নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৬
রূপন্তী সরকার
এতক্ষণ ধরে ঘরের সবার নাটকীয় স্বীকারোক্তি আর আবেগঘন দৃশ্যগুলো ইয়াশফা একদম পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে চুপচাপ শুনছিল। কিন্তু এবার ওর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে সবার দিকে একরাশ ক্লান্তি আর তীব্র অভিমান নিয়ে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠলো,
“হয়েছে আপনাদের সবার নাটক করা? সবার কথা বলা শেষ? ঠিক আছে, এবার তাহলে আমি আসি।”
রিদের মুখের হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। সে উদ্বিগ্ন হয়ে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে বললো, “এটাম বোম… এখন এই অবস্থায় তুমি কোথায় যাবে?”
ইয়াশফা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না। সে সোজা ঋষভের সামনে গিয়ে ওর কোল থেকে ইয়ানকে নিজের বুকে টেনে নিলো। তারপর একটা ত্যাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
“তাই তো, কোথায় যাবো আমি? আমার মতো এতিম মেয়েদের তো জাহান্নাম ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই…”
ইয়াশফার মুখ থেকে এমন কথা শুনে ঋষভের বুকটা কেঁপে উঠলো। সে অত্যন্ত আকুল গলায় ডাকলো, “ইয়াশ…!”
কিন্তু ইয়াশফা ঋষভের ডাকে একটুও সাড়া দিলো না। সে দরজার দিকে পা বাড়ানোর আগে শুধু মিহির দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় বললো, “ভালো থেকো মা।”
ইয়াশফা ইয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রুম থেকে বের হতে যাবে, ঠিক তখনই ওর পুরো পৃথিবীটা কেমন যেন দুলতে লাগলো। তীব্র মানসিক চাপ আর ক্লান্তিতে আচমকা ওর মাথাটা ঘুরে উঠলো। ও ভারসাম্য হারিয়ে সোজা মেঝের দিকে পড়ে যেতে নিচ্ছিল, আর ওর হাত থেকে ছোট ইয়ানও পড়ে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে চিতাবাঘের মতো চটজলদি গতিতে ঋষভ এগিয়ে এসে এক ঝটকায় ইয়াশফা আর ইয়ান দুজনকে নিজের শক্ত বুকের সাথে চেপে ধরে নিচে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিলো।
ঋষভ ইয়াশফাকে এভাবে প্রায় অচেতন হয়ে যেতে দেখে পাগলের মতো বলতে লাগলো, “কেন এমন করছো ইয়াশ? প্লিজ আমাকে ছেড়ে কোথাও যেও না! আমি… আমি তোমাদের ছাড়া কীভাবে বাঁচবো বলো?”
এদিকে ইয়াশফাকে আচমকা পড়ে যেতে দেখে ইউভানও আর নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারলো না। সে সমস্ত দ্বিধা ভুলে একছুটে ওদের পাশে এসে দাঁড়ালো। ওর চোখ-মুখ তখন এক অদ্ভুত আতঙ্কে কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে। সে দ্রুত ইয়াশফার হাতটা টেনে নিয়ে ওর পালস চেক করতে লাগলো। তারপর ঋষভের দিকে তাকিয়ে কিছুটা আশ্বস্ত করার সুরে বললো, “ভয় পাস না, হয়তো মেন্টাল স্ট্রেসের কারণে প্রেশার হুট করে অনেক হাই হয়ে গেছে।”
ঋষভ কালবিলম্ব না করে ইয়ানকে দ্রুত ইউভানের কোলে বাড়িয়ে দিলো। তারপর ইয়াশফাকে দুই বাহুতে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে সোজা ভেতরের বেডরুমের দিকে ছুটে গেল। পেছন পেছন ইয়ানকে কোলে নিয়ে ইউভানও দ্রুত ওই রুমে ঢুকলো।
রুমে ঢুকে ইয়াশফাকে বিছানায় শোয়ানোর পর ইউভান পাশে থাকা প্রেশার মাপার মেশিনটা হাতে নিলো। সে ঋষভকে বললো, “তুই সর, আমি ওর প্রেশারটা মেপে দেখছি।”
কিন্তু ঋষভের ভেতরের রাগ তখনো কমেনি। সে ইউভানের হাত থেকে মেশিনটা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বেশ কড়া গলায় বললো, “আমি পারবো, দে ওটা আমাকে! তুই ওর থেকে দূরে থাক।”
ইউভান আর সহ্য করতে পারলো না। ইয়ানকে একহাতে শক্ত করে ধরে সে ঋষভের দিকে তাকিয়ে রেগে গিয়ে বললো, “একটু থামবি শালা! আগে পেশেন্টকে দেখতে দে!”
বিছানায় শোয়ানোর পর ইয়াশফা হঠাৎ কেমন যেন করতে লাগলো। ওর শরীর কাঁপছিল, নিশ্বাস দ্রুত হয়ে আসছিল আর ও ছটফট করছিল। ইয়াশফাকে এভাবে ছটফট করতে দেখে ঋষভ একদম অস্থির হয়ে উঠলো। নিজের ভেতরের সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, “ইয়াশ! ইয়াশ, কেন এমন করছো তুমি? কী হয়েছে তোমার? ইউভান, দেখ না ও এমন করছে কেন? কিছু একটা কর!”
ইউভান আর এক মুহূর্তও দেরি না করে ঋষভকে সরিয়ে দিয়ে জোর করেই ইয়াশফার পালস আর চোখ পরীক্ষা করলো। পরীক্ষা শেষ করতেই ওর নিজের মুখটাও ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে অত্যন্ত গম্ভীর আর চিন্তিত মুখে ঋষভের দিকে তাকিয়ে বললো, “প্রেশার হুট করে অনেক বেশি বেড়ে গেছে ঋশ… অবস্থা সুবিধার না। বাড়িতে রেখে আর লাভ নেই, এখনই ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।”
ইউভানের কথা শেষ হওয়ার আগেই ঋষভ পাগলের মতো ইয়াশফাকে বিছানা থেকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিলো। তারপর তড়িৎ গতিতে নিচে নেমে সোজা গিয়ে গাড়িতে উঠলো। পেছন পেছন ইউভান, রিদ, মিহি সবাই একছুটে বেরিয়ে এলো। ঋষভ গাড়িতে বসেই জানালার কাচ নামিয়ে রিদের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, “পাপা, আমরা ওকে নিয়ে আগে বের হচ্ছি। তোমরা এখন বাসায় থাকো, হসপিটালে বেশি মানুষের দরকার নেই। কোনো সমস্যা হলে বা দরকার পড়লে আমি নিজেই কল করবো।”
কথাটা বলেই সে ইউভানকে গাড়ি টানতে বললো। ইউভান স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে গাড়ি স্টার্ট দিলো। ও প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে, আর ওদিকে পেছনের সিটে বসা ঋষভের হাত-পা তখন ভয়ে কাঁপছে। সে ইয়াশফাকে নিজের বুকের সাথে পাথরের মতো শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো। ওর মনে হচ্ছিল, একটু আলগা করলেই বুঝি ইয়াশফা ওকে ছেড়ে চিরতরে কোথাও চলে যাবে। ঋশ কখবো মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও চোখের পলক ফেলেনি, সে আজ নিজের স্ত্রীর এই ছটফটানি দেখে ভেতরে ভেতরে একদম শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ঋষভ আর নিজেকে সামলাতে পারলো না, সে ইয়াশফার গলায় মুখ গুঁজে একদম ছোট বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠলো। কাঁপা গলায় অনুনয় করে বলতে লাগলো,
“আমাকে এত বড় শাস্তি দিও না ইয়াশ… তোমার পা ধরি পাখি আমি তোমার সব কথা শুনবো, তুমি যা বলবে আমি তা-ই করবো। শুধু এভাবে আমাকে ছেড়ে যেও না!”
ইয়াশফা তখনো আধো-চেতন অবস্থায় ছটফট করছিল। সে অত্যন্ত ক্ষীন আর অভিমানী কণ্ঠে চোখ বন্ধ রেখেই ঋষভকে উদ্দেশ্য করে বললো, “আপনাকে আর… আর এক বিন্দুও বিশ্বাস করি না আমি। আমি খুব ভালো করে জানি, আপনি আবার আমাকে এভাবেই একা ফেলে… ছেড়ে চলে যাবেন।”
ঋষভ ওর কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে পাগলের মতো মাথা নেড়ে বললো, “আর কোথাও যাবো না ইয়াশ, প্রমিজ তোমাকে আর ইয়ানকে রেখে আমি এই জীবনে আর একটা মুহূর্তের জন্যও কোথাও যাবো না। সত্যি বলছি!”
গাড়ির সামনের সিটে তখন কোলে থাকা ছোট ইয়ান বড়দের এই কান্না আর চেঁচামেচি দেখে ভয়ে বেশ জোরে কেঁদে উঠলো। ইউভান একহাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্যহাতে কোনোমতে ইয়ানকে সান্ত্বনা দেওয়ার, ওর কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু পেছনের সিটে বসা ঋষভের সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই, ওর পুরো দুনিয়া তখন ইয়াশফাকে কেন্দ্র করেই থমকে গেছে।
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ঋষভ আর ইউভান মিলে ডাক্তারদের ডেকে ইয়াশফাকে দ্রুত ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করালো। ওর চিকিৎসা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রিদের মন মানলো না, সে মিহিকে সাথে নিয়ে হসপিটালে চলে আসলো। মিহির মুখাবয়ব তখন এক অদ্ভুত ক্রোধ আর শান্ত শক্তিতে থমথম করছে। সে হসপিটালের করিডোরে এসেই সোজা রিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রিদের চোখের দিকে তাকিয়ে মিহি অত্যন্ত ধারালো আর কঠিন গলায় বললো, “আমার মেয়ের যদি একটুও কোনো ক্ষতি হয়, তবে আমি কাউকে ছাড়বো না, মনে রাখবা! ও কি কোনো খেলার পুতুল যে যার যেভাবে ইচ্ছে, যখন যেভাবে খুশি নাচাবে আর ভাঙবে? অনেক সহ্য করেছি, এবার আমি এর শেষ দেখেই ছাড়বো!”
মিহির এমন রুদ্ররূপ রায়ান পরিবারের কেউ আগে কখনো দেখেনি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রুহি আর জ্যোতি দ্রুত এগিয়ে এসে মিহিকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে দিতে একটু দূরে কেবিনের দিকে নিয়ে গেল।
মিহির এই হুমকি আর ভেতরের তীব্র ক্ষোভ দেখে রিদের মতো শক্ত মনের মানুষেরও এবার সত্যি সত্যি বুকটা কেঁপে উঠলো, সে ভেতরে ভেতরে বেশ ভয় পেয়ে গেল। রিদ যখন করিডোরের এক কোণায় অপরাধীর মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ঋষভ আস্তে আস্তে ওর বাবার সামনে এসে দাঁড়ালো। ঋশের চোখ দুটো তখনো লাল হয়ে আছে। সে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা, গম্ভীর গলায় বললো, “তুমি আমার সাথে এটা একদম ঠিক করোনি পাপা। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসটা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেললে তুমি?”
নিজের ছেলের এই বুকফাটা অভিযোগ শুনে রিদের মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বেরোলো না। সমস্ত চক্রান্ত আর মাস্টারপ্ল্যানের জাল বোনা এই মানুষটি আজ নিজের ছেলের সামনে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
ডাক্তারদের কাছ থেকে ইয়াশফাকে কেবিনে শিফট করার খবর পেয়ে ঋষভ একটু হালকা হলো। সে করিডোরের এক পাশে ইউভানের কোলে থাকা ছোট ইয়ানের কাছে এগিয়ে গেল। এতক্ষণ মন খারাপ করে থাকা ইয়ান তার বাবাকে দেখা মাত্রই হাসিতে মুখ ভরিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিল। ঋষভ ছেলেকে নিজের কোলে তুলে নিলো। তারপর ইয়ানের নরম গালে নিজের গাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বললো, “তোমার মাম্মাকে একটু বুঝিয়ে বলো না বাবা, সে যেন তোমার বাবাকে ক্ষমা করে দেয়? বলো যে বাবা আর কখনো তোমাদের একা ফেলে এমন করে কোথাও চলে যাবে না।”
বাবার গালের দাড়িগুলো হয়তো ইয়ানের মুখে একটু সুড়সুড়ি দিচ্ছিল, ও খিলখিল করে হেসে উঠে আচমকা ঋষভের নাকে ছোট্ট একটা কামড় বসিয়ে দিল। ছেলের এই মিষ্টি বাঁদরামি দেখে ঋষভের ঠোঁটের কোণে এতক্ষণ পর এক চিলতে হাসি ফুটলো।
ঠিক এই সময়ে কেবিন থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। ঋষভকে দেখে তিনি আশ্বস্ত করার সুরে বললেন, “মি. চৌধুরী, এখন আর ভয়ের কিচ্ছু নেই। হঠাৎ মানসিক চাপ আর অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে ওনার প্রেশারটা শুট করেছিল। আমরা মেডিসিন দিয়েছি, এখন উনি স্ট্যাবল। তবে একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, ওনাকে একদম কোনো ধরনের মেন্টাল স্ট্রেস দেওয়া যাবে না। ওনার মন সবসময় খুশি রাখার চেষ্টা করুন।”
ডাক্তার চলে যেতেই ঋষভ আর এক মুহূর্তও বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো না। সে ইয়ানকে কোলে নিয়েই আলতো করে ইয়াশফার কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। কেবিনের আবছা আলোয় বিছানায় শুয়ে থাকা ইয়াশফাকে দূর থেকে দেখে ঋষভ নিজের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত টান অনুভব করলো। সে ইয়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে ইয়াশফাকে দেখিয়ে আলতো গলায় বললো, “ওই দেখো বাবা… ওই যে শুয়ে আছে আমাদের পুরো দুনিয়া।”
ইয়ান যেন বাবার কথার গভীরতা বুঝতে পেরে আবারো মিষ্টি করে হেসে উঠলো। ঠিক তখনই ইয়াশফা পিটপিট করে নিজের চোখ দুটো মেললো। ও চোখ খুলতেই দেখলো ঋষভ ঠিক ওর বেডের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ঋষভ ইয়াশফার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় ডাকলো, “সাকুরা… তাকাও না আমার দিকে একটু?”
কিন্তু ইয়াশফার ভেতরের অভিমানী মনটা তখনো শক্ত হয়ে ছিল। সে ঋষভের চোখের দিকে তাকালো না, বরং চোখজোড়া অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো। মায়ের এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেখে কোলে থাকা ইয়ান এবার নিজেই আধো-আধো স্বরে ডেকে উঠলো, “মাম্মা… বা… তাতা!”
ছেলের ওই ভাঙা ভাঙা মিষ্টি ডাক শুনে ইয়াশফা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সে নিজের ক্লান্ত চোখ দুটো ঘুরিয়ে ছেলের দিকে তাকালো। এই সুযোগে ঋষভ বেডের ওপর নিজের এক হাত বাড়িয়ে ইয়াশফার একদম হিমশীতল হয়ে থাকা নরম হাতটা নিজের তপ্ত মুঠোর মধ্যে পুরে নিলো। তারপর পৃথিবীর সমস্ত আকুলতা ঢেলে দিয়ে বললো, “আই অ্যাম সরি ইয়াশ… প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও।”
ইয়াশফা এবার নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করলো না, তবে চোখ দুটো বন্ধ করে আবারো নিজের মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিলো যেন সে এখনো ঋষভের ওপর ভীষণ রেগে আছে। ইয়াশফার এই নীরবতা ঋষভকে একদম অস্থির করে তুললো। সে কাতর গলায় অনুনয় করলো, “আমার সাথে একটা বার কথা বলো প্লিজ? একটু রাগ দেখাও, চিল্লাইয়া বকো, তাও ভালো। কিন্তু এভাবে চুপ করে থেকো না, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
তবুও ইয়াশফা কোনো কথা বললো না। ঋষভ আর কোনো উপায় না পেয়ে ইয়ানকে সাবধানে বেডের এক পাশে বসিয়ে দিল। তারপর নিজে সোজা মেঝের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে ইয়াশফার চাদরে ঢাকা দুটো পা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ঋষভ রায়ান চৌধুরীকে এভাবে নিজের পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখে ইয়াশফা তীব্র চমকে উঠলো। সে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলো এবং অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে ঋষভের হাত থেকে নিজের পা দুটো টেনে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বললো, “কী করছেন কী এসব? ছাড়ুন! পাগল হয়ে গেছেন আপনি?”
ঋষভ পা ছাড়লো না, বরং আরও একটু ওপরের দিকে ঝুঁকে ইয়াশফার চোখের দিকে তাকালো। ওর লাল হয়ে থাকা চোখ দুটোতে তখন এক বুক আকুতি আর নিখাদ ভালোবাসা। সে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে নরম গলায় আবদার করলো, “আমি বড্ড ক্লান্ত ইয়াশ… আমাকে একটু তোমার বুকে আশ্রয় দেবে? একটু জড়িয়ে ধরবে আমাকে?”
ঋষভের এই ভেজা কণ্ঠ আর চোখের ওই একরাশ আকুলতা দেখে ইয়াশফার দীর্ঘ তিন বছরের জমে থাকা সব অভিমান, রাগ আর শক্ত দেয়াল এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। দুই হাত বাড়িয়ে ঋষভকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিলো। ঋষভও ইয়াশফার গলার খাঁজে নিজের মুখ লুকিয়ে ওকে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, যেন এই আলিঙ্গন ভাঙার ক্ষমতা দুনিয়ার কারো নেই।
মায়ের বুকে বাবার এই হুট করে লুকিয়ে যাওয়া দেখে পাশে বসা ছোট ইয়ানও খিলখিল করে হেসে উঠলো। সে নিজের ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে ওদের দুজনকে ছোঁয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। ইয়াশফা তখন ঋষভের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর ওর চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। গত তিন বছরের সমস্ত একাকীত্ব আর কষ্টের অবসান ঘটছে এই একটি জড়িয়ে ধরায়।
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৫
ঋষভ ইয়াশফার কান্না ভেজা মুখটা আলতো করে নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিলো। বুড়ো আঙুল দিয়ে ওর চোখের জল মুছে দিতে দিতে ঠোঁটে মিষ্টি একটা হাসি এনে বললো,
“কেঁদো না বউ। তুমি তো আমার লক্ষি বউ… আর লক্ষি বউরা কখনো কাঁদে না। এখন চুমু দাও আমাকে”
