Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৭

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৭

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

তখন রাত দশটা প্রায়। হিমেল মাছ ভাজতে গিয়েছে আজ। রান্নায় পুরোপুরি অদক্ষ হিমেল মাছ ভাজার জন্য তেল দিয়েই অপেক্ষা করছে গরম হওয়ার জন্য। মিথি বলেছে গরম তেলে দিতে। হিমেলও সে অনুযায়ীই করছে। মিষ্টিকে আগেই মিথির রুমে দিয়ে এসেছে যদি তেল ছিটকে পরে তার জন্য। অবশেষে তেল গরম হলো কিনা বুঝেই ফটফট করে মাছ গুলো কড়াইতে রাখল। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই তেল ছিটকে এসে পড়ল হিমেলের হাতেও। হিমেল ভ্রু কুঁচকাল। গরম তেল পড়েছে আর কি এমন হবে? এমন একটা ভাব নিয়েই সে তরকারির মতো করে মাছ নাড়াতে শুরু করল। অতঃপর একটা পর্যায়ে দেখল মাছগুলা ভেঙ্গে একাকার। হিমেল অদক্ষ এমনিতেই তার উপর এমন কিছু হবে বুঝে উঠে নি। আশ্চর্য! হিমেল ইতোমধ্যে ঘেমেও গেছে। কপাল কুঁচকে গেছে। উপায় না পেয়েই মিথি গলা উঁচু করে ডাক দিল। বলল,

“ মিথি, মাছ গুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। ”
মিথি শুনল কি শুনল না বুঝেই আবার পা চালিয়ে মিথির কাছেই গেল। গম্ভীর স্বরে জানালও সমস্যাে কথা। মিথির অবশ্য শুনে খারাপ লাগল। হিমেলের অবস্থা দেখে শুধাল,
“ আপনাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছি হিমেল ভাই। আমাদের জন্য কত কি পোহাতে হচ্ছে বলুন তেো। ”
হিমেলের কপাল আরে কুঁচকাল। বলল,
“ কি করব মাছ গুলো তা বল? ফেলে দিব? ”
“ না, ওগুলাই করুন। আর কিছু করবেন না। ”
হিমেল এর পরপরই গটগট পা তুলে চলে গেল। অতঃপর রান্নাঘরে এসে দেখল যেটুকু রান্না নষ্ট করা ওর বাকি ছিল ওইটুকুও ডান। মাছ পুড়ে এসেছে। খুব কম সময়ে আর কিছু করতে না পেরে হিমেল আলু ভর্তাটাই করল এবার। খাবারের প্লেটে খাবার বাড়তে বারবার পোড়া মাছ গুলোর দিকে তাকাচ্ছিল কেবল সে। অতঃপর আবারও মিথির কাছে গেল। মিষ্টি তখন মিথির মুখে ঠোঁট ছুঁয়ে দিচ্ছে। কানে কানে কিছু একটা বলছে ঠোঁট আওড়িয়ে। হিমেল দরজায় দাঁড়িয়েই সে দৃশ্য দেখল। কি সুন্দর! দুই দুটো মিথিফুল। তার হয়েছে এই দুটো মিথিফুল, তার কাছে থাকবে। কি সুন্দর, প্রশান্তময় অনুভূতি। বুকের ভেতর কেমন একটা অনুভূতি যেন। হিমেল বুঝাতে পারে না। শুধু চেয়েই থাকে। এক পর্যায়ে মিথিই খেয়াল করল হিমেলকে। তার দিকেই তাকিয়ে আছে । তবে সে তাকাতেই আর চোখাচোখি হতেই হিমেল নজর সরাল। মিথি বলল,

“ কিছু বলবেন? ”
হিমেল চাইল আবার। বলল,
“ তুই তো অসুস্থ মিথি। বাইরের খাবার খাবি? আমি তো মাছগুলো পুড়িয়ে ফেলেছি একটু একটু।বাইরের খাবার নিয়ে আসি?”
মিথি সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর করল,
“ না, যা আছে তা দিয়েই হবে। ”
“ খেতে কি বিশ্রী হবে ভাব। ”
“ সমস্যা নেই। ওসবই আনুন হিমেল ভাই। ”
হিমেল কিছুটা সময় শান্ত হয়ে গম্ভীর ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। অতঃপর আবার গেল। খাবার বেড়েও আনল। গরম ভাত, এক পাশে আলু ভর্তা আর কোনরকমে হওয়া একটু একটু পুড়ে যাওয়া মাছ ভাজা। প্লেট নিয়ে হাজির হলো। মিষ্টিকে আগেই খাইয়ে দিয়েছিল হিমেল। মিথিকে প্লেটটা ওর হাতে দিতেই মিথি ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ চামচটা হিমেল ভাই? ”
হিমেল ভ্রু বাঁকাল।কপাল কুঁচকে বলল,

