তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৮ (২)
noorayn
২ মাস পর….
এই দুই মাসে সময় যেন নিজের গতিতে অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে।
ছোট্ট ডোরা দেখতে দেখতে উনিশ মাসে পা দিয়েছে। টলমল পায়ে হাঁটতে শিখেছে ; যদিও মাঝে মাঝে হামাগুড়ি দিয়েই চলাফেরা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে সে। আধো আধো বুলি, নিষ্পাপ হাসি আর অবুঝ কাণ্ডকারখানায় মুহূর্তেই সবার মন জয় করে নিতে পারে। গোলগাল মুখ, টুকটুকে গাল আর সারাক্ষণ দুষ্টুমিতে ভরা চোখজোড়া ; যেই একবার তাকে দেখবে সে যেন আর আদর না করে থাকতেই পারবে না।
তবে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তার দুষ্টুমির মাত্রাও যেন পাল্লা দিয়ে ভারি হয়ে উঠছে। আজ যেমন আলিশার চোখ এড়িয়ে তার পছন্দের লিপস্টিক হাতে পেয়ে পুরো রুমের দেয়ালকে নিজের আঁকার খাতা বানিয়ে ফেলেছে ; দেয়ালজুড়ে লালচে আঁকিবুঁকি দেখে আলিশার মুখের অবস্থা এমন হয়েছে যেন এখনই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।
–মায়ের ধমক খাওয়ার পর অবশ্য বেশিক্ষণ অপরাধবোধ টেকেনি ডোরার। ঠোঁট ফুলিয়ে ছুটে গিয়ে বাবার বুকে মুখ গুজে ছিলো সে। কিন্তু, সেখানেও তার শান্তি নেই। আরহামের কোলে বসে থেকে তারই বুকে মুখ ঘেষে দুধ খাবার চেষ্টা শুরু করেছে সে। আকস্মিক এমন আক্রমণে আরহাম এমনভাবে চমকে উঠলো যে নিজেকে সামলাতে না পেরে ধপাস করে বিছানা থেকে নিচে পড়ে গিয়েছে। হঠাৎ নিচে পড়ায় আরহাম নিজের পশ্চাৎদেশে বেশ ভালোই আঘাত পেয়েছে।
ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে নিজের পশ্চাৎদেশে হাত বুলাতে থাকা আরহামকে গভীর মনোযোগে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো ডোরা ; তার মনে হয়েছে বাবার শিশি পেয়েছে কিন্তু তার মতো ডাইপার না থাকায় তা করতে পারছেনা। তাই সে দৌড়ে গিয়ে নিজের একটা ডাইপার হাতে ফিরে এলো। মায়া মায়া চোখ করে নিজের গুলুমুলু দুই হাতে সেটি আরহামের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নিষ্পাপ গলায় বললো –
“বাবা… ইটা পুলো। চিচি কলো।”
ছেলের আদুরে গলায় এমন বেয়াদবি সহ্য হলোনা আরহামের। সে কিনা এই বয়সে এসে শিশি করার জন্য ডাইপার পড়বে! বলে কি এই ছোট মরিচ! রাগে কিরমির করতে করতে আরহাম এবার ডোরাকে কোলে তুলে তার ছোট্ট পশ্চাৎদেশেও আলতো করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গেলো ডোরার কান্না।
আরহাম ছেলের কান্না থামানোর বদলে নিজেও নিজের ব্যথার কথা স্বরন করে প্রায় একই সুরে ডোরার সাথে তাল মিলিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ শুরু করলো। মুহূর্তের মধ্যেই ঘরজুড়ে বাপ-ছেলের পায়ে পা লাগিয়ে চিৎকারের এক বিরল যুদ্ধ শুরু হলো।
অন্যদিকে, আলিশার ধ্যান অন্য জায়গায়। নিজের পছন্দের লিপস্টিক হারানোর দুঃখে সে এখন আরহামের পকেট থেকে টাকা ছিনতায় করার চেষ্টা চালাচ্ছে ; মিনি গন্ডার নষ্ট করেছে তাই এর উসুল এখন সে বড় গন্ডার থেকেই করবে।
এইতো…এভাবেই চলছে তাদের সংসার।
আলিশা এখন প্রায় আঠারো বছর আট মাসের তরুণী। বয়স বাড়লেও তার চঞ্চল স্বভাবের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি ; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা যেন পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। সংসার, ডোরা আর পড়াশোনা – তিন দিকেই সমানভাবে খেয়াল রাখার প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে সে।
কিছুদিন আগেই আলিশা তার A Level এর শেষ পরীক্ষা দিয়েছে। দীর্ঘ প্রস্তুতি আর পরিশ্রমের পর অবশেষে পরীক্ষার চাপ থেকে মুক্তি মিলেছে। যদিও রেজাল্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবুও, সেটা নিয়ে আলিশার খুব একটা মাথাব্যাথা নেই ; যা হওয়ার হবে। অনেক দিন পর পাওয়া এই অবসরটুকু সে নিজের মতো করে উপভোগ করছে।
বর্তমানে, তার ভ্যাকেশন চলছে। আর ভ্যাকেশন মানেই ঘুরাঘুরি, ডোরার সাথে দুষ্টুমি, আরহামকে বিরক্ত করার নতুন নতুন পরিকল্পনা আর পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখা। মাঝে মধ্যে, আলিশার এমন বাচ্চাসুলভ কাণ্ড দেখে বাড়ির কারো বিশ্বাসই হয়না যে ; এই মেয়েটিই উনিশ মাস বয়সী এক ছোট বাচ্চার মা!
আরহামের বয়স এখন প্রায় বাইশ বছর ছয় মাস।
যৌবনের উচ্ছ্বাস এখনো তার রক্তে টগবগ করে প্রবাহিত। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ক্লাব, স্টুডিও, গান-বাজনা ; এসব নিয়েই তার দিন যাচ্ছে। পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ কোনোকালেই তেমন ছিলো না। কোনোমতে পরীক্ষায় টেনেটুনে পাশ হয়ে বাড়িতে ইজাজ সাহেবের ঝাড়ি শুনে আবারও সেই আগের মতো নিরুদ্বেগ জীবনে ফিরে যায় সে। দায়িত্ববোধ শব্দটি যেন এখনো তার অভিধানে পুরোপুরি জায়গা করে নিতে পারেনি।
তবে, একটি পরিবর্তন এসেছে। আগে সামান্য বিষয়েই আলিশার ওপর চিৎকার-চেঁচামেচি করলেও এখন সে নিজেকে অনেকটাই সংযত করেছে। রাগ কমেছে, ধৈর্য বেড়েছে। যদিও তার জীবনদর্শন এখনো একই ; চিল এন্ড কুল।
মজার বিষয় হলো, এই নিয়ে তাদের সংসারে কখনোই কোনো অশান্তি হয় না। কারণ, দুজনেই সমান ফাজিল, সমান ফাঁকিবাজ। একজন কোনো কাণ্ড ঘটালে অন্যজন সেটি সামাল দেওয়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে।
প্রায় দুই মাস আগে তাদের সকল মান-অভিমানেরও অবসান হয়েছে। সেদিন আলিশা শেষ পর্যন্ত আরহামকে ক্ষমা করে দিয়েছিলো। সেই সঙ্গে ফিরে এসেছিলো তাদের বহুদিনের সাপ-নেউলের সম্পর্ক ; যেখানে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঝগড়া হয়, একে অপরকে জ্বালানো হয় আবার দিন শেষে একজনের আরেকজনকে ছাড়া চলেও না।
আরহাম- আলিশা কখনোই সংসারকে শুধু দায়িত্ব হিসেবে দেখেনি ; বরং নিজেদের মতো করে অগোছালো ভাবে সংসারটাকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যেখানে নেই কোনো নিয়মের বেড়িবাঁধ, নেই কোনো সীমা।
–সংসারে তারা হাসব্যান্ড-ওয়াইফ হলেও ভাইবে তারা ফুলটাইম ক্রাইম পার্টনার।
যেমন, কিছুদিন আগেই কাহাফের জন্মদিনের পার্টি থেকে রাত তিনটার দিকে টলতে টলতে বাড়ি ফিরেছিলো আরহাম। ড্রিংক করার কোনো ইচ্ছেই তার ছিলো না ; কিন্তু বন্ধুদের জোরাজুরিতে একটু করতে গিয়ে কখন যে তা বেশি হয়ে গেলো তা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারেনি।
হুঁশ ফিরতেই তার মাথায় প্রথমে এলো – ইজাজ সাহেব যদি তাকে এই অবস্থায় দেখেন তবে আজ তার আর বাড়িতে ঢোকা হবে না।
শেষ পর্যন্ত, সেই বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলো আলিশাই। রাত তিনটায় সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চোরের মতো আরহামকে চুপিচুপি ঘরে ঢুকিয়েছিলো সে। তবে, এত বড় উপকার করে সুযোগের সদ্ব্যবহার না করলে কি আর আলিশার হয়?
শাস্তিস্বরূপ টানা দশ মিনিট আরহামকে মোরগ বানিয়ে রেখেছিলো ; শুধু তাই নয়, পুরো ঘটনার ছবি তুলে সেগুলোকে ভবিষ্যতের ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র বানিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সে আরহাম থেকে।
অবশ্য, প্রতিশোধ নিতে আরহামও খুব বেশি দেরি করেনি।
একদিন আলিশা কলেজ ফাঁকি দিয়ে ফ্রেন্ডদের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়েছিলো ; বাড়ির ড্রাইভার রাশেদ কাকা বিষয়টা বাড়িতে জানাতে গেলে আরহাম তাকে কড়া ধমক দিয়ে, সঙ্গে সামান্য ঘুষ ধরিয়ে মুখ বন্ধ করিয়ে দেয়।
বিনিময়ে পুরোনো হিসাব মেটাতে আলিশাকেও সে দশ মিনিট মুরগী বানিয়ে রেখেছিলো। এছাড়া, পরিবারের সবার সামনে তাকে নাগিন ডান্স করিয়ে তবেই শান্ত হয়েছিলো আরহাম নামক আলিশার গন্ডার।
সেই ঘটনা নিয়েও কয়েক দিন ধরে চলে এক দফা ঠান্ডা যুদ্ধ, খুনসুটি আর প্রতিশোধের পালা।
সব মিলিয়ে তারা দুজন যেন একে অপরের জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ক্রাইম পার্টনার। আর এখন সেই দলে নতুন সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে তাদের উনিশ মাস বয়সী ছোট্ট ডোরা।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে গেছে। কিন্তু বদলায়নি নীলা আর আরশাদের জীবনের অপূর্ণতা। সন্তানহীনতার সেই দীর্ঘশ্বাস আজও নীরবে তাদের দুজনকে গ্রাস করে চলেছে।
গত কয়েকদিনে, আরশাদ একাধিকবার সন্তান দত্তক নেওয়ার কথা বলেছে নীলাকে।
কিন্তু নীলা প্রতিবারই সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। তার একটায় কথা ; সে নিজের সন্তান চায়, নিজের রক্তের সন্তান। অন্যের সন্তানকে ভালোবাসা যায়, মানুষও করা যা ; কিন্তু নিজের মাতৃত্বের অনুভূতির সঙ্গে সে কোনো কিছুরই তুলনা করতে পারে না।
এই ভিন্নমতের কারণেই গত কয়েক দিন ধরে তাদের মধ্যে এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বড় কোনো ঝগড়া নয় তবুও, নীরব অভিমান যেন দুজনের মাঝখানে অদেখা এক দেয়াল তুলে দিয়েছে।
অন্যদিকে, আয়শা ও শাইনা এখনো আগের মতোই নিষ্ঠার সঙ্গে সংসারের দায়িত্ব সামলে যাচ্ছেন। তবে, ধীরে ধীরে সেই দায়িত্বের একটা অংশ নীলা ও আলিশার হাতেও তুলে দিতে শুরু করেছেন তারা। কারণ, এখন তারা শুধু এই বাড়ির মেয়ে নয় সাথে এই বাড়ির দুই পুত্রবধূও। আগামী দিনের এই সংসার, এই বংশ – সবকিছুর দায়িত্ব একদিন তাদের কাঁধেই এসে পড়বে।
এই পরামর্শটা মূলত দিয়েছিলেন মেহরোজা আক্তার।
জীবনের এই শেষ বয়সে এসে তার চাওয়াগুলো খুব বেশি নয়। তিনি শুধু দেখতে চান ; তার নাতনিরা যেন নিজেদের সংসার সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিতে শিখে। জীবনে যা চেয়েছেন তা প্রায় সবই পেয়েছেন। একটি পরিপূর্ণ, ভালোবাসায় ভরা পরিবার। এখন শুধু একটি অপূর্ণ ইচ্ছেই রয়ে গেছে – নীলা আর আরশাদের কোলজুড়ে একটি সন্তান। সেই স্বপ্ন পূরণ হতে দেখলে তিনি নিশ্চিন্তে জীবনের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছাতে চান। তার আগে পরিবারের প্রতিটি মানুষকে তিনি নিজের জায়গায় গুছিয়ে দিতে চান।
এদিকে, আলিশার পরীক্ষা শেষ। ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায় থাকলেও এখন তার ভ্যাকেশন চলছে। তাই দিনের বেশির ভাগ সময়ই কেটে যায় তার ডোরাকে নিয়ে।
নীলার জীবনেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। আগে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য প্রায়ই কিটি পার্টি কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে সময় কাটাতো সে। এখন আর সেসবের প্রতি আগ্রহ অনুভব করে না ; বরং বাড়ির চার দেয়ালের ভেতর যেন সে নিজের শান্তি খুঁজে পেয়েছে।
বাড়ির দুই বউ’ই যেহেতু আপাতত ফ্রি আছে তাই আয়শা ও শাইনা সুযোগটা কাজে লাগিয়েছেন। ধীরে ধীরে সংসারের ছোট-বড় সব দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দিয়ে শেখাতে শুরু করেছেন।
অবশ্য নীলা একেবারে অনভিজ্ঞ নয়। ইতালিতে প্রায় দুই বছর আরশাদকে নিয়ে আলাদা সংসার করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তাই রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘর সামলানো টুকটাক সবই পারে সে। তবে অভিজ্ঞতা আর দক্ষতার দিক থেকে এখনো মায়েদের মতো পারদর্শী হয়ে উঠতে পারেনি।
অন্যদিকে, আলিশার রান্নার হাতও বেশ ভালোই। আর এর পুরো কৃতিত্বটাই যায় আরহাম আর আলিশার মিডনাইট ক্রেভিংসকে।
প্রায়ই মাঝরাতে যখন দুজনের একসঙ্গে ক্ষুধা পেতো তখন সবাই ঘুমিয়ে পড়লেই তারা চোরের মতো কিচেনে ঢুকে ইউটিউব দেখে নতুন নতুন রেসিপি বানানোর চেষ্টা করতো। রান্নার চেয়ে কিচেন এলোমেলো করাতেই যেন তাদের দক্ষতা বেশি ছিলো। পরদিন সকালে সেই অবস্থা দেখে আয়শা বকাবকি করলেও তাদের দুজনের তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিলো না। বরং পরের রাতেই আবার নতুন কোনো এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে হাজির হতো তারা।
সেই অসংখ্য ব্যর্থ আর সফল এক্সপেরিমেন্টের জন্যই আজ তারা দুজনেই টুকটাক বেশ ভালো রান্না করতে পারে।
এই পরিবারের একটি বিষয় শুরু থেকেই সবার মধ্যে সমানভাবে গড়ে উঠেছে – কোনো কাজকেই তারা ছোট করে দেখে না। নিজেদের কাজ নিজেরা করাটাকেই তারা স্বাভাবিক দায়িত্ব বলে মনে করে। কারণ তাদের শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে ইতালির রোম শহরে ; যেখানে আত্মনির্ভরশীলতা ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার অংশ।
বহু বছর আগে বাংলাদেশে ফিরে এলেও সেই শিক্ষা, সেই কালচার আর জীবনযাপনের অভ্যাস আজও তাদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। মেহরোজা আক্তার যদি একসময় দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত না নিতেন তাহলে হয়তো আজ তাদের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগোত।
তবে, এই নিয়ে কারও মনে কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ ইতালি তাদের শৈশবের অংশ হলেও, বাংলাদেশ তাদের ভালোবাসার ঠিকানা। এখানকার মানুষ, কালচার, উৎসব সবকিছুর সঙ্গেই তারা গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। তবুও, শিকড়ের টান কি এত সহজেই ভোলা যায়? তাই সুযোগ পেলেই বছরে এক-দুইবার পুরো পরিবার মিলে ইতালি ঘুরে আসে। পুরোনো স্মৃতিগুলোকে আবার নতুন করে ছুঁয়ে দেখার জন্য।
আজ আয়শা দায়িত্ব নিয়েছেন আলিশাকে গোল রুটি বানানো শেখানোর। রুটি-পরোটা ; এসব বানাতে আলিশা এখনো তেমন পারদর্শী নয়। তাই আয়শা ভেবেছেন, শুরুটা না হয় সহজ কিছু দিয়েই করা যাক।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ধৈর্য ধরে একে একে আলিশাকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি। আর ছোট্ট ডোরা টলমল পায়ে মায়ের পিছু পিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সব বুঝিয়ে দিয়ে আয়শা ডোরাকে কোলে নিতে গেলে ডোরা আসলোনা। এখন ডোরার কোলে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই। তার মনোভাব এমন যেন সেও আজ মাম্মার সাথে রুটি বানানো শিখবে।
বহু কসরত করেও নাতিকে কোলে নিতে পারলেন না আয়শা। উল্টো জোর করে নিতে যেতেই ডোরা ছোট্ট আঙুল উঁচিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বললো –
“আ…তা… তাইত! দোরা লাগ কুব্বে!”
শেষ পর্যন্ত হার মেনে আয়শা তাকে না নিয়ে আলিশার পাশেই কিচেন ক্যাবিনেটের ওপর সাবধানে বসিয়ে দিলেন।
“ঠিক আছে, আপনি আপনার মাম্মার সঙ্গে থাকেন নানুভাই।”
বলেই তিনি মেহরোজা আক্তারের রুমের দিকে চলে গেলেন। উনার ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।
আলিশা আয়শার কথা অনুযায়ী একটা বড় বোলে আটা ঢেলে অল্প অল্প করে পানি মিশাতে শুরু করলো। আর ছোট্ট ডোরা গোল গোল চোখ করে মায়ের প্রতিটি কাজ গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছে। মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সুযোগ পেলেই আটার বোলের ওপর একটা থাবা বসাবে সে।
ছেলের মনোভাব বুঝতে পেরে আলিশা তাড়াতাড়ি আটার বোলটা নিজের দিকে সরিয়ে এনে কড়া গলায় বললো –
“দেখ, বড় গন্ডারের ছোট আন্ডা! আমি তোকে সাবধান করে দিচ্ছি, একদম এদিকে থাবা বসাবি না। দিলে তোর বাপ বড় মোরগের আন্ডা ছোট মোরগকে আমি ফ্রাই করে অমলেট বানিয়ে খেয়ে ফেলবো।”
ডোরা বড় বড় চোখ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো – “বলো দন্দারের আন্দা চুট দন্দার?”
“আবার কপি করিস?”
ডোরা এবার আরও কৌতূহলী হয়ে বললো –
“ফাই কলি কাই পেলবে?”
“খেয়ে ফেলবো।”
“আমিও কাবো।”
“তোর বাপের আন্ডা খাস।”
ডোরা সঙ্গে সঙ্গে নিষ্পাপ মুখে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো –
“বাবা আন্দা কাবু?”
ডোরার কথা শুনে আলিশার দমফাটা হাসি পেলো। ছেলের বলা কথার ডাবল মিনিং মাথায় আসতেই সে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না ; হা হা করে হেসে উঠে ডোরার ফোলা ফোলা গাল দুটোতে আলতো করে চেপে ধরে আদর করে দিলো।
আলিশা কোনো রকমে আটার ডো তৈরি করে ফেলেছে। কিন্তু ততক্ষণে ডোরা কয়েকবার সেই আটায় থাবা দেওয়ার ব্যার্থ চেষ্টা চালিয়েছে। আলিশা যতবারই বোলটা নিজের দিকে সরিয়ে নেয় ততবারই ডোরা রাগান্বিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট আঙুল তুলে “তাইত” দিতে শুরু করে।
আলিশা লবণ আনতে এক মুহূর্তের জন্য অন্যদিকে যেতেই ডোরা সুযোগ বুঝে বোলের ভেতর নিজের গুলুমুলু দুই হাত ডুবিয়ে দিলো। তারপর মনের সুখে আটা মাখামাখি শুরু করে দিয়েছে।
লবণ হাতে ফিরে এসে ছেলের কাণ্ড দেখে আলিশা হতভম্ব।
সে তাড়াতাড়ি বোলটা ছিনিয়ে নিতে যেতেই ডোরা গলা উঁচিয়ে কান্না জুড়ে দিলো। বাধ্য হয়ে আলিশা হাল ছেড়ে দিয়েছে।
এমনিতেও এই আটা দিয়ে বানানো রুটি আর কেউ খাবে না। তাহলে এই মিনি গন্ডার যা ইচ্ছা করুক!
বোল থেকে একটু আটা নিয়ে আলিশা রুটি বেলার বোর্ডের ওপর রাখল। তারপর বেলন হাতে নিয়ে রুটি বানাতে শুরু করলো।
নতুন জিনিস দেখে ডোরার কৌতূহল যেন আরও কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলো বেলন আর আটার দিকে থাবা দেওয়ার।
“আমি কব্বো… দোরা ডাও।”
“ডোরা, সর। কী করছিস এসব? আমি রুটি বানাচ্ছি না?”
“দোরা লুটি বানাই। দোরা ডাও।”
“তোর রুটি বানানোর বয়স হয়েছে?”
ডোরা ভাবুক হয়ে মায়া মায়া মুখে জিজ্ঞেস করলো –
“বুয়ুস?”
“হ্যাঁ, বয়স। হয়েছে তোর?”
ডোরা নিজের গুলুমুলু হাত দুটো নাড়াতে নাড়াতে বললো –
“দোরা বুয়ুস হুইনাই… হুইনাই।”
“বয়স হয়নাই তাই রুটিও বানাতে হবে না।”
ডোরা ঠোঁট ফুলিয়ে প্রতিবাদ করলো।
“দোরা বানাবি… লুটি কাই।”
বলতে বলতেই এক থাবা দিয়ে আলিশার বেলা রুটিটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো। তারপর সেটাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এমনভাবে দেখছে যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো গবেষণা করছে সে।
“দোরা বানাই… দোরা ডাও।”
ছেলের জেদ দেখে আলিশা আর না করতে পারলো না।
সে ডোরাকে তুলে রুটি বেলার বোর্ডের সামনে বসিয়ে দিলো। নিজে ঠিক তার পেছনে দাঁড়ালো ; যাতে ডোরা কোনোভাবে পড়ে না যায়।
ডোরা বরাবরই খুব বুদ্ধিমান বাচ্চা। একবার কোনো কিছু দেখলেই সেটা প্রায় হুবুহু করার চেষ্টা করে।
সে নিজের ফোলা ফোলা গাল দুটো গম্ভীর করে একমুঠো আটা হাতে নিলো তারপর মায়ের মতো করে সেটা বোর্ডের ওপর রেখে বেলন তুলতে গেলে সেটা আর নিতে পারলোনা।
কেননা বড় বেলনটা তার ছোট্ট হাতের তুলনায় বেশ ভারি।
ছেলের ব্যর্থ চেষ্টা দেখে আলিশা পাশের ড্রয়ার থেকে ছোট্ট একটা বেলন বের করে দিলো তাকে ; সাধারণত এটা দিয়ে লুচি বেলা হয়।
নিজের সাইজের বেলন পেয়ে ডোরার খুশি আর দেখে কে?
কুটিকুটি হেসে সে ছোট বেলন হাতে নিয়ে রুটি বেলার কাজে নেমে পড়লো। একবার আটার ওপর বেলন চালাচ্ছে পরক্ষণেই সেই আটা নিজের গায়ে মাখিয়ে ফেলছে। আবার একটু পর পর পেছনে ফিরে আলিশার দিকে একমুঠো আটার ডো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে, আরহাম মাত্রই বাড়ি ফিরেছে।
সিটি তুলতে তুলতে সে লিভিং রুমের দিকে হেটে যাচ্ছে। মুখে তার প্রশস্ত হাসি ; আজ তার নতুন একটা কন্ট্রাক্ট সাইনিং হয়েছে তাই মনটা ভীষণ ফুরফুরে।
ঘরের ভেতর ভেসে আসা সেই নির্লজ্জ সিটির শব্দ শুনেই আলিশা বুঝে গেলো ; আরহাম ফিরেছে। কারণ, এই বাড়িতে সে ছাড়া আর কেউই এমন সিটি বাজানোর মতো অসভ্যতা করে না।
আলিশা কিচেন থেকেই তাকে ডাক দিলো।
নিজের রুমের দিকে পা বাড়ানো আরহামের চলন্ত পদযুগল থেমে গেলো আলিশার ডাকে। সে পেছন ফিরে একবার কিচেনের দিকে তাকালো। আবারও সেই একই ডাক ভেসে আসতেই সে দিক বদলে সোজা কিচেনের দিকে হাঁটা ধরলো।
কিচেনে ঢুকেই আরহামের চোখ ছানাবড়া! এই কী!
তার আদরের কিউট বদের হাড্ডি ছোট মরিচকে দিয়ে কিনা লিশা রুটি বেলাচ্ছে!
সঙ্গে সঙ্গেই সে কটমট করে আলিশার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো – “শুশু আব্বা নিয়াজের ঘরের ভোটকির ভোটকি! আমার দুধের বাচ্চাকে দিয়ে কিনা তুই রুটি বেলাচ্ছিস?”
“আমি করাচ্ছি নাকি? এই মিনি গন্ডার নিজে থেকেই করছে?
আরহাম আর কোনো কথা না বলে ছেলের দিকে হাত বাড়িয়ে আদুরে গলায় ডাকলো –
“আহারে আমার আন্ডাটা! আয় বাপ, আয়… তোর বাপের কোলে আয়।”
বাবাকে দেখেই ডোরা খুশিতে কুটি কুটি হেসে উঠলো। তারপর নিজের গুলুমুলু হাতে একমুঠো আটা তুলে নিয়ে আরহামের দিকে ছুড়ে মারলো।
ফলস্বরুপ, ডোরাকে কোলে নিতে এগিয়ে আসা আরহামের মুখের ওপর গিয়ে সোজা আছড়ে পড়লো পুরো আটার স্থুপ।
মুহূর্তেই তার মুখটা সাদা আটার আস্তরণে ঢেকে গেলো। দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ পুরো মুখে ময়দা মেখে দিয়েছে।
আর এই কাণ্ড ঘটিয়েই ডোরা যেন ভীষণ খুশি। কিছুই হয়নি এমন ভাব করে সে আবারও মনোযোগ দিয়ে নিজের গুলুমুলু হাত দিয়ে আকাবাঁকা রুটি বেলতে শুরু করলো।
ডোরার কান্ডকারখানা দেখে আলিশা রাগে ফুসতে ফুসতে আরহামকে বললো –
“এই গন্ডার, দেখ তোর তোর ছানা কী করছে! একদম বাপের মতো বজ্জাত হয়েছে।”
আরহাম এক হাতে মুখের আটা ঝাড়তে ঝাড়তে প্রতিবাদ করলো –
“বাপ? এই, ওর বাপকে টানলি কেন? আমি আবার কী করলাম?”
“তোর থেকেই শিখেছে এসব।”
“হ্যাঁ, দুষ্টুমি করলে আমার ছানা আর কথা শুনলে তোর ছানা! যত দোষ আরহাম ঘোষ!”
মা-বাবার সেই চিরচেনা ঝগড়ার মাঝেই ছোট্ট ডোরা নিজের হাতে বানানো প্রায় দুই ইঞ্চির একটা আকাবাঁকা রুটি উঁচিয়ে দেখাতে দেখাতে নিজের গুলুমুলু হাত নেড়ে নেড়ে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলতে লাগলো –
“আই…য়া! লুটি… লুটি!”
ডোরার রুটি বানানোর একদফা যুদ্ধ শেষ হতেই আরহাম ছেলেকে কোলে নিয়ে নিজের রুমে ফিরে এলো।
এখন একটা শাওয়ার নেওয়া দরকার।
সে ডোরাকে বিছানার ওপর বসিয়ে তার জামাকাপড় বের করতে শুরু করলো।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ডোরা ডাক দিলো।
“আই…য়া… বাবা।”
আরহাম না ফিরেই বললো –
“কী ছোট মরিচ?”
“আন্দা।”
“কী আন্ডা?”
ডোরা নিষ্পাপ গলায় বললো –
“বাবা আন্দা কাবু।”
মুহূর্তের মধ্যেই যেন আরহামের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো! সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে ডোরার দিকে তাকালো।
“ক… কী বললি? আবার বল তো!”
ডোরা খুব আগ্রহ নিয়েই একই কথা আবারও বললো।
“বাবাল আন্দা কাবো।”
আরহামের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
সে তড়িঘড়ি করে ডোরাকে কোলে তুলে আবার বিছানায় বসিয়ে দিলো। তারপর কাঁপা কাঁপা চোখে নিজের নিচের ইজ্জতের দিকে তাকিয়ে এক ঝটকায় দুই হাত দিয়ে তা ঢেকে ফেললো।
“আবার… আবার তুই বাপের ইজ্জতের দিকে নজর দিয়েছিস?”
ডোরা অবশ্য এসবের কিছুই বুঝলোনা। সে দিব্যি নিজের গুলুমুলু আঙুল মুখে ঢুকিয়ে চুষতে চুষতে বললো –
“আ… আই…য়া।”
তোমার আমার গল্প পর্ব ৪৮
“কে শিখিয়েছে তোকে এসব?”
ডোরা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জবাব দিলো –
“মাম… মাম বুলচে বাবা আন্দা কেতে।”
এক সেকেন্ডের নীরবতা।
পরের মুহূর্তেই পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে আরহামের গর্জন শোনা গেলো।
“আলিশাআআআআ!”
