প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩২
নীতি জাহিদ
এস এস সি পরীক্ষার শেষ দিন। অভিভাবকদের ভীড়। জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ অতিক্রম করেছে সন্তানেরা। শেষ পরীক্ষা হওয়াতে কম বেশি সবার অভিভাবক এসেছে। ব্যস্ত স্কুল গেট। রবিন গাড়ি দূরে দাঁড় করিয়েছে ইমরানের আদেশে। গাড়ি থেকে দুজন বেরিয়ে এক পাশে দাঁড়ালো। এর মাঝে ইশান বেরিয়ে দুজনকে দেখেই ছুটে এলো। পরীক্ষা বেশ ভালো দিয়েছে। দায়িত্ববান মায়ের মত প্রশ্ন হাতে নিয়ে দেখছে আর জিজ্ঞেস করছে,
– সব দিয়েছো? মিস করেছো কিছু?
ইমরান থামিয়ে বললো,
– হয়েছে থামো, ক্ষুধা পেয়েছে আমাদের। চলো কিছু খাবে।
– আগে ফুচকা। আমার পক্ষ থেকে ট্রিট।
মোনা খুশিতে হাত তালি দিয়ে বলে,
– ওকে।
ইশানের কয়েকজন বন্ধু এগিয়ে এলো। বন্ধুদের বাবা মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। বন্ধুদের অনেকের বাবা মা ও ইশানের বাবা মায়ের সাথে আজ প্রথমবার পরিচিত হলো৷ মোনাকে দেখে অনেকে আঁড়চোখে তাকাচ্ছে। মোনা হেসে মিষ্টি করে কথা বলছে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে ইশান বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
– পাপা তোমার হাইজেনিক লুকে তাকাবেনা আমাদের দিকে। আমি মাকে ফুচকা খাওয়াবো কথা দিয়েছি। একদম আনহাইজেনিক বলবেনা।
ইমরান মাথা নাড়লো। সে কখন কিছু বললো! সবাই শুধু তাকে দোষ দিতেই ব্যস্ত থাকে। বাবা মা গাছতলায় গাড়ির সামনে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। ইশান দু হাতে দুই প্লেট ফুচকা নিয়ে এক প্লেট নিজে নিলো অন্যটা মাকে দিলো। ইমরান ফোন চালাচ্ছে। মোনা আরাম করে খাচ্ছে। ইমরান ভ্রু কুচকে বললো,
– আমাকে তো একবার জিজ্ঞেস করা যেত খাব কিনা?
মোনার প্লেট থেকে ফুচকা নিয়ে একটা মুখে পুরে বললো,
– টেস্ট ইজ গুড বাট ধানমন্ডি লেকের টা বেস্ট।
মোনা আর ইশান হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে ইমরানকে। ইশান বলেই ফেললো,
– পাপা তুমি ফুচকা খাও?
ইমরান হাসছে। মোনা থেকে আরেকটা ফুচকায় টক মিশিয়ে মুখে পুরে দিয়ে বললো,
– অবশ্যই। ফুচকা তো খাওয়ার জিনিস।
মোনা মুখ ভেঙচিয়ে বললো,
– আরো কত কি যে দেখবো আল্লাহ। ইমরান সাহেব ফুচকা খায় কিন্তু আনহাইজেনিক কিছু খাবেনা।
ইমরান একপেশে হেসে বললো,
– ফুচকা আনহাইজেনিকই টেস্ট। হাইজেনিক হলে টেস্টলেস হয়ে যাবে।
মোনার কানের সামনে এসে ফিসফিস করে বললো,
– দুনিয়াতে এমন আরো অনেক আনহাইজেনিক জিনিস আছে যা আনহাইজেনিকই অমৃত।
মোনা স্তব্ধ। ঘাড় ঘুরিয়ে ইমরানের দিকে তাকাতেই ইমরান ছেলেকে তাড়া দিচ্ছে। যেন সে কিছুই বলে নি এখন। ইমরান ডাবল মিনিং কথা বলে মোনা জানতেই পারলোনা আজ অবধি? মোনার কাছ থেকে ফুচকাওয়ালা প্লেট নিয়ে গেলো। ইশানের পক্ষ থেকে ট্রিট ছিলো বাবা মায়ের জন্য। রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ সেরে গাড়িতে উঠে বাড়ির পথে রওয়ানা হতেই ইমরানের ফোন এলো অফিসে ঝামেলা হয়েছে। মোনাকে জানাতেই গাড়ি অফিসের দিকে রওয়ানা হলো।
অফিসে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকতেই ভিড় লেগে গেলো। রিমিকে সমানে বকে যাচ্ছে নয়ন। ইমরানকে দেখে নয়ন কিছুটা শান্ত হলো। ইমরান সরাসরি প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে?
