Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১
জান্নাত চৌধুরী

ইফরাহর চোখের পলক পড়ছেনা। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গর্তের পানে। ঘরের উত্তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে , ধীরস্তে নিজেকে স্বাভাবিক করতে একটু একটু করে এগিয়ে আসে ইফরাহ। একটু খানি ঝুঁকে দেখে মাটির দিকে-
উপর হতে নিজ বরবাবর একটা সিঁড়ি নেমেছে। তবে ভেতরে যে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রেজা এগিয়ে আসলো।
গলার স্বর খাদে নামিয়ে ডাকল -“ ব‌উরানী”
ইফরাহ নিজের ওষ্ঠের উপর আঙ্গুল রেখে চুপ করার ভঙ্গি দেখিয়ে কথা বন্ধ করলো রেজার । রেজা থেমে গেলো ,
ইফরাহ মাটির দিকে কান পেতে কিছু একটা শোনার চেষ্টা করলো। রেজা নিশ্চুপে অনুসরণ করে গেলো ইফরাহকে।
ইফরাহ উঠে দাড়ালো রেজার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল-

“ ভেতরে কি চলছে ?”
রেজার মস্তিষ্ক জ্যাম পড়েছে। কি করবে ? কি বলবে ? কোনো কাজ হচ্ছে না তার দ্বারা। ইফরাহ তার উত্তরের অপেক্ষা করলো না। রেজাকে নিশ্চুপ দেখে আবারো বলল-
-আমি যেতে চাইছি সেখানে , নিয়ে চলুন !
-মাফ করবেন ব‌উরানী; এ কাজ আমি পারবোনা!
ইফরাহ পাত্তা দিলো না রেজার কথার। নিজ বুদ্ধিতে আস্থা রেখেই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকলো সে। রেজার করণীয় কী বুঝে না। ইফরাহ কে আটকাবার উপায় একদম জানা নেই , ইফরাহর পিছে যায় সে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ঘুটঘুটে অন্ধকার সিঁড়িতে, চোখে কিছু পড়ছে না। এতো সময় যে শব্দ কানে আসছিলো সে শব্দ এখন আর কানে বাজে না। অন্ধকার পথ ধরেই একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে ইফরাহ। ভেজা মাটির শ্যাতশ্যাতে এক গন্ধ। তার জানা নেই কোথায় এগিয়ে চলছে সে। সিঁড়ি বেয়ে যত নিচে নামছে শৈত্যপ্রবাহ বাড়ছে। অনুভুতি এমন যেনো কোনো হিমাগারে ঢুকে পড়ছে সে‌। ভীষণ রকমের শীত শীত লাগছে, শরীরের প্রতিটি লোমকুপ দাড়িয়ে পড়েছে। বুকের বামে অবস্থিত হৃদপিন্ড তার ধুকধুক শব্দ বাড়িয়ে তুলছে। হৃদযন্ত্রের শব্দ যেন কানে এসে বাজছে। ইফরাহ মনে হলো জিনিসটা এখনি বেড়িয়ে আসবে। এক একটা সিঁড়ি মারিয়ে প্রায় ৩৮ খান সিড়ি পাড় হয়েছে ইফরাহ – আরো বাকি তবে শেষের দিকে সিঁড়িতে আলো চোখে পড়ছে।

ভয় হচ্ছে না তার। এই যে অন্ধকার পথ পেরিয়ে এসেছে – সামনে কি রয়েছে এতেও ভয় করছে না। ইফরাহ কি এতোই সাহসী। সে সাহসী নয় , তবে আজ ভীত নয় সে। কেনো নয়? ওই লোকটা ভেতরে রয়েছে বলে‌। কি চলছে ভিতরে ;
মস্তিষ্কে একের পর এক প্রশ্ন ইয়ার ফোনের তারের মতো প্যাঁচ পড়ছে।
একের পর এক সিঁড়ি পেরিয়ে শেষ সিঁড়িতে পা রাখতেই চমকে ওঠে সে।ঘরের কিছুটা দৃশ্যমান হয় সামনে। এ যেন এক নতুন রাজ্য , মাটির নিচের তৈরি সম্রাজ্য। তবে পুরো ঘরে শৈত্যপ্রবাহ মাত্রাধিক বেশি। যত গভীরে প্রবেশ করছে শীতে জমে যাচ্ছে ইফরাহ।

