Home ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৯+৪০

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৯+৪০

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৯+৪০
তানিশা ভট্টাচার্য্য

ভোরের আলো তানভীর চোখে পড়তেই তার ঘুম ভাঙলো। নিজেকে আর্ভিকের বুকের ওপর আবিষ্কার করে সে লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় মুহূর্তের মধ্যে ধরফড়িয়ে উঠে বসল। তানভীর এই হঠাৎ নড়াচড়ায় আর্ভিকের তন্দ্রা ছুটে গেল, সে দুচোখ মেলে তানভীর বিভ্রান্ত মুখের দিকে তাকাল। তানভী ইতস্তত করে ভাঙা গলায় বলল
-“স..সরি বুঝতে পারি নি। আপনার মাথা ব্যথাটা কি এখন একটু কমেছে? কেমন লাগছে আপনার?”
আর্ভিক একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল

-“হুম ঠিক আছি। যা, ঝটপট রেডি হয়ে নে, স্কুলে যেতে হবে।”
তানভীর মনে অস্বস্তি থাকলেও সে বাধ্য মেয়ের মতো তৈরি হতে চলে গেল। ওদিকে আর্ভিক নিজেও অফিসের জন্য পরিপাটি হয়ে নিচে নেমে এল। শরীরটা দুর্বল থাকলেও সে নিজের হাতে তানভীর জন্য চটজলদি ব্রেকফাস্ট তৈরি করল।
খাওয়ার টেবিলে যখন দুজনে বসল, তানভীর খাবার এগিয়ে দেওয়ার সময় আর্ভিকের তীক্ষ্ণ নজর আটকে গেল তার কবজির কাছের লালচে একটা দাগে।
-“তোর হাতে এটা কিসের পোড়া দাগ? আগে তো ছিল না!”
আর্ভিকের কণ্ঠে হঠাৎ উদ্বেগের ঝিলিক। তানভী প্রথমে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু আর্ভিকের কড়া ধমক শুনে সে বলল
-“কাল রাতে স্যুপ বানাতে গিয়ে গরম হাতা লেগে হাতটা পুড়ে গেছে।”
আর্ভিক এক মুহূর্ত দেরি না করে খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে নিজের রুমে গেল। এরপর ড্রয়ার থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে আনল তারপর অতি যত্ন ও সাবধানের সাথে সেই পোড়া জায়গায় মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল।
ব্যান্ডেজ করার শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার দীর্ঘনিঃশ্বাসের ভেতরে লুকিয়ে ছিল তানভীর প্রতি এক গভীর অপরাধবোধ আর ভালোবাসা। এরপর নিজে গাড়ি চালিয়ে তানভী কে স্কুলের গেটে নামিয়ে দিয়ে, অফিসের দিকে রওনা হলো।

“Agar main bata doon
mere dil mein kya hai
To mujhse nigaahen
chura to na loge…”
স্কুলের মাঠে সকালের রোদ তখন খেলা করছে। রিকি একমনে গান গাইতে গাইতে আড়চোখে মেঘাদ্রির দিকে তাকাচ্ছিল। তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস স্কুল শুরু হওয়ার আগে এবং রিসেসের সময় এখানে বসে আড্ডা দেওয়ার। মেঘাদ্রি বই থেকে মুখ তুলে মহাবিরক্ত হয়ে বলল
-“কী শুরু করেছিস বল তো রিকি? রিলেশনে আসার পর থেকে তোর এই সব ফাজলামি গুলো দিন দিন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে!”
রিকি দমবার পাত্র নয়, সে একটা নাটকীয় ভঙ্গি করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার দৃষ্টি স্থির হলো গেটের দিকে। তানভী হেঁটে আসছে স্কুলের মেইন গেট দিয়ে। রিকি মেঘাদ্রির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল

-“আরে! এ তো দেখছি অমাবস্যার রাতে চাঁদের উদয়!”
মেঘাদ্রির মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল
-“তোর এই সব নাটক এবার বন্ধ কর। আর একটা উল্টোপাল্টা কথা বললে সপাটে এক লাথি মেরে বিনা রকেটে তোকে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দেব, মনে থাকে যেন!”
রিকি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল
-“আরে বাবা, অত রাগছিস কেন? তোকে বলেছি নাকি, ওদিকে দেখ তানভী আসছে। ওকে অনেকদিন পর দেখলাম, তাই বললাম আর কী! তানভীর দেখা পাওয়া তো আজকাল ভাগ্যের ব্যাপার।”
রাগের রেশ কাটিয়ে মেঘাদ্রিও দেখল তানভী কে। দুজনে তড়িঘড়ি উঠে তানভীর কাছে এগিয়ে গেল। তৃষাণের জন্মদিন আর গতরাতের ধকলের রেশ তানভীর চোখেমুখে থাকলেও বন্ধুদের দেখে সে ম্লান হাসল। তিন বন্ধু মিলে কিছুক্ষণ খুনসুটি আর জমানো গল্প সেরে নিয়ে যখন ঘণ্টার আওয়াজ কানে এল, তখন তারা দ্রুত পায়ে ক্লাসের দিকে হাঁটা দিল।

বিকেলের ম্লান আলোয় অভিক সাহেবদের বিদায়ের সুর বেজে উঠতেই তৃষাণের বাঁধভাঙা কান্না শুরু হলো। অবুঝ ছেলেটি রাখী রায়চৌধুরীর শাড়ির আঁচল ধরে সজল চোখে আবদার করল
-“বড় মা, ঋষি ভাইয়া, আঙ্কেল তোমরা যেও না! তোমরা গেলেই তো আমাকে পড়তে বসতে হবে। আজকে অন্তত থেকে যাও না!”
তার এই সরল আকুতি উপস্থিত সবার বুকেই যেন এক বিষণ্ণতার ছোঁয়া দিয়ে গেল। রাখী রায়চৌধুরী পরম মমতায় তৃষাণকে কাছে টেনে নিলেন। তার গালে স্নেহের স্পর্শ বুলিয়ে শান্ত স্বরে বললেন
-“লক্ষ্মী বাবা আমার, আর্ভিক ভাইয়া আর তোমার দিভাই তো একা আছে ওখানে, আমাদের যেতেই হবে সোনা। আবার আসব তো, আর এবার তোমরাও আমাদের বাড়ি বেড়াতে যাবে। আর তোমাকে আজ কে কেউ পড়তে বসাবে না।”
এই বলে তিনি তৃষাণের গালে স্নেহের ছোঁয়া এঁকে গাড়িতে উঠলেন। রাখী রায়চৌধুরীর কথা গুলো শুনে তৃষাণ চোখের জল মুছল ঠিকই, কিন্তু তার ছলছলে দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল ধাবমান গাড়িটার দিকে। মুহূর্তে ধূলো উড়িয়ে গাড়িটি দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।

সময়ের চাকা গড়িয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে অনেকগুলো দিন ঝরে গেছে। তৃষাণের সেই ছোট্ট জেদ এখন রক্তে মিশে থাকা এক নেশায় পরিণত হয়েছে। সেদিনের আর্ভিকের দেওয়া সেই ‘পিট বাইক’ এখন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাঝখানের মাসগুলোয় সে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নিজেকে তৈরি করেছে। আজ নতুন বছরের প্রথম দিন, তৃষাণের জীবনের এক অগ্নিপরীক্ষা,তার প্রথম বাইক রাইডিং কম্পিটিশন। আগের দিন রাতে তৃষাণ উত্তেজিত গলায় আর্ভিক কে ফোন করে বলেছিল
-“ভাইয়া, কাল আমার বড় লড়াই। তুমি না থাকলে আমি আত্মবিশ্বাস পাব না, তুমি আসবে তো?”
আর্ভিক তাকে নিরাশ করেনি। আজ সেই ধুলো ওড়ানো রেসিং ট্র্যাকের ধারে তৃষাণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সে।
শুরু হলো প্রথম রাউন্ড। চারদিকে ইঞ্জিনের গর্জন আর দর্শকদের চিৎকার। তৃষাণ ঝড়ের গতিতে বাইক ছোটাচ্ছিল, সে সবার আগে ছিল কিন্তু অন্য এক প্রতিযোগী জঘন্যভাবে তৃষাণের লাইনে এসে তাকে ধাক্কা মেরে ট্র্যাক থেকে সরিয়ে দিল। ছেলেটি অসৎ উপায়ে প্রথম রাউন্ডে প্রথম হলো, আর তৃষাণ হলো দ্বিতীয়। রাগে আর অভিমানে তৃষাণ দৌড়ে আর্ভিকের কাছে এলো।