“ চামচ দিয়ে খাবি? মাছের কাঁটা চামচ দিয়ে বাছতে পারবি নাকি তুই?”
মিথি ছোট ছোট চোখে তাকাল। হিমেল পাশে বসেই গম্ভীর গলায় বলল,
“ তুই যখন ছোট ছিলি মিষ্টির মতো প্যাঁ প্যাঁ করে কান্না করতি মিথি, আর এখন এমন একটা ভাব করিস তুই খুব বড় হয়ে গিয়েছিস। মানুষের হাতে খাবার খেলেই তোর মানসম্মান সব ডুবে যাবে। ”
মিথি কথাগুলো শুনল। কি বলবে বুঝে উঠল না। হিমেল এবার প্লেটের খাবার টুকু মাখিয়ে মুখের সামনে তুলে বলল,
” নে হা কর। আমার হাতে ময়লা নেই।”
মিথি এবারও চোখ ছোট ছোট করে তাকাল। প্রথমবার বলেছে বিষ খাইয়ে দিবে নাকি? এখন বলছে ময়লা নেই। ওভাবে তাকিয়েই ও হা করল। ডান হাতের হাড্ডি যদি না ভাঙত তাহলে ও নিজের হাতেই খেতে পারত। সমস্যা হতো না। কিন্তু ভেঙেই বিপদ হলো। অন্যদিকে হিমেল মাছের কাঁটা বাছতে গিয়ে বলল,

“ পুড়ে গিয়েছে, মনে মনে রান্না পারি না বলে কিছু বলিস না আবার। ”
মিথি শুধু দেখছিল। কি সুন্দর ভাবে কাঁটা বেছে খাইয়ে দিচ্ছে। একদম তার আব্বার মতো করে। তার আব্বাও এমনই করত। আজ কতগুলো দিন পর মিথি নিজের আব্বার যত্নটা পাচ্ছে, দেখছে। আসলেই কি এতোটা যত্ন করা উচিত হচ্ছে হিমেল ভাই এর? কেন করছে? মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। হিমেল ততক্ষনে তার মুখে খাবার তুলে দিয়ে মিষ্টির দিকে ও খাবার বাড়াল। বলল,
“ হা করুন আম্মুজান, খেয়ে নিন। ”
মিথি আবারও চাইল। আবারও বাবা মেয়ের সুন্দর একটা সম্পর্ক, সুন্দর একটা যত্ন যেন চোখে ভেসে এল। আবারও তার মনে হলো হিমেল ভাই সত্যিই যত্নশীল পুরুষ।

মধ্যরাত তখন। মিষ্টিকে হিমেলই ঘুম পাড়িয়েছিল। নিজের সাথে। তারপর ঐটুকু পুতুলটাকে নিয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পুতুলটা মায়ের সাথে ঘুমাতে ঘুমাতেই রাতে যখন ঘুম ভাঙল তখন মাকেই প্রথমে খুঁজল। ঘুম ঘুম চোখে হাতড়ে খুঁজল মায়ের মুখ। অথচ পেল না। ঐটুকু মেয়েটা মায়ের মুখের অবয়ব, শরীরের ঘ্রাণ এমনকি মায়ের উপস্থিতি না পেয়েই চোখ খুলে তাকাল এবার। ফ্যালফ্যাল করে চাইল এপাশ, ওপাশ। কোথাও মা নেই। মিষ্টির মুখটা কাঁদোকাঁদো হয়ে এলে। নিচের ঠোঁট উল্টে ফেলল ও। পাশে হিমেলের মুখটা দেখে দুই হাতে চাপড় দিয়ে ও বোধহয় ডাকতে চাইল। জাগাতে চাইল। পরবর্তীতে আধো আধো স্বরে ডেকেই উঠল

