তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩১
ঐশী আফরিন
চৈত্রের খড়ার মতই মাধবীর মন শুকিয়ে আছে। শুধু মন না চেহারাও। কে বলবে যে এই মেয়ের আজ বিয়ে? পরে মাধবীর কথামত গ্রামেই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। সাথে ইচ্ছের টাও এখানেই করা হচ্ছে। যেহেতু এক দিনেই বিয়ে তো শুধু দু জায়গায় ছড়ানোর কি দরকার। সব ভালো হলেও মাধবীর মন মেজাজ সব খারাপ হয়ে আছে। কিন্ত জায়গা থেকে উঠে যেতে পারছে না। গায়ে ভারি লাল বেনারসি। চকচকে সোনালি রঙ পারের মাঝে। পুরো শাড়িতে মনে হয় পৃথিবীর সব চুমকি বসিয়ে দিয়েছে।
মোটা মোটা ২ চেইন পরানো গলায় সাথে বহু স্থর বিশিষ্ট চন্দ্রহার,পাতা হার এবং লকেট সহ হার। যার মাঝে খাঁটি স্বর্ণ দিয়ে খোদাই করে লেখা মহামান্য পাঞ্জাবিওয়ালার নামের অক্ষর। কানে ভারি ঝুমকা। দুলের চেইন কান থেকে চুল পর্যন্ত আটকানো। নাকে বড় নথ লাগানো। সেটাও চুল পর্যন্ত আটকানো। ২-৩ জোরা স্বর্ণের চুরির সাথে মোটা মোটা বেঙ্গল। দু হাতে ৫টা বড় পাথরের আঙটি। সিঁথিতে টিকলি আর মাথার বা পাশে বড় ঝাপটা। পায়ে মোটা ঘুঙুরওয়ালা নূপুর। নরলেই শব্দ করে। মোটকথা মাধবীর পুরো পা থেকে মাথা পর্যন্ত গহনায় পরিপূর্ণ। এগুলো সবই দিয়েছে মাহমুদা ইশান। তিনি তো আজ আসতে পারেনি। কি করে আসবে? ছেলের বিয়ে। এছাড়াও আরিয়ান আরো অনেক কিছু এনেছিলো। কিন্ত মাহমুদা ইশান কোনভাবেই সেগুলো পড়তে দেয়নি। উনার ইচ্ছা উনার পুত্র বধূ উনার বিয়ের গহনা দিয়ে সাজুক।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মাধবীর পাশে ইচ্ছেও বিরশ মুখে এভাবেই তৈরী হয়ে বসে আছে। তবে তার শাড়ি গহনার ডিজাইন সহ সবই ভিন্ন। গহনাও কম তার গায়ে। মাধবীর মেজাজ খারাপের কারণটা অপু। অপুটা ভিষন রাগ করেছে কেন তাকে সেদিনের কট খাওয়া বিয়ের কথা জানায়নি। অপু প্রথমে এসে ভালোভাবেই কথা বার্তা বলেছে। তখন মাধবী কথায় বলেছিলো “এত খুশির কিছু নেই এটা দ্বিতীয় বার বিয়ে”
“কিহহহ?”
“১৭ তারিখে আমরা বিয়ে করেছিলাম”
“কোন ১৭ তারিখ?”
“জানুয়ারির ১৭ তারিখ”
“আজ কি তাহলে?”
