ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৭+২৮
তানিশা ভট্টাচার্য্য
তানভীদের বৃন্দাবন থেকে কলকাতায় ফিরতে অনেকটা রাত হয়ে যায়। তাদের ফ্লাইট প্রায় একঘন্টা মতো লেট করেছিল। সেইজন্য রুদ্র বাবু আর দোয়েল ব্যানার্জী ঋষি আর তানভীকে যেতে দেননি ওই দিন। ওরা দুজনে আজকে রাতটা থেকে কাল সকালে চলে যাবে।
পরের দিন সকালে ঋষি ও তানভী ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে গেছে। কাল থেকে তানভী আর ঋষি দুজনেরই স্কুল আর কলেজ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে তানভী ও ঋষি চৌধুরী নিবাসে পৌঁছে গেল। ঋষি ও তানভী বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতেই একটা ছোট্ট গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুর বাচ্চা তাদের দিকে দৌড়ে এল। তানভী ওর হাতে থাকা লাগেজটা ফেলে দেওয়ার মতো করে রেখে দিয়ে কোলে থাকা গোপাল বিগ্ৰোহটা ঋষির কাছে দিয়ে দৌড়ে গেল তার দিকে। তানভী কুকুরটা কে কোলে তুলে আদর করতে করতে ভিতরে গেল। ঋষি বিগ্ৰোহ ও লাগেজ গুলো কে নিয়ে ভিতরে গেল। তারপর গোপাল বিদগ্ৰোহ টা তানভীর কাছে দিয়ে লাগেজ গুলোকে নিয়ে রুমে চলে গেল। তানভী কুকুরটাকে কোল থেকে নামিয়ে গোপাল বিগ্রোহ টা নিয়ে নিল। রাখী রায়চৌধুরী আর অভিক সাহেব তখন সোফায় বসেছিলেন। তানভী ওনাদের সামনে গিয়ে বলল
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“আঙ্কেল, বড়মা! এই ছোট্ট কুকুর বাচ্চাটা কাদের এখানে কি করছে?”
অভিক সাহেব মুচকি হেসে বললেন
-“এটা তোমার মামনি”
তানভী আনন্দিত কণ্ঠে বললো
-“সত্যি!”
রাখী রায়চৌধুরী সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালেন। তারপর বললেন
-“হুম এটা তোর জন্মদিনে তোর আঙ্কেলের তরফ থেকে একটা ছোট্ট উপহার। এখন যা রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। আর গোপাল বিগ্ৰোহটা তোর নিজের রুমে রেখে দিস।”
তানভী কুকুর বাচ্চাটার দিকে হাত দেখিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল
-“বড়মা একে নিয়ে যাব?”
-“হুমম”
তানভী আনন্দের সহিত কুকুরটিকে নিয়ে তার রুমে চলে যায়। রুমে দরজা খুলে ঢুকতেই সে আরেক দফা অবাক হয়। তার বিছানা ভর্তি গিফট। সে দরজার কাছে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকল অবাক হয়ে। তারপর রুমে ঢুকে বিছানার কাছে গিয়ে দেখে সেখানে গুনে গুনে ১৭ টা গিফট রয়েছে। তানভী গোপাল বিগ্ৰোহটা একটা শৌখিন চেয়ারে বসিয়ে কাবাড থেকে জামা কাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। কিছুক্ষণ পর ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে সোজা নিচে চলে আসে। নিচে এসে রাখী রায়চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী কণ্ঠে বললো
-“থ্যাংক ইউ বড়মা আর আঙ্কেল এতগুলো গিফটের জন্য।”
অভিক সাহেব আর রাখী রায়চৌধুরী কিছুটা অবাক হলেন। অভিক সাহেব বিস্মিত কন্ঠে বললেন
-“এতগুলো গিফট মানে? মামনি আমরা তো তোমাকে শুধু একটাই গিফট দিয়েছি।”
-“হ্যাঁ গুল্লু তোর আঙ্কেল তো তোকে মাত্র একটাই গিফট দিয়েছে।”
ওনাদের কথায় তানভী তব্দা খেয়ে যায়। সে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল
-“তাহলে আমার রুমে ওই ১৭টা গিফট রাখলো কে?”
