প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৬
নওরিন কবির তিশা
—’আইয়াজ ভাই?
ভেসে আসা মেয়েলী কন্ঠটায় পিছনে ঘুরল আইয়াজ। কানে ধরে রাখার সেল ফোনটায় আলাপচারিতা স্থগিত করে; আলগোছে কেটে দিয়ে পকেটে পুরলো। নাহা’র হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,,
—’জ্বী?
নাহা বান্ধবী ওহিকে বিদায় জানিয়ে আইয়াজের সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে বলল,,—’আপনি?
—’হুম আমি,অ্যানি প্রবলেম?
—’না,না;প্রবলেম হতে যাবে কেন? আসলে প্রতিদিন রহিম চাচা আসে তো।
—’রহিম চাচা তিহু ম্যাডামকে নিয়ে স্যারের অফিসে গিয়েছিলেন। এজন্যই স্যার আমাকে পাঠিয়েছেন।
—’ওহ।
আইয়াজ সৌজন্যের সঙ্গে গাড়ির দরজাটা খুলে ধরল, নাহার পদক্ষেপ যেন নিমেষের জন্য আড়ষ্ট হয়ে গেল। এক ঝলক রোদ এসে ওর কপালে পড়তেই সেখানে যেন এক স্নিগ্ধ কুহক রচনা করল। সে আর কোনো বাক্যব্যয় না করে অতি সাবধানে গিয়ে গাড়ির ভেতরটিতে বসল। ওর পরনের ওড়নার আঁচলটা অবহেলায় সিটের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছিল—তবে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আইয়াজ নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে মন্থর চরণে ড্রাইভিং সিটের দিকে এগিয়ে গেল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
গাড়ি ছুটে চলেছে রাজপথের বুক চিরে। আইয়াজ অত্যন্ত নিপুণ হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে। তার পুরো মনোযোগ সামনের পিচঢালা রাস্তার ওপর। দীর্ঘদেহী আইয়াজের মুখাবয়বে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য, তার এই নিস্পৃহতা আর চরম নির্লিপ্ততা যেন গাড়ির ভেতরের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছে।
অন্যদিকে, ব্যাকসিটে বসা নাহা যেন কোনোভাবেই স্থির হতে পারছে না। সে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকার ভান করছে ঠিকই, কিন্তু তার অবাধ্য চোখ দুটো বারবার তস্করের মতো সামনের আয়নায় গিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছে। তার উন্মুক্ত চুলের কয়েকটা গোছা জানলার বাতাসে গা ভাসিয়ে মাঝে মাঝে তার গালের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। তার সমস্ত কৌতুহল ওই আয়নাটাকে ঘিরে, যেখানে দৃশ্যমান আইয়াজের শান্ত আর অবিচল চোখের প্রতিচ্ছবি।
নাহা বারবার চাইছে আইয়াজ একবার অন্তত আয়নার দিকে তাকাক, একবার অন্তত তাদের দৃষ্টির সংঘাত হোক। কিন্তু আইয়াজ যেন আজ প্রতিজ্ঞা করে বসেছে—সে তাকাবে না। তার এই হেলদোলহীন ভাব দেখে নাহার বুকের ভেতরটা অকারণেই দুরুদুরু করছে, আবার একটা চাপা অভিমানও দানা বাঁধছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে গেল অঘটনটা। আইয়াজ হুট করেই তার চোখের মণি জোড়া স্থির করল আয়নার ওপর। অত্যন্ত নিপুণভাবে, কোনো রকম পূর্বসংকেত ছাড়াই আইয়াজের সেই তীক্ষ্ণ আর গভীর দৃষ্টি সরাসরি আছড়ে পড়ল নাহার চোখের ওপর।
নাহা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। ধরা পড়ে যাওয়ার এক তীব্র লহমায় তার শরীরটা যেন পাথর হয়ে গেল। আইয়াজের চোখের সেই অতল চাহনিতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল নাহা।। তার মনে হলো, আইয়াজ যেন চোখের পলকেই তার মনের সবটুকু অস্থিরতা পড়ে ফেলেছে।
সে দ্রুত চোখের পলক ফেলে জানলার বাইরে দৃষ্টি সরিয়ে নিল ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তার ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় আর সংকোচে আরক্তিম হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আইয়াজ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে ফের মনোনিবেশ করলো ড্রাইভিংয়ে।কিন্তু নাহার অবস্থা বেসামাল। গাড়ির ইঞ্জিনের মৃদু শব্দের মাঝে এখন কেবল নাহার হৃৎপিণ্ডের দ্রুত ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
🎶তৈ তৈ তৈ তৈ তৈ
আমার বৈয়ম ফাখি কৈ
তৈ তৈ তৈ তৈ তৈ
আমার বৈয়ম ফাখি কৈ 🎶
ভার্সিটি শেষে বান্ধবীর সাথে গল্প করতে করতে কখন যে সময়টা পেরিয়ে গেছে টেরই পায়নি মুন্নি। বাড়ি যাওয়ার জন্য ভার্সিটি থেকে অনতিদূরে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সে। ড্রাইভার আঙ্কেল আসবে কিছুক্ষণের মাঝেই, যে আশায় অপেক্ষমান সে। হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসা এমন উদ্ভট গানে বিরক্ত হয়ে পিছন ঘুরল সে।
তৎক্ষণাৎ দৃষ্টিগত হল কিছুদিন পূর্বের অসভ্য যুবকটাকে। মুন্নি রেগে সেখান থেকে প্রস্থান করতে যেতেই যুবকটা দ্রুত এগিয়ে এসে মুন্নির ওড়নার আঁচল টেনে বলল,,
—’হে ইউ বিউটিফুল লেডি! এত দেমাগ কিসের?
