Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৮

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৮
নওরিন কবির তিশা

মিঠে রোদ্দুর গ্রাস করেছে ‌চরাচর; ঠিকরে পড়া কাঁচা হলদেটে ‌রৌদ্ররশ্মিতে চিকচিক করছে ‌বালুকাবেলা। উত্তাল সমুদ্রের লোনা হাওয়া জানালা গলে ঘরে প্রবেশ করতেই ঘুমের রেশটুকু কর্পূরের মতো উবে গেল তৃষার। জানালার ওপাশে নোনাজলের অবিরত গর্জন আর ভোরের পাখিদের কলকাকলিতে এক মায়াবী স্নিগ্ধতা বিরাজমান। তৃষা আর্যর অক্টোপাস ন্যায় বাঁধন থেকে অতি সন্তর্পণে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।
পাশে শুয়ে থাকা মানুষটার প্রশান্ত মুখখানির দিকে একপলক তাকিয়ে ও দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল; হৃদস্পন্দন এখনো কাল রাতের সেই নেশাক্ত কণ্ঠের গানে অবাধ্য হয়ে নাচছে। ​শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা জলের ঝাপটায় নিজেকে সজাগ করার চেষ্টা করল ও। কিন্তু তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে গিয়েই আয়নার দিকে নজর পড়তেই ও থমকে গেল। বিস্ময়ে ও নিজের অধর কামড়ে ধরল। আয়নার স্বচ্ছ বিম্বটি স্পষ্ট জানান দিচ্ছে সে কাল রাতের সেই মধুর উন্মাদনার সাক্ষী।

ওর দুগ্ধশুভ্র গ্রীবায় ফুটে আছে আর্যর দেওয়া ভালোবাসার গাঢ় নীলচে ছোপগুলো ওর গলার ভাঁজে জেঁকে বসেছে। লজ্জায় তৃষার গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। ওড়নাটা টেনে কোনোমতে সেই চিহ্নগুলো আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে ও তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এল।
​ঘরজুড়ে তখন ভোরের মিঠে রোদ খেলা করছে। তৃষা দেখল টুইংকেল ততক্ষণে ঘুম ভেঙে উঠে পড়েছে। আধোঘুমে থাকা টুইংকেল চোখ কচলাতে কচলাতে ওর দিকে তাকিয়ে একগাল হাসল। তৃষা নিজের অস্বস্তিটুকু ঝেড়ে ফেলে দ্রুত ওর কাছে এগিয়ে গেল। ওকে কোলে তুলে নিতেই ছোট্ট টুইংকেল তার নরম হাত দুটো দিয়ে তৃষার গলা জড়িয়ে ধরল। ওর আধো আধো বোল আর নিষ্পাপ হাসি যেন তৃষার সকালটাকে আরও ঝলমলে করে তুলল। তৃষা টুইংকেলের নাকে নিজের নাক ঘষে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
​ – গ্যুড মর্নিং মাই লিটল প্রিন্সেস! রাতে ঘুম ভালো হয়েছে মাম্মাম?
​টুইংকেল হাই তুলে তৃষার গাল টিপে দিয়ে বলল,
– গুড মর্নিং বানি! ইয়েস, বাট বানি, ইউ লুক সো রেড! তোমার গাল দুটো আপেলের মতো লাল হয়ে আছে কেন? আর ইয়্যু সিক?
​টুইংকেলের বাচ্চা বাচ্চা প্রশ্নে তৃষা হকচকিয়ে গেল। গলার দাগগুলো আড়াল করতে ওড়নাটা আরও একটু টেনে দিয়ে আমতা আমতা করে বলল,

– নো ডার্লিং, আই অ্যাম টোটালি ফাইন। রোদে বোধহয় এমন দেখাচ্ছে। কাম অন, লেটস গেট রেডি। আজ কিন্তু আমরা বিচে অনেক মজা করব, ওকে?
​টুইংকেল খুশিতে তালি বাজিয়ে উঠল। ও তৃষার কোল থেকে নামতে নামতে বলল,
– ওহ ইয়েস! আই ওয়ান্ট টু বিল্ড আ বিগ স্যান্ডক্যাসেল। আর পাপা কোথায়? পাপা কি এখনো ঘুমাচ্ছে? সো লেজি!
​তৃষা হাসল। ও টুইংকেলের গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
– পাপা ইজ স্টিল স্লিপিং। রাতভর অনেক গান-বাজনা করেছে তো, তাই হয়তো টায়ার্ড। তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি পাপা-কে ডেকে দিচ্ছি। ডোন্ট ওরি, উই উইল হ্যাভ আ ব্লাস্ট টুডে!
টুইংকেল নেচেকুদে ওয়াশরুমে ঢুকে যেতেই কক্ষ জুড়ে স্তব্ধতারা ঘাটি গাড়লো। ও ধীর পায়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। আর্য এখনো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। শান্ত, সুঠাম সেই মুখাবয়বে ভোরের অবাধ্য রোদ্দুর এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। তৃষা বিছানায় একটু ঝুঁকে আলতো করে আর্যর কাঁধ ধরে নাড়া দিল।
​ – এই যে মিস্টার! অনেক হয়েছে, এবার উঠুন।

​আর্যর ঘুমের ঘোর কাটল না। ও কেবল বিরক্তির এক অস্ফুট শব্দ করে পাশ ফিরে শুতে চাইল। তৃষা এবার একটু জোর দিয়েই ওর হাত ধরে টানল। আর্য আধবোজা চোখে একবার তৃষার দিকে তাকিয়েই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সোজা হয়ে বসল। ওর চোখেমুখে তখন কাল রাতের সেই ঘোর আর ভোরের স্নিগ্ধতার এক অদ্ভুত সন্ধি। ​আর্য নিজের অবিন্যস্ত চুলে হাত চালিয়ে একটু বাঁকা হেসে বলল,
– গুড মর্নিং মিসেস এহসান! তোমার তো দেখছি এনার্জি লেভেল একদম হাই। কাল রাতের পেনাল্টি সেশনের পর আমি তো ভেবেছিলাম তুমি আজ বিছানা ছাড়তেই পারবে না!
​তৃষা লজ্জায় যেন কুঁকড়ে গেল। ওড়না দিয়ে গলাটা আরও একটু আড়াল করে ও মেকি রাগ দেখিয়ে বলল,
– আপনার ওই বাজে বকা বন্ধ করুন তো! টুইংকেল কিন্তু উঠে পড়েছে। ও এখন দেখলেই বুঝবে ওর পাপা কত বড় একটা ড্রামা কিং!

​আর্য বিছানা ছেড়ে উঠে তৃষার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। তৃষা পিছিয়ে যেতে চাইলেও আর্যর দীর্ঘদেহী অবয়ব ওকে যেন দেওয়ালের সাথে বন্দি করে ফেলল। আর্য আলতো করে তৃষার কানের লতি ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,
– ড্রামা কিং? আই থিঙ্ক আই অ্যাম মোর অব আ রোমান্টিক ডিকটেটর। আর বাই দ্য ওয়ে, ওই ওড়না দিয়ে নীলচে দাগগুলো ঢাকার চেষ্টা করে লাভ নেই মাই লাভ, ওগুলো আমার পার্সোনাল সিগনেচার। ইট লুকস প্রিটি অন ইয়্যু।
​তৃষা আর্যর বুকে আলতো একটা কিল মেরে বলল,
– ইয়্যু আর ইমপসিবল ক্যাপ্টেন! যান বলছি, ফ্রেশ হয়ে নিন।
​আর্য তৃষার কপালে একটা চটজলদি চুমু খেয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে পেছন ফিরে তাকাল। চোখে সেই চিরচেনা দুষ্টুমি নিয়ে বলল,
– ওকে ম্যাম! আপনার হুকুম শিরোধার্য। বাট বি রেডি ফর!!
​তৃষা চোখ পাকাতেই আর্য তৎক্ষণাৎ জলদি পায়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করলো;ও যেতেই তৃষা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুচকি হাসল।

দরিয়াপুর গ্রামের আবহাওয়া বড্ড গুমোটবদ্ধ আজ। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা চললেও বিমলা নদীর তীরে বাতাসের হাহাকার মেহসানার বুকের ভেতরের শূন্যতাকেই যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। আদ্রিয়ান আর মেহসানা এইমাত্র মেহসানার মায়ের কবরের পাশে শেষবারের মতো দাঁড়িয়ে দোয়া সেরে ফিরল।
আজ ওরা গ্রাম ছেড়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। মাহতাব সাহেব উঠোনের এক কোণে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মেহসানা ধীর পায়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওর দুচোখে নোনা জলের ধারা তখনো শুকায়নি। মাহতাব সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে কম্পিত কণ্ঠে বললেন,
– মা রে, নিজের খেয়াল রাখিস। এই অভাগা বাপ তোরে কিছুই দিতে পারল না, শুধু অপমানের বোঝা ছাড়া।
মেহসানা ফুঁপিয়ে উঠে বাবার হাত দুটো চেপে ধরল। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিয়ান মাহতাব সাহেবের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,

– আঙ্কেল, প্লিজ ডোন্ট ব্লেম ইয়োরসেলফ। মেহসানাকে আপনি আমার হাতে তুলে দিয়েছেন, এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আই প্রমিস, ওর চোখে আমি আর কোনোদিন অশ্রু জমতে দেব না। শ্যি উইল বি সেফ অ্যান্ড হ্যাপি উইথ মি।
মাহতাব সাহেব ঝাপসা চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকালেন। আদ্রিয়ান মেহসানার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
– মেহসানা, ইট’স টাইম টু গো। নিজেকে শক্ত করো। জীবনটা অনেক বড়, আর আমাদের অনেকটা পথ একসাথে চলতে হবে। ইউ হ্যাভ টু বি ব্রেভ ফর আস।
মেহসানা অশ্রুসিক্ত চোখে একবার নিজের চেনা উঠোন, বড় ঘরের বারান্দার পানে চাইলো। সব স্মৃতি যেন আজ এই মাটির খাঁচায় বন্দি হয়ে রইল। ও ধরা গলায় বলল,
– আই নো। চলুন। বাবা, তুমি ঠিকমতো ওষুধ খেয়ো আর নিজের যত্ন নিও। আমি গেলেই যেন সব ভুলে থেকো না।
আদ্রিয়ান মেহসানার হাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। আড়ষ্টটাহীন এক পরম নির্ভরশীল স্পর্শ অনুভব করে মেহেসানা শিউরে উঠলো।ওরা গাড়ির দিকে এগোতে লাগল, পেছনে মাহতাব সাহেব তাকিয়ে রইলেন ধূসর রাস্তার দিকে, যেখানে তার কলিজার টুকরোটি এক নতুন পরিচয়ে, নতুন গন্তব্যের দিকে পা বাড়াচ্ছে আজ।

​গাড়ি চলতে শুরু করেছে অনেকক্ষণ হলো। দুপাশে ধূসর প্রান্তর আর মেঠো পথ দ্রুত পেছনে ছুটে পালাচ্ছে। মেহসানা জানালার বাইরে একমনে চেয়ে আছে, হঠাৎ বুকটা খাঁ খাঁ করে উঠল ওর; এক দারুণ তৃষ্ণায় ওর কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। নিজের অস্বস্তিটুকু লুকানোর চেষ্টা করলেও আদ্রিয়ানের তীক্ষ্ণ নজর এড়ালো না তা। মেহসানা কিছু বলার আগেই আদ্রিয়ান হাত বাড়িয়ে পাশের পানির পাত্রটি তুলে নিল। কিন্তু হায়! পাত্রটি শূন্য, এক ফোঁটা জলও অবশিষ্ট নেই তাতে।
​আদ্রিয়ান একবার জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরের রুক্ষ জনপদের দিকে দৃষ্টি মেলাল। যতদূর চোখ যায়, কোনো দোকানপাটের চিহ্নমাত্র নেই। গ্রাম্য নিস্তব্ধতা যেন চারিদিক ঘিরে ধরেছে। হুট করেই ওর চোখে পড়ল পথের ধারে একলা দাঁড়িয়ে থাকা একটি জরাজীর্ণ টিউবওয়েল। জনমানবহীন সেই প্রান্তরে ওটাই যেন তৃষ্ণার্তের পরম ভরসা।
আদ্রিয়ান তৎক্ষণাৎ ব্রেক কষলো গাড়ি স্থির হতেই ও অত্যন্ত তৎপরতার সাথে দরজা খুলে নিচে নেমে পড়ল। এদিকে গাড়িটা আকস্মিক ব্রেক কষতেই মেহসানা সংবিৎ ফিরে পেল। জানালার বাইরে ধূসর ধূলিকণাগুলো থিতু হতেই ও দেখল আদ্রিয়ান দরজা খুলে দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। ও অবাক হয়ে জানালার কাঁচ নামিয়ে একটু গলা উঁচিয়ে ডাকল,