-“কি বলিস রে? ১৭ টা গিফট!… কই আমরা তো কেউ রাখেনি।”
বিস্মিত কন্ঠে বললেন রাখী রায়চৌধুরী।
-“মা ওগুলো আমি রেখেছি।”
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে বলল ঋষি। রাখী রায়চৌধুরী ছেলের কথার প্রতি উত্তরে বললেন
-“তুই কখন রাখলি? আর কখনই বা কিনলি গিফট গুলো?”
-“গিফটগুলো আমি কিনিনি ওগুলো ভাইয়া কিনেছে। আর বৃন্দাবনের জন্য এখান থেকে যাওয়ার আগের দিন বোনুর রুমে রেখে এসেছি আমি।”
স্কুলে দ্বিতীয় পিরিয়ডের পর রুপসা নামের একটা মেয়ে এসে রিকি কে ডেকে নিয়ে যায়। তারা দুজনে ক্লাস রুমের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। আর সেদিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘাদ্রি। কিন্তু সে চেয়েও কিছু বলতে পারছে না। কথা শেষ করে রিকি ক্লাসে এসে মেঘাদ্রির দিকে তাকাল। মেঘাদ্রি রাগ-অভিমান মিশ্রিত দৃষ্টি নিয়ে রিকির দিকে তাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তা দেখে রিকি নিঃশব্দে হাসল।
আজকে সারাদিন স্কুলে রিকি মেঘাদ্রির সাথে কথা বলেনি। এমনকি স্কুল ছুটির পরেও রিকি মেঘাদ্রির জন্য অপেক্ষা করেনি। মেঘাদ্রি ব্যাপারটা বেশ লক্ষ্য করল। কিন্তু কিছু বলল না।
ঘড়িতে রাত প্রায় ১ টা বাজে তানভী চুপচাপ শুয়ে আছে। আজ তার ঘুম আসছে না। তার ডান পাশে গোল্ডি ঘুমিয়ে আছে (তানভী তার কুকুর বাচ্চাটার নাম গোল্ডি রেখেছে)। আর বাম পাশে তার গোপু সোনাকে শয়ন দিয়েছে। সেই দুপুরে যখন থেকে গিফট গুলো খুলছে তখন থেকেই তার ঘুম উড়ে গেছে। প্রত্যেকটা গিফটেই তানভীর সব পছন্দের জিনিসগুলো রয়েছে। তানভী ভেবেছিল আর্ভিক ভাই কে ধন্যবাদ জানাবে। কিন্তু ভয়ের কারণে এতক্ষণ জানাতে পারেনি। অবশেষে এখন সাহস জুড়িয়ে সে আর্ভিক ভাইকে ধন্যবাদ জানাবে বলে ঠিক করল। তানভী বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা নিয়ে দেখল যে কটা বাজে। ১টা বেজে ২০ মিনিট তানভী আর্ভিকের নম্বরে কল করল।
আর্ভিক সবে মাত্র ঘুমিয়েছে। হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠল। রিংটোনের শব্দে আর্ভিকের ঘুম ভেঙে গেল। সে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ফোনটা হাতে নিল। ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম জ্বল জ্বল করছে “প্রাণকন্যা”। তা দেখে আর্ভিকের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু হঠাৎ সময়টা চোখে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা ধুপ করে উঠলো। হঠাৎই তার মনে এক অজানা ভয় হানা দেয়। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে কলটা রিসিভ করল আর্ভিক। তারপর ভয়াক্রান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল
-“তানভী! কী হয়েছে?ঠিক আছিস তুই?”
আর্ভিকের ঘুম মিশ্রিত ভয়াক্রান্ত নেশালো কণ্ঠস্বর শুনে তানভীর নেশা ধরে গেছে। সে যেন এক অজানা রাজ্যে পারি দিয়েছে। আর্ভিক আবার উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল
-“কি হল বল কিছু!”
আর্ভিকের কথায় তানভীর ঘোর কেটে যায়। তানভী শান্ত কন্ঠে জবাব দিল
-“হ্যাঁ! আর্ভিক ভাই সব ঠিক আছে।”
এটা শুনে আর্ভিক কিছুটা শান্ত হয়ে একটা প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর নিজেকে স্বাভাবিক করে স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করল
-“এত রাতে কেন ফোন করেছিস?”
তানভী সহসা জবাব দেয়
-“কেমন আছেন আপনি?”