নয়ন ইমরানের উপর চড়াও হয়ে বললো,
– ফাইল সাইন করার আগে দেখিস নি মডেল কে?
– না।
– মডেল হলো হিরোইন কাঁকন। সে অসুস্থ তাই আসতে পারবেনা। বাসার লোকজন জানিয়েছে। আমি বুঝিনা আমার অফিসের মেয়ে গুলো এমন গর্দভ প্রকৃতির কি করে হতে পারে। শাড়ির শ্যুটের জন্য এমন ভাইরাল হিরোইন কেনো আনতে হবে?
নয়নের চিৎকারে অফিস শান্ত। রাগে ওর শরীর কাঁপছে। সোহান বুঝিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কে শুনে কার কথা। ইমরান একটি কথাও বলছেনা। ইশান মোনার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান নিজের কেবিনে ফ্যাশন টিম এবং ক্রিয়েটিভ টিমের দশজনকে ডাকলো। ওরা আসার পর মোনা তামান্নার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আপু তোমার মডেল গুলার কি সমস্যা হয়েছিলো?
তামান্না জানালো,
– কিছুই না। রিমি বললো একটু হাইপড, ভাইরাল নিতে এতে নাকি প্রমোশন ভালো হবে।
– শো স্টপার রেডি হয়েছে?
– হিরোইন কাঁকনই ছিলো।
মোনা চোখ বুজে নিজেকে শান্ত করে বললো,
– তোমার মডেলরা আসবে কল দিলে?
– জানিনা। দিবো?
– দাও। আরেকটা কথা শো স্টপার আমি হবো। আমি আরো আগেই প্ল্যান করেছিলাম একজন মেল মডেল লাগবে। আমার কাছে মেল মডেল আছে। ইমরান সাহেব আপনার কোনো আপত্তি আছে আমি শো স্টপার হলে?
উপস্থিত সকলে আবাক মোনার আচরনে। ইমরান মাথা নাড়লো। আপত্তি নেই জানালো। নয়ন বললো,
– মেল কে?
– জানাবো।
ইমরানের তীক্ষ্ণ চোখ। মোনার হাসি পেলো। ইমরান গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলো নিজেকে আটকাতে না পেরে,
– মেল কে?
– জানাবো?
ইমরান বজ্রেকন্ঠে বলে উঠলো,
– আমি তো যাকে তাকে তোমার সাথে স্টেজ পারফর্ম করতে দিতে পারিনা।
পুরুষ মানুষ যে স্ত্রীর ব্যাপারে হিংসুক প্রকৃতির হয় এটা জানা কথা তবে ইমরান শরীফ ও বউ এর জন্য ভাবছে ব্যাপারটা বেশ। মোনা বক্র হাসি দিয়ে ইমরানকে উপেক্ষা করে তামান্নার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
– আপু আসবে উনারা?
– হ্যাঁ হ্যাঁ রাজি হয়েছে। এখন আসতে বলেছি।
মোনা হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো,
– এখন অলরেডি সাড়ে তিনিটা ক্রস করেছে। লাঞ্চ আওয়ার শেষ। উনারা আসলেই ফটোশুটের জন্য রেডি হয়ে যেতে হবে আমাদের। ইমরান সাহেব আমাদের ফ্লাইট টা কি ডিলে করা যায় না? কাজটা শেষ করে যাই। হয়তো দুয়েক ঘন্টার পার্থক্য হবে।
ইমরান ইশানের দিকে তাকাতেই ছেলে মুখ কালো করে ফেলেছে। মোনা ইশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– ইশান আমরা যাব তো। তুমি এখন রবিন আংকেলের সাথে বাসায় চলে যাও। রেডি হয়ে নাও। টিকিট দশটায় কাটলে হবে।
নয়ন ইমরানের চেহারায় রাগের আভা দেখতে পেয়ে প্রশ্ন করলো,
– মোনা মেল মডেল কে?
মোনা হেসে উত্তর দিল,
– আমাদের ইশান।
নয়ন হঠাৎ হেসে দিলো। উত্তেজিত হয়ে বললো,
– আহারে মোনা! যেভাবে দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছে আশেপাশের মানুষ জনসহ আমরা ভাবলাম তুই মনে হয় কারো সাথে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিস। না ঠিক আছে, পারফেক্ট নায়ক।
ইশান নাক মুখ কুচকে বললো,
– কি বলো এসব। আমি স্টেজে হাঁটতে পারবোনা। আই হ্যাভ স্ট্রং স্টেজ ফোবিয়া।
নয়ন ক্ষেপে বললো,
– বেটা তোর বাপ স্টেজ চষে বেড়িয়েছে আর তুই স্টেজ ফোবিয়া নিয়ে আছিস।
মোনা কপালে রাগের রেখা তুলে বলে উঠলো,
– ওকে আমি রেডি করবো। এখন এসব বাদ দাও। ইশান বাড়ি যাও। আর রিমি আপু তোমাকে যে আমি বার বার প্রশ্ন করেছিলাম মডেল কে? আমাকে এমন ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে উত্তর না দিলে এখন সবাইকে এমন ঝামেলায় পড়তে হতোনা। মাঝে মাঝে একটু কথা শুনবে আমার। সবকিছুতে নিজেকে সর্বজ্ঞানী ভাবা কমাও। তুমি যে ইদানীং সবকিছুতে বেশি বুঝছো এটা কি আন্দাজ করতে পারছো?
মোনা আজ রাগ ঝাড়া শুরু করেছে। রিমির সাথে মোনার ব্যবহার দেখে বাকিরা স্তব্ধ। এত বাজে ব্যবহার আজ অবধি মোনা করেনি। ইমরানের ইন্টারকমে হাত বাড়িয়ে একজন স্টাফকে ফোন দিয়ে বললো রুম থেকে সব রকম কাউন্টের একটা করে স্যাম্পল শাড়ি নিয়ে আসতে। নয়ন রিমির দিকে তাকিয়ে বললো,
– মডেলকে কি এডভান্স পেমেন্ট করেছিলে?
– চায় নি তাও নিজ থেকে পাঠিয়েছি অনারিয়াম হিসেবে।
– কত?
– ত্রিশ হাজার।
নয়ন ক্ষেপে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সাথে সাথে নয়নকে থামিয়ে মোনা বললো,
– মামা এমনিতেই পাপের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। দান খয়রাত করা হয়নি আমার অনেক দিন। আমার স্যালারি থেকে ত্রিশ হাজার কেটে রেখে দিও। বেচারী অসুস্থ চিকিৎসার জন্য লাগবে।
ইমরান কিঞ্চিৎ হাসলো। পাক্কা বিজনেস লেডি। ঘটনা ট্যাকেল দেওয়াও শিখে গিয়েছে। মুগ্ধ চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছে মিনহাজ কন্যার প্রতিটি কাজ। শাড়ি আসতেই মোনা উপস্থিত অফিসারদের সবাইকে দাম জিজ্ঞেস করা শুরু করলো কোনটা কত, সেই সাথে কাউন্ট। বেশ কজন বলতে পারলেও বাকিরা চুপ করে আছে। রিমি কাউন্ট ও বলতে পারেনি, দাম তো বহু দূরের। মোনা পুনরায় রাগ ঝাড়লো,
– সেদিন বার বার বললাম সুযোগ পেলেই শাড়ি গুলো দেখবেন। প্রাইস নিয়ে আলোচনা করবেন। আমার কথা কেউ আমলেই নিলেন না। আপনারা কি চাচ্ছেন বলেন তো? ঢং ঢাং করে অফিসে আসবেন। কে কত সুন্দর গেট আপে এসেছে এসব দেখবেন। এর উপর আজ বসের উপর তো কাল বসের পিয়নের উপর ক্রাশ খাবেন এরপর কাজে ফাঁকি দিবেন। দরকার কি জোর করে জব করার ইচ্ছে না থাকলে? শাড়ির দাম জানা এমন আহামরি কি কাজ! এর মাঝে কতবার যে তাঁত পল্লী ভিজিট হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।আমাদের সব তাঁতী কো অপারেটিভ। আমাকে জিজ্ঞেস করলেই তো বলতে পারতাম। জানতেও তো আসেন না আমার কাছে। সবজান্তা সবাই। আসবেন কেনো?