-“ভাইয়া, দেখলে ও কী করল? ও আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল! তুমি কিছু কর।”
তৃষাণ নালিশ জানাল। আর্ভিক এবার আর তাকে আদর করল না। পরিবর্তে, তৃষাণের দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসল সে। আর্ভিকের কণ্ঠস্বরে তখন পাথরের মতো গাম্ভীর্য
-“শোন তোজো, কোমল হো কিন্তু দুর্বল নয়। জীবন তোকে বারবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে, কিন্তু সব সময় আমি আসব না তোকে আগলে রাখতে। নিজের লড়াইটা নিজে জিততে শেখ।”
আর্ভিকের এই কথাগুলো তৃষাণের ভেতরের সুপ্ত আগুনকে জ্বালিয়ে দিল। সে আর নালিশ করল না। চোয়াল শক্ত করে আবার গিয়ে দাঁড়াল রেসিং ট্র্যাকে। সেই প্রতিযোগীটি তৃষাণের দিকে তাকিয়ে একটা পৈশাচিক হাসি দিল, যা তৃষাণের জেদকে আরও বাড়িয়ে দিল।

ফাইনাল রাউন্ড শুরু হতেই তৃষাণ যেন বিদ্যুতের গতিতে বাইক ছোটাল। সেই ছেলেটি আবারও তাকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এবার তৃষাণ কৌশলে তাকে পাশ কাটিয়ে গেল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছেলেটি নিজেই ধুলোর মধ্যে ছিটকে পড়ল, আর তৃষাণ ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করল বিজয়ী হিসেবে।
বিজয়মঞ্চে দাঁড়িয়ে তৃষাণ ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরল। তার চোখ তখন ভিড়ের মাঝে একজনকে খুঁজছিল। যখন আর্ভিকের সাথে তার চোখাচোখি হলো, দেখল আর্ভিকের মুখে সেই চেনা গর্বের হাসি। তৃষাণ আজ শুধু রেস জেতেনি, সে আজ নিজেকে চিনতে শিখেছে।
বিজয়ীর মুকুট মাথায় পরে তৃষাণ যখন টলমল পায়ে আর্ভিকের কাছে এগিয়ে এল, আর্ভিক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সব গাম্ভীর্য ঝেড়ে ফেলে সে তৃষাণ কে কোলে তুলে নিল। তপ্ত দুপুরের রোদে ভিজে যাওয়া তৃষাণের ঘর্মাক্ত কপাল আর আর্ভিকের তৃপ্ত হাসি মিলে এক অপার্থিব দৃশ্যের জন্ম দিল। আর্ভিক তৃষাণের চিবুক নেড়ে বলল

-“আমি জানতাম তুই জিতবি! বল, কী চাস? যা চাইবি তাই দেব।”
তৃষাণ মাথা নেড়ে বলল
-“কিছু চাই না ভাইয়া, তুমিই আমার জীবনের সেরা গিফট।”
কিন্তু আর্ভিক কি আর তা শোনে? সে জোর করে তৃষাণকে ওর প্রিয় চকলেট আর আইসক্রিম কিনে দিল। সঙ্গে উপহার হিসেবে দিল সেই দামী রিমোট-কন্ট্রোল ড্রোনটি, যেটা কেনার তৃষাণের অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল। পরম প্রাপ্তির আনন্দ নিয়ে তৃষাণ আর্ভিকের পাশে গাড়িতে বসল। এরপর আর্ভিক গাড়ি ছোটাল বাড়ির পথে, আর তৃষাণ তার ট্রফিটা জাপটে ধরে গাড়ির সিটে মাথা রাখল।
বিজয়ী বীরের বেশে তৃষাণ যখন অভিক সাহেবদের ড্রয়িংরুমে পা রাখল, তখন ওর দুহাতে ধরা ঝকঝকে ট্রফিটা বিকেলের রোদে সোনা ঝরাচ্ছিল। তৃষাণের সেই গর্বিত মুখ দেখে অভিক সাহেব আর রাখী রায়চৌধুরী যেন খুশিতে আত্মহারা। ঋষি তৃষাণ কে কাঁধে তুলে নিয়ে ঘরজুড়ে লাফাচ্ছিল, যেন জয়টা ওর নিজেরই। ড্রয়িংরুম তখন হুল্লোড় আর হাসিতে গমগম করছে।

