ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১ (৩)
জান্নাত চৌধুরী
দুপুরের সূর্য কিছুটা হেলে পড়েছে, ঘরে প্রবেশ কৃত রোদের তীব্রতা কিছুটা কমে আসছে , বেলকনির দরজা পেরিয়ে আসা আলো টুকুও ভেতরে আসছেনা। পর্দা টেনে রাখা যে ,
কে জানে দূরে কোন রাস্তা হতে মাইকের শব্দ আসছে , থেকে থেকে আবার একটা করে পল্লি গান ও বেজে ওঠছে। কিসের ঘোষণা হচ্ছে সেসবে মনোযোগী নয় মানহা।
চলন্ত ফ্যানের শীতল বাতাসে উড়ন্ত চুলগুলো বার বার আচড়ে পড়ছে তার মুখে। চুলগুলো ভীষণ অযত্নেই রয়েছে। চুলে চুলে জোটলা বেঁধেছে। পড়ার টেবিলে বসে রয়েছে মানহা। আনমনে কত কথার মিল খুঁজে চলেছে। ইদাংনিং আরাধ্য নামক মনের জমিতে রোপণ করা ছোট চারাগাছ আর বেড়ে ওঠার সাহস করছে না। করবে কি করে মানহা যে তাতে তার নিয়মিত পানি দিচ্ছে না। কেনো দেবে ? কেনো বারংবার নিজেকে কুলশীত করবে সে ওই লোকের জন্য। করবে না!
একদম করবে না- রোজ নিয়ম করে এই কথাটা একবার অন্তত ভাবলেও আরাধ্যের ছায়ার দেখা মিললেও মনে যে এক ঝড় ওঠে তার। মানহার কেউ নেই , বাপ নেই , মা নেই , কেউ নেই তার। সে যে মীর বাড়ির আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা এক পড় গাছা। বড় একখান গাছ আকড়েই বাঁচতে বেঁচে থাকা তার।
বিপদ আপাদে এ বাড়ির লোক তাকে কতই না সাহায্য করছে। তবুও সে বেহায়ার মতো গিয়ে আরাধ্যের সামনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেললো। কেন করেছে সে? সেসব ভাবলেই নিজকে -নিজের ঘৃণা লাগে তার।
মানহার কান্না পেলো, রাগে নাকি ঘৃণায় তা বোঝার উপায়ন্তর মিলল না। মেয়েটা চোখ বুজলো, চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে নিশ্চুপ রইল কিছুসময়। চোখের কোণে পানি কয়েক ফোঁটা গড়িয়ে পড়লো –
মানহা হাতের তালুতে পানি মুছে নিলো। চোখ খুলে বইয়ের সারির মাঝ হতে একটা লাল রঙের ডাইরি বের করলো। ডাইরিটা আরাধ্যের দেওয়া। ওই মানুষটার দেওয়া ছোট ছোট উপহার গুলো মানহা সযত্নে তুলে রাখতো। মাঝে মাঝেই হাত বুলিয়ে নিজেকে প্রশান্ত করলো। যে বছর চাকরি ছেড়ে এলো সে বার আরাধ্য ডাইরি খান মানহার হাতে দিয়ে বলছিলো –
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“ধর দেখি চেংড়ি ! উফফফ এই অপ্রয়োজনীয় জিনিস খান আনতেই আমার ঘাড়ের ব্যথা ধরে গেলো। বাপু গে কি ভারি;
মানহা ছৌ মেরে ডাইরিটা নিয়ে ছুটে ঘরে এসেছিলো , একটু লজ্জা পেয়েছিলো হয়তো। একটা ধন্যবাদ অব্দি দেওয়া হয়নি তাকে।
মানহা কলম হাতে নিলো ডাইরির পাতা উল্টে গিয়ে থামলো ৫৪তম পৃষ্ঠায়। তারিখ লিখলো , ২৬ এপ্রিল ২০০৮…!!
হাত কাঁপছে , মানহার কাঁপা হাতে কলম চালিয়ে লিখল-
প্রিয় পুরুষ ,
-দেখছেন , আমি বিহীন আপনার একখান ঘর হইলো। সাজানো গোছানো একটা সংসার হইলো। আপনি মানুষটা অন্য কারো হইলেন। নৃত্যদিন আপনার দেহের উপরে লেপ্টে থাকা একখান উষ্ণ নারীত্বের অস্তিত্ব পাইলেই।
রোজ নিয়ম করে , আপনার প্রয়োজনীয় সকল জিনিস হাতের নাগালে আইনা দেওয়ার একটা মানুষ পাইলেন। মন খারাপে, দুই-চারখান কথা বলার একটা মানুষ পাইলেন। পাইলেন তীব্র মাথাব্যথায় আপনার ঘন চুলে বিলি কাটা একখান নরম হাত। আপনি সব পাইলেন !