রুম গরম হয়ে গিয়েছে মোনার গলার স্বরে। সবার মাথা নত। ইমরান চুপচাপ দেখছে। রিমি কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলল,
– স্যার আমি তো আপনাকে জানিয়েছি আমি ওয়েস্টার্ন ড্রেসে অভ্যস্ত শাড়ি তেমন চিনি না। আমার একটু সময় লাগবে।
ইমরান মোনার দিকে আঙুল তাক করে রিমিকে বললো,
– যা বলার ম্যাডামকে বলুন। মোনালিসা, ম্যাডামের ডিপার্টমেন্ট। আ’ম দ্য এডভাইজর এন্ড ইনভেস্টর অনলি।
মোনা রক্তচক্ষুতে রিমির দিকে চেয়ে বললো,
– তাহলে এত আগ্রহ নিয়ে যে রিপোর্ট করলেন আপনি মিস. রিমি ওগুলো কি ফেক ছিলো নাকি? আপনার রিপোর্ট নয়?
তিহান তখন উত্তর করলো,
– আসলে ওগুলা আমরা সবাই মিলে করেছি।
মোনা হেসে বলে,
– মি. তিহান স্যরি টু সে সবসময় ফ্রেন্ডকে বাঁচাতে পারবেন না। আমি একবার টার্গেট করলে নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে দিব।
সাদাফ ইশারা দিলো। বাকিরা চুপ থাকলো। দোষটা ওদেরই। মোনালিসাকে লাইট ভাবে নিয়েছিলো।ইমরান যে মোনালিসার আউটলেট নিয়ে এত সিরিয়াস কেউ কল্পনাও করেনি। নয়নের ফোন আসাতে বাইরে গেলো সাথে করে নিয়ে এলো টিউলিপের সাপোর্টিভ ইলিয়ানার কোম্পানির চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দোহাকে। ইমরানের চেম্বারে ঢুকতেই,
নয়ন বলে উঠলো,
– দেখ কাকে নিয়ে এসেছি?
ইমরান তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম জানাতেই কোলাকুলি করলো। ইমরান হেসে বলে উঠলো,
– হোয়াট আ প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ মি. দোহা।
মি. দোহা হেসে বললেন,
– ঢাকা এসেছি আর আপনার সাথে দেখা না করে চলে যাব তা হয় নাকি? ভাগ্যিস আজ এসেছিলাম। সোহানকে ফোন দিয়ে জানলাম আপনি ঢাকার বাইরে যাবেন আজ রাতেই। তাই দেরি না করে চলে এলাম।
– খুব ভালো করেছেন।
অফিসের বাকিদের কাজে পাঠিয়ে ইমরান, নয়ন এবং মোনা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসলো দোহার সাথে। সকলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই ইমরান ইশানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মিট মাই সান ইশান।
দোহা ইশানকে জড়িয়ে ধরলো।
ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমার সহধর্মিণী মোনাশা ইকবাল।
দোহা চমকে উঠে বললেন,
– আসসালামু আলাইকুম ভাবীসাহেবা। তাহলে মি. ইমরান ইনিই সেই মোস্ট সিগ্নিফিকেন্ট, ম্যাগনেফিশেন্ট,এলিগেন্ট মোনালিসা। চেয়ারম্যান অফ মোনালিসা। ইমরানের মোনালিসা।
ইমরান হেসে মাথা নাড়ালেন। মোনা তব্ধা খেয়ে গেলো। সিগ্নিফিকেন্ট, ম্যাগনেফিকেন্ট মোনালিসা শুনে। ইমরান প্রতিউত্তর করলো,
– ইনিই সেই মোনালিসা।
– বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, আপনার ভাবী মানে রিদিমা আমার মাথা টা নষ্ট করে ফেলেছে দুদিন ধরে মোনালিসার জামদানীর জন্য। অনলাইনে দেখেছে নাকি এছাড়া আমি সোহানের পাঠানো জাস্ট দুটো স্যাম্পল দেখিয়েছিলাম জামদানীতে পার্ল ওয়ার্ক করা এবং ভাবীসাহেবার কথা বলেছিলাম সেই থেকে তার ধ্যানে জ্ঞানে মোনালিসা। আমার আজকে আপনার সাথে দেখা করার রিজন ও এটা। যেহেতু চেয়ারম্যান ম্যাডামকে পেয়ে গেলাম আপনাকে আর লাগবেনা।
মোনা হাসছে। দোহা বললো,
– ভাবীসাহেবা সামনে আমার ছোট বোনের বিয়ে। সেই হিসেবে বিয়ের সব জামদানী আপনার শো রুম থেকে যাবে। দায়িত্ব কিন্তু আপনার। আমি রিদিমাকে আজকেই গিয়ে কথা বলিয়ে দিব আপনার সাথে। আপনার কাজ দেখেই সে আপনার ফ্যান হয়ে গিয়েছে।
মোনা মাথা নেড়ে সাঁয় দিয়ে বললো,
– আ’ ম ব্লেসড ভাইয়া। আমি সবসময় প্রস্তুত। আপনি আমাকে ভাবীর নাম্বার দিন। আমি নিজেই কথা বলে নেব।
বেশ কিছুক্ষন আলাপের পর দোহা চলে গেলো।মডেলরা চলে আসলে সকলে স্টুডিওতে চলে যায়। ইশানকে পাঠিয়ে দিয়েছে। ফটোশুট শেষে মোনা তামান্নাকে নিয়ে নিজের ডেস্কে এসে কিছু কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। তামান্না প্রশ্ন করলো,
– কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি মোনা?
– হ্যাঁ আপু বলো।
– ইশান কে?
মোনা পুনরায় হেসে বলে,
– আমার ছেলে।
তামান্না মন খারাপ করে চুপ হয়ে গেলো। মোনা হেসে বললো,
– বলবো। কয়েকদিন পর। আজ আসি?
তামান্না হঠাৎ বললো,
– স্যার রিমির উপর রেগে আছে মনে হয়। ও স্যারকে কিছু বলেছে ওই সময়।
– তুমি নিশ্চিত আপু?
– একশো ভাগ। স্যারের রুম থেকে বের হয়েই কেমন যেন করছে। পুরোপুরি নার্ভাস। স্যার কি বলেছে বুঝতে পারছিনা।
– হয়তো মুখের উপর ঝামা ঘষে দিয়েছে ?
তামান্না ফিক করে হেসে দিলো। মুখে হাত দিয়ে বললেন,
– স্যারকে নিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। রিমি নাকি স্যারকে জানাতো। আজই যে ঘটনা ঘটাবে কে জানতো?
– দেখো গিয়ে, তোমাদের স্যার না ঠান্ডা মাথায় ডান্ডা মে/রে বলেছে মিস.রিমি আপনার কাল থেকে অফিস আসার প্রয়োজন নেই।
দুজন হাসতে হাসতে বের হলো। অফিসের সব কাজ গুছিয়ে সবার বের হতে হতে প্রায় সাড়ে সাতটা। বাসায় পৌঁছেই তড়িঘড়ি করে রওয়ানা হলো। এদিকে ইমরান মিজান আংকেল থেকে ফোন দিয়ে খবর নিলো মিনহাজের অবস্থা আগে থেকে বেশ ভালো, ইম্প্রুভ করছে। ডাক্তার আশাবাদী। কিছুটা স্বস্তির শ্বাস ফেললো। বাসায় ফিরেই সবার প্যাকিং শেষ। বাকিদের যেতে বললো কেউই রাজি হলোনা। শেষে গাড়ি নিয়ে রওয়ানা হলো চারজন। ইমরান,মোনা,ইশান এবং রবিন। কক্সবাজার গিয়ে রবিনকে ছাড়া বের হওয়ার মতো রিস্ক ইমরান নিতে চাচ্ছেনা। যদিও ঢাকা, কক্সবাজার তার জন্য সমান তবে সাথে এখন স্ত্রী, সন্তান আছে।
প্লেনে উঠতেই কিছুটা রিল্যাক্স ফিল করছে। কাঁকনের ব্যাপারটা হ্যান্ডেল করে নিয়েছে। কাকপক্ষী ও টের পেলোনা। যদিও ব্যাপারটা ইথিক্যালি ক্রিমিনালিজম ক্যাটেগরিতে পড়ে তবুও কাজ টা করতে হয়েছে। গ্যাসলাইটারের মত কাজ করেছে। গ্যাসলাইটিং এ মিথ্যা ঘটনাকে সত্যি বলে মানসিক যন্ত্রণা দেয় তবে ইমরান সত্যি ঘটনাকে বার বার বলে কাঁকনকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। কাজটা অনেক আগে থেকেই করা উচিত ছিলো।যাই হোক দেরিতে হলেও ব্যাপারটা বেশ শান্তির। যেই যন্ত্রনাতে ইমরান ছিলো সতেরো বছর আগে, এবার কাঁকন থাকবে। আগে করুনা হলেও এখন আর সেসব অনুভূতি কাজ করেনা। নিজেকে আর এসবে জড়াতে চাচ্ছেনা।
মোনা সিটে মাথা এলালো। সারাদিনের ব্যস্ততায় ঘুম চলে এসেছে। মোনার মাথাটা নিজের কাঁধে নিয়ে একটু কাছে টেনে আকড়ে ধরলো। মেয়েটা ঘুমাক। ভালো রাখার প্রতিজ্ঞা নিয়ে পথে নেমেছি। হঠাৎ ইমরানের সেই কথা পুনরায় মনে পড়ে গেলো, মিনহাজ বলেছিলো,
– আমার মোনা তোকে ওর জেনারেশনে নামিয়ে আনবে, নিজেকে তোর জেনারেশনে নিয়ে যাবে।
আজকের দুষ্টু মিষ্টি খুনশুটি, দায়িত্ব নিয়ে অফিসের কাজগুলো সামলানো। মোনা সত্যি অতুলনীয়। একজন বাবা তার মেয়ের প্রতি ঠিক কতটা আত্মবিশ্বাসী হলে এভাবে বলতে পারে। কন্যা সন্তানের পিতা হওয়া চরম সৌভাগ্যের।
মিনিট বিশেকের মাথায় মোনা মাথা তুলে বললো,
– রিমিকে কি বলেছেন ইমরান সাহেব?
ইমরান হাসছে। ইমরান ভেবেছে মোনা বুঝি ঘুমিয়েই পড়লো। এই খবর ও ম্যাডামের নিকট পৌঁছে গিয়েছে।
– কি হলো উত্তর দিন।
– তোমার নামে অভিযোগ করতে এসেছিলো। তোমার ব্যবহার নাকি বেশ রূঢ়। এছাড়া সরাসরি আমাকে পছন্দ করে জানালো।
– আপনি কি উত্তর দিলেন?
– প্রথম কথা বলেছি যার নামে অভিযোগ করছে তাকে সামনে নিয়ে যেন করে। আর দ্বিতীয় কথার উত্তর হচ্ছে আমার জীবন পরিপূর্ণ কাউকে প্রয়োজন নেই।
মোনা অভিমান নিয়ে বললো,
– বললেন না কেনো আপনি ম্যারিড?
– বাঃ রে কেনো বলবো, কেউ একজন আমাকে শর্ত দিয়েছিলো সে আমার পরিচয় চায়না।
ছলছল চোখে চেয়ে আছে মোনা। মুহুর্তের মাঝে দুচোখে জল। ইমরান হতচকিত হলো। চোখের পানি মুছে বললো,
– সেকি! কাঁদছো কেনো? ভুল বললাম কিছু।
– আমি বাসায় যাবো।
– কিভাবে? এখান থেকে লাফ দেয়া ছাড়া উপায় নেই।
– তবে লাফ দিয়ে ম*রেই যাবো। আমার কাউকে লাগবে না।
ইমরান না বুঝার ভান করে বললো,
– পারমিশন দিবেনা পাইলট সুইসাইড করার জন্য।
– তার মানে পারমিশন দিলে আপনি ম*রতে দিতেন?
– আমি তোমার কোনো খায়েশ অপূর্ণ রেখেছি?
ইমরানের ঠোঁটে মিটমিট হাসি দেখে মোনার চোখে অশ্রুপাত বেড়েই চলেছে। এক পর্যায়ে ইমরান হাসতে হাসতে মোনাকে বুকে টেনে নিয়ে বললো,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩১
– বোকা মেয়ে? মজাও বুঝেনা। কেনো তোমাকে ম*রতে দিব। সেই সাহস আছে নাকি আমার। তোমার আর ইশানের কিছু হলে আমিই আগে ম*রে যাব। পাগলী। আর অফিসের ব্যাপারটা আমরা গিয়ে সবাইকে বলব। এখন কিছু বললে ইস্যু হবে। আমি চাইছিনা আমাদের ট্রিপ টা নষ্ট হোক। বুঝতে পেরেছো।
মোনা শান্ত পাখির মতো ছটফটানি বন্ধ করে স্বামীর বুকের মাঝে গুটিশুটি মে*রে চুপটি করে লেপটে আছে। ইমরান ঘাঁড় ঘুরিয়ে ইশান এবং রবিনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো দুটো গেম খেলতে মগ্ন। এদের যেন হুঁশ ই নেই। আর মিনিট বিশেকের মাঝেই ল্যান্ড করবে উড়োজাহাজটি। ছোট ছোট প্রতিটি মুহুর্ত ভীষণ সুন্দর যদি উপভোগ করা যায়। এই যেমন উড়োজাহাজ ভ্রমনের এই কিছু সময়টাও মান অভিমান ভালোবাসাতে ভরে উঠেছে।