অভিক সাহেব তখনই রুদ্র বাবুকে ভিডিও কল করলেন। ফোনের ওপাশ থেকে ছেলেকে ওই বিজয়ী ট্রফি হাতে দেখে দোয়েল ব্যানার্জীর চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। রুদ্র বাবু হাসিমুখে গম্ভীর গলায় বললেন,
-“সাবাস বাবা! আজ তুই সত্যিই আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছিস। আজ ওখানেই থাক, কাল সকালে আমি নিজে গিয়ে তোকে নিয়ে আসব।”
নিচে এত কোলাহল শুনে তানভী নিচে নেমে দেখতে এলো। তানভীর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই তৃষাণ উড়ন্ত ড্রোনের মতো ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তানভীর সামনে ট্রফিটা তুলে ধরে বিজয়ীর হাসি হেসে সে বলল
-“দেখেছিস দিভাই, আমি জিতেছি!”
তানভী তৃষাণের কপালে স্নেহের চুমু খেয়ে তাকে আদর করল। সেই মুহূর্তটা যেন এক অদ্ভুত মমতায় ভরে উঠল, যেখানে জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠল এক নিবিড় পারিবারিক বন্ধন।

স্কুলের করিডোরে তখন রিসেসের ঘণ্টার শব্দ মিলিয়ে গেছে, চারদিকে ছাত্রছাত্রীদের কোলাহল। রিকি, মেঘাদ্রি আর তানভী স্কুল মাঠে তাদের আড্ডা দেওয়ার জায়গায় বেঞ্চিতে বসে আড্ডায় মেতেছে। তৃষাণের জন্মদিন থেকে ফেরার পর থেকেই তানভী সব সময় রিকি আর মেঘাদ্রির কাছে আর্ভিকের বিষয়েই কথা বলে, এখনও তার ব্যতিক্রম নয়।
স্কুলের বাগানে আড্ডার মেজাজটা হঠাৎ করেই বেশ গম্ভীর আর রহস্যময় হয়ে উঠল। রিকি আর মেঘাদ্রি একে অপরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করে তানভীর দিকে তাকাল। রিকি হঠাৎ ফিসফিস করে বলে উঠল
-“শোন তানভী, লুকানোর চেষ্টা করিস না। তুই যে মনে মনে আর্ভিক দাদার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস, সেটা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।”
তানভী হকচকিয়ে গিয়ে দুদিকে মাথা নাড়ল

-“ধুর! কী বলিস তোরা! উনি তো আমার অভিভাবক, আমার বড় ভা….”
মেঘাদ্রি তাকে মাঝপথে তানভীকে থামিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল
-“তাই যদি হয়, তবে ওই রাতে সিনু দাদার অসুস্থতায় তুই কেন অমন পাগলের মতো কাঁদছিলি? কেন অতটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলি? সাধারণ চিন্তা আর ওই হাহাকারের মধ্যে অনেক তফাত আছে রে।”
তানভী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার মনের গহীনে যেন কেউ হাতুড়ি পিটছে। মেঘাদ্রি এবার তানভীর কাঁধে হাত রেখে খুব শান্ত গলায় বলল
-“জানিস তানভী, যখন তুই ওই দিন বিপদে পড়েছিলি, ওই লোকগুলো তোকে ঘিরে ধরেছিল, তখন কিন্তু তোর সবথেকে বেশি সিনু দাদার কথাই মনে পড়ছিল। মানুষ বিপদে পড়লে অবচেতন মনে তার নামই জপে, যাকে সে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।”
তানভীর চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। মেঘাদ্রির কথাগুলো তীরের মতো গিয়ে তার হৃদয়ে বিঁধল। সে আনমনে নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতটার দিকে তাকাল। আর ভাবল তবে কি তার এই অবাধ্য হৃদপিণ্ডটা সত্যিই আর্ভিক ভাইয়ের নামে স্পন্দিত হয়? তানভীর ভাবনায় ছেদ পড়ে রিকি আর মেঘাদ্রির হাসিতে, কিন্তু তার মনের ভেতরে শুরু হয় এক নতুন অনুভূতির তোলপাড়।
তানভীর মনের আকাশে তখন একরাশ সংশয়ের মেঘ। সে উৎসুক হয়ে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে খুব মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল

-“আচ্ছা, তোদের কী মনে হয়? আর্ভিক ভাইও কি আমাকে ভালোবাসেন?”
রিকি আর মেঘাদ্রি একে অপরের চোখের ভাষা পড়ে নিয়ে রহস্যময় এক চিলতে হাসি বিনিময় করল। যেন এই প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে অনেক আগে থেকেই আছে, কিন্তু তারা তা এখনই প্রকাশ করতে চায় না। মেঘাদ্রি তানভীর হাতটা ছুঁয়ে দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল
-“ভালোবাসতেই পারেন, তবে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আর যদি না-ও বাসেন, তাতেও বা কী! ভালোবাসা তো সবসময় দ্বিপাক্ষিক হয় না রে। উভয় দিক থেকে হলে সেটা ভাগ্য, কিন্তু একতরফা ভালোবাসার অনুভূতিটাও বড় আলাদা, এটা এমন একটা অনুভূতি যা শব্দে প্রকাশ করা যায় না।”
তানভীর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। এটা তার প্রথম অনুভূতি, তার প্রথমবার কোন পুরুষের জন্য এমন অনুভব হচ্ছে। কিন্তু সেটা এমন একজনের প্রতি হল যে, সে তাকে পছন্দ করে কি না জানে না। তানভী আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে ক্লাসের দিকে রওনা দিল। তানভীর পানে তাকিয়ে রিকি নিচু স্বরে বলল
-“মেয়েটা বোধহয় খুব কষ্ট পেল।”
মেঘাদ্রি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল
-“এখনই সব সত্যি জানার সঠিক সময় নয় রিকি। সত্যিটা আগে ওর নিজের ভেতরে পরিপক্ক হতে দে।”
তানভীর যাওয়ার পথে তখন ধুলো উড়ছে, আর তার মনে বাজছে এক অজানা বিরহের সুর।

ছুটির ঘণ্টা বাজার পর তানভীর মনটা এক অজানা ভারে নুয়ে ছিল। স্কুলের প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসতেই তার চোখে পড়ল পরিচিত সেই কালো গাড়িটা, যার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্ভিক। তানভীর উপস্থিতি টের পেয়ে আর্ভিক ছোট করে বলল
“আয় গাড়িতে ওঠ।”
তানভী কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটে বসল। আজ আর আগের মতো হাজারো অভিযোগ বা স্কুলের গল্প তার মুখে নেই। জানালার কাঁচের ওপাশে দ্রুতবেগে পিছিয়ে যাওয়া শহরটার দিকে সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতায় কেবল ইঞ্জিনের মৃদু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। আর্ভিক আড়চোখে একবার তানভীর বিষণ্ণ মুখটা দেখল, তারপর অতি কোমল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল

-“কি হয়েছে? কেউ কি কিছু বলেছে?”
-“না”
তানভী ছোট করে উওর দিল। আর্ভিক কিছু বলতে গিয়েও বলল না। এরপর কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে নিরবতা বিরাজ করল।
গাড়ির ভেতরে জমে থাকা নিস্তব্ধতা ভেঙে আর্ভিক হঠাৎ মৃদু হেসে বলল,
-“আজ বাড়িতে কারা এসেছে জানিস?”
তানভীর উদাসীন চোখে কৌতূহল উঁকি দিল, কিন্তু সে কