Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৭

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৭
ইনান হাওলাদার

ড্রয়িং রুমে ছোট খাটো একটা শপিংয়ের স্তূপ তৈরি হয়েছে।যেখানে তূর্যের একটা সুতাও নেই। উপস্থিত সবার মাঝে প্রতিটা ব্যাগ খুলে খুলে দেখাচ্ছে আহি। মারুফা বেগমের মাথায় হাত। ওনার ধারণা এতকিছু আহি মাদবরী করে কিনেছে।এই নিয়ে দুই-একটা কথাও শুনিয়েছেন তিনি মেয়েকে। আহি মায়ের কথা গায়ে লাগায়নি।কারণ,সে তো শুধু পছন্দ করেছে ।প্রথমে তূর্য তিন / চারটা ড্রেস অথবা শাড়ি নিজে পছন্দ করে তাকে বলেছে সিলেক্ট করতে।তার মায়ের ধারণার মতো অত খারাপ সে নয়।সে একটাই সিলেক্ট করেছে।তবে কিছু কিছু সময়ে দুই – তিনটার মধ্যে কনফিউজড হয়ে গেছিল।সেটা তূর্য লক্ষ্য করে নিজেই সবগুলো কিনে দিয়েছে।সে একবারও বলেনি সবগুলো কিনে দিতে। আর তূর্য নেওয়ার সময়ও সে মানা করেছে।সুতরাং এতে তার কোনো দোষ নেই।একদম নি’র্দোষ সে।তবে তূর্যের এত এত সাবধানতার ভিড়েও ঠিকই বিয়ের ড্রেসটা নিয়ে ঝা’মেলা হলো। ও চাইলে বাকিসব ক্ষেত্রের মতো এখানেও দুইটা ড্রেসই কিনে দিতে পারত।কিন্তু একটা মানুষের রুচি এতটা খারাপ কিভাবে হতে পারে ভেবে পায় না সে।মূলত সে কারণেই কিনে দেয়নি।
আসিফ চৌধুরী চা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন,

” তারপর ল্যাহেঙ্গা কোনটা আনলি? তোর পছন্দ করাটাই নাকি তূর্যের ?”
” তূর্য ভাইয়ের ” শপিং ব্যাগে জুতা রাখতে রাখতে উত্তর দিলো আহি।
” জো’র করেছে তোকে ? ” জানতে চাইলেন আকবর চৌধুরী।
” জো’র তো অবশ্যই করেছে বড় আব্বু।আহিপুকে দেখুন ঠোঁটের পাশে কেঁটে গেছে। নিশ্চিত গালের উপর এক থা’বড় মে’রে রাজি করিয়েছে তূর্য ভাইয়া ”
শান্তের কথায় সবাই খেয়াল করলো আহির দিকে। ও থতমত খেয়ে ঠোঁটের কোণায় হাত রাখলো।বোকা বোকা চাহনিতে আশপাশটায় চোখ বুলালো।অতঃপর চোখ রাঙ্গালো শান্তকে।শকুনের চোখ ছেলেটার!মনে মনে ব’কলোও।
আকবর চৌধুরী গম্ভীর গলায় আহির কাছে জানতে চাইলেন,

” তূর্য সত্যিই মে’রেছে তোমাকে ? ”
আহি দ্রুত এদিক ওদিক ‘ না ‘ বোধক মাথা নেড়ে বলল,
” না ,বড় আব্বু ” সত্যিটা লুকাতে এত বড় মিথ্যা ও বলতে পারলো না।
তূর্য সারাজীবন ওকে মা’রার হু’মকি দিলেও কখনো ভুলেও গায়ে হাত উঠায়নি। তবুও আহির কথা মানতে পারলেন না আকবর চৌধুরী। ছেলেকে দিয়ে ওনার কোনো বিশ্বাস নেই।তিনি জেরা করলেন,
” তাহলে ব্য’থা কিভাবে পেয়েছো ?”
মিথ্যা কথা বানালো আহি,
” ওই …রাতে ফেরার সময় গেইটের সাথে ধাক্কা খেয়েছিলাম।তখন একটু কেঁ’টে গিয়েছিল ”
“দেখে চলা ফেরা করতে পারিস না, মা! কাল পোকায় কাঁমড়ায় ,আজ ঘাঁই-গুঁতো খাস” চিন্তিত হয়ে বললেন পারভিন বেগম ।অথচ,ভদ্র মহিলা জানতেই পারলেন না এসব তার অতি ভদ্র-সভ্য ছেলের সু-কর্ম। মারুফা বেগম ফোঁড়ন কাঁ’টলেন,

” এত অপচয়কারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না।এজন্যেই ছোট-খাটো একটা সাজা দিয়েছেন ” এক্ষেত্রে তিনি তূর্যের ভূমিকা পালন করলেন।মেইন কা’লপ্রিট যদি সে না হতো আর মেয়েটা যদি সত্যিই ওভাবে ব্য’থা পেত ,তূর্য উপস্থিত থাকলে হয়তো এভাবেই বলতো আহিকে। সুতরাং বাড়ির কাউকেই তূর্যের অনুপস্থিতি বোধ করতে দিলেন না তিনি। আসলাম চৌধুরী বললেন,
” হবু জামাইয়ের কাছ থেকে শ্বাশুড়ি স্পেশাল ট্রেনিং চলছে নাকি?”
হেসে উঠলেন সবাই। কিন্তু,আহি হাতে থাকা ড্রেসটি রাগের সাথে ধপ করে নিচে ফেললো।খিটখিটে মেজাজে বলল,

” আম্মু তুমি আমার সাথে একদম শ্বাশুড়িদের মতো বিহেভ করো। ভাল্লাগে না ”
” ভালো কথা তো আপনার ভালো লাগবে না আম্মাজান ” টিটকিরি করে বললেন মারুফা বেগম। প্রান্ত বলল,
” তোমার কষ্ট কিসের আহিপু ? মা ,শ্বাশুড়ির মতো বিহেভ করে আর শ্বাশুড়ি মায়ের মতো।কাটাকাটি হয়ে গেল না? ”
এই কথার জের ধরে একে-একে সবাই তাদের কিছু মূল্যবান মতামত পেশ করলেন। মা মেয়ের খুনশুটি থেকে বিষয়টা হাসিঠাট্টায় মোড় নিল। এরইমধ্যে জগিং সেরে বাড়ি ফিরল তূর্য।ড্রয়িং রুমের আলাপ-আলোচনা নিয়ে ধারণা নেই ওর।সে মায়ের কাছে কফি চেয়ে সিঙ্গেল সোফাটায় বসলো।সাথে সাথে আকবর চৌধুরী ধরা করলেন ওকে,
” ঠিকই নিজের পছন্দ চাপিয়ে দিয়েছ মেয়েটার উপরে।তাহলে সাথে কেন নিয়ে গেছ? নিজের মর্জি মতো কিনে আনতে!”

তূর্য অবুঝ ভঙ্গিতে তাঁকালো বাবার দিকে। পারভিন বেগম সুন্দর করে বুঝিয়ে বললেন ছেলেকে,
” আহি যেই পোশাক পছন্দ করেছিল সেটাই কিনে দিতিস আব্বা ”
” তাছাড়া আর কি কিনে দিয়েছি?” আহির দিকে তাঁকিয়ে ওকে প্রশ্ন করলো তূর্য। মেয়েটার দৃষ্টি অন্যত্র। আকবর চৌধুরী গমগমে গলায় বলে উঠলেন,
” তাহলে বিয়ের পোশাক কার পছন্দের?তোমার নয়?”
” অর্ধেক কথা বলে রেখে দিয়েছিস?পুরোটা বল ” তূর্য মুখে কথাটা বললো এবং তার সাথে-সাথে চোখ দিয়েও বলার জন্যে ইশারা করলো আহিকে।সে এবার সবটা খুলে বলল,
” আমি আমার পছন্দের ল্যাহেঙ্গাটাই নিয়ে আসছিলাম বড় আব্বু।মাঝ পথে আসার পর ওটা আর ভালো লাগছিল না। তারপর আবার ব্যাক করে তূর্য ভাইয়ের পছন্দ করাটাই এনেছি ”
তূর্যের এহেন ধৈর্যে ঘর শুদ্ধু সবাই চমকালেন। এই ছেলে আবার ফেরতও গিয়েছিল!বিষয়টা বিশ্বাস করা কষ্টসাধ্য।তবুও মেনে নিলেন তারা। তূর্য ড্রয়িং রুম ছেড়ে যেতে-যেতে মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

” কফি টা কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিও ”
এই ‘ কাউকে ‘ মানে বুঝেন পারভীন বেগম।তিনি কিছুক্ষণ পর আহিকে দিয়ে কফির মগটা পাঠালেন। ইদানিং তূর্যের রুমে নক করে ঢোকার কোনো প্রয়োজন পড়ে না ওর।তবুও অভ্যাস রয়ে গিয়েছে।ভবিষ্যৎ দুই – একবার ব্যতীত বাকি সময় নক করেই ঢোকে।এবারেও নক করার জন্যে দরজার কাছে দাঁড়িয়েছে।সাথে সাথে ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে এলো,
” আয় ”
সে পূর্বের মতো চঞ্চলতা দেখলো না। ভদ্রভাবে রুমে প্রবেশ করে বেড সাইড টেবিলের উপর কাপটা রাখলো। এমনকি মাথাটাও তুললো না।অতঃপর চলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালে তূর্য বাধ সাধলো । কাপ ওর হাতে ধরে দেওয়ার জন্যে বললো।আহি কোনো কথাবার্তা ব্যতীত মাথা নিচু করে কাপটাকে এগিয়ে দিলো ওর দিকে। ড্রয়িং রুম থেকে বেড রুম পর্যন্ত একটা বারের জন্যও আহি ওর চোখে চোখ রাখেনি বিষয়টা খেয়াল করেছে তূর্য।কারণ অবশ্য বুঝতে পেরেছেও।এটা ছেলে মানুষী বৈকি আর কিছু নয়।ও কাপ নিতে নিতে বলল,

” তাঁকা আমার দিকে ”
তাঁকালো না আহি।মিনমিনে সুরে বলল,
” বলুন ।শুনছি ”
” শুনতে বলিনি,দেখতে বলেছি।লুক এ্যাট মি আহি ”
শেষ বাক্যটা কঠিন শোনা গেল।তাঁকালো আহি।বলল ,
” বলুন ”
” এমন কিছুই আমাদের মধ্যে হয়নি যার জন্যে তুই চোখ তুলে তাঁকাতে পারছিস না। এসব পালায়-পালায় ভাব আমার সামনে দেখাবি না আহি।অসহ্য লাগে ” শক্ত কন্ঠে বলল তূর্য।
কি বলবে কোনো কথা খুঁজে পেল না আহি। মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।সে তূর্যের অনুমতির অপেক্ষায় ।একবার শুধু ‘ যাহ ‘ বললেই হয়। তবে এসব কিছুই বলল না তূর্য। আর সে ও মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো।

“এখন আসবো? ” মিনিট পাঁচেক পর বাধ্য হয়ে আহি নিজ থেকে বললো।
” একটা চু’মুর ভার সামলাতে জানিস না।ইভেন সেটার জের ধরে চোখ তুলে তাঁকানোই বন্ধ করে দিয়েছিস ।অথচ,ফ্রেন্ডের ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিস। মেয়েটা নিশ্চয় এমনি এমনিই আসবে না ? ”
সাবলীল গলায় বলল তূর্য।সে এখনো প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে আহির দিকে তাঁকিয়ে।এদিকে মেয়েটার মাথা ভোঁ ভোঁ করে উঠেছে।অদৃশ্য হাতে নিজের কান চেপে ধরতে চাইলো ।কাজের কাজ কিছুই হলো না।কথাগুলো ঠিকই কানের শেষ প্রান্ত অবধি পৌঁছে গিয়েছে।আর বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ও তড়িঘড়ি করে বলল,

” আসছি আমি।”
” আমার চোখের দিকে তাঁকিয়ে বল ”
এই পর্যায়ে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো আহি।নিমিষেই লজ্জাভাব উধাও হয়ে গেল।ঝগড়াটে ভঙ্গিমায় বলল,
” আগে তো নিজে কখনো আমার দিকে তাঁকিয়ে কথা বলতেন না। আর আমি একটু একদিন না তাঁকালে কি হচ্ছে আপনার?আপনি বেশি বেশি করেন তূর্য ভাই ”
নিজের রূপে ফিরে এসেছে ও।এখন ওকে স্বাভাবিক লাগছে তুর্যের কাছে।মুচকি হাসলো ও। বলল,
” বেশি বেশি কিছুই করিনি।যেই ভাব… করলে হয়তো বাড়ি ছেড়েই চলে যেতিস ”
” ঘোড়ার ডিম যেতাম ” বলে মুখ ভেংচালো ও।
ওর কান্ডে গোপনে হাসলো তূর্য।তারপর অনুমতি দিলো।কফির মগ ওর হাতে দিতে দিতে বলল,
” যা,এখন। ”
ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো আহি।গোঁড়ামি করে বলল,

” এখন যাব না আমি ”
এই মেয়ের ভাবগতি বুঝতে পারে না তূর্য।কিছুক্ষণ আগেও কিভাবে লজ্জায় ম’রছিল।আর এখন দেখ! ওর মধ্যে লজ্জার
‘ ল ‘ও নেই। কিভাবে রূপ বদলায় নিজের।গিরগিটি একটা! তূর্য ওর হাতে জোর করে কাপ ধরিয়ে দিয়ে শুতে শুতে বলল,
” না যাস থাক এখানে। ঘুমাতে চাস? চাইলে পাশে শুতে পারিস। ঘুমোবো আমি ”

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৬

আহি আরেকটা মুখ ঝামটা মে’রে হনহন করে বেরিয়ে গেল। এই লোক হয়তো জানেন না ‘ ল’জ্জা নারীর ভূষণ ‘ । জানলে নিশ্চয়ই এমন করতো না।সবাই কি ওনার মতো অসভ্য হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছে নাকি? গভেট একটা ! তূর্যকে মনে মনে গভেট বলায় নিজেই হেসে ফেললো সে। সমীকরণ মিলালো –প্রথমে ল’জ্জা পেতে পেতে রুমে ঢুকলো ,তারপর কিছুক্ষণের মাথায় ঝ’গড়া শুরু করলো আর এখন হাসছে। সে সত্যিই একটা স্টু’পিড।ঠিকই বলেন তূর্য ভাই। তবে এখন যেহেতু বুঝতে পারছে সে স্টু’পিড ,তাহলে তো সে স্টু’পিড নয়। পাগল তো আর কোনোদিন বুঝতে পারে না সে পাগল।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৮