়ে এসেছে। আশেপাশে পুলিশসহ মিডিয়ার লোকজনকেও দেখা যাচ্ছে। সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে এত বছরের সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটার জন্য।
এয়ারপোর্টের বাহিরে মেয়েদের এত ভিড় দেখে আলো তব্দা খেল। তারমানে নিউজটা সত্যিই। নাহলে কী এত ভক্তরা আসত? অন্যদিকে ছায়া বড় বোনকে রেখেই ভিড় ঠেলে-ঠুলে সামনের দিকে চলে গেল। এতে মেজাজ খারাপ হয় আলোর। সে এখন একা একা দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে আশ্চর্য! ওইদিকে বাড়িতে আসল কথা বলে আসেনি, ছায়া বলেছে তার অসুস্থ বান্ধবীকে দেখতে যাবে। আর জলদি ফিরে আসবে। প্রথম প্রথম আলেয়া রহমান আপত্তি করলেও পর মূহুর্তে রাজি হয়ে যান। কারণ বড় মেয়েও সঙ্গে যাচ্ছে। তাই তিনি আর বাঁধা দেন না।

হঠাৎই সবার চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে আলোর ধ্যান ভাঙল। তড়াক করে অ্যারাইভাল গেটের দিকে তাকিয়ে দেখে মাথায় ক্যাপ, চোখে সানগ্লাস, কানে হেডফোন, মুখে মাক্স, কালো হুডি, অসংখ্য পকেটযুক্ত কার্গো প্যান্ট পরিহিত একজন যুবক বেরিয়ে আসছে। চারপাশে কয়েকজন বডিগার্ড ও পুলিশ তাকে প্রটেকশন দিচ্ছে। কাঁধে সিগনেচার গিটার, ডান হাতের আঙুলে রুপালি আংটি ও কব্জিতে বিশেষ ব্রেসলেট-টি জানান দিচ্ছে মানুষটার পরিচয়।
সবাই ভেবেছিল জনপ্রিয় তারকা ভিনদেশের ভক্তদের মতোই তাদেরকেও এড়িয়ে যাবে। কারণ তারা যতদূর চেনে এবং শুনেছে তাতেই পরিষ্কার মানুষটা একটু অদ্ভুত টাইপের। সাথে কিপ্টাও। নাহলে কী সামান্য একটা অটোগ্রাফ দিতেও কারোর এত সমস্যা হয়? কিন্তু আজ সব ভক্তদের অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে মৃন্ময় বাহিরে এসে সর্বপ্রথম একটা পিচ্চি মেয়ের থেকে ফুল গ্রহণ করে। এতে বাচ্চা মেয়েটার খুশি দেখে কে! ​চারপাশ ফেটে পড়ছে হাজারো মানুষের চিৎকারে। সিকিউরিটির বেষ্টনী ভেদ করে একদল ফ্যান মরিয়া হয়ে এগিয়ে আসতে চাইল। তাদের প্রত্যেকের হাতে পোস্টার আর ডায়েরি। ভিড়ের একদম সামনে থেকে এক তরুণী ফ্যান গলার সবটুকু জোর দিয়ে চিৎকার করে উঠল,
-“রকস্টার এমএ! প্লিজ, প্লিজ একটা অটোগ্রাফ!”

মৃন্ময় মেয়েটার দিকে না তাকিয়েই অটোগ্রাফ দিল। ব্যস! সবাই ঝাপিয়ে পড়ল প্রিয় তারকার ওপর। কেউ একটা ছবি, একটু অটোগ্রাফের জন্য রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। সবাইকে সামলাতে সামলাতে পুলিশরা একপ্রকার হিমশিম খাচ্ছে। তবুও মৃন্ময় আজ ভীষণ শান্ত। সে চেষ্টা করছে একটু হলেও ভক্তদের মনের আশা পূরণ করতে। হাজার হোক, নিজ মাতৃভূমি বলে কথা। এখানে কী অহংকার দেখানো যায়? উঁহু, মোটেও না!
আলো একটা নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে আইসক্রিম খাচ্ছিল আর সবার পাগলামি দেখছিল। তার আবার এসবের প্রতি ইন্টারেস্ট নেই। এমন না যে সে ওই লোকটার গান পছন্দ করে না। অবশ্যই পছন্দ করে। কিন্তু সে আর পাঁচ জনের মতো পাগলা ফ্যান নয়! তাই এইগুলো থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। ওই গরমের মধ্যে ঢুকে জ্যান্ত হিউম্যান কাবাব হতে মোটেও ইচ্ছে নেই। আলো এসব ভাবতে ভাবতে আইসক্রিমে বড়সড় একটা কামড় বসাতেই খেয়াল করল, তার বোন ছায়া কাঁদতে কাঁদতে এদিকেই আসছে। ছোট বোনকে কাঁদতে দেখে কপাল কুঁচকে যায় আলোর।
-“কী হয়েছে? এমন ম’রা কান্না কাঁদছিস কেন?”