মুন্নি চাইল না দশজনের সামনে কোনো বিশ্রী কাণ্ড ঘটিয়ে বসতে। তাই নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরির উদগিরণ সংযত করে, দাঁতে দাঁতে চেপে সে বলল,,
—’ওড়না ছাড়ুন অসভ্য লোক।
যুবকটি এগিয়ে এসে বলল,,—’আমার একটা সুন্দর নাম আছে, বাবা জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা দিয়ে খুব যত্ন করে রেখেছিল শেহতাজ চৌধুরী ছোট করে সবাই তাজ বলে ডাকে। আমাকে সেই নামে ডাকলেই খুশি হব।
মুন্নি ক্ষিপ্র বেগে নিজের ওনার আঁচল ছাড়িয়ে বলল,,
—’নিজের নাম আর পার্সোনালিটির বর্ণনা অন্য কোথাও গিয়ে দেন আমার লাগবে না।
বলেই সে সেখান থেকে প্রস্থান করতে যেতেই শেহতাজ দৌড়ে এগিয়ে আসলো তার দিকে। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল,,
–‘এত দেমাগ কেন হ্যাঁ? অ্যাটলিস্ট নামটা তো বলতে…!
মুন্নি তার দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাতেই শেহতাজ কাচুমাচু কন্ঠে বলল,,
—’ওই আর কি…!এমনি শুনছিলাম!
তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে ভেসে আসলো কোনো পৌরুষ কন্ঠস্বর,,
—’ভাই আপনি এখানে?
শেহতাজ বিরক্তিতে মুখ কুঁচকালো;হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উচ্চারণ করল,,
—’ওহ শিট।
পরক্ষনেই পিছন ঘুরে বলল,,—’হ্যাঁ একটু এদিকে হাঁটতে এসেছিলাম।
ছেলেটা অবাক কণ্ঠে বললো,,—’আপনি হাটতেও বের হন ভাই?
শেহতাজ বিরক্ত কন্ঠে বলল,,—’কেন আমায় দেখে কি মানুষ মনে হয় না?
বিস্মিত ছেলেটা এগিয়ে এসে বলল,,—’না মানে আপনার মত ছেলেও হাঁটতে বেরিয়েছে, গাড়ি রেখে। এটা কি অবিশ্বাস্য না?
শেহতাজ হঠাৎ চেয়ে দেখলো;একটি গাড়ি এসে মুন্নিকে নিয়ে গেল সেখান থেকে। তৎক্ষণাৎ বিস্ফোরিত হলো শেহতাজ; রেগে গিয়ে বলল,,
—’জয়নালদের পচা ডোবায় আজ সারারাত ডুবে থাকবি তুই!
ছেলেটা বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করে বলল,,—’মানে?
