কাজলরেখা পর্ব ৫১ (২)
তানজিনা ইসলাম
-“রেহান, চাঁদনী কই?”
রেহান নিজেও চাদনীকে খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে যাচ্ছিলো। পইপই করে বলেছিলো ও মেয়েটাকে ওঁকে না জানিয়ে কোথাও যাতে না যায়। পার্টিতে হাজার রকমের, হাজার মেন্টালিটির মানুষ এসেছে। চাদনী এমনিতেই ভিতু, একটা হাত ধরা ছাড়া একা চলতে পারে না। এখন কোথায় গায়েব হয়ে গেছে এ মেয়েটা। আঁধারের প্রশ্নে রেহান তাকালো ওর দিকে। মুখ কালো করে বললো
-“তোমার সাথেই না দেখা করতে গেলো, ভাই!”
আঁধার কপালে ভাজ ফেলে বললো
-“কই না তো। আমার সাথে তো দেখা করতে আসেনি। আর ও আমাকে পাবে কই? আমি তো ছাঁদে ছিলাম। আমি তো ভাবলাম তোমার সাথে আছে।”
-“আমি যে খবর পেলাম তোমার সাথে দেখা করতে গেছে।”
-“কোত্থেকে খবর পেয়েছো?”
রেহান চিন্তায় পরলো। কোত্থেকে খবর পেয়েছে ওর মনে নেই। কেক খাওয়া, ছবি তোলার ব্যস্ত সময়ে একটা উড়ো খবর এসেছিলো চাদনী আঁধার ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেছে। রেহান তখন অতোটা পাত্তা দেয়নি।রেহান ভেবেছিলো চাদনী আঁধারের সাথে আছে, আঁধার ভেবেছিলো চাদনী ওর বন্ধুদের সাথে আছে। আল্টিমেটলি চাদনী কোথাও নেই। রেহানের বুকে টান পরলো। আধার
রেহানকে বলেছিলো, চাদনীকে দেখে রাখতে। একটু আগে চাদনী ওর বন্ধুদের সাথেই ছিলো।হুট করেই কোথায় গায়েব হয়ে গেলো। ওর উপেক্ষার জন্যই হলো এটা। বিগত দশমিনিটে রেহান ওঁদের পুরো বাড়ি চসে ফেলেছে। ওর বন্ধুরাও লন, পার্টির এরিয়া, গার্ডেন সব জায়গায় তন্যতন্য করে খুঁজেছে চাদনীকে। পায়নি। শেষে সুক্ষ আশা ছিলো চাদনী হয়তো আঁধারের সাথে ছাদে আছে। ছাদেই যাচ্ছিলো ও। আঁধার নিজেই নেমে এসে জিজ্ঞেস করলো ওর থেকে চাদনীর কথা।
কক্ষের দরজা খুলতেই চাদনী দেখলো দু’জন পুরুষ দাঁড়িয়ে। চাদনী এদের চেনে না, কিন্তু পার্টিতে রিকের সাথেই দেখেছিলো। ও ঝাপ্সা চোখে যতটুকু ঠাওর করতে পারলো, ওরা দু’জনের মুখেই খুব পৈশাচিক হাসি লেপ্টে ছিলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো ওরা মদ্যপ প্রায়ই। চাদনীর শরীর ক আতঙ্কে কাপছিলো।চাদনী দুর্বল!শারীরিক ভাবে, মানসিকভাবে কোনোদিক দিয়েই ও স্ট্রং না। তারউপর মাঝে মাঝে এতো বোকামি করে।রিকের দু’জন সহযোগী।
