বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৯
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
“ হিমেল ভাই আমাকে রেখে এভাবে যেতে পারেন না আয়মান ভাই। কিছুতেই না। আমার সাথে উনি এমনটা করতে পারেন না। আপনি জিজ্ঞেস করুন। ভালো করে জিজ্ঞেস করুন। ওটা মিথ্যে। ”
মিথি ভেতরে ভেতরে গুড়িয়ে যাচ্ছিল হয়তো অজানা ভয়ে,আশংকায়। আবার একইভাবেই দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বসে আছে যে হিমেল তাকে একা রেখে যেতে পারে না। কিছুতেই না। হিমেল ভাই এমনটা কি করে করবে হ্যাঁ? মিথিকে এভাবে অবহেলায় ফেলে রেখে চলে যাবে? মিথি চোখ বুঝে। শেষবারের হিমেলের মুখটুকু মনে করার চেষ্টা করে। বাসের ঐটুকু জায়গায় মানুষটা কতোটা হুড়মুড় করে তাকে আগলে নিয়ে জড়িয়ে ধরেছিল বুকের মধ্যে। যাতে মিথির উপর কোন আঁচ না আসে ঐজন্যই ঝাপটে বাচ্চার মতো করে জড়িয়ে নিয়েছিল একমুহুর্তে। তার পরমুহুর্তেই একটা ধাক্কা! মিথির আবছা মনে পড়ে ছিটকে যাওয়ার আগ মুহুতে হিমেল ভাই বাসের কিনারায় আঘাত পেয়েছিলেন বোধহয়। ঝরঝর করে রক্ত গড়িয়ে এসেছিল মুহুর্তেই। এরপর? এরপরেই মিথি ছিটকে গেল কোথাও। তারপর জ্ঞান ফিরে আর আর মানুষটাকে দেখলই না। একবারও না। অথচ ঐ মানুষটিই তীব্র আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও মিথির হাত আঁকড়ে রাখার চেষ্টা করছিল। পারলে হয়তো মিথিকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে নিজের বুকের ভেতরই ডুকিয়ে নিত মানুষটা। মিথি মনে করে। বারবার মনে করে। বলল,
“ আয়মান ভাই, আরেকবার কল করুন না। জিজ্ঞেস করুন না আরেকবার। আমি নিশ্চিত ওটা আপনার বন্ধু নয়। উনি ভুল বলেছেন নিশ্চয়। একবার জিজ্ঞেস করুন না আয়মান ভাই। ”
কতোটা আকুতি। সাধারণ সময়ে মিথির এখন আকুতি মিনতি আয়মান সত্যিই দেখেনি। প্র্যাগন্যান্ট থাকা অবস্থাতে একা একা বেঁচে থাকাকালীন সময়েও আয়মান এমন করুণ রূপ দেখেনি। অথচ আজ এই মিথিরই এই রূপ দেখে আয়মান চোখ বুঝে। তার বন্ধুটা এই মেয়েটার ভালোবাসা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। বিশ্বাস করত যে, এই মেয়েটাও তাকে কোন না কোন সময় ভালোবাসবে। বাসল তো! কিন্তু তার বন্ধুটি নেই আজ। আয়মান চোখ খুলে। কোনভাবে নিজেকে স্থির রেখে বলল,
“ ও ভুল বলেনি মিথি। ওটা হিমেল। আমি ওকে স্পষ্টই রুম নং বলর এসেছিলাম খেয়াল রাখতে। নিজেকে মানাও মিথি। যাকে জীবিত অবস্থায় ভালোবাসা দাওনি, তাকে নাহয় তার অনুপস্থিতিতেই ভালোবাসো। ক্ষতি কি বলো?
মিথি এরপর আর একটা কথাও বলল না। নিশ্চুপ বসে থাকল কেবল। কান্নারা আর আসে না তার। স্থির, একদম স্থির হয়ে গেল মেয়েটা। হিমেল ভাই সত্যিই এটা করল? কেন করল? মিথিকে শাস্তি দিল, তাই না?