“ হিম হিম.. ”
হিমেল চোখ মেলল তার একটু পরই। ঘুমোঘুমো চোখে মিষ্টির দিকে চাইতেই দেখল উঠে বসে আছে। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখজোড়া টলমলে। ঠোঁট উল্টে রেখেছে। যেন এক্ষুনিই কেঁদে ফেলবে। এক্ষুনিই! হিমেল মুহুর্তেই উঠে বসল। মিষ্টির মুখটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে আদুরে গলায় শুধাল,
“ মিষ্টি, উঠে পড়েছেন আম্মু? ভয় পেয়েছেন? কি হয়েছে আম্মু? কান্না পাচ্ছে? ”
ব্যস! এইটুকু আহ্লাদেরই বাকি ছিল বোধহয় মিষ্টি। মুহুর্তেই আওয়াজ তুলে কেঁদে উঠল সে। হিমেলকে আঁকড়ে ধরে কান্নারত স্বরে বলতে লাগল,

“ হিম.. ”
হিমেল কান্না থামানোর চেষ্টা চালাল। আদর দিয়ে শুধাল,
“ কি হলো আম্মু? ঠোঁট উল্টে কান্না কান্না ভাব কেন মিষ্টি? কি করেছি হিম বলো? হিম সরি হু? ”
আবার শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে বলল,
” কাঁদে না, কাঁদে না.. হিম আছি না? বলো হিমকে..”
এইটুকু বলেই মাথায় হাত বুলাল সে। মিষ্টি তখনও কাঁদছে। অতঃপর হিমেল আবার ও জিজ্ঞেস করল,
“ আম্মুর কাছে যাওয়ার জন্য কান্না করছো মিষ্টি? আম্মুর জন্য? ”
এবারে কাঁদতে কাঁদতে মিষ্টি ঠোঁট আওড়িয়ে বলতে লাগল,
“ আ্ আম্ মু..মা, আম্ মু। ”
হিমেল এবারে বুঝে উঠল কারণ টা। মিষ্টিকে শান্ত স্বরে বুঝিয়ে কোলে তুলল। কান্না থামাল। অতঃপর মৃদু পায়ে পা এগোল মিথির ঘরের দিকে। দরজাটা ভিড়িয়ে রাখা ছিল। হিমেলই ভিড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল। মিথি নিশ্চয় এখন ঘুমোচ্ছে। ডাকা উচিত হবে না নিশ্চয়? আবার না ডেকে ঘুমন্ত অবস্থায় এভাবে তার ঘরে যেতেও হিমেলের মন সায় দিল না। এপাশ থেকেই হিমেল গলা ঝাড়ল। বলল,

“ মিথি? আসছি। ”
মিথি বোধহয় শুনলও না। হিমেল ছোটশ্বাস ফেলল। মিষ্টি আবার কেঁদে উঠতে নিল। হিমেল কোলে দুলিয়ে কোন রকমে থামিয়ে পরমুহুর্তেই কি ভেবে দরজা ঠেলে পা রাখল। মিথি সত্যিই ঘুমোচ্ছে। হিমেল চাইল। মিষ্টিকে একপাশে বালিশ দিয়ে শুঁইয়ে দিয়েই ফিসফিস করে বলল,
“ আম্মু আছে। দেখেছেন তো?ঘুমাক কেমন? আপনিও ঘুমিয়ে যান আম্মু,হিম চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। ”
মিষ্টি কি বুঝল কিজানি। মাকে দুই হাতে ঝাপটে সত্যি সত্যিই চোখ বুঝল। হিমেল হাসল। মিষ্টির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধু মিথির ঘুমন্ত মুখটা দেখছিল। এত মায়া মায়া কেন এই দুইজন? হিমেল সত্যিই বুঝে না। এই একটা মেয়ের প্রতি তার যতো মুগ্ধতা, যত মায়া, যত অনুভূতি! একজনেতেই। হিমেল এইটুকুই ভাবল। অতঃপর মিষ্টিকে ঘুম পাড়িয়ে খাটের কিনারায় বালিশ দিয়ে এল। আলো নিভিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড় করল,
” আমি রোজ রোজ একজন্যের প্রতিই আকৃষ্ট হই মিথিফুল। একজনের প্রতিই! যার প্রতি মুগ্ধতা আমার এই জন্মে কমবে না। ”

সকাল হতেই মুহিবের এই নিয়ে কয়েকবার কল দিয়েছে। হিমেল ঘুমে ছিল তখন। মিথি আর হিমেলের সত্যি সত্যিই কবুল বলে বিয়ে হয়েছে এই খবরটা হিমেলের পরিবার অব্দি যেতে দেরি হলো না৷ মুহিবের মায়ের কাছেই খবরটা আগে গিয়েছিল। অতঃপর খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই কল এসেছিল হিমেলের কাছে। ওপাশ থেকে জানানে হলো,
“ তুই সত্যিই বিয়ে করেছিস? মিথিকে বিয়ে করেছিস বাবা? সত্যি করে বল। বিয়ে করেছিস? ”
হিমেল শুনল নিরবেই। হিমেল ভেবেছিল বিয়ে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই খবর পাবে। তবে এইটুকু দেরি হলো কেন বুঝল না। ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ হ্যাঁ, বিয়ে করেছি মামনি। মিথিকেই। ”
“ কিসব বলছিস? মাথা ঠিক আছে হিমেল? এতবার সাবধান করার পরও, এতদিন বুঝানোর পরও কিভাবে পারলি? ”
হিমেল শান্ত স্বরে জানাল,

“ কারণ এতদিন বুঝানোর পরও সে আমার মস্তিষ্ক থেকে একটুও সরেনি। একই ভাবে গেঁথে ছিল। ”
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
“ আমাদের কথা একবারও ভাবলি না বাপ? গ্রামের মানুষ কি বলবে? দেড় বছর! দেড় বছর তো ঠিকই চুপচাপ ছিলি বাপ। আবার হঠাৎ কি হলো? কোন ভূত চেপেছিল যে মিথিকে বিয়ে করতে হলো? ”
“ ভূতটা আসলে অনেক বছে যাবৎ ই চেপেছে মামনি। তোমার ছেলের জন্য ভূতটাকে পাত্তা দিই নি। ”
“ আমার ছেলের জন্য? ”
হিমেল এড়িয়ে গেল এবার। বলল,
“ কিছু না। ”
“ ঐ মেয়ে কিভাবে ফাঁসিয়েছে বল বাপ? কি করেছে ও? ”
হিমেল ছোটশ্বাস ফেলে জানাল,
“ ও না, আমি ওকে ফাঁসিয়ে দিয়েছি মামনি। ”
” মজা করছি না তোর সাথে হিমেল। আমরা, আমরা কিন্তু এই বিয়েটা মানি না হিমেল। বুঝলি? ”
“জানি, কিন্তু আমার আম্মু মানে৷ ”
“ হু? ”
হিমেল চোখ বুঝে। শুধাল,
“ আমি বিয়ের সময়ও আমি আম্মুকে মনে মনে বলেছি। অনেকবার বলেছি।”
“ তোর আম্মু ও চাইত না এমন কাউকে তোর বউ করতে। চাইত না বুঝলি? ”
“ যে মানুষটাকে ভালোবাসি সে মানুষটাকেই পেয়েছি, খুশি হয়েছি। এইটুকুতে আমার আম্মু খুশি হতো না?”
” আমি কি তোর আম্মুর থেকে আলাদা? ”
হিমেল চুপ থাকে। কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
“ তুমিও আমার আম্মুর মতোই মামনি। কিন্তু আমার আনন্দ, সুখটা বুঝতেই চাও না মামনি। আমার আম্মু হলে তো মানত বলো? ”
ওপাশ থেকে মুহুর্তেই বলল,
“ হিমেল, আম্মুর মতোই মানে? আম্মু হয়ে উঠতে পারিনি? ”
হিমেল হাসে। বলে,
“ ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করছো মামনি? ”
মুহিবের আম্মু আর উত্তর করল না। হিমেল ফের ডাকল,

