প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৪০
নীতি জাহিদ
ইমরান এবং নয়ন বিষদ আলোচনায় বসেছে। আলোচনার উদ্দেশ্য প্রোগ্রামটা দ্রুত ঘরোয়াভাবে সেরে নেয়া তবে ইমরানের মন টানছেনা। কিন্তু প্রোগ্রাম সেরেই মিনহাজকে না জানিয়ে মোনাকে নিয়ে সে থাইল্যান্ড যেতে চায়। এভাবে মোনাকে বাবা থেকে দূরে রাখা উচিৎ নয়। যদি কোনো দূর্ঘটনা ঘটে যায় তখন হয়তো কাঠগড়ায় ইমরানকে দাঁড়াতে হবে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই মোনাকে নিয়ে বের হলো ইমরান। কনভেনশন হলের দিকে যেতে যেতে গাড়িতে টুকটাক আলাপ চলছে। রবিনকে বললো,
– রবিন মতিঝিল হয়ে যেও। হাকিম চাচার দোকানের সামনে দিয়ে।
– ওকে স্যার।
ইমরান মোনার দিকে তাকিয়ে বললো,
– আমি না গেলেই ভালো হত।
– কেনো?
– জানিনা মনে হলো। তুমি অস্বস্তিতে পড়তে পারো।
মোনা এগিয়ে এসে ইমরানের হাত জড়িয়ে বললো,
– জীবনে অস্বস্তিতে দুবার পড়েছি। আর পড়বোনা।
– কোন দুবার?
– বিয়ের দিন রাতে আপনার পেছনে নামায পড়েছিলাম। খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম। কারণ, জানতাম আমি আপনার অপ্রিয় নারী। আর দ্বিতীয় বার…
– হুম দ্বিতীয় বার?
– কক্সবাজার সেই রাতে। আমাকে দেখে, আমার কথা শুনে আপনার অনেক কনফিডেন্ট মনে হয়েছিলো তাই না?
ইমরান হেসে বললো,
– উহু মনে হয়নি। তুমি অনেক ভয় পেয়েছিলে। চোখমুখ দেখেই বুঝেছিলাম। তবে মন থেকে সম্পর্কে আগাতে চেয়েছো বলে সায় দিয়েছি। তবে তুমি সত্যিই লজ্জায় ছিলে। কিন্তু প্রকাশ করোনি।
মোনা মাথা নুইয়ে রেখেছে। ইমরান কাছে টেনে বললো,
– এখন তো সুপার কনফিডেন্ট থাকো। ব্যাপার কি?
– কোনো ব্যাপার না। এখন মনে হয় যে লাইফটা এঞ্জয় করা প্রয়োজন আর আপনি আশেপাশে থাকলে আমার এমনিতেই খুশিতে উড়তে ইচ্ছে করে আগের মতো।
– মোনালিসা তুমি টায়ার্ড হওনা, আমাকে এভাবে মুগ্ধ হয়ে অবজার্ভ করতে করতে।
– নাহ, আপনার চুল সব পেকে গেলেও হবোনা।
ইমরানের ঠোঁটের কোণে হাসি। হেসে বললো,
– আমার সব চুল পাকতে হয়তো আর কিছু বছর। তখন তুমি বাড়ন্ত নারী। ভালো লাগবে না আমাকে তোমার সাথে।
– কোথায় এত বয়স আমাদের। হিসেব করুন। আমার বাইশ প্রায় শেষ আপনার বেয়াল্লিশ। মাত্র তো বিশ বছর। আপনার যখন চুল পাকবে আমি নাহয় চুল গুলো সব সাদা করে নেবো। চলবে?