একটা সাদা কাপড়ে ঢাকা হসপিটালের ফ্লোরটায় খুব অবহেলায় পড়ে আছে একটা নিথর দেহ। আয়মানরা আসতে আসতে এইতো পনেরো বিশ মিনিট লাগল হয়তো। এসেই প্রথমে দেখা গেল ডক্টর সাইমুনকে। আয়মানের পরিচিত এক ছোট ভাই৷ আয়মান এগোতে পারছিল না যেন যখন সাইমুনের পেছনে ঐ সাদা কাপড়ের ঢেকে থাকা অংশটুকু দেখা গেল। আবার মিথিকেও সামলাতে পারছিল না সে। মিথিটা হুট করেই কেমন নিস্ত্বব্ধ নিরব সরোবরের মতো স্থির হয়ে গেল। যেন পথ চলার আর কোন ইচ্ছে নেই। দৃঢ়, ঘুরে দাঁড়ানো মিথি এমন নিস্তেজ রূপ বোধহয় আয়মান আশাও করেনি। আয়মান ছোটশ্বাস ফেলে। মিথিকে সবটা সামাল দিতে পারার জন্য আগে আগেই সবটা বুঝিয়ে দিতে ডাকল,
“ মিথি? শুনছো? ”
মিথি চাইল। জবাবে জানাল,
“ হু। ”
“ আমি জানি এটা মেনে নেওয়া সহজ নয় মিথি। নিজেকে শক্ত করো। জানো মিথি? তোমাকে দেখতে যাওয়ার আগ অব্দিও আমি ভেবেছিলাম আমার বন্ধুটা থাকবে। এইতো আমি ওর অপারেশনের জন্য সইস্বাক্ষর সব করলাম। চোখের সামনে ওটিতে নিয়ে গেল। অপারেশন হলো। আমি তো ভাবলাম আমার বন্ধুটা বেঁচে থাকবে মিথি। জানতাম ওর জ্ঞান ফিরতেই ও তোমার খোঁজ করবে। তাই তো ছুটতে ছুটতে গেলাম ঐ হসপিটালে। কিন্তু কি হলো? আমার বন্ধুর জ্ঞান ফেরার আগেই তো চলে গেল। সব ছেড়ে চলে মিথি। ”
মিথি সবটা শুনল কেবল। উত্তর করল না একটাও। শুধু বিড়বিড় করল,
“ হিমেল ভাই, খুব দায়িত্বশীল না আপনি? এই আপনার দায়িত্ব? রেখেই তো চলে গেলেন আমাকে। তাহলে এসেছিলেন কেন মাঝপথে? হাত ধরে পাশে থাকার এই সময়টুকু কেন দিলেন? আপনার অভ্যাসে কেন অভ্যস্থ করলের হিমেল ভাই? আমি এখন কিভাবে বাঁচব? অস্থিরতায়, যন্ত্রনায় ছটফট করাতে চেয়েছিলেন তাই না? আপনার একপাক্ষিক ভালোবাসার যন্ত্রনাটা আমারও হোক চেয়েছিলেন, তাই না? তাই তো হলো। তাই তো! আপনি বলেছিলেন না আমি আপনার জীবনে বসন্তের প্রথম সুর হয়ে যেমন এসেছিলাস ঠিক তেমনই বিষাদের গাঢ় রেখাও এঁকে গিয়েছিলাম? আজ আমিও বলছি, আপনি আমার জীবনে বসন্ত যেমন ঠিক তেমনই বিষাদ হয়েও রয়ে গেলেন হিমেল ভাই। আমার জীবনেও বিষাদ এবং বসন্ত উভয়ই আপনি।”
মিথির গলার স্বর কাঁপছে। পা জোড়া সামনের এগোনোর যেন শক্তিটুকুও নেই তবুও বাড়াচ্ছে পা। চোখ মুখ ফোলা হয়ে আছে। আয়মান ছোটশ্বাস ফেলে ওর এমন হাল দেখের।পা বাড়িয়ে যেতেই সাইমুন এসে বলল,
“ ভাই, এসেছেন? আপনার বন্ধুকে আমরা সত্যিই বাঁচানোর চেষ্টা করছিলাম ভাইয়া। পারিনি, শেষ অব্দি আর রাখতে পারিনি তাকে। ”
আয়মান ছোটশ্বাস ফেলে ধরা গলায় জানাল,
“ বুঝেছি সাইমুন। তোমার দোষ নেই। হিমেল কোথায়? আই মিন, হিমেলের…”
বাকিটুকু আর আসল না মুখ দিয়ে। গলা আটকে এল। সাইমুন ততক্ষনে হাত বাড়িয়ে সামনে সাদা কাপড়ে ঢাকা পড়ে থাকা দেহটা দেখিয়ে দিল। একটা হাত খুব অবহেলায় বেরিয়ে আছে। মিথি একটু একটু করে এগোল। একদম ধীরস্থির ক্লান্ত ভাবে এগোতে এগোতে সে নিষ্প্রভ স্থির এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকল কেবল। অতঃপর নিথর দেহটার সামনে এসেই হুট করেই উপড় হয়ে পড়ল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করল,
“ হিমেল ভাই? শুনতে পারছেন আমার কথা? আমি.. আমিও আপনাকে… ”
অতঃপর থেমে গেল। হয়তো এটাই বলত যে সেও হিমেলকে ভালোবাসে। কিন্তু যে কথা হিমেল জীবিত অবস্থায় থাকলে অধিক খুশি হতো সে কথা মৃত্যুর পর বললে খুশি হবে? মিথি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। চোখ ঘুরিয়ে যখন সাদা কাপড় বেরিয়ে আসা হাতটার দিকে চাইল ঠিক তখনই দেখা গেল হাতটা ফর্সা মতো। উজ্জ্বল বর্ণের। অথচ মিথির হিমেল ভাই তো শ্যামপুরুষ।এটা নিশ্চয় হিমেল ভাই নয়? মিথি মুহুর্তেই তাকাল। আয়মানের দিকে চেয়ে হুট করেই বলল,
“ আয়মান ভাই? এই, এইই.. হিমেল ভাই নয় আয়মান ভাই। আমাকে হিমেল ভাইয়ের কাছে নিয়ে চলুন না। ”
মিথি যেন বহু কষ্টে বলল এইটুকু। গলা আটকে আসল মেয়েটার। নিঃশ্বাস যেন আটকে আসে। মিথি মনে মনে শুধু এইটুকুই বিড়বিড় করল,
“ এটা ভুল। এটা ভুল তো হিমেল ভাই। আপনি নন তো এটা। হিমেল ভাই? হিমেল ভাই আমার জন্য হলেও প্লিজ থাকুন না হিমেল ভাই। আমি শেষবার, শেষবার চাইছি একটা সুযোগ। আমায় এই সুযোগ দিন না হিমেল ভাই। কথা দিচ্ছি, আপনাকে অবহেলা করব না। আপনার ভালোবাসারও এইটুকু অবহেলা করব না হিমেল ভাই। আমায়, আমায় দয়া করে এই আজীবনের যন্ত্রনাটা উপহার দিবেন না হিমেল ভাই। আমি আপনাকে চাই হিমেল ভাই।আপনার অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়া আমার জন্য খুব সহজের নয় হিমেল ভাই। আমি আপনার অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে চাই ও না। ”
মিথির চোখ টলমল। পানি না গড়ালেও কান্না আসবে আসবে। মিথি ঠোঁট কাঁমড়ে বোধহয় কান্না আটকানোর চেষ্টা চালায়। আয়মান ততক্ষনে ভ্রু কুঁচকাল। মিথির কথা বুঝে না উঠতেই মিথি ফের সামনে ফিরল। মনে মনে বারংবার বলল,
” আল্লাহ হিমেল ভাইকে নিও না আমার থেকে। নিও না। আমার তো কেউ নেই।অন্তত যে মানুষটার অভ্যাসে এতদিন অভ্যস্ত হলাম সে থাকুক না আল্লাহ? নিও না প্লিজ। এই মানুষটা অন্য কেউ। অন্য কেউ তো। আমার হিমেল ভাই না । হিমেল ভাইকে সুস্থ রাখো, দয়া করে আমার জন্য হলেও সুস্থ রাখো আল্লাহ। একটু দয়া করো। ”
এগুলো বলতে বলতেই কাঁপা হাতে হাত বাড়াল মিথি। শরীরর কাঁপছিল মেয়েটার। কোনরকমে কাঁপা কাঁপা হাতে সাদা কাপড়টা মুখ থেকে সরাতেই চোখে পড়ল একটা উজ্জ্বল বর্ণের সুন্দর মুখশ্রী। হয়তো হিমেল ভাইয়ের মতোই কারোর না কারোর প্রিয়তম পুরুষ। হয়তো কারোর খুব ভালোবাসার মানুষ। অথচ সে মানুষটিই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছে কতোটা নিঃশব্দে। মিথি চাইল। কাঁপা শরীরে, মিনমিনে চোখে এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে দ্রুতই ফিরল আয়মানের দিকে। এতক্ষন ধরে আটকে রাখা কান্নাটা এবার আহাজারি করা কান্নায় রূপান্তর হলো। বলল,
“ দেখুন আয়মান ভাই, উনি হিমেল ভাই নয়। হিমেল ভাই না তো উনি। হিমেল ভাই নিশ্চয় সুস্থ আছেন, ঠিক আছেন। উনি ভুল বলেছেন। দেখলেন তো? ভুল বলেছেন উনি। হিমেল ভাই কিছুতেই মিথিকে একা রেখে যেতে পারে না। যে হিমেল ভাই মিথিকে আগলে নেওয়ার জন্য এত কিছু করলেন সে হিমেল ভাই মিথিকে এভাবে ফেলে চলে যেতে পারেনই না। দেখলেন তো? প্রমাণ হলো? ”
একইভাবে আয়মানেরও চোখ গড়িয়ে পানি পড়ল। স্থির, বিমূঢ় হয়ে চেয়ে থাকল সাদা কাপড়ে মোড়ানো মানুষটার মুখের দিকে। না, এটা তার বন্ধু নয়। আল্লাহ তার বন্ধুকে নেয় নি। নেয়নি! আয়মান ফুফিয়ে কাঁদে। মিথিকে বোনের মতোই আগলে নিয়ে বলে,
“ না, আমার বন্ধু নয় এটা মিথি। বন্ধু নয়। এই প্রথম, এই প্রথম আমার মনে হচ্ছে আমি খুব বড়কিছু জিতে নিয়েছি মিথি। অনেক বড়কিছু!”
সাইমুন এই হসপিটালেরই ইন্টার্ন ডক্টর। স্বভাবতই ব্যস্ত ছিল ছেলেটা। তার মধ্যে এক্সিডেন্টের মতো এমন একটা ক্রাইসিসে অনেক রোগীই এডমিট হয়েছে। যার কারণে ইন্টার্ন ডক্টর হয়েও বেশ দৌড়াদৌড়ির উপরই ছিল ছেলেটা। ব্যাক্তিগতভাবে হিমেলের সাথে পরিচয় না থাকলেও আয়মানকে সে চেনে। সে সূত্রেই আয়মান মিথিকে দেখতে যাওয়ার সময় সাইমুনকে দেখতে পেয়েই বন্ধুর খেয়াল রাখতে বলেছিল।হিমেলকে অপরেশনের পর যখন রুমে দেওয়া হলো তার একটু পরই আয়মান বের হয়েছিল।সাইমুন অবশ্য তখনও হিমেলকে চেনে না। আয়মান যাওয়ার সময় সাইমুনকে দেখেই দোতালার বামদিকের সে রুম নং টা বলে বলেছিল বন্ধুর আপডেট জানাতে। সাইমুনও কখনো হিমেলকে দেখেনি। ব্যস্ততার মাঝে একবার দোতালায় গিয়ে ওখানকার নার্সদের ঐ রুমের প্যাশেন্টের কথা জিজ্ঞেস করেছিল প্রথমে। জানাল অবস্থা মোটামুটি ভালো, তবে জ্ঞান ফেরেনি। তার ঠিক পনেরো- বিশ মিনিট পর আবার যখন গেল দোতালায় ঠিক তখনই সে রুম খুঁজে রুমের সামনে গেল। আর তখনই জানা গেল প্যাশেন্ট মারা গেছে। মূলত হিমেল যে রুমে, যে বেডে ছিল ওখানেই পরবর্তীতে এই ছেলেটাকে রাখা হয়েছিল যে মারা গিয়েছে। মোটামুটি বয়সে আয়মানের বয়সীই এবং রুম নং, বেড সব একই হিসেবেই সাইমুনও ভেবে নিয়েছিল এই ছেলেটাই হিমেল। অর্থ্যাৎ, আয়মানের বন্ধু। কিন্তু হিমেলের বেড তার আগেই চেঞ্জ হয়েছিল। অন্য রুমে শিফ্ট করা হয়েছিল হিমেলের কিছু জটিলতার কারণেই। আর এই বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার পর থেকেই সাইমুন বার কয়েক সরি বলেছে। বিচারার নিজেরও খারাপ লাগছে এমন একটা ভুলের জন্য। তারপর নিজ দায়িত্বেই হিমেলের রুম নং খুঁজে দিয়েছে।
হিমেলের একটু আগেই নাকি জ্ঞান ফিরেছিল। অথচ ছেলেটা জ্ঞান ফিরে কাউকেই দেখেনি। না বন্ধুকে , না মিথিকে আর নাতো আপন কাউকে। জ্ঞান ফেরার পরই নাকি ছটফট করছিল ছেলেটা। অস্থির দেখাচ্ছিল বেশ। এমনটা ভালো নয় বলেই ঘুমের ঔষধ দেওয়া হয়েছিল। মিথি পাশে বসেই স্থির চাহনিতে শুধু হিমেলকে দেখে যাচ্ছিল। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো, ক্লান্ত মুখশ্রী, কপালের দিকটায় চুল লেপ্টে থাকা আর মাথায় ব্যান্ডেজ। কেমন যেন মায়া মায়া মুখটা এই শ্যামপুরুষের। মিথি ওভাবেই চেয়ে থাকে। অস্থিরতা? জ্ঞান ফেরার পর এই অস্থিরতাটা নিশ্চয় মিথির জন্য ছিল? মিথির চোখ গড়িয়ে পানি পড়ে। আসলেই কি এতোটা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য সে? আসলেই?
ফিজা মিষ্টিকে নিয়ে হসপিটালে এসেছিল মিথিরা আসার একটু পরই। ফোনে এমনটা শুনে সেও ভেঙ্গে পড়েছিল। কিন্তু হসপিটালে ফিরেই এমনটা শুনে খুশি হয়েছিল বেশ। যে ফিজা একটা সময় ছোট মিষ্টির কান্নায় বিরক্তবোধ করত সে ফিজাই আজ পুরোটা সময় মিষ্টিকে কোলে রাখল, সামলাল মিথির অবস্থা বুঝে। মিথি উঠে দাঁড়ায় ততক্ষনে। ফিজার কাছে গিয়ে ক্লান্ত স্বরে বলে,
“ ফিজা আপু? মিষ্টিকে দাও।আমি নিই। ”
“ আমিই নিই। কান্না করলে দিব তোমায় মিথি। তুমি বরং হিমেল ভাই এর কাছে থাকো। ”
এরপর ফিজা আবারও রুম থেকে বেরিয়ে মিষ্টিকে নিয়ে হাঁটল। মিথি হিমেলের কাছেই ঠাঁই বসা।অনেকটা সময় হিমেলকে দেখতে দেখতেই মিথি ছোটশ্বাস ফেলল। বলল,
“ এই অপেক্ষা খুব দীর্ঘতম অপেক্ষা হিমেল ভাই। কখন চোখ খুলবেন? আমি আপনার জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করছি। অস্থির লাগছে। অপেক্ষা করাটাও কি যন্ত্রনার, দেখুন না। ”
এইটুকু বলেই ফের চাইল মিথি। হিমেলের কানের সামনেই মুখ এনে ফিসফিস স্বরে বলল,
“ আপনাকে জানানো হয়নি বহু কথাই। শুনুন, আমি আপনার যত্নে, ভালোবাসায়, বিশ্বাসে এবং সম্মানে জড়িয়ে গিয়েছি হিমেল ভাই। একটু একটু করে নিজেকে জড়াতে জড়াতে বোধহয় আপনাকে ভালোও বেসে ফেলেছি। ভাবুন,আমি কি পরিমাণে নিজেকে অভ্যস্ত করেছি যে আপনাকে ছাড়া আমি আমার জীবন কল্পনা করতে পারছি না। আপনি চোখ মেলছেন না কেন? আমার অনেক কিছু বলার আছে তো হিমেল ভাই।চোখ মেলুন না, একটাবার শুনুন। ”
মিথি এইটুকু বলতেই বলতেই উঠল। ঝুঁকে কপালের দিকে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সযত্নে সরিয়ে দিতে দিতেই বলল,
“ আমার জীবন থেকে কখনো সরে যাবেন না হিমেল ভাই। কখনো না। আমি মেনে নিতে পারব না। ”
এইটুকু বলেই প্রথমবারের মতো মিথি নিজের ঠোঁটজোড়া ছোঁয়াল হিমেলের মাথার ব্যান্ডেজের নিচে কপালের অল্প অংশটুকুতে। বলল,
“ আমার কান্নারা, আমার অপেক্ষারা সব আপনার প্রতীক্ষায় হিমেল ভাই। শীঘ্রই আমার প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আপনার ভালোবাসায়, অনুভূতিতে অধিকার দেখানোর সুযোগ দিবেন না? ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৮
মিথি তখনও হিমেলের বেশ কাছাকাছিই। ওভাবেই ঝুঁকে থাকা। মুখের ঠিক অল্প উপরেই মিথির মুখ।ঠোঁটজোড়া তখনই কপাল ছুঁয়ে যাচ্ছিল কথা বলার সময়ে। ঠিক সে সময় চোখ খুলে চাইল হিমেল। প্রথমবারে চোখ মেলে নিজের প্রিয় নারীকে দেখতে পেলেও এবারে দেখা মিলল মেয়েটির। হিমেল তাকায়। ওভাবেই চেয়ে থাকে স্থির দৃষ্টিতে। মেয়েটার চোখমুখ ফুলে আছে কেমন! চুল এলোমেলো। কপালের দিকটায় আঘাত পাওয়ার কালশিটে দাগ পড়েছে।ওভাবেই সব পরখ করছিল হিমেল, অথচ তখনও কথা বলে উঠতে পারছিল না। নয়তো এক্ষুনিই বলত,
“ মিথি, আমার এত কাছাকাছা কিভাবে তুই? এটা তুই? আদৌ তুই নাকি তোর ভূত? ”