“ মামনি? ”
মুহিবের মা এর ঠিক কিছুটা পর বলল,
“ যা ইচ্ছে করো। যাকে ইচ্ছে তাকে বিয়ে করো, সংসার করো। কিচ্ছু বলব না। আমি তো তোমার মা নই হিমেল। আর কখনো কিছুই বলব না। ”
এর পরপরই কল রেখে দিল। হিমেল চেয়ে থাকল। অতঃপর মিথিরা কি করছে তা দেখার জন্য দরজায় উঁকি দিতেই মিথি মুহুর্তেই বলল,
“ কে কল দিয়েছিল হিমেল ভাই? ”
হিমেল ভেবেছিল মিথি শুনতে পাবে না। অথচ শুনেছে। হয়তো কথা গুলোও শুনেছে। নয়তো জিজ্ঞেস করত না। বলল,
“ মামনি। ”
“ ঝামেলা হলো নিশ্চয়? উনারা কষ্ট পেল অনেক তাই না? ”
এইটুকু বলেই উত্তরের অপেক্ষায় থাকল। অথচ হিমেল উত্তর করল না। মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। একটা পরিবার শেষ করে দিবে ও? বিধাতা তাকে এমন এক পর্যায়ে ফেলে নিজেও কিছু করতে পারছে না। টিউশনি গুলোও ছুটে যাবে নিশ্চয়ই। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। কত কি! মিথি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল যায় হোক হিমেল ভাই এর ঘাড়ে বসে থাকবে না আর। অনেক তো কষ্ট করেছে হিমেল ভাই, অনেক সাহায্য করেছে। তাই বলল,

”শুনুন হিমেল ভাই, আয়েশা খালাকে খবর দিয়েছেন? ”
“ খবর দিয়েছি। দুপুরের আগে আগে চলে আসবে বলেছে। ”
“ সত্যি দিয়েছেন? তাহলে আমি নিজের বাসায় শিফট হতে চাই হিমেল ভাই। ”
হিমেল মিষ্টির দিকে মনোযোগ দিল। কোলে তুলতে তুলতেই গম্ভীর মুখে বলল,
“ খবর দিয়েছি, কিন্তু সেপারেশনে যাচ্ছি না আমরা। একই বাসাতেই থাকব। বিয়ের পর স্বামী স্ত্রী একসাথে থাকলে সম্পর্কের উন্নতি হয়। ”
“এই উন্নতিটা না হলেই ভালো হিমেল ভাই। ”
এইটুকু বলেই ফের শান্ত গলায় বলল,
” আপনার পরিবারের সাথে কথা বলেছেন? শুধু শুধু একটা ছোট্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে অশান্তি হবে। ঝামেলা হবে, আপনার সাথে উনাদের সম্পর্ক নষ্ট হবে। তাও আমার জন্য। অপরাধী লাগবে না আমার নিজেকে? সাবিহা আপু আপনাকে এখনো ভালোবাসেন। কতোটা ভালোবাসেন তা উনার চোখের অসহায়ত্ব না দেখলে বুঝতেই পারবেন না। ঐ অসহায়ত্ব দেখলে আপনার নিজেরই মায়া হবে। ”
হিমেল হুট করেই আগের মতো গম্ভীর মুখ নিয়েই ঝুঁকে গেল। মিষ্টিকে কোলে নিয়েই মিথির মুখের সামনে ঝুঁকে রাশভারী স্বরে বলল,

“ মিথি, একবার আমার চোখের দিকে তাকা। ”
আকস্মিক এভাবে নিজের মুখের সামনে হিমেলের মুখটা ঝুঁকে যাওয়াতে মিথি মাথা পিছিয়ে নিল। হিমেল ফের গম্ভীরভাবে বলল,
“ কি হলো তাকা। ”
মিথি তাকাল এবারে। হিমেল আবার ও গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ আমার চোখের অসহায়ত্ব কখনো চোখে পড়েছে তোর? কখনো মায়া হয়নি এই চোখজোড়ায় ভাসা অসহায়ত্বের প্রতি? হয়েছে? ”
মিথি শুনল। অসহায়ত্ব? মায়া? মিথি তাকাল। অনেকটা সময় চুপ থেকে উত্তর করল,
“ যদি আপনার ভালোবাসাটা আমি বিয়ের আগে পেতাম, আমার অবিবাহিত জীবনে পেতাম তাহলে হয়তো আমি মূল্য দিতাম আপনার এই অনুভূতিটাকে হিমেল ভাই। এত যত্ন করা মানুষের প্রতি মানুষের এমনিতেই মায়া জন্মে, মুগ্ধতা জন্মায়। আমারও জন্মাত। কিন্তু এখন আমার গ্রহণ করার সুযোগ নেই হিমেল ভাই। আপনার মতো একটা মানুষের সুন্দর জীবন, সুন্দর পরিবার ধ্বংসের অপরাধ এবং দিনশেষে সমাজের দোষ নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও নেই। আমার মাঝে এখন আর অনুভূতিরাই নেই হিমেল ভাই। তবে মাঝে মাঝে ভাবি, আপনি হয়তো আরো আগেই আমার জীবনে আসলে আমার জীবনটা অনেক অনেক সুন্দর হতো। ”
হিমেল সোজা হয়ে দাঁড়াল। মিষ্টিকে কোলে নিয়ে যেতে যেতে বলল,

