কাজলরেখা পর্ব ৫৩
তানজিনা ইসলাম
আঁধার যখন এহসান বাড়িতে ঢুকলো, তখন রাত তিনটা বেজে পয়তাল্লিশ মিনিট। দারোয়ান ওকে আটকালো না। শাবিহার সাথে অনেকবারই দেখেছে ওকে। তারউপর এমন একটা ঘটনা ঘটলো যে এতো রাতেও মানুষের আনাগোনা লেগে আছে এহসান বাড়িতে। কেও বাইরে যাচ্ছে, কেও ভেতরে আসছে।
শাবিহা বাগানে বসে আছে৷ ওঁদের বাগানটা অনেক বড়। সবসময় চেয়ার টেবিল এমনিতেই থাকে বসার জন্য। আজ অনুষ্ঠান হওয়ায় আরো বেশিই আছে।
একজায়গায় স্হির হয়ে বসতে পারছে না ও। কিছুক্ষণ চেয়ারে এসে বসছে, কিছুক্ষণ উঠে পায়চারি করছে।
ওর ব্লাড প্রেশার হাই হয়ে যাচ্ছে। একটু আগেই প্রেশারের ওষুধ খেয়েছে ও।ওর সব বন্ধুরা চাঁদনীকে দেখতে গেছে। তটিনী ওকে বলেছিলো যেতে। কল করেও জানিয়েছে চাদনীর জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু চাঁদনী কে দেখতে যাওয়ার সাহস হয়নি ওর। ওর বন্ধুরা সন্দেহ করছে ওঁকে। আমান তো অনেকবার বলেও ফেলেছে যেতে যেতে, তুই করেছিস এমন তাই না। বন্ধুকে উসকে দিয়েছিস। বাচ্চা মেয়েটার সাথে এমন না করলেও পারতি। তোর থেকে এটা আশা করি নাই শাবিহা।” আরে ভাই শাবিহা করেছে টা কি? ওরা সবাই ওঁকে ব্লেম করছে কেন? ও নিজেও তো সবার সাথেই গেলো সেখানে। তাহলে ওর দোষটা কোথায়? কেন রিক ধরা পরেছে বলে, ওকেও কালপ্রিট বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
শাবিহার রাগ হয় চাদনীর উপর। মেয়েটা বশ জানে কি-না কে জানে! আঁধার যে প্রথমে, ওঁকে সহ্যই করতে পারতো না। সে এখন চাদনীকে ছাড়া কিছু বোঝেই না। ইভেন ওর বন্ধুরা পর্যন্ত মেয়েটার পক্ষ নিচ্ছে। শাবিহাকে কালপ্রিট বানাচ্ছে। শাবিহার এতো বছরের বন্ধুত্বের চেয়ে ওই মেয়েটা বেড়ে গেছে সবার কাছে!ওর বড় ভাই পর্যন্ত মেয়েটার জন্য চিন্তা করছে। সাবধান বাণী ছুড়ছে ওঁকে। যেখানে আবরার কখনো চোখ রাঙিয়ে কথা পর্যন্ত বলেনি ওর সাথে, সেখানে শাবিহাকে বলছে ওঁকে শাস্তি পেতে হবে।শুধু ওই মেয়েটার জন্য? রিক যা করেছে একদম ভালো করেছে। এতোক্ষণ ওর রিকের উপর রাগ হচ্ছিলো। কেন একটা মেয়ের ইজ্জতে হাত দিলো ও। এখন মনে হচ্ছে না, এই টাইপের মেয়েগুলোর সাথে এমনই করা উচিত। এরা আরেকজনের প্রিয় মানুষকে কেড়ে নিয়ে নিজের দল ভারী করে। আর কি কি কাড়বে ওই মেয়েটা? প্রিয় মানুষ, খুব কাছের বন্ধুবান্ধব, এমনকি নিজের বড় ভাইকে পর্যন্ত ওর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলো।
শাবিহা লম্বা করে শ্বাস নিলো। আরেকটু হলে হার্ট অ্যাটেক করবে ও। এমনিতেই বুকে ব্যাথা উঠে গেছে। প্রেশারের ওষুধ কাজ করছে না হয়তো।
পানি খেতে খেতে পেটে পুকুর বানিয়ে ফেলেছে শাবিহা। তবুও গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ওর বারংবার।এতোটা চিন্তায় কখনো পরেছে কি-না ও, মনে পরে না। আঁধার ওঁকে ভুল বুঝবে। চাঁদনীর অবস্থার জন্য দ্বায়ী করবে ওঁকে। আর্গুমেন্ট করবে ওর সাথে। রাত নিজ দায়িত্বে রিক আর ওর দুই বন্ধুকে পুলিশে দিয়েছে। ওঁদের অবস্থা কি হবে, শাবিহা ভাবতে পারছে না। রাত যখন দায়িত্ব নিয়েছে, তখন ওদের অবস্থা বেহাল করে ছাড়বে ও। মামলার উপর মামলা হবে ওঁদের উপর। চৌদ্দশিকের আড়ালে কাটবে সারাজীবন । যদিও রাত এখনো ওঁকে কিছু বলেনি। তবুও ও নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। বোন বলে ছাড় পাবে না ও। রাতের বিচার সবার জন্য সমান। রিক যেমন শাস্তি পাচ্ছে শাবিহাও পাবে। এতে চিন্তা নেই ওর। ও শাস্তি মেনে নিতে সদা প্রস্তুত। ভুল করেছে যখন শাস্তি তো পেতেই হবে। কিন্তু বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার মতো শাস্তি কি করে সহ্য করবে শাবিহা? এতো বছরের বন্ধুত্ব, ওর একটা ঠুনকো ভুলে ভেঙে যাবে! যেখানে ও, সরাসরি জড়িতও ছিলো না।
ইশ! এতো বড় ভুল কিভাবে যে হয়ে গেলো ওর দ্বারা। শাবিহা নিজের কপালে হাত রাখলো।
তক্ষুনি আঁধার এলো ওর কাছে।
ভুত দেখার মতো চমকালো শাবিহা। এতো রাতে আঁধার এখানে। ও কি হ্যালুসিনেশনে ভুগছে?ভয়ের চোটে মাথা খারাপ হয়ে গেছে ওর? আঁধার এতো রাতে চাঁদনীকে ফেলে এখানে আসবে, তা কী হয়!
শাবিহা অস্হির, আতঙ্কিত দৃষ্টিতে দেখলো আঁধার কে। অথচ আঁধারের দৃষ্টি নিষ্প্রভ, স্হির। কোনো চঞ্চলতা নেই সে দৃষ্টিতে। অথচ শাবিহার দেখা সবচেয়ে চঞ্চল একটা মানুষ আঁধার। যার চোখের দৃষ্টিতে সবসময় চঞ্চলতা থাকে, সে মানুষটার চোখের নিস্তেজ ভাব শাবিহার হজম হলো না। শাবিহা লম্বা শ্বাস নিয়ে সাহস সঞ্চার করলো নিজের ভেতর। আঁধার যা-ই প্রশ্ন করুক ও সবকিছুর উত্তর না দেবে। সবকিছু অস্বীকার করবে ও। রিক মারা খাক! ওঁকে ওর বন্ধুত্ব বাঁচাতে হবে। শাবিহা বিক্ষিপ্ত শ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো আঁধারের কাছে।
ধরফরিয়ে বললো
-“অন্ধকার, চ্ চাঁদনী কেমন আছে? ডক্টর কি বলেছে রে?”