অতঃপর আমাদের দুরত্ব বাড়িলো। আমি গোটা জগতে একাকিত্ব বোধ করিতে লাগিলাম। এইযে খানিক সময় আগে চোখ বুজিয়া নিজেরে জিগাইলাম।
“যে জন চলিয়া যায় সে জন কি ফিরিবার লাগি যায়?”
মন আমারে উত্তরের বদলি প্রশ্ন করিলো –
“যে গেলো সে কি আসলেই আপন ছিলো ?”
আমি নিশ্চুপ থাকিলাম। ব্যতিব্যস্ত কোলাহল পরিপূর্ণ
পরিবেশ হতে দূরে সরিয়া নীরবতা গ্রহণ করিলাম।
সর্বপরি আঁধার আচ্ছন্ন নিশীথের নিঃসঙ্গ চাঁদের পানে চাহিয়া নিজেরে নিজেই সান্ত্বনা দিলাম।
সময় গেলে বুঝিলাম, আমি বিষ পান করিয়াছি! ভালোবাসা নামক এক ভয়ংকর বিষ আমার দেহের সর্বত্র গ্রাস করিতেছে। বুকের জ্বলনের প্রসাধনীর নাগাল ধরিতে, ছুটিতে লগিলাম। স্বার্থপর হয়ে এই বোকা মন রে অতি শক্ত এক পাথরে রুপান্তরিত করিতে চাহিলাম। অথচ হৃদয় মশকরা করিলো – দুই একবার সুযোগের ফায়দা লুটে বলিলো
– “ সাঁতার না জানিয়া সমুদ্র পাড়ি দেবার সাহস করিয়াছো নারী। তুবি ডুবিবে- পানি খাইয়াছো নিশ্চয়ই ; আপতত হয় নিজেই বাঁচো, নয়তো মৃত্যুই তোমার জন্য শ্রেয়।
কলম থামালো মানহা পাতা উল্টালো ৫৫ তম পৃষ্ঠায় লিখলো –
“ আপনি আফসোস করিবেন ; জীবনের খাতায় বড় একখান অধ্যায় লিখিবেন এই আফসোস শব্দ লইয়া।
এক শ্যামকন্যার তীব্র ভালোবাসা অগ্রাহ্য করিবার শাস্তি স্বরূপ এক আফসোসের নিঃশ্বাস -ফেলিবেন আপনি।
অতঃপর কথা – দিন যাইবে , হায়াত কাটা পড়িবে।
আপনার লাগি আমৃত্যু আমার হৃদয় পুড়িবে।
থেমে গেলো মানহা। কয়েক পাতা উল্টে আরাধ্যে এক ছবি বের করে তাকিয়ে থাকলো একদৃষ্টে। তারপর যথা স্থানে রাখলো। আনমনে চোখের পানি ফেলছে –
হঠাৎ আরাধ্য ঘরে ঢুকলো , তার আবার এসব অনুমতি লাগে না। যদিও মানহা তখনো টেবিলে বসা। আরাধ্য একবার সে দিকে তাকিয়ে বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসল “ টুকি “ টুক টুক টুকি।
মানহার ভাবনা ভঙ্গ হলো! দ্রুত ডাইরির ভাজে কলম রেখে তাকিয়ে বলল –
-“আপনি”?
আরাধ্য বিছানায় আধশোয়া ভাবে বসে বলল-
-“কি ভাবছিস ?”
মানহা কান্না লুকাতে চাইলো। আরাধ্য আড়চোখে মেয়েটার ভেজা চোখ মুখে দেখে নিয়ে সুরোলা কন্ঠে বলল-
-“বিধাতা শুনছেন-
আমি এক অভুক্ত প্রেমিকা বলছি- আমার স্বপ্ন সাজানো বারণ আমি শোকে আধমরা ইহা তার কারণ।”
আরাধ্য এক চোখ বন্ধ করে জিহ্ব কাটলো “ ধুর ধুর আজকাল বড্ড সত্য কথা বলে ফেলছি। ছিঃ ছিঃ শালা আমার মুখে গু পড়ুক। ”
কথাগুলো বলেই নিজের কানে নিজে জোড়ে চিমটি কেটে মানহার দিকে তাকলো আরাধ্য। মানহা তার দিকেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা রাগ করেছে নাকি রাগ করবে , বুঝলো না আরাধ্য। বেক্কল এক হাসি দিয়ে কথা ঘুরাতে বলল –
-“ভাই মশকরা করেছি , মাইরি বলছি ! ”
-আরাধ্যের মশকরায় পাত্তা দিলোনা মানহা কড়া কন্ঠে জিজ্ঞেস করল “ কি মনে করে এসেছেন এ ঘরে ?”
-“যাহ শালা এ ঘটনা কখন ঘটলো ?”
মানহা ভ্রু জুগল একত্র করলো “ কি ঘটেছে ?
-“এইযে কেমন জানি। বিনা মেঘে বৃষ্টি পাত লগে আবার, পর পর একখান ভাব !”
-”কি বলছেন? ”
আরাধ্য উঠে দাড়লো বিছানা ছেঁড়ে। টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে নিয়ে বলল” এইসব আপনি আপনি কখন শুরু হয়েছে?”
-“হওয়ার প্রয়োজন ছিলো ! ”
-“কারণ?”
মানহা টলমল চোখে একবার আরাধ্যকে দেখে নিয়েই দৃষ্টি নামিয়ে বলল- ”কিছু লাগবে আপনার ? কোনো কাজ আছে নিশ্চয়ই বলুন আমি করে দিচ্ছি!”
-“প্রিয়জন না হয়ে প্রয়োজন হতে চাইছিস ? ইরার হওয়া লাগিয়েছিস গায়ে!
-“সর্বস্ব হারিয়ে অন্তত অসম্মান টুকু নিজের করে রাখতে দিন আরাধ্য ভাই। আর ছোট করবেন না আমায় ? ”
-”ইরার হাওয়া লাগেনি বলছিস ?
-”জ্বি না!
আরাধ্য চোখ বুজে আঙ্গুলে কপাল চেপে ধরলো। মানহা বলল- “আপনার অনুমতির প্রয়োজন ছোট নবাব। প্রাপ্ত বয়স্ক এক মেয়ের ঘরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নাজায়েজ”!
মানহা কথা বলেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আরাধ্য অলস কন্ঠে বলল” -ঘৃণা হয়?
মানহা চুপ করে যায়। গলার কথাগুলো দলা পাকিয়ে আটকে আছে তার। আরাধ্য তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছু সময় দেখে বলল-
-“যে বিষে মরণ থাকে ,সে বিষ গ্রহণ এতো ব্যাকুলতা কিসের?”
-“নেই তো !”
-“নেই; তাহলে পারু হতে চাইছিস কোন সুখে ?
মানহা দীর্ঘশ্বাস নিংড়ে ফেলে” দেবদাস কে আপনি ? উহু আপনি তো দেবদাস না। তাহলে এখানে পারুর কোনো অস্তিত্ব নেই।’
আরাধ্য হাসল; মানহা আবার বলল-
-বিষবৃক্ষ জড়িয়েই বেড়ে ওঠা পড়গাছা চারা আমি!
আমার মৃত্যু নিশ্চত তবে সময় সাপেক্ষ !
আরাধ্য এবার উচ্চ শব্দ হাসল , আরো একটু এগিয়ে মানহার ডাইরির দিকে হাত বাড়তেই পাশ হতে ছোঁ মেরে তা সরিয়ে নিলো মানহা। আরাধ্য তার বাড়ানো হাত ফেরত এনে মাথা চুল নেড়ে বলল – “সিদ্দি বাড়ির পুকুর ঘাটে ইরা কে নিজে চলে আসিস? হাঁস খেলা রয়েছে ।
কথার নড়চড় হবে না নিশ্চয়ই ?
উত্তরের অপেক্ষা করে আরাধ্য উল্টে ঘুরে যায়। রিতিমত গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে যায় সে –
ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১ (২)
“তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি
ধরতে পারলে মন বেড়ি
দিতাম পাখির পায়।
কেমনে আসে যায়।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।
আট কুঠুরি নয়- দরজাটা আটা।(২)
মধ্যে মধ্যে ঝড়কা কাটা।
তাঁর উপরে সদর কোঠা (২)
আয়না মহল তায়।
কেমনে আসে যায়।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।
মানহা মেঝেতে বসে পড়ে। দু হাঁটু শক্ত করে চেপে ধরে। কেঁদে ওঠে। অযত্নে্য চুল গুলো চোখের কোণে পড়ছে। সেসবে খেয়াল করলো না সামলো না নিজেকে?
