বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬২
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
হিমেল পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে এইতো সপ্তাহ খানেক আগেই। অফিসেও জয়েন করেছে কয়েকদিন হলো। আজও গিয়েছে। মিথি এই কয়েকটাদিনে হিমেল অফিস যাওয়ার পরই দিনে দুই দিনবার করে কল করেছে। খোঁজ নিয়েছে। খাবার খাওয়ার জন্য, সাবধানে চলার জন্য, সাবধানে বাসায় ফেরার জন্য আরো কত কি । হিমেল শুধু হাসে। অর্ধেকটা সময় মিষ্টির সাথে বকবক করলেও যেটুকু সময় মিথি কথা বলে মিথির এই খোঁজ নেওয়া দেখে হিমেলের বোধহয় ভালোই লাগে। হিমেল ঘড়ি দেখছিল। আর একটু পরই লাঞ্চ আওয়ার। উঠেই প্রথমে মিথিকে কল করবে করবে ভাবতেই ঠিক মিনিট দুয়েক পরই ফোনে কল এল। আগে হলো হিমেলকে তাকিয়ে দেখতে হতো কে কল করেছে। তবে আজ দেখল না সে। এই কয়েকদিনের অভ্যাসে হিমেল এইটুকু জানে যে এটা মিথিই হবে। ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি নিয়ে ফোনটা কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভারী আওয়াজ ভেসে এল,
“ হিমেল, বের হবো আজ সন্ধ্যায়। বের হোস হুহ? ”
গলাটা আয়মানের। অসুস্থতা, সমস্যা এই নিয়ে বন্ধুর জন্যই আয়মান বিয়েটা পিঁছিয়েছিল। এইতো পরশুই আয়মান আর ফিজার বিয়েটা। হিমেল মাথা নাড়িয়েই বলল, বের হবে। এরপরও দুই বন্ধু বহু হাবিজাবি বকবক করল প্রায় মিনিট পনেরো নিয়ে। অতঃপর আয়মান কল রাখতেই হিমেল ছোটশ্বাস ফেলেই পরমুহুর্তে কল দিল মিথিকে। মিথি কল তুলতে সময় নিল না। প্রথমেই বলল,
“ ওয়েটিং এ ছিল। এতক্ষন কথা বলছিলেন? ”
হিমেল শুনল। কেন জানি হাসিই এল সর্বপ্রথম। মিথি আজকাল অধিকার দেখায়। খোঁজখবর নেয়। আবার তদারকিও করে। হেসেই বলল,
“ না, প্রেমালাপ করছিলাম। ”
“ কার সাথে? ”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উল্টোদিক থেকে পাওয়া প্রশ্নে হিমেল চোখ বুঝল নিঃশব্দে হেসে। জানাল,
“ কার সঙ্গে বললে খুশি হবি? ”
মিথি তখন চুপ রইল হুট করেই। তারপর প্রায় মিনিটখানেক চুপ থেকে উত্তর করল,
“ পনেরো- ষোলো মিনিট যাবৎ কথা বললেন। কার সাথে বলছিলেন? ’
“ সন্দেহ করছিস নাকি বউদের মতে করে? ”
ওপাশ থেকে এবারও মিনিটখানেক নিরবতা ভেসে এল। বলল,
” প্রেমালাপ করতে যে পারবেন না সেটুকু জানি আমি। কিন্তু কি কথা বলছিলেন এতোটা সময়? খেয়েছেন?”
