নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২৩
রূপন্তী সরকার
রিদের পুরো শরীর একদম ঘেমে একাকার হয়ে গেছে।
মিহি আর দেরি না করে ইয়াশফার পাশে গিয়ে বসল। মেয়েটা ব্যথায় ছটফট করছে। রিদের মনে মনে খুব ভয় হচ্ছে, কারণ সে ভালো করেই জানে ইয়াশফা সহজে কান্নাকাটি করার মতো মেয়ে না।
অথচ আজ ব্যথার চোটে ইয়াশফা ঋষভের পেটে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
ঋষভ ইয়াশফাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ঋষভ রিদের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বললো৷
“পাপা, হা করে দাঁড়িয়ে থেকো না! ডক্টর আঙ্কেলকে ফোন দাও।”
ঋষভের কথা শুনে রিদ আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে ডাক্তারকে কল দিল। এদিকে মিহি ইয়াশফার
হাতটা নিয়ে হালকা করে মালিশ করে দিতে গেল। কিন্তু হাত ছোঁয়াতেই ইয়াশফা আরও জোরে চিৎকার করে উঠল। রিদ আর মাথা ঠিক রাখতে পারছে না। ও বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে, তার এই গুণধর ছেলেই মেয়েটাকে এভাবে আঘাত দিয়েছে।
রিদ রাগে কটমট করে ঋষভকে বলল,
“আমার মেয়ের যদি কিছু হয় ঋশ আমি কিন্তু তোমাকে ছেড়ে কথা বলবো না৷ রিদ রায়ান চৌধুরী যেমন ভালো করে কথা বলতে জানে তেমন আবার কলিজা টেনে ছিড়েও ফেলতে জানে। আমি কোনে ছেলে মেয়ে দেখবো না৷ অনেক সুযোগ দিয়েছি আর না মাইন্ড ইট”
ঋষভ হাত মুষ্টি বদ্ধ করে নিলো৷ কোনো কথা বললো না।
পরিস্থিতি খারাপ দেখে মিহি চিৎকার করে তিথিদের ডাকল। মিহির গলার আওয়াজ পেয়ে রুমের মধ্যে সবাই হুরমুর করে ছুটে আসল
রাহা, তিথি, রুহি আর মুগ্ধ। মুগ্ধ রুমে ঢুকেই এক ছুটে এসে ইয়াশফার পাশে বসে পড়ল। মুগ্ধর সাথে ইয়াশফার সম্পর্কটা বেশ ভালোই ছিল, যদিও তারা খুব একটা কথা বলত না। কিন্তু মুগ্ধকে ইয়াশফার এত কাছে বসতে দেখে ঋষভের কেমন যেনো লাগলো। ও এক টানে ইয়াশফাকে নিজের সাথে আরও জড়িয়ে নিলো। মুগ্ধর দিক থেকে ঘুরিয়ে অন্যদিকে মুখ করে দিল।ইয়াশফা তখনো ব্যথায় একটানা গোঙাচ্ছে।
সবার মুখেই চিন্তার ছাপ। পরিবারে যেন একের পর এক বিপদ লেগেই আছে কোথাও কোনো শান্তি নেই।
এরমধ্যেই ডাক্তার রুমে এসে ঢুকলেন
ডক্টর ইয়াশফার পাশে গিয়ে বসলেন। তিনি বেশ সাবধানে ইয়াশফার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিলেন। এরপর মচকানো জায়গাটা বোঝার জন্য যেই না একটু চাপ দিয়েছেন অমনি ইয়াশফা ব্যথার চোটে জোরে একটা চিৎকার দিল।ইয়াশফার চিৎকার শুনে ঋষভের মাথা গরম হয়ে গেলো। ও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডাক্তারকে এক প্রকার ধমক দিয়েই বলে উঠল
“আস্তে ধরুন দেখছেন না ও ব্যথা পাচ্ছে?
ঋষভের অমন ধমক শুনে ডাক্তারএকটু ভড়কে গেলেন। তিনি চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে ঋষভের দিকে তাকালেন, তারপর বেশ সাবধানে আর নরম হাতে ইয়াশফার হাতটা আবার পরীক্ষা করলেন। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর ডাক্তার রিদ আর মিহির দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন।
ডাক্তার বললেন
“ভয়ের কিছু নেই, হাড় ভাঙেনি। আসলে হুট করে টান লাগায় রগে প্রচণ্ড চোট লেগেছে, হাতটা বেশ ভালো রকম মচকে গেছে। আমি একটা ব্যথার মলম আর কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি। এগুলো নিয়ম করে খাওয়ালে আর মলমটা দিনে দু তিনবার হালকা হাতে লাগিয়ে দিলে চার পাঁচ দিনের মধ্যে ব্যথা একদম কমে যাবে। তবে হ্যাঁ, এই কয়েকটা দিন হাতটা একদম নাড়াচাড়া করা যাবে না। পুরোপুরি বিশ্রামে রাখতে হবে।”
ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশনটা রিদের হাতে দিয়ে বিদায় নিলেন। মুগ্ধ ডক্টরকে এগিয়ে দিতে রুমের বাইরে গেল।ডাক্তার চলে যেতেই রুমে এক থমথমে নীরবতা নেমে এল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিদ হনহন করে হেঁটে সোজা আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। আলমারি খুলে কোনো কথা না বলে ইয়াশফার জামাকাপড় বের করে একটা ট্রাভেল ব্যাগে গোছাতে শুরু করল। ঋষভ বিছানায় বসে স্থির চোখে রিদের এই কাণ্ড দেখছিল।
মিহি রিদের পাশে গিয়ে হাত ধরে বললো
“কী হয়েছে পঁচালোক?এসব করছো কেনো?”
মিহির কথা শেষ হতে না হতেই রিদ সবার সামনে মিহিকে অনেক জোরে একটা ধমক দিয়ে উঠল
“চুপ। একদম চুপ একটা কথাও বলবে না কেউ। আমি যা করছি আমাকে করতে দাও। এর মধ্যে কেউ বাধা দিতে আসলে কিন্তু একদম খবর আছে বলে দিলাম।
রিদের গলার আওয়াজ শুনে মিহি আর কিছু বলার সাহস পেল না। লোকটা যে এই মুহূর্তে কতটা রেগে আছে, তা রিদের লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
রাহা, তিথি, রুহি আর মুগ্ধ সবাই একদম কাঠের পুতুলের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রিদের কাণ্ড দেখছিল।রিদ ঝড়ের গতিতে ব্যাগ গোছানো শেষ করল। তারপর ব্যাগটা এনে ইয়াশফার মাথার কাছে টেবিলের ওপর রাখল। এরপর সে আলতো করে ইয়াশফার পাশে বসল। ইয়াশফার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে, বিশেষ করে ঋষভকে শুনিয়ে কড়া গলায় বলল
“আমি মেয়েটাকে এই অসভ্যটার কাছে আর রাখব না। এর কাছে থাকলে ও আমার মেয়েকে কোনোদিন ভালো রাখতে পারবে না। ও একটা আস্ত সাইকো।
রিদ একটু থেমে ঋষভের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে
বলল, “আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। কাল সকালেই আমি এটাম বোমকে ওর বাপের বাড়ি রেখে আসব। ও গ্রামে শান্তিতে থাকবে।
ঋষভের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে এলো। ঋষভ কোনো কথা না বলেই ধুপধাপ পা ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার আগে দরজার পাশের টেবিলটা এক ধাক্কায় ফেলে দিলো।
টেবিল পড়ার বিকট শব্দে ঘরের সবাই চমকে উঠল। মিহি আর স্থির থাকতে পারল না
ঋষভের পেছন পেছন ওর ঘরের দিকে দৌড়াল।
ঋষভ নিজের রুমে ঢুকেই মুখের ওপর দরজাটা ঠাসস করে লাগিয়ে ভেতর থেকে লক করে দিল। রুমের ভেতর থেকে একের পর এক জিনিসপত্র ভাঙার শব্দ আসছে
ঋষভের ভাঙচুর করা অবশ্য বাড়ির মানুষের কাছে নতুন কিছু না।
রিদও রাগে ফুসতে ফুসতে ওর দরজার সামনে আসল।
একটা আস্ত বেয়াদব ছেলে জন্ম দিয়েছে।
রিদ কড়া গলায় বলল,
“ঋষ, দরজা খোলো। এই ভাঙচুর বন্ধ কর।”
কে শোনে কার কথা। রুমের ভেতর থেকে তখনো ধুমধাম করে জিনিসপত্র আছাড় মারার আওয়াজ আসছে।
এইদিকে এই ভাঙচুরের শব্দে ইয়াশফার ঘুমটা ভেঙে গেল। এমনিতেই মচকানো হাতের ব্যথায় ওর জান বের হয়ে যাচ্ছে তার ওপর এত শোরগোল আর নিতে পারছে না।
ইয়াশফা দুই হাত দিয়ে নিজের কান দুটো চেপে ধরে রাখল। রুহি ওর এই অবস্থা দেখে ইয়াশফার পাশে এসে বসল আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।
ওদিকে ঋষভের থামার কোনো নামগন্ধই নেই, ঘরের মধ্যে তাণ্ডব শুরু করে দিয়েছে।
মিহি জোরে জোরে দরজায় চাপড়াতে লাগলো
“বাবু, বাহিরে বের হ। দেখ মেয়েটা কিন্তু অনেক অসুস্থ। ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে!”