তানভীর এই একটা সামান্য প্রশ্নে আর্ভিক স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনের ভেতরে যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের ন্যায় উথাল পাতাল শুরু হল। অনুভূতির রাজ্য থেকে অনুভূতিরা যেন ভিড় জমালো তার মনে। কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল
-“হুমম ভালো আছি”
তানভীর সহসা বলে উঠে
-“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আর্ভিক ভাই”
আর্ভিক ফোনের ওপাশে নিঃশব্দে হাসল। আর্ভিককে চুপ থাকতে দেখি তানভী জিজ্ঞেস করল
-“আপনি কবে ফিরবেন?”
-“কেন?”
-“না এমনি।”
আর্ভিকের মুখে হাসি খেলে গেল। আজ তার ভীষণ আনন্দের দিন। তার প্রণয়িনী নিজে থেকে তাকে ফোন করেছে, তার খোঁজ নিচ্ছে। তানভী এবার একটু ভয়ে ভয়ে বলল
-“আর্ভিক ভাই একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
-“হুমম কর”
তানভী কম্পিত কন্ঠে বলল
-“আপনি সেদিন কি ভাবে জানলেন…যে আমি আর তোজো পার্কে ছিলাম?”
-“তার কৈফত তোকে দিতে হবে নাকি!”
আর্ভিক গম্ভীর কন্ঠে বলল। তানভী আহ্লাদী কন্ঠে বলল
-“বলুন না প্লিজ।”
আর্ভিক সরাসরি জবাব দিল
-“স্পাই লাগিয়ে রেখেছি। তুই কখন কোথায় কী করছিস সব খবর আসে আমার কাছে।”
তানভী আঁতকে উঠে বলল
-“কেন ?”
-“একাদশ শ্রেণীতে উঠলে নাকি সবার ডানা গজায়। তা তুই ডানা মেলে কতটা উড়ছিস সেটা দেখার জন্য।”
আর্ভিকের কথায় তানভী তব্দা খেয়ে যায় পুরো। আর্ভিক এরপর ঘড়ির দিকে তাকালো, ২টো বাজতে ১০ মিনিট বাকি। আর্ভিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল
-“ঘুমিয়ে পড়। অনেক রাত হয়েছে।”
-“আপনিও ঘুমান রাখছি। আর সরি আপনাকে অহেতুক বিরক্ত করলাম।”
এমনটা বলে তানভী ফোন কাটতে যাবে এমন সময় আর্ভিক কণ্ঠস্বর দ্বিগুণ ভারী করে বলল
-“দাঁড়া! ফোন কাটবি না”
হঠাৎ আর্ভিকের এমন গুরু গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনে তানভী কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। সে ভাবে হয়তো সে ভুল কিছু বলে ফেলেছে তাই জন্য আর্ভিক ভাই তার ওপর রেগে গেছেন। তানভীর ভাবনার মাঝে আর্ভিক আগের ন্যায় কন্ঠস্বর গম্ভীর করে বলে উঠে
-“তোকে কি আমি বলেছি যে তুই ফোন করেছিস বলে আমি বিরক্ত হয়েছি? তোর যখন ইচ্ছা হবে তখন ফোন করবি। কাল সকালে তোর স্কুল আছে সেই জন্যই ফোনটা রাখতে বললাম। যাতে ঘুম থেকে উঠতে দেরি না হয়। নাহলে সারারাত ফোন কলে রেখেদিতাম।”
আর্ভিকের এমন কথা শুনে তানভী আতঙ্কিত কন্ঠে বলল
-“এখন তাহলে রাখি?”