– এই যে! মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে কোথায় যাচ্ছেন? গাড়ি কি নষ্ট হয়ে গেল নাকি?
আদ্রিয়ান একবার পেছন ফিরে মেহসানার দিকে তাকাল;টিউবওয়েলটার দিকে এগোতে এগোতে বলল,
– গাড়ি ঠিক আছে মিসেস সার্জন। আপনার ওই শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠনালী আর ফ্যাকাশে মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আপনি যে কোনো মুহূর্তে সাহারা মরুভূমি হয়ে যাবেন। সো, আই অ্যাম জাস্ট ট্রায়িং টু সেভ ইয়্যু ফ্রম ডিহাইড্রেশন। ডোন্ট মুভ, আমি আসছি।
মেহসানা বিড়বিড় করে বলল,
– আস্ত একটা পাগল!
পরমুহূর্তে গলা উঁচিয়ে বলল,, -এই রোদের মধ্যে টিউবওয়েল চেপে জল আনতে হবে না, আমি না হয় একটু সহ্য করে নিতাম।
আদ্রিয়ান ততক্ষণে জরাজীর্ণ টিউবওয়েলটার হাতল ধরেছে। হাতলটা নাড়তেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে নিস্তব্ধ প্রান্তরটা কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর যখন মাটির গভীর থেকে শীতল জল বেরিয়ে এল, আদ্রিয়ান হাতের আঁজলা ভরে সেই জল মুখে-চোখে দিল। ওর শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ও পানির বোতলটা ভরে দ্রুত গাড়ির দিকে ফিরে এল।
গাড়ির ভেতরে ঢুকে ও বোতলের মুখটা খুলে মেহসানার দিকে বাড়িয়ে দিল। মেহসানা বোতলটা হাতে নিতে নিতে আড়চোখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকাল। রোদে আদ্রিয়ানের ফর্সা মুখটা একটু তামাটে হয়ে গেছে। ও এক চুমুক জল খেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
– থ্যাংকস। বাট আপনি কি করে বুঝলেন আমার তেষ্টা পেয়েছিল?
আদ্রিয়ান সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে এক চিলতে বাঁকা হাসি হাসল। মেহসানার চোখের মণি বরাবর তাকিয়ে ও গভীর স্বরে বলল,
– ম্যাজিক, আমি তো আর আপনার মত সাউন্ডবক্স না যে সবসময় চিৎকার করব। ছোট ছোট জিনিস গুলো আমি বুঝি।
মেহেসানা কিছু বলতে গিয়েও থামলো। এক ঝলক আর দৃষ্টিতে তাকালো পাশে বসা মানুষটার দিকে।

“কিসের টিকিট এটা?”
তৃষা সরু নেত্রে চাইলো; দীঘল আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করছিলো আর্য ।তৃষার প্রশ্নে ও আয়নায় প্রতিফলিত তৃষার বিস্মিত চোখের ওপর নিজের স্থির দৃষ্টি স্থাপন করে শান্ত স্বরে বলল,
– সেন্ট মার্টিনের।
​তৃষা বিস্ময় কাটিয়ে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ছোট্ট টুইংকেল ঝড়ের বেগে পেছন থেকে ওকে জাপ্টে ধরল; উত্তেজনায় টইটম্বুর গলায় বলল,,
– সারপ্রাইজ বানি।
​তৃষার বিস্ময় এবার বাঁধ ভাঙল। ও আলতো করে টুইংকেলকে নিজের সামনে ঘুরিয়ে এনে ওর আদুরে তুলতুলে গাল দুটো টিপে ধরে কৌতূহলী চোখে আর্যর দিকে তাকাল। আর্য হাতঘড়িটা পরতে পরতে চোখের ইশারায় টুইংকেলকে কিছু একটা ইঙ্গিত করল। টুইংকেল অমনি তৃষার গলা জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী স্বরে বলল,
​ – জানো বানি, আমরা অনেক আগে থেকেই এটা প্ল্যান করে রেখেছিলাম। তুমি একদিন বলেছিলে না তোমার সেন্ট মার্টিন খুব পছন্দ? তাই তুমি যখন মামাইদের বাসায় গেছিলা না? আমি টা পাপা-কে বলে দিয়েছিলাম। পাপা তখন বলল, বানি-কে একদম বলা যাবে না, আমরা ওকে সারপ্রাইজ দেব। তাই পাপা তোমাকে না জানিয়েই সব টিকিট কেটে ফেলেছে। বুঝছো এবার?
​তৃষা বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল বাবা-মেয়ের এই মিষ্টি ষড়যন্ত্রের দিকে।পুঁচকে পুতুলতুল্য মেয়েটা যে এত বড় একটা গোপন কথা পেটে চেপে রেখেছিল, তা ভেবে ও অবাক না হয়ে পারল না। আর্য তৃষার এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে তৃষার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
– ​ছোট্ট গুপ্তচরটা কিন্তু বেশ কাজের, তাই না মিসেস এহসান?
​তৃষা হাসবে না কি রাগ করবে বুঝে উঠতে পারল না। এক চিলতে শান্তির হাসি খেলে গেল ওষ্টাধর প্রান্তে।

অদ্ভুতভাবে, কোনো তিক্ততা বা অভিযোগ ছাড়াই আদ্রিয়ানের পরিবার মেহসানাকে বরণ করে নিয়েছে। বিশেষত হামিদা বেগম, মেহসানাকে দেখা মাত্রই বুকে টেনে নিয়ে ছিলেন।​ আদ্রিয়ান সবটা বলেছে ওদের। আদ্রিয়ানের কক্ষের বৃহৎ সোফায় মেহসানার পাশে বসে হামিদা বেগম ওর হাত দুটো সস্নেহে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিলেন। মেহসানার ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যথিত কণ্ঠে বললেন,
​ – মা রে, এত বড় একটা শোকের খবর আমাদের কাছে গোপন রাখলি কেন? তোর মা চলে গেলেন, আর আমরা শেষবার ওনার মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারলাম না! এই দুঃখ আমার মনে আজীবন থেকে যাবে।
​মেহসানা মাথা নিচু করে রইল, চক্ষু কার্নিশে অশ্রুকণা চিকচিক করছে। যেকোনো মুহুর্তেই টুপটাপ ঝরে পড়বে তা। হামিদা বেগম আঁচল দিয়ে মেহসানার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন,
​ – সব সয়ে নিতে হয় মা। যা হারিয়েছিস তা আর ফিরবে না, কিন্তু এখন থেকে আমরাই তো তোর সব। আদ্রিয়ান যেমন আমার ছেলে, তুইও আজ থেকে আমার সেই আদরের মেয়ে। কোনো কিছু নিয়ে মন খারাপ করবি না।
​​হামিদা বেগম মৃদু হেসে মেহসানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
– এখন অনেক ক্লান্ত তুই। যা,একটু জিরিয়ে নে। আমি তোর জন্য খাবার পাঠাতে বলছি।
​হামিদা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আদ্রিয়ান ধীর পায়ে ঘরে প্রবেশ করল। ও দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মেহসানার শান্ত বিম্বটির দিকে একপলক তাকিয়ে ছিলো; তারপর এগিয়ে এসে ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে বলল,

– বলেছিলাম না, আমার আম্মু তোমাকে ঠিক পছন্দ করে নেবেন? এখন তো দেখছি আমার গুরুত্ব কমে তোমার পাল্লাই ভারী হয়ে যাচ্ছে।
​মেহসানা ম্লান হেসে আদ্রিয়ানের চোখের দিকে চাইল,
​ – এই বাড়িটা আজ থেকে তোমার নিরাপদ আশ্রয়, মিস থুড়ি মিসেস। এখানে শুধু অধিকার নয়, এক আকাশ ভালোবাসা পাবে। শুধু নিজেকে আর একা ভেবো না।