ঋষভের কান পর্যন্ত তখন কোনো কথাই পৌঁছাচ্ছিল না।
ছেলের এমন জেদ দেখে রিদ নিজের রাগ সামলাতে না পেরে দরজায় সজোরে একটা লাথি মারল। মিহি এখন কাকে আটকাবে কিছুই বুঝতে পারছে না। বাপ আর ছেলে মিলে ওর জীবনটা শেষ করে দিচ্ছে।
তিথি, রুহি, রাহা, মুগ্ধ সবাই ঋষভের দরজার সামনে এসে জড়ো হয়েছে।ইয়াশফা এতক্ষণ নিজের রুমেই চুপচাপ শুয়ে ছিল কিন্তু ঘরের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতে দেখে সে আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারল না।
গুটিগুটি পায়ে হেঁটে ঋষভের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল।ইয়াশফাকে দেখে মিহি এক ছুটে ওর কাছে গেল।
“ঋষকে একটু দরজাটা খুলতে বলো না মা।
ইয়াশফা দরজার কাছে এগিয়ে গেল। নিজের ভালো হাতটা দিয়ে দরজায় আলতো করে একটা ধাক্কা দিল। শান্ত গলায় বলল,
“দরজাটা খুলুন। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।এবার মনে হয় সত্যিই মরেই যাব!”
হঠাৎ করে ভেতরের ভাঙচুরের আওয়াজটা একদম দমে গেল।
পুরো বাড়ি যেন এক সেকেন্ডে শান্ত হয়ে গেলো। কারো মুখে কথা নেই। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।
ঋষভ আচমকা দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়াল। ঋষভের দুই হাত বেয়ে টপটপ করে রক্ত ঝরছে। দুই হাতের তালুতেই ছোট ছোট কাঁচের টুকরো গেঁথে আছে।
এই দৃশ্য দেখে তিথি আর রুহির গা শিউরে উঠল। মিহির মনে হলো বুক থেকে কলিজাটা কেউ টেনে ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। মিহি
দৌড়ে গিয়ে ঋষভের রক্তাক্ত হাত দুটো চেপে ধরল।
ঋষভ মিহির দিকে তাকিয়ে একটু শান্ত হওয়ার চেষ্টা করলো মায়ের কপালে একটা আলতো চুমু দিল।
এরপর রক্তাক্ত হাত বাড়িয়ে ইয়াশফাকে এক টানে নিজের গায়ের সাথে এনে দাঁড় করাল। ইয়াশফার অবশ্য এই রক্তারক্তি দেখে কিছুই মনে হলো না। এসব রক্ত দেখে ভয় পায় না ও।
এদিকে ঋশের এমন তেড়ামি দেখে রিদ নিজের হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
ইয়াশফা ঋষভের রুমের ভেতরের দিকে তাকিয়ে দেখল, ওটাকে আর কোনো মানুষের রুম বলে চেনার উপায় নেই। গোটা ঘরে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে এইমাত্র ঘরের ওপর দিয়ে একটা বড়সড় ভূমিকম্প বয়ে গেছে।
ঋষভ সবার সামনেই নিজের হাত থেকে এক এক করে গেঁথে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো টেনে বের করতে লাগল। কাঁচ বের করার সাথে সাথে ফিনফিন করে তাজা রক্ত বের হতে শুরু হলো। সব কাঁচ বের করার পর ঋষভ রক্তাক্ত হাত দিয়েই ইয়াশফার গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর চিৎকার করে বলল
“তুই কালকে কোথাও যাবি না।”
ছেলের এই অবাধ্যতা দেখে রিদ এবার মারাত্মক রেগে গেলো। মামার বাড়ির আবদার নাকি? ও যা বলবে তাই হবে?
রিদ কড়া গলায় বললো
“না! কালকে ইয়াশফা গ্রামে যাবেই।”
রিদের কথা শুনে ঋষভের মাথা গরম হয়ে গেলো। এক ঝটকায় ইয়াশফাকে কোলে তুলে নিল। তারপর ঘরের ভেতর ঢুকে সবার মুখের ওপর দরজাটা ঠাসস করে লাগিয়ে দিল।
ঋষভ ইয়াশফাকে বিছানায় বসালো। তারপর নিজের রক্তাক্ত হাতটা ওর গালে চেপে ধরে চোখ রাঙিয়ে বলল
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ২২
“কাল গ্রামে গেলে তোর পা আমি ভেঙে দিবো।”
ইয়াশফা মুখে কিচ্ছু বলল না।
ইয়াশফা মনে মনে মুখ বাঁকিয়ে বলল
“হ শুধু তোমারই হোগা ভরা জেদ আছে আমাগো নাই। কালকে আমি যাবোই তোর মতো বলদা পাডার সংসার করমু না।”

গল্প টা জাসট ওয়াও