—’মানে তোর মাথা আর আমার মুন্ডু।
শেহতাজের চোখেমুখে তখন আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভা। ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল, যেন আকাশ থেকে পড়া কোনো উল্কাখণ্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। শেহতাজ আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। জুতোর মচমচ শব্দ তুলে গটগট করে নিজের দামি স্পোর্টস কারের দিকে এগিয়ে গেল সে।
শেহতাজ চৌধুরী এই শহরের একচ্ছত্র অধিপতি মীর শাহজাহান চৌধুরীর একমাত্র আদরের দুলাল। অগাধ ধন-সম্পদ আর ক্ষমতার মোহিনী শক্তিতে বেড়ে উঠেছে সে। বর্তমান ছাত্ররাজনীতির এক প্রভাবশালী নেতা সে, যার একটি হুঙ্কারে রাজপথ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। অথচ এই প্রতাপশালী যুবকটিই আজ এক অজ্ঞাত তরুণীর ওড়নার আঁচল ধরে সামান্য একটু পরিচয়ের জন্য ভিক্ষুকের মতো দাঁড়িয়ে ছিল—এই বৈপরীত্যই হতবাক হয়েছে তার দলীয় এই ছেলেটি।
ক্ষণিকের মাঝেই উজ্জ্বল আকাশটা মেঘের দস্যিপনায় যেন এক অন্ধকার কারাপুরীর রূপ ধারণ করল। জুলাইয়ের সেই দুপুরের তপ্ত রোদকে নিমেষের মধ্যে গ্রাস করে নিল একঝাঁক কালচে মেঘের দল।তারা যেন দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে, ঠিক যেমন কোনো অবাধ্য বালক শাসনের শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে।
বাতাসের বেগ বাড়ার সাথে সাথে ধুলোর আস্তরণ রাজপথকে ঝাপসা করে দিল, আর সেই সাথে শুরু হলো মেঘের গুরুগুরু গর্জন। কিছুক্ষণ পূর্বের উজ্জ্বল নীলিমা মুহূর্তের মধ্যে এক রুদ্রমূর্তিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এই আকস্মিক বিদ্রোহ যেন এক পশলা বৃষ্টির পশরা নিয়ে ধেয়ে আসছে মহাপ্রলয়, যা ধুয়ে মুছে দেবে শহরের সমস্ত ক্লান্তি।
নীল-তিহু বেরিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। হুট করেই আকশের সমস্ত উজ্জ্বলতা বিলীন হয়ে মেঘের আস্তরণ পড়েছে। বাইক ছুটছিল এক নির্জন রাস্তা ধরে কোনো এক অজ্ঞাত গন্তব্যে। আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকায় ব্যস্ততা কমেছে সড়কগুলোতে প্রায় নির্জন সেগুলো। শুধুমাত্র কিছু ফুলের দোকান এখনো বন্ধ হয়নি।
নীল-তিহু সবে এক জীর্ণ টঙের দোকানের সামান্য ছাউনির নিচে আশ্রয় নিয়েছে।হঠাৎই আকাশের মেঘগুলো যেন কোনো এক গূঢ় অভিমানে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে শ্রাবণের সেই নিবিড় অন্ধকার চরাচরকে গ্রাস করে নিল। তারপরই শুরু হলো সেই বহু প্রতীক্ষিত বর্ষণ—ঝমঝম শব্দে বৃষ্টির সেই অবিশ্রান্ত ধারা যেন আকাশ আর মাটিকে এক নিবিড় আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলল।
রাস্তার ধারের ধুলোগুলো বৃষ্টির প্রথম স্পর্শে এক সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে বিদায় নিল, আর চারপাশটা হয়ে উঠল এক মায়াবী কুয়াশায় আবৃত।তিহু মুগ্ধ নয়নে সেই জলধারার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তাকে ডাকছে। সে আকুল হয়ে নীলের দিকে তাকিয়ে বলল,,
—’মিস্টার পলিটিশিয়ান?
নীল বোধহয় বুঝল তিহুর সুর। কিছুটা কপাল গুটিয়ে তাকাতেই তিহু আহ্লাদি কণ্ঠে বলল,,
—’চলুন না একটু বৃষ্টি বিলাস করি।
নীল ভ্রু কুঁচকে তার দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলল,,
—‘একদম নয়। ঠান্ডা লাগবে।
তিহুর ঠোঁট উল্টে গেল অভিমানে। তার সেই চপল মনের সাধ যেন এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে জানালার ধারের লতার মতো মুখ ফুলিয়ে ছাউনির এক কোণে সরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন বৃষ্টির জলের চেয়েও গভীর এক মান-অভিমানের খেলা। নীল দেখল, কিন্তু ধরা দিল না।
পরক্ষণেই নীলকে কিছু বুঝে ওঠার অবকাশ না দিয়েই তিহু এক দৌড়ে সেই উন্মুক্ত রাজপথের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। তার দুহাত প্রসারিত, আকাশের দিকে মুখ তুলে নিজেকে শক্ত করল তীব্র সে বর্ষণে । নীল উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললো,,
—’নুর?
কিন্তু তিহু তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে হাসছে, আর সেই হাসির লহর বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে এক অপূর্ব মূর্ছনা তৈরি করছে। নীল আর স্থির থাকতে পারল না। একরাশ বিরক্তি আর তার চেয়েও বেশি ভালোবাসা নিয়ে সে-ও বৃষ্টির ঝাপটার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তিহুর হাতটা ধরে নিজের দিকে টানতেই তিহু খিলখিল করে হেসে উঠল; সেই সঙ্গে নীলের হাত ধরে তাকেও এক পাক ঘুরিয়ে নিল।
নির্জন সেই জনহীন রাজপথে, বৃষ্টির পদাঘাতে চঞ্চল জলরাশির মধ্যে দাঁড়িয়ে দুজন মানব-মানবী যেন মহাকালের এক স্তব্ধ কাব্যে পরিণত হলো। নীলের গাম্ভীর্য তখন বৃষ্টির ধারায় ধুয়ে মুছে গেছে। সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল তীব্র বর্ষণে জলসিক্ত তিহুর ওই মুখশ্রীর দিকে। অলক্ষ্যে মনের কোণে কোথাও যেন বেজে উঠল,
🎶Kabhi Jo badal barse…
Main dekhun tujhe aankhe Bhar ke…
Tu lage mujhe pahli barish Ki duaaa…🎶
ঝোড়ো হাওয়ায় তাদের সিক্ত বসন আর এলোমেলো চুল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল,বৃষ্টির তোড় ক্রমে ক্রমে বাড়ছে, আকাশের মেঘদল যেন আজ মাটির সঙ্গে সমস্ত হিসাব চুকিয়ে নিতে চায়। সেই অবিশ্রান্ত ধারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নীল মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল তিহুর দিকে। বৃষ্টির প্রতিটি বিন্দু তিহুর মুখে-চোখে এক অলৌকিক লাবণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।
নীল ধীরপদে তিহুর আরও কাছে সরে এল। তার বলিষ্ঠ হাত দুটি দিয়ে তিহুর মেদহীন কোমরখানা সযত্নে আঁকড়ে ধরল। নীলের আকস্মিক এমন স্পর্শে তিহু এক নিমেষে শিউরে উঠল, তার কম্পিত চোখের পাতা দুটিতে বৃষ্টির জল আর লজ্জার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ সৃৃষ্টি করল।নীল তার অন্য হাতটি বাড়িয়ে তিহুর ললাটে লেপ্টে থাকা সেই অবাধ্য জলসিক্ত চুলের গোছাগুলো অতি সন্তর্পণে সরিয়ে দিল। বৃষ্টির শীতল স্পর্শেও নীলের আঙুলের সেই ছোঁয়া যেন তিহুর সারা শরীরে এক বিদ্যুৎতরঙ্গ বইয়ে দিল।
নীল তিহুর চোখের গভীরে নিজের দৃষ্টি ডুবিয়ে দিয়ে স্নিগ্ধ অথচ গভীর কন্ঠে বলল,,
“শহর জুড়ে বৃষ্টি নামুক,
তুমি খুঁজে নিও ঠাই
প্রতিটি বৃষ্টিরকণায় লেখা থাকুক,
শেষ অবধি আমার তোমাকেই চাই।”
কথাগুলো যেন বৃষ্টির শব্দের চেয়েও জোরালো হয়ে তিহুর হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করল। ঝোড়ো বাতাসের দাপটে চারপাশের গাছপালা মত্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু এই দুজন মানুষের কাছে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। তিহু কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু মাথা নিচু করে নীলের বুকে নিজের আশ্রয় খুঁজে নিল।তিহুর লাজুকতায় মৃদু হাসলো নীল।
বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যারাত হয়েছে তিহু-নীলের। নীলের অর্ধ ভেজা ব্লেজারটা তখনো তিহু শরীরে জড়ানো।নীল খুব যত্নের সহিত আগলে আছে তাকে। মহলে ঢুকতেই মির্জা সায়মা দ্রুত এগিয়ে এলেন; উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন,,
—’এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজেছিস? এক্ষুনি ঠান্ডা লাগবে।
নীল তিহুকে বক্ষে আগলেই বলল,,—’তুমি গরম দুধের ব্যবস্থা করো কাকিয়া। হারি আপ।
রুমিন আরা কোথা থেকে জানি হাজির হলো সেথায়,,
—’নীল তুইও এক কান্ড ঘটিয়েছিস। রাওফিন টাও কোথা থেকে জানি ভিজে পড়ে এসেছে; শিগ্রী যা,রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে দ্রুত।
বক্ষদেশে থাকা তিহু লজ্জায় কাচুমাচু করছে। এত মানুষের ভেতর নীল তাকে এভাবে ধরে আছে দেখে; তবে হেলদোলহীন নীল এবার আরেক বিস্ময়কর কান্ড ঘটালো। সকলের সম্মুখেই তিহুকে তৎক্ষণাৎ করে তুলে নিল। তিহুর চোখ বিষ্ময়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম।
সে কিছু বলার আগেই নীল একের পর এক সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে চলল কক্ষের দিকে।তিহু আকুপাকু করছে নামার জন্য তবে নীল ভাবান্তর দেখালো না কোনো।
কক্ষের সম্মুখে আসতেই একপ্রকার লাফিয়েই নেমে গেলো তিহু।নীল অবাক কন্ঠে বলল,,
—’ক্যাঙ্গারুর মতো লাফাচ্ছো কেন?
তিহু নাক সিটকে দূরে সরে গিয়ে বলল,,—’আপনি একটা…! আপনি একটা যা..তা..! ওভাবে বড়দের সামনে থেকে কেউ কোলে করে নিয়ে আসে?
নীল কক্ষে প্রবেশ করতে করতে বলল,,—’বউকেই কোলে নিয়েছি।
—’তা বলে সবার সামনে?
—’সবার সামনে কি আমি তোমাকে পুরো দেশের সামনে কোলে নিতে পারি, শুধু কোলে না আরো অনেক কিছু করতে পারি তুমি চাইলে ….!
তাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তিহু চিৎকার করে পাশে থাকা সোফার কুশনটা ছুঁড়ে মারল নীলের দিকে। নীল ক্যাচ ধরে হাসতে হাসতে বলল,,
—’ওকে ওকে,আই অ্যাম কিপিং মাই মাউথ শাট।
তিহু রাগে গজগজ করতে করতে, আলমারি থেকে কাপড় নিয়েই ওয়াশরুমে প্রবেশ করল। নীল তখনো হেসে চলেছে; হঠাৎ ওয়াশরুম থেকে ভেসে আসলো তিহু রাগি কণ্ঠস্বর,,
—’কেলাবেন পরে, আগে গিয়ে চেঞ্জ করুন রুমে পানি পানি হলে আপনার খবর আছে।
তিহু সবে শাওয়ারটা ছেড়েছে, হঠাৎ ভেসে আসলো নীলের কণ্ঠস্বর,,
—’জো হুকুম বেগম সাহেবা।
ঘড়ির কাটায় রাত বারোটার কিছু বেশি, রাতের খাওয়া-দাওয়া আর এক গ্লাস গরম দুধ খাওয়ার পর থেকে হাঁচির তোপটা কিছুটা কমেছে তিহুর। নীল এখনো ল্যাপটপে কাজ করছে। একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন বাকি রেখেই সে তিহুকে নিয়ে বেরিয়েছিল। এখন সেটার কাজই সম্পন্ন করে রাখছে।
হঠাৎ সে দেখল তিহু শীতে কাঁপছে। কুঁকড়ে গিয়েছে বেশ, তৎক্ষণাৎ ল্যাপটপটা অফ করে সে এগিয়ে আসলো ঘুমন্ত তিহুর দিকে। তিহুর রক্তিম মুখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো তার। সঙ্গে সঙ্গে হাতছোঁয়ালো তিহুর প্রশস্ত ললাটে। যা ভেবেছিল ঠিক তাই, জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর।
বিচলিত নীলের উদ্বিগ্নতা বাড়লো শত গুণ। দ্রুতপায়ে কক্ষ থেকে প্রস্থান করলো সে।
কিছুক্ষণ পর একটা বাটিতে সামান্য পানি আর কাপড় নিয়ে ফিরলো সে। অপর হাতে স্যুপের বোল। সেটাকে বেড সাইড টেবিলে রেখে তৎপর হলো তিহুর মাথায় জলপট্টি লাগাতে। ক্ষণকালের মাঝে জ্বরের তোপ কমলো তিহুর। তার আরক্তিম মুখশ্রীটা এখন ফ্যাকাশে হয়ে আছে।ধীরে ধীরে তাকে ডাকলো নীল,,
—’নুর?
প্রথমবার ডাক শুনলো না তিহু। নীল অতি যত্নের সহিত তার মুখে হাত বুলিয়ে ফের ডাকলো,,
—’নুউর?
তিহু পিটপিট করে তাকাতেই নীল বলল,—’তখন বারণ দিয়েছিলাম কিন্তু কে শোনে কার কথা? এখন দেখলেন তো জ্বর ঠিকই এসে গেল।
তিহু বিরক্ত কন্ঠে বলল,,—’এখন ডাকছেন কেন?
—’স্যুপটা খেয়ে নাও এরপর মেডিসিন নিতে হবে।
—’আমার এসব মেডিসিন-ঠিন ভালো লাগেনা।
—’কিন্তু নিতে হবে;না হলে জ্বর বাড়বে।
—’সরুন তো।
—’নুর?
—’কি হইছে?
—’খেয়ে নাও।
—’খাবোনা বলছি তো।
—’তাহলে কি খাবে বলো?
তিহুর ভীষণ বিরক্ত লাগছে সবকিছু। এমনকি নীলের বলা কথাগুলোও। আনমনে সে বলল,,
—’বিরিয়ানি তাও গরম গরম। খাওয়াবেন?
নীল সামান্য কপাল গোটালো, পরমুহূর্তেই বলল,,—’আচ্ছা ওয়েট।
তিহু বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকাতেই; নীল বেরিয়ে গেল কক্ষ ছেড়ে।
রাত একটা বেজে ৫০ মিনিট। প্রায় ঘন্টাখানেকের বেশি নীল কক্ষে অনুপস্থিত। এত রাতে কোথায় গেল সে? এমন চিন্তাধারা থেকেই এক প্রকার টলতে টলতে নিচে এসেছে তিহু।
হঠাৎ রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা টুংটাং শব্দ আর মশলার পরিচিত সুবাসে তিহুর ভ্রু কুঁচকে এল। এই মাঝরাতে রান্নাঘরে কে? সে ধীর পায়ে কিচেনের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল। সামনের দৃশ্য দেখে সে পলকহীন নয়নে চেয়ে রইলো ক্ষণকাল।নীল পরণের শার্টের হাতা গুটিয়ে, কোমরে একটা অ্যাপ্রন জড়িয়ে অতি মনোযোগে খুন্তি নাড়ছে। চুলগুলো অবিন্যস্ত, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
তিহু অস্ফুট স্বরে ডাকল,—’নেতা সাহেব?
নীল চমকে পেছনে তাকাল। তিহুকে দেখে হালকা হেসে বলল,— ওয়েট ফর টেন মিনিটস,বিরিয়ানি অলমোস্ট ডান।
তিহু বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলল,—’আপনি… আপনি সত্যি সত্যি রান্না করছেন? এই মাঝরাতে? আমি তো জাস্ট এমনি বলেছিলাম!
নীল চুলোর আঁচ কমিয়ে দিয়ে তিহুর সামনে এসে দাঁড়াল। তার তপ্ত ললাটে আলতো করে হাত রেখে জ্বরের তাপটা মেপে নিয়ে বলল,,—’হুউউম, ম্যাডাম সাহেবার ফর্মালিটি বলে কথা মেইনটেইন না করলে হবে?
তিহু অবাক হয়ে দেখল, নীল কতটা নিপুণভাবে বিরিয়ানির দমে বসানো কুকিং পট”টা নামাল। প্লেটে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম বিরিয়ানি বেড়ে যখন সে ডাইনিং টেবিলে এনে তিহুকে ডেকে বলল,,
—’এবার আসুন ম্যাডাম সাহেবা।
প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৪৫
বিরিয়ানির ঘ্রাণে চারিদিক ম’ম করছে।তিহু ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো;সে টেবিলে বসতেই নীল চেয়ার টেনে তার পাশে বসল।অতি যত্নে যত্নে প্লেট থেকে,খাবার তুলে তিহুর মুখে দিল।
প্রথম লোকমা খেয়েই তিহু বিস্মিত কন্ঠে বলল,,—’আনবিলিভেবল; আপনি এত ভালো রান্না করতে পারেন?
নীল মুচকি হেসে বলল,—’ সামান্য পারতাম। কিন্তু আজকেরটা ডিফরেন্ট, ইটস টু মাচ স্পেশাল কেননা আজকে ক্লায়েন্ট খুব ডিমান্ডিং তো।
তিহু এবার হেসে উঠলো। পরক্ষণেই ভাবলো সে কতটা ভাগ্যবতী।
