চারুবৃত্ত পর্ব ১৮
জুলি জোনাকি
তখন বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামবে, অথচ চারুর সেদিকে খেয়াল নেই । সে এলোমেলো পায়ে দৌড়ে সেখান রাস্তায় গেল , বেশ লোকের ভিড় জমেছে । ঠেলে একটু ভেতরে ঢুকে দেখলো কেউ নেই , শুধু রক্ত পড়ে আছে । এতো রক্ত দেখে মাথা ঘুড়ে উঠলো চারুর । নিজেকে সামলে একটা মহিলাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো ,
“আ আন্টি এখানে যে এক্সিডেন্ট করেছে সে কোথায় বা বলতে পারবেন ?”
“হ্যা, পোলাডারে তো হাসপাতালে লইয়া গেছে । খুব খারাপ অবস্থা , মনে হয় বাঁচাতে পারবো না । ”
চারু এবার নিজেকে আটকাতে পারলো না , চোখ ঠেলে পানি পড়তে লাগলো । এলোমেলো পায়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো, হাটুতে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো । এমন সময় কেউ একজন এসে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে চারুকে ডাকলো ,
” চারু….”
চারু কান্না দমিয়ে মুখ তুলে তাকালো, সামনে থাকা মানুষটাকে কিছু বুঝতে দেওয়ার আগেই উঠে দাঁড়ালো তারপর আচমকা তার গলা পেচিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ।
বৃত্ত বেশ আশ্চর্য হলো !এমন করছে কেন ? চারু হাতের বাঁধন আরো শক্ত করলো । বৃত্ত তার এক হাত চারুর কোমড়ে রাখলো আরেক হাত চারুর মাথায় রাখে বলল,
“কি হয়েছে, এখানে এই ভর সন্ধ্যায় কি করছো তুমি ? ”
চারুর কিছু বললো না কেবল তার ভারী ভারী শ্বাস ফেলার শব্দ এলো । বৃত্ত চারুর হাতের বাঁধন আলগা করে বললো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“শুনো শ্যামবতী, বলবে তো কি হয়েছে? ”
চারুর তার নিজ খেয়ালে আসতেই বৃত্তের থেকে ছিটকে সরে গেল । বৃত্ত চারুর মুখের দিক বেশ কিছুখন তাকিয়ে থেকে চারুর দু কাধে দু হাত রেখে একটু ঝুঁকে নিকটে গিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বলল,
“ইস !তুমি বুঝি আমার জন্য কান্না করছিলে ? কিন্তু কেন ?ওভাবে চলে এসেছি বলে ?
চারুর বৃত্তের হাত সরিয়ে, নিজের এমন কাণ্ড খেয়ালে আসতেই মাথা নামিয়ে বললো,
“আমি আসছি ।”
চারুর সোজা পথে পা বাড়াতে বৃত্ত পেছন থেকে ডাকলো,
“চারুর শুনছো? ”
চারুর পা থেমে গেল । পেছন ফিরে বললো,
“আবার কি ?”
“তোমার এই স্বভাব টা আমার বেশ লাগে ।”
চারু দু হাত বুকে গুঁজে জানতে চাইলো ,
“কোন স্বভাব? ”
বৃত্ত এক পা দু পা করে এগিয়ে আসতে আসতে বলতে লাগলো ,
“এই যে তুমি আমায় ভালোবাসো অথচ মুখে শিকার করো না । মানে বুক ফেটে যাবে তবুও মুখ ফুটে ভালোবাসি বলবে না । এটা কি ঠিক ?”
“আমি কেন আপনাকে ভালোবাসতে যাব । বাজে কথা ,বাড়ি যান ।”
বৃত্ত চারুর একদম নিকট এসে দাঁড়ালো । তারপর কানের কাছে ফিসফিসে বলল,
” ভালোবাসো না আমায় ?”
চারু ধাক্কা মারে দূরে সরিয়ে চলে লাগলো । বৃত্ত ফের হাসতে হাসতে চারুর পেছন পেছন গেল ।
“চারু কোথায় ?”
“নেই , আমায় বলুন কি দরকার ?”
“না কিছু না ।”
আদিল সন্ধ্যার দিকে আবার এসে চারুর খোজ করছিল । লতা তখন টেবিলে পরিষ্কার করছিল । তখন চারু আর বৃত্ত কে আসতে দেখে লতা এগিয়ে গিয়ে বলল,
“ওহ তাহলে তুমি বৃত্ত ভাইয়া কে খুজতে গিয়েগিয়েছিলে? আরে বলে যাবে তো ,তোমার ওভাবে ছুটে যাওয়া দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম বৃত্ত ভাইয়ার এক্সিডেন্ট হয়েছে । ”
চারু লতাকে থামানোর আগে বৃত্ত বলল,
“এক্সিডেন্ট? ”
“হ্যা তো ,সামনে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, চারুকে বলতেই সে দৌড়ে সেদিকে গেল ।”
“ওহ হো ওই কাহিনি । তাহলে আবার জড়িয়ে ধরতে পারো ।”
এই বলে বৃত্ত তার দুই হাত প্রসারিত করে চারুর দিক তাকিয়ে মুচকি হাসলো । চারু বৃত্ত কে কিছু বলার আগে আদিল ডাকলো ,
“চারু . . . একটু এদিকে আসবে? ”
চারু সেদিকে গেল । বৃত্ত দাতে দাত চেপে হাত নামালো । আরে এক হ্রাস বিরক্ত নিয়ে বলল,
“এই ছেলেটারে ভাগোও তো ,যখনি দেখবো চারু চারু করে আমার মাথা খারাপ করে দেয় । ”
লতা হেসে বলল,
“হ্যা তা তো ঠিক ,তবে ভাগাবো কি করে , রেগুলার কাস্টমার খারাপ ব্যবহার করলে আর আসবে না ।”
“তাহলে বিয়ে করে নাও , ঝামেলা শেষ ।”
বৃত্ত এমন কথা শুনে লতা পেট ধরে হাসতে হাসতে বলল,
“ঠিক আছে ভাইয়া, আমি বিয়ের ব্যবস্থা করছি , আপনি একটু শান্ত হয়ে বসুন আর কি লাগবে বলুন ।”
“কিছু না শুধু চারুকে ওখান থেকে সরাও, আমি গেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না।”
লতা হি হি করে হেসে চারুকে ডাকলো ,
“কি গো চারু , একজনকে দেখলে হবে আরো তো মানুষ আছে এদিকে এসো । ”
“আসছি ।”
চারু হেসে কথা বলছে দেখে বৃত্ত উতলা হয়ে বলল,
“দেখ আবার হাসছে , আমি গেছে দুজনে হাসা বের করবো বলে দিলাম ।”
লতা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য চারুকে ওখান থেকে জোর করে নিয়ে এলো । বৃত্ত আর আদিল দুজন দুজনের দিক বিরক্ত নিয়ে তাকিয়ে দাত কটমট করতে লাগলো ।
আজো সকাল থেকে কেউ চারুর পেছন পেছন আসছিল । বিকালের দিক চারু কাজ করছিল তখনো বৃত্ত আসে নি , এমন সময় বৃত্তের মা এসে সামনে দাঁড়াল । চারু চমকালোর সাথে সাথে বেশ অবাক হলো । মুখে হাসি টেনে ডাকলো ,
“কাকিমা তুমি এখানে ?”
বৃত্তের মা বিরক্তে হেসে খোঁচা মেরে বলল,
“তোর এসব করেই খেতে হবে । তা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এমন জায়গা তে এলি যে আমার ছেলে তোর নাগাল খুব সহজেই পেয়ে গেল । ”
চারু উওর না দিয়ে বলল,
“এখানটায় বসো কাকিমা ।”
চারুর উত্তর না পেয়ে রেগে বলল,
“আমার ছেলের পিছু ছাড়বি কবে? ”
চারু কি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল । বৃত্তের মা ফের বলল,
“দেখ চারু আমার ছেলে তোর থেকে ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে , তুই কি বুঝিস না । আমার ছেলের ভালো চাস না তুই ?”
চারু চোখ ভরে পানি এলো । তা মুছে বলল,
“কি করতে হবে আমায় বলো ?”
“আমার ছেলের অবহেলাটা পছন্দ করে না , যে অবহেলা করে তাকেও পছন্দ করে না , তুই যেভাবে পারবি আঘাত করবি । যত পারবি অবহেলা করবি । ”
চারু অতসত না ভেবে বলে ফেললো ,
“ঠিক আছে কাকিমা ।”
“মনে থাকে যেন ।”
এই বলে বৃত্তের মা চলে গেল । চারু নিজেকে সামলে নিয়ে লতার কাছে গেল ।
রাত নয়টা বৃত্ত এলো দোকানে তবে দোকান বন্ধ দেখে সোজা চারুর কাছে গেল ।
চারুর মন মেজাজ ভালো নেই জন্য আজ তারাতারি দোকান বন্ধ করে চলে এসেছে ।লতা ঘরে গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়লো, চারুর মা এখন অনেকটা সুস্থ তাই তিনিই রান্না টা করতে গেলেন । চারু বেলকুনিতে গিয়ে বসে হাটুতে ভর করে বসে ঝুঁকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো । এমন সময়ে বৃত্ত নিচ থেকে ডেকে উঠলো ,
“চারু শুনছো? ”
চারু মাথা তুলে তাকালো । বৃত্তের দিক তাকিয়ে থাকলো । বৃত্ত হাতের ইশারায় নিচে নামতে বললো । চারু চোখের পানি মুছে নিজেকে শক্ত করে নিচে গেল ।
চারু নিচে যেতেই বৃত্ত হেসে বলল,
” আজ এতো তারাতারি বাড়ি এলে যে , আমার সাথে দেখা না করেই চলে এলে ?”
চারু কিছুটা ভদ্র হয়ে বলল,
“আমার আপনাকে ভালো লাগে না , সহ্য হয়না, বুঝতে পারেন না ?”
বৃত্ত ভালো হয়তো আজ লেট করে এসেছে বলে অভিমান করে এমন ভাবে কথা বলছে । তাই বৃত্ত নিজের দু কান ধরে চারু দিক ঝুঁকে বলল,
“সরি ,একটা কাজ ছিল জন্য আসতে দেরি হয়ে গেছে । ”
চারু এবার ঝাঁঝালো কণ্ঠে তেতে উঠে বলল,
“এক কথা বারবার বলতে ভালো লাগে না , পিছু ছাড়ছেন না কেন ? আমি একদম আপনাকে সহ্য করতে পারি না বুঝতে পারেন না ? চলে যান এখান থেকে আর আসবেন না কখনো ।”
বৃত্ত কান ছেড়ে দিল । চারু যে সিরিয়াস হয়ে কথা গুলো বলছে তা বুঝতে পেরে এগিয়ে এসে চারুর হাত ধরতে যাবে এমনি চারুর তার হাত সরিয়ে ধাক্কা মারে দিল । বৃত্ত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”
চারু এবার কান্না থামিয়ে রাখতে পারলো না । কান্না করতে করতে বলল,
“আমি বড্ড ক্লান্ত, কেন বুঝতে পারেন না । কেন বারবার কাছে এসে আমার সমস্যার কারণ হচ্ছেন । কেন…..”
চারু আর কোন কথা বলার আগে বৃত্ত সব বুঝতে পারলো , কিছু একটা হয়েছে তাই চারুর হাতটা আলতো করে টেনে নিজের বুকে চেপে ধরলো । চারুর বৃত্তের বুকে কিল মারতে মারতে বলল,
চারুবৃত্ত পর্ব ১৭
“আপনি কেন চলে যাচ্ছেন না , কেন ?”
বৃত্ত চারুর মাথাটা বুকে চেপে ধরে ঠান্ডা সুরে শুধল,
“শান্ত হও চারু ……”
