নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৬
আশিকা আক্তার সোহাগী
“বিচ্ছেদের দুঃখে প্রেমের বেগ বাড়িয়া যায় -রবী ঠাকুর”
তবে জেনি আর মক্কুর বেগ মনে হয় চারগুন বেড়েছে।যদিও সেই বেগ মক্কু নিজের মাঝে ঠেসেঠুসে চেপে রেখেছে।তার কঠিন অভিমান গলে গ হয়ে গেছে যখন গোসল করে বের হয়ে দেখে জেনি লাল টুকটুকে শাড়ি পড়ে বউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে।
টুকটুকে লাল এই বউটা মক্কুর নিজের। ভাবতেই মনের আনাচে-কানাচেতে কোন্দল শুরু হলো।মন ময়ুরী পেখম পেলে প্যাকপ্যাক করে গান খাওয়া ধরলো।মস্তিস্কের নিউরনে নিউরনে লাল নীল বাত্তি জ্বলে উঠলো।সারাজীবন নিজের বলতে কিচ্ছু না পাওয়া মক্কুর জন্য এই তো সাত রাজার ধন।লাল শাড়িতে জেনির শরীর থেকে যেনো আভা বের হচ্ছে।তাই তো বিভিন্ন কবি সাহিত্যিক শাড়ি পড়া রমনীকে বলেছেন পুরুষের চরিত্র ধ্বংসের কারণ।চোখ জ্বলসে যাওয়ার মতো রুপ নিয়ে এই মেয়েকে মক্কুর বউ হতে কে বলেছে।অসহ্য যন্ত্রণায় যখন মক্কুর নাভিশ্বাস। সেটা আরও বাড়িয়ে দিয়ে জেনি শাড়ির আচঁল ভাজ করে কোমরে গোঁজে ফেললো।
মক্কু চোখ বন্ধ করে ফেলে সাথে সাথে। ব্লাউজ আর কোমরের নিচ পর্যন্ত ফাঁকা বক্র কোমর যেনো সাক্ষাৎ মরণ বাণ। দেখবে না এই ছলনাময়ীকে।
বিয়ের পর মক্কুর বউয়ের প্রতি উচাটন দেখে নিবিড় বারবার সাবধান করেছে।বলেছে সেই বিখ্যাত গল্পেটি
“একলোক প্রচন্ড শীতের মাঝে পাতলা পোশাকে হেঁটে যাচ্ছিলো।অন্য একজন তাকে এত হালকা পোষাকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
-তোমার ঠান্ডা লাগে না? এত হালকা পোশাকে কিভাবে বেঁচে আছো?
জবাবে লোকটি বলে,
-এতেই আমি অভ্যস্ত।
পরক্ষণেই লোকটির খুব করুণা হলো। দুঃখী লোকটাকে বাহিরে দুই মিনিট দাঁড়াতে বলে ঘরের ভেতরে গরম কাপড় আনতে যায়।ঘরে ঢুকে লোকটি অন্যকাজে ব্যাস্ত হয়ে বাহিরের অভাবী লোকটার কথা ভুলে যায়।সকালে যখন মনে পড়ে ,তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে দেখে বরফে জমে অভাবী লোকটা মারা গেছে।
এতকাল সে হালকা পোশাকে দিব্বি বেঁচে থাকলেও ,যেই কেউ তাকে গরম কাপড়ের প্রলোভন দেখিয়ে তেমনি তার শরীর আর মন লড়াই করা ছেড়ে দিয়েছে।আর ফলাফল মৃত্যু”
এই গল্পটার তোর জন্য শিক্ষনীয় দিক হচ্ছে, নিজের যে আচরণগত অভ্যাস সেটা যদি কারো উপর ভরসা করে বদলিয়ে ফেলিস তবে জীবন কঠিন ভাবে ধোকা দিলে আর দাঁড়াতে পারবি না। যে অপরের উপর যত বেশি আশা করে তার মানসিক শান্তি তত কমে যায়।””
ঠিক ঠিক মক্কু আর এত বেশি স্বপ্ন দেখবে না।জান আজ সকালে যেকোন মুহূর্তে উড়ে যেতো।শুধু যদি একটা ট্রেইন সেই সময়ে পাস করতো।
মক্কুর চোখ বন্ধ দেখে জেনি এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে টেনে নেতিয়ে যাওয়া ফুলের বিছানায় বসায়।নিজেও সামনে বসে একহাতে থুতনি ধরে আরেক হাতে কপালে ব্যাথার জায়গা আলতো স্পর্শে ছুঁয়ে দেখে।
-আহ
করে মক্কুর চোখ খুলে গেলে দেখে,টকটকে লাল ঠোঁট গোল হয়ে শীতল বাতাস দিচ্ছে তার কপালে।সেই ঠোঁট নিজ জায়গায় গিয়ে প্রশ্ন করে ,
-অনেকটা লেগেছে।জ্বলছে নিশ্চয়? চলুন ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ লাগিয়ে আসি।না হলে আরও ব্যাথা বাড়বে।
মক্কুর কিছুক্ষণ আগের সকল পণ মাঠে মারা গেলো।নেশাগ্রস্তের মতো মাথা আউলা ঝাউলা হয়ে দুই হাতে জেনির উন্মুক্ত কোমর আকড়ে ধরে টান দিয়ে নিজের কোলে বসিয়ে জিজ্ঞেস করে ,
-আমার ব্যাক্তিগত ফার্মেসী থাকতে কোন দুঃখে পাবলিকে যাবো?
খিলখিল করে হেঁসে উঠে জেনি।এবং মক্কু ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ভাবে সেই কথা ” পুরুষের জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে নিজের ব্যাক্তিগত নারীর প্রাণখোলা হাঁসিমুখ”
জেনি মক্কুর কোলে বসায় বেশ উপরে উঠে গেছে।মক্কুর মাথা জেনির বক্ষদেশ বরাবর। সেখানে মক্কু নিজের আহত কপাল খানা ঠেকিয়ে প্রশ্ন করে,
-তোমার জুতা অন্য মেয়ের কাছে কিভাবে এলো?
জেনি কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে ,
-আপনি কিভাবে জানলেন?
-প্রশ্নটা আমি আগে করেছি?
অভিমান এখনো সম্পুর্ণ কাটেনি এটা জেনির বুঝা হয়ে গেছে। তাই সোজাসুজি উত্তর দিলো,
-আমাদের কাল প্ল্যান ছিলো হুইপ রেজাউল সরকারকে খতম করার। সেভাবেই আমরা বের হয়। কিন্তু মাঝপথে কিছু নেশাগ্রস্ত বখাটের পাল্লায় পড়ি।তাদের সাইজ করতেই আমাদের দেরি হয়ে যায়।আর আমরা পৌঁছে দেখি অন্য একটা বাচ্চা মেয়ে তারা যোগাড় করে ফেলেছে।একেবারেই যে দুস্ত অসহায় একটা মেয়ে ধরে এনেছে ,সেটা মেয়েটার বাহ্যিক বেশভূষায় বুঝতে পারি।পায়ে জুতা পর্যন্ত ছিলো না পর্যন্ত। কান্নারত মেয়েটাকে যখন আমাদের সামনে দিয়ে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো ,আমি আপনাকে বুঝাতে পারবো না মুসাদ্দিক আমার কেমন লেগেছে।মেয়েটা আমার হাত টেনে ধরে আকুতি ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো জানেন? কোথাও সে হইতো ভরসা করেছিলো আমার উপর। কিন্তু আমরা নিরুপায় ছিলাম। আমাদের ধারণার চেয়েও বেশি সিকিউরিটি প্লাস গেটের কাছে জার্মান শেফার্ড ছিলো চারটা। মেয়েটার খালি পা দেখে আমি আমার জুতাটা দিয়ে চলে আসি।অপেক্ষা করি বাহিরে কিছুক্ষণ। বিশ্বাস করবেন না বাহিরেও মেয়েটার আর্তনাদ ভেসে আসছিলো। একসময় যখন যখন আর্তনাদ থেমে যায়,আমরা বুঝি আর একটা প্রাণ ক্ষমতায় পৃষ্ঠ হলো।
বলে ডুকরে কেঁদে উঠে জেনি।মক্কু আগলিয়ে নেয় দুই হাতে জেনিকে।তারপর পিঠে হাত দিয়ে শান্তনা দিয়ে বলে,
-আজ যদি একটা ট্রেন সময় মতো আসতো তাহলে এই যে লাল শাড়ি পড়ে আছো সেটার পরিবর্তে সাদা শাড়ি গায়ে জড়াতে হতো।
জেনি নিজের মাথা মক্কুর কাধ থেকে উঠিয়ে চোখ ভরা জল নিয়ে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকানো দেখে মক্কু আবার বলে,
-আমি তোমার জুতা পেয়ে ভেবেছি মৃত্য মেয়েটা তুমি। তারপর নিজের জীবনের প্রতি মায়া চলে যায়। তাই সোজা রেললাইনে মাথা দিতে চলে গিয়েছিলাম।
জেনি ফট করে মক্কুর মুখ চেপে ধরে।তারপর আবার কেঁদে বলে উঠলো ,
-আমাদের কেউ কোন ক্ষতি করতে পারবে না মুসাদ্দিক।হাতের প্রতিটা নখে দেড়গ্রাম সায়ানাইড ছিলো।একবার শুধু আঙুল দিয়ে নখ ধর্ষিকের নাকের কাছে ঘষা দিলেই শরীরে অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে হৃদযন্ত্র কাজ করা থেমে যেতো।কিন্তু ভাগ্য যেনো সহায় ছিলো না।
আপনি এতটা ভালোবাসবেন না প্লিজ।জানেন না ,মানুষ যে জিনিসকে যতবেশি ভালোবাসে সৃষ্টিকর্তা সে জিনিস তার কাছ থেকে তত দ্রুত কেড়ে নেন।
মক্কু চেপে ধরে জেনিকে। তার আর কিচ্ছু চায় না। শুধু এই মেয়েটাকে ঘিরেই বাচতে চায় সে।পরিবেশ সহজ করতে মক্কু বলে উঠলো ,
-মরা ফুলে বাসর হয়?
-দিনের বেলা?
-বউ আছে ,জামাই আছে ,ফুল শস্যাও আছে দিন রাতে কি আসে যায়?
বলে একসেকেন্ড দেরি করলো না নিজের অধিকার কিংবা হক আদায় করার প্রসেসিং শুরু করতে।শক্তিশালি বিছানাও আর্তনাদ করে উঠলো দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রলয় ঝড়ে। দুইজন কুলহারা ,নীড়হারা মানুষের একে অপরকে আকড়ে ধরার শপথ এই তো শুরু। মহাবিশ্ব যে সম্পর্ক সম্পর্কে অবগত। যে সম্পর্কের চক্রে জগৎ সংসার ঘূর্ণমান।এই তো সেই সম্পর্ক ,মহা পবিত্র ,অমৃত্য সুধা পানের একমাত্র মাধ্যম।
ভালোবাসার জন্য যার পতন হয় সে বিধাতার কাছে আকাশের তারার মতো উজ্জ্বল -জনসন
কিন্তু নিবিড়ের পতন কোন ভালোবাসায় হয়নি।হয়েছে সাবান পানিতে পিছলে। দরজা খোলে পা দেয়ার সাথে সাথেই থপাস করে আছাড় খায়। একবার উঠে দাঁড়ানোর সাথে আবার।সে চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারে এই কাজ কার। ইচ্ছাকৃত এমন ইতরামি একমাত্র তার বউ রুপী বাদরটাই করতে পারে।যদিও চোখ বন্ধের দরকার নেই কারণ এই ঘরে অন্য কেউ নেই।পরপর তিনবার পড়ার পর গর্জে উঠে ,
“”জিয়ানা””” বলে। জিয়ানা বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে পেট ধরে হেঁসে যাচ্ছে এত বড় দামড়া মানুষের আছাড় খাওয়া দেখে।খিলখিল করে হেঁসে জিজ্ঞেস করে ,
-আহারে ফ্লোরটা ব্যাথা পেলো মনে হয়। এই ভন্ডনেতা আস্তে পড়তে পারলেন না একটু?
নিবিড় দাঁতে দাঁত চেপে বাহিরে দাঁড়ানো গার্ডকে ইশারা করে হাতের ব্যাগগুলো রেখে চলে যেতে। গার্ড চলে যেতেই নিবিড় কটমট করে বলে ,
-এগুলা কি করেছো? সাবান পানি কেনো সারা রুমে?ফাজলামির একটা লিমিট আছে গর্দভ মেয়ে কোথাকার।যা কিছু এনেছিলাম একটা সুতাও পাবে না।
-কি আর এনেছেন সব নিশ্চিত ভুলভাল জিনিস।ছুড়ে মারুন আমার দিকে।আমি আপনার ঘর পরিস্কার করছিলাম। পরস্কার পরিছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।
নিবিড় এবার ভালো ভাবে তাকায় জিয়ানার দিকে। রান্নার এপ্রোন গায়ে জড়িয়ে কাধে প্লাস্টিকের ঝাড়ু হাতে ছোট বালতি।নিবিড় নিজের শার্ট খুলে ফ্লোরে রাখে।তারপর সেটার উপর পা দিয়ে বাহিরে বের হয়ে ব্যাগগুলা হাতে নেয়।তারপর আবার শার্টে পা দিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে বলে,
-সুইপার হিসেবে তোমাকে চমৎকার মানাবে। এককাজ করো এলাকায় এইভাবে বেড় হয়ে যাও বেশ ভালো ইনকাম করতে পারবে।
একদম জিয়ানার কাছে এসে সবগুলো শপিং ব্যাগ জিয়ানার পায়ের কাছে রাখে।একটা ব্যাগ শুধু নিজের হাতে নিয়ে রুমে ঢুকে।জিয়ানা সেই ছোট্ট ব্যাগ খেয়াল করে বলে,
-ওইটাও দিন আবার দরজা জানালা বানিয়ে দিবো।ইকো ফ্রেন্ডলি জাঙ্গিয়া।
নিবিড় থেমে যায় সেখানেই। ঘুরে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগে রিরি করে বলে ,
-এমন চটকাটা দিবো চেহারার ডিসপ্লে চেইঞ্জ হয়ে যাবে। তোমার জিনিসপত্র পেয়েছো সো ইফ ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট টু সি মাই ট্রু ফেইস দেন কিপ ইউর ডিস্ট্যান্স ফ্রম মি।
এতগুলো ব্যাগ দেখে জিয়ানা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করে,
-সে না হয় বুঝলাম এত গুলো কি এনেছেন? কি করবো এত এত জিনিস দিয়ে?
-এককাজ করো কিছু কেটে কেটে দরজা জানালা বানাও আর কিছু দিয়ে রান্না করে খেয়ে ফেলো। কিন্তু তার আগে আমি বের হয়ে যেনো দেখি ড্রয়িংরুম পরিস্কার। তানাহলে তোমাকে দিয়ে রাব করবো ফ্লোর। বলে টাওয়াল নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো।
জিয়ানা হাতের ঝাড়ু ফেলে মুখ ভেঙ্গচি কেটে বলে
-এসেছে লাটের বাট।কারো হুকুমে জিয়ানা চলে না।
তারপর ব্যাগ গুলো একে একে বিছানায় উঠায়।প্রথমে ব্যাগ গুনা শুরু করলো। আঠারো ব্যাগ।ব্যাগ গুনতেই জিয়ানার দম লেগে গেছে।এত এত জিনিস কে কিনে ভ্রু কুচকে বাথরুমের দরজায় তাকায়।সবচেয়ে কাছের ব্যাগটা আগে খুলে।ধপধপে সাদা সফট নেটের একটা গাউন বের হয়ে এলো।জিয়ানা ড্রেসটা বের করে বিমূর্ত হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো।তার বিশ বছরের জীবনে এমন মেয়েলী জিনিস কেউ কখনো দেয়নি।জামাটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নেই।নতুন কাপড়ে একটা ঈদ ঈদ গন্ধ আছে।তারপর নিবিড়ের বাথরুমের দরজায় তাকিয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড।হঠাৎ মনটা ভার হয়ে এলো জিয়ানার।এখন তো এসবে একদম মন টানে না।অথচ একসময় মুকের মতো অপেক্ষা করতো যদি জিয়াউল একটা এমন ড্রেস কিনে আনে।পরমুহূর্তেই মাথা ঝাকায় না কিনেই ভালো হয়েছে।ছোট ছোট চুলে এমন মেয়েলী ড্রেসে তাকে নিশ্চয় খুব হাস্যকর লাগতো।মেয়েদের ট্রি শার্ট ,ডেনিম প্যান্ট ,জিন্স প্যান্ট ,ফ্লোরাল প্রিন্টের অভার সাইজ শার্ট,লুজ টাওজার, লং স্কার্ট ,কুর্তি ,দুই জোড়া জুতা ,দুইজোড়া স্যান্ডেল আর আন্ডারগার্মেন্টস কলথ।অতি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে সব গুলো পাঁচটা করে। সাথে পাঁচটা কালার।কালো ,সাদা,ধূসর,নেভি ব্লু,সী গ্রীন।আর একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে মেয়েদের শ্যাম্পু ,শাওয়ার জেল আর অন্যান্য জিনিসপত্র।এগুলার মাঝে শুধু শ্যাম্পুটা কাজে লাগবে।কন্ডিশনারও কখনো ইউজড করে না জিয়ানা।একটা ক্লিনজার আর শ্যাম্পুই তার জন্য এনাফ।শীতের দিন বেবিলোশন হলেই তার স্কিন কেয়ার কমপ্লিট হয়ে যায়।পুরো এক বিছানা জিনিসপত্র দেখে জিয়ানার বারাবাড়ি মনে হলো। ভালো লাগার চেয়ে মেজাজ খারাপ হচ্ছে বেশি।ট্রি-শার্ট আর টাউজারের ব্যাগটা আলাদা করে বাকি গুলা থেকে একটা করে নিলো।সাথে সাদা গাউনটা।
সুন্দর হাঁসিখুখী বিকেল। গাছ গাছালীতে ঘেরা বাড়ির ছাদে আচার শুকাতে দিয়ে পাশে বসে আছে এক বৃদ্ধা। আর একটু পর পর হাঁসিখুশী এক তরুনী কোত্থেকে এসে ছু মেরে আচার নিয়ে দৌঁড়ে চলে যাচ্ছে।খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠা সেই তরুনীর হাঁসিতে সারা বাড়ি ঝলমল করে উঠে।মনের মন্দিরে ঘন্টা ঠং ঠং করে ভেজে উঠে।বেহায়া মন সেই হাঁসিতেই খু*ন হতে চাই বারবার ,হাজার বার। সেই বাকাচোখের হাঁসি ,মুধুঝরা কন্ঠের মিহি ডাকে শীতল হতে চাই তনু।কবে হবে আর কবে?বেলা যে বয়ে গেছে অনেক।শরীরের ছালে টান লেগে কয়েক বসন্তের আগেই।তবুও কেনো এত আশা? এত অপেক্ষা?
ইজি চেয়ারে হেলান রত লোকটির চোখের কোন ঘেঁষে গড়িয়ে পড়ে অপেক্ষার জল। পাশ থেকে পুরুষ কন্ঠ ডেকে উঠে,
-স্যার।
চোখ মেলার আগে হাতের টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে জবাব দেয় ,
-হুম।
-নিবিড় তার বউকে নিজের ফ্ল্যাটে তুলেছে পরশুরাতে।
চোখ মেলে সোজা হয়ে বসে মামুন ইসলাম। কোমল মুখ হিংস্র হয়ে উঠলো মুহূর্তেই।কাটকাট গলায় জিজ্ঞেস করে ,
-মাসখানেক থেকে ক্লাবে মেয়েও যাচ্ছে না তাই না?
-জ্বি স্যার।তবে মাসখানেক থেকে না চারমাস থেকে।সমুদ্র খু*ন হওয়ার পর থেকেই।আর একটা খারাপ খবর আছে।
-আর কি খারাপ খবর আশরাফ?আমাকে কি একটু শান্তিতে থাকতে দিবে না তোমরা?
-মেহেদী ইউএসএ যায়নি ,গেছে মালেশিয়া।
হো হো করে হেঁসে উঠল মামুন ইসলাম।
-বাপের মতো সব ধূর্ত হয়েছে তাই না আশরাফ? আমি ভাবলাম শুধু রাফিনটাই চালাক চতুর হবে ,বাকি দুইটাকে রাফিন নিজের কাজে ব্যাবহার করবে।এখন দেখি উল্টা হলো।রাফিনের কি খবর বলো তো?
-রাফিন স্যার শ্বশুরবাড়ি যায়নি একবারও।আমি বলি কি বউয়ের পরিক্ষা তো শেষ উঠিয়ে আনলেই ভালো হবে।তাহলে কাছাকাছি থাকবে দুইজনই।মিল মহব্বতও হয়ে যাবে।
-হয় না আশরাফ। মনে একবার যে বসে যায় এসিড মেরে গলিয়ে দিলেও তাকে উঠানো যায় না।আমার জন্য রাফিনকে তো কুরবানী দিতেই হতো। আজ অথবা কাল।
-এখন তাহলে কি করবেন স্যার?
-সবাইকে এক জায়গায় করে হয় শেষ করবো ,না হয় নিজে শেষ হবো।জীবনের তো শেষই হয়ে গেলো আর কিসের অপেক্ষা?তারা খেলবে আমি শুধু গ্যালারিতে বসে খেলা দেখবো।দেখি কে জিতে!
বলে দেয়াল ফাটা হাঁসি শুরু করলো মামুন ইসলাম।
মানুষের মনের আড়ালে আরও একটা মন থাকে।কাছ থেকে সেই মনের সন্ধান যারা পায় তারা কখনোই বুকে হাত রেখে বলতে পারে না লোকটা খারাপ।প্রতিটা খারাপের পেছনে কারণ থাকে। থাকে হাজার ব্যাথা আর লুকায়িত কষ্ট।
নিবিড় পুশ শাওয়ারে নিজের ঘাড়ে পানি ঢেলে হারিয়ে যায় জিয়ানার ওয়ার্ল্ডে।শপিং শেষে একেবারের কোনার একটা ডিসপ্লে ডলের গায়ে সাদা ড্রেসটা দেখে থেমে যায় নিবিড়।হাতে আর ব্যাগ রাখার জায়গা নেই।তবুও মনে হলো এই ড্রেসে জিয়ানাকে একেবারেই প্রিন্সেস লাগবে।যদিও জানে না সে পড়বে কিনা। তবুও লোভ হলো কিনার এবং শেষে কিনেই ফেলে।কিন্তু জিয়ানাকে কখনই বলতে পারবে না একবার ড্রেসটা পড়ে তার সামনে আসতে।
আর একটা জিনিস ভাবলো আগে ফ্ল্যাটে ফিরলে কেমন অশান্তি অশান্তি লাগতো। মনমরা একটা নিস্তব্ধতায় ঘেরা শুধুই ফ্ল্যাট। অথচ কাল রাত থেকে সেই অশান্তিটা অচম্বিতে উদাও। নিস্তব্ধতাও কেটে গেছে যেনো।জিয়ানার করা দুষ্টুমি গুলোতে পরিবার পরিবার একটা ব্যাপার আছে। গড়িয়ে পড়া পানিতে বাকা হাসির ঠোঁট প্রসারিত হলো। পরিবার? নিবিড়ের পাগল বউ?
তারপর স্বীদ্ধান্ত নিলো এখন থেকে জিয়ানার প্রতিটা বিরক্তিকর কাজে সে বিরক্ত প্রকাশ করবে না।যাই করুক সে জিরো রিয়েকশান দিবে।পাগলকে এত প্যাম্পার দেয়া যাবে না।কতবার বিরক্ত করবে। একসময় বিরক্তি এসে ওকেই বিরক্ত করবে যখন দেখবে নিবিড়ের কোন হেলদোল নেই।
তারপর মস্তিষ্ক ছুটে গেলো রাজনৈতিক ক্ষেত্রে।আর মনটা তখনই বিষিয়ে উঠলো।নিবিড়ের বিষাক্ত জীবনে স্বস্তির কোন কিছু নেই। একমাত্র জিয়ানা ছাড়া। এই মেয়েটা যখন মস্তিস্কে থাকে কেমন আরাম লাগে শরীরে। বাকি সবই বিষাক্ত ,বিরক্তিকর দ্বায়িত্ব ছাড়া আর কিছু না।
দীর্ঘ গোসল শেষ করে ,আরও পাঁচ মিনিট স্টিম শাওয়ার নেয়। তারপর বরাবরের মতোই কোমরে টাওয়াল পড়ে উর্ধাঙ্গ উন্মুক্ত রেখে বের হয়ে আসে।জিয়ানা ব্যাস্ত সব উল্টেপাল্টে দেখাতে।ড্রয়িং উকি মেরে দেখে গমগমে গলায় জিজ্ঞেস করে ,
-কাজ হয়নি এখনো? সাহস দেখি চূড়ান্ত দেখাচ্ছো মেয়ে?
-চুপ করুন তো। এই এগুলা সব কি এনেছেন? এতগুলা কে পড়বে? আমি এই কয়েকটা রাখছি। বাকিগুলা ফেরত দিয়ে আসবেন।
-নিবিড় একবার কিছু নিলে সেটা ফেরত দেয় না।
-আহা কি ডায়ালগ। অতি জঘন্য। তাহলে আপনি পড়ুন বাকি গুলা। একটা কথা বলুন তো টাকা কামড়ায় না চুলকায় আপনাকে? আর এগুলা কি কিনেছেন? হ্যাঁ?
বলে একটা নোড কালার ব্রাসিয়ার নিবিড়ের দিকে ছুড়ে মারে।সেটা গিয়ে পড়ে নিবিড়ের কাধে।ঝট করে নিবিড় কাধ ঝাড়া মেরে উল্টো ঘুরে যায়।তার গাল আর কান লাল হয়ে উঠছে।কেমন অসভ্য মেয়ে। একটু হায়া লাজ লজ্জা নেই। জিয়ানা নিবিড়ের হাল দেখে বলে,
-এহ আসছে লজ্জাবতী লাজুকলতা। নিজে নাঙ্গু হয়ে ঘুরে বেড়ায় অথচ এইসব দেখে লজ্জা পায়।আচ্ছা তো কিনলেন কিভাবে?হুম?
নিবিড় আবার জিয়ানার দিক ঘুরে একেবারে কাছে এসে চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে ,
-কেনো আমাকে এভাবে দেখে তোমার কিছু ফিল হচ্ছে?
এতকাছে হওয়াই জিয়ানার হঠাৎ অস্বস্তি ঘিরে ধরলো। চোখ সরিয়ে পাশে ফিরালে নিবিড় আবার বলে উঠলো ,
-আই ক্যান রিড পিপলস আইস এন্ড ফেস।তুমি লজ্জা পাচ্ছো রাইট?
জিয়ানা নিচ থেকে একটা কালো রংয়ের ব্রাসিয়ার নিয়ে নিবিড়ের মুখে গুছে দিয়ে বলে,
-এগুলা কি এনেছেন হ্যাঁ? এমন উঁচু উঁচু ফোলা ফোলা। যান বদলিয়ে আনোন।কম্ফি টাইপ আনবেন।
বলে রুম থেকে বের হয়।আর সাথে সাথেই ধপাস করে পিছলে পড়ে। জিয়ানার পড়া দেখে নিবিড় দম ফাটা হাঁসি শুরু করলো। জিয়ানা পড়ে মুখ চোখ কুচকে ফেলে। যত না ব্যাথা পেয়েছে এম্ব্যারসড বেশি হয়েছে।একেই বলে “অন্যের জন্য খুঁড়া খর্তে নিজেকেই পড়তে হয়”
মক্কুর ফোনে তখন থেকে বেজে চলেছে। বালিশের নিচে হাতরিয়ে জেনি ফোন বের করে আনে। মক্কু সেটা হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বন্ধ করে জেনির হাত চেপে ধরে।
নিবিড়ের ফোন বেজেই চলেছে। বিপবিপ করে ভাইব্রেট হচ্ছে সোফায়।জিয়ানার পায়ের কাছে হওয়ার পায়ের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে কেটে দিচ্ছে বারবার। আর আড়চোখে নিবিড়কে দেখছে ,খেতে খেতে টিভি দেখছে।জিয়ানা খাবে না এইসব বাহিরের বিরিয়ানি।তার ভাত মাছ ডাল চায় তার।নিবিড় ডোন্ট কেয়ার নিয়ে নিজে খাওয়াই ব্যাস্ত।
জিয়ানা পেপার কম নিবিড়কে দেখছে বেশি।লোকটার চোয়াল কি শার্প রে বাবা।এই ধারালো চোয়ালের কারণে চেহারায় একটা গাম্ভীর্যের ব্যাপার আছে।এইজন্যই আরও বেশি লিডার লিডার ভাব আছে।লম্বা চুল ,খোচাখোচা দাড়ি শ্যামা গায়ের রঙ মিলে একেবারে সুপুরুষের কম্বো।
হঠাৎ নিবিড় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। জিয়ানা মনোযোগ দিয়ে পেপার পড়ছে দেখে মুচকি হাঁসে।তারপর আবার টিভির দিকে চোখ রেখে বলে,
-যারা চুরি করে দেখে তাদের চুন্নি বলে।
জিয়ানা পেপার রেখে নিবিড়ের দিকে ফট করে এগিয়ে এসে হাতের পেপার দিয়ে নিবিড়ের বাহুতে মে*রে বলে,
-আমাকে চুন্নি বললেন? ভন্ড নেতা কোথাকার!
-যার মনে যা ফাল দিয়ে উঠে তা।
বলে নিবিড় হোঁ হোঁ করে হেঁসে উঠে।
জিয়ানা পাশে বসে মিহিয়ে যায়। এত কেনো চালাক এই লোক।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৩৫
ক্লাবে আকাশ চার পাঁচজন ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
-ভাইলোক জীবনে যদি উন্নতি করতে চাও তবে সেটা অবশ্যই বিয়ের আগে।কারণ বিয়ের পর বউয়ের পাল্লায় পড়ে কঠিন কঠিন পাথুরে মানুষ নরম কাঁদায় পরিনত হয়।এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের দুই নেতার।যারা ক্লাবেই খায় ,ক্লাবেই ঘুমায় অথচ আজ সারাদিন থেকে তাদের হদিস নেই। এমনকি আমার ফোনটা পর্যন্ত রিসিভ করছে না।
আমিও বিয়ে করতে চাই ভাই…..
বলে মেকি কান্না শুরু করলো। আর বাকিরা দমফাটা হাঁসিতে ফেটে পড়ে।