“ এইতো লাঞ্চ আওয়ার শুরু হলো।খেয়ে নিব। মিষ্টি কি করে মিথি? তোরা খেয়েছিস? ”
মিথি এবার বোধহয় ফোনটা মিষ্টির সামনে ধরল। ওপাশ থেকে আদুরে বাচ্চা একটা স্বরে মিষ্টি বলে উঠল,
“ হিম, কেয়েছো? ”
হিমেল হাসল। উত্তর দিল,
“ এইতো আম্মু, খেয়ে নিব। আপনি আর আপনার আম্মু খেয়েছেন? ”
মিষ্টি বাধ্যগত মেয়ের মতো উত্তর করল,
“ কাচ্ছি হিম। আম্ মু ও কাবে। তুমিও কেয়ে নাও। ”
হিমেল হাসল স্নিগ্ধ চাহনিতে চেয়ে। হৃদয়ের কোথাও বোধহয় শান্তি শান্তি অনুভব হচ্ছিল একটা। অবশেষে তার একটা সংসার, একটা ভালোবাসার ঘর আর সুখের প্রাপ্তি। হিমেল বেশ হেসেই এবার কল রাখল। মিথি ততক্ষনে রান্নাঘরে গেল মেয়ের জন্য সবজি টুকু নিতে। ঠিক ঐ সময়টুকুতেই হিমেল ফের ভিডিও কল দিল। মিষ্টি বাচ্চা হলেও এতদিনে কল কিভাবে রিসিভড করে তা শিখেছে । ছোট্ট ছোট্ট আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করে কল রিসিভড করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল হিমেলের মুখটা। অন্যপাশে হিমেলের ফোনেও ফুটে উঠল মুখে খাবার লেগে থাকা মিষ্টির মুখটাও। কি মিষ্টি মুখটা। একদম মিথির মতো। হিমেলের তাকিয়েই হাসে। দু দুটো মিথিফুল! অথজ দুইজনের মুগ্ধতাতেই হিমেল এতোটা কঠিন ভাবে আটকেছে যে মুগ্ধতা সময়ের সাথে কেবল বেড়েছেই। তাকালেই ইচ্ছে হয় মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে। হিমেল সে মুগ্ধতা নিয়েই হাসল। মিষ্টির সাথে টুকটাক আরো বহু কথা বলে গেল। অতঃপর তার একটু সময় পরই স্ক্রিনে মিষ্টির পিছনেই দেখা গেল মিথিকে দরজা পেরিয়ে আসতে। গোলাপি রংয়ের একটা কামিজ পরনে, চুলগুলো আলগোছে খোঁপা আর হাতে খাবারের প্লেট। বোধহয় ভাত মাখাচ্ছিল মিষ্টিকে খাওয়ানোর জন্য। হিমেল স্থির শান্ত চাহনিতেই তাকিয়ে দেখছিল কেবল। মিথি ঠিক তখনই মাথা তুলে চাইল। ফোনের স্ক্রিনে খুব মনোযোগী হয়েই তাকিয়ে থাকা হিমেলকে মুহুর্তে দেখেই ভ্রু কুঁচকে নিল। ঠিক পরমুহুর্তেই ছিটকে সরে গেল অন্যপাশটায়। গায়ে ওড়না রাখেনি গরমে। মেয়েকে পিছুপিছু ছুটে খাওয়াতে হয় বলেই একপাশে খুলে রেখেছিল। অথচ ভিডিও কল যে এসেছে সেই বুঝেই উঠল না? মিথি ছোটশ্বাস ফেলে পাশ থেকে বামহাতে ওড়না নিয়ে দ্রুতই জড়াল শরীরে। হিমেল শুধু তা দেখে নিঃশব্দে হাসল। জানাল,
“ আম্মু? তোমার আম্মুকে বলিও খেয়ে নিতে। হিম খেয়ে নিব এখন। হুহ? ”
মিষ্টি বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ে। অতঃপর ওভাবেই ফোনটা ধরে রেখে হিমেলকে দেখতে দেখতে হাজারটা কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ করল। হিমেলও ওভাবেই ভিডিও কলে থেকেই খাবার খেতে নিল। মাঝে একবার মিথিকে বললও,
“ খাবি না নাকি? খাবার আন। খাওয়া শেষ কর এক্ষুনি। ”
মিথি শুনল। অতঃপর উঠে খাবার আনতে যেতে যেতেই হিমেল ফের আবারও বলল,
“ আজকে তো অনেককিছু দিয়ে দিয়েছিস টিফিনে। এত খাবার খাবে কে? আমি পারব? ”
মিথি শুধু ঘাগ বাঁকিয়ে চাইল। বিছানার উপর পড়ে থাকা ফোনের স্ক্রিনে চোখ ফেলে বলল,
“ স্বাদ হয় নি? তাড়াহুড়ো হয়েছিল রান্নার সময় তাই বোধহয়। ”
হিমেল এবারে নাক কুঁচকাল। উত্তর দিল,
” একটুও স্বাদ হয়নি। এসব কি রান্না করেছিস? ছিঃ ছিঃ! ”
মিথি বড় আহত নজরেই চাইল। সত্যিই স্বাদ হলো না? অথচ এতোটা বাজে রান্নাও তো মিথি করে না৷ চোখ ছোট ছোট করে তাকাতেই ফের আবার বলল হিমেল,
“ শীঘ্রই যা, খাবার এনে এই বিচ্ছিরি খাবার টেস্ট কর। ”
