Home নীতিহীন রাজ নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৮

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৮

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৮
আশিকা আক্তার সোহাগী

“সময় গেলে সাধন হবে না ” লালন গীতির এই গানটা রাফিনের জন্য প্রযোজ্য। সকালের চা পানের সময় দেখে জিয়ানা জাম্প সুট পড়ে হেঁটে বাহিরে যাচ্ছে।রাফিন জানে জিয়ানা সূর্য উঠার আগে ঘুম থেকে উঠে।সামনে তাকিয়ে ঘড়িতে দেখে আটটা বাজে।জিয়ানা নামার পাঁচ মিনিট পর নিবিড় নামে। আজকে বড্ড ফ্রেশ আর দ্যুতিময় চেহারায় হাজির নিবিড়।নিবিড় নেমেই একজন স্টাফকে বলে তাদের ঘর পরিস্কার করতে।
মিনিট দশেক পর বিনে বিনে ফুল যখন নিচে নামাচ্ছিলো। সেটা দেখে রাফিনের বুকের খাচা কেপে উঠলো। সেই কাপা খাচার নিচে প্রচন্ড জ্বলুনি আরও বাড়ে একজন গভর্নেন্সের সাথে আসমার ফিসফিসানি কথাতে।যা স্পষ্ট রাফিন শুনতে পেলো।

-নিবিড় ভাই এমনে দেহা গেলে কি হইবো মেলা রুমন্টিক আছে।রুমে গিয়া দেখি সারারুম খালি ফুল আর ফুল আর কি সুন্দর সুন্দর মোমবাতি।
-থাক এইসব বইলো না।পরে আমাগোর চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হইবো।
রাফিনের চা আর গলা দিয়ে নামে না।সাফা দৌঁড়ে এসে বলে,
-বাহিরে অনেক গুলা বাচ্চা ফুটবল নিয়ে দাঁড়িয়ে। খেলা হবে নাকি?
রাফিন জবাব না দিয়ে ভরাক্রান্ত মনে পা বাড়ায় বাহিরের দিকে।
নিবিড় বাহিরে এসে দেখে জিয়ানা অনেক গুলা বাচ্চার মাঝখানে দাঁড়িয়ে খিলখিলিয়ে হেঁসে বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।দূর থেকে নিবিড় অপলক চেয়ে ভাবে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কিভাবে সাধারণ হয়ে এতটা স্পেশাল হওয়া যায়? নিবিড়ের মাথায় আসে না।কিভাবে শুধুমাত্র একটা হাঁসির ঝলকে সারাশরীর অলংকৃত করা যায়? কিভাবে একটা মানুষের আগাগোড়া বদলিয়ে দেয়া যায়? ধ্যান ভাঙে রাফিনের হাত তার কাধে পড়ায়।নিবিড় ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দেয়।রাফিন থমথমে মুখে বলে,
-মেহেদী আর তুই একই ভুল করে প্রমাণ করলি তোরা একই নৌকার মাঝি। মেহেদী তোর উপর জেদ করে ফারহানাকে বিয়ে করেছে আর তুই আমার উপর জেদ করে জিয়ানাকে বিয়ে করেছিস।সেই পর্যন্ত না হয় ঠিক ছিলো। তুই মেয়েটাকে ব্যবহার করছিস কেন?
-তোর কাছে জবাবদিহি করতে কি আমি বাধ্য?
-জবাবদিহির ক্ষমতা থাকলে না করবি?
-যা খুশি ভাব।আই ডোন্ট কেয়ার।
-তোরা কতটা ঘনিষ্ঠ হয়েছিস?
নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে,

-একজন লেকচারার হয়ে এমন লেইম পার্সোনালিটি মানায় না।আর হাজবেন্ড ওয়াইফের কথা অতি পার্সোনাল।
রাফিনের বিক্ষিপ্ত মন তেতে উঠে। সে এগিয়ে গিয়ে নিবিড়ের কলার ধরে চোয়ালে ঘুষি মারে।নিবিড় প্রস্তুত ছিলো না বিধায় ঠোঁটে লেগে কেটে যায় সাথে সাথেই।সাফা পেছন থেকে দেখেই একটা চিৎকার দেয়।ফলে সবার দৃষ্টি নিবিড় আর রাফিনের দিকে স্থির হয়।জিয়ানা সহ বাচ্চারাও দ্রুত পায়ে তাদের দিকে আসে।নিবিড় ঘুষি খেয়ে ফটাফট রাফিনকেও দুইটা ঘুষি দিলো।পাল্টা মা*রামারি শুরুর আগেই জিয়ানা মাঝখানে গিয়ে নিবিড়কে টেনে সরিয়ে আনে।তারপর রাফিনের দিকে রক্তচক্ষু করে তাকিয়ে বলে,

-আপনার সাহস কি করে হয় আমার হাজবেন্ডের গায়ে হাত তুলার? দেখি কোন হাত দিয়ে মেরেছেন? পেছন থেকে নিবিড় নিজের ঠোঁটের রক্ত মুছে চমৎকার হাঁসে।এতে রাফিনের আরও মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সে তেড়ে আসলে জিয়ানা একপ্রকার চিল্লিয়েই বলে,
-খবরদার স্যার। কোন প্রকার হটকারিতা করলে আমি ভুলে যাবো আপনি আমার স্যার।
রাফিন অবাক চোখে তাকায়।পেছন থেকে সাফা বের হয়ে এসে কাচুমাচু করে বলে,
-উনি তো একটা মে*রেছে কিন্তু ভাইয়া দুইটা মেরেছে উনাকে।
জিয়ানা সাফার দিকে তাকিয়ে বলে,

-এই যে মিনি বিড়াল তোমার ওন্দা বিলাইকে আটকাও।আর হ্যাঁ যদি লড়াই করার ইচ্ছা থাকেই তবে আসল লড়াই করে দেখাক।বাচ্চারা ফুটবল খেলবে দুইজন দুই টিমের ক্যাপ্টেন হয়ে নিজের টিম জিতিয়ে দেখাক।দেখি কার বেশি পাওয়ার তোমার ওন্দা বিলাইয়ের নাকি আমার মুফাসার থুক্কু লায়ন কিংয়ের।
বলে নিবিড়ের বাহুতে টেপ করে।রাফিনের চোখ জিয়ানাতেই স্থির দেখে নিবিড় জিয়ানকে টেনে নিজের পেছনে এনে বলে,
-আমি রাজি।চল দেখি কেমন পারিস?
-চল।
এদের হটকারিতায় বাড়ির প্রায় সবাই বের হয়ে আসে। তাশদীদ এগিয়ে এসে বলে ,
-আমি তবে নিবিড় ভাইয়ের টিমে।
মেহেদী দেখে চলে যেতে যেতে বলে ,

-চাইল্ডিস।
পেছন থেকে রাফিন ডেকে বলে,
-কাপুরুষরা সব সময় পালায়।
মেহেদী চটাং করে নিজের ট্রি-শাট খুলে বলে,
-চল দেখি কে কতটা পুরুষ?
জিয়ানা কানা বকুলের এলাকার বাচ্চাদের নাম দিয়েছে “হিংটিংছট”। আর তার টিমের নাম দিয়েছে “গিলি গিলি হা”
তবে চারজনের মাঝে বাটাবাটি করে নিবিড় আর মেহেদী এক টিমে। রাফিন আর তাশদীদ এক টিম তারা হিংটিংছট এর গ্রুপ।রাফিন ক্যাপ্টেন। এদিকে মেহেদী নিবিড়ের ক্যাপ্টেন্সি মানবে না।তাই তাদের মাঝে পাজ্ঞা লড়ায় করানো হয়।নিবিড় জয়ী হয় তাই সেই ক্যাপ্টেন্সি করবে।
জিয়ানা তার টিমকে বুঝাচ্ছে ,

-শোন। এরা সব বড়লোক বাপের হারামি টাইপ পোলা।সব খেয়ে বসে জিম করে ঝাকানাকা পিন্ডা বানিয়েছে।তোরা সব চুনোপুঁটি এদের কাছে।এরা যখন বল নিয়ে ছুটবে সাইড দিবি।কান খুলে শোন জীবনের আগে টাকা কিচ্চু না।বুঝা গেছে? আর একটা কথা এদের মাথায় ছিট আছে কিন্তু।দেখা যাবে খেলার মাঝখানে নিজেরাই কামড়াকামড়ি শুরু করলো। তোরা তখন এককোনায় থেমে যাবি।ঠিক আছে?
সবাই সমসুরে চিল্লিয়ে উঠে” ওক্কে ওস্তাদ”
নিবিড় রাফিনরা চেঞ্জ করে শর্টস আর জার্সি পড়ে এসেছে।জিয়ানা হাত তালি দিয়ে সবাইকে কাছে ডেকে বলে,

-আমি রেফারি….
বলার আগেই জিয়ানার হাতে টানা পড়ে। নিবিড় তাকে ধরে টেনে মাঠের একসাইডে নিয়ে যাচ্ছে।সবাই সেদিকে একবার তাকিয়ে নিজেদের কাজে মন দেয়।কুলসুম ,স্বপ্না ,লতা দাস (অনুরাধার মা) ফারহানা ,ফাইজা,মাইমুনা সহ বাড়ির স্টাফটাও দাঁড়িয়ে আছে মাঠের সাইডে।এই বাড়িতে বহুদিন এমন ঘটনা ঘটেনি।অনুরাধা মারা যাওয়ার পর থেকে তো এরা তিনজন জাতশত্রুতে পরিনত হয়েছে।একে অপরের খোমায় দেখতো না।অথচ আজ খেলতে নেমেছে।কুলসুম জিয়ানার দিকে তাকায়। আজকাল তার বড্ড সুখী দেখতে ইচ্ছা করে এই পরিবারের মানুষ গুলোকে।যে সুখের জন্য নিজের স্বামীর আদেশ মেনে নিজ সন্তানদের খুনিকে সন্তানের পরিচয় দিয়ে আসছে এতকাল ,সেই সুখ তো ধরা দেয়নি তাকে।এই মেয়েটার অছিলায় যদি আবার খন্ডাংশ জোরা লাগে।
বড় আম গাছের আড়ালে নিয়ে হাত ছেড়ে থুতনি ধরে নিবিড় জিজ্ঞেস করে ,

-তোমার কি মাথা খারাপ জিয়ানা?এখন যদি তুমি ফুটবল খেলতে নামো অসুস্থ হয়ে পড়বে না?
-আ’ম ফিট এন্ড ফাইন্ট। টেনশন নট। তাছাড়া আপনিও তো খেলতে চাচ্ছেন?
-তুমি আর আমি কি এক?
-কেনো এক না কেনো? নারী পুরুষ সমতা নিয়ে কত আন্দোলন হচ্ছে দেখেন না?
-নারী পুরুষ সমতা কখনো সম্ভব না জিয়ানা।নারীর অবস্থান অনেক বেশি উঁচুতে।তারা জান্নাতে সৃষ্টি।পৃথীবীতেও সম্মানের দিক দিয়ে বহু উপরে রাখা হয়েছে।

-ওয়াহ। ভালোই তো হাদিস কুরআন জানেন। তবুও এমন ভন্ডামী করেন ক্যান?
-হাদিস কুরআন সব ফু-আম্মু শিখিয়েছেন।কথা ঘুরিয়ে লাভ হবে না।রেফারিকেও অনেক দৌঁড়াতে হয়।
তারপর কানে কানে কিছু একটা জিজ্ঞেস করলে ,জিয়ানা মাথা দিয়ে হ্যাঁ বুঝায়।নিবিড় তাই আবার বলে,
-চুপচাপ একসাইডে দাঁড়িয়ে দেখবে।লাফালাফিও করবে না। মনে থাকবে?
নিবিড়ের বলা কথা সত্যি।তার অস্বস্তি হচ্ছে। তবে শরীরের কষ্ট চিরকাল এড়িয়ে চলায় আজকেও ভেবেছে একই রকম।তাই বাধ্য হয়েই নিবিড়ের আদেশ মেনে নিলো।
সবার যখন খেলা শুরু করবে। তখন নিবিড় এনাউন্স করে,

-খেলার ফার্স্ট প্রাইস পঞ্চাশ হাজার টাকা।আমার পক্ষ হতে যাবে।
বাচ্চারা হইহই করে তালি দেয়া শুরু করলো। তাদের থামিয়ে রাফিন বলে ,
-আমার পক্ষ হতে সবাইকে বুফের ট্রিট।
মেহেদী আর পিছিয়ে থাকবে কেন ,সেও এগিয়ে বলে,
-আমি সবাইকে শপিং করে দিবো।
একজন হ্যাংলা পাতলা গার্ড রেফারি হয়েছে।গেটের দারোয়ানের বাঁশি তার হাতে।প্রতিদিন নিয়ম করে মাঠ ট্রিম করার কারণে ঘাস সমানভাবে বিন্যস্ত। একটা কোদাল দিয়ে পেনাল্টি স্পট আর গোলপোষ্ট বানানো হলো।বাকি যা আছে তাই।বাঁশি ফুকার সাথে সাথেই রাফিন বল নিয়ে ছুটলো। একসাথে সব বলের দিকে ছুট লাগায়।
জিয়ানার কাছে লাগে তিনটা দামড়ার মাঝে একটা দেশি গরু আর কতগুলা বাছুর দৌঁড়াচ্ছে।

খেলা একেবারেই জমে ক্ষির।রাফিনের গতি দুর্দান্ত।নিবিড় আর মেহেদী পেরে উঠছে না তার সাথে।অলরেডি দুইটা গোল নিবিড়রা খেয়ে ফেলেছে।জিয়ানা পা খিচিমিচি করছে শুধু। আর তার মনটা চাচ্ছে টেবিলের উপর উঠে নিবিড়ের গলাটা টিপে ধরে টাস টাস করে দুইটা চটকানা দিতে।কত্ত বড় বদের বদ নিজে তো খেলছেই তাকে পুতুলের মতো সাজিয়ে রেখেছে। এই ভন্ডলোককে বিয়ে না করে সেদিন যদি সবাইকে কেলিয়ে বের হয়ে যেতো বাসা থেকে। তবে এত অধিকার সব ছুটে যেতো।একটু একটু বলে সম্পুর্ণ আদর নামের তান্ডবও সহ্য করা লাগতো না।আর না এভাবে পুতুল হয়ে বসে থাকা লাগতো।আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলে,
-এত কড়া জামাই না দিয়ে হাল্কার উপর অল্প কড়া একটা দিতা?
বিশ মিনিট খেলে তারা বিরতি নেই।কারোরই অভ্যাস না থাকাই সবাই ঘাসে শুয়ে পড়েছে।জিয়ানা একটা ইনটেক বোতল নিয়ে নিবিড়ের কাছে যায়।নিবিড় পা মেলে হাত দিয়ে পেছনে হেলান দিয়ে বসে আছে।পানির বোতল মুচড়িয়েও জিয়ানা খুলতে পারছে না।কারণ তার হাত ঘেমে পিচ্ছিল হয়ে গেছে।বেশি এক্সাইটেড হলে তার হাত পা খেমে যায়।নিবিড়ের পেছনে গিয়ে বলে,

-এটা একটু খুলে দেন তো?
-নিবিড় জিয়ানার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
-রুমে চলো। সব খুলবো।
জিয়ানা নিবিড়ের বাহুতে বোতল দিয়ে বাড়ি দিয়ে বলে,
-পার্ভাট।আমি এটার কথা বলেছি।
নিবিড় হো হো করে হেঁসে উঠে।কিছুটা দূর থেকে রাফিন আর মেহেদী তাকায় তাদের দিকে।রাফিন আবার মাথা ঘুরিয়ে আকাশের দিকে তাকায়।পাশ থেকে মেহেদী বলে,
-শা*লার হাঁসিই থামে না দেখি।
-তুইও হাঁস। মানা কে করেছে?
রাফিনের কথা শুনে মেহেদী উঠে বসে বলে,
-তুই কি সত্যিই এই মেয়ের এক্স ছিলি ভাই? এত কুল কিভাবে থাকিস এদের ঢং দেখে? আমার তো মাথায় রক্ত উঠে যায় চিন্তা করলেই।

-তোর কি মনে হয় এই মেয়ে রিলেশন কিংবা প্রেমিকা ম্যাটারিয়ালের? অনেক রিকুয়েষ্ট করে তিন চারদিন ফোনে কথা বলেছিলাম।তবুও সে পড়াশোনা ছাড়া অন্যকোন কথার দিকে যেতেই দেয়নি।একদিন জোর করে রেস্টুরেন্টে বসেছিলাম। পুরাটা সময় গপাগপ খেয়ে গেছে।কাউকে ইমপ্রেস করার নূন্যতম্য ইচ্ছা তার মাঝে নেই।
-তবে তুই আর নিবিড় ঘায়েল হলি কি জন্য?
-এই যে যেমন দেখছিস ঠিক তেমনই তার ভেতর আর বাহির।কারো জন্য ক্ষতিকর না।সবচেয়ে বেশি টানে স্ট্রাগল স্পিরিট ব্যাপারটা।তাছাড়া নিলু মাসির মতো ইনোসেন্ট একটা ফেস তো আছেই।
মেহেদী সাফার দিকে ইশারা করে বলে,

-তবে বিয়ে করলি কেন?
রাফিন উত্তর দেয় না।তাই মেহেদী আবার প্রশ্ন করে ,
-বউকে কি কাছে টাছে নিয়েছিস নাকি সাধুগিরী দেখাস?
এবারও রাফিন উত্তর দিলো না,তবে চোখের পাতা কেপে উঠায় মেহেদী হোঁ হোঁ করে হেঁসে বলল,
-শা*লা পুরুষ মানুষের জৈবিক চাহিদার কাছে শতবর্ষয়ী প্রেমও কিচ্ছু না।
এরমাঝে রেফারি রুপি গার্ড বাঁশি বাজালে সবাই উঠে যায়।জিয়ানা নিবিড়কে আর টিমকে চেয়ার আপ করে। নিবিড়ের কানে কানে কিছু একটা বললে ,সে ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাঁসে। জিয়ানা মাঠ ছেড়ে বেড়িয়ে গেলে মেহেদী পাশে এসে বলে,

-জীবনে একবার বাসর করে তোর মুখ থেকে হাঁসি সরছে না দেখি?
-যে বছরে ৩৬৫দিন হারাম বাসর করে সে কি করে বুঝবে হালাল বাসরের মর্ম?
বলে বলের পেছনে ছুটা শুরু করে। বল রাফিনের কাছ থেকে আক্কাস কেড়ে নিয়ে মেহেদীকে পাস করে।মেহেদী পায়ের তালে কিছুটা দৌঁড়ে এগিয়ে নিবিড়কে পাস করে পেনাল্টি স্পটের দিকে এগিয়ে যায়।নিবিড়কে রাফিন চেষ্টা করে ফাউল করতে। যেনো পেনাল্টি স্পটে ঢুকতে না পারে।মেহেদী চিল্লিয়ে যাচ্ছে জোরে জোরে পাস পাস ,পাস দ্যা বল ইডিয়েট।কিন্তু নিবিড়ের টার্গেট আর একটু এগিয়ে সোজা গোলপোষ্টের দিকে শট করা।নিবিড় একটা ফেইক মুভ করে। ফলে রাফিন ভুলে সেই দিকে সরে যায়।আর এই সুযোগে নিবিড় পেনাল্টি স্পটে গিয়ে তাশদিদের দিকে তাকিয়ে একটা কড়া শট করে। তাশদিন ঘাবড়ে উল্টা দিকে জাম্প করে। আর গিলিগিলি হা টিম প্রথম গোল করে। ফলে স্কোর 2/1। জিয়ানা লাফিয়ে উঠে পাশে স্বপ্নাকে জড়িয়ে ধরে। পরপর কুলসুম আর মাইমুনার সাথে কোলাকুলি করে।কিন্তু সাফা তার প্রতিপক্ষ। রাফিন গোল দেয়ার পর সে অনেক ভাব নিয়েছে।এইবার জিয়ানা সাফার কাছে গিয়ে বলে,

-দেখ লুংজ্ঞা। হুহ
সাফা ভেঙ্গচি কেটে বলে ,
-আমরাই জিতবো।
এদিকে মাঠে নিবিড়কে ফেলে তার উপর মেহেদী শোয়ে কোলাকুলি করছে।নিচ থেকে নিবিড় একটা ল্যাং মেরে ফেলে উঠে বলে,
-শা*লা চরিত্রহীন।
মেহেদী নিবিড়ের গলা হাতের ভাজে চেপে ধরে বলে,
-গোল দিয়ে পরিবারের সামনে মান সম্মান বাঁচানোর জন্য ,আজ থেকে তোর বউ আমার বোন যাহ।
নিবিড় ধাক্কিয়ে সরিয়ে বলে,
-চাল হাট। আমার বউয়ের ভাই এখনো বেঁচে আছে…
ভুলে মুখ ফস্কে বলে ফেলায় মেহেদী সোজা হয়ে যায়।নিবিড়ের দিকে তাকানোর আগেই আবার বাঁশি বেজে উঠে।

পাকা সকালের রোদটা খুব একটা মিঠা হয় না।তবে চারপাশে গাছ থাকলে প্রাণজুড়ানো একটা হওয়া বয়।নূর ম্যানসনের পেছনের নারকেল সুপারির গাছ গুলা সেই হাওয়াই তিড়তিড় করে কাপছে।এমন শীতল হাওয়াতেও ঘেমে ছপছপ হয়ে গেছে খেলারত প্লেয়াররা।
তরুন আর প্রবীণের মিশেলে অগোছালো জঙ্গলের মতো এখন মাঠের খেলার অবস্থা। যে যেমন পারছে ফাউল করছে।বাচ্চারা শুধু মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওইপ্রান্ত দৌঁড়াদৌড়ি করছে। বল একটাও ক্যাচ করতে পারছে না।সময় আছে আর দশ মিনিট। রাফিনরা এক গোলে এগিয়ে আছে।
ফারহানা আর ফাইজা টেনে বের করে আনে ফিজানকে। সে ট্যাব নিয়েই গেমে ব্যাস্ত।কিছুতেই বাহিরে আসবে না।বাহিরে আসার পর যখন দেখলো সবাই খেলছে।তখন তার আগ্রহ হয়।আর জিয়ানার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,

-আই ওয়ান্টস টু প্লে অলসো!
-ওরে ইংরেজের বংশধর। এতক্ষণ কোথায় ছিলি?খেলা প্রায় শেষ।
ফিজান মুখটা বিষিয়ে আবার ঘরের দিকে যাত্রা শুরু করলে জিয়ানা হাত টেনে বলে,
-তুলম্বা তুই আর আমি দুধভাত। ওদের খেলার স্পোর্টসকাস্টার আমরা।চল শুরু করি।
-ওহ রিয়েলি? কিন্তু কিভাবে করে?আমি তো জানি না।
-ওয়েট। আমি শুরু করছি।
বলে পাশ থেকে একটা বোতল নিয়ে মুখের কাছে ধরে স্পিকার বানিয়ে বলে,
-হিংটিংছটের খাম্বা আই মিন ক্যাপ্টেন রাফিন রকেট গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু গিলিগিলি হা এর শক্তিমান সুখনীল ফু মেরে উড়িয়ে দিলো। মু হা হা…
ফিজান হেঁসে কুটোকুটি হয়ে বলে,

-আরও বলো?ড্যাডকে নিয়ে বলো?
-ওকে। গিলিগিলি হা এর একমাত্র আকাইম্মা প্লেয়ার কম স্টাইল মা*রানি তুলম্বার বাপ হালকা মেহেদী দৌঁড়াচ্ছে দৌঁড়াচ্ছে কিন্তু একি উনার হাওয়া ফুসসসসস…..
ফিজান এবার খিলখিয়ে হেঁসে বলে,
-তুমি এইভাবে কথা কোত্থেকে শিখেছো?
-বই থেকে।
-কোন বই?আমিও পড়তে চাই।দিস সিমস ভেরি ইন্টারেস্টিং।
-বড় হয়ে নে আগে। আমি তোকে গিফট করবো।

দূর থেকে ফারহানা খেয়াল করে ফিজানকে। সহজেই কারো সাথে মিশতে পারে না।ডিভাইজে অ্যাডামেন্ট হয়ে যাচ্ছে দিন দিন বাচ্চাটা ।এমন পরিবেশ পেলে হইতো ঠিক হবে আস্তে-ধীরে। ফিজানের দিক থেকে চোখ সরিয়ে জিয়ানার দিকে তাকায়।তারপর খেলারত নিবিড়ের দিকে তাকায়।যে ছেলে মেয়ে দেখলেই নাক ছিটকাতো ,সে কাল রাতটা স্ত্রীকে বিশেষ ফিল করানোর জন্য দুইট্রাক ফুল দিয়ে ঘর সাজিয়েছে।
কালচারাল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলো নিবিড় তাদের কলেজের।একই ব্যাচ আর ডিপার্টমেন্টও একই।নিবিড়ের চলাফেরা আর লায়ন্স ভয়েসের কারণে একটা লিডার লিডার ভাব ছিলো আগে থেকেই।অন্যরা যেখানে চিল্লাচিল্লি করেও প্রোগ্রাম সাজাতে পারতো না।সেখানে নিবিড়ের এক ধমকেই সোজা হয়ে যেতো সবাই।ফারহানা তখন ডিভেট করতো।নাম লেখাতে গিয়ে নিবিড়ের সাথে পরিচয়। কখনো একটা সিঙ্গেল কথাও বলতো না।এমন কি প্রশ্ন করলেও হুম না তেই উত্তর দিতো নিবিড়।কিন্তু একবার প্রোগ্রামে ফারহানা তার স্পিচ হারিয়ে ফেলায় কান্নাকাটি শুরু করে। নিবিড় গিয়ে বলে সে রেডি করে দিচ্ছে।পাশে মেহেদীও ছিলো সেদিন।মেহেদী ছিলো ক্যাডেট কলেজের।ছুটিতে হইতো গিয়েছিলো নিবিড়ের কলেজে।

এরপর থেকে মেহেদীর হাই হেলো শুরু। ফারহানা এক ভাইয়ের কাছে পাত্তা না পেয়ে অন্য ভাইয়ের আচরণে তাকে বন্ধু করে নেয়।কিন্তু মেহেদী দিন যেতেই কেয়ারিং আর লাভিং বিহেভে ফারহানা তার প্রেমে পড়ে। তারপর থেকে এইতো হাত-পা সব ভেঙে পড়েই আছে সেখানে।তাই তো মেহেদী আর দেখেও দেখে না তাকে।এমন না যে আগেও দেখতো।বিয়ের পর থেকে একদিনের জন্যও তারা কাছাকাছিও আসেনি। দুই বছর পর পর দেশে এসেছে ঠিকই। সেটা কেবল নিবিড়কে জ্বালানোর জন্যই।কখনো নিজের ছেলেটাকেও কাছে টেনে নেয়নি।
কাল সকালে গেস্টরা আসার আগে জিয়ানা যখন ফিজানের মাথায় হাত বুলিয়ে ফারহানার উদ্দেশ্যে বলেছিলো,
-আর একটা সুখনীল নিবিড় যদি বানাতে না চান ভাবি তবে সময় থাকতে পদক্ষেপ নেন।পুরুষ মানুষকে কখনো সরাসরি পানি দিলে খাবে না।এদেরকে মাথার পেছন দিয়ে কানের পাশ দিয়ে হাত ঘুরিয়ে পানি দেন আলগোছে গ্রহন করবে।তারা যখন বুঝবে কেউ তার জন্য আকুল কিংবা ম*রে যাচ্ছে ,এরা তখন সেই ম*রাকে আরও জোরে চেপে ধরে তাড়াতাড়ি মা*রাতে চায়।

জিয়ানার কথায় ফারহানা বুঝেছে ,সত্যি সে রং পাথে ছিলো এতদিন।তারও যে একটা আলাদা ব্যাক্তিত্ব থাকা উচিত সেটা যেনো ভুলেই বসেছিলো।মেহেদীর বর্তমানে দুইজন গার্লফ্রেন্ড আছে।নিত্যদিন তাদের সাথেই রাত কাটিয়ে ভোরে বাসায় ফেরে।আচ্ছা ছেলেদের শরীর কি নোংরা হয় না? তারা কি পবিত্র মাটিতে দিয়ে বানানো? তারা নোংরা হয় না ঠিকই কিন্তু যে মেয়েদের ছুঁয়ে দেয় তারা ঠিকই নোংরা হয়।আজ যদি মেহেদীর করা কাজ অর্ধেকও ফারহানা করতো তবে কি এই পরিবার কিংবা সমাজ চুপ করে থাকতো?অথবা মেহেদীই কি শুধু ভালোবাসার খাতিরে ফারহানাকে কাছে পেতে চাইতো? তবে ফা্রহানা কেনো চাইছে? সে যথেষ্ট ভালো পরিবারের মেয়ে।তাদের সব আছে।তবে ব্যাক্তিত্ব হারিয়ে একটা শেল্টারের জন্য শুধু শুধু এখানে পড়ে আছে কেনো? মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় , এবার মাথা উঁচু করে বাঁচবে।

স্বপ্না হনহন করে ভেতরে চলে যাওয়াই ফারহানা ভাবনা ছেদ হয়। নজর ঘুরিয়ে দেখে আবার জিয়ানাকে আর ফিজানকে। দুইজন হাই ফাইভ করছে।
ফিজান লাফিয়ে লাফিয়ে মাঠে চলে গেছে।মেহেদী একবার ফিজানকে দেখে আবার খেলায় মনোযোগ দিলো।রাফিন হাত তালি দিয়ে ফিজানকে নিজের টিমে নেয়।
বিপবিপ করে জিয়ানার টাওজারের পকেটে নিবিড়ের ফোন ভাইব্রেট হলো।জিয়ানা বের করে দেখে ডাঃ শিফন ইজ কলিং।নিবিড়ের সাইকাইট্রিস। একটু সাইডে সরে গিয়ে রিসিভ করে সালাম দেয়ার পর নিজ পরিচয় দেয়।
ডাক্তার প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো ,

-আপনাদের সম্পর্কের কি অবস্থা?
জিয়ানা হেঁসে বলে,
-আলহামদুল্লিহ।
-ক্লিয়ারলি বলেন।কতটা ঘনিষ্ঠ হয়েছেন? দেখুন ডাক্তার আর উকিলের কাছে হেজিটেজ করলে হয় না।সব খুলে বলতে হয়।
-জ্বি জানি।উই হেভ বিকাম ক্লোজ।আই মিন ভেরি ক্লোজ।
-নিবিড়ের রিয়েক্টশন সব স্বাভাবিক ছিলো?
-বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়েছে আমি জিয়ানা।
-খুলে বলুন?
জিয়ানার মেজাজ তিড়তিড়ে খারাপ হওয়া শুরু করলো। সে কাটকাট গলায় বলল,

-আপনার পেসেন্টকে জিজ্ঞেস করবেন।আপনি আমাকে কোওপারেট করতে বলেছেন ,ব্যাস আমি করেছি।তার কোন প্যানিক এট্রাক্ট হয়নি।হি ইজ কমপ্লিট ফিট এন্ড ফাইন।
তারপর খট করে ফোন ডিস্কানেক্ট করে দিলো।এরমাঝে হৈহল্লার শব্দে ঘুরে দেখে রাফিনরা আরেকটা গোল দিয়েছে।জিয়ানার মেজাজ এবার বিস্ফোরকের মতো ব্লাস্ট হওয়া বাকি।
মুখটা নিমখাওয়ার মতো কুচকে কোমড়ে হাত রেখে তাকিয়ে আছে নিবিড়ের দিকে।নিবিড় হাটুতে হাত দিয়ে হাপাচ্ছে।মেহেদী চার হাত পা চারদিকে দিয়ে শুয়ে পড়েছে।জিয়ানার টিম গিলিগিলি হা কেঁদে দিবে কেঁদে দিবে ভাব।ফিজানকে কাধে নিয়ে রাফিন বাচ্চাদের সাথে মজা করছে।তাহানি এসে তার বাবার কোলে চড়ে সেও হই হই করছে।জিয়ানা হনহন করে মাঠে ঢুকে বলে,

-টাকা দুই ভাগ হবে।বাচ্চারা তোরা কোন গোল দিতে পারিস নাই।সব বড়রা স্কোর করেছে।তাই খেলা ফেয়ার হয়নি।
নিবিড় সোজা হয়ে বলে,
-রাইট।
রাফিন মুচকি হেঁসে বলে,
-কথা সত্য।তবে দুই টিমই ভালো খেলেছে।পঁচিশ হাজার করে পাবে তোমরা।
এবার রাব্বিরা হৈহৈ করে উঠলেও কানা বকুলের এলাকার পোলাপান চুপ মেরে যায়।পেছন থেকে মেহেদী শুয়েই বলে,
-রাফিদা তুই যে এই গেমে জিতবি জানা কথা।আগে থেকেই গতির দানব গদা তুই।খেলতে যখন নেমেছি চল কোর্স কমপ্লিট করি? গাছে উঠার চ্যালেঞ্জে আমাকে কোনদিন তোরা হারাতে পারিসনি।
নিবিড় জিয়নার হাতের বোতলটা খুলে পানি খেয়ে বলে,

-যদি হারিস তবে?
-যদি জিতি তবে?
-তোর পাঁচটা প্রশ্নের উত্তর দিবো। যাহ।
বলে বোতলটা মেহেদীর দিকে ছুড়ে।মেহেদী বোতল থেকে পুরা পানি খেয়ে বলে,
-দ্যাসট স্পেলেনডিড।দ্যান লেটস গো।
রাফিন বলে ,
-দশ মিনিট রেষ্ট নেই দাঁড়া। হাওয়া সব বের হয়ে গেছে।
পেছনে ঘুরে দেখে সাফা একটা টাওয়াল আর বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।কিন্তু দেয়ার সাহস পাচ্ছে না।এদের দেখে মেহেদী ফারহানাকে খোজে ।সে নেই এখানে।

স্বপ্না হনহন করে দোতলায় উঠে নিবিড়ের রুমের সামনে থামে।রুম থেকে লতা বের হচ্ছে চুপিসারে। স্বপ্নাকে দেখে হকচকিয়ে গিয়ে থেমে যায়।স্বপ্না এগিয়ে গিয়ে ঠাস করে একটা থা*প্পর দিয়ে বলে,
-আমার সাথে যে অন্যায় করেছিলি সেই একই অন্যায় আমি আমার ছেলের বউয়ের সাথে হতে দিতে পারি না লতা? তুই বহুবছর থেকে আশ্রিতা হয়ে এই বাড়িতে আছিস মানে এই না যে ,নিজেকে কর্তি ভাববি? আন্টি নিজের একটা অন্যায়ের জন্য তোকে এতটা লায় দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতেও দুইবার ভাববে না।ওই ঘরে ঢুকেছিস কেন বল? কি নিতে গিয়েছিলি? জাদুকরী ,অসভ্য? এখনো কিসের লোভ তোর?
লতা কাচুমাচু করে বলে,

-ভাবি। আমি তো ,আমি তো…
পেছন থেকে মাইমুনা এসে বলে,
-লতা আন্টি পেয়েছো?
স্বপ্না আর লতা একসাথে তাকায়।লতা হাপ ছেড়ে বাঁচে মাইমুনাকে দেখে।স্বপ্না জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখে মাইমুনা বলে,
-তাহার গায়ের মাসিপিসি নামের একটা দানাদানা কি যেনো বের হয়েছে।কাচা দুধ আর অষ্টধাতু চোবানো কুসম পানি দিয়ে গোসল করালে নাকি সেরে যায়।তাই নিবিড় ভাইয়ের ঘরে অষ্টধাতুর টিস্যুবক্সটা নিতে পাঠিয়েছিলাম।
স্বপ্নার ভাজ করা কপাল সোজা করে বলে,

-বিনা অনুমতিতে কারো ঘরে প্রবেশ করা যে অভদ্রতা সেটা তো তোমার জানার কথা মুনা? বিশেষ করে এই ঘরে
কেউ ঢুকলে নিবিড় একেবারেই পছন্দ করে না। তুমি খুব ভালো করেই জানো? কথা হচ্ছে নিবিড় তো লক ছাড়া কখনোই রুম খোলা রাখে না।চাবি পেলে কোথায় লতা?
লতা এবার কাপা গলায় বলে,

-দরজা খোলায় ছিলো তো।এখন বউ হইছে না? এখন কি আগের মতো লক করা মানাইবো নাকি?
স্বপ্না দুইজনকেই দেখেই সেখান থেকে চলে আসে।কিন্তু তার মনের খচখচানি ভাব কাটে না।
স্বপ্না চলে আসার পর মাইমুনা লতাকে ইশারা করলে বলে,
-মামুনি কিচ্ছু পাইনি। এই মাইয়া কি তেল দেয় মাথায় ভগবান জানেন।একটা চুলও নাই ঘরে।এমন কি ব্যবহারের কাপড় সব ওয়াশিং মেশিনে দেয়া।
মাইমুনা তর্জনী আঙুল দিয়ে চুপ করতে বলে নিচে যেতে ইশারা করে।

দেখে দেখে সবচেয়ে বড় গাছটা বাছাই করা হলো।মোটা একটা আম গাছ।এই গাছটা একেবারে পেছনের দিকে। খেলাটা হবে কে কত দ্রুত গাছের মগডালে উঠে আবার নামতে পারে।একটা বিরামঘড়ি তাশদিদের হাতে আছে।শুরু করার সাথে সাথেই সেটা অন করা হবে।আর নামার সাথে সাথেই অফ।
প্রথমেই রাফিন শুরু করলো।হাতে মাটি ঘষে খসখসে করে নিলো। যেনো স্লিপ না কাটে।গোড়ার দিকটাই উঠতে বেশ অসুবিধা হলেও পরের স্টেপ গুলা ফটাফট উঠে আবার নেমে গেলো। রাফিনের দল ভারি। বাচ্চাগুলা সব তাকে চেয়ারাপ করছে।রাফিনের সময় লেগেছে এগারো মিনিড় সাতচল্লিশ সেকেন্ড।তবে তার বুক আর হাতের কনুই ছিলে গেছে গাছের ঘষায়।

এবার মেহেদী।এই বান্দার দলে শুধু ফিজান। আর কেউ চিয়ারাপ করলো না।কিন্তু তার উঠতে আর নামতে দেখে জিয়ানার কাছে মনে হলো ,এই ব্যাটা বান্দর গোত্রীয়। কিভাবে যেনো একহাত দিয়ে ঝুলে ঝুলে উঠে গেলো গাছে।এমন কি মোটা গোড়ায় উঠেছে দূর থেকে দৌঁড়ে এসে রানিং অবস্থায়।মেহেদীর সময় লাগে সাত মিনিট নয় সেকেন্ড।
এবার নিবিড় হিরোপান্তি করে টান দিয়ে নিজের ট্রি-শার্ট খুলে জিয়ানার দিকে ছুড়ে মারে।জিয়ানা শাসিয়ে বলে,
-এবার হারলে আপনাকে কালা পানিতে চুবিয়ে হিরোগিরী ছুটিয়ে দিবো।
নিবিড় মুচকি হেঁসে গাছে উঠা শুরু করে। রাব্বিরা এখন নিবিড়ের দলে চলে এসেছে। নিবিড়ের ডাল গুলা ক্রস করতে সমস্যা হচ্ছিলো। তবুও ব্যাথা পাওয়া ছাড়া যখন নামে বিরামঘড়িতে তখন সময় দশ মিনিট বারো সেকেন্ড।
জিয়ানা চোখ ছোট ছোট করে নিবিড়ের দিকে তাকায়।নিবিড় এগিয়ে এসে জিয়ানার হাত থেকে ট্রি-শার্ট নিতে নিতে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে,

-কাল রাতে বড় ট্রফি জিতে এইসবে এখন আমার আর মন নেই।
জিয়ানা নিবিড়ের বাহুতে পাঞ্চ শুরু করে। গজরাতে গজরাতে বলে ,
-ভন্ড লোক একটাতেও জিতলো না।মান সম্মান সব শেষ।
মা*র খেতে খেতে নিবিড় বলে,
-দাঁড়াও আমার কারমা দেখাচ্ছি।
রাফিন তাকাবে না তাকাবে না করেও জিয়ানাকে আড়চোখে কয়েকবার দেখে নিয়েছে।ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে নিবিড় সবসময় গম্ভীর। কিন্তু গত দুই দিনে তার মুখে একটা চমৎকার হাঁসি লেপ্টে থাকে।আজকে তো চেহারায় পাল্টে গেছে যেনো।রাফিনের হারানো সুখ নিবিড়ের ঘরে বলেই কি এত উৎফুল্লতা? রাফিনের আবার বুক জ্বলে। সাফার হাত থেকে বোতল নিয়ে ডগডগ করে পানি চালান দেয় নিজ গলায়।
নিবিড় নিজের বজ্রকন্ঠে সবাইকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে,

-তোরা তো নিজেদের পারদর্শীতা দেখালি।এবার আমার পালা।পুল সাইটে চল।দেখি এখন কেমন সুইম পারিস তোরা?
মেহেদী নিবিড়ের দিকে এগিয়ে এসে বলে,
-প্রশ্নের উত্তর?
-সব শেষে দিবো।
তাই সবাই পুল সাইটে যায়।তখন ভেতর থেকে গভর্নেন্সরা ট্রে তে করে সকালের হালকা কিছু নাস্তা আনে।কেউই আজ ব্রেকফাস্ট করেনি।তাই কুলসুম এখানেই পাঠিয়ে দিয়েছে।বাচ্চাদের সবাইকে জেলি ব্রেড ,ডিম সিদ্ধ আর জোস দেয়া হলো। জিয়ানাও ওদের সাথে খাচ্ছে।নিবিড় ইশারা করেছে মুখ ভরে না খেতে।জিয়ানা পাত্তায় দেয়নি তার ইশারার।সবাই খেলেও নিবিড়রা খেলো না। তাদের শরীর হালকা রাখা দরকার।

এবারও রেফারি তাশদিদ।হুইশেল বাঁশি নিয়ে সে দাঁড়িয়ে । অপরদিকে নিবিড় মেহেদী আর রাফিন পুলের অপরদিকে পজিশন নিয়ে রেডি।হুইশেল ফুকার সাথে সাথেই ঝপাত করে তিনজনই লাফ দেয় পুলে।লাফের সময়ই নিবিড় এদের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে ছিলো।নিবিড় সাতার কাটছে ঠিকই ,উপরে জিয়ানা নিশ্বাস বন্ধ করে হাত পা ছুড়ছে শুধু। সবার আগে নিবিড় পুলের একপাশে হাত দিয়ে স্পর্শ করে কুইক ঘুরে যায়।এবং পা দিয়ে জোরে ঠেলে আবার ব্যাক করে স্টার্টিং স্পটের দিকে।নিবিড় যখন ব্যাক করে মাঝামাঝি মেহেদী আর রাফিন তখন মাত্র এক রাউন্ড শেষ করে।জিয়ানা লাফিয়ে চিয়ারাপ করে যাচ্ছে।নিবিড় শেষ করে স্পটে এলে জিয়ানা কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। শেষমেশ একটাতে পেরেছে যাক।নিবিড় একহাতে জিয়ানাকে ধরে আরেক হাতে নিজের লম্বা চুল পেছনে ঠেলে পাঠায়।নিবিড়ের অনেকটা পর মেহেদী শেষ করে আর সবার শেষে রাফিন।
নিবিড় জিয়ানাকে বাচ্চাদের সবাইকে নিয়ে ভেতরে যেতে বলে।ওদের দরকার আছে একটু।তাই সবাই স্থান ত্যাগ করে। নিবিড় আবার পুলে পা ডুবিয়ে বসে পড়ে। কিছুটা দূরে মেহেদী আর রাফিন বসায় ছিলো।নিবিড় মেহেদীর দিকে তাকিয়ে বলে,

-শুরু কর।
মেহেদী পানিতে চোখ স্থির করেই বলে,
-নীল কোথায়?
-চেয়ারম্যানের অফিসে।
রাফিন আর মেহদী দুইজনই তাকায় নিবিড়ের দিকে।রাফিন কিছু জিজ্ঞেস করবে। তার আগেই মেহেদী বলে,
-রুপমামুর সার্জারীর পেপার্স তুই এনেছিস?
রাফিন এবার দাঁড়িয়ে যায়।নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে,
-তোর রুপমামুর ছেলেই এনেছে।আমি তার কাছ থেকে ছিনতাই করেছি।
মেহেদী কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে কিছু ভাবে। তারপর আবার প্রশ্ন করে ,
-জিয়ানার কাছ থেকে রাফিনকে কি এইটা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে সরিয়েছিস?
নিবিড় মুচকি হেঁসে মাথা উপর নিচ করে।

-অনুরাধাকে কে রে*প করেছে?
-তোর রুপমামু।
রাফিন এবার নিবিড়ের দিকে তেড়ে এসে নাক বরাবর ঘুষি মা*রে।
নিবিড় উঠে নিজেও রাফিনের চোয়াল বরাবর ঘুষি দেয়।মেহেদী এসে নিবিড়ের কাছ থেকে রাফিনকে ছাড়িয়ে নিজে পেটে জোরে ঘু*ষি দিয়ে বলে,
-বা*স্টার্ড তোর বাপের পাপ ওর ঘাড়ে চাপিয়েছিস?আগে থেকেই জানতি সে তোর বাপ তাই তো ভেজা বেড়াল হয়ে থাকতি সব সময়?
রাফিন মেহেদীর হাত আটকে মেহেদীর উরুতে কিক করে বলে,

-আমি কখনো মুখে বলেছি তোকে?আমি শুধু চুপ ছিলাম। বাবা সেদিন অনেক ড্রাংক ছিলেন।অনুরাধাকে চিনতে পারেনি।তোর অনুরাধা তোর নামে বিচার দিতে গিয়েছিলো সেই রাতে উনার কাছে।কিন্তু উনি এতটাই ড্রাংক ছিলেন যে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এই কাজ করে।আমি বন্ধ দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নক করেছি সেদিন।কিন্তু আমার কথা বাবার কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি।অনুরাধা সেখান থেকে বের হয়ে এক ছুটে নিবিড়ের রুমে চলে যায়।আমি পেছনেই ছিলাম।কিন্তু ওদের কাছে যাওয়ার আগেই নিবিড় অনুরাধাকে ধাক্কা মা*রে। তখন তুই সেখানে উপস্থিত হোস।
মেহেদী রাগে থরথর করে কাপছে।নিবিড়ের কাছে গিয়ে চিল্লিয়ে পাঞ্চ করতে করতে বলে,

-রাস্কেল ,শা*লা সাইকো আমার অনুরাধাকে ফিরিয়ে দে।দে ফিরিয়ে? তোরর মাঝে কি আছে সব মেয়েরা তোর জন্য কেনো দেওয়ানা হয়? কেনো অনু আমার চোখের ভাষা না বুঝে তোকে বেশি গুরুত্ব দিতো? কেনো সেদিন আমার কাছে না এসে তোর মতো বা*স্টার্ডের কাছে গেলো?
নিবিড় এই গালিটা নিতে পারে না।তার মাথা খারাপ হয়ে গেলো।তার চোখমুখ রক্তিম হয়ে চোয়াল শক্ত করে চিল্লিয়ে বলে উঠলো ,
-শু*য়োরের বাচ্চা কি বললি তুই? আবার বল? বল দেখি?
বলে এলোপাথাড়ি মা*র দেয়া শুরু করলো। রাফিনে এগিয়ে থামানোর চেষ্টা করে নিজেও খেলো কয়েক ঘা।
নিবিড় রাফিনের দিকে তেড়ে গিয়ে বলে,

-যে বাপকে বাচাতে এত কিছু করেছিস তোর সেই বাপ হচ্ছে তোর মায়ের খু*নি।প্ল্যান করে গ্যাসের বিস্ফোরণ করে তোর মাকে মে*রেছে।
রাফিন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।পরক্ষণেই সেও উড়াধুরা হাতপা ছুড়া শুরু করে। তিনজনই এখন সমান তালে মে*রামারিতে ব্যাস্ত।
এদের মা*রামারি আর গর্জানোতে গার্ডরা আর বাড়ির সবাই আবার বের হয়ে এলো।তাশদিন আর দুইজন গার্ড মিলে টেনে নিবিড়ের কাছ থেকে মেহেদী ছাড়িয়ে আনলো।মেহেদীর ঠোঁট নাক কপাল ফেটে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ছে অনবরত। মেহেদী শব্দহীন কাঁদছে। রাফিন মাথা ঝুকিয়ে একপাশে বসে পড়েছে।তার মাথা ঘুরছে।নিবিড়ের মুখ চোখও ফুলে গেছে আঘাতে।
জিয়ানা দৌঁড়ে এলো নিবিড়ের কাছে।গার্ডরা মেহেদী আর রাফিনকে ধরে ভেতরে নিয়ে যায়।জিয়ানা নিবিড়ের পেছনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
এরমাঝে বসার ঘর থেকে কুলসুমের আর্তনাদ সহ কান্না ছিটকে বের হয়ে আসছিলো বাহির পর্যন্ত। নিবিড় দ্রুতগতিতে পা বাড়ায় সেদিকে।জিয়ানা পেছন পেছন ছুটে।

-হাই আল্লাহ।সবার সাথে আমাকেও কেনো নিলেন না?এই ম*রা বাড়িতে আমি কেনো যুগের পর যুগ বেঁচে আছি? কেনো প্রজন্মের বুঝা আমার উপর আপনি চাপিয়ে গেলেন মাজাহারের আব্বা?সারাজীবন মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের বউয়ের জন্য কিচ্ছু বলতে পারেননি।মরেও আমাকে শান্তি দিলেন না।এই পাপের রক্ত আমি আর দেখতে পারি না।
জিয়ানার কাছে লাগলো এত ছোট্ট শরীরের আলাদা কোন ব্যাটারি আছে নাকি?যে পরিমান শব্দ ছিটকে বেরিয়ে আসছে ,সে পরিমান শক্তি উৎপাদনের জন্য আলাদা চারটা ব্যাটারি অবশ্যই দরকার।যে মানুষ গুলাকে জিয়ানার চট করে ভালো লেগে যায় ,তাদের মাঝে এই উম্মে কুলসুম বেগমও আছেন।উনার একটা আলাদা ব্যাক্তিত্ব আছে যেটা সে এই পরিবারে একমাত্র নিবিড়ের মাঝে দেখেছে।এরা প্র‍য়োজনের বেশি কথা বলে না।এমন কি মন ভুলেও কোন টুশব্দ বের করে না।যেটা বলে তার পেছনে অবশ্যই কারণ থাকে।এই যে বৃদ্ধার আহাজারি কেনো জানি মনে হচ্ছে এটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট সত্যি না।এর পেছনে কোন কারণ আছে।

আর একটা জিনিস উপলব্ধি করলো জিয়ানা। মানুষ গুলা কষ্টকে খুব ভালোবাসে।কষ্টকে পেলেপুষে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ আকারে নিয়ে যায়।আর কষ্টটা যখন দগদগে শোকে পরিনত হয় তখন অদ্ভুত ভাবে নিজেকে কষ্ট দিয়ে শান্তি পায়।এই শান্তিটা আবার মরণঘাতী যা তিলেতিলে ঘুনপোকার মতো নসাৎ করে দেয় মানুষের ভেতরটাকে।
জিয়ানা প্রতি পদে সৃষ্টিকর্তার উপর সন্তুষ্ট হয় ,নিজের বোধের জন্য।এই যে একটা চমৎকার বোধ উপরওয়ালা তাকে দান করেছে,যেটার কারণে কষ্ট গুলা তাকে ছুঁতে পারে না।ছুঁয়ে গেলেও সেটা কখনোই দগদগে শোকে পরিনত হয় না।যা গেছে তা গেছে টাইপ মনোভাব আছে বলেই না সে এত বিন্দাস চলতে পারে।গতদিনের শোক আকড়ে বসে থাকলে যদি আগামীদিনের সুখের দেখা নাই মিলে তবে কেনো এই মিছে আহাজারি?

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৭

নিবিড় শক্ত পায়ে দ্রুত প্রস্থান করে ড্রয়িংরুম।আপাতত তার প্ল্যান এই পর্যন্ত। তাদের দাদা যখন সিক্রেট পাস গুলা বন্ধ করে তখন রুপক মন্ডল সাথে ছিলো।উনার কাছে একটা নকশা ছিলো।সেই নকশা আবার মেহেদী দেখেছিলো।নতুন নূর ম্যানসন বানানোর সময় সে একটা রাফ ড্রয়িং করেছিলো।পরে ইঞ্জিনিয়ার সেটা বাজেয়াপ্রাপ্ত করলে রাগে ছিড়ে ফেলে।তাই সিক্রেট পাসের টানেল ডিজাইন মেহেদীই পারবে একমাত্র চিহ্নিত করতে।

নীতিহীন রাজ পর্ব ৫৯