“আজও বিয়ে। সেদিনের অনেক কাহিনী। পরে তোকে বলবো”
“সেদিনের পর দিন তো তোরা গ্রামে এসেছিলি। তবুও আমায় একটা বার জানাস নি কুত্তি। থাক তুই তোর বিয়েতে আমি থাকবো না”
বলে সত্যি সত্যিই মেয়েটা বাড়ি চলে গেছে। ওদের মাধবীর ঘরেই বসানো হয়েছে। গ্রামের মহিলারা এই বিয়ের সুযোগে এত বছরে ঢেকে রাখা মেয়েটাকে দেখে যাচ্ছে। রুমজুরে কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা নেই। কেউ একবার দেখে চোখ সরাতে পারছে না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে তাকিয়ে আছে। এতে ভিরাভিরি আরো বাড়ছে। কেউ এই সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাইছে না। তাই সকলের চোখেই এক পলক তাদের এত বছর ধরে শুনে আসা সেই দুঃসাহসী ভয়ংকর সুন্দরীকে দেখার অদম্য ইচ্ছা। এই শীতের দিনেও মাধবী ঘেমে গেছে। ঘর থেকে বেরও হতে পারছে না। আরিয়ান বাহিরে। যেখানে খাওয়া দাওয়ার জন্য সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে।
শুধু এখানে না। গ্রামের প্রতিটা বড় মাঠে এই আয়োজন চলছে। ময়মনসিংহের প্রতিটা বড়মাঠে রান্না করছে শত শত বাবুর্চি। ৭০ হাজার লোকের রান্না চাট্টিখানি ব্যাপার না। বলতে হবে তো কাদের বিয়ে রাজ্যের রাণী মা ও সেনাপতির বিয়ে। এসব নানান আলোচনা করছে লোকে নানান জায়গায় দাঁড়িয়ে। আরশি বসে অপলোক দৃষ্টিতে মাধবীকে দেখছে। চোখে মুগ্ধতার সাথে হিংসা। আজ মাধবীর স্থানে কি সে থাকতে পারতো না? যদিও তাকে এতটা সুন্দর লাগতো না তবুও সে তো এই দিনটা নিজের জন্য চাইতো। এত বছর ধরে ভালোবাসার মানুষটির বউ তার সামনে বসে আছে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? এই অনুভূতি থেকে সে এটুকু বুঝলো যে সে ধৈর্যশীল।
শুধু সে না আরশি অপূর্ব ওরাও তার মতো ধৈর্যশীল। এই তো আরশি কি সুন্দর ভালোবাসার মানুষটির বউয়ের পাশে নিজেও বউ সেজে বসে আছে। তবে যাকে চাইতো তার বউ হওয়ার মত সৌভাগ্য হলো না। আর অপূর্ব কে দেখো। নিজের সমস্ত কষ্টকে মাটি চাপা দিয়ে বন্ধুকে নিজ হাতে বর সাজিয়ে পাগড়ি পরিয়ে দিয়েছে। এখন আবার বন্ধুর সাথে সাথে থেকে খাওয়া দাওয়ার সমস্ত কিছু নিজ হাতে সামলাচ্ছে। এমনকি আরিয়ানের লেখা সেই চিরকুটটাও সে ছাপিয়ে এনেছিলো। প্রথমে চিরকুটটা পরে একটা বিষাদমাখা হাসি দিয়েছিলো। পরক্ষণেই তার শক্ত পুরুষালি হৃদয়ে ভাঙন ধরিয়ে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরেছিলো অশ্রু। পুরুষের চোখের অশ্রু! যেটা প্রতিটা নারী নিজেকে হাড়ানোর ভয়ে প্রিয় মানুষটার চোখে দেখতে চায়। এই অশ্রু যদি মাধবী দেখতে সে কি খুশি হতো? নাহ এই মেয়ে হতো না। কারণ এই মেয়ে আর পাঁচটা মেয়ের মত আবেগী না। কেউ হয়তো তার জন্য জীবন দিলেও তার যায় আসে না। কিছুক্ষন বসে থাকার পর মাধবী রুহিকে ডেকে বলে “তোর হারকিপ্টে ভাইকে ডেকে আন তো”
রুহি মুখটা ভেংচি দিয়ে বললো “এহ। আমার ভাই কে কিপ্টা বলছে। ৭০ হাজার মানুষের খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়েছে। সবাই প্রশংসায় পঞ্চমুখ”
“তার প্রশংসা করছিস তার কাছে গিয়ে করিস। এখন উনাকে ডেকে নিয়ে আয়”
“এই ভীরের মধ্যে?”
“সমস্যা নেই। উনি এলেই ভীর কমে যাবে”
“আচ্ছা যাচ্ছি”
বলে রুহি বেরিয়ে যায়। সেও আরশির মত শাড়ি পড়তে চেয়েছিলো। কিন্ত কীভাবে যেন অভি জানতে পেরে যায়। পরে আর পরতে দেয়নি। রুহি এদিক ওদিক আরিয়ান খুঁজে না পেয়ে অজয়কে পেয়ে জিজ্ঞেস করে “ভাইয়াকে দেখেছেন?”
“ভাইয়া কে?”
“আরিয়ান ভাই। দেখেছেন ভাইয়াকে?”
“ভাই চিপায়”
রুহি ভ্রু কুচকে অবাক হয়ে বলে ” চিপায় মানে?”
“প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে বিসর্জন দিতে গেছে”
রুহি হেসে দেয়। “আচ্ছা ভাইয়া আসলে বলবেন আপু ডেকেছে”
অজয় ওদের কাউকে এত ভালো করে চেনে না। সে সাফসাফ বললো “কোন আপুর ডাকেই ভাই সারা দিবে না। উনার আজ উনার প্রেমিকার সাথে বিয়ে”
রুহির হাসি পায় ভিষন। ঠোঁট কামরে হেসে বলে “উনার সেই প্রেমিকাই ডাকছে”
“কীহহ? রাণী মা ডাকছে?”
“হ্যা”
অজয় উল্টো হাঁটা ধরে। আর হাঁক ছেরে ডাকতে থাকে “এ ভাই। বেঁচে থাকলে প্রচুর মুত্র বিসর্জন দিতে পারবেন। রাণী মা ডাকছে। ধরা খেলে আমি বলবো আমি আপনাকে চিনি না”
রুহি পেছন থেকে আবার ডাকে অজয়কে। অজয় ফের ঘুরে এসে বলে “রাণী মা আর কিছু বলেছে?”
“না। কিন্ত আপনি কীসের ধরা পরার কথা বলছেন?”
অজয় নিচু স্বরে বলে “কেন আপনি জানেন না?”
রুহি মাথা নারায়। অর্থাত সে জানে না। অজয় হেসে বলে “দাঁড়ান”
তারপর পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে রুহির হাতে দিয়ে বলে “এই চিরকুটের কথা রাণী মা জানতে পারলে যে কি করবে আল্লাহ জানে। কাউকে বলবেন না। আপনার কাছে রাখবেন”
বলে অজয় চলে যায়। রুহি হেসে বাড়ির ভেতর ঢুকতে নেবে তার আগেই একটা শক্ত হাত হেঁচকা টানে তাকে চিপা গলির দেয়ালের সাথে ঠেসে ধরে। রুহি প্রথমে ভয়ে চোখমুখ খিঁচে নেয় পরে ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে অভি অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই অভি তার ললাটে ললাট ঠেকিয়ে দেয়। ফিসফিসিয়ে বলে
“আমাকে ভালোবাসো?”
“হুম?”
“ভালোবাসো আমায়?”
রুহি কাঁপা কন্ঠে উত্তর দেয় “হু হুম”
“বউ হবে আমার?”
রুহি কিছুক্ষন চুপ থেকে মাথা নারায়।
“আমার জিনিসের ভাগ আমি কাউকে দেই না”
“হ্যা?”
“এত হেসে কী কথা বলছিলেন অজয়ের সাথে?”
“ঐ…”
“কীসের চিঠি দিয়েছে ও তোমাকে। ওকে কিন্ত আমি খুন করবো”
“আরে এটা…”
“চুপপপ। চিঠিটা আমার হাতে দেও”
রুহি মন খারাপ করে বলে “আমি পড়ে পরে আপনাকে দেই?”
“থাপ্পড় চিনো? দেও চিঠিটা আমার হাতে”
রুহি ধমক খেয়ে চিঠিটা অভির হাতে দেয়। অভি রুহির কাছ থেকে সরে গিয়ে চিঠিটা খোলে। রুহি উঁকি দিলে আবারও ধমক দেয়। যখন চিরকুটটা তার পড়া হয় তখন সেও হেসে দেয়। তার হাসি দেখে রুহি বলে “আমাকে একটু দেন আমিও হাসি”
অভি কিছু না বলে চিঠিটা রুহির হাতে দেয়। রুহি অবাক হয়ে চিঠিটা হাতে নেয়। কিন্ত পড়তেই সেও হেসে দেয়। এটা সেই চিরকুটটা যেটা আরিয়ান বিয়ের কার্ডের বদলে সবাইকে দিয়েছিলো। অভি বলে “আরিয়ান টা দিন দিন এমন যে কেন হয়ে যাচ্ছে কে জানে! এক সময় অপূর্ব এমন ছিলো। এখন আরিয়ান ওর স্বভাবটা নিয়ে নিজের বিষন্ন মনটা অপূর্বকে দিয়ে দিয়েছে। তবুও অপুর ভাঙাচোরা বুক নিয়েও সারাক্ষণ হেসে বেরায়। তার নাকি না হাসলেন ভালো লাগে না। কি যে হবে যখন আরিয়ান জানবে”
“তবে আরিয়ান ভাইয়ার আগের আচরণের চেয়ে এখনের আচরণটাই আমার কাছে ভালো লাগে। এতে মাধবী আপু কিন্ত সামনে যেমন তেমন করুক পেছনে তারও ভাইয়ার এই আচরণ ভালো লাগে”
“আরিয়ানের আচরণ এখন বাদ। তোমার ডাকাত ভাই কে কি করবে?”
“কেন আয়াজ ভাইয়া কি করলো?”
“যখন সে জানবে তার গুনধর বোন একটা বিধর্মী ছেলেকে ভালোবাসে সে কি মেনে নেবে?”
রুহি মন খারাপ করে বলে “জীবনেও না”
“তো কি করবে?”
“পালিয়ে যাবো”
অভি কাপল কুচকে বলে “থাকতে পারবে গিয়ে?”
“পারবো না কেন। অবশ্যই পারবো”
“শুধু শুধু চাপা মেরো না। কথাটা তোমার মাধবী আপু বললে মানা যেত। তুমি তো আগের দিন গিয়ে পরের দিন বাড়ির জন্য কান্না কাটি শুরু করবে”
“তাহলে?”
“পরেরটা পরে দেখা যাবে। এখন বাড়িতে যাও চিন্তা করবে সবাই। আর হ্যা, অজয়ের পাশে আরেকবার আপনাকে দেখলে খবর করবো”
রুহি হেসে বাড়িতে চলে যায়। অভি অপলোক কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
আরিয়ান মাধবী ডেকেছে খবর পেয়েই ছুটে আসে। সেই সকালে একবার দেখেছিলো লাল টুকটুক বউটাকে। পরে আর দেখার সুযোগ পায়নি। তবে সমস্যা তো একটাই মেয়েটাকে দেখলেই তো তার বুক ব্যাথা করে। এ আবার কেমন যন্ত্রনা! একটা মেয়ে ঠিক কতটা সুন্দরী হলে তাকে একবার সাদা শাড়িতে দেখে সে অজ্ঞান হয়েছিলো এখন লাল শাড়িতে দেখে সকাল থেকে বুকে ব্যাথার জন্য ৩৫টার উপরে সিগারেট শেষ। আরিয়ান আল্লাহর নাম নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢোকে। প্রথমেই মাধবীর দিকে না তাকিয়ে সবাইকে বেরিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয়। সকলে একে একে বেরিয়ে যায়। আরিয়ান মাধবীর দিকে তাকায়। সাথে সাথে বুকে হাত চলে যায়। মনে হচ্ছে কলিজা কিডনি যা আছে সব খুলে পরে যাবে। মাধবী এতক্ষন গাঁট হয়ে বিছানায় বসে ছিলো। এখন সে বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে
“নিজেকে এখন আমার বাজারে বসে থাকা মফিজ পাগলের মত লাগছে। দুনিয়ার সব ভারি ভারি জিনিস গায়ের মাঝে পরিয়ে রেখেছে। মেজাজটা এবার বিচুটি পাতার মত জ্বলছে”
আরিয়ান মহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে উত্তর দেয় “আমারও”
মাধবী কপাল কুচকে বলে “কি?”
“আমারও জ্বলছে”
“বা*ল। কী জ্বলছে?”
“পুরো অঙ্গ জ্বলছে”
“ফসকা পরেছে নাকি বাবুর্চিদের সাথে থাকতে থাকতে?”
“পুড়ে গেছে”
“চোখ সরান আপনি। আপনাকে তাকিয়ে থাকার জন্য ডেকে আনিনি। আমি অপুদের বাড়ি যাবো”
এতক্ষনে আরিয়ানের ধ্যান ভাঙে “কোথায় যাবি?”
“অপুর বাড়ি”
“মামার বাড়ির আবদার পেয়েছিস। বিয়ে রেখে ওদের বাড়ি যাবি কোন দুক্কে?”
“মামার বাড়ি স্বামীর বাড়ি দুটরই পেয়েছি। আর এটা কি সত্যি সত্যি বিয়ে নাকি যে আমার থাকতে হবে?”
“না পুতুলের বিয়ে। ফাজিল মেয়ে”
“সে যাই বলুন। আমি এখনই যাবো। নিয়ে চলুন”
“আমি লোক পাঠাচ্ছি অপুকে নিয়ে আসতে”
“নাহ। বেচারি রাগ করেছে কট বিয়ের কথা বলিনি বলে। এখন আমারই গিয়ে রাগ ভাঙিয়ে নিয়ে আসতে হবে”
“এই বাড়ি ভরা মানুষ রেখে যাওয়া যাবে না মধু। বোঝার চেষ্টা কর”
“বাড়ি ভরা মানুষ সব আপনার আপনজন। আমার আপনজন কই? আমার তো কেউ নেই। তাহলে আমি কেন অন্যদের আপনজনদের পরোয়া করবো? আমার আপনজন বলতে শুধু ঐ একটা মেয়েই আছে। আর ওকে ছাড়া আমি কিছুতেই এখানে ঢেং ঢেং করে বিয়ে করতে পারবো না”
আরিয়ান সম্মতি জানিয়ে তৈরী হতে বলে চলে যায়। মেয়েটার হুটহাট করা অদ্ভুত আবদারগুলোও সে ফেলতে পারে না। একটা কথাও ফেলতে পারে না মেয়েটার। মাধবী ঘোমটা টা হালকা সরিয়ে একটা মোটা নেকাব পরে নেয় মুখে। তারপর লম্বা ঘোমটা টা আবার তার উপর দিয়ে দেয়। অফ হোয়াইট রঙের হাত মোজা পা মোজা পরে ফেলে। এখন এসবের উপর বোরকা পরলে কিছুই থাকবে না। এছাড়াও আরিয়ান এখন ঘরের ভেতরেই পালকি আনবে সেটা মাধবী জানে। একটু পরেই আরিয়ান পালকি নিয়ে আসে। এতে নমিতা ইশান ভীষণ নাকচ করেছিলো। বিয়ের কঁণে নাকি বাড়ি ভরা মানুষজন রেখে বান্ধবীর রাগ ভাঙাতে যাবে! তবুও আরিয়ান সকলের মর্জিকে উপেক্ষা করে মাধবীকে পালকিতে উঠে বসে বলে। সে উঠে বসলে লোকেরা এসে পালকি তুলে নিয়ে রওনা দেয়। আরশি ইচ্ছে দুজনেই বিরক্ত চোখে এসব দেখে। রুহি খুশি মনে আরিয়ানের সাথে পালকির পেছন পেছন যায়।
অপু এসে বসে আছে ঘরে। সাজগোজ কিছুই নষ্ট করে নি। করবে কেন? সে তো জানে মাধবী প্রহরী পাঠাবে। তাই একটু রাগের ঢং করে বসে রইল। ঘরের বাহিরে যখন মানুষের কোলাহল শুনতে পেলো সে ভাবলো হয়তো প্রহরী এসেছে তাকে নিতে। ভাঙা কাঠের দরজাটা খুলতেই সে অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌছে যায়। মাধবীর পালকি রাখা হয় একেবারে মাটির ঘরের চৌকাঠে। অপু ভেতরে ঢোকে। গ্রামের মহিলারা পালকি থেকে দরজা পর্যন্ত দুদিকে কাপড় ধরলে মাধবী নিঃশ্বব্দে ঘরে প্রবেশ করে। ভেতর থেকে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। অপু অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পরে আনন্দশ্রু। সে মাধবীর সাথে বন্ধুত্ব করেছিলো যখন বয়স ছিলো ৬ কি ৭। আজও তাদের এই বন্ধুত্ব অটল। মাধবীর মধ্যে সে না দেখেছে কখনো রূপের অহংকার না দেখে ধনসম্পদের। এই মেয়েটা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ ভাবে তার পাশে থাকে। সে কল্পনাও করতে পারেনি রাজ্যের রাণী বিয়ে রেখে তার রাগ ভাঙাতে আসবে। তার কথা বন্ধ হয়ে যায়। মাধবীকে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করে দেয়। মাধবী হেসে পিঠে হাত বুলিয়ে বলে “ধুর পাগলি মেয়ে। কান্না করছিস কেন? সাজ নষ্ট হয়ে যাবে না? চোখ মোছ। এক্ষুণি মোছ”
অপুর কান্নার মাঝেও খানিক হেসে বলে “বন্ধুত্বে এতটা ভালোবাসা তো আমি আশা করিনি”
“বড় বড় আশা গুলো বন্ধুত্বেই রাখতে হয়”
“কিন্ত তুই তো মায়া লাগিয়ে চলে যাবি”
“চলেতো যেতেই হবে। তোকে তো বলেছিলাম আমার সাথে চল”
“আম্মার অসুখ। শেষ সময়টা নাকি উনি আব্বার সৃতি সাথে নিয়ে মরতে চান। তাই উনি কোত্থাও যাবেন না”
“আচ্ছা এখন আগে বিয়েতে চল। বাহিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে”
“চল”
মাধবী ভেতর থেকে দরজায় টোকা দিতেই একই বদ্ধতীতে তাকে পালকিতে তুলে পর্দা লাগানো হয়। মাধবী ভেতর থেকে বলে “অপুও পালকিতে উঠবে”
মাধবীর কথা শুনে সকলে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। অপু ইতস্তত করে। সে ভাবেনি মাধবী এই কাজটা করবে। বউয়ের পালকিতে সে উঠবে ব্যাপার টা কেমন না? কিন্ত আরিয়ান আদেশ দিতেই সেও উঠে বসে। পালকিটা বড়ই নেয়া হয়েছে। এখান থেকে যাওয়ার সময় মাধবী আরিয়ান দুজনেই পালকিতে যাবে। যেহেতু দূরের পথ। ইচ্ছে আর আয়াজও এক পালকিতে যাবে। আর বাকিদের জন্য গরুর গাড়ি। বিয়ে বাড়িতে পৌছেই খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা করা হয়। মধুরিয়ান এবং ইচ্ছেয়াজ কে একসাথে ঘরে আলাদা আলাদা দুটো বড় থালে খাবার দেয়া হয়েছে। বড় থালের আশেপাশে তাদের সাথে আরো কয়েকজন আত্মীয়ের বাচ্চারা বসেছে। রুহি অপুও সাথে বসেছে। বাহিরে ছেলেরা যেমন,অপূর্ব,আজয়,অরিন্দ,অভি আর মাধবীর মামারা একসাথে খেতে বসেছে। তবে খেতে আর পারলো কই? ইচ্ছে,আরশি,আয়াজ,অপূর্ব কেউই খেতে পারেনি।
এমনকি অভি আর রুহিরও ভবিষ্যতের চিন্তায় গলা দিয়ে খাবার নামেনি। সকলের খাওয়া শেষে সকলে মাধবী আর ইচ্ছেকে নিয়ে উঠোনের এক কোণে করা মাঝারি সাইজের সামিয়ানার নিচে যায়। যেটা অত্যন্ত রাজকীয় ভাবে তৈরি করা হয়েছে শুধু মাধবীর জন্য। এই সবটা আরিয়ান মাধবীর পর্দার দিকে খেয়াল রেখে করেছে। মহিলারা সবই চলে যায় সেই সামিয়ানার নিচে। নিচে আরাম কেদারা বিছানো হয়েছে। চারদিকে নাচের আয়োজন। গ্রাম্য বিয়ে না নাচলে কি আর বিয়ে বিয়ে মনে হয়? মাধবী ইচ্ছে দুজনকে বসানো হয়েছে নরম কেদারায়। গ্রামের কিশোরী মেয়েরা একে একে নিজেদের প্রতিভা মত নাচতে থাকে। মাধবী শুধু ওদেরকে দেখেই যায়।
এইতো এই মেয়েগুলোর কত স্বাভাবিক জীবন। এমনকি তার জীবনটাও হতে পারতো না? সে একটা কৃষকের ঘরে জন্ম নিতো আর আরিয়ান রাখাল হয়ে। তাহলে তো তাদেরও সুন্দর সংসার হতো। তাদের জীবনটাও কত সুখের হতো। এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে এক পর্যায়ে ওরা মাধবীকেও অনুরোধ করে নাচার জন্য। জোরাজুরি করতে পারছে না ভয়ে তা দেখে অপু ওদের কানে কানে বলে “আরে তোমরা যাও। রাণী কিচ্ছু বলবে না। একবার পটাতে পারলে সত্যিই নাচবে”
সকলের মুখ খুশিতে চকচক করে উঠে। সাহস করে সকলে এগিয়ে গিয়ে মাধবীর সামনে জড়ো হয়ে গাঁইগুই করে বলে “রাণী মা আপনি যদি একটু নাচতেন। দয়া করে না করবেন না। আপনাকে হয়তো আর কখনও এতটা সময় দেখার সুযোগ পাবো না। একটু নাচবেন”
মাধবী প্রথমে একেবারেই মানা করে দেয়। কিন্ত পরে ওরা এত জোরাজুরি করে যে রাজি হতেই হয়। মাধবীর নাজেহাল অবস্থা দেখে অপু আর রুহি ঠোঁট টিপে হাসে। ইচ্ছে আর আরশি প্রচন্ড বিরক্ত এদের এত আদিখ্যেতায়। মাধবী রাজি হতেই অপু গিয়ে আরিয়ান কে ডেকে। প্রথমে আরিয়ান আসতে চায়নি। এত এত মেয়েদের মাঝে সে গিয়ে কি করবে। কিন্ত যখন শুনেছে মাধবী নাচবে তখন আর না করেনি সোজা চলে আসে। এই মেয়ের নাচ বলে কথা। একেবারে হাতে চাঁদ পাওয়ার মত। সকলে মাধবীকে মাঝে দাঁড় করিয়ে দেয়। আরিয়ান কে আসতে দেখে সকলে হেসে জায়গা করে দেয়। আরিয়ান গিয়ে নরম কেদারার সামনে দাঁড়িয়ে ইচ্ছে আর আরশিকে এখনও সেখানে বসে থাকতে দেখে বলে “কি? আপনাদের স্বামীদের ডাক দিতে হবে না কি ? কোলে তুলে উঠানোর জন্য?”
দুজনে কথা না বারিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ইচ্ছে শাড়ি সামলাতে না পেরে হোঁচট খেয়ে আরিয়ানের পাঞ্জাবিতে ধরতে নিলে আরিয়ান ছিটকে দূরে সরে যায়। একটুর জন্য আরিয়ানের পাঞ্জাবিটায় ছোঁয়া লাগেনি। আরিয়ান অগ্নি দৃষ্টিতে তাকায়। আরশি এসে ইচ্ছেকে তুলে পাশের একটা চেয়ারে বসিয়ে দেয়। মাধবী মাঝে দাঁড়িয়ে একবার পুরো জায়গাটাতে তাকায়। আশেপাশে সমস্ত মহিলারা অপেক্ষা নিয়ে তাকিয়ে আছে। মাধবী শাড়ির আচঁল টা কোমরে গুঁজে দেয়। শাড়িটা কিছুটা উপরে তুলে রেডিও বাজাতে ইশারা করে। গানের তালে তালে মাধবীর পায়ের নূপুর জোরা নিজস্ব নৃত্যে শব্দ করছে। গানের আওয়াজের সাথে মাধবীর নূপুরের আওয়াজ মিশে গিয়ে এক স্বর্গীয় শব্দ তৈরী করছে। নৃত্যের সাথে সাথে মাধবী গানের তালে তালে গেয়ে উঠে,
“দো দিলো কি ইয়ে প্রেম কাহানী
লে আয়ে দেখো কাহা
ইন লাকিরো মে মিল না আপনা থা
জানমো পেহেলে লিখা
হামারে মিলান কো
হেয় তারছে তো নেয়না
ইনহে আজ না রোখ না
জুদা আব না হোগে
কারো হামছে ওয়াদা
মেরা সাথ না ছোড় না…
তুমহে আজ পায়েঙ্গে
ইয়া মার হি জায়েঙ্গে
ইয়ে খোয়াব না তোর না
মেরে ঢোল না…..সুন
মেরে পেয়ার কি ধুন
মেরে ঢোল না…..সুন
মেরে চাহাতে তো
ফিজা মেইন বাহেগী
জিনদা রাহেগী হোকে ফানা
তানি ধানা ধুম (২)
তানি ধানি ধুম (২)
তা না দেরে (৩)
আমি যে তোমার….
শুধু যে তোমার…
আমি যে তোমার…..!!!!! ”
থেমে যায় মাধবীর নূপুরের শব্দ। থেমে যায় তার পা। সেখানে দাঁড়িয়েই মাথা বাঁকা করে এক গুয়ে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আরিয়ানের দিকে। আরিয়ানও স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। এই গান দ্বারা কি বোঝাতে চাইলো মাধবী? কী তার উদ্দেশ্য? তার মানে কি তার অনুভূতিদের মতই মাধবীর অনুভূতি? মাধবীও তাকে ঠিক ততটাই ভালোবাসে যতটা সে বাসে? মেয়েটা কি এই দু বছরেই তাকে ভালোবেসেছে নাকি আরো আগের থেকে? তাহলে কী দুজনে যেমন সমান তালের পাপীষ্ঠ তেমনি সমান তালের আত্মীক বন্ধনে বন্দি ? এত পাপের মাঝেও মাধবীকে তাকে গভীরভাবে ভালোবাসে যতটা সে তাকে বাসে? কিন্ত সমস্যাটা দুজনেই চাপা স্বভাবের। কেউ কারো পাপও প্রকাশ করবে না ভালোবাসাও না। আরিয়ান আজ খুশি হলো। ঠিক যতটা খুশি হলে কারো নিজেকে দুনিয়ার সর্বোচ্চ সুখি মনে হয় ততটা খুশি হলো।
মাধবী এসে বসলো আরিয়ানের পাশে। সকলে হাত তালি দিলো। যাক মেয়েটা পুরো পরিবার কে হাড়িয়েও তো কতটা শক্ত রয়েছে। পেয়েছা একটা ভালো জীবন সঙ্গী। দোয়া করলো সকলে যেন মধুরিয়ান আজীবন সুখে থাকতে পারে। কোন অশুভ ছাঁয়া যেন তাদের ভালোবাসায় না পরে। ওদের দোয়াতেই যেন আজীবন বেঁচে থাকে মধুরিয়ানের দুষ্টুমি মিশ্রিত মধুর সম্পর্ক।
মাধবীর এই আনন্দটা সেদিন বিয়েতে লাগেনি। কারণ তার গ্রামের মানুষদের হাসিমুখ গুলো দেখতে পায়নি। এখন তার কাছে আনন্দ লাগছে। তার গ্রামের মানুষগুলো প্রাণ খুলে হাসছে। মাহফুজ চৌধুরী থাকলে এখন কতই না খুশি হতো ভাবতেই মাধবীর মনটা খানিক ভার হয়। ততক্ষণে আকাশ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। সূর্য হেলে পরেছে পশ্চিমে। তবে আরিয়ান উঠে বাড়িতে যাওয়ার মত অবস্থায় নেই। সে তো কল্পনাও করেনি মাধবীর এতখানি ভালোবাসা। তার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে মাধবী বলে “এই যে পাঞ্জাবিওয়ালা! বাড়িতে কী নিয়ে যাবেন? না ঘর জামাই থাকতে চাইছেন?”
আরিয়ান হেসে বলে “মধুমতী যদি থাকতে বলে তাহলে পাঞ্জাবিওয়ালার সমস্যা নেই”
“থাকতে হবে না আর চলুন এবার”
অপূর্বরা আগে থেকেই সব তৈরী করে রেখেছিলো। সকলে বেরিয়ে আসে সেই সামিয়ানার ভেতর থেকে। পালকি আনা হয় দুয়ারে। সেখান থেকেই মাধবী উঠে পরে। ইচ্ছে বের হয়ে পালকিতে উঠে। আয়াজ আর আরিয়ানও উঠে বসে। বাকিরা সকলে গরুর গাড়িতে বসে। আজ যদি মাধবীরও পরিবার থাকতো তাহলে তো তার সাথেও কেউ না কেউ যেত। অপুটাকেও নিতে পারছে না।
পালকি কাঁধে নিতেই সকলের মুখে নেমে আসে বিষাদের ছাঁয়া। অপুসহ গ্রামের লোকজনও কান্নায় ভেঙে পরে। যতই হোক ওটা আগে মামার বাড়ি ছিলো আর এখন শশুর বাড়ি। আগে যেমন চাইলেই তাদের খোঁজ নিতে গ্রামে আসতে পারতো এখন আর তো সম্ভব না। তাদের কাছে বিয়ে মানেই যে সব স্বাধীনতা শেষ। রাজ্যের রাণী চলে যাচ্ছে নিজের রাজ্য ছেড়ে রাজার প্রাসাদে। মুক্ত পাখি বন্দি হচ্ছে খাঁচায়। তাদের কাছে তো এসবই মনে হচ্ছে।
মাধবী অবাক নয়নে দেখে প্রতিটা মানুষ কে। দুটো বছর ধরে তার থাকা হয় না গ্রামে। আগেও তো তার বাবার কারণে না অন্দরে কেউ ঢুকতো না কারো সাথে কথা হতো।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৩০
তবুও মানুষগুলোর এত দরদ তার জন্য। সে পালকির ভেতর থেকে হাতটা শুধু বের করে বিদায় জানায় সবাই কে। চুরি পরা আলতা রঙা হাতটাতে চোখ আটকে যায় অপূর্বের। মাধবী সাথে সাথেই হাতটা ভেতরে নিয়েছে। তবে তার চোখ থেকে মোছেনি। চোখ ঝলসানো সুন্দর লাগছিলো হাতটা। না জানি বউ বেসে ঠিক কতটা সুন্দর লাগছে তাকে। অপূর্ব কল্পনা করার চেষ্টা করলো কেমন লাগতে পারে মাধবীকে। ততক্ষণে গরুর গাড়ি চলতে শুরু করছে। পালকির লোকেরাও হাঁটা শুরু করেছে।