ঘরে প্রবেশ করতেই অবাকের সপ্তমে পৌঁছে যায়। চোখ ধাঁধানো এক সৌন্দর্য। এ কেমন সৌন্দর্য , মশালের লাল আলোতে ঘরের সৌন্দর্য কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘরের জিনিসপত্র মাত্রাধিক সুন্দর সব পরিপাটি সাজানো। দেখে মনে হচ্ছে কেউ যত্নে নিয়ে সাজিয়েছে। প্রতিটি ফার্নিচার মাটির তৈরি। ইফরাহ চোখ বুলিয়ে দেখলো , ছোট নবাবের কক্ষের প্রতিটি জিনিসের এক পিস করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে এ ঘরে। হঠাৎ এক পরিচিত কন্ঠস্বর কানে এলো –
“ইরা , ইরা ,ইরা ! আমার রক্তকমলিনী , আমার দহনরূপা
আমার সর্বনাশ তুমি মেয়ে! “

ইফরাহ ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে বেড়িয়ে এলো একটি নাম “ছোট নবাব”!
ঘরের মাঝেই এক চেয়ার পাতানো। মাটির নয় কাঠের তৈরি রাজকীয় এক চেয়ার হতে উঁকি দিলো আরাধ্য –
ইফরাহর চমকিত মুখটুকু একবার দেখে চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে আসতে নিয়ে বলল-
“ আমার অর্ধেকাংশ , আমার হৃদপিন্ডে বসত পাখি, আমার ঘরনি , আমার রাজ্যে আপনার স্বাগতম রানী।”
-“আপনি জানতেন আমি আসবো ?”
আরাধ্য কেমন করে জানি হাসল , এই প্রথম এতো তাচ্ছিল্যের এক হাসির দেখা মিললো তার মুখে , লোকটা কি ইফরাহ কে তাচ্ছিল্য করলো। আরাধ্য আবার বলল-
-“কেমন অনুভূতি তোমার রানী? ”

ইফরাহ উত্তর করলো না , ঘাড় কিছুটা কাত করে আরাধ্যকে পাশ কাটিয়ে পিছনে তাকালো। কয়েকজন লোক মিলে কিছু একটা করছে। আরাধ্য তার দৃষ্টিস‌ই একবার ঘুরে তাকিয়ে ফুঁ দেয় ইফরাহর মুখে। শিরশির শীতল বাতাস মুখে লাগতেই আরাধ্যের দিকে সরল এক দৃষ্টি দিলো ইফরাহ।
মায়া মায়া মুখটা দেখে আরাধ্য মুসকি হেসে বলল-
-“শীত শীত লাগছে , তাইনা ?”
ইফরাহ আরাধ্যের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল- “ওরা কি করছে ?
-”মাংস প্যাকেজিং করছে! দেখবে তুমি?
ইফরাহ অপেক্ষা করলো না আরাধ্য কে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো লোকগুলোর দিকে-
চারজন যুবক বসে মাংস প্যাকেজিং করছে , বেশ যত্ন নিয়ে
কাজ করছে তাঁরা। ছোট ছোট অংশে ভাগ করে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের প্যাকেটে সংরক্ষণ করছে। ইফরাহ লোকগুলোর কাজ দেখে জিজ্ঞেস করল-

-”এসব কি কাজে লাগবে?
-“সাপলাই হবে ?”
-”মানে ?
-“আমদানি রপ্তানি পড়ো নি মেয়ে ! ওইটাই হবে – বিদেশে পাঠানো হবে! লগে দেশের বিভিন্ন স্থানে , এর চালান যায়!”
ইফরাহ শুনলো , আরো কিছুটা সময় লোকগুলোর কাজ দেখে , ঘরের আনাচে কানাচে দেখতে দেখলো। হঠাৎ করে তার চোখ গিয়ে বাজলো উত্তরে কোণের এক দেওয়ালের দিকে। লাল ফোঁটা ফোঁটা রক্তের মতো কিছু একটা লেগে আছে সেখানে। ইফরাহর শান্ত মস্তিষ্কে আবারো প্রশ্ন উঠলো, ওটা কি ? রক্ত । দক্ষিণা দেওয়ালেও কয়েক জায়গায় এক‌ই রকমের লাল ছোপ ছোপ দাগ। ইফরাহর মনে একে পর এক কৌতূহল জাগলো। সে কি একবার ছুঁয়ে দেখবে রংটা-
ইফরাহর ভাবনার মাঝেই আরাধ্য ডাকল-