“ দেরি করে অনুভূতি জানানোর শাস্তি দিচ্ছিস? ”
“ না, বাস্তবতা দেখুন হিমেল ভাই। কয়জন অবিবাহিত ছেলে একটা বিবাহিত মেয়েকে বিয়ে করছে? আপনি আরো ভালো ডিজার্ব করেন। আরো অনেক ভালো একটা মেয়ে পাবেন জীবনে। হয়তো একটা ঘটনা আমাদের মধ্যে হয়ে গিয়েছে কিন্তু এটা..”
হিমেল পা থামাল। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ এটা? ”
“ এটা আমরা দুইজনেই ভুলে যাই বরং। একটা সুন্দর জীবন প্রাপ্য আপনার। এই সামান্য ঘটনাটা সেখানে বাঁধা হতে পারে না। ”
হিমেল মুখচোখ শক্ত হয়ে এল। কেমন স্থির, গম্ভীর! যেতে যেতে বলল,
“ তোর কাছে সামান্য হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে আমার লাইফের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। লাইফের সবচাইতে বেশি আকাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত ছিল মিথি। এত গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তকে শুধুমাত্র তোর জন্য ঠুনকো ভাবতে পারছি না। সরি। ”

দুপুরের একটু আগে আগেই আয়েশা খালা এসেছেন। উনাকে মিথিকে দেখতে বলেই হিমেল একটু বের হয়েছিল কিছু কেনাকাটা করতে। মিথির জামাকাপড়, মিষ্টির জামাকাপড় সাথে কিছু বাজার। এই ঘন্টা দুয়েক লাগবে বলেই বের হয়েছিল। এর মধ্যেই হিয়া এসেছিল। ফিজার থেকে কালই শুনেছিল সে মিথির সম্পর্কে। অতঃপর আজ এসেই এত এত কাহিনী শুনে বিস্ময় নিয়ে বলল
“ মিথি? মিথি? তুই সত্যিই বিয়ে করেছিস? তাও এই উদ্ভট লোককে? সত্যিই? কিন্তু আমি খুশি হয়েছি। আমি সত্যিই খুশি হয়েছি। অন্তত এই লোকটা অমানুষ হবেন না। ”
“ হিয়া,বিয়েটা একটা সিচুয়েশনে পড়ে করতে হয়েছে। আমি..”
“ কি? ”
মিথি এবার মুখ কাচুমাচু করে হিয়াকে বলল,

“ তুই আমায় কয়কটা দিন হেল্প করবি হিয়া? এই তিন চারদিন। পড়ালেখার ক্ষতি হবে তোর? পা টা একটু ভালো হলেই চলে যাস নাহয়। উনার ঘাড়ের উপর কেমন পড়ে আছি আমি। উনার পরিবার চান না জেনেও সেদিন বিয়েটা করে ফেলেছি। এখন নিজের উপর বিরক্ত লাগছে। সেদিন বোধহয় নিজের চরিত্রে দোষ নিয়ে হলেও বিয়েটা আটকানো উচিত ছিল হিয়া। ”
হিয়া শুনল। বলল,
“ থাকতে পারব। কিন্তু সে তো ভালোবাসে তোকে। এতগুলো দিন নিশ্চয় অভিনয় করবে না? ”
” উনার ভালোবাসা নিয়ে সংশয় করছি না আমি হিয়া । আমি জীবনে কাউকে জড়াইতেই চাইছি না।আমার আর ইচ্ছে নেই। ”
হিয়া বুঝানোর ন্যায় বলল,
“ কিন্তু জড়িয়ে তো গিয়েছিস মিথি। তোর জীবনটা সুন্দরভাবে গোছানোর জন্য হলেও এমন কাউকে প্রয়োজন। মিষ্টির জীবনটা ভালোভাবে গোছানোর জন্যও কাউকে প্রয়োজন এমন। উনাকে আমার সত্যিই পছন্দ হয়েছে। কোন মেয়েকে অসম্মান করেন না। ”

