প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৯ (৩)
ইনান হাওলাদার
অতঃপর একটি নতুন দিনের সূচনা। নতুন সূর্যোদয়!
বহুল কাঙ্ক্ষিত সেই দিন।গতকাল মধ্যরাত থেকেই বিয়ের রান্নার আয়োজন শুরু হয়েছে চৌধুরী বাড়িতে। বেলা বারোটা গড়াতে না গড়াতেই সকল রান্না-বান্না শেষ।ইতোমধ্যে অতিথি আপ্যায়ন শুরু হয়ে গিয়েছে। বর-কনে একই বাড়ির হওয়ায় বরযাত্রী আসা-যাওয়ার কোনো ঝামেলা নেই। বাড়ির তিন কর্তা শুধু মন ভরে অতিথি আপ্যায়ন করতে পারলেই সন্তুষ্ট।আত্মীয় স্বজন ,পাড়া-প্রতিবেশীসহ চৌধুরী বাড়ির সকলের ভোজ সম্পন্ন করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমেছে। চৌধুরীদের আপ্যায়নে ছোট থেকে বড় সকলেই মুগ্ধ। খেয়ে-দেয়ে আসা-যাওয়ার পথে সকলেই সুনাম করছেন।এতে গর্বিত ওনারা। অবশেষে তাদের কষ্ট সার্থক হয়েছে। বরাবরের মতো এবারেও আতিথেয়তা দিয়ে সকলের মন জয় করতে পেরেছেন। এখন ভালোই ভালোই বিয়েটা পড়ানো হলেই চিন্তা মুক্ত হোন।
বিয়ে উপলক্ষে চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িং রুম সাজানো হয়েছে — যার পুরোটাই হোয়াইট আর অফ হোয়াইটের মিশ্রণে।যা বর-বউয়ের পোশাকের কালারের সাথে মিল রেখে। বর-কনে আর ড্রয়িং রুম ব্যতীত সকলের জন্যে অফ হোয়াইট কালার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা একান্তই কনের আবদার। এমনকি বাধ্য হয়ে বিয়ের কার্ডেও সেই কথা হাইলাইট করে দেওয়া হয়েছে। যারা কার্ড পেয়েছেন এমন আজগুবি বিয়ের কার্ড হয়তো জীবনের প্রথমবার পেয়েছেন তারা — যেখানে ইচ্ছা মতো কালারের ড্রেস পরা যাবে না।
বিয়ের ডেমো কার্ড হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে তূর্য বলেছিল,
” এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করে আমাকে কার্ড পাঠালে জীবনেও অ্যাটেন্ড করতাম না ”
নেহাত বাড়ির বড় কর্তার লায় পেয়েছিল মেয়েটা ।নাহলে আর এসব আজগুবি কাজ-কর্ম হতো না।
সেই দুপুর থেকে শেরওয়ানি পরে বসে আছে তূর্য। এখন অধৈর্য ভঙ্গিতে রুমে পায়চারি করছে। হাতে মোবাইল — একাধারে কল করে চলেছে একটা নম্বরে । একটা বারের জন্যে রিসিভ হচ্ছে না কল। কল রিসিভ করলে সে আর কি-ই বা বলতো।জাস্ট একটাবার দেখতে চাইতো। ব্যস !
এতটা অধৈর্য কি সে আগে কখনো হয়েছে? মনে করতে পারলো না। তখনই ব্যস্ত ভঙ্গিতে আলিয়া ছুটে এলো।মুখে বিরক্তি,
” কল রিসিভ হচ্ছে না তাহলে তোর বোঝা উচিত মেয়েটা ব্যস্ত।সাজাচ্ছে ওকে।তুই বারবার কল করে ডিস্টার্ব করছিস তূর্য ”
আলিয়ার চেয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে তূর্য বলল,
” সেই ফাইভ আওয়ার্স ধরে সাজাচ্ছে।আর কতো? ”
” তাতে প্রবলেইম কি তোর? লেইট হচ্ছে ? বিয়ে সেরে হসপিটাল যাবি?কোনো অপারেশন আছে? ”
তূর্য কিছু বলবে তার আগেই কোত্থেকে তাসিন আর নাবিল উদয় হলো। ফোঁড়ন কেঁটে নাবিল বলল,
” অপারেশ সার্চ-লাইট…. না বউ-লাইট!বিয়ের জন্যে কলিজা ফাঁইডা যাইতাছে ওর ”
সাথে তাসিন যোগ দিলো,
” যত তাড়াতাড়িই বিয়ে সারো বউ সেই রাতেই পাবে ”
আলিয়া তাসিনকে ইঙ্গিত করে বলল,
” তাও পাবে।একবার নিজের কথা চিন্তা কর।ধামড়া তো কম হোসনি ”
তাসিন ব্যঙ্গার্তক স্বরে বলল,
” এহহ..! এক বুড়ি আরেক বুড়িরে কয় দাদি। তোর কথা একবার চিন্তা কর। আমি ছেলে মানুষ পঁয়ত্রিশ পার হয়ে গেলেও বিয়ে করলে ঠেকায় কে! নিজে তো বুড়ি হয়ে যাচ্ছিস।তোকে কে বিয়ে করবে !”
তাসিনের কথায় বিপরীতে বড়বড় পায়ে হেঁটে চলে গেল আলিয়া। তাসিন চিন্তিত হলো — মেয়েটাকে আবার হার্ট করে ফেললো না তো? সেই চিন্তিত মুখ নিয়ে নাবিলের কাছে জানতে চাইলো,
” ভাই আলিয়া কষ্ট পেল নাকি?আমি তো শা’লা মজা করেই বলেছিলাম ”
নাবিল ওর পিঠ চাঁপড়ে বলল,
” ধুর বা’ড়া! কষ্ট পাইবো ক্যান? মজা করছস বুঝছে অয়। ”
” মাইয়া মানুষ ভাই । ওভাবে বলাটা উচিত হয়নি।রাগ করে চলে গেল মনে হচ্ছে ”
” রাগ হলে হইছে তাতে তোর কি বা’ড়া?একটু পর এমনেই ঠিক হইয়া যাইবো। এমন ভাব করতাছস যেন তোর গার্লফ্রেন্ড লাগে ”
নাবিলের কথায় তাল দিলো তাসিন।বলল,
” তাইতো ভাই! হুদাই টেনশন করছিলাম ”
তারপর পাশে তাঁকিয়ে তূর্যের উদ্দেশ্যে বলল,
” শোন…” কথা থামিয়ে দিলো ও।এই তূর্য কোথায় গেল? সারা রুমে চোখ বুলিয়েও দেখতে পেল না। ওয়াশরুমে আছে কিনা দেখে নিলো।দরজা ভেজানো ,সেখানেও নেই।এদিকে কে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের ফালতু ঝগড়া শুনবে। তূর্য যে আরো আগেই বেরিয়ে গিয়েছে সেদিকে হুশ নেই ওদের।
মাঝখানে একটা সাদা গোলাপের খিলান যার দুইপাশে দুইটা বসার আসন যেখানে বসে আছে তূর্য-আহি।অর্থাৎ দুইজন দুজনার বিপরীত প্রান্তে বসে আছে ।খিলান হয়ে গোলাপের সারি গুলো বেঁয়ে মেঝেতে পড়েছে। তার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে আবছা আবছা ভাবে দেখা যাচ্ছে দুই প্রান্তের মানুষ দুটোকে।অফ হোয়াইটের ভারি ল্যাহেঙ্গা পরনে আহি। সাথে গাঢ় মেরুন কালারের লং ব্রাইডাল ভেইল — যা ওকে পুরোটা ঢেকে রেখেছে। ঘোমটার নিচেও মাথা নিচু করে বসে আছে ও। তূর্যের গায়েও অফ হোয়াইট কালারের শেরওয়ানি সাথে মাথায় পাগড়ি । ওর পূর্ণ দৃষ্টি ফুলের ঝালরের ওপাশে বসে থাকা রমণীর দিকে। এত এত বাঁধা বিপত্তির পর অবশেষে সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। মনটা এখনো অস্থির হয়ে আছে ওর।ইচ্ছা করছে চারিপাশের লোকজন মাড়িয়ে প্রেয়সীর ঘোমটা উঠিয়ে কপালে টুপ করে একটা চু’মু খেতে।ভেবেই পরপর নিজের উপর হাসলো সে । সামান্য মুখ দেখার সুযোগ এখনো তার হলো না আর চুমু খাওয়ার কথা চিন্তা করছে।
এদিকে উৎকণ্ঠায় রীতিমতো হাত-পায়ের তালু ঘামতে শুরু করেছে আহির।গলা শুকিয়ে আসছে ওর। একটু পর সে তূর্য ভাইয়ের বউ হবে? এই বিয়েটা সত্যি-ই হচ্ছে তো? নাকি বরাবরের মতো স্বপ্ন? স্বপ্ন নিশ্চয় এতটা বাস্তবিক হবে না? ওর নানান বাস্তব-অবাস্তব চিন্তার ধ্যান ভাঙলো কাজী সাহেবের খুদবায়।