-“হুমম”
তানভী আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা কেটে দিল। তানভী ফোন কেটে ফেসবুক ওপেন করল। অনেক দিন অনলাইন হয়নি ফেসবুকে। ফেসবুক ওপেন করতেই তার ফিডে আর্ভিকের একটা পোস্ট এল। আর্ভিক একদিন আগে ছবিটা পোস্ট করেছিল। কমেন্ট সেকশন সব সুন্দর সুন্দর কমেন্টে ভরা। তানভী ছবিটা দেখল।
সবুজ প্রকৃতির স্নিগ্ধ পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে আর্ভিক। যেন সজীবতার এক মূর্ত প্রতীক সে। তার পরনের জলপাই সবুজ শার্টটি চারপাশের প্রকৃতির সাথে এক অপূর্ব মিতালী তৈরি করেছে। দৃষ্টিতে তার এক গভীর স্বপ্নীল আবেশ, যা সুদূরের কোনো অজানাকে খুঁজে ফিরছে। হাতের ঘড়িটি যেন বয়ে চলা সময়ের সাক্ষী, আর গলায় “T” লকেটটি দৃশ্যমান। সিঁড়ির রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার এই ভঙ্গিটিতে মিশে আছে এক সহজাত সাবলীলতা ও পুরুষালি গাম্ভীর্য। রোদেলা দিনের নরম আলোয় তার অবয়বটি এক শান্ত স্থিরতায় উদ্ভাসিত, যা একাধারে আধুনিক এবং ধ্রুপদী।
তানভী নিষ্পলক মোহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। চোখ ফেরাতে পারছে না সে। তারপর অতিকষ্টে ছবিটা থেকে চোখ সরিয়ে ক্যাপশনটা পড়ল
“তোমার ওই শান্ত চাওয়ায় এক চিলতে রোদ হাসে,
আমার সবটুকু প্রেম শুধু তোমাকেই ভালোবাসে।”
তানভীর ক্যাপশনটা পড়ার মাঝে আর্ভিকের একটা মেসেজ এল
“এখন অনলাইনে কী করছিস? ঘুমাতে বলেছিলাম না!”
তানভীর মেসেজটা পড়ে সারা শরীর ভয়ে কেঁপে উঠল। এরপর আবার একটা মেসেজ এল
“একবার বাড়ি যেতে দে! তোকে তুলে ছাদে থেকে নিচে আছাড় মারব। মাইন্ড ইট।”
তানভী কিছু একটা টাইপিং করতে যাচ্ছিল আর্ভিকের আবার একটা মেসেজ এল
“You have only 2 minutes! ফোনটা রেখে ঘুমা।”
তানভী তৎক্ষণাৎ ফোনটা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু আর্ভিক, সেই রাতটা নির্ঘুম কাটাল।
অক্টোবরের সেই কাঁচা রোদেলা সকাল। জানলার পর্দার ফাঁক গলে আসা এক চিলতে সোনালি রোদ আলতো করে ছুঁয়েদিল সপ্তদশী কিশোরীর ঘুমন্ত মুখে। হালকা হিম মেশানো হাওয়ায় তার অবিন্যস্ত চুলগুলো কপালে খেলা করছে। রাতের সব স্বপ্ন চোখের পাতায় প্রশান্তি হয়ে থমকে আছে। বাইরের শিউলি ফুলের মৃদু ঘ্রাণ আর পাখির কলতানে মেখে থাকা এই শান্ত সকাল তাকে জাগাতে চায় না। ঘুমের অতলে সে যেন এক জীবন্ত কবিতা, যেখানে কৈশোরের সারল্য আর শরতের স্নিগ্ধতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
অক্টোবরের সেই মায়াবী নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ বেজে উঠল তার ফোনটি। সুরের এক ধারালো কম্পন মুহূর্তেই ছিঁড়ে দিল ঘুমের রেশম জাল। বালিশের পাশে রাখা যন্ত্রটির নীলচে আলোয় ম্লান হয়ে গেল সকালের স্নিগ্ধতা। সেই চেনা সুরে সপ্তদশীর স্বপ্নিল ঘোরটুকু থমকে দাঁড়াল। কাঁচা ঘুমের আবেশ জড়িয়ে কিশোরী যখন চোখ মেলল, তার চোখে তখন শরতের মেঘের মতো বিস্ময়। হাতের আলতো ছোঁয়ায় ফোনের স্ক্রিন উজ্জ্বল হতেই মিলিয়ে গেল নির্জনতার কবিতা। এক মুহূর্ত আগেও যে ভোরে ছিল নিবিড় শান্তি, চেনা মানুষের একটি কলে সেখানে হঠাৎই আছড়ে পড়ল বাস্তবের ব্যস্ত কোলাহল। কৈশোরের আলস্য ভেঙে মেয়েটি জেগে উঠল এক নতুন দিনের আহবানে। তানভী কলটা রিসিভ করল। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল আর্ভিকের কণ্ঠস্বর। আর্ভিক স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“Good morning স্কুল থেকে ফিরে আমার রুমে যাবি। বিছানার উপর একটা জিনিস রাখা থাকবে সেটা নিয়ে নিবি।”