কাঁদতে কাঁদতে ছায়ার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের চেহারা রক্তিম হয়ে উঠেছে। মেয়েটা ফুপিয়ে উঠে বলল,
-“আ-আমি….আমি অটোগ্রাফ পাইনি আ-আপু। আর না আ-আমার নিয়ে আসা ফুল নিয়েছে।”
বোনের কথা শুনে আলো নিজের কপাল চাপড়ায়। আশেপাশে কিছু মেয়েদের দিকে ইশারা করে বলল,
-“দেখ শুধু তুই না। আরো অনেকেই অটোগ্রাফ পায়নি।”
-“কিন্তু…অনেকেই তো পেয়েছে আপু। তা-তাহলে আমি কেন পেলাম না?”
বলেই শব্দ করে কেঁদে দিল ছায়া। আলোর চোখ উল্টে গেল। এখন এই পাগল মেয়েটাকে বোঝাবে কীভাবে? এই মেয়েটা এত অবুঝ কেন?

-“শান্ত হ বইন। আজ অটোগ্রাফ মিস করেছিস তো কি হয়েছে? অন্য কোনো একদিন পেয়ে যাবি ইনশাআল্লাহ৷ আর না পেলেও আমি ম্যানেজ করে এনে দিবো৷ তবুও তুই প্লিজ কান্না থামা। নয়তো মাথা ব্যথা করবে তো!”
ছায়াকে বোঝানোর চেষ্টা করছে আলো। কিন্তু মেয়েটা অবুঝ বাচ্চাদের মতো কেঁদেই যাচ্ছে। কতগুলো বছর ধরে সে এই দিনটার জন্য অপেক্ষায় ছিল। আজ খুব আশা করে এসেছিল, লোকটার অটোগ্রাফ নিবে। কিন্তু কি হলো? এত ভিড়ের মধ্যে না পেল অটোগ্রাফ, আর না দু-চোখ ভরে দেখতে পারল ওই মানুষটাকে। অথচ অনেক মেয়েই অটোগ্রাফ থেকে শুরু করে গিফটও দিয়েছে। ছায়ার কেন জানি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছে করছে এখানেই হাত-পা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে। তাহলে হয়তো মনটা একটু হালকা হত।
আলো এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাতে কপাল চেপে ধরে আশেপাশে নজর বুলিয়ে নিল। হঠাৎই কিছু একটা খেয়াল করতেই তার চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো। সে তড়িঘড়ি করে বোনের উদ্দেশ্যে বলল,
-“এখানেই দাঁড়া। আমি এক্ষুনি তোর কান্না থামানোর মেডিসিন নিয়ে আসছি!”
বলেই আলো ছুটে গেল একটা প্রাইভেট কারের দিকে।
-“আহহহ্!”

আলো ব্যথায় আর্তনাদ করে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করল। অন্যদিকে, নিচে পড়া যুবকটি বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে রমণীর সুন্দর মুখশ্রীর দিকে। পরিস্থিতি বুঝতে কিছুটা সময় লাগল। তবে পাশ থেকে বিশালবড় একটা ট্রাক ধেয়ে যেতে দেখে যা বোঝার তাই বোঝা হয়ে গেল। আলো জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে পিটপিট করে তাকায়। চোখের সামনে অচেনা একজন সুদর্শন যুবকের চেহারা ভেসে উঠতেই সে তড়িঘড়ি করে উঠে গেল৷ তারপর খেঁকিয়ে বলল,
-“এতই যখন ম’রার শখ হয়েছে তাহলে নদীতে গিয়ে ঝাপ দিয়ে ম’রুন না। নয়তো হারপিক গিলুন। তাহলে দেখবেন বিনা টিকিটে সুন্দর ভাবে উপরে চলে গিয়েছেন। এইভাবে রাস্তা দূষন করার কোনো মানেই হয় না!”
মেয়েটার কথা শুনে আগন্তুকের কপাল কুঁচকে গেল। হাত-পা ঝেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
-“সুইসাইড করার জন্য দারুণ আইডিয়া দিচ্ছেন। অথচ এই আপনি-টাই একটু আগে আমাকে বাঁচালেন!”
-“তো কী করতাম হুহ্? চোখের সামনে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে ট্রাক চাপা খেতে দেখতাম? এ্যাই আপনি খাবার খাননি? নাকি ট্রাক চাপা খাওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিলেন?”
যুবকটি কানে আঙুল দিয়ে বিরবির করে বলল,

-“আরেহ আস্তে ম্যাডাম! আপনি তো দেখছি আমার কানের পর্দা ফাটিয়ে দিবেন। গলা তো নয় যেন মসজিদের মাইক!”
আলো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। সে যখন রাস্তা পার হচ্ছিল তখনই এই লম্বু খাম্বাটাকে নজরে পড়ে। শ্লার ব্যাটা ফোনে কথা বলতে বলতে অমনোযোগী হয়ে রাস্তা পার করছিল। লোকটার বিপরীত পাশ থেকেই একটা ট্রাক ছুটে আসছিল, সেটা দেখে এক মূহুর্তের জন্য থমকে যায়। কতবার চিৎকার দিয়ে সরে যেতে বলল। অথচ ঠসা মানুষটা কিছুই শুনতে পায়নি। তাই তো না চেনাজানা সত্ত্বেও মানুষটাকে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছে। আর যাইহোক, চোখের সামনে কারোর মৃ’ত্যু দেখতে পারত না। সবটা দেখেশুনেও যদি সাহায্য না করত, তাহলে মনে মনে অনুশোচনায় ভুগত।
-“হ্যালো মিস! কোথায় হারালেন?”
মেয়েটাকে অন্যমনষ্ক হয়ে থাকতে দেখে চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে কথাটি বলে যুবকটি। আলো আশেপাশে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

-“হাসপাতালে গিয়ে কানের সাথে চোখেরও ডক্টর দেখান। নয়তো দিনদুপুরে রাস্তায় আকাম-কুকাম করে বসে থাকবেন! আর সবাই আমার মতো এত উদার মনের নয় যে, নিজের জীবন বাজি রেখে এইভাবে ছুটে আসবে।”
যুবকটি আনমনে হেঁসে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর আপদমস্তক পর্যবেক্ষণ করতে করতে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“আপনি সত্যিই সবার থেকে ভীষণ আলাদা মিস।”
আলোর এলোমেলো দৃষ্টি গিয়ে রাস্তার ওই পাশে পড়ে। কাঙ্ক্ষিত গাড়িটা অনেক আগেই চলে গিয়েছে। আশেপাশের মানুষজনও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। আলো দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটার ওপর খেঁকিয়ে উঠল,
-“সবটা আপনার জন্য হয়েছে। এখন আমি ওই গায়কের অটোগ্রাফ কোথায় পাবো? ওইদিকে আমার বোনটাও অবুঝের মতো কান্না করছে। আপনি মাঝরাস্তায় এসে সবকিছু ঘেটে ঘ করে দিলেন। এখন তো ইচ্ছে করছে নিজ হাতেই আপনাকে ট্রাকের নিচে ফেলে দিই।”

আলোর রাগান্বিত চেহারা দেখে যুবকটা হেঁসে দিয়ে বলল,
-“রিলাক্স মিস। এত হাইপার হবেন না। নয়তো পানির ট্যাঙ্কির মতো ফেটে যাবেন।”
আলোর শরীর জ্বলে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে যাবে তখনই লোকটা হুট করে তার বাম হাতের কব্জি ধরল।
-“আপনার হাত থেকে তো ব্লিডিং হচ্ছে।”
আলো চমকে উঠে নিজের বাম হাতের উল্টো পিঠের দিকে তাকায়। পিচঢালা রাস্তায় পড়ে যাওয়ার জন্য হাতটা ছিলে গেছে। সেখান থেকেই হালকা র’ক্ত বের হচ্ছে। আলো হাতটা সরিয়ে নেওয়ার সময় খেয়াল করল মানুষটা তার হাতে নিজের রুমাল বেঁধে দিয়েছে শক্ত করে।

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১২

-“আর কোথাও ব্যথা পেয়েছেন? হাসপাতালে নিয়ে যাবো?”
আলো হাত সরিয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বলল, -“না, না আমি ঠিক আছি।”
-“শিওর?”
-“ইয়াহ!”
আলো আর কিছু না বলে যেভাবে ছুটে এসেছিল ঠিক সেভাবেই ছুটে গিয়ে চোখের পলকে হারিয়ে গেল। আগন্তুকটি এখনো একই জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। তার ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি রাস্তার বিপরীত পাশে আবদ্ধ। অচেনা যুবকটি হঠাৎই বলে উঠল,
-“দেখা হবে খুব শীঘ্রই… মিস বোম্বাই মরিচ! আই জাস্ট হোপ দ্যাট!”

এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১৪

1 COMMENT

Comments are closed.