তিনি খুদবা শেষে বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। কবুল বলার সময় রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে মেয়েটা।এমনটা তো করার কথা ছিল না। সে তো কত দিন ধরে এই দিনটার ই অপেক্ষা করছিল।তাহলে কথা আটকে কেন যাচ্ছে? ওর এত সময় লাগায় বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পড়লো তূর্যের। তার হাত সারা জীবনের জন্যে ধরতে এতটা ভ’য় পাচ্ছে ও? এরইমধ্যে কাজী সাহেব দ্বিতীয় বার বললেন,
” রাজি থাকলে বলো মা ‘ কবুল ‘ ”
এবার আর দেরি করলো না ও।সাথে সাথে তিনবার ‘ কবুল ‘ করে নিলো সামনের মানুষটাকে উপস্থিত লোকজন ঠোঁট টিপে হাসলেন। প্রথমে বলছিল না আর এখন একবার না দুইবার না তিন বার ই একসাথে বলে দিলো!ঠোঁট প্রসারিত হলো তূর্যের।এবার তূর্যের উদ্দেশ্যে বলা শুরু করলেন কাজী সাহেব। দীর্ঘ কয়েক লাইন বলার পর যখনই কাজী সাহেব ওকে কবুল করতে বললেন ও একটু সময় অপচয় করলো না যেন এই কথাটার-ই অপেক্ষা করছিল সে।ন্যানো সেকেন্ড সময় নষ্ট না করে ঝটপট তিন কবুল করলো।তাসিন তূর্যের কানের কাছে ঝুঁকে ওকে আরেকবার মনে করিয়ে দিল,
” যত দ্রুতই কবুল বলিস না কেন বউ সেই রাতেই পাবি ”
তূর্য দাঁত পিষে কিছু বলার আগেই কাজী সাহেব মোনাজাত শুরু করলেন।দুজনের সুখী জীবন কামনা করে মোনাজাত শেষ করলেন ।তারপর রেজিস্ট্রি হলো দুজনের।বিনি সুতোর বাঁধনে বাঁধা পড়লো দুটি মন। বাঁধা তো আরও আগেই পড়েছিল।এবার শুধু সামাজিকভাবে — সবাইকে সাক্ষী রেখে মার্চের শেষ শুক্রবার সেই কাজটা সম্পন্ন হলো। হালাল ভাবে একে অপরের হাত ধরলো। অবসান ঘটলো দীর্ঘ অপেক্ষার। সমাপ্তি ঘটলো দুটি হৃদরের প্রণয় ব্যাকুলতা’র।
বিয়ে শেষে বড়রা ড্রয়িং রুম ত্যাগ করলেন।জানেন এরা এখন আরো অনেক নিয়ম-নীতি পালন করবে । দুই একটা বেফাঁস কথা বলবে।সুতরাং এখানে থেকে লজ্জিত হওয়ার কোনো মানে নেই।
ড্রয়িং রুম একটু ফাঁকা হতেই তূর্য উঠে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর দিকে।আলতো হাতে ফুলের ঝালর সরিয়ে প্রেয়সীর নিকট পৌঁছালো।সামান্য কুঁজো হয়ে ধীরে ধীরে ঘোমটা টেনে তুললো। মুখ খানা দৃষ্টি গোচর হতেই চোখ বন্ধ করে নিলো ও। সেকেন্ডের মধ্যে আবার চোখ খুলল।মাথা নত করে রাখা নতুন বউয়ের মুখটা দুই হাতে আঁজলা করে ধরলো । ধীরে ধীরে মুখ তুললো আহি। তূর্য ওর কপালে গভীর করে একটা চু’মু আঁকলো তূর্য।লজ্জায় নুইয়ে পড়লো মেয়েটা। তূর্য ওর চোখে চোখ রাখলো।সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে গেল।আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
” আর ইউ ক্রা’য়িং? হোয়াই?”
উত্তর দিলো না আহি। তূর্য ওর ভেজা দু চোখের পাতায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুটো চু’মু এঁকে ফিসফির করে বলল,
” এখনই কাঁন্না করিস না। সামনে কত সময় পড়ে আছে ”
” এখানেই বাসর শুরু করে ভাই ” তাসিনের কথায় ওর রুষ্ট চোখে ওর দিকে তাঁকালো তূর্য।বলল,
” কি প্রবলেইম তোর? ”
” প্রবলেইম আমার একটাই ভাই।তুই …..” আসলাম চৌধুরীকে এদিকে আসতে দেখে মুখ বন্ধ করে নিলো তাসিন। ঘটা করে একটি সালাম দিলো। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে একদম তূর্যের কাছে এগিয়ে গেলেন।মেয়েকে দাঁড় করালেন। তূর্যের একটা হাত আর আহির একটা হাত একসাথে করে নিজের দুই হাত দ্বারা আগলে ধরলেন । ধরা গলায় বললেন,
” সামলে রাখিস বাবা । ছেলে মানুষ ! ”
তূর্য এবারে অবাক না হয়ে পারল না।আসলাম চৌধুরীর দিকে লক্ষ্য করে দেখল এই মহাশয়ও ভেজা চোখে দাঁড়িয়ে আছেন। আজ বুঝলো সে, তার সহধর্মিণী এত কাঁন্না-কাঁটি কোথা থেকে শিখেছে।নিশ্চিত বাপের জিন’টাই পেয়েছে।জনাব এমন ভাব করছেন যেন তার মেয়েকে নিয়ে পুরো দেশ ছেড়ে চলে যাবে ও।আর কখনো তাদের দেখা হবে না,কথা হবে না।অথচ বাড়িটাও ছাড়ছে না তারা। ও মৃদু কন্ঠে আ’র্তনাদ করে বলল,
” চাচ্চু?আপনি কাঁন্না করছেন? আর আহি কেমন আমি জানি না?সেটাও বলে দিতে হবে? ”
ভেজা চোখে হাসলেন আসলাম চৌধুরী।গর্বিত কন্ঠে বললেন,
” জানি বলেই মেয়েটাকে নিশ্চিন্তে তোর হাতে তুলে দিয়েছি। ”
তূর্য এবার সোজা আসমান থেকে পড়লো।নিশ্চিন্তে তার হাতে তুলে দিয়েছেন ? তাহলে অতসব খেল কে খেলল? ভালোবাসার দহনে জ্বা’লিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে তবে ছেড়েছেন ভদ্রলোক।ভাগ্যিস ছাই হওয়ার আগে আগে মেয়েটাকে নিশ্চিন্তে দিয়েছেন।আর এটাই যদি নিশ্চিন্তে দেওয়া হয় তাহলে চিন্তা করে দিলে তিনি কি করতেন একমাত্র উপরওয়ালা ভালো জানেন। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া তিনি নিশ্চিন্তে দিয়েছেন,মোটেও চিন্তা করেননি।
আরো কয়েকটা আবেগী কথাবার্তা বলে ভদ্র লোক চলে গেলেন।তূর্য নিজের ত্যাঁড়া কথা পিছন পকেটে রেখে যথাসম্ভব ভদ্র-সভ্য ভাবে উত্তর দিয়ে গেল। আসলাম চৌধুরী যেতেই তাসিন কপট ভোলাভালা মুখ করে বললো,
” ভাই বউকে যেভাবে সান্ত্বনা দিলি।শ্বশুরকেও সেভাবে দিতিস ” তূর্য আগ্নেয়গিরির লার্ভার মতো চোখ করে ওর দিকে তাঁকালো। থোড়াই কেয়ার করলো তাসিন! সে তূর্যের দৃষ্টি উপেক্ষা করে বলল,
” বুঝলি না কি বললাম? ঐযে আহির দু’চোখের পাতায় চুমু খেয়ে যে সান্ত্বনাটা দিলি ঐটার কথা বললাম ভাই ”
তাসিনের কথার বিপরীতে পিংকি ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলল,
” এত কথা বলিস তুই। আমরা নাহয় তোর ফ্রেন্ড।আহিকে তো মানবি ! ”
” এই বিবাহিতা মহিলা চুপ থাক তুই ”
তাসিনের কথার বিপরিতে নাবিল শাসালো ওকে ,
” এই বা’ড়া আমার বউয়ের লগে মুখ সামলায় কথা বলবি ”
” আসছে আমার বউওয়ালা ! তুইও সর ” মৃদু ধমকে কথাগুলো বলল পিংকি। ওর কথায় হো হো করে হেসে উঠলো তাসিন। এমন হাসি দেখে নাবিলের ইচ্ছা করছে চেহারার নকশা বদলে দিতে।
আলিয়া-তূর্য ঠোঁট টিপে হাসছে। আহিও জোরে হেসে উঠলো। তূর্য ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাঁকাতেই নিজেকে ধাতস্ত করে মুচকি হাসলো। সেটা দেখে তূর্যের ঠোঁট আরেকটু প্রসারিত হলো।
এদিকে নাবিলের অবস্থা কাঁদো কাঁদো।হৃদয় চিরে একটাই কথা বের হয়ে আসলো ‘ যার জন্যে করি চু’রি সেই বলে চোর ‘
সে বুক ভরা কষ্ট নিয়ে বিড়বিড়ালো,
” বা’ড়ার বউ বিয়ে করছি।জীবনে তুই থেকে তুমিতে আনতে পারলাম না।আর যেমনে পারবে তেমনে ঠাপ দিবো ”
তূর্য আহিকে নিয়ে ওরা একটা ওয়েডিং স্টেজ সোফাতে পাশাপাশি বসিয়েছে। আহির ঘোমটা উঠিয়ে এখন কপালে তোলা হয়েছে। সুন্দর করে সেট করিয়ে দিয়েছে আলিয়া। ওর পাশেই তূর্য বসে আছে। তার পাগড়ি আপাতত শান্ত-প্রান্তের কব্জায়।তারা একেকবার একেকজন মাথায় দিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত। ওদের কান্ড দেখে তাহির ইচ্ছা করছে আহির মাথা থেকে ভেইন খুলে এনে নিজের মাথায় দিতে। কিন্তু অত বড় ওড়না সামলাতে পারবে না হয়তো তাই যাচ্ছে না।অগত্যা সেও দুই ভাইয়ের কাছে পাগড়ি চাইতে লাগলো।সেটা পরেই ছবি উঠাবে।তার মনের আশা পূরণ হওয়ার আগেই বর-কনের সাইড থেকে হাউকাউ ভেসে এলো। হাসাহাসির আর কথার শব্দ শুনে সে দৌঁড়ে তাদের কাছে চলে গেল।গিয়ে দেখলো আলিয়া একটা আয়না হাতে তূর্য-আহির সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে।আর বাকিরা ওদের ঘিরে রেখেছে।ও গিয়ে হাত তালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো।
আলিয়া আহির কাছে জিজ্ঞেস করলো,
” আয়নায় কি দেখা যায়?”
আহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। কি বলবে কিচ্ছু মাথায় আসছে না। এবারে সকলে চেঁচিয়ে উঠে আবারো একই কথাটা বলল,
” আয়নায় কি দেখা যায় আহি?”
আবারো মস্তিষ্ক হাতানো শুরু করলো মেয়েটা। তারপর লাজুক মুখে বলল,
” তূর্য ভাই ”
সবাই অবাক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাঁকালো মেয়েটার দিকে।এত গুলো চোখকে ওভাবে নিজের দিকে তাঁকিয়ে থাকতে দেখে আহি আহত দৃষ্টিতে পাশে তাঁকালো। পাশের ব্যক্তির দৃষ্টি আরো ভ’য়ঙ্কর।অগ্নি দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে তূর্য ওর দিকে। চোখে চোখ পড়তেইও দাঁত পি’ষে বলল,
” কি বললি ইডিয়ট?”
লোকটার এহেন কন্ঠে মেয়েটার বুক ধক করে উঠলো।সে দ্রুত চোখ সরালো তূর্যের হতে।নাহলে মনে হচ্ছে চোখ দিয়ে গিলে খাবে। পিংকি বলল,
” ঠিক করে বলো আহি ”
আহি এবারেও একটু সময় নিলো।বলল,
” তূর্য ভাআআআ..” আবারো তূর্যের চোখে চোখ পড়ায় মাঝ পথে থেমে গেল ও।তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে সে। মেয়েটা নিজেকে শুধরে থতমত করতে করতে বলল,
” ববর, বর, স্বাআআমী,হাজ …হাজবেন্ড ”
তাসিন ওর কথাগুলো গুছিয়ে এক জায়গা করলো,
” তূর্য বর,আহি? ”
এরপর হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তূর্যের দিকে তাঁকিয়ে টিটকিরি করে বলল,
” কিউট নেইম ভাই।একদম হৃদয় কাঁড়া ।তূর্য ভাই থেকে এখন তূর্য বর”
তারপর একযোগে সকলে হেসে উঠলো। তূর্য কিছু বলল না ওকে ,আর না আহিকে।শুধু ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো। মৃত্যু ছাড়া হয়তো বউয়ের ভাই ডাক থেকে মুক্তি পাবে না সে। নাবিল তাড়াহুড়ো করে বলল,
” হইছে বা’ড়া ছোট মানুষ ।এই তূর্য তুই ক এহন ”
তাসিন ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
” তোর এত তাড়াহুড়ো কিসের? মনে হচ্ছে এসব রিচ্যুয়াল চুকিয়ে বাসরে তূর্য না তুই ঢুকবি ”
এই মুহূর্তে নাবিল ওর কথায় পাত্তা দিলো না।তাড়াহুড়ো করবে না? সে তো শুনতে চায় তার বন্ধু মহাশয় কি বলেন।
তাসিন তূর্যের কানের কাছে ঝুঁকে বলল,
” বা’সরটা একটু ভুলে থাক ভাই। ”
” থাকতে দিচ্ছিস তুই?” কটমট করে উঠলো তূর্য। নাবিল এবারের তাসিনের দলে যোগ দিলো,
” হ একটু ভুইলা থাক! সকাল হলেই তোগো ছাইড়া দিবো ”
” কি গুজুর-গুজুর, ফুসুর-ফুসুর করিস ?” আলিয়া বিরক্ত হয়ে বলল।নাবিল ধ’মকে উঠলো,
” সব কথা তোরে কওন লাগবো বা’ড়া ? নিজের কাজ করা ”
আলিয়া চায় না ওদের সাথে তর্কে জড়াতে।ও তূর্যের উদ্দেশ্যে বলল,
” এই তূর্য এইবার তুই বল । আয়নায় কি দেখা যায়?” পরপরই আবার হাসতে হাসতে বলল,
” তুই আবার তোর বউয়ের মতো বলিস না — আহি বউ দেখা যায় ”
আবারো হাসির ঝড়।লজ্জায় আহির গাল রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। তূর্য আয়নার মধ্য দিয়ে সেটা দেখলো।দুজনের চোখাচোখি হলো । চোখে চোখ রেখেই তূর্য হঠাৎ অন্যমনস্ক হলো। মধ্যম আওয়াজ তুলে বলল,
” আমার এত বছরের অপেক্ষার ফল। মাই লাভ,মাই লাইফ,মাই হা’র্টস্টিলার এ্যান্ড এ্যাট লাস্ট মাই এভরিথিং ! ”
আহি তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিলো।তূর্য এখনো ওর দিকে তাঁকিয়ে আছে।
” ভাই একটা জিনিস মিসিং। ”
তূর্য প্রশবিদ্ধ নয়নে তাঁকালো তাসিনের দিকে।তাসিন বিষয়টা পরিষ্কার করে বলল,
” জা’ন বললি না যে ? ”
” ধুর বা’ড়া! লাইফ বলছে না? জীবন আর জা’ন একই তো । ক তূর্য ? ”
নাবিল-তাসিনের থাট্টামিতে গা জ্বলে উঠলো তূর্যের।শক্ত কন্ঠে বলল,
” তোদের জাস্ট নিতে পারছি না।আর কোনো রিচ্যুয়াল পালন করতে পারবো না আমি।” অতঃপর আহির হাতের কব্জি ধরে উঠতে উঠতে বলল,
” এই চল ”
” আর কোনো রিচ্যুয়াল নেইও। একমাত্র বাসরই আছে। তুই না চাইলে আমরা তোকে জোর করছি না ভাই।আর …” তূর্যের সরু চাহুনি দেখে মুখ বন্ধ করে নিলো তাসিন।আহি এখনো ঠাঁয় বসে আছে দেখে তূর্য একটু শক্ত করে বলল,
” উঠছিস না কেন?”
” একটু ওয়েট কর তূর্য।আমরা আহিকে রুমে দিয়ে আসি তারপর তুই আয় ”
পিংকির কথা মেনে নিলো ও। পুনরায় সোফায় বসলো। আলিয়া পিংকি ও আরো কয়েকজন মিলে আহিকে নিয়ে গেল। সোফার অপর পাশ ফাঁকা হতেই নাবিল-তাসিন সেই জায়গা দখল করলো।তারা হয়তো কিছু বলতে চাইছিল।কিন্তু তার আগেই তূর্য ওদের সাবধান করলো,
” এখন একটা ফালতু কথা বলে দেখ তোরা ”
প্রায় মিনিট বিশেক পর আলিয়া কল করে তূর্যকে রুমে যেতে বলল। তূর্য ড্রয়িং রুমে বসে আবারো আসলাম চৌধুরীর সাথে কথা বলছিল।এবারে পাশে মারুফা বেগমসহ বাড়ির বাকিরাও আছেন।শুধু আকবর চৌধুরী ব্যতীত।আলিয়াকে সে ছোট্ট করে একটা ম্যাসেজ দিয়ে জানালো একটু পর যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই। আরো কিছুক্ষণ সময় পার হলো তারপরেও তূর্য এলো না দেখে তাসিন কল করলো ওকে।তাকেও একই কথা বললো তূর্য। খানিক পরপর একেকজনের থেকে একেকবার কল আসছে খেয়াল করলেন লতা বেগম। লাগাতার কল দেখে তিনি বললেন,
” রাত ভালোই হয়েছে। শুয়ে পড়লে ভালো হতো। ”
ওনার ইঙ্গিত বুঝলেন আসিফ চৌধুরী।তিনি মেজো ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
” হ্যাঁ,ভাইজান।উঠি আমরা।তূর্য যা তুই ”
এভাবেই বললেই তো আর উঠে যাওয়া যায় না।তূর্য বসে রইলো সেখানে। অথচ মনে মনে চাইছে এই আসর ভাঙুক।তারপর সে যাক।কিন্তু সেটা বোধ হয় হওয়ার নয়।কথা শুধু বাড়ছেই।কিছুক্ষণ বাদে তাসিন হাঁক-ডাক করতে করতে এলো,
” কিরে ভাই বা’সর-টাসর করবিনা নাকি?”
কথাটা বলেই ড্রয়িং রুম শুদ্ধু মানুষ দেখে চমকে উঠলো ও।ওরা তখন তূর্যকে একা রেখেই উপরে গিয়েছিল।পুরো ফ্যামিলি কোথা থেকে উদয় হলো কে জানে। ছেলেটা ফ্যাকাশে মুখে সবার দিকে একেকবার করে তাঁকিয়ে মেকি হাসলো। এবার বোধ হয় টনক নড়ল আসলাম চৌধুরীর।তারপর তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
” আচ্ছা,উঠছি তাহলে।তোমরা শুয়ে পড়ো।আহির মা এসো।”
অতঃপর একে একে সবাই শয়ন কক্ষে চলে গেলেন।ড্রয়িং রুম ফাঁকা হতেই তাসিন মুখ গোমড়া করে বলল,
” স্যরি ভাই।সবাই আছে আমি বুঝতে পারিনি ”
তূর্য উঠে ওর কাঁধে হাত রাখলো। সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে বলল,
” থ্যাংক ইউ ”
” কেন?” আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো তাসিন। এ আবার পাগল হয়ে গেল না তো। এতক্ষণে দুই ঘা না দিয়ে জামাই আদর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আবার ধন্যবাদও জানাচ্ছে ?
” নাহলে জায়গা ছেড়ে উঠতেই পারছিলাম না ” মুখ খুলল তূর্য।
” আমি কত হেল্পফুল বল ? ” একটু গর্বিত ভাব নিয়ে বলল তাসিন ।তূর্য ওর কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে যেতে যেতে বলল,
” হ্যাঁ,ভীষণ ! ”
তূর্য সিঁড়ি টপকে রুমের দরজায় এসে দেখলো তালা ঝুলছে সেখানে।আর দরজা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে পিংকি-আলিয়া-নাবিল-শান্ত-প্রান্ত আর এতক্ষণ ওর সাথে আসা তাসিনটাও এক লাফে ওদের দলে যোগ দিয়েছে। আশ্চর্য হলো না সে। এ বিষয়ে তার পূর্ণ ধারণা ছিল। এমনকি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে। ইতোমধ্যে অনেক জায়গা অনেক সময় নষ্ট করে ফেলেছে।এবারে আর সেটা হচ্ছে না।সে তাড়াহুড়ো করে বলল,
” অ্যামাউন্ট বল ”
সবাই একসাথে লাফ দিয়ে বলে উঠলো,
” ফিফটি থাউজেন্ট ”
তূর্য সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে ফেললো।আশ্চর্য হয়ে বলল,
” পা’গল তোরা? ”
” আমরা ছয় জন। দশ হাজার কম চেয়েছি এটা ভেবে শুকরিয়া আদায় কর ”
” এত টাকা কোথায় পাবো?বোঝার ট্রাই কর ”
” নাটক না করে টাকা বের কর তূর্য।অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমার কষ্ট হচ্ছে ” বলে হাত এগিয়ে টাকা চাইলো পিংকি।
তূর্য ওদের বোঝানোর চেষ্টা করলো।শান্ত কন্ঠে বলল,
” এত ক্যাশ টাকা নেই আমার কাছে,ট্রাস্ট মি। ”
” আচ্ছা নেই ভালো কথা।এইযে চাবি আমরা গেলাম ” বলে হাতের চাবি তূর্যের মুখের সামনে দিয়ে দুই-একবার নাচালো আলিয়া।তূর্য ওর আর পিংকি উদ্দেশ্যে বলল,
” তোরাও ওই দুইটার মতো করবি?” নাবিল আর তাসিনকে উদ্দেশ্য করলো সে। পিংকি – আলিয়া দুইজনেই উপর নিচ
‘ হ্যাঁ ‘বোধক মাথা নাড়লো। শান্ত-প্রান্ত বলল,
” দিয়ে দেও তো ভাইয়া।ঘুম আসছে সকালে কলেজ আছে ”
তূর্য এবারে তাঁকালো দুই ভাইয়ের দিকে।ওর কাছে সত্যিই এত ক্যাশ টাকা নেই। ওয়ালেট কুঁড়ালে হয়তো হাজার বিশেক হবে।সেটাও ওদের জন্যে রেখেছিল।নাহলে এতগুলো টাকাও থাকতো না। অতঃপর সে ওয়ালেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে ওদের হাতে দিলো। আলিয়া হাত থেকে চাবিটা এক প্রকার ছোঁ মে’রে নিয়ে নিলো।দ্বিতীয় কোনো কথা না বলে রুমে প্রবেশ করলো ও।তাসিন আফসোস করে বলল,
” কয়েক হাজার বেশি চাইলে ভালো হতো। পঞ্চাশ চাইলাম আর পঞ্চাশই দিয়ে দিলো?লস হয়ে গেল রে ”
” গেল রে গেল ..সব গেল ” তাসিনের কথার মাঝে হাহাকার করে উঠলো নাবিল । পিংকি ওর মাথায় চ’ড় বসিয়ে বলল,
” পাঠার মতো চিল্লাস কেন ? ”
” ধুর বলদ বা’ড়ারা। তূর্য পিন বলে নাই রে ”
সকলের মাথায় হাত উঠে গেল। অতঃপর সবাই হুড়মুড়িয়ে দরজার উপর পড়লো।এক যোগে দরজা ধাক্কাতে আরম্ভ করলো।কিছুক্ষণ ধরে ধাক্কা-ধাক্কির পরেও ভেতর থেকে কোনো সাঁড়া-শব্দ না পেয়ে ক্লান্ত হয়ে থেমে গেল ওরা। এত বড় নির্বুদ্ধিতার জন্যে তারা নিজেরাই একে অন্যের উপর দোষ আরোপ করতে লাগলো। তাসিন কি’ড়মিড় করে নাবিলকে বলল,
” শালা আগে বলবি না ?”
” ও তাও পরে বলেছে তুই তো সেটাও পারলি না ” আলিয়া বলল।
পিংকি গোমড়া মুখে বলল,
” তূর্য এমনি যেমনই হোক ওকে আমি সলিড ভাবতাম। সেও তাসিন-নাবিলের মতোই জা’উরার হাঁটি ”
” বরের সাথে থেকে থেকে তার কথা ভালোই আয়ত্ত করেছিস দেখছি ” আলিয়ার এহেন কথায় ওর উপর চোটে গেল নাবিল।বলল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৫৯ (২)
” বা’ড়ার কথা কইস? আমি খালি বা’ড়া-ই কই।ওসব জা’উরা-ফাউরা বলি না ”
” হ ভাই ক্ষ’মা !” বলে আলিয়া চলে গেল। নাবিল তখনও গলা উঁচু করে বলতে লাগলো,
” আমার বউ আমার সাথে থাইকা নাহয় শিখছে।তুই তো আর তাসিনের লগে থাকোস না। তুই ‘ ভাই ‘ কেমনে শিখছস বা’ড়া?”