সময়টা অপরাহ্নের পূর্বলগ্ন। রৌদ্রের তপ্ততা না থাকলেও বাতাসে ভ্যাপসা গরম ‌বিদ্যমান। নীলাম্বরী সমুদ্র আর দিগন্তের নীলিমা এখানে এসে যেন একাকার হয়ে মিশে গেছে। স্ফটিকস্বচ্ছ নীল জলরাশির বক্ষদেশে স্বর্ণরঙা রৌদ্ররশ্মি অপার্থিব দ্যুতির সৃষ্টি করছে। প্রায় ঘন্টাখানেক হলো এখানে এসে পৌঁছেছে তৃষারা। রোদ্দুর কিঞ্চিৎ স্তিমিত হয়ে আসায় সৈকত জনাকীর্ণ হতে শুরু করেছে।
সেন্ট মার্টিনের স্বচ্ছ ফিরোজা জলরাশি সৈকতের প্রবাল পাথরে আছড়ে পড়ছে। আর্য সৈকতের বালুকাভূমিতে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের অনন্ত বিস্তার অবলোকন করছিল। ওর পরনে সাদা লিনেন শার্টের সাথে নীল রঙের ট্রাউজার । আকস্মিক পেছন ভেসে এলো টুইংকেলের মিষ্টি কন্ঠস্বর,
– পাপা! লুক অ্যাট আস! বানি আর আমাকে কেমন লাগছে দেখো তো?
​আর্য ধীরলয়ে পেছন ফিরতেই ওর চোখের মণি স্থির হলো। কোলাহল ছাপিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো এক বিমোহিত সৌন্দর্যের অধিকারিনী রমনী আর তার পার্শ্ববর্তী ছোট্ট রাজকুমারীটির পানে। দুজনের পরনেই এক রঙের শাড়ি; হালকা নীলরঙা। একই রকম করে বাঁধা চুল,একইভাবে বিনুনীর ভাঁজে গাঁথা কাঠগোলাপ। দুজনের ডাগর চক্ষুতেই স্পষ্ট চিকন আই-লাইনারের চিকন আঁচড়।
সম্মোহিত দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকল আর্য। তৃষা বক্র হাসির রেখা ফুটিয়ে এগিয়ে এসে দুষ্টুমির ছলে আর্যর সম্মুখে তুড়ি বাজিয়ে বলল,

– এই যে মিস্টার?
এতক্ষণে ধ্যান ভাঙল আর্যর। ও একবার নিজের চোখের পলক ঝাপটাল;চোখের কোটরে তখন রাজ্যের বিস্ময় আর মুগ্ধতা মিলেমিশে একাকার।ও এক পা এগিয়ে এসে তৃষার কোমর জড়িয়ে ধরল। আর্যর গভীর চাউনি তৃষার অস্বস্তি বাড়িয়ে দিলেও ও এবার আর সরার চেষ্টা করল না। আর্য নিচু স্বরে তৃষার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
– আই অ্যাম স্পিচলেস মাই কুইন ! ইয়্যু আর লুকিং লাইক আ ড্রিম ইন দিস আউটফিট।
তৃষা লজ্জায় আর্যর শার্টের কলারটা একটু টেনে ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
– আর আপনার মেয়েকে?
– প্রিন্সেস তো সবসময়ই বিউটিফুল, বাট কুইন ইজ্য সামথিং এলস!ইয়্যু নো মাই কুইন তোমাকে রুপে দেখে আমার হার্টবিট অলরেডি আউট অফ কন্ট্রোল। ডু ইউ ওয়ান্ট টু বি দ্য রিজন অফ মাই হার্ট ফেইলিওর?
তৃষা আর্যর বুকে আলতো চাপ দিয়ে শাসনের স্বরে বলল,
– আবার সেই উল্টাপাল্টা কথা! জাস্ট শাট আপ।
আর্য প্রসারিত হাসলো। তৃষার কোমরে ওর হাতের বাঁধনটা আর একটু নিবিড় করে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,
– গুড বয় হওয়ার ট্রাই তো অনেক করলাম মিসেস এহসান, বাট নিজের সুন্দরী বউকে এত সাজুগুজু অবস্থায় দেখলে তো ভালো মানুষেরও মাথা ঠিক থাকার কথা নয়। ইউ আর লুকিং অ্যাবসোলিউটলি স্টানিং!
তৃষা লজ্জিত হাসিতে আর্যর শার্টের বোতাম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,