আঁধার উত্তর দিলো না। শাবিহা অপেক্ষাও করলো না জবাবের। নিজের মতো সাফাই দিয়ে বললো
-“জানিস আমান, রাবিব, মাহাদী, তটিনী আমাকে ভুল বুঝছে। আমি না-কি পরোক্ষভাবে দ্বায়ী চাঁদনীর এ অবস্থার জন্য। রিক আমার বন্ধু, আমি ওঁকে এসব করতে বলেছি। ওরা আমাকে বিশ্বাস করছে না। তুই বল, আমি এমন করতে পারি? তুই আমাকে চিনিস না অন্ধকার? আমি কি এতো খারাপ! এই, তুই বল। বল, আমাকে বিশ্বাস করিস।”
আঁধার এবারেও উত্তর দিলো না। ও শুধু পাথর হয়ে দেখলো শাবিহাকে। শাবিহা বিহ্বল দৃষ্টিতে দেখে ওঁকে। আঁধার কি ঘৃণার চোখে দেখছে ওঁকে! আঁধার ওঁকে ঘৃণা করতে পারে? পারে না। আঁধার, শাবিহা কে ঘৃণা করতে পারে না। কক্ষণো না। ও ভুল দেখছে। আঁধারের চোখের ভাষা ও বুঝতে পারছে না। শাবিহার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো। বুকের ঢিপঢিপানি বেড়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে
-“কিছু বল। কিছু তো বল। বল যে আমি করিনি এসব। আমি দ্বায়ী না। আমি এমন নিচু একটা কাজ করতে পারি না।”
আঁধারের জবাব পায় না শাবিহা। ও ভাঙা গলায় বললো
-“এই, দোস্ত। অন্ধকার। বল না। প্লিজ বল, আমাকে বিশ্বাস করিস না তুই? আমি এমন করতে পারি? তুই আমাকে বিশ্বাস না করলে, কে করবে? সবসময় তো আমাকে বিশ্বাস করে এলি। বলেছিলি না, পুরো দুনিয়া আমার বিরুদ্ধে চলে গেলেও আমাকে বিশ্বাস করবি তুই। আজ কি হলো অন্ধকার?”
-“সে সেনসিটিভিটি নেই আর।” আঁধার কাঠ গলায় জবাব দিলো।
-“কী?” বিষাদ স্বরে জিজ্ঞেস করে শাবিহা।
-“এমন কেন করলি?”
-“কি করেছি আমি? বল, কি করেছি? আমার দোষ কোথায়? আমি বলেছি রিককে এসব করতে?”
-“বলিসনি? ওর কি শত্রুতা থাকতে পারে চাঁদনীর সাথে? কীসের এতো আক্রোশ, যে মেয়েটাকে সারাজীবনের ট্রমায় ফেলে দিলো ও!”
শাবিহা ঢোক গিলে উত্তর দেয়
-“জানি না আমি। আমার জানা নেই।”
-“তুই বলিসনি রিককে? বলিসনি তুই?”
-“আমি কিচ্ছু বলিনি অন্ধকার। বিশ্বাস কর আমাকে তুই!”
আঁধার শ্লেষাত্মক হাসলো। অগোছালো স্বরে বললো
-“হাহ! বিশ্বাস। তুই জানিস শাবিহা, চাঁদনী এ ইন্সিডেন্টের পর কতোটা ট্রমাটাইজ হয়ে যাবে? প্রতিটা মুহুর্ত ট্রমায় কাটবে ওর। তুই ভাবতে পারছিস, আমি বা তোর ভাই আরেকটু দেরি করে গেলে কি হতো ওর সাথে?ও অনেক কষ্ট পেয়েছে রে। অনেক কষ্ট হয়েছে ওর। ওর পুরো শরীরে অসংখ্য জখম দেখে এসেছি আমি। ওর জ্ঞান ফেরার পর আমি বোধহয় ওর চোখে চোখ রাখতে পারতাম না। আমার জন্যই তো হলো এসব তাই না! দোষ করেছি আমি, রিককে বন্ধু বানিয়েছি আমি, রিকের সাথে শত্রুতাও আমার সাথে। অথচ সাফার করছে মেয়েটা। কেন করছে? আমার জন্য? আমার অপরাধের ফল ও কেন পাবে? আমি এখানে উত্তর জানতে এসেছি। আর কেন এসেছি জানিস, হিসেব চাইতে। ঠিক কোন কারণে মেয়েটার উপর এতোটা আক্রোশ তুললি তুই?”
শাবিহা টলমলে দৃষ্টিতে তাকালো আঁধারের দিকে। ও অনেক্ষণ ধরে চোখের জল আটকে রেখেছে। আজ এই চোখের জল আঁধারকে টলাতে পারছে না। নয়তো আঁধার এতো নিস্তেজ, নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো না। শাবিহা খুব করে চাচ্ছে আঁধার কে বিশ্বাস করাতে ও এটা করেনি। এতো হীন, জঘন্য একটা কাজ, একটা মেয়ের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আর যায় হোক শাবিহার পক্ষে সম্ভব না।
-“ওই বাস্টার্ড টা কই? কোথায় ও? ওই হারামির সব হারামিপিনা বের করবো আমি। ওরে ঠিকমতো মারতে পারি নাই বুঝছোস। চাঁদনীর অবস্থা দেখে অন্য কোনো দিকে খেয়াল করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। খুব হেডাম ওর তাই না? তোর তো আবার খুব ক্লোজ। এতো সাহস তুই ওঁকে দিয়েছিস। তুই বলেছিস৷ ওঁকে এসব করতে তাই না।”
আক্রোশে চেঁচালো আঁধার। খুব শক্ত করে শাবিহার দুই বাহু চেপে ধরলো ও।শাবিহার মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। ও ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকে আঁধারের দিকে। আঁধার খুব শক্ত করে ধরেছে ওঁকে। সকল আক্রোশ ঢেলে দিয়েছে হাতে। শাবিহার ব্যাথা অনুভূত হলো না। ও কান্নার চোটে কিছু বলতে পারছে না। ও আঁধারের চোখের দিকে তাকাতে পারছে না।ওই চোখে যে রাগ, ক্ষোভ, অসহায়ত্ব, দুঃখ আছে তা শেষ করে দিচ্ছে শাবিহা কে। আঁধার হুটহাট রেগে যাওয়া মানুষ। রাগ ওর নাকের ডগায় থাকে সবসময়। একটা সিম্পল বিষয় নিয়েও কিভাবে বাজে রিয়েক্ট করা যায়, সেটা আঁধারকে দেখে বুঝেছে শাবিহা। কিন্তু শাবিহা এটা বলতে পারে, ও কখনো এতোটা রাগতে দেখেনি আঁধারকে। এতোটা রাগ কখনো উপলব্ধি হয়নি ওর।
শাবিহার নিজেরও রাগ হলো খুব। অকস্মাৎ ক্ষোভ জন্মালো চাঁদনীর উপর।সেটা উগড়াতে, শাবিহা বিমূঢ় স্বরে বললো
-“হ্যাঁ দিয়েছি। কি করবি তুই?”
আঁধার অবাক দৃষ্টিতে তাকালো শাবিহার দিকে। যে শক্ত বাঁধনে শাবিহার বাহু আঁকড়ে ধরেছিলো আঁধার, তা ঢিলে পরতে শুরু করলো। এই না মেয়েটা সাফাই দিচ্ছিলো নিজেকে নিয়ে। কাদছিলো। অথচ এখন কতো শক্ত গলায় অবলীলায় বলে দিচ্ছে এটা ও করেছে।
-“শাবিহা।” আঁধারের গলা কাঁপলো।
-“কী? মারবি আমাকে? শাস্তি দিবি? হিসেব চাইতে এসেছিস তাই না। যাহ, স্বীকার করলাম যে আমি করেছি। কি করবি তুই? বল। আমিই বলেছি রিককে, চাঁদনীর এমন অবস্থা করতে, যাতে তুই কখনো ওর দিকে ফিরেও না তাকাস। হ্যাঁ, আমি এসব করতে বলিনি। কিন্তু আমি স্বায় দিয়েছি।”
আঁধারের মুখ দিয়ে কথা বের হলো না। শাবিহা এভাবে মুখের উপর হ্যাঁ বলে দিবে, আঁধারের আইডিয়া ছিলো না। এতো কঠিন একটা কথা কি অবলীলায় বলে দিলো মেয়েটা। আঁধার চিনতে পারে না শাবিহা কে। যে শাবিহা ওর বেস্টফ্রেন্ড ছিলো সে শাবিহা অনেক অমায়িক,নরম একটা মানুষ ছিলো। এতো জঘন্য সে শাবিহা কখনোই হতে পারতো না। আঁধার এ শাবিহাকে চিনতে পারছে না।
শাবিহার কোটর বেয়ে অশ্রু গড়ায়। ও ভেজা চোখে আঁধারের দিকে তাকিয়ে বললো
-“আমি তোকে ভালোবাসিরে অন্ধকার। অনেক ভালোবাসি আমি তোকে। বিশ্বাস কর, অনেক চেষ্টা করেছি তোকে ভোলার। বারবার নিজেকে বুঝিয়েছি তুই বিবাহিত। তোর বউ আছে। আমার জন্য কি ছেলের অভাব হবে, যে আমি একটা বিবাহিত ছেলেকে বিয়ে করবো! তার দ্বিতীয় অপশন হবো আমি! দুই সেকেন্ড পরেই সব ভুলে যেতাম। কেমন যে লাগতো আমার তোর জন্য। ইশ! কেন যে আমি তোকে বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু ভেবে ফেললাম। কেন আমি তোকে এতোটা ভালোবেসে ফেললাম যে আমার ঠিক, ভুল বাচাবিচার করার মতো পরিস্হিতি রইলো না! আমি চাইলাম, তুই চাদনী থেকে দূরে সরে যা। আমাকে নিজের না কর, কিন্তু চাদনীও তোর হয়ে না থাকুক। আমি অন্য মেয়ের পাশে তোকে মানতে পারছিলাম না। কিন্তু আমি বলিনি রিককে এমন করতে। ও শুধু নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য আমাকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করলো।”
-“এটা তোর কেমন ভালোবাসা শাবিহা? ভালোবাসার মানুষের সাথে এমন করা যায়? ভালোবাসার মানুষের, কাছের জনকে এতোটা কষ্ট দেওয়া যায়? তোর ভালোবাসার ধরণ টা আমি বুঝতে পারছি না। এই তুই জানতিস না, চাদনী আমার কতোটা কাছের ছিলো।তুই না-কি আমাকে বুঝিস! তাহলে তুই এটা কেন বুঝলিনা, আল্লাহ না করুক চাদনীর সাথে যদি এমন কখনো হতোও আমি চাদনীকে ছাড়তাম না। কক্ষনো না। ও আমাকে ছেড়ে দিতে চায়তে পারে, কিন্তু আমি ছাড়বো না। তুই জানিস না, আমি আমার প্রিয়মানুষ গুলোকে ছাড়ি না। যারা একবার আমার জীবনের সাথে জুড়ে যায় তাঁদের ছেড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না, জানিস না তুই? উল্টো আমি চাঁদনীর চোখে নিচে নেমে যেতাম। আমি ওর সাথে দৃষ্টি মেলাতে পারতাম না, এই ভেবে আমার বন্ধুত্বের প্রতিদান ওঁকে দিতে হচ্ছে। তুই আমাকে এই চিনলি শাবিহা?”
শাবিহা মাথা তুলতে পারে না। ও মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে। আঁধার ছেড়ে দেয় ওর হাত। দুপা পিছিয়ে যায় শাবিহা। আঁধারের চোখে পানি টলমল করছে। বিশ্বাস ভাঙলো ওর। শাবিহা ওর বিশ্বাস ভেঙে দিলো। ওর খুব সুন্দর একটা বন্ধুত্ব শেষ করে দিলো। ওর খুব প্রিয় একটা মানুষের সাথে অন্যায় করলো। ভেঙে দিলো তাকে। মিথ্যা না, কিন্তু আঁধার কোনো না কোনো একদিন ওঁকে সত্যিই ভালোবেসেছিলো। সেটা বন্ধু হিসেবে হোক, বা ওর জীবনে আসা প্রথম নারী হিসেবে।
শাবিহা চোখ তুলে তাকালো। আঁধারের অস্হির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ঠোঁট দু’টো তিরতির করে কাঁপছে। কিছু বলতে চাচ্ছে, কিন্তু বলে উঠতে পারছে না।ঢোক গিলে সংবরণ করছে সে বাক্যকে।
শাবিহা বললো
-“অন্ধকার। শাস্তি দিতে এসেছিস, না! দে। যা শাস্তি দিবি আমি মাথা পেতে নেবো।”
-“বন্ধুত্ব তোর ঠুংকো হতে পারে। তুই আমাকে খুব বাজেভাবে আঘাত করতে পারিস, কিন্তু আমার দ্বারা সেটা হয়ে উঠবে না রে। তোর একটু ব্রেক চাওয়াতে আমি রেগেমেগে গ্রামে চলে গেলাম বিয়ে করতে। আমার ভালোবাসায় কমতি ছিলো। কিন্তু আমার বন্ধুত্ব তোর মতো নড়বড়ে ছিলো না। আমি জানি না চাদনী কখনো আমাকে মাফ করবে কি-না। কিন্তু আমি তোকে মাফ করে দিলাম। তোর সাথে আমার সব সম্পর্ক, এখানেই শেষ।আজকের পর থেকে, না আমি তোকে চিনি, না তুই আমাকে চিনিস।”
শাবিহা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো যেন! আঁধার এতোবড় কথা বলে দিলো। একটুও বাঁধলো না ওর? ওর ছয় বছরের বন্ধুত্ব কি অবলীলায় শেষ করে দিলো ও! শাবিহা দ্রুত আঁধারের শার্টের হাতা চেপে ধরলো। ও আঁধারের হাত ধরা ছেড়ে দিয়েছে অনেকদিন। আগে যখন তখন চেপে ধরলেও, এখন খুব আত্মসম্মানে লাগে।
-“আঁধার। নো। প্লিজ এমন করিস না। এতোবড় শাস্তি না! বন্ধুত্ব ভাঙার মতো অপরাধ আমি করিনি।”
আঁধার ছাড়িয়ে নিলো ওর হাত। স্থির স্বরে বললো
-“তোর প্রতি আমার ভালোবাসায় কমতি থেকে গেলেও বন্ধুত্বটুুকু পাক্কা ছিলো, জানিস। এজন্য হয়তো তুই কষ্ট পাবি এমন কিছু করা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। বন্ধুত্বটুকু তোলা থাকলো। এবার সৎভাবে ভালোবাসার পালা। তোর বন্ধুত্ব রক্ষা করতে করতে আমি একটা মেয়ের প্রতি ভালোবাসা উপলব্ধির সুযোগই পেলাম না। ভালো বন্ধু তো অনেক হলাম, এবার না-হয় ভালো স্বামীর দায়িত্ব পালন করি।”
-“চাঁদ।এখন কেমন লাগছে তোমার?”
তটিনীর প্রশ্নে চাঁদনী দরজা থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো। কেবিনে শুধু ও আর তটিনী। বাকিরা বাড়ি চলে গেছে। শুধু তটিনী ছিলো চাঁদনীর পাশে। ও-ই সবাইকে জোর করে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।
চাঁদনী বসে আছে। তটিনী কথা বলছিলো ওর সাথে। পার্টিতে কি হলো? কী করে চাঁদনী ওঁদের পাশ ছেড়ে, রিকের কবলে পরলো? ও তো সারাক্ষণ ওর বন্ধুদের সাথেই ছিলো।
চাদনী উত্তর দিতে পারেনি। ও এখনো কথা বলতে পারছে না। ও বারংবার চোখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। একটু পর পর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে দরজার দিকে। জ্ঞান ফেরার পর যখন থেকে চাদনী একটু স্টেবল হলো তখন থেকে, ও চেয়ে আছে দরজার পানে। কেবিনের দরজা টা বন্ধ। আঁধার এখনো আসছে না। চাদনী অপেক্ষা করতে করতে হাপিয়ে গেছে। ওর তবুও প্রতি ক্ষণে ক্ষণে মনে হচ্ছে এক্ষুণি বোধহয় দরজায় টোকা পরবে। আঁধার ওঁকে ডাকতে ডাকতে আসবে। বকবে ওঁকে, কেন এতোবড় একটা বোকামি করলো ও। কিন্তু সে আসছে না। চাঁদনী লম্বা শ্বাস ফেললো। তটিনী বুঝলো ওর ছটফটানি। অনেকক্ষণ ধরে ছটফট করছে মেয়েটা। চঞ্চল দৃষ্টিতে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। আঁধার টা এসময় কোথায় চলে গেলো কে জানে! ছেলেটা হুট করেই গায়েব হয়ে গেলো। চাদনীর তো মনে হতে পারে যে আঁধার ওঁকে ভুল বুঝলো। মেয়েটা কেমন মুখ কালো করে বসে আছে। আসলে তেমন না। চাদনী দেখেনি আঁধারের পাগলামি। চাদনী যখন চোখ মেলছিলো না, তখন কি অবস্থা হয়েছিলো আঁধারের, চাদনী দেখেনি। তটিনী ওকে প্রথমবার কাঁদতে দেখেছে। এতোটা পাগলামি করতে দেখেছে।বারবার কিভাবে ডাকছিলো ও চাদনীকে! কতোটা ভয়ে ছিলো। এসব তো চাদনী জানে না। তটিনী জানায়নি ওঁকে। অন্তত ওর জ্ঞান ফেরার পর আঁধারকে দেখতে পাওয়া উচিত ছিলো ওর। চাদনী দেখতে পায়নি।
তটিনী বললো
-“আঁধার চলে আসবে, চাদনী।মন খারাপ করো না।”
চাদনী তাকালো তটিনীর দিকে। ডানে বায়ে মাথা নাড়িয়ে বোঝালো ও আধারের অপেক্ষা করছে না। তটিনী হাসলো। কিছু বলতে যাবে, তার আগেই দরজায় টোকা পরলো।
তটিনী উঠে দাঁড়িয়ে বললো
-“এসেছো হয়তো।”
চাদনী উদগ্রীব দৃষ্টিতে তাকালো দরজার দিকে। তটিনী দরজা খুলতেই রাত প্রবেশ করলো কেবিনে। তটিনী চমকালো। তারচেয়েও বেশি অবাক হলো চাদনী।
রাত একা এসেছে। সুহাশকে ও বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। চাদনী বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে থাকে ওঁদের দিকে। দু’জন মানুষের অদ্ভুত দৃষ্টিতে রাত হকচকিয়ে যায়। নিজেকে ধাতস্থ করে বলে
-“এক্সকিউজ মি! ভুল টাইমে এসে পরলাম।”
তটিনী বললো
