নিবৃতা পর্ব ৩৬
নেহার ছায়ালিপি
চারপাশে রাতের নিস্তব্ধতা। নিশুতি প্রানীর ম্লান ডাক সেই নীরবতার গহীনে একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। গভীর রজনি নেমে আসলে, এখনও হালকা হালকা শীত অনুভূত হয়। গহন আধারে প্রহেলিকাময় সাদাটে ধোয়ার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। প্রকৃতি থেকে এখনও যে বসন্ত বিদায় নেয় নি৷ নিত্য ব্যস্ত দিনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অধিকাংশ মানুষই এখন বিশ্রামে মত্ত। সেরকমই তাবিবের জন্যও আজ এক ক্লান্তিময় দিন ছিল। এই লম্বা দিবসের পরিসমাপ্তিতে এখন বড্ড পরিশ্রান্ত লাগছে। চোখের সম্মুখে ভাসছে কিছু অপ্রীতিকর মুহুর্ত, যেগুলো ক্ষনে ক্ষনে ওর মনকে অস্থির করে তুলছে! শতবার চেয়েও ক্রমে টালমাটাল হয়ে ওঠা চিত্তকে বাগে আনতে পারছে না ও। কোন রকমে অবসন্ন দেহ টেনে ফ্ল্যাটের কাছে এলো ও। অভ্যাসানুযায়ী কলিং বেল পর্যন্ত হাত উঠেও থেমে গেলো মাঝপথে। নিবৃতাকে অপেক্ষা করতে বারন করে এসেছিল ও। নিশ্চয়ই কথার বরখেলাপ হয় নি। ঘুমন্ত মানুষদের নিদ্রায় ব্যাঘাত না ঘটাতে মানিব্যাগ ঘেঁটে চাবি বের করলো ও। অতঃপর আস্তেধীরে অন্দরে প্রবেশ করতেই চোখ যায় ডাইনিং টেবিলে, যার উপর মাথা এলিয়ে ঘুমে বিভোর এক অপেক্ষাকৃত রমনী। অবসাদগ্রস্ত মনে সুখমিশ্রিত লিলুয়া বাতাস বয়ে গিয়ে ক্লান্ত মুখে হাসি ফুটলো তৎক্ষনাৎ। এখন থেকে হয়তো, তাবিবের দেওয়া কিছু কিছু আদেশের অমান্য ঘটতে দেখা যাবে কারণ অপর পক্ষ যে নতুন নতুন সাহস জুগিয়েছে! অবশ্য এই অবাধ্যতায় বরঞ্চ তাবিবের মনটা যে শীতলই হবে, সেটা ও ভালো করেই জানে। কাছে এগিয়ে যায় সে। ওড়নার ঘোমটা খসে উন্মুক্ত হওয়া কেশরাশির অভ্যন্তরে হাত গলিয়ে দেয় তাবিব। আদুরে গলায় ডাকে,
– নিবেদিতা!
খুবই ক্ষীণ সেই স্বর, তবুও নিবৃতা চট করে সজাগ হয়। ঘুম ছুটে যাওয়া ফুলো ফুলো চোখে তাকিয়ে ধীর গতিতে প্রস্ফুটিত পুষ্পের ন্যায় এক মিষ্টি হাসি উপহার দেয়।
– তোমাকে অপেক্ষা করতে নিষেধ করে গিয়েছিলাম না?
নিবৃতা চোখ নামায়। ধীর লয়ে বলে,
– আপনি কি রাগ করেছেন?
নিবৃতার মনে হয়েছিল মানুষটার জন্য প্রতিক্ষার প্রহর গুনলে সে সন্তুষ্ট হবে৷ এজন্যই তো ও বসেছিল৷ চুলের ভাজ থেকে পৌরুষ হাতটা সরে এসে জায়গা করে নেয় উষ্ণ কপোলে, পরপর সেটি আদুরে ভঙ্গিতে মৃদু বলে টেনে দিয়ে শুধায়,
– উহুম.. খুশি হয়েছি।
জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে সে তাকালেই তাবিব আবার বলে,
– তবে সবসময় এমন বিশেষ ব্যবহার পেলে তো অভ্যাস হয়ে যাবে।
নিবৃতা চোখ পিটপিট করে চায়, না বোঝার ভঙ্গিমায় বলে,
– অভ্যাস হলে সমস্যা কোথায়? খারাপ কিছু তো না।
– ভালো বলছো তাহলে?
নিবৃতা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
– হ্যা।
– আচ্ছা, তুমি যা বলো।
সরলতায় মোড়া স্নেহপ্রবণ স্ত্রীর কথায় শান্ত হয়ে তাবিবের দৃষ্টি যায় টেবিলে সাজিয়ে রাখা খাবারের দিকে। তড়িৎ কিছু একটা মাথা আসতেই নজর চলে যায় স্বীয় হাতের উপর। ওমনি চোখমুখ বিকৃত হয়ে আসে খানিকটা। র/ক্তের ছোঁয়া ওর জন্য নতুন নয়, তবে আজকেরটা সম্পূর্ণ বিপরীতই ছিল। কন্ঠতালুতে জেগে ওঠা ঘৃণা টুকুন বহু কষ্টে গলাধঃকরণ করে বলে,
– খেয়েছ তুমি?
– হ্যা। ঝিলমিল জোর করছিলো অনেক।
– আচ্ছা, এগুলো গুছিয়ে চলে এসো।
– আপনি খাবেন না?
সারাদিনের ঝক্কিতে পেটে তুমুল ক্ষুধা, তবে সেই রুচি এখন হারিয়ে গিয়েছে। ও মিথ্যে বলে,
– ক্ষুধা নেই। তুমি এসো, আমি ফ্রেশ হতে যাই।
তাবিব চলে যেতেই নিবৃতা ছোট মুখ করে বসে থাকে। কি হলো আচমকা!
সিক্ত চুল মুছতে মুছতে ঘরে প্রবেশ করতেই চোখ পরে বিছানার উপর। স্নিগ্ধ চেহারায়, মিষ্টি আলোড়ন বিছিয়ে, প্রিয় একজন তারই অপেক্ষায় চেয়ে আছে। হাতে খাবারের থালা। এই যত্ন, এই জেদ, এই অধিকার ফলানোর মতো সহজ স্বাভাবিক আচরন, এগুলোই তো তাবিবের কাম্য ছিল। যা অবশেষে মিলছে। সেগুলো ঠিক এতোটাই মিঠা যে হৃদয় আনাচে কানাচে ভরপুর হয়ে উঠছে অল্পতেই। তাবিব ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নিবৃতার পাশে বসে।
– খাবো না বলেছিলাম তো।
নিবৃতা ভাতে হাত দেয়। লোকমা বানাতে বানাতে বলে,
– ক্লান্ত আপনাকে দেখে, ক্ষুধার্ত মনে হলো তাই নিয়ে এলাম।
– কি ব্যাপার বলো তো! আগে তো মুখে বললেও বুঝতে না, আর এখন চেহারা পড়েই সবকিছু জেনে যাও।
নিবৃতা কি বলবে? আগে তো আপনাকে বোঝার চেষ্টাই করি নি তাই কিছু জানতামও না? নিবৃতা জানে, ও না বললেও এর পেছনে থাকা উত্তর সম্পর্কে তাবিব সম্পূর্ণই অবগত। তাই ও আর কিছু বললো না৷ সোজা তাবিবের মুখে এক লোকমা ভাত তুলে দিলো।
একটু আগেও নিজ হাতে ভাত খাওয়ার কথা চিন্তা করে তাবিবের অভক্তি চলে এসেছিল। মনে হচ্ছিল পেটের ভেতর সবকিছু কেমন গোল গোল করে পাক খাচ্ছে। অথচ এখন? সে সকল অনুভূতি ছুটে পালিয়েছে। প্রিয় মানুষের সাহচর্যে বুঝি এভাবেই সকল মনোকষ্টে স্বস্তির বারিধারা নেমে আসে। খাওয়া প্রায় শেষের পর্যায়ে আসতেই নিবৃতা বলে উঠলো,
– একটা কথা বলি?
নিচু স্বরে অনুমতি চাওয়ার আভাস। মুখের আদলে কেমন যেন এক দুঃখের ছটা।
– এক হাজারটা বললেও, কখনো অনুমতি নিতে হবে না। মনে থাকে যেন।
– আচ্ছা।
– এখন শুনি।
আরেক লোকমা ভাত তুলে দিয়ে নিবৃতা এক শ্বাস ছাড়লো। দুঃখী গলায় বললো,
– বড় ভাইয়া, ভাবিকে তালাক দিয়েছেন।
তাবিব ভ্রু উচিয়ে চাইলো। এরূপ কিছু শোনার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
– কি বললে?
নিবৃতা উঠে গেলো। কিয়ৎক্ষণ পর, তাবিবের জন্য এক গ্লাস পানি হাতে ফিরে আসলো।
– ভাইয়া ভাবির বলে অনেক দিন যাবতই বনিবনা হচ্ছিল না। তারউপর ভাবি আমার সাথে যা করেছেন, সেটা নিয়েও ভাইয়া অনেকটা অসন্তুষ্ট ছিলেন। কথা বলা পরও বলে ভাবির মাঝে কোন অনুতাপ ছিল না। তাই গতকালই মৌখিক তালাক হয়ে গিয়েছে তাদের।
তাবিব সবটা শুনে চুপ রইলো। অপেক্ষা করলো নিবৃতার কিছু বলার।
– সব দোষ আমার তাই না? আমি আসলেই শুধু ঝামেলা ঘটাই। কাওকে শান্তিতে থাকতে দেই না।
– কিসব বলছো আবার? মানা করেছি না?
তাবিবের গলার স্বর ভারি শোনালো। নিবৃতা তৎক্ষনাৎ নতজানু হয়। দু হাত কচলে ফের বলে,
– আমি সেভাবে বলতে চাই নি৷ কিন্তু আমার এই বিষয়টা না থাকলে তো তাদের মাঝে এতো ঝামেলা হতো না। বাদবাকি ছোট ছোট সমস্যাগুলো সমাধান হয়ে যেতো।
– তোমার ভাইয়া কি অবুঝ কেউ? নিজের ভালো খারাপ কি উনি বোঝেন না?
তাবিবকে বেশ খানিকটা রাগান্বিত লাগলো। নিবৃতা এ যাত্রায় চুপ হয়ে গেলো। ও আসলেই নির্বোধ। কথা গোছাতে জানে না এখনও। দিলো তো লোকটার মেজাজ খারাপ করিয়ে!
– একজন মানুষ, যে জেনেশুনে অন্যের সাথে অন্যায় করে, নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য একের পর এক মিথ্যে বলে, অশান্তি ঘটায় এবং দুর্বলকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটে। আর এসবের পরেও দিনশেষে তার মাঝে কোন অনুশোচনাও থাকে না৷ এমন একজন মানুষকে তোমার ভালো লাগবে?
– সে তো ভালো না। খারাপ মানুষকে কেন কেউ পছন্দ করবে?
– তাহলে? তুমি কি চাও রত্নার মতোন একটা নিচু মনমানসিকতার মানুষ তোমার বড় ভাইয়ার জীবন সঙ্গিনী থাকুক? তোমার ভাইয়া কি এসবের যোগ্য? ভালো কিছু কি তার প্রাপ্য নয়?
এখন আর নিবৃতা কিছু বলতে পারলো না। বাস্তবতা ওর বুঝে আসছিলো তখন।
– আর নিভান ভাইয়া একজন বুঝদার মানুষ। অবশ্যই এতো বড় সিদ্ধান্ত উনি ভেবেচিন্তেই নিয়েছেন।
নিবৃতা মাথা নেড়ে বললো,
– জ্বি।
– ভাগ্যে না থাকলে কোনকিছুই টেকসই হয় না। হয়তো নিভান ভাইয়া আর রত্না ভাবিও একে অপরের জন্য নয়। এই বিচ্ছেদই তাদের জীবনে নতুন পথ উন্মোচন করবে। আমার সংসারও তো থাকে নি৷ তার মানে কি এই নয় যে আমি ভালো নেই? অবশ্যই ভীষন সুখী। আর সেও তো তার নতুন সংসারে ভালো আছে অনেক। তাই বলছি, ভাগ্যে আস্থা রাখার পাশাপাশি নিজেকেও চেষ্টা করে যেতে হয়।
তাবিব এমনিই বোঝানোর জন্য বলছিলো, তবে বোকা নিবৃতার মস্তিষ্ক আজ একটু দ্রুতই চললো যেন।
– আপনি কিভাবে জানলেন, সে নতুন সংসার গড়েছে এবং ভালোও আছে?
আচমকা এ কথায় তাবিবের ভাবনার তাল কেটে গেলো। অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
– কি? কার কথা বলছো?
নিবৃতা এক হাত এগিয়ে এলো। তাবিবের একদম কাছাকাছি। তাগিদ দিয়ে বললো,
– সে, সে। আপনার প্রাক্তন, মনে হয়।
কথায় সামান্য তেরছা তেজ মেশানো রয়েছে। তাবিবকে কিঞ্চিৎ হতবিহ্বলতা জেঁকে ধরলো। ভাঙা সুরে বললো,
– হ্যা বিয়ে করেছ তো আবার। দুটো বাচ্চাও আছে।
নিবৃতার চোখের দৃষ্টি সরু হয়ে এলো।
– আপনি কিভাবে জানলেন?
– দেখা হয়েছিল একবার।
– কোথায়?
– অস্ট্রেলিয়ায়
নিবৃতা বিস্ময় নিয়ে বলে,
– আপনি না সেখানে কাজ করতে গিয়েছিলেন?
তাবিব অপ্রস্তুত হেসে বললো,
– হ্যা।
– তাহলে দেখা হলো কখন?
প্রশ্নগুলোর ধরন তাবিবের নিকট কৌতুকের ন্যায় ঠেকলো। ধেয়ে আসা হাসির ঝংকার দমিয়ে রেখে বললো,
– কলিগরা মিলে ক্যাফেতে গিয়েছিলাম। সেখানেই হঠাৎ দেখা হয়েছিল।
সব বুঝে নিয়েছে এমন ভঙ্গিমায় মাথা নেড়ে নিবৃতা সরে এলো সামান্য। পেলব ঠোঁট দুটো গুটিয়ে রাখা, যার অর্থ খুবই গোপনে সে কিছু একটা ভেবে চলেছে। তাবিব নিবেশিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,
– কোন সমস্যা?
– না।
– তাহলে?
অবুঝ গোল গোল নয়ন যুগলে জিঘাংসার বসবাস। মিহি কন্ঠ তার ভাবুক গলায় বলে উঠলো,
– আপনার জীবনে প্রতিনিয়ত কি কি হয়, তার কিছুই তো জানি না আমি৷ সারাদিন বাহিরে থাকেন। কতো কিছুই না হয়!
মনোযোগী নজরে এবার ঝলকে উঠলো। নতুন উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,
– তুমি জানতে চাও?
নিবৃতা উৎফুল্ল স্বরে বলে,
– হ্যা হ্যা।
তাবিব একদম তৈরী হয়ে বসলো, যেন গুরুত্বপূর্ণ কোন প্রশ্নোত্তর পর্ব চলবে এখন৷ পীঠ টানটান করে, মস্তিষ্ক পরিষ্কার করে বলে উঠো,
– বলে ফেলো।
অনুমতি পেতেই আগ্রহী নিবৃতা আরও এগিয়ে এলো। তাবিবের হাত আঁকড়ে ধরে বললো,
– তাহলে সেদিন ক্যাফেটেরিয়াতে, আপনার প্রাক্তনের সাথে কি কি বিষয়ে কথা হয়েছিল? আমার না খুবই শুনতে ইচ্ছে করছে!
নরম কন্ঠ তার নিষ্পাপ আদুরে শোনায়। অথচ মনের মাঝে তখন হিংসার সূক্ষ্ণ দানা বাঁধছে। তাবিব হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে। স্ত্রী আার যতই সহজ সরল বোকা হোক, নারীজাতি ঘুরেফিরে একই বৈশিষ্ট্য ধারন করে তাদের মাঝে! পরনারীর ক্ষেত্রে স্বামীকে নিয়ে তাদের এই অতিরিক্ত অধিকারবোধ ও সংবেদনশীলতা কখনোই বদলাবে না৷ তাবিব দন্ত কপাটি মেলে হেঁসে ফেললো। সাথে এক নির্মল শান্তি বয়ে গেলো অন্তঃস্থলে। নিবৃতা তাকে নিয়ে এখন হিংসেও করে! ব্যাপারটা অসাধারণ।
এদিকে তাবিবকে হঠাৎই হাসতে দেখে বেকুব বনে গিয়েছে নিবৃতা। হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে থাকতেই তাবিব তাকে জাপ্টে ধরলো এক প্রকার। পরপর দু’জনেই থপ করে পরলো বিছানায়। নিবৃতার পীঠ গিয়ে ঠেকলো নরম গদিতে। ওর কেন যেন তাবিবের এই হাসিটা বিরক্ত লাগছে। সুপ্ত রাগে কান গরম হয়ে আসছে। অথচ ও বুঝতে পারছে না এমনটা কেন হচ্ছে!
নিবৃতার পরিবর্তিত মুখে আদল দেখে তাবিব নিজের হাসিকে বহু কষ্টে সামাল দিলো। মেয়েটার শুভ্র রঙা সরু নাকের অগ্রভাগ একদম টমেটোর মতো লালচে হয়ে ফুলে এসেছে! নাসারন্ধ্র কিছুটা প্রসারিত। চোখের মনি জোড়া স্থির। সাহেবা কি তাহলে রাগ করেছেন? তাবিব চোখে হাসলো। পরপর আচমকা মুখ নামিয়ে নরম চুমু খেলো আরক্তিম নাকের উপর। হঠাৎ এরূপ কাজে নিবৃতা বিস্ময় নিয়ে চাইলো। তাবিব সরে আসতেই আপনা আপনি হাত চলে গেলো নাকের উপর। তাবিব দেখলো সেই হতবাক মুখশ্রী। মনে মনে বেশ আনন্দ পেলো এতে! ফের মুখ নামিয়ে চলে গেলো কানের কাছে। কর্ণধারে ওষ্ঠ ছুয়ে ফিসফিস করে বললো,
– মিসেস তানজিব কি সত্যিই জানতে চান, আমাদের মাঝে কি কথা হয়েছিল?
নিবৃতা কথা কি বলবে, এক অদ্ভুত অনুভূতিতে গ্রাসিত হয়ে তখন ওর চেতনা হ্রাস পাচ্ছে। ভেতরটা প্রকম্পিত হচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে। চোখের পাতা আবেশে জড়িয়ে আসছে। তিরতির করে কাঁপছে সেগুলো। তবুও তাবিবের অবাধ্য হতে মন চাইলো না। মদিরা গলায় বললো,
– জ্বি। জানতে চাই।
– তার আগে আমি অন্য কিছু বলতে চাই।
– জ্বি।
– তার সাথে কথা বলার পরপরই তোমাকে কল দিয়েছিলাম আমি। প্রথমবারের মতো অবিশ্বাস্যকর এক অনুভূতির স্বীকারোক্তি দিয়েছিলাম তোমার কাছে।
– কি সেটা?
তাবিব চাইলো মোহনীয় দৃষ্টিতে। সে কি ভীষন অনুরাগ সেথায়! নরম চোখ দুটোতে মনের সকল প্রেমের পসরা সাজিয়ে যেন নিবৃতাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে সে। তাবিব লহু নিনাদি স্বরে আওড়ালো,
– মিসেস তানজিব, আপনাকে আমি ভালোবাসি। একটু বেশিই বাসি।
এই একটি শব্দ নিবৃতা যতবার শুনে, নিজেকে ততবারই স্বার্থক মনে হয়। জীবনে সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত আসায় নিজেকে ভাগ্যবতী লাগে৷ হৃদয়ঙ্গম অনুভূতির প্রকাশ মাত্রই, পুষ্প নরম ওষ্ঠপুট ঘেঁষে লাজুক হাসি ছড়িয়ে পরেছে। অক্ষি পল্লব সেঁটে হয়েছে বন্ধ। প্রেমিকের ঘাতক নজর দেখলো সবটা! মনে জাগলো সেই মূল্যবান হাসি টুকুন একটুখানি ছুঁয়ে দেওয়ার ইচ্ছে৷ অনুমতি তো সে কবেই মিলেছে। নিজেকে ফেরালো না ও। নিবিড় সান্নিধ্যে জড়িয়ে মনের সাধ পুরন করে তবেই ক্ষান্ত হলো!
দুপুরের খাবার বিরতি তাবিব কাজ থেকে একটু বিরতি পেলো। এর মাঝে মনটা আরেকটু ফুরফুরে হওয়ার জন্যই বাড়ি থেকে নিবৃতার পাঠানো টিফিনবাক্সও চলে এসেছে। এই চমকে তাবিবের খুশি একটু বেশিই জোড়ালো হলো। ঝটপট আদুরে স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে, সেই বাক্স নিয়ে সোজা হাটা ধরলো এনাম মাহমুদের কেবিনে। ব্যক্তিগত ঝামেলায় স্যারের সাথে আর কথা বলার সুযোগ হয়ে উঠে নি। আজ নাহয় আড্ডাও দেয়া হবে সাথে তাবিব কিছু সাহায্যও চেয়ে নিবে।
এনাম মাহমুদ কেবিনেই ছিলেন। তাবিবের হঠাৎ আগমনে তাকে খুশি হতেই দেখা গেলো। চমৎকার হেসে তাবিবকে স্বাগত জানালেন তিনি।
– মাই বয়! তোমাকে তো দেখাই যায় না ইদানীং।
তাবিবও পাল্টা হাসলো। হালকা দম ছেড়ে বললো,
– ব্যস্ততা পেয়ে বসেছিল স্যার। কিন্তু আপাতত সবটা একটু শান্ত।
– আজ এ রাস্তায় যে?
তাবিব হাত উচিয়ে দেখালো বড় বাক্সটা। এনাম অবাক হয়ে বললেন,
– তোমার ওয়াইফের হাতের রান্না বুঝি?
– জ্বি স্যার।
– তাহলে তে আজ জমেই যাবে!
এনাম উৎসুক গলায় পিওনকে খাবার সাজিয়ে দেওয়ার জন্য ডাকলেন। সবকিছু গোছানো হতেই তারা খেতে বসলেন। নিবৃতা দারুণ আয়োজন করে সব পাঠিয়েছে। অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। খাবারের প্রথম লোকমা তুলতেই এনাম প্রসন্ন হলেন। চওড়া হেসে বললেন,
– মারভেলাস!
তাবিব গর্বিত হাসলো। একসময়কার সামান্য চুলো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকা মেয়েটার রান্না হাত এখন একেবারে পাক্কা এবং পটু! অসাধারণ রাধুনি!
– থ্যাংক ইউ স্যার।
এনাম খেতে খেতে বললেন,
– এমন রান্না বারে বারে খাওয়ার জন্য আত্মীয়তা করতে হয়, বুঝলে তাবিব!
এভাবেই নানান কথাবার্তায়, অসাধারণ স্বাদ উপভোগ করে তাদের খাবার পর্ব শেষ হলো। বড্ড তৃপ্তি নিয়ে খাওয়ায় এনাম তখন বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।
– তোমার ওয়াইফ উপহার পাওয়ার যোগ্য। তার পাওনা রইলো আমার কাছে।
– স্যার এসবের কোন প্রয়োজন নেই।
– উহুম! বিয়েতেও কিছু দেই নি৷ এবার উসুল করে দিতে হবে একেবারে।
তাবিব হাসলো তার প্রেক্ষিতে। তবে নিজের প্রয়োজনও এবার আর লুকালো না।
– স্যার, আপনার কাছে একজন এক্সপেরিমেন্সড সাইকোলজিস্টের রিকমেন্ডেশন চেয়েছিলাম।
এনাম মনে পরার ভঙ্গিতে বলে উঠেন,
– হ্যা হ্যা। আমি দেখেছি। তোমাকে নিজ থেকে বলবো বলেও সে সুযোগ আর হয় নি। শুনো তাবিব,
– জ্বি স্যার।
– যাকে পেয়েছি উনি একজন লেডি। ঠিক আছে না তোমার ওয়াইফের কম্ফোর্টের জন্য?
– ইয়েস স্যার। পারফেক্ট!
– এই তো পাশেই। নিজস্ব ক্লিনিক। সেখানে যাও। কয়েকটা সেশন এটেন্ড করাও। যদি মনে হয়, নাহ! আরও ভালো লাগবে তাহলে আমাকে জানাবে৷ আমি বিদেশি ডাক্তারের খোঁজও করেছি। অনলাইন সেশনে তারা ইন্টারেস্টেড!
তাবিব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো।
– থ্যাংক ইউ সো মাচ স্যার।
– ডোন্ট মেনশন ইট।
এনাম সোজা হয়ে বসলেন। মুখের ভাব ভঙ্গিমা কিছুটা গম্ভীর এবারে। সাবধানী গলায় বললেন,
– তোমাদের মধ্যকার সমস্যার সমাধান হয়েছে তাবিব? তোমার শশুড়ের বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছে?
এ প্রশ্নের সাপেক্ষে তাবিবের মুখের আদলও বদলে এলো চোখের পলকে। দৃপ্ত গলায় বললো,
– জ্বি স্যার। উনি মৃত। কয়েক বছর পূর্বে স্বাভাবিকভাবেই গত হয়েছেন তিনি৷
এনাম তবুও পুরোপুরি সন্তুষ্ট হলেন না। আগ বাড়িয়ে বললেন,
– তার অতীত কোন সমস্যার সৃষ্টি করবে না তো তোমার জন্য?
তাবিব অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো,
– আমি তার কৃতকর্মের জন্য গর্বিত স্যার।
এরূপ কথাটি এভাবে অকপটে বলায়, এনাম পুরোপুরি চুপ রইলেন। আর কিছু বলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিলেন না। তন্মধ্যে তাবিব আবারও নির্মল সুরে বলে,
– জাকির সরোয়ারের মতো কেবল নামমাত্র জন্মদাতার ভিড়ে কিছু কিছু নীরব ফারুকীর মতো পিতাও থাকেন স্যার, যারা সন্তানদের জন্য নিজ জীবনকে উৎসর্গ করতে কখনো পিছপা হন না।
এক পিতার ত্যাগ তিতিক্ষার উপর কি আঙুল ওঠানো উচিত হবে? কখনও নয়। এনাম কিছু বলার জন্য খুঁজে পেলেন না।
– দোয়া করবেন স্যার, আমিও যেন তার মতো আমার মেয়েটার জন্য এক আদর্শ বাবা হতে পারি।
তাবিবের মনোভাবের উপর প্রশ্ন তুলবেন না এনাম। ছেলেটার শিক্ষার উপর সম্পূর্ণ আস্থা আছে তার। উনি প্রশস্ত হাসলেন।
– তোমাকে নির্ভার দেখে আজ নিজেকে অনেক হালকা লাগছে তাবিব। সবসময় এভাবেই ভালো থাকো।
– ধন্যবাদ স্যার।
– আজ আমারও তোমার কাছে কিছু চাওয়ার আছে।
এনামের মুখশ্রীতে ক্ষীন আশার ছটা দেখা গেলো। তাবিব শ্রদ্ধাশীল কন্ঠে বললো,
– জ্বি স্যার। আমার অধীনে থাকলে অবশ্যই সর্বাত্মক চেষ্টা করবো।
– তোমার বেলায় তো দেরী হয়ে গিয়েছে কিন্ত তোমার মেয়ের বেলায় সেই ভুল আর করতে চাইছি না আমি। জানি তানহা মামনি এখনও অনেক ছোট। তবুও মনের ইচ্ছেটা আর দাবিয়ে রাখতে পারলাম না৷
এনাম মাহমুদের কথার তালে তাবিবের মুখাবয়ব ক্রমশ স্থির হয়ে এলো। শুধুমাত্র চুপচাপ বসে থেকে বিনা প্রতিবাদে শুনে গেলো সবটা।
হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হাঁটছিল তাবিব। মাথায় এনাম মাহমুদের কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও উনি বলেছেন, সময় নিয়ে তাকে জানাতে, তবুও গুরুজনের চাওয়ায় গুরুত্ব না দিয়ে থাকতেও পারছে না। কি করা যায়, সেটাই চিন্তা করছিলো ও। তন্মধ্যে মোবাইলে কল এলো। অপরিচিত নম্বর। তাবিব দ্বিধা নিয়ে মোবাইল কানে ঠেকাতেই গম্ভীর গলার স্বর শুনতে পেলো।
– আমি নিভান বলছি।
এই লোক আবার কেন তাবিবকে কল করছে? আবার নিবৃতাকে নিয়ে কোন ঝামেলা বাঁধাবে না-কি? তাবিবের ভ্রু কুঁচকে এলো। এবার আর নতমুখে কিছু শুনবে না ও। সে-ও পাল্টা ভারি স্বরে বললো,
– জ্বি নিভান, বলুন।
– প্রয়োজনে কল করেছিলাম। আপনি বিজি এ মুহুর্তে?
– সমস্যা নেই, আমি শুনছি।
– এতোদিন তো দেশে ছিলাম না, তাই তেমন কোন কন্ট্যাক্ট নেই৷ আপনার কাছে ভালো কোন ডিভোর্স লইয়ারের খোঁজ আছে?
কয়েক পলের জন্য ভাবলো তাবিব৷ আছে ওর কাছে। বেশ নামকরা একজনই সে৷ ও সায় জানিয়ে বললো,
– জ্বি আছে।
– ঠিকানাটা একটু দিন।
– ভদ্রলোক আমার পরিচিত। আমি সাথে গেলে কাজ তরান্বিত হবে বলে আমি মনে করি।
– আচ্ছা, কাজ শেষে আমাকে টেক্সট করবেন। আমি চলে আসবো।
– আচ্ছা।
কথা শেষে দম দিলো তাবিব। স্বেচ্ছায় সিংহের গুহায় পা রাখলো। এখন তার সাহায্যের নামে নিজের গলায় ফাঁস না লাগলেই হয়!
পার্কিং লটেই তাবিবের অপেক্ষায় ছিল নিভান। আঁধার নেমে আসলেও চোখো তার কালো ফ্রেম এঁটে রাখা। পরনে হালকা নীল রঙা জিন্স ও সাদা পোলো টি-শার্ট। চুলগুলো জেল দিয়ে পরিপাটি করা। সুদর্শন নিভানকে এক দেখায় তার বয়স আন্দাজ করা বেশ কষ্টসাধ্য। মসৃণ ললাট, নিরেট চোয়াল ও তীক্ষ্ণ চোখ দেখলে, বরঞ্চ বয়সের সত্যিটা অপরিচিত কাওকে বিশ্বাস করানোই কঠিন হয়ে যাবে। নিভান আপাতত ড্রাইভিং সিটে তার আসন বুঝে নিয়েছে। পেশীবহুল হাত দুটো হুইলের উপর শায়িত।
গ্যারেজে ধুলো জমে থাকা পুরাতন গাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে নতুন চকচকে গাড়ি নিয়েছে সে। বোন যেহেতু এখানেই থাকছে তাহলে আর দেশ ছেড়ে যাওয়ায় কোন লাভ নেই। বাকিটা সময়, সবাই কাছাকাছি একত্রে থেকে যেতে পারলেই শান্তি। তাই দেশে ঠিকমতো নিজের অবস্থান তৈরী করতে তৎপর সে। এরই মাঝে জানালায় করাঘাত হতেই নিভান ধ্যানচ্যূত হয়। তাবিব উঠে এসে বসেছে।
– হোপ আ’ম নট বিয়িং আ ট্রাবল।
ইঞ্জিন চালু করতে করতে নিভান বলে উঠতেই তাবিব কাষ্ঠ হাসলো।
– ইটস নো বদার, নিভান।
– ইউ ক্যান কল মি ভাইয়া।
শান্ত কণ্ঠস্বর। ছোট একটি বাক্য, তবুও গভীর মর্মার্থ ধারন করা ভারি শব্দমালা। খুব সহজেই স্বাভাবিক সম্পর্কের স্বীকারোক্তি জানালো নিভান। বুঝিয়ে দিলো যে বোন জামাই হিসেবে তাবিবকে নিয়ে এখন আর কোন সমস্যা নেই তার। বুকের উপর চেপে থাকা ভারি পাথরটা নেমে গেলো তাবিবের।
– ধন্যবাদ ভাইয়া।
নিভান সে প্রসঙ্গে আর এগোলো না। উকিলের অফিসের পথ ধরতে ধরতে বললো,
– আমার ডিভোর্স কেইসটা অনেক জটিল। রত্না নানান এলিগেশন দিচ্ছে, অনেকগুলো মামলা করছে। তারউপর আমাকে রুবেলের বিষয়টা নিয়ে থ্রেটও দিচ্ছে। ও হয়তো রুবেলকে রিচ করার ট্রাই করছে। আগেরকার সবকিছু টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসছে। বিষয়টা বেশ ঘোলাটে হওয়ার পথে।
– রুবেলকে নিয়ে আর চিন্তার কিছু নেই।
চট করে কথাটা বলে নিজেই বিপাকে পরে গেলো তাবিব। ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে থম ধরে বসে রইলো। অথচ ওদিকে নিভান মোটেও থেমে নেই।
– কেন, বলুন তো!
নিভানের দৃষ্টি সম্মুখে অথচ তাবিব স্পষ্ট অনুভব করলো ও বিশেষ নজরদারির কবলে পরে গিয়েছে। ভীষন সাদাসিধে তাবিবের পক্ষে আর কিছুই বলা সম্ভব হলো না। কেবলমাত্র গাট হয়ে বসে রইলো। এই নীরবতায় নিভান তীর্যক হাসলো। সামনে থেকে মোবাইলটা তুলে তাবিবের দিলে এগিয়ে দিলো। তাবিব বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে মোবাইল হাতে নিতেই ওর দৃষ্টি থমকে গেলো।
মোবাইল স্ক্রিনে একটি নিউজ আর্টিকেল জ্বলজ্বল করছে। বিশিষ্ট শিল্পপতি রুবেল হাসানকে র/ক্তা/ক্ত অবস্থায় তার ফ্ল্যাটে পাওয়া গিয়েছে। ঘটনাস্থলে, তার একটি হাত, কাঁধ থেকে সম্পূর্ণ কা/টা এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। অতঃপর চিকিৎসার আওতায় আসার পর, চিকিৎসকগণ তাকে প্যারালাইজড্ ঘোষণা করেছেন। আরও নানান তথ্যাবলী উল্লেখ করা ছিল সেখানে। তাবিব সেগুলো কিছুই পড়ার রুচি খুঁজে পেলো না৷ মোবাইলটা পূর্বের স্থানে রেখে চুপচাপ বসে রইলো। এতোক্ষণের ভীত মুখটা গম্ভীর হয়ে উঠেছে।
– আই মাস্ট সেয়! কাজটা খুবই নিখুঁতভাবে করেছেন আপনি তাবিব। আক্রমণকারীর কোন ট্রেসই খুঁজে পাওয়া যায় নি।
তাবিব কিছু বললো না। চুপচাপ জানালার দিকে আপন মুখ ঘুড়িয়ে নিলো।
– আব্বু আর আমার কথা মানা যায়। সেই ঘটনা পরবর্তী নির্মম অবস্থার চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে, মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়ে পরি আমরা। যার কারণে ওসব করেছিলাম। তাছাড়া নিবু আমাদের আপন! আমাদের র/ক্ত! তাই ওর জন্য এই হাত দুটো র/ক্তা/ক্ত করতে বাঁধে নি আমাদের। কিন্তু আপনি কেন? আপনি কেন নিজেকে কলুষিত করলেন?
সে রাতে, উজ্জ্বল আলোয় রাঙা মুহুর্তে, যখন আবারও নিবৃতাকে আপন করে নিচ্ছিলো তাবিব, তখন ক্ষনে ক্ষনে, প্রবলভাবে ওর অন্তরটা কেঁপে উঠছিল। শুভ্র, মোলায়েম ত্বকে ভেসে ওঠা প্রতিটি কালসিটে ও অস্পষ্ট সেলাইয়ের দাগ, আঘাতের নির্মম চিহ্নগুলো যতবার ওর আঙুলগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছিলো, ততবারই মনে হচ্ছিল সে ব্যথা দিচ্ছে তার নিবেদিতাকে! জাগ্রত করছে পুরনো সকল ভয়াবহ ক্ষতকে। নিজেই মানসিকভাবে অস্বাভাবিক অনুভব করছিল। তবুও কিভাবে যে নিজেকে সামলেছিল ও! তাবিব ভেঙে পরলে নিবৃতাকে কে আগলে নিতো? বারেবারে ভিজে আসা অক্ষিকোল, আড়ালে নিবৃতার শাড়ির আঁচলে লুকিয়েছে। সেই মুহুর্তে অনুভব করা প্রবল অসহায়ত্ব ওর মাঝে যে দাবানলের সৃষ্টি করেছিল, সেটা ওই জালেমের র/ক্তে ভিজে তবেই নিভেছে। যেই হাত দুটো সর্বদা কারও জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে লড়াই করে, তাদের কারও জীবন ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করা সহজ ছিল না ওর জন্য। তবে ভালোবাসার আরেক নাম তো বিধ্বংসী। সকল রূপকেই বরণ করে নিতে হবে যে! তাছাড়া অমানুষদের এই নিষ্ঠুরতা প্রাপ্য! প্রকৃতি আমাদের সকল কৃতকর্ম এক না এক সময়, কারো না কারও মাধ্যমে ঠিকই ফিরিয়ে দেয়।
– আমি তার স্বামী হই। বর্তমানে তার সবচাইতে আপন। আমার মানুষটাকে অসহ্য কষ্ট দেওয়া একটি হাত ও স্মৃতি ধারন করা নিকৃষ্ট মস্তিষ্ক এখনও সচল আছে, সেই ভাবনা আমাকে শান্ত থাকতে দেয় নি। আর আমি কলুষিত হই নি, আমার নিবেদিতার জন্য তার অপূর্ণ ন্যায় বিচারটা ছিনিয়ে নিয়ে এসে নিজেকে ধন্য করেছি।
বোনের জন্য তাবিবের চাইতে যোগ্য কাওকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না কি না এ নিয়ে নিভান সন্দেহ প্রবন হয়ে উঠলো। পরপর স্বচ্ছ এক হাসি ছড়িয়ে পরলো ওর মুখশ্রীতে। তাবিবের কাঁধ চেপে ধরে হাসোজ্জল গলায় বললো,
– মাস্টারমাইন্ড! আমাকেও পিছে ফেলে এসেছেন। সবটা শুনতে চাই। কিভাবে কি হলো?
নিভানের সহজ হওয়ার প্রচেষ্টায় তাবিবও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে আনলো। স্বাভাবিক গলায় জবাব দিলো,
– আমার ফুপির ছেলে হয় রুবেল হাসান। ছোট থেকেই তাকে চেনাজানা। স্নেহভাজন ছিলাম তার। আমার কিছু টুকটাক বিজনেস এ তার থেকে বেশ কিছু এডভাইসও নিয়েছি। এবার ঢাকায় এসে প্রথমেই সে আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে পোষন করে। সেখান থেকেই ঠিকানাটা পাওয়া।
নিভান চট করে চোখ থেকে চশমা খুলে অবাক চোখে তাকায়। তাবিব নামক মানুষটা তার বোনের জন্য পরিবারকেও ছাড়ে নি?
– সে আপনার পরিবারের একজন সদস্য!
– তার শুধুমাত্র একটাই পরিচয়। ধর্ষ/ক!
শক্ত কন্ঠে তাবিব জবাব দেয়। নিভান দ্বিমত করার কিছুই পায় না এতে। এটাই তো এক ঘৃণ্য সত্য!
আজ, সাইকোলজিস্টের সাথে নিবৃতার প্রথম সাক্ষাৎ। তাবিব যখন চিকিৎসার বিষয়ে নিবৃতার অভিমত জানতে চাইলো, তখন আশ্চর্যজনকভাবে নিবৃতা কোন বিরোধিতা করে নি৷ প্রথমবারেই রাজি হয়ে গিয়েছে। এমনকি ওর মাঝে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য এক ভিন্ন তাগিদ দেখা যাচ্ছে। নিজের মাঝে থাকা বাদবাকি সমস্যাগুলোর নিষ্পত্তি ঘটানোর জন্য ও বেশ আগ্রহী। খানিক বাদেই এপোয়েনমেন্ট। নিবৃতা তাড়াহুড়ো করে তৈরী হচ্ছে। একটু আগেই তানহার মার্শাল আর্টস এর ক্লাস শেষ হয়েছে। ওখান থেকে আসতে আসতেই মা মেয়ের সময় লেগে গিয়েছে। এরপর তানহাকে আগেভাগে তৈরী করিয়ে দিয়ে এখন নিবৃতা ছুটছে নিজেকে নিয়ে।
তাবিবও আজ দ্রুত কাজ শেষ করে বাসায় ফিরেছে। ও অপেক্ষা করছিলো নিবৃতার আসার। এর মাঝেই তানহার আওয়াজ শোনা যায়।
– বাবা।
– এসো।
তানহা প্রবেশ করতেই তাবিব উঠে দাঁড়ায়। ভেবেছে সব ঠিকঠাক এখন, বেরিয়ে পরা যাবে৷ এগিয়ে এসে কিছু বলবে তার আগেই তানহার বিভ্রান্ত, চিন্তিত মুখ নজরে আসে। কিছু বলার জন্য যেন হাসফাস করছে। তাবিব মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
– কি হয়েছে মা? কোন সমস্যা?
তানহা ছোট মুখে তাকায়। দুঃখী গলায় বলে,
– আম্মুকে সাইকোলজিস্ট কেনো দেখাচ্ছ? আম্মুর কিছু হয়েছে?
মা’কে নিয়ে সে চিন্তিত। তাবিব হাসে। মেয়ের মাথা হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
– কিছুই হয় নি তোমার আম্মুর।
– তাহলে শুধু শুধু কেন ডাক্তার দেখাচ্ছ?
– শুধু শুধু অবশ্য দেখাচ্ছি না। শুনো তানহা, সবার জীবনের কিছু গল্প থাকে। কারও কাছে সেটা সুইট এন্ড মেমোরেবল, কারও কাছে বিটার এন্ড ট্রমাটিক। তোমার আম্মুর জীবনে অনেক সংগ্রাম করেছেন। সে সময়গুলো এখন পেরিয়ে গেলেও সেগুলো এখনও তোমার আম্মুর মাঝে ভয় জাগায়। আমি চেষ্টা করছি, সেগুলো থেকে পরিত্রাণ পেতে তাকে সাহায্য করতে। তার সব সমস্যা দূর করে দিতে।
তানহা শুনলো সবটা। সে চায় আম্মু ভালো থাকুক সবসময়। তবুও মনটা মানলো না। শুকনো গলায় বললো,
– আমি তোমার বইয়ে পড়েছি। সাইকোলজিক্যাল চিকিৎসার পর রোগির মাঝে অনেক পরিবর্তন চলে আসে। তাহলে কি আম্মুও বদলে যাবে? বর্তমানে সে যেমন আছে তেমনই তো সবচেয়ে ভালো। এভাবেই সেরা!
স্বভাব সুলভ চেনা মা’কে হারিয়ে ফেলার ভয় জেঁকে ধরেছে তাকে। তানহা মুখে না বললেও, ও তো জানে নিবৃতা কতোটা সরল। বেশি জটিল কিছু বুঝে না। মনে কোন কুটিলতা নেই। বিরল একজন। সবার থেকে একটু বেশিই আলাদা। তাইতো সেই সত্তা থেকে আলাদা হতে চায় না ও। তাবিব তানহাকে শান্ত করতে বলে,
– বদলে অবশ্যই যাবে। তবে এবার সেরার থেকেও সেরা হয়ে উঠবে। মানুষের স্বভাবে পরিবর্তন আসলেও মন কিন্তু একই থাকে। আর তোমার আম্মু তো সবচেয়ে বেশি তোমাকেই ভালোবাসে। তুমিই তার জন্য সবার আগে। তাহলে ভয় কেন পাচ্ছো?
তাবিবের কথায় তানহা চুপ হয়ে গেলো। এখন তো আর কিছু বলার নেই। এরই মাঝে নিবৃতা ছুটে এলো।
– চলুন!
তৈরী হয়ে এসেছে সে। তাবিব কিছু বলবে তার আগেই নিবৃতা গিয়ে তানহাকে এক পেশে ধরলো। সম্মুখে হাঁটতে হাঁটতে বললো,
– পটের পানি পুরোটা শেষ করেছ তো ঝিলমিল? ক্লাসে কিন্তু অনেক ঘেমেছিলে! নয়তো ইলেকট্রোলাইটস্ এর ঘাটতি দেখা যাবে পরে।
– হ্যা করেছি তো।
– গুড গার্ল!
তানহার ছোট থেকে ছোট বিষয়েও খেয়াল থাকে তার। মা মেয়েকে দেখে তাবিব হাসে। মেয়ের সম্মুখে তাবিব সর্বদাই নিবৃতার নজরে অদৃশ্য থাকবে। এবং এতে হয়তো কখনোই অভিযোগ করবে না তাবিব! বরঞ্চ ও চায়, পরিস্থিতি যেন সবসময় এরকমটাই থাকুক!
আকাশে আজ পূর্ণ চন্দ্রিমার রাজত্ব। তার অম্লান স্নিগ্ধ আলোর দাপটে অন্যান্য নক্ষত্ররাজির তেজ বিলুপ্ত। ছাদ খোলা বারান্দায়, মৃদুমন্দ সমীরণ বয়ে চলেছে। তারই বলে, নিবৃতার কপালের উপর ছোট চুলগুলো স্বাধীনভাবে ছুটোছুটি করছে। তবে একলা এই রমনীকে সঙ্গ দিতে চলে এসেছে তার সঙ্গী। পুরুষালি ভারি হাত দুটো আরামসে ওর সুর মধ্যমা ঘেরাও করে নিয়েছে। চৌখা থুতনি ঠেকেছে কাঁধে। একে অপরের সান্নিধ্যে লম্বা নীরবতা চললো। সাথে মস্তিষ্ক খুঁজে নিলো প্রিয় মানুষের মাঝে থাকা আরাম আরাম অনুভূতিটা।
তবে তাবিব চুপচাপ ভেবে চলেছে ভিন্ন কিছু। ডাক্তারের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ বেশ ভালো কেটেছে। নিবৃতার সুস্থ হয়ে ওঠার নিশ্চয়তা অনেকটাই দিতে পেরেছেন তিনি৷ তালিকায় যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু নতুন ঔষধ। সেখান থেকে একটি নতুন ভাবনা তাবিবের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই চিকিৎসা শেষ হলে আরেক পথ উঁকি দিয়ে আছে যেন! এবার না পারতে ও বলেই বসলো সেটা।
– একটা কথা ছিল।
এ কথায়, নিবৃতা হাসলো অলক্ষ্যে।
– অনুমতি চাইছেন?
সত্যিই তো! তাবিব কি অনুমতি চাইছে? ও হেসে ফেললো। ঘাড় ঘুরিয়ে কোমল গালে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে বললো,
– সময় পরিবর্তন হয়েছে। নানান চিকিৎসা পদ্ধতির আবিষ্কার হয়েছে। আগে যা কঠিন ছিল এখন সেটা সহজলভ্য। সেজন্য বলছিলাম, তুমি যদি চাও তাহলে, এরপর তোমার ফার্টিলিটি চিকিৎসা আমি পুরোদস্তুর শুরু করে দিবো। আমি আবারও বলছি এটা কিন্তু একান্তই তোমার ইচ্ছে।
নিবৃতা শুনলো তবে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বললো না। এ বিষয়ে কখনও ভেবেই দেখা হয় নি যে এর আগে। ও সামান্য ঘুরে তাকালো তাবিবের পানে। নির্ভেজাল মনে বললো,
– আপনি কি চান?
– আমি বলেছি এটা তোমার ইচ্ছে। তোমার শরীর। তোমাকে সবকিছু সহ্য করতে হবে।
– আচ্ছা তবুও। আপনি কি আবার বাবা হতে চান?
আলিঙ্গন জোড়ালো করলো তাবিব। মিহি স্বরে বললো,
– কিছু কিছু অনুভূতি কখনও কোন মূল্যে পরিমাপ করা যায় না। পিতা মাতা হওয়া বিষয়টা তেমনই। তানহা আমাকে পিতৃত্ব লাভ করিয়েছে। এখন সেই অনুভূতি শতবার অনুভব করলেও কখনো মন ভরবে না। কিন্তু এখানে আমার চাওয়া না চাওয়ার কথা আসবেই না। কারণ আমি তোমার এ বিষয়ে জেনে বুঝে, অবশেষে বিয়েতে মত দিয়েছি। তুমি যা আছো, যেভাবে আছো সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট। তবে হ্যা, আমি চাই তুমি এ জীবনে সব পাও, এবং সেটাতে মা হওয়ার অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত।
– আমি তো মা’ই। ঝিলমিলের আম্মু।
নরম কপালে এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে তাবিব বলে,
– তুমি জানো আমি কি বুঝিয়েছি।
প্রত্যুত্তরে নিবৃতা স্মিত হাসে৷ পরপর বলে,
– ঝিলমিল বড় হচ্ছে। সত্যি বলতে বড় হয়ে গিয়েছে। ওর বয়সের তুলনায় অনেক কিছুই বুঝে ও৷ যেটা কয়েকবার বলেও আমাকে বোঝানো যাবে না সেটা ওলে বলাও লাগে না। আগে থেকেই জেনে বসে থাকে। তাই যদি আমার চিকিৎসা চলে তাহলে ও সেটা খুব সহজেই বুঝে যাবে।
– সেটাই তো। আমাদের মেয়ে অনেক বুঝদার। তাহলে সমস্যা কোথায়?
– সমস্যা তো এখানেই। আমি চাই না, ঝিলমিলের কখনও মনে হোক ও আমার জন্য যথেষ্ট নয়। শুধুমাত্র ওকে দিয়ে চলবে না, এই ভাবনা যেন কখনও না আসে। আমার জন্ম দেওয়া কেউ ওর চাইতে বেশি আপন হবে, সেই চিন্তায় মন ছোট হয়ে যাক, এটা আমি কল্পনাও করতে পারবো না। আমি চাই না ওর থেকে আমার মনোযোগ সরে আসুক। ভাই-বোন থাকা স্বাভাবিক কিন্তু সেটা রব কর্তৃক একাকি না এলে আমি এর পেছনে ছুটতে চাই না। আমার জীবনের আলো হয়ে তানহা এসেছে, আমি কখনও ওর ঠোঁটের হাসি মুছে যাওয়ার কারন হতে চাই না।
তাবিবের কাছেও তো ওর মেয়ের আগে কিছুই নয়। নিবৃতার বিষয়ে তানহা খুবই সংবেদনশীল, তারউপর মেয়ে তার বড্ড অভিমানীও। এই ছোট জীবনের এতগুলো বছর মা ছাড়া থেকে এসে, এখন সে আম্মু ছাড়া কিছুই বুঝে না। যদি হিতে বিপরীত কিছু হয়ে যায়! হয়তো এই বিষয়টা সময় এবং ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়াই শ্রেয়। পিতৃত্বের স্বার্থে তাবিবও আর কিছু বললো না। চুপ হয়ে গেলো। অজানা এক ক্লেশে জড়িয়ে গিয়ে তারা দুজনই আর কিছুই বলতে পারলো না। একে অপরকে আঁকড়ে ধরে ধাতস্থ হচ্ছিল।
নিবৃতা পর্ব ৩৫
গড়ে ওঠা এই নীরবতা ভাঙলো তাবিবের মোবাইল বেজে ওঠায়। এ সময়ে কারও কল আশা করে নি তাবিব। আবারও অপরিচিত নম্বর। জবাব দিয়ে সালাম দিতেই অপর পাশ থেকে নারী কন্ঠ ভেসে এলো।
– তোমার সাথে যোগাযোগ করার কোন রাস্তাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না তাবিব। শেষে উপায় না পেয়ে, তাকরিমাকে আবার বলে, অনেক অনুরোধ করে অবশেষে তোমার নম্বর জোগাড় করতে পেরেছি।
অপর পক্ষ যতই কথা এগোলো ততটাই ধীর হয়ে এলো তাবিবের মুখের ভাব ভঙ্গিমা। এক সুপ্ত রাগ ভেসে উঠলো নরম আঁখি জোড়ায়। কাঠিন্যতায় মোড়া সেই মুখ খানি, চাঁদের সফেদ আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলো নিবৃতা। কি হলো হঠাৎ? এরই মাঝে তাবিবকে শক্ত গলায় বলতে শোনা যায়,
– আমি আসবো না। কখনোই না।