– হইছে, অনেক প্রশংসা করছেন! এবার একটু টুইংকেলের দিকে তাকান তো। ও তো অলরেডি সমুদ্রের সাথে মিতালি শুরু করে দিয়েছে।
ওরা দুজনেই দেখল, ডাগর চোখের সেই ছোট্ট রাজকন্যাটি হাত দুয়েক দূরে প্রবাল পাথরের ওপর দিয়ে আপন মনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। ওর ছোট্ট দুই হাতে ধরা দুটো কাঁচি-ঝিনুক। হঠাৎ টুইংকেল পিছু ফিরে আর্য আর তৃষার দিকে তাকিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকল,
– পাপা! বানি! কাম কুইক! দেখো, ওয়াটার ইজ সো ক্লিয়ার! আমি ফিশ দেখতে পাচ্ছি!
তৃষা আর্যর বাঁধন থেকে আলতো করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শাড়িটা খানিক উঁচিয়ে টুইংকেলের দিকে দৌড় দিল। হালকা নীল শাড়িটা বাতাসের ঝাপটায় সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছে। তৃষা চিৎকার করে বলল,
– মাম্মাম, ওয়েট! ওখানে পাথর পিচ্ছিল, তুমি দৌড়াবে না!
টুইংকেল হাসতে হাসতে আরও একটু দূরে সরে গিয়ে বলল,
– নো বানি! ইয়্যু আর সো স্লো! পাপা, কাম অন, বানি-কে হেল্প করো আমাকে ধরতে!
আর্য পকেটে হাত গুঁজে সমুদ্রের সেই সিক্ত বালুকাভূমির ওপর দিয়ে ধীর কদমে হাঁটছে। ওর দৃষ্টির পুরোটা জুড়েই তৃষা আর টুইংকেল। তৃষা যখন টুইংকেলকে প্রায় ধরে ফেলেছে, তখনই টুইংকেল এক চিলতে দুষ্টু হাসি দিয়ে আবার দৌড় লাগাল। তৃষার শাড়ির আঁচলটা লুটিয়ে পড়ছে প্রবাল পাথরের গায়ে, সে সেটা এক হাতে টেনে ধরে অন্য হাতে টুইংকেলকে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
আর্য পাশ থেকে হেসে বলল,

– দ্যাটস মাই গার্ল! রান প্রিন্সেস! বানি কিন্তু আজ হাপিয়ে যাচ্ছে!
তৃষা এক মুহূর্ত থেমে আর্যর দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম রাগে চেঁচিয়ে বলল,
– আপনি ওখানে দাঁড়িয়ে হাসছেন কেন? কাম অ্যান্ড হেল্প মি টু ক্যাচ হার!
– তুমিই ধরো।
-আপনি আসবেন!
– নো!
– বুঝতে পেরেছি। অ্যাকচুয়ালি আপনি দৌড়াতে পারেন না!
এবার আতে ঘা লাগল আর্যর! সে দৌড়াতে পারে না মানে?
– উল্টাপাল্টা বকো না!
– আমি কোনো উল্টাপাল্টা বকছি না! পারেন তো ধরে দেখান!
বলেই দৌড় লাগালো তৃষা। তবে এবার আর থেমে থাকল না আর্য ও এবার ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এল। এক ঝটকায় ও তৃষার হাতটা খপ করে ধরে, পাশ থেকে টুইংকেলকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। টুইংকেল খুশিতে আত্মহারা হয়ে আর্যর গলা জড়িয়ে ধরল। আর্য অন্য হাত দিয়ে তৃষার কোমর জড়িয়ে ধরল। সেন্ট মার্টিনের সেই নীল জলরাশির তীরে, অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভায় তিনটি প্রাণের এই খুনসুটি পূর্ণ সুখের অবতারণা করছে।
আর্য তৃষার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

– লুক অ্যাট দিস মিসেস এহসান! দ্যিস ইজ্য মাই হোল ওয়ার্ল্ড,ইয়্যু, মি অ্যান্ড আওয়ার লিটল ওয়ার্ল্ড। আই প্রমিস, এই নীল সমুদ্রের মতোই আমাদের ভালোবাসাটা সবসময় এমন গভীর আর স্বচ্ছ থাকবে।
তৃষা আর্যর কাঁধে মাথা রেখে পরম তৃপ্তিতে চোখ বুজল। ওর মনে হলো, জীবনের সমস্ত পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব যেন এই নীল নির্জনতায় এসে ভিড়েছে। হঠাৎ গুনগুনিয়ে গান ধরল ও,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৭ (২)

🎶 সুখের-ই সাগরে ঢেউয়ে ঢেউয়ে…
দুজনে একসাথে ভেসে যায়….🎶
সঙ্গে সঙ্গে আর্যর প্রত্যুত্তর ভেসে এলো,
🎶 ভেসে ভেসে ভালোবেসে…
সারা জীবন বাঁচতে চাই….🎶
তৃষা আর্যর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে খাইলো,,
🎶 তোমায় ছেড়ে বহুদুরে যাব কোথায়?
এক জীবনে এত প্রেম পাব কোথায়? 🎶
আর্য তৃষার ললাটে দীর্ঘ প্রেম পরশ এঁকে গাইলো,,
🎶 তোমায় ছেড়ে বহুদুরে যাব কোথায়?
এক জীবনে এত প্রেম পাব কোথায়? 🎶

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৮ (২)