-“এতো রাতে ভাইয়া! আমি তো সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।”
-“উমমম। আসলে আমার কালকে চট্টগ্রামে চলে যেতে হবে। আসার সময় পাবো না। তাই ভাবলাম, রাত হলেও একটু দেখে যাই। আফটার অল আমাদের উইক সিকিউরিটির কারণেই চাদনী এতোটা বিপদে পরেছে।”
ডাহা মিথ্যে কথা! চট্টগ্রামে যাওয়ার কোনো কথা রাতের ছিলো না। তটিনী কে বলার জন্য ঝটপট ও কোনো এক্সকিউজ সাজাতে পারেনি। তটিনী সুক্ষ্ম স্বরে বললো
-“চাদনী কথা বলতে পারছে না।”
রাত তাকালো চাদনীর দিকে। ও অন্য দিকে তাকিয়ে আছে মুখ কালো করে। রাত ক্ষীণ স্বরে বললো
-“সমস্যা নেই। আমি কয়েকটা কথা বলেই চলে যাবো।”
-“আপনি কথা বলুন। আমি আছি বাইরে।”
তটিনী বেরিয়ে গেলো। রাত ধীর পায়ে গেলো চাদনীর বেডের দিকে।ওর পাশে একটা টুল টেনে বসলো। চাদনী মাথা নিচু করে বসলো। ও কারো দিকে তাকাতে পারছে না। লজ্জা হচ্ছে ওর। ওর খুব কান্না পাচ্ছে। বুকে এক পাহাড়সম কষ্ট চেপে বসেছে। সেসব কান্না করে উগড়ানো দরকার। তটিনী সারাক্ষণ ওর পাশে বসে থাকায় পারেনি। আঁধার না আসা পর্যন্ত ও কাঁদতে পারছে না। কান্না করার কারো বুক দরকার ওর।যাকে আঁকড়ে ধরে দুঃখ গুলো বের করতে পারবে। সে আসছে না, চাদনী কাঁদতেও পারছে না।
কাজলরেখা পর্ব ৫২
আঁধার এলো প্রায় শেষ রাতের দিকে। বড্ড তড়িঘড়ি করে এলেও, কেবিনের সামনে এসে বুঝলো ও আসতে দেরি করে ফেলেছে। রাত বসে আছে চাদনীর সামনে। কিছু একটা বলছে হয়তো ওঁকে।আঁধারের দিক থেকে রাতের পিঠ দৃশ্যমান। চাদনীকে খুব একটা ভালো করে দেখতে পারলো না ও, রাতের জন্য। আধার কেবিনে ঢুকলো না, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকলো। চাঁদনীর সাথে রাতের কথা বলার দৃশ্য টা, ওই সময়ে রিকের সাথে চাদনীকে পাওয়ার দৃশ্যের চাইতেও বিশ্রী ঠেকলো আঁধারের কাছে।

Please next part
আপু আপনি না অনেক ভালো প্লিজ দয়া করে নেক্সট পার্ট দিন প্লিজ আপু নেক্সট পার্ট দিন
আপু আপনি হয়তো সময় পান নাই কিন্তু আপু আমাদের দিকটা একটু বোঝার চেষ্টা করেন আপু আপনার গল্পটা অনেক সুন্দর লাগছে আমার কাছে প্লিজ আপন এক্সপার্ট গুলা দিয়ে দেন প্লিজ প্লিজ 🙏
আপু দয়া করে নেক্সট পার্টটা দিন আপনার পায়ে পড়ি প্লীজ
আপু আপনি যে একটু দেরি করে দেন তাই আপু যখন দিবেন তখন দয়া করে অনেকগুলা পাঠ একসাথে দিবেন প্লিজ আপু
আপু ২ দিন পর একটা পাট দিয়েন প্লিজ 🙏
next part pleaseeeeeeeeee
আপু প্লিজ পাঠগুলো তাড়াতাড়ি দিয়ে দেন আর অপেক্ষা করতে পারতাছি না
Pliz next part gula taratari den
Next part
ও আপু তুমি কী বেঁচে আছো। থাকলে পরের পাট একটু তাড়াতাড়ি দাও প্লিজ 🙏🙏🙏🙏😥😥
Apuu next episode plzz😭😭😭😭😭
Plz apu next part din plz