মিথি গেল। অতঃপর প্লেটে খাবার বেড়ে এনে ওভাবেই একপাশে চেয়ার টেনে বসে খাবার খেল। কোথায়? খাবার তো বিস্বাদ হয়নি। অপরপাশে হিমেলও এই খাবার বিস্বাদ বলে বলেই পুরোটা খাবার শেষ করল। অতঃপর শেষে শুধু এইটুকু বলল,
” নেহাৎ তুই প্রতিদিন কষ্ট করে রান্না করিস বলেই এই বিস্বাদ রান্না খাই। ”
মিথি শুধু সরু চোখেই তাকায়। হিমেল শেষটুকুতে মিষ্টিিকে বলল,
“ মিষ্টি আম্মু, রাখি এবার? হিম আবার কল করবে হুহ? ”
মিষ্টি মাথা নাড়ায় পুতুলের মতো। হিমেল শুধু হাসল। নিজেও মিষ্টির মতো করে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“ বাই আম্মু। ”
মিষ্টি দাঁত কেলিয়ে হাসল। বিনিময়ে দ্রুতই হাত নাড়িয়ে বলল,
” টাটা হিম। ”
হিমেল ফিরতে কিছুটা দেরিই হলো। আয়মানের সাথে ঘোরাফেরা এই সেই করতে করতেই দেরি হলো। অবশেষে যখন ফিরল তখন মিষ্টি ঘুমিয়ে গেছে। মিথি চেয়ারর বসাই ছিল। হিমরলকে দেখেই সর্বপ্রথম বলল,
“ দেরি হলো, কোথাও গিয়েছিলেন? ”
“ হু। ”
“ কোথায়? ”
হিমেল হাসল বোধহয়। যেতে যেতে বলল,
“ ওভাবে তাকাচ্ছিস কেন? আয়মানের সাথে গিয়েছি। এখন মাথাও ধরেছে। ফ্রেশ হয়ে এসে মিষ্টির পাশে একটা ঘুম দিব হুহ? ”
মিথি শুধু মাথা নাড়াল। অতঃপর হিমেল ফ্রেশ হয়ে আসার নাম করে মাথায়, মুখে পানি দিয়ে এল। ভেজা চুল নিয়ে যখন মিথির সামনে দাঁড়াল মিথি ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ এখন গোসল করেছেন? চা করেছি। চা খেলে ভালো লাগবে। ”
“ ইচ্ছে হচ্ছে না চা নিতে এখন। ঘুমাব।”
মিথি এবারে বিনিময়ে আর কিছু বলল না। পা ঘুরিয়ে গিয়েই প্রথমে তোয়ালেটা আনল। ততক্ষনে হিমেল বিছানায় বসেছে। মিথি যখন তেয়ালে নিয়ে হাজির হলো তখন প্রায় শুঁয়ে বালিশে মাথা রাখছিল সে। মিথি মুহুর্তেই বলে উঠল,
“ এক মিনিট, মাথাটা মুঁছিয়ে দেই। তারপর নাহয় ঘুম দিবেন। ”
হিমেল ভ্রু বাঁকিয়ে চাইল। বলল,
“ তুই মুঁছিয়ে দিবি? ”
“ তাহলে বরং আপনি মুঁছে নিন। ”
এইটুকু বলেই তোয়ালেটা এগিয়ে ধরল। হিমেল সোজা হয়েই বসল ফের। মিথির হাতটা তোয়ালে সহই তুলে নিজের মাথায় রাখল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রাখল মিথির আড়ালেই। অতঃপর বলল,
“ দে, মুঁছিয়ে দে। ”
মিথি একটুখানি চুপ থেকেই পরমুহুর্তেই মাথাটা মুঁছিয়ে দিতে লাগল স্বযত্নেই। হিমেল শুধু চুপ থেকে অনুভব করছিল সবটুকু। অতঃপর চোখ বুঝে নিয়ে গম্ভীে কন্ঠে আরও একবার বলল,
“ আমরা সত্যি সত্যিই সংসার করছি, তাই না মিথি? ”
এই প্রথম বোধহয় এই প্রশ্নের উত্তরে মিথি মৃদু হাসল। অতঃপর স্বতস্ফূর্ত স্বরে বলল,
” করছি তো। একটু একটু করে গড়ে উঠা একটা সংসার। ”
হিমেল এবারেও হাসল নিঃশব্দেই। মাথা মোঁছা শেষে চোখ বুঝে ঘুমানোর আগে আগেই দেখা গেল মিথি বিছানার এককোণে বসে এবার ও সরাসরিই বলল,
“ মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে ব্যাথাটা কমবে। মাথাটা কোলে রাখুন বুঝলেন?”
হিমেল শুনল। চেয়ে থেকে আবারও বলল,
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৬১
“ আমার জন্য খুব ভাবছিস? ভালোবাসিস মিথি? ”
মিথির মনে হলো বলে দিক, ভালোবাসি। অথচ তা বলা হলো না।বলল,
“ যেটুকু অনুভব করা যায় সেটুাু না বললেও হয়। ”
হিমেল চোখে হাসল। অনুভব? অনুভব তো সে সত্যিই করছে। মিথিফুলের কোমল, স্নিগ্ধ ভালোবাসার অনুভূতির অনুভব। হিমেলনে মনে হেসেই ওভাবেই মাথাটা মিথির কোলে রাখল।আর মিথি কেবল হাত দিয়ে বুলিয়ে দিল চুলগুলো।