ইমরান গাড়িতে শব্দ করে হেসে উঠলো। মোনাও হাসছে। মোনার মেহেদী রাঙানো রতনচূর ও চুড়িভর্তি হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে বুকের কাছে চেপে ধরে বললো,
– সেদিন আমার সেই ক্লাসমেটের হাতের দিকে চোখ পড়েছিলো, মন্তব্য করেছি মনে মনে বেশ সুন্দর। তবে আল্লাহ আমার মনের আশা এমন ভাবে পূর্ণ করলো ওই হাতগুলোর চেয়ে ঢের আকর্ষণীয় হাত আমার করে দিলো। আজ এই হাত দুটো দেখে তো রীতিমতো হিংসে হচ্ছে।
– কেনো?
– আমি ছাড়াও অনেক মানুষ এই হাত দেখেছে। নিশ্চিত হাতের প্রেমে পড়েছে।
মোনা মিটিমিটি হেসে বললো,
– চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। সকালে ইন্সটেন্ট মেহেদী পরেছি আপনাকে খুশি করবো বললো। মুখটা কেমন বেজার করলেন! আমার তো সন্দেহ হয় আপনি সেই ইমরান সাহেব তো যিনি আমাকে উঠতে বসতে ধমকের উপর রাখতেন। আর এখন?
– কি এখন?
– কিছুনা।
– তোমাতেই মত্ত তাই তো?
মোনা উপর নিচ মাথা নাড়লো। ইমরান ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বললো,
– মোনালিসা দেখো দেখো, এই চাচা টা প্রায় সময় চুড়ি বিক্রি করে। তোমার হাতের কাচের চুড়ি গুলো ওনার কাছ থেকে কিনেছি। জানো ওনার স্ত্রী প্রতিদিন উনাকে হাতে মেখে দুপুরে ভাত খাইয়ে দেয়। একদিন আমিও খেয়েছি চাচীর হাতে। উফ রান্নার যে কি স্বাদ! জাস্ট ভুলা যাবেনা। তোমাকে কাল বলেছিলাম না মতিঝিলের এই রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাব। দেখো ফুটপাতেও সুখ৷ আমরা সুখ খুঁজে বেড়াই অট্টালিকাতে।
– সুখে থাকতে জানলে মাটিতে থাকা যায় জানেন না।
– মাটিতেই তো ছিলাম।
ইমরান হাসছে। মোনা সেই হাসি দেখে মুখ ভেঙছে বলল,
– জ্বি আপনি তো রাস্তায় ও ছিলেন তাই না।
ইমরান হাসে। মোনার দিকে তাকিয়ে বলে,
– ছিলাম তো দুদিন। ইশানকে রিক্তার কাছে রেখে দুদিন আমি রাস্তায় ছিলাম। তখন রিক্তা হোস্টেলে থাকতো। নয়ন অনুরোধ করেছিলো দুটোদিন ইশানকে রাখতে আমি বাসা পাওয়া অবধি। সারাদিন আমার কাছে থাকতো, রিক্তা ক্লাসে থাকতো। রাতে রিক্তার কাছে। বাবা তো বাড়িতে ঢুকতে দেয় নি রাগে। আপা তখন শ্বশুর বাড়িতে। উপায় কি তাই রাতে না ঘুমিয়ে রিক্তার হোস্টেলের নিচে বটগাছের নিচে থাকতাম। নয়নের বাসায় থাকতে বলেছিলো। আমি ইশানকে এভাবে একা রেখে যেতে পারিনি।
মোনার দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলো মেয়েটার চোখ ছলছল। ইমরান হেসে বলে,
– পাগলী কাঁদবেনা তো। হুটহাট মনে পড়ে তাই বলি। এসব ভুলে গিয়েছি। আমি নিতান্তই মাটির মানুষ। হুট করে টাকা পেয়ে ধ্যান হারিয়ে ধরা কে সরা জ্ঞান ভাবা কম্ম নয়। তোমার বাবা, মামা সবই জানে। তবুও যে কেনো আমার মত মানুষের সাথে বিয়েতে রাজি হলেন আল্লাহ পাক জানেন।
গাড়ি কনভেনশন হলে সামনে। ভেতরে প্রবেশ করতেই পরিচিত অনেক বন্ধুদের সাথে দেখা, স্কুল,কলেজ ইউনিভার্সিটির বন্ধু এছাড়া এহসান স্যারের সহকর্মী শিক্ষক প্রায় অনেকের সাথে দেখা। বেশ কিছুক্ষন থেকে রাত হলো বাসায় ফিরতে ফিরতে। আজ চয়ন এবং স্যারকে একসাথে দেখে মোনার নিজের বিয়ের কথা মনে পড়লো। হাসিও পেলো। বছর চারেক আগে এমনই পাগলামি করেছে দু বান্ধবী। একে অন্যের পছন্দের মানুষ নিয়ে নাক ছিটকেছে অথচ আজ তারা দুজনই পছন্দের মানুষদের পেলো চড়াই উতরাই করে।
সকাল থেকেই অফিসের পরিস্থিতি বেশ থমথমে। গতকালকের ঘটনা কারোই যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা। ইমরান সকালে অফিসে ঢোকার পর থেকে অবস্থা আরো গুরুতর। ফাইল নিয়ে কেউ ভেতরে আগাচ্ছেনা। জুয়েল এখনো দ্বিধায় আছে। রিনি থম মেরে আছে। যাকে ঘিরে এত স্বপ্ন সে নাকি দু দিনের মোনার হয়ে গেলো। এ যেন মেনে নিতেই পারছেনা। এগারোটায় মোনা অফিসে ঢুকেছে। কমলা রঙা জামাতে ফুলের মতো ফুটফুটে সুন্দর লাগছে দেখতে। তামান্নাদের দিকে তাকিয়ে হেসে সালাম দিতেই প্রত্যেকে অপ্রস্তুত হয়ে হেসে দিলো। চেয়ারম্যান স্যারের ওয়াইফকে কিভাবে সম্বোধন করবে বুঝতে পারছেনা।
মোনা অল্প কিছু কাজের ব্যাপারে কয়েকজনের সাথে কথাবার্তা বলে নিজের রুমে যাবে পেছন থেকে জুয়েল ডাক দিলো। জুয়েলের সাথে কথা বলে জানতে পারলো জুয়েলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে তা অফিসে না বাইরে বলতে। মোনা কথা না বাড়িয়ে জুয়েলকে বললো,
– কোথায় যাবেন?
– বাইরে বসতে চাচ্ছি। অফিসের ক্যান্টিনে চলো।
মোনা খানিকটা হেসে বললো,
– চলুন।
দুজনই বেরিয়ে গেলো। রিমি ঠোঁটের কোণে বিদঘুটে হাসি ফুটিয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দিলো।
মোনা জুয়েলের দিকে ভদ্রভাবে লক্ষ্য করে বুঝার চেষ্টা করছে এভাবে ডেকে আনার কি আছে? জুয়েল ভনিতা না করে বললো,
– মোনাশা বিয়েটা কখন করলে?
– হচ্ছে মাস দুয়েক।
– বলোনি কেনো?
– বলতে হবে কেনো? কাউকে জানিয়ে বিয়ে করতে হবে এমনটা কি কথা ছিলো?
– তুমি জানতে না আমি অপেক্ষায় আছি তোমার জন্য। আর এ কাকে বিয়ে করলে বয়স তো তোমার মামার মত।
– কি বলতে চাচ্ছেন তা ক্লিয়ার করুন। আমি এখানে বেশিক্ষন থাকতে চাচ্ছিনা। ভেতরে কাজ আছে। যাকে ইচ্ছে তাকে বিয়ে করবো আপনার কি? মামার বন্ধুর বয়স তার মতোই তো হবে।
– চেয়ারম্যান স্যার শুনেছি ডিভোর্সড, তোমার কিসের অভাব ছিলো বলো তো এমন একজনকে বিয়ে করলে।
– আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
– মোনাশা আমার খুব কষ্ট হচ্ছে দু বছর তো কম সময় নয়। ক্যাম্পাসে কখনো কারো দিকে চোখ তুলিনি তোমার জন্য। আর আজ শুনি তুমি বিবাহিত তাও আমি জানিনা। আমার বাসায় সবাই চেনে তোমাকে। মা বাবা তো পরিকল্পনাই করে রেখেছে তোমার বাবার সাথে কথা বলার। অথচ কাল যা শুনলাম দেখলাম! আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। তুমি কি আমার কষ্ট টা বুঝতে পারছো? ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট কি করে বুঝবে তুমি! আর তোমার বাবাই বা কি করে এমন একজনের সাথে তোমার বিয়ে দিলো?
মোনা অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। কেমন যেন ভেতরটা খচখচ করছে। আশপাশে তাকিয়ে দেখে অনেকেই দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। মোনা নিজেকে স্বাভাবিক করে কথা চালিয়ে গেলো।
– ম্যে আই কাম ইন স্যার?
– ইয়েস কাম ইন।
ইমরান এলইডি স্ক্রিন অফ করে দিলো। ফোন কান থেকে নামিয়ে রিমির দিকে তাকালো। রিমির হাতে ফাইল। রিমির সাজ পোশাক আজ ভিন্ন। শালীন পোশাক পরনে মাথায় ঘোমটা। ফাইলটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
– স্যার মোনা এসেছিলো তো, এখনো ভেতরে আসেনি? জুয়েলের সাথে বের হতে দেখেছিলাম।
ইমরান কথা না বলে সাইন করে দিয়ে বললেন,
– তোফায়েল সাহেবকে ডেকে দিন।
– ওকে স্যার, স্যরি স্যার আসলে আমি জানতাম না মোনা আপনার ওয়াইফ। তবে জুয়েলের সাথে এভাবে মেলামেশা কি ঠিক হচ্ছে?
ইমরান ফাইল থেকে চোখ তুলে বললো,
– মোনালিসা কার সাথে মিশবে তা কি আপনি ঠিক করে দেবেন?
– স্যরি স্যার।
– গেট লস্ট।
রিমি কুটিল হাসি দিয়ে বের হতে হতে দেখতে পেলো মোনা দরজা দিয়ে ঢুকছে৷ মনে মনে ভাবছে যেভাবে গতকাল চমকে দিয়েছিলে তেমনি ভাবে আজ থেকে একেকটা কাজ করে আমি চমকে দিব। রিমিকে উপেক্ষা করে ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে দিলো।
মোনার হাতে একটা ক্যাটালগ দিয়ে ইমরান বললো,
– সব রেডি। ইশান কি রাজি হয়েছে হাঁটার জন্য?
মোনা মাথা ঝেঁকে বললো,
– হয়েছে।
– কফি খাবে?
– না।
ইমরান মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে। মোনা ইমরানের দিকে তাকিয়ে বললো,
– বাসায় চলে যাব আমার শরীর ভালো লাগছেনা।
– আচ্ছা। গাড়ি নিয়ে যাও।
মোনা নিরবে বেরিয়ে গেলো। কেনো যেনো মোনার মনে হলো ইমরান সব জানে তবুও কোনো প্রশ্ন না করাতে কষ্ট লাগছে। তবে কি ইমরান মোনাকে উপেক্ষা করলো! মোনার যাওয়ার পথে চেয়ে রইলো ইমরান। মনে পড়লো, আজ একসাথে লাঞ্চ করার কথা। মোনাকে বেশ এলোমেলো লাগছিলো। পুনরায় এলইডি স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখতে পেলো ক্যান্টিনের সি সি টিভি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাজে পূর্ণ মনোযোগ দেয়ার আপ্রান চেষ্টা। জুয়েল মোনার হাত ধরার চিত্র টা চোখের সামনে ভেসে উঠছে বার বার। যদিও মোনার করা কঠোরভাবে নিষেধ বুঝা যাচ্ছে পরের সময়টাতে। হাত ধরার জন্য জুয়েলকে স্পষ্ট শাসাচ্ছে ভিডিওতে বুঝা যাচ্ছে। চেয়ারে চোখ বুজে হেলান দিলো। ঘন্টা পেরিয়ে গেলো ধ্যান নেই। সেভাবেই চোখ লেগে এসেছিলো। ফোনের আওয়াজে চোখ খুললো। তিনটার মিটিং এটেন্ড করা জরুরি। শার্টের স্লিভ ঠিক করে মিটিং এর জন্য কনফারেন্স রুমে চলে গেলো। ইতিমধ্যে সবাই উপস্থিত। আজকের মিটিংয়ে মোনার থাকাটা খুবই জরুরি ছিলো। দুপুরের খাবার খাওয়া হয়নি, ঔষধ খাওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে মাথা যন্ত্রণা করছে। পরশু দিন প্রোডাক্ট শোকেজিং ডে। গেস্ট ইনভাইটেড। মডেল রেডি। সকলে আজ উপস্থিত। ফাইনাল টাচ আপ ডে আজ। অথচ যার জন্য এত আয়োজন সেই আজ অনুপস্থিত। মিটিংয়ে ইমরানের নিরবতা আজ সকলে লক্ষ্য করছে। ম্যানেজার সাহেব তো প্রশ্ন করে বসলেন,
– স্যার আপনি কি ঠিক আছেন? অসুস্থ লাগছে।
ইমরান মিনিট খানেক সময় ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে জানালো ঠিক আছে। সোহান মোনাকে টেক্সট করলো। রিপ্লাই আসছেনা। নয়ন পুরো মিটিং গুছিয়ে নিলো। মিটিং শেষ হওয়া মাত্র ইমরান চেয়ার ছেড়ে উঠে বেরিয়ে গেলো। নিজের কেবিনে প্রবেশ না করে বেরিয়ে যাবে রিমি ডেকে বললো,
– স্যার, মোনাকে ফোন দিয়েছিলাম ধরছে না। ও কি যাবে আমাদের সাথে?
অফিস আজ ক্লোজড হয়ে যাবে এখনই। প্রত্যেকে প্রোডাকশনের নতুন শাড়ি গুলোর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। রিমির পেছনে সবাই এসে দাঁড়িয়েছে। ইমরান ফোন বের করে নিজেও বেশ কয়েকবার কল করলো। কল রিসিভ না হওয়াতে সোহান এবং নয়নের দিকে তাকাতেই দুজন মুখ ফ্যাকাশে করে রেখেছে। নয়ন বললো,
– মোনা কাল আসবে। ওর শরীর টা ভালোনা।
ইমরান কথা না বলে বেরিয়ে গেলো। রিমির ঠোঁটে জিতের হাসি। জুয়েলও মোনাকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েছে। অফিসের নিচে এসে সবাই গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সবার থেকে খানিকটা দূরে নিরবে দাঁড়িয়ে আছে ইমরান। সকলের মাঝে কানাঘুষা চলছে। এমনিতেই অফিসের হট কেক ছিলো ইমরান – মোনা। এর মাঝে ইমরানের নিরবতা। গাড়ি এসে দাঁড়ালো সামনে। কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলতে বলতে হেলে দুলে এগিয়ে আসছে মোনা। হাতে একটা গোলাপী হাওয়াই মিঠাই। একটু করে মুখে দিচ্ছে আর মাথা নাড়ছে। সকলকে সামনে দেখে মুখ ঘুরিয়ে ইমরানের পাশে দাঁড়ালো। হাওয়াই মিঠাইয়ের শেষ টুকু নয়নের মুখে পুরে দিয়ে বললো,
– দুপুরে একা খেয়েছো কেনো মামা? আমার ক্ষুধা লেগেছে জানোনা?
নয়নের চক্ষু ছানাবড়া। উত্তর দিলো,
– তুই না বাড়ি গেলি?
– নাহ। আমার কথা শুনো, একা তো খেলে ভালো কথা আমার স্বামীটা যে খায় নি সেদিকে খেয়াল রাখলে না কেনো?
উপস্থিত সকলকে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। ইমরান গম্ভীর স্বরে বললো,
– কখন এসেছো?
মোনা ভ্রু কুচকে বলে,
– গিয়েছি নাকি? মন খারাপ ছিলো অনেক তাই আশে পাশে রাস্তায় হেঁটেছি। ফুচকা খেয়েছি লেমন মিন্ট খেয়েছি। লাঞ্চ করার কথা ছিলোনা একসাথে? আপনি তো জিজ্ঞেস ও করেন নি। এসব ফুচকা, মিন্টে পেট ভরে? দুপুরে তো আমার এবং আপনার দুজনের মেডিসিন আছে। খাওয়া উচিত। ক্ষুধা পেয়েছে। কাচ্চি ভাই থেকে খাবার এনেছি। এই যে ব্যাগে খাবার নিয়ে ঘুরছি। খাব। আসেন।
ইমরানের হাত ধরে টান দিলো। ইমরান আটকে দিয়ে কিছু বলবে এর আগেই নয়ন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হাসতে হাসতে বলে,
– এজন্যই ভাবছিলাম চারদিকে এত অন্ধকার কেনো? এখন অবশ্য রোদ উঠবে। যা যা মোনা খেয়ে নেয়।
ইমরান প্রগাঢ় স্বরে বললো,
– তুমি যাও আমার ক্ষুধা নেই।
– একা তো খাবোনা আজ। একসাথে লাঞ্চ করার কথা ছিলো।
– এখন কি লাঞ্চের সময়? বললাম তো খাব না। গাড়িতে বসে খেয়ে নাও। আমার কাজ আছে। এখন ক্ষুধা নেই।
ইমরানের ধমক খেয়ে মোনা মেজাজ হারিয়ে ফেলেছে। নিজেকে এতটা সময় কষ্টে স্বাভাবিক রেখেছে। অন্যদের মত কষ্ট চাপিয়ে ধুকে ধুকে ভেতরটা ছিন্ন করতে পারবেনা সে। আচমকা ইমরানের হাত ছেড়ে দিয়ে রিমির সামনে দাঁড়ায়। সবার সামনে রিমিকে বলে উঠলো,
– যে মুখ দিয়ে বেশি পটপট করো মুখ টা একদম সেলাই করে দিব আমার স্বামীর দিকে তাকালে। বেহায়া মহিলা। কি বলেছো তুমি ইমরান সাহেবকে রুমে গিয়ে?
ইমরান পেছন থেকে ডাক দিলো,
– মোনালিসা…
– আপনি এখনো একে সহ্য করছেন কেনো এখনো ইমরান সাহেব? তামান্না আপু,সাদাফ ভাইয়া শুনো, তোমাদের বান্ধবী আমার আর ইমরান সাহেবের মাঝে ঝামেলা পাকানোর জন্য বলে এসেছে, জুয়েল ভাইয়া আমাকে নিয়ে ক্যান্টিনে গিয়েছে।
জুয়েল তাজ্জব বনে গেলো। কিছুটা ভীত হলো। ভয়ে ইমরানের কাছে এসে বললো,
– স্যার…
ইমরান সকলের সামনে থামিয়ে দিয়ে মোনাকে ধমকে বললো,
– মোনালিসা দিস ইজ ঠু মাচ। আমি তোমাকে কিছু বলেছি?
মোনা জোর গলায় বলে উঠলো,
– আপনি বলতেও পারবেন না। কি নিয়ে বলবেন? আপনি আমাকে সন্দেহ করেন নি তাই প্রশ্ন ও করেন নি। কিন্তু মিস রিমি উল্টা পালটা যখন বললো…
নয়ন মাঝে বাঁধা দিয়ে বললো,
– গাড়িতে উঠ দেখছি আমি।
– আমার প্রবলেম আমি দেখবো। তুমি দেখার হলে তখনই দেখতে মামা।
রিমি অতি অপমানে রেগে বললো,
– যা সত্যি তাই বলেছি, সবাই দেখেছে জুয়েলের সাথে বের হতে। আমি তো স্বাভাবিক ভাবে স্যারকে বলেছি। এত রিয়েক্ট করার কি আছে?
রিমির দিকে ফিরে চোখ মুখ কুচকে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো,
– এতদিন ভদ্র ভাবে বুঝিয়েছি, ভদ্রতা দিয়ে। আর নয়। কিসের সত্যি বলেছো? তোমাকে কি ইমরান সাহেব প্রশ্ন করেছে, রিমি মোনা কার সাথে গিয়েছে? তাহলে পন্ডিতি করতে গিয়েছো কেনো? খবরদার আমার ইমরান সাহেবের দিকে চোখ দিলে চোখ উপড়ে ফেলবো। চুল ছিঁড়ে ন্যাড়া করে দিব। আমি খুব ভালো আবার খুব খারাপ ও। তোমার হিস্ট্রি পুরা মহল্লা জানে। জব বাঁচাতে চাইলে ভদ্র হয়ে যাও নতুবা যে কয়জনের পকেট ফুটো করেছো ওদের ফোন দিয়ে তোমার এড্রেস দিয়ে দিব বুঝছো। যে একটা ডিগ্রি তোমার কোথাও জব পাবেনা। টিউলিপ থেকে বের হতে হলেও এক্সপিরিয়েন্স সার্টিফিকেট এবং ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট লাগবে যা আমি কিছুতেই দিব না। রেড মার্ক করে দিব। মনে রেখো আমার সাথে লাগতে আসবেনা। তোমার বস, কলিগরা তোমার প্রতি মায়া দেখালেও আমি দেখাবোনা।
রিমি আঙুল তুলে কথা বলতে যাবে এর আগে মোনা ধমকে বললো,
– আঙুল ভেঙ্গে দিব একদম। কেউ আমার দিকে তোলার সাহস করেনা বাবা আর ইমরান সাহেব ছাড়া। আর আমিও তোয়াক্কা করিনা। সুতরাং ভাঙ্গার সময় ভাববোনা আঙুলটা কার? মাইন্ড ইট।
জুয়েলের দিকে তাকিয়ে বললো,
– জুয়েল ভাই যদি আমার কোম্পানিতে জব করতে মন চায় করুন, সমস্যা নেই। তবে মাথায় রাখবেন আমি বিবাহিত এবং আমার সন্তান আছে। উই আর হ্যাপি। আপনি কষ্ট পেয়েছেন তার জন্য খুবই দুঃখিত। আপনাকে আশায় রাখিনি। নিজে নিজে এত আশা কেনো করেছেন? বেশ কয়েকবার বারণ করেছি। যা উত্তর দেয়ার তা তো ক্যান্টিনে দিয়েছি। ভালোবাসা হারানোর কষ্ট আমার অর্ধেক ও আপনি পান নি৷ আমি এসব নিয়ে কথা বাড়াতে অপছন্দ করি। কেউ আমাকে সন্দেহ করুক আমি চাইনা। আশা করি সেই সম্মান টুকু পাবো।
মোনা হেঁটে গাড়িতে উঠে গিয়ে বসলো। ইমরান নয়নের দিকে তাকাতেই নয়ন শিষ বাজাতে শুরু করলো। রিমির ব্যাপারে সব নয়নই মোনাকে বলে দিয়েছে। রিমি যখন এসব কথা বলছিলো তখন তখন ফোনে লাইনে ছিলো। সবাইকে উদ্দেশ্য করে ইমরান সরাসরি বললো,
– কোন ধরনের নোংরামি চলছে অফিসে, ক্যান এনি ওয়ান প্লিজ ক্লিয়ার ইট? মনে হচ্ছে এটা অফিস নয় একটা প্রেম-পিরিতির কারখানা। এসব তো আমি সহ্য করবোনা। জুয়েল কাল আমার সাথে দেখা করবেন সেই সাথে রিমি ও। আপনাদের অফিস পছন্দ না হলে প্লিজ ত্যাংকিউ। লিভ ইট। দেয়ার আর আ লট অফ অফিস ইন দ্য ক্যাপিটাল। হোয়াই আর ইয়ু ওয়েস্টিং ইউর ভ্যালুয়েবল টাইম হিয়ার? আর যা শুনছি ভেরি অ্যাবসার্ড। একচুয়েলি উইয়ার্ড। চলুন এখন।
গাড়িতে উঠে মোনা গাল ফুলিয়ে কাচ্চি ভাইয়ের প্যাকেট টা খুলে নিজে নিজেই খেতে বসেছে। ইমরান উঠতেই মুখ ঘুরিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। নয়ন মিররে দেখে মোনাকে বললো,
– খাইয়ে দেয় তোর জমিদারকে। না খেয়ে আছে।
ইমরান ক্রোধ না সামলাতে পেরে গাড়িতে চেঁচিয়ে উঠলো,
– তোরা পেয়েছিস টা কি। সার্কাস চলছে? এ্যাই যে মহারানী, কথা গুলো কাল বলা যেতনা। আজই কেনো রাস্তার উপর হট্টগোল করতে হলো। মান সম্মান কিছু থাকলো আমার! অফিসের নিচে অভদ্রের মত ঝগড়া চলেছে। যা আমার লাইফে কখনো দেখিনি তা আজ দেখতে হলো। মুখের ভাষার কি ছিরি, চোখ উপড়ে ফেলবো, ন্যাড়া করে দিব, চুল ছিড়ে দিব, ছিঃ।
খাবারের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছে মোনা। নয়ন মোনার চোখে পানি দেখে চুপ হয়ে গেলো। রবিন নয়নের মুখের দিকে তাকিয়ে মিররের দিকে তাকালো। শুকনো ঢোক গিলে গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দিলো। মোনা গোগ্রাসে খাবার গিলছে। ইমরান সিটে হেলান দিয়ে নয়নকে বলল,
– ওকে থামতে বল, নতুবা আজ সত্যি আমি খারাপ কিছু বলব। খেতে গিয়ে কাঁদছে কোন সাহসে। হয় খাবে নাহয় কাঁদবে। ওর রুহের হায় লাগানো বাকি রেখেছে তাই না!
খাবার খাওয়া বন্ধ করে পানি গিলে বাইরে চোখ দিলো মোনা। ইমরান চোখ খুলে মোনার দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলো বেশি বলে ফেলেছে আজ। মেয়েটা ফুফিয়ে কাঁদছে। কিন্তু আওয়াজ করছেনা। নয়ন পেছন ফিরে ইমরানের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাগ্নীকে দেখলো। আজ নয়ন ও মজা করছেনা। ইমরান এগিয়ে এসে কাচ্চির প্যাকেট টা নিজের হাতে নিলো। মোনা মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো ইমরান এক চামচ মুখে দিলো। মোনাকে কাছে টেনে মোনার মুখের সামনে চামচ ধরলো। মোনার চোখ দিয়ে পুনরায় পানি পড়ছে। ইমরান চোখ পাকিয়ে বললো,
– আবার!
নয়ন মোনাকে বলে উঠলো,
– মা খেয়ে নেয়। আমি রিমির ব্যবস্থা করছি প্রমিজ। হুট করে তো বাদ দেয়া যায় না বাবা। অফিসিয়াল ডেকোরাম আছেনা।
ইমরান খাইয়ে দিচ্ছে আর গিলছে মোনা। খাবার চিবাতে চিবাতে বলে,
প্রিয় মোনালিসা পর্ব ৩৯
– আমি বাদ দিতে বলেছি নাকি। ও কেনো এমন করে। আমার কষ্ট লাগে। আমি কি করবো? ইমরান সাহেবকে কিসব বললো ও।
– আমি বিশ্বাস করিনি।
মোনা কথা বাড়ায় নি। নিজের মতো চুপ করে বাইরে নজর দিলো। এভাবে ইমরান কখনো বকা দেয় নি! রিমির জন্য এভাবে হেনস্তা হতে হলো। এর প্রতিদান রিমিকে দিতে হবে।