-“ইরা
ইফরাহর খেয়াল নেই আরাধ্য এগিয়ে এসে গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠলো মেয়েটা।
-কে …কে ?
-”চমকালে ?
আরাধ্যের গলা পেতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো ইফরাহ।
আরাধ্য বলল –
-দাড়িয়ে তো অনেক্ষণ বসবে চলো ; শীত লাগছে তোমার ?
ইফরাহ উত্তর করে না। একধ্যানে তাকিয়ে লোকগুলোকে দেখে। ঘরের কোথাও খেয়াল নেই লোকগুলোর‌। রোবোটিক্স ভাবে কাজ করে চলেছে তারা। একবারো চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। ইফরাহর ভালো লাগে , পুরুষ গুলো তাকে দেখছে না। হয়তো ভয়ে দেখছে না। কেই বা চাইবে যেচে মৃত্যু কে নিমন্ত্রণ করতে। ইফরাহর গর্ব হলো , এই পুরুষ লোকের হাত হতেই নিজের নারীত্ব রক্ষায় বাঘের খাঁচায় পুরেছে নিজেকে।
আচ্ছা সব পুরুষ কি নারী লোভী? হয়তো নয় , সব পুরুষ এক হলে আরাধ্য কেনো তাকে এখনো সুযোগ দিয়েছে ?
ইফরাহ এতোদিনে কিছুটা হলেও লোকটাকে বুঝেছে।

হঠাৎ ঘাড়ে কিছুটা ব্যাথা অনুভব করলো ইফরাহ।
কিসের ব্যথা বুঝার আগেই অচেতন হয়ে পড়লো সে –
আরাধ্য আগলে নিলো তাকে। বেশ যত্নে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিলো!
রেজা এগিয়ে আসে , আরাধ্য হাতের ইনজেকশন ছুড়ে দিলো রেজাকে। রেজা বেশ দক্ষ হাতে তা ক্যাচ করলো।
আরাধ্য কোলে তুলে নেয় ইফরাহকে। রেজা কিছু বলবে তার আগেই আরাধ্য ক্ষিপ্ত নজরে তাকায় তার দিকে। রেজা শুষ্ক ঢোক গিলে , জিহ্বা দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে এক বেক্কল হাসি দিয়ে বলে –
-“ইয়ে মানে ছোট নবাব বলছিলাম কি?”
-“তোর বাপের বিয়া ! ”
রেজা থতমত খায় , লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলে আরাধ্য বলে -“ অকর্মণ্য রাম ছাগল , এক মাইয়ারে ঘোল দিতে পারোনা বেটা তুমি ?”

-দুঃখিত ছোট নবাব;
-তোর নানীর হেডা !
আরাধ্য বেড়িয়ে যায়। ভোর পাঁচটা চারদিকে , রাতের কালো
আঁধারী পাতলা হয়ে এসেছে, আকাশে হালকা নীলচে রঙ ফুটে উঠেছে। পাখিরা তখনো ঠিক ভাবে জাগেনি, তবে মাঝে মাঝে টুক করে দুই একটা ডাক শোনা যায়। আরাধ্য ইফরাহকে নিয়ে ঘরে ডুকেছে। মেয়েটা অচেতন, স্টপব্লিড ৫০০এম জি ইনজেকশন আর স্লিপিং ড্রাগস দুটোর মিশ্রণের ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে ইফরাকে- আপতত ঘুমাবে কিছু সময়। আরাধ্য বিছানায় শুইয়ে দিলো মেয়েটাকে। হাঁটু ভাজ করে মেঝেতে উবু হয়ে বসে তাকিয়ে র‌ইলো ইফরাহ মুখ পানে! কিছু সময় ওভাবে থেকে ইফরাহর গালে হাত রেখে বলল-

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩০

“অতঃপর প্রেমে পরিলাম।
ভেবেছিলাম মোহ আচ্ছন্ন হয়েছে হৃদয়।
সময় গড়ালেই কাটিয়া যাবে, ভূল ভাবিলাম।
আত্মা স্পর্শি বোকাহরণি তুমি মেয়ে।
শারাবের থেকেও ভয়ংকর তোমার নেশা”

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩১ (২)