Home নিবৃতা নিবৃতা পর্ব ৩১

নিবৃতা পর্ব ৩১

নিবৃতা পর্ব ৩১
নেহার ছায়ালিপি

বাতাসে এক অদ্ভুত মত্ততা মেশানো মনোগ্রাহী সুবাস ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিবেশকের দু’নয়নের জমিন জুড়ে আধিপত্য ঘটাচ্ছে অবর্ণনীয় এক অসাধারণ চিত্তাকর্ষক মুহুর্ত। খোলা বারান্দা থেকে, অলস দুপুরের, মিঠে মিঠে, কোমল রোদের ছায়া এসে পরেছে এই ঘরের দুয়ারে। সেই চকচকে আপতিত আলোয় উষ্ণ হয়ে ওঠা মেঝের বুকে হেটে চলেছে রমনীর ললিত চরণ জোড়া। ভীষন ব্যস্ততা মিশ্রিত প্রতিটি কদম, তবুও তার মিয়ানো সত্তায় স্নিগ্ধতার বাস। মিষ্টি রোদ্দুরের কিরণে তার ভেজা শুভ্র বদনখানিতে জেগে উঠেছে লুকায়িত সেই দুর্লভ মায়াবী দীপ্তি। উজ্জ্বল জ্যোতির পরশ ছুয়ে দিয়েছে নতুন প্রাণ। ঈষৎ লালচে কেশগুচ্ছ বড্ড অবলীলায় চোখে লাগার মতো জ্বলজ্বল করছে। সুষমা ছড়ানো সেই সরল মুখে সৌন্দর্যের কোন কমতি নেই আজ। বরঞ্চ সেই সিক্ত মুখশ্রীর প্রতিটি প্রান্ত মাধুর্যতা ফুটে উঠেছে। নাকের উপর চিকচিক করা ক্ষুদ্র হীরক খন্ডটি যেন সার্থক সেথায় স্থান পেয়ে। এই অপার মহীমার ক্ষুদ্রতর অংশ থেকে শুরু করে সবকিছু, আজ কেন তাকে এতো করে টানছে?

কাঙ্ক্ষিত বস্তু দূরে গেলেই বুঝি তার প্রতি থাকা সেই সুপ্ত টানে প্রবল আঘাত পরে? সে জানে না এতো কিছু। শুধু বুঝতে পারছে, বক্ষের ঠিক বা পাশে এক সূক্ষ্ণ ব্যথা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। বড় ধরনের ব্যঘাত ঘটেছে তার শ্বাসক্রিয়ায়। হঠাৎই সব কেমন যেন জাগতিক অনুভূতির উর্ধ্বে গিয়ে ঠেকলো! তবুও সম্মুখ দৃশ্য থেকে মনোযোগ সরলো না এক বিন্দু। খুবই নিবেশ সহকারে দেখে গেলো, সেই অপরূপাকে। সবুজ কাতান শাড়িতে তার সুপ্ত রূপের বাহার আজ সদর্পে, মাথা উচিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছে। প্রকৃতির এই জীবন্ত রঙ, এই আর্দ্র মিহি ত্বকে ভেসে ওঠা দ্যুতির কারণ। রমনী সে যখন দ্রুত হাতে, তোয়ালে হাতে চুল ঝাড়লো তখন সেই বিন্দু পানির ছটা গিয়ে পরলো, ধ্যান জ্ঞান হারানো প্রেমিক পুরুষের মুখের উপর। মোহে ডুবে থাকা তাবিবের এবার বোধদয় হলো বুঝি। চমকে উঠে খেয়ালে এলো, প্রাপ্তবয়স্ক দেহের মাঝে থাকা এই হৃদয়টা খুবই অবুঝ হয়ে উঠেছিল খানিকক্ষণ পূর্বেই। তবে আফসোস হলো না একটুও। প্রিয়তমার মনোহারী লাবণ্যতার চাক্ষুষ সাক্ষী কে-ই বা না হতে চায়? মুচকি হাসির রেখা অজান্তেই ছড়িয়ে পরে ঠোটের কোনে।

সলজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে নিতেই, আচমকা নিবৃতা ঘুরে দাঁড়ায়। তৎক্ষনাৎ নজরে আসে তাবিবকে। যে নজর হারিয়ে, নিবৃত্তে দাড়িয়ে আছে। ঠিক এই ঘরেরই অভিমুখে। কোথায়? ক’দিন আগেও তো, যেখানে নিবৃতা একা থাকে সেখানে আসার আগে সে অনুমতি চাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। অধিকার আদায় করে, নিবৃতাকে মৃদু জ্বালাতন করতে পছন্দ করতো। স্বচ্ছ কাঁচের আড়ালে থাকা তীক্ষ্ণ নয়ন যুগলে স্পষ্ট হয়ে ওঠা সরল অনুভূতি মেলে, সরাসরি নিবৃতাকে দেখতো। সেগুলো তাহলে আজ হারিয়ে গেলো? কেন? নিবৃতার সেই অতীত কি এতেটাই ঘৃণ্য? অথচ দোষ তো নিবৃতার ছিল না। তাহলে কেন ওকে শাস্তি পেতে হচ্ছে এভাবে? লোক চক্ষুর আড়ালে থাকতে পছন্দ করা এই ঘরকুনো নিবৃতার, সামনে থাকা মানুষটার বিশেষ মনোযোগ ছাড়া যে চলছে না! কেন এমনটা হচ্ছে ও নিজেও জানে না৷ কয়েক মাস আগে এরকমটা হলে হয়তো, এই মনটায় স্বস্তি মিলতো, কিন্তু আজ অন্তঃপটে অশান্তির প্রলয় উঠেছে। মন খারাপেরা মেলা বসালো সেই বোকা মুখে। চোখের দৃষ্টি কাতর হয়ে আসতেই তাবিব চাইলো। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললে, অজানা ভয়ে নজর চুরি করলো তাবিব। সেই সর্বনাশী ডাগর আঁখি যুগলের মায়ায় পরে গেলে অনর্থ হয়ে যাবে যে! ও মুখে হাত চেপে মৃদু গলা খাঁকারি দিলো।

– তানহা বললো, ও আমার পাওয়ার ব্যাংকটা নিয়ে এসেছিল গতকাল রাতে। ওটা দাও তো একটু।
নড়বড়ে কণ্ঠস্বর। কাঠিন্যতার বড়ই অভাব। যেন নিজেকে সামলে রাখার প্রচেষ্টা। কিন্তু নির্বোধ নিবৃতা তো ওতোসতো বুঝে না। ও মুখটা শুকনো করে, পাওয়ার ব্যাংক খোঁজায় মনোযোগ দিলো। অথচ সেখানে সুবিধা বুঝে, নিবৃতার দৃষ্টির আড়ালে, তাকেই মুগ্ধ হয়ে দেখে চললো তাবিব। নিবৃতাকে দেখে ওর প্রেমের তৃষ্ণা মিটছে না। মনে হচ্ছে এই মন জমিনে প্রবল খরার উদ্ভব হয়েছে। এর নিবারন সহজে হবে না। খানিক বাদে, নিঃশব্দে, কোন কথা না বলেই, নিবৃতা এগিয়ে দিয়েছে পাওয়ার ব্যাংকটা। তাবিবের এই নীরব আচরণে যে একজন বেশ রুষ্ট রয়েছে সাথে দ্রুততার সাথে বাড়ছে তার অভিমানের পাল্লার ওজন, সেটা তাবিব জানে। কিন্তু কিছুই যে করার নেই। অবশেষে পাওয়া গিয়েছে কাঙ্ক্ষিত বস্ত, সাথে মিলেছে তাবিবের তার অভিমানিতা এবং স্বয়ং নিজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা। কোনমতে সেটা হাতে নিয়ে ছুটে বেড়িয়ে গেলো সে। কদমে অত্যন্ত তাড়া। অথচ দুঃখী রমনীর কাছে সেটা মনে হলো স্পষ্ট, নিষ্ঠুর অবজ্ঞা!

সফেদ রঙা পাঞ্জাবিতে শ্যাম বর্ণের তাবিবকে ভীষন নজরকাড়া লাগছে। সুদীর্ঘ, সৌষ্ঠব অবয়বে এই পোশাকটা বেশ মানায় তাকে। সুপুরুষ গড়নটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে যেন।
– হ্যান্ডসাম!
আয়ানার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিচ্ছিলো তাবিব। তখনই পাশ থেকে আসা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সে। দরজার সম্মুখে তানহা দাঁড়িয়ে। মুখে চওড়া হাসি৷ মেয়েকে খুশি দেখে তাবিবও হাসলো। পরনের পাঞ্জাবিটা ছুঁয়ে দিয়ে বললো,
– আসলেই ভালো লাগছে তো?
তানহা সবেগে হেটে আসতে আসতে বললো,
– টপ টিয়ার! এবার মামা তোমাকে এপ্রুভ না করে যাবেন কোথায়!
তানহা অবুঝ কেও নয়। গত কয়েক বছরে যে নিভান নামক লোকটার সাথে যে ওর বাবার কথা হয় নি, সেটা ও জানে৷ বাবা যথেষ্ট আন্তরিক মানুষ। সম্পর্কের কদর করতে জানে এবং বুঝে। তাইতো তাদের যদি একান্তই না বনে থাকে, তাহলে বিপরীত পার্শ্বে অবস্থান করা মানুষটা তাকে পছন্দ করে না। এখন কারও পছন্দের উপর তো আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না!

– তোমার মামা যে আমাকে আগে থেকেই ডিসএপ্রুভ করে দিয়েছেম, সেটা এখম তোমাকে কিভাবে বলি?
মনের মাঝে কথাটা উঠলেও তাবিব বললো না সেটা স্পষ্ট করে৷
– এই বয়সে আবার কে ইমপ্রেস হবে বলো তো।
তানহা নাক মুখ কুঁচকে বলে,
– আসলেই সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। আম্মুর মতো নিরস কথাবার্তা বলা শুরু করে দিয়েছ। দিনকে দিনকে যে আরও কতো কিছু শুনতে হবে আমাকে!
মেয়ের বিকৃত মুখ দেখে তাবিব হেসে ফেললো। তানহার নাকটা কিঞ্চিৎ টেনে দিয়ে বললো,
– পাকনি!
– তা-ও ভালো আছি।
– ঝিলমিল!

বাবার মেয়ের কথার মাঝে মা এসে হাজির। সাজগোছের বিষয়টা সবসময় এড়িয়ে গেলেও, আজ নিজ থেকেই তানহার সাহায্যে তৈরী হয়েছে নিবৃতা। লম্বা কেশ রাশি সুন্দরমতোন বিনুনীতে বাঁধা। মুখে হালকা প্রসাধনীর ছোঁয়া। পেলব ওষ্টে লালচে আভা। উদ্ভাসিত চোখের পরতে কাজলের দাগ! অতঃপর কাঁধের অপর পাশে উঠিয়ে রাখা আঁচলের শেষাংশ, তার সংসারী গৃহিণী রূপকে পূর্ণতা দিয়েছে। সরল, স্নিগ্ধ রমনী। তানজীব সরোয়ারের মিসেস! ওকে দেখেই, তাবিব আস্তে করে অন্য পাশে সরে গেলো।
– তোমার জুতো বের করে দিয়েছি। দেখো ঠিক লাগে কি না।
– থ্যাঙ্কিউ আম্মু! আমি তাহলে যাই।
এক দৌড়ে বেরিয়ে গেলো তানহা এবং তৎক্ষনাৎ ঝুপ করে নীরবতা নেমে এলো কামড়া জুড়ে। নিজেকে অযথাই ব্যস্ত প্রমানিত করতে, বেড ডাইড টেবিলের ড্রয়ারে ঘাটাঘাটি করতে শুরু করলো তাবিব৷ নিবৃতাও তাকে উপেক্ষা করে আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। তাবিবের কিনে দেওয়া বোরকাটা এখানেই রাখা৷ বিনা কারণে ড্রয়ার খুললেও, কাজের একটা জিনিস খুঁজে পেলো তাবিব। আসলে সেই তো, নিজ প্রয়োজনে, নিবৃতার হাত থেকে এদের খুলে, তাড়াহুড়োয় এখানে রেখে দিয়েছিলো। আর ফিরিয়ে দেওয়া হয় নি৷ হাতে তুলে নিয়ে উঠে গেলো সে। ঠিক গিয়ে দাঁড়ালো নিবৃতার পেছনে৷ আলমারি লাগিয়ে পিছু ঘুরতেই অবাক হলো নিবৃতা। মানুষটা এভাবে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে কেন? ও অবুঝ নয়ন তুলে তাকাতেই সোনার বালা দু’টো সন্তর্পনে এগিয়ে দিলো তাবিব।

– পরে নাও।
নিবৃতা কিয়ৎক্ষণ চুপ থেকে হাত বাড়িয়ে দিলো। তবে সেটা নেওয়ার জন্য নয় বরঞ্চ তাবিবের হাত থেকে পরে নেওয়ার জন্য। লোকটা যখন তাকে এই বালা জোড়া উপহার করেছিল তখন নিজ হাতে পরিয়ে দেওয়ার সময় বলেছিল, সবসময় পরে থাকবে। বাধ্য নিবৃতা তার অবাধ্য হয় নি মোটেও৷ কখনও খুলে রাখে নি সেগুলো আর। সেদিন রাতে তাবিব নিজ হাতে খুলে রেখেছিল। তাহলে আজ সে-ই পরিয়ে দিবে আবার। নিবৃতা কেন নিজে পরতে যাবে?।
ঘুরানো হাত দেখে এর অর্থ বুঝলেও, তাবিব অজ্ঞাত থাকার ভান করলো। পুনরায় বলে উঠলো,
– নাও!
ওষ্ঠদ্বয় কেঁপে উঠলো সহসা। গুটিয়ে গেলো পরপর। নিবে না সে। একদম নিবে না এভাবে! নাকের পাটা লালচে হয়ে ফুলে উঠতেই উল্টো ঘুরে গেলো ও। তবে এগোতে পারলো না বেশি। লম্বা বিনুনিতে মাঝারি বলের টান পরেছে। হতবাক হয়ে মাথা চেপে তৎক্ষনাৎ ঘুরে যায় নিবৃতা। চোখে তার অপার বিস্ময়।

– আমার কথা শুনবে না? কিন্তু আগে তো যা বলতাম তাই শুনতে। তাহলে কি আর ভালো লাগে না আমাকে? ভালো তো বাসোই না। এখন কি পছন্দের তালিকা থেকেও বাদ পরেছি?
তাবিবের ঠোঁটে স্পষ্ট হাসি, অথচ চোখের ভাষা বড্ড বেদনাদায়ক। নিবৃতা কয়েক মুহুর্ত নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলো। এখন উল্টো তাকেই রাগ দেখানো হচ্ছে? অদ্ভুত তো। এমন কেন করছে সে?! নৈরাশায় নিবৃতার মনটা ভারি হয়ে আসে৷ চুপ করে নিজ থেকেই বালা জোড়া হাতে নিয়ে বলে,
– কেউ একজন তো বলেছিলো, আমি না ভালো বাসলেও, সে আমায় ভালোবাসে। কিন্তু এখন সেটা কেন মিথ্যে মনে হচ্ছে?
আর এক ক্ষণও নয়। বেরিয়ে গেলো সে, কিন্তু তাবিব সেখানেই নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ভালোবাসার ঠিক কতগুলো রূপ রয়েছে? প্রিয়তমার ভালোর জন্য তাকেই ছেড়ে দেওয়া, না অধিকার খাটিয়ে আটকে রাখা? ভালোবাসার মানুষটার জন্য ঠিক কোনটা সঠিক?

ফারুকী নিবাসে, সকলে অপেক্ষায় ছিল, এতো লম্বা সময় পর, নীড় ফেরা মানুষটির আশায়। শিউলির মাতৃ মন ছিল বড্ড উৎসুক। সামনাসামনি ছেলেকে দেখেন না আজ কতগুলো বছর! নীরব ছিলেন পরিবার কেন্দ্রীক পুরুষ। পরিবারের কাছে থাকা, তাদের সর্বোচ্চ সময় দেওয়াই তার কাছে সবচাইতে বেশী অগ্রাধিকার পেতো। বাকি সব কিছুই তার কাছে নগন্য। তাই তো পরিবারের মানুষ তার কাছ থেকে অঢেল ভালোবাসা পেয়েছে। সেই চেতনা থেকেই, ছেলেমেয়েকে কখনও দূরে পাঠানোর ইচ্ছে ছিল না তার। ছোট্ট নীড়ে, সকলে একত্রে শান্তির এক জীবন কাটিয়ে দেওয়া ছিল স্বপ্ন। তবে সব ইচ্ছেই তো আর পূরণ হয় না! বাধ্য হয়ে, ছেলের সুন্দর এবং নিরাপদ জীবনের আশায় সেই স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। নিভানকে যেতে হলো দূরে। এরপর কালের বিবর্ধনে, নানান প্রয়োজন ও তাগিদে, এখানে আর ফেরা হয় নি নিভানের। তবে এবার সময় হয়েছে। সকল দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটিয়ে, এবার নির্ঝঞ্ঝাট, শান্তির জীবনের আশায় ও চলে এসেছে।

দুপুরের প্রায় শেষ প্রান্তে যখন কলিং বেল বেজে উঠলো, তখন শিউলি এক প্রকার ছুটতে ছুটতেই এগোলেন। থমকানো মনে তো নিবৃতাও অপেক্ষা করছিলো ভাইয়ের জন্য। জড়তার আড়ালে থেকে শেষে সে-ও আর উপেক্ষা করতে পারলো না। তুরন্ত মায়ের পিছু পিছু গেলো একদম সদর দরজা অবদি।
মায়ের চাইতে আপন বোধহয়, এই ধরনীতে কেউ নেই। এই একজন মানুষের মাঝে ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা, বন্ধুত্ব কিংবা প্রয়োজনে শাসন ও কঠোরতা, সবকিছুই মিলেমিশে অনুভব করা যায়। যার চোখের আড়াল হলেও, কখনও মনের আড়ালে যাওয়া সম্ভব নয়। মায়ের উষ্ণতার দ্বিতীয় কোন বাহক নেই। তাইতো, শিউলিকে যখন নিজ সম্মুখে পাওয়া গেলো, তখন নিভানের মতো শক্ত সামর্থ্যবান পুরুষের তীক্ষ্ণ চোখেও নম্রতা নেমে এলো। ভিজে গেলো শুষ্ক চোখের পাতা। অপরদিকে শিউলির দু নয়ন তখন বাধ ভাঙা অশ্রুজলে সিক্ত! দৃষ্টিতে হতবিহ্বলতা, মাতৃ অনুভূতির তোরে কম্পিত কণ্ঠস্বর। মুখ ফুটে কিছু বলতেও সক্ষম হলেন না তিনি। শুধু কাঁপা কাঁপা হাতে, সৌম্য মুখকান্তি তুলে নিলেন আপন আজলায়। মন ভরে দেখলেন তার জৈষ্ঠ্য সন্তানকে। তাদের প্রতি থাকা মায়ের টানটা একটুই বেশিই হয় যে!

– কেমন আছিস বাবা আমার!
মা’কে এক পেশে আগলে ধরে নিভান। অস্ফুটে হেসে বলে,
– মায়ের কাছে এসেছি! এর চেয়ে ভালো আর থাকবো কিভাবে!
শিউলির কান্নার বেগ বাড়ে। বাস্তবে ছেলের কন্ঠস্বর শুনতে একদমই অন্যরকম! চেনাই যাচ্ছে না। নীরব ফারুকী নামক ভদ্রলোকের ছায়া মিশে আছে সেথায়।
– অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস।
নিভান মুচকি হেসে, ভ্রু নাচিয়ে বলে,
– বড় না বুড়ো?
শিউলিও হেসে উঠেন এবার। বাহুতে চাপড় মেরে বলেন,
– এখনও দাদি হতে পারলাম না, আর তুই এসব বলছিস?
নিভানের মুখে সজ্জিত জ্বলজ্বলে হাসি, এবারে কিছুটা মিইয়ে এলো। তবে প্রত্যু্ত্তরে আর কিছু বললো না। এখন সঠিক সময় নয়। তবে ওর নজর তখনই ঠিক শিউলির পিছনে গিয়ে ঠেকলো। দরজার আড়ালে দাড়িয়ে আছে একজন। অবশ্য লুকিয়ে আছে, বললেই তার অবস্থানকে বেশি মানাবে।

– নিবু!
নিবৃতা তার নামে ডাক শুনতেই অনেকটা হকচকিয়ে গেলো। এতো সহজেই বড় ভাইয়ার নজরে পরে গেলো।
– এদিকে এসো নিবু।
নিভান ওকে কোনরূপ অস্বস্তি না দিতে, পুনরায় নরম কন্ঠে ডেকে উঠলো। তবে নিবৃতা আজ আর কুন্ঠিত আচরণ করে না। নীরব ফারুকী নামক সাহচর্য আর না থাকলেও তানহা এবং তাবিব, এই দু’জন মানুষ, ওর জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রামে কখনও হাত ছেড়ে একা করে দেয় নি। ক্রমাগত ওকে সাহস জুগিয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি ফুটিয়ে, নিবৃতা বেরিয়ে এলো। চোখে চোখ রাখার মতন সামর্থ্য না হলেও, নিজ থেকেই আগ বাড়িয়ে সালাম জানালো।

– আসসালামু আলাইকুম বড় ভাইয়া।
– ওয়া আলাই কুমুসসালাম।
নিভান কিছুটা অবাক হয়েই প্রত্যুত্তর করলো, কারণ নিজের সেই ছোট বোনের এই পরিবর্তিত রূপ দেখে সে অবাক হয়েছে বেশ। ছোট্ট নিবু, সত্যিই আজ অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।
– মা’কে নিয়ে ভেতরে আসো। সেই কখন থেকে দাড়িয়ে আছো।
সদা পরিবরের যত্ন ও কড়া নজর বন্দীতে অভ্যস্ত থাকা নিবৃতা আজ অন্যের খেয়াল রাখছে। উদাসীনতা ভুলে আজ ভীষন পরোয়া করা শিখেছে। নিভানের ভালো লাগলো। তবে এই পরিবর্তন স্বেচ্ছায় না জীবনে আসা নতুন সদস্যদের চাপে, সেটা তো সময়ই বলে দিবে। নিভান এগিয়ে এসে নিবৃতার মাথায় আদুরে ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে দিলো।
– আমার নিবুটা কেমন আছে?
চোখ নামিয়েই স্বচ্ছ হাসলো নিবৃতা। নরম সুরে বললো,
– খুব ভালো। আলহামদুলিল্লাহ।
সেই মুক্ত হাসিতে প্রাণ ছিল। অথচ নিভানের মনে নেই, বিষাক্ত সেই ঘটনার পর নিবৃতাকে কখনও এভাবে হাসতে দেখেছে কি না৷ হয়তো, ও কাছে ছিল না বিধায়ই।
– বড় ভাইয়া তাহলে এতেই খুশি।

পারিবারিক সেই মিষ্টি মুহুর্তে উপস্থিত থেকে কোনরূপ অস্বস্তির কারণ হতে চায় নি তাবিব। তাইতো মেয়েকে সাথে নিয়ে, বসার ঘরেই চুপচাপ বসে ছিল। অথচ তানহা এদিকে মুখ আমসে করে রেখেছে। ওর তো এই ছোট ছোট সুখী সুখী মুহুর্তগুলো দেখতে অনেক ভালো লাগে। বাবা কেন এভাবে, ওকে সরিয়ে রাখলো। তারাও তো এই পরিবারের অংশ। বাবাটা না মাঝেমধ্যে একটু বেশি বেশিই ভেবে বসে থাকে। জীবনে এতো সচেতন হলে হয়? মানুষের সাথে মিলেমিশে, হাসি ঠাট্টা করে, আপনজন তৈরী করাতেই তো এ জীবনের স্বার্থকতা। এরূপ বেরসিক পুরুষের কন্যা যে এই চটপটে তানহা কীভাবে হলো, সেটাই মাঝে মাঝে মাথায় খেলে না ওর! এরই মধ্যে সেখানে নিভানদের আগমন ঘটে। মা এবং ভাইবোন, তিনজনের মুখের সুখের আলোকচ্ছটা। দৃষ্টিতে উষ্ণতা স্পষ্ট। তাবিব ও তানহা ভদ্রতার খাতিরে দাঁড়াতেই নিবৃতা ঝটপট এগিয়ে এলো। তানহাকে পাশ থেকে বগলদাবা করে নিয়ে গেলো নিভানের সম্মুখে।
– আমার মেয়ে, তানহা বিনতে তানজিব সরোয়ার।

মুখে বিস্তৃত গর্বের হাসি৷ চোখের অম্লান চকচকে ভাষা। যেন মা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে পেরে নিবৃতার এই বিশেষত্বহীন জীবন ভীষন করে স্বার্থক। যেন ছোট বাচ্চাদের মতোন, বড় ভাইয়ের কাছে নিজের আদুরে পুতুল তুলে দেখাচ্ছে। অবশ্য তানহা পুতুলের চাইতে কম কিসের। মায়ের কাছে শুনেছে, নিজের মেয়েকে অঢেল মায়া এবং যত্নে লালন করে নিবৃতা। নিবুর অন্যতম খুশির কারণ। নিভান আবারও হাসলো। একদিনেই এতো হাসছে অথচ বিগত বছরগুলো কেমন শূন্যতায় ঘেরা ছিল!
– আমার মামাটার কি খবর?
তানহা ঝলমলিয়ে হাসলো। সলজ্জিত হয়ে বললো,
– ভালো। আপনি কেমন আছেন মামা?
– প্রথমে মা এরপর বোন আর এখন মিষ্টি একটা ভাগনি! ফিলিং ট্রিপল হ্যাপি।
– এখনই যোগ করবেন না। বাবা এখনও বাকি আছে। তাহলে কোয়াড্রাপেল হয়ে যাবে তো।
তানহার কথায় বাকি সবাই ক্ষীণ হেসে উঠলেও নিভাম সূচালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো তাবিবের পানে। তাবিবও অনমনীয় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিল। নজরে নজর পরতেই এগিয়ে এলো সম্মুখে। করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

– গুড টু সি ইউ ভাইয়া।
তীর্যক হেসে তাবিবের হাতে হাত মেলালো নিভান। আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ ভ্রাতৃত্ব বন্ধন দেখালেও, সেখানে জোর ছিল অপার কাঠিন্যতার। ব্যথায় তাবিবের ভ্রু সামান্য কুঁচকে এলো। এতেটা কঠোর ব্যবহার কি তার সত্যিই প্রাপ্য? নিভানকি অযথাই ওর সাথে অতিরিক্ত রূঢ় আচরণ করছে না?

নিবৃতা পর্ব ৩০

– জাস্ট কল মি নিভান।
ঠোট চেপে কথাটি বলে উঠলো নিভান। তাবিবের কাছ থেকে ভাইয়া ডাক শুনতে মোটেও আগ্রগী নয় সে। মন থেকে সায় আসে না একদমই৷ তাবিব আস্তে করে নিজের হাতটা। আবারও শীতল অপমান। ওর বোধহয় আজ আসাটা ঠিক হয় নি। কারোও বিরক্তির কারণ হতে চায় না ও। দ্রুতই এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা খুঁজতে হবে।

নিবৃতা পর্ব ৩২