ওরা কাছে আসতেই চাদনীর শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। ভয়ে, আতঙ্কে শরীর টলছিলো তো বহু আগে থেকেই। ও হাত ছাড়াতে চায়লো। রিকের পুরুষালি হাতে সাথে পারলো না। এতো শক্ত করে ধরেছে যে, মনে হচ্ছে কব্জি থেকে খুলে যাবে হাত। ওরা দু’জন দু’দিক থেকে চাদনীর হাত চেপে ধরলো বেডের সাথে।এতোটা শক্ত করে ধরলো যে, চাদনীর মনে হলো ওর চিকন চিকন হাড় গুলো ভেঙে যাবে, এক্ষুণি আত্মা বেরিয়ে যাবে। বেশ তাই হোক। ও এ কলঙ্কিত মুখ তো আঁধার কে দেখাতে পারবে না। না,ও এ কলঙ্ক বয়ে বেরাতে পারবে। এ সমাজ ওঁকে কথার বানে মারার আগে, এরাই না-হয় মেরে ফেলুক। আঁধার কোথায়? কোথায় সে? সে খুঁজছে না চাদনীকে? মানা করেছিলো না চোখের আড়াল হতে। হলো তো চাদনী। এখন সে আসছে না কেন, ওঁকে খুঁজতে খুঁজতে।
নিজের সহল অসহায়ত্ব নিয়ে কাদলো চাদনী। ভয়ে বুক কাঁপছে ওর।মস্তিষ্কের প্রতিটি শিরা দপদপিয়ে জানান দিচ্ছে খুব শীঘ্রই ওর চরিত্রে কালি ছোঁড়া হবে।সেই সাথে কল্পনায় আসছে, গ্রামের মানুষগুলোর ওঁর চরিত্রে কাঁদা ছোড়ার দৃশ্য।চেয়েও মনের মধ্যে সাহস সঞ্চার করে রাখতে পারছে না চাদনী।মেয়েদের সবচেয়ে দামী জিনিস তাদের ইজ্জত-সম্মান। সেটাই যখন আহূতি হয় তখন বেঁচে থাকার আর কোনো কারণ থাকে না।
ওর কান্না দেখে পৈশাচিক আনন্দ পেলো রিক। গায়ে থেকে সাদা রঙের সিল্কের ওড়না ছিনিয়ে নিলো একপ্রকার। চাদনীর হাত দু’টো খাটের পাটাতনের সাথে শক্ত করে বেধে অট্টহাসলো।
পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে সুধালো
-“ডোন্ট ক্রাই। আমার কথা শুনলেই তেমন একটা ক্ষতি হবে না তোমার। আমরা একটা ডিসকাশনে আসতে পারি।
-“আঁধার ভাই ছাড়বে না আপনাদের। আমাকে এখানে এনে ঠিক করলেন না আপনারা। এর মাশুল আপনাদের দিতেই হবে। আমার ক্ষতি করে আপনারা পার পাবেন না।”
চাদনীর কণ্ঠ ভেজা।অসম্ভব ভয়ে আর ক্রোধে মেশানো। ছেলেগুলো কোনো উত্তর দিল না। চাদনী হাত পা ছোটাতে চায়লো। হাত ওড়নার বাঁধনে বাধা। পা দু’টো ছেলে দু’টো ধরে রেখেছে।চাদনী সাবধান বাণী দিলো ওঁদের। আঁধার শেষ করে ফেলবে ওদেরকে। ছাই বানিয়ে দেবে। এতো বড় ভুল ওরা যাতে না করে। ওঁকে মেরে ওরা নিজেরা বাঁচবে না। চাদনী নিজে শেষ হলে, আধার ওদেরও নিঃশেষ করে দেবে।
কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করার পর চাদনী ক্লান্ত হয়ে মাথা নামিয়ে নিল। চাদনীর অবস্থা দেখে গা কাঁপিয়ে হাঁসলো ওরা।সেই বিকট শব্দ গুমোট পরিবেশ আরো ভুতুড়ে করে তুললো।ভেজা হতভম্ব হয়ে তাকালো চাদনী।এভাবে উন্মাদের মতো হাসার কারণ ঠিক ঠাওর করতে পারলো না।
-“ডিসকাশন টা শোনো।” রিকের কন্ঠ বাতাসের সাথে ভেসে এলো। চাদনী ভেজা চোখে তাকালো।
-“আঁধার কে ছেড়ে দাও। ও শাবিহার।তোমার না। উড়ে এসে জুড়ে বসেছো কেন তুমি, হ্যাঁ? এতোটুকুনি একটা মেয়ে, আমার বন্ধুর সংসার কেঁড়ে নিয়েছো। অন্যের সংসার করছো। অন্যের ভালোবাসার মানুষকে কেঁড়ে নিয়েছো। তারপরও এতো বড় বড় কথা কি করে বলো?”
-“আমি কিচ্ছু কাড়িনি। কারো কোনো জিনিস নিই নি আমি। আমি নিজ থেকে আসিওনি। আমাকে আনা হয়েছে। যদি আঁধার ভাই শাবিহা আপুকে এতোই ভালোবাসতো তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করলো?” চাদনী সাহস সঞ্চার করে বললো। ওর স্বর মৃদু। চেঁচাতে চেঁচাতে গলা বসে গেছে। মনে হচ্ছে, গলা ফেটে রক্ত বেরোবে। তবুও কী কারো কানেই ওর চেঁচানোর শব্দ পৌঁছাচ্ছে না!
-“আঁধার কে ছাড়বা? হ্যাঁ না-কি না?”
-“আমি কে হই তাকে ছাড়ার? আমার জীবনের সব সিদ্ধান্ত সে নেয়। সে না চায়লে, আমি তাকে ছাড়তে পারবো না।”
-“তাহলে এমন কিছু করি, যাতে সে নিজেই তোমাকে ছেড়ে দেয়। তোমার নিজের কষ্ট করে ওঁকে ছাড়তে না হয়, কী বলো?”
কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে ঘৃণায় মুখ ঘোরালো চাদনী।অট্ট হাসলো রিক।ঠোঁট গোল করে, তাচ্ছিল্য করে বললো
-“ছুরত না থাকলেও, জিদ কিন্তু ষোলো আনা।আমাদের রাতটা খারাপ যাবে না কী বলো!
রিক ঝুঁকলো ওর কাছে।চাদনীর চিবুক ধরলো আলতো করে।শিষ বাজিয়ে বললো
-“বি প্রিপেয়ার্ড বেবি! তোমার রাতটা আজ খুব সুন্দর কাটবে। চিন্তা করো না, তোমার আঁধার বেপ্পি তোমার অবস্থা দেখে, এমনিতেই তোমাকে ছেড়ে দেবে। তোমার চেয়ে বেশি আমরা তাকে চিনি। নিজে বারো হ্যান্ডেড হলেও, তার ইনটেক জিনিসপত্র লাগে। চু চু চু!”
রিক ঠোঁট গোল করে আফসোস করলো।
চাদনীর চোখ বেয়ে টুপ করে অশ্রু গড়ালো।ঠোঁট কাঁপছে ওর।কান্না আটকানোর বৃথা চেষ্টা করছে। ও কোনো মতে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো
-“মেরে ফেলেন এর চেয়ে।আমি মরে গেলেই শাবিহা আপু আঁধার ভাইকে পেয়ে যাবে।”
-“নাহ, রিক দু’পাশে মাথা নাড়লো। খুব শান্ত কন্ঠে বললো
-“মৃত্যু খুব সহজ শাস্তি হবে তোমার জন্য। আমার বন্ধু একটা বছর কষ্ট পেয়েছে। সে কষ্টের মাশুল তুলবো না। সে একবছর কষ্ট পেলে, তোমাকে এক শতাব্দী কষ্ট পেতে, তবেই না প্রতিশোধ পূর্ণ হবে। তোমার জামাইয়ের প্রতিশোধ যে তোমার থেকে তুলতে হবে।
চাদনীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এ খবরটা রাতের কানে এলো তখন যখন কথাটা সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পরলো। একটা মেয়ে রাত বিরেতে একটা জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি থেকে উধাও হয়ে গেলো। এটা আসলে বিশ্বাস করার মতো কোনো ঘটনা না। পুরো এরিয়া জুড়ে সিসিটিভি ফুটেজ। কার এতো সাহস হলো যে এতো গিজগিজ করা মানুষের মধ্যে থেকে একটা মানুষকে নিয়ে যাবে।
রাতের বুক ধ্বক করে উঠলো। এই জায়গাটা ভালো না। এখানে অভিশাপ আছে। ওর পুরো ছোটবেলা শেষ করে দিয়েছে। ওর মায়ের সংসার ভেঙে দিয়েছে। ওঁকে সারাজীবনের জন্য একা করে দিয়েছে। ইশ! মেয়েটাকে ও অনেক্ষণ ধরে খুঁজ ছিলো। অনেক খুজেও যখন চোখে পরলো না তখন ভেবে নিয়েছিলো হয়তো তার স্বামীর সাথে আছে। অন্যের বউকে এতো উদগ্রীব হয়ে খোঁজা ঠিক না। শ্যামাঙ্গিনী, ও ঠিক আছে তো!
চোখের কোণা বেয়ে নোনাজল গড়াচ্ছিলো চাদনীর। হাত পা অসাড় হয়ে আসছে।মনের যন্ত্রণার সাথে শরীরের যন্ত্রণা কাহিল করে দিচ্ছে ওঁকে। তিনটা জানোয়ার চেপে ধরেছে ওঁকে। প্রস্তুতি নিচ্ছে ওঁকে ভেঙে দেওয়ার জন্য। এক্ষুণি শেষ করে দেবে ওঁকে। ও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত তবে কলঙ্কের জন্য না। চাদনী মনে মনে দোয়া পরছে। কিছু একটা হোক। আঁধার আসুক। বাঁচাক ওকে। কেও তো আসুক। ওর বাবার মুখটা খুব মনে পরছে ওর। চট্টগ্রাম থেকে আমার সময় একবার মানুষটার সাথে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলেনি ও। চাদনী তো একবার শেষ সুযোগও পাবে না তার সাথে কথা বলার জন্য। ও নিজের কলঙ্কিত মুখ না আঁধার কে দেখাতে পারবে, না ওর বাবাকে। হঠাৎই বাইরে কিছু গন্ডগোলের শব্দ আসলো এই ধারে! চাদনী মাথা তুলে তাকানোর শক্তি পেলো না। ও ভয়ে জ্ঞান হারালো।নিজের শেষ হওয়ার দৃশ্য ওর নিজের দেখার শক্তি নেই। বাইরে থেকে চিৎকার-চেচামেচির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। দপদপিয়ে দৌড়ানোর শব্দও ঠাওর করা যাচ্ছে। বুটের শব্দ এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। রিক আর ওর সহযোগিরা তাকালো। ঢোক গিলে, একে অপরকে দেখলো। এখনো তো কিছু করতেই পারলো না ওরা, তার আগেই ধরা পরে যাবে!
আচমকাই কাঠের দরজাটা ধুম করে ভেঙে গেলো।হকচকিয়ে সামনে চাইলো ওরা। প্রথমেই রাতের চিন্তিত, রাগান্বিত মুখ দৃশ্যমান হলো।পরপর আঁধার, শাবিহা দৌড়ে এলো। আঁধার থেমে গেলো দরজায়। পা চালিয়ে ভেতরে আসতে পারলো না। পেছনে প্রেসের লোকজন, কয়েকজন জার্নালিস্ট। তাঁদের হাতে ডিজিটাল ক্যামেরা। সাথে পার্টির অনেকজন এসেছে।
রিক দ্রুত পায়ের নামলো বিছানা ছেড়ে। আঁধারের দিকে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। পরক্ষণে ইনোসেন্ট মুখ করে আঁধারকে বুঝ দিতে চায়লো,
-“ভাই, ও ডেকেছিলো আমাদের।”
আধার একপলক রিকের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফেরালো, চাদনীর দিকে। ওর পা দু’টো ছেড়ে দিয়েছে ছেলে দু’টো। কিন্তু ওর নাজুক অবস্থা। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পরে আছে মুখের উপর। গায়ের কাপড় ঠিকঠাক নেই। গাউনের অনেক জায়গায় টানাহেঁচড়ার ফলে ছিড়ে গেছে। শরীরের অনেক জায়গা আঁচড় খামছির দাগ। শ্বাসের গতি ধীর। বহু কষ্টে শ্বাস ফেলছে, বুকের উপরের চামড়ার ওঠা নামা দেখেই বোঝা যায় তা। মেয়েটার চোখ দুটো বন্ধ। কিন্তু জ্ঞান হারায়নি পুরোপুরি। আঁধার ঢোক গিললো, ও কিছুক্ষণ নড়তে পারলো না। ওর অবশ মনে হলো নিজেকে।