তানভীর কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্ভিক কল কেটে দিল। তানভী ঘড়ির দিকে তাকালো ৬টা বেজে ২৫ মিনিট। সে দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নিল স্কুলের জন্য। তারপর গোপাল সোনাকে ঘুম থেকে তুলে তার মুখ ধুয়ে দিয়ে ভোগ লাগাল। এরপর নিচে নামল ব্রেকফাস্ট করতে। তার পিছনে পিছনে গোল্ডি ও এল। তানভী গোল্ডিকে খেতে দিয়ে নিজে খেয়ে বেরিয়ে গেল।
সকালবেলার কাঁচা রোদ জানালার কাঁচ চুইয়ে তানভীর মুখে এসে পড়েছে। গাড়ির নরম সিটে হেলান দিয়ে সে বাইরের চঞ্চল পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে আছে। কানে ইয়ারফোন, হয়তো প্রিয় কোনো সুর তার কিশোরী মনের স্বপ্নগুলোকে উসকে দিচ্ছে।
রাস্তার ধারের গাছগুলো দ্রুত পেছনে ছুটে যাচ্ছে, ঠিক যেমনভাবে শৈশব পেরিয়ে সে কৈশোরের শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে। বাতাসের ঝাপটায় অবাধ্য কিছু চুল কপালে এসে নাচছে। তার কোলের ওপর রাখা স্কুল ব্যাগটা যেন একরাশ দায়িত্ব আর আগামীর সম্ভাবনার সমাহার।
অক্টোবরের মিঠে রোদে মাখামাখি কলকাতার সকাল। ডিপিএস (দিল্লি পাবলিক স্কুল রুবি পার্ক কলকাতা) গেটের সামনে গাড়ি থামতেই সপ্তদশী স্নিগ্ধতা নিয়ে নামল। সাদা ইউনিফর্মে শরতের মেঘের ছোঁয়া, আর হাওয়ায় উড়ছে অবাধ্য চুল। পুজোর আমেজ মাখা বাতাসে ওর চঞ্চল পদক্ষেপ যেন এক জীবন্ত কবিতা।
স্কুল গেট দিয়ে প্রবেশ করতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় তানভী। সামনে একগুচ্ছ রক্তগোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে সমগ্ৰ; তাকে দেখে এগিয়ে এল তার দিকে। তানভী দেখল সমগ্ৰর চোখে আজন্ম লালিত স্বপ্নের আকুলতা। সমগ্ৰ তানভীর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে গোলাপ গুচ্ছটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল
-“I love you Tanvi. Will you be my girlfriend?”
শোরগোল ভরা ক্যাম্পাসে মুহূর্তেই যেন স্তব্ধতা নামলো। তানভী সমগ্ৰর কথা শুনে স্বাভাবিক কন্ঠে জবাব দিল
-“No Samagro. I’m not ready for this right now.”
প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দিতেই মুহূর্তের সেই রঙিন মায়া এক লহমায় ফিকে হয়ে গেল। তানভী শান্ত চোখে তাকিয়ে অস্ফুটে জানাল তার অসম্মতি; প্রত্যাখ্যাত গোলাপটি যেন অপমানে কুঁকড়ে গেল সমগ্ৰর হাতে। স্তব্ধতা চিরে তানভী দৃপ্ত পায়ে হেঁটে গেল ক্লাসের দিকে।
অফিসে নিজের কেবিনে বসে আছে আর্ভিক। চেয়ারে গা এলানো হাতদুটো জোড়ো করে মাথার পিছনে রাখা, বাম পা টা ডান পায়ের উপর তুলে চোখ বন্ধ করে ভাবুক ভঙ্গিতে বসে আছে সে। মনে করছে আজ থেকে ১৬ বছর আগের ঘটনা—–
-“Very Good my Son. তুমি অনেক ভালো বন্দুক চালাতে শিখেছ।”
পিছন থেকে বলে উঠলেন রনজয় ব্যানার্জী। এরপর এগিয়ে এসে ৮ বছরের ছোট্ট আর্ভিক কে কোলে তুলে নিলেন। আর্ভিক খিলখিল করে হেসে বলল
-“Thank you. জেঠুমনি।”
-“নিজে যে পথে গেছো। আমার আর্ভিক কে কি সেই পথে পাঠাবে নাকি? দেখো আমি বলেদিলাম আমার ছেলেটা কে একদম ওই সব পথে পাঠাবে না।”
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জীর এমন কথায় পিছন ঘুরে তাকালেন রনজয় ব্যানার্জী আর আর্ভিক। রনজয় ব্যানার্জী আর মৈত্রেয়ী ব্যানার্জীর বিয়ের ১০ বছরেও সন্তানের মুখ দেখতে পাননি তারা, তাই আর্ভিক, ঋষি ওদের কে ওনারা নিজের ছেলের মতো দেখেন। ১১ বছরের মাথায় মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী কনসিভ করেছেন, উনি এখন ৮মাসের গর্ভবতী। ওনাকে দেখে আর্ভিক একগাল হাসল। রনজয় ব্যানার্জী আর্ভিককে কোলে থেকে নামিয়ে দিলেন। আর্ভিক এক দৌড়ে চলে গেল মৈত্রেয়ী ব্যানার্জীর কাছে। তারপর ওনাকে জড়িয়ে ধরল।
-“বড়মা!”
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী ঠোঁটের কোণায় হাসি রেখে বললেন
-“আমার সোনা ছেলে। চলো খেয়ে নেবে।”
আর্ভিক সম্মতি সূচক মাথা নাড়িয়ে মৈত্রেয়ী ব্যানার্জীর সাথে চলে গেল। রনজয় ব্যানার্জী ওনাদের পিছন পিছন গেলেন। আর্ভিক সোফায় বসে আছে আর মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী ওকে খাইয়ে দিচ্ছেন। রনজয় ব্যানার্জী এসে পাশে সোফায় বসলেন। আর্ভিক উদ্বিগ্ন কন্ঠে মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী কে জিজ্ঞেস করল
-“আচ্ছা বড়মা বাবু কবে আসবে?”
-“এইতো বাবা আর কিছুদিনের মধ্যেই চলে আসবে।”
রনজয় ব্যানার্জী আর্ভিককে বললেন
-“চ্যাম্প! তোমার কী চাই ভাই না বোন?”
আর্ভিক একবার রনজয় ব্যানার্জী আর একবার মৈত্রেয়ী ব্যানার্জীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“আমার ভাইও চাই না বোনও চাই না। আমার একটা ছোট্ট প্রিন্সেস চাই। যাকে সব সময় আমি আমার কাছে রাখব।”
আর্ভিকের কথায় রনজয় ব্যানার্জী আর মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী দুজনে হেসে ওঠেন।
হঠাৎ ফোনের রিংটোনের শব্দে অতীতের স্মৃতি থেকে ফিরে আসে আর্ভিক। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল দোয়েল ব্যানার্জীর নাম। সে সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা রিসিভ করে বলল
-“হ্যাঁ কাকিমনি বলো।”
ফোনের ওপাশ থেকে তৃষাণ কান্না মিশ্রিত কন্ঠে জবাব দিল
-“আর্ভিক ভাইয়া!”
তৃষাণের এমন কন্ঠস্বর শুনে আর্ভিক কপাল কুঁচকে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল
-“তোজো! কি হয়েছে? তুই কাঁদছিস কেন? সবাই ঠিক আছে তো?”
-“হ্যাঁ ভাইয়া”
আর্ভিক একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললো
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ২৫+২৬
-“তাহলে তুই কাঁদছিস কেন?”
-“ভাইয়া আমি বাইক রাইডিং করতে চাই। কিন্তু বাবা মানছে না। তুমি একটু বলো না ভাইয়া প্লিজ।”
এই বলে আবার কাঁদতে লাগলো তৃষাণ। আর্ভিক তৃষাণ কে শান্ত কন্ঠে বলল
-“আচ্ছা ঠিক আছে। তুই আগে কান্না বন্ধ কর।”
তৃষাণ কিছুটা শান্ত হল। আর্ভিক তৃষাণ কে বলল
-“আমাকে দেশে ফিরতে দে তারপর আমি দেখছি। এখন রাখছি একটু কাজ আছে।”
এই বলে আর্ভিক কল কেটে দিল।