“ এ ঘটনাকে নিয়ে জীবনে পড়ে থাকব? একটা পরিস্থিতি ছিল কেবল। উনার দিকটাও ভাবা উচিত হিয়া। কেমন স্বার্থপর হয়ে ভাবছিস তুই। আমার মেয়ে? আমার মেয়ে বড় হয়ে কি জানবে? তার মা তার কথা না ভেবে দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলেছে? ”
“ প্রাণের কথা ভাবছিস না কোথায়? আমি তো দেখছি ঐ মানুষটাও প্রাণকে নিয়ে ভাবে মিথি। ”
মিথি আর শুনতে চাইল না। কথা থামাতে বলল,
“ হিয়া? এসব রাখ বরং। একটু সাহায্য কর। আমায়, আমায় একটু উপর তলায় শিফট হতে সাহায্য কর। প্লিজ।”
“ আচ্ছা, কিন্তু উনাকে একবার বলা উচিত না? ”
“ দিবেন না উনি। বলে লাভ নেই। ”
“ তবুও বলা উচিত না? ”
“ পরে, পরে বলে দিব অবশ্যই হিয়া। ক্ষমাও চেয়ে নিব দরকার হলে এভাবে না বলে যাওয়ার জন্য। ”
অতঃপর মিথি সত্যিই হিয়ার সাহায্য নিয়ে নিজের বাসায় পৌঁছাল। মিষ্টিকে কোলে নিয়ে এনে দিলেন আয়েশা খালা। আসতে আসতে বললে,
“ হিমেল আব্বায় বড্ড কষ্ট পাইবেন দেইখো। যে ভালোবাসে মিথি আম্মাকে।”

হিমেল দুই ঘন্টা বললেও এক ঘন্টা বিশ মিনিটেই ফিরে এল। অতঃপর এসেই দেখা গেল মিথি নেই। উধাও!মিষ্টিও নেই। বুঝে না উঠে পুরো বাসা খুঁজতেই দরজার সামনে দেখা গেল আয়েশা খালাকে। অতঃপর উনার থেকেই শুনলেন সবটা। তারপর হিমেল কেবল এইটুকুই বলল,
“ বাহ! বাহ! খুব ভালো। ”
অতঃপর তার একটু পরই মুখচোখ শক্ত করে ব্যাগে নিজের কিছু জামাকাপড় নিল। ধুপধাপ পা চালিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সোজা মিথির বাসাতেই গেল। কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলল হিয়া। হিমেল একটুও তাকাল না, কথাও বলল না। সোজা পা চালিয়ে মিথি কোথায় আছে তা দেখল। তারপর মিথির চোখে পড়তেই মিথি মলিন স্বরে বলে উঠল,
” হিমেল ভাই, আপনাকে না বলে চলে আসার জন্য সরি। কিন্তু ওভাবে আপনার বাসায় থাকাটাও সুন্দর দেখাচ্ছিল না। ”
হিমেল শুনল। খুব আয়েশ করে একটা চেয়ার টেনে পায়ে পা তুলে বসল। অতঃপর কাঁধের কাপড়ের ব্যাগটা এক জায়গায় ছুড়ে রেখে বলল,

“ হু? সমস্যা নেই। তোর বাসায় আমার থাকাটা অবশ্য সুন্দর দেখাবে মিথি।বল? ”
মিথি চোখ ছোট ছোট করে বলে,
“ মানে? ”
হিমেল হাসল। ঠোঁটজোড়া একটু বাঁকিয়ে শুধাল,
“ আপাতত আমার এক ব্যাগ জামাকাপড় এনেছি। জিনিস পত্র কাল শিফট করে নিব। বিয়ে করেছি, একা একা থাকা তো মানায় না বল? ”
মিথি কেমন করে তাকাল। বলল,
“ হু? কিসব বলছেন? ”
“ কিসব বলছি? এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? ”
“ আপনি কেন আমার বাসায় থাকবেন? ”
“ কারণ তুই আমার বাসায় থাকছিস না।স্বামী স্ত্রী দুইজন দুই বাসায় থেকে বাসা ভাড়া দিয়ে টাকা অপচয় করার মানে হয়? ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৬

মিথি শুনল। বিনিময়ে কি বলবে ভেবেই পেল না। হিমেল তাকাল। মিথিকে ভাবতে দেখে বলল,
“ এখন তো চরিত্রে দোষ পড়বে না তোর, তাই না? স্বামী হই এখন। এক বাসায় থাকতে পারব। তাই একা একা আর আলাদা আলাদা বাসায় থাকার কোন দরকারই তো দেখছি না। ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৪৮