ওঁকে সরিয়ে দিয়ে রাত ভেতরে প্রবেশ করলো। চাদনীর দিকে বেশিক্ষণ তাকালো না। চোখ ফিরিয়ে নিজের গায়ের কোর্টটা দিয়ে ঢেকে দিলো চাদনীকে। গলার স্বর উঁচিয়ে বললো
-“সুহাশ, সবাইকে নিয়ে যাও এখান থেকে। এখানকার কোনো ভিডিও বা ছবি যাতে কারো ক্যামেরায় না থাকে।”
সুহাশ আর দলের কয়েকজন সে ব্যাপারটা সামাল দিলো। শাবিহা ভয়ে মুখে হাত চাপলো। রিক এসব করবে, কখনো ওর ভাবনাতেও আসেনি। ওর মনে হয়েছিলো রিক চাদনীকে ভয় দেখাবে। আঁধারের জীবন থেকে চলে যেতে বলবে। বা গুম করে দেবে। সেটাই করতো। দরকার হলে মেরে ফেলতো। এখন যে ধরাটা খেলো। এর ব্লেইম তো শাবিহার উপরও আসবে।
ও আঁধারের হাত ধরতে গেলো। তার আগেই আঁধার তেড়েফুঁড়ে গেলো রিকের কাছে। কলার ধরে মুখ বরাবর সর্বশক্তি দিয়ে ঘুষি বসালো। এতোটাই জোরে মারলো যে এক ঘুষিতেই নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো ওর। রিক উল্টে পরতে পরতে সামলালো।। নাকে হাত চেপে বেজে বেজে বললো
-“শাবিহা থেকে জিজ্ঞেস কর, মেয়েটা ডেকেছে আমাদের। নয়তো আমাদের লেভেল এতো নিচুও না।”
আঁধারের কানে একটা শব্দও প্রবেশ করলো না। ওর রাগে হাত পা কাঁপছে। ও আরেকটা ঘুষি বসালো রিকের মুখ বরাবর। এবারে রিক নিজের তাল রাখতে পারলো না, পরে গেলো মেঝেতে। আঁধার ওর গায়ের উপর চড়ে বসলো।
গলার উপর হাটু দিয়ে পাড়া দিয়ে, চোখের পাপড়ি টেনে ছিড়ে ফেললো। রাত টেনে আনলো ওঁকে। আঁধার আবারো তেড়েফুঁড়ে যেতে চায়লো ওর কাছে। কাপছিলো ও। মুখ দিয়ে একটা রাগান্বিত শব্দ পর্যন্ত বের করতে পারছিলো না।
রাত ওর শার্ট আকড়ে ধরে গম্ভীর স্বরে বললো
-“ওঁকে মারার চেয়েও এখন বেশি জরুরি চাদনীকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া।”
আঁধার থামলো ঠিকই, কিন্তু ছেড়ে দিলো না রিককে। রাতের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে, সর্বশক্তি দিয়ে লাথি বসালো রিকের শরীরে। রিক চেঁচিয়ে উঠলো।
চাদনী ভয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। তেমন ক্ষতি হয়নি ওর। শুধু টানা হেচড়ায় শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিড়ে গেছে। অনেক জায়গা নখের দাগ বসে, রক্ত গড়িয়ে পরছে সেখান থেকে। আঁধারের চোখে খুব বিধলো ব্যাপারগুলো। ওর ইচ্ছা করলো রিকের শরীর থেকে চামড়া টেনে টেনে খুলতে। মেয়েটার উপর কারো ছায়াও সহ্য হয় না ওর।সেখানে রিক ছুঁয়েছে ওকে, আঁচড়ের দাগ বসিয়েছে। রাতের কোর্টটা দিয়ে চাদনীকে পেঁচিয়ে নিজের কাছে আনলো আঁধার। গালে হাত দিয়ে, ভাঙা গলায় ডাকলো
-“চাঁদ। এই, চোখ খোল।এসে গেছি আমি। এতো বোকা কেনো রে তুই? একটু বুদ্ধি খাটালে কি হয়! আমার আসতে আরেকটু দেরি হলে কি অঘটন হতো বলতো!”
চাদনী উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। আঁধার
চাদনীকে পাঁজা কোলে তুললো। হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে। শাবিহা দেয়ালের সাথে শিটিয়ে ছিলো। আঁধারের ওই দৃষ্টিতেই খুন হয়ে যাচ্ছিলো বারবার৷ আঁধার ওর ঘৃণার মানুষগুলো ছাড়া কখনো কারো দিকে ওভাবে তাকায় না। রাত খুব শান্ত দৃষ্টিতে দেখলো শাবিহাকে। শাবিহা তুতলে বললো
-“ভাইয়া,,
রাত খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বললো
-“সবাইকে নিয়ে বাইরে যাহ।”
ওর এ স্বাভাবিক কন্ঠই অস্বাভাবিক। ঝড়ের পূর্বাভাস৷ শাবিহা ক্ষতিটা কার করলো, চাদনীর, না ওর নিজের? এখন ও এতোদিকে সামাল দেবে কি করে!
রিক মেঝেতে পরে কোকাচ্ছে। আঁধার ওর দুচোখের পাপড়ি টেনে টেনে ছিঁড়েছে। ওর অন্ড*কোষ বরাবর ব্যুট জুতো দিয়ে সজোরে লাথি বসিয়েছে। ও উঠে দাঁড়াতে পারছে না।
রাত আগুন দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। এমন ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলো ও খুব ছোটোবেলায়। ওর নিজের মায়ের সাথে এমন একটা ঘৃণ্য ঘটনা ঘটেছিলো। রাত সে ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলো, আজ এ ঘটনারও হলো। সে দিন পুরো রাত কেঁদে ছিলো রাত।ওর মায়ের সুন্দর, ইনোসেন্ট মুখটা বারবার চোখের সামনে ভাসছিলো! ওর মায়ের ক্ষত, কষ্ট সেসব নিয়ে দুঃখ তো ছিলোই তার চেয়েও বড় দুঃখ ছিলো ওর বাবার প্রতি ওর মায়ের ভক্তি,ভালোবাসা সব। যা ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছিলো রাতকে।কেন তার মা এমন একটা মানুষকে ভালোবাসতে গেলো, যার তার সম্মান নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা ছিলো না!
ওর বাবা সময়ের পরিক্রমায় অতো কাছের মানুষটাকেও ভুলে গিয়েছিলাে।এমনই হয়! আমরা ভুলে যাই!স্মৃতির উপর ধুলাবালি জমে যায়।দু’দিন আফসোস করি হয়তো, তারপর আবার নিজেদের নিত্য জীবনে ফিরে যায়।তবে যার হারায়! সেই জানে প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা!সেই মনে রাখে, প্রতিনিয়ত কষ্টে তড়পায়! রাত তড়পে গেলো। বিশটা বছর ও কষ্টে, যন্ত্রণায় তড়পালো। ওর বাবার কিচ্ছু হলো না। সে আরেকজন নারীকে নিয়ে ঠিকই সুখের সংসার সাজালো।
কাজলরেখা পর্ব ৫১
চাদনীর সাথে কেন এমন একটা ঘটনা ঘটে গেলো আজ! কেন এমন হলো? শিট! শিট! এটা হওয়া উচিত হয়নি। চাদনী ট্রমাটাইজ হয়ে গেলো। এখন ও তড়পাবে। রাতের মতো। আঁধার ওঁকে বুঝবে তো না! না, ওর বাবার মতো ভুল বুঝবে? বিশবছর আগে ও ওর বাবাকে ছেড়ে দিলেও, এ বারে ও আঁধার কে ছাড়বে না। আঁধার কে চাদনীর সিচুয়েশন বুঝতেই হবে। ও চাদনীকে ছাড়তে পারবে না। কক্ষণো না।

Next part plz taratari den
Next part plz
Next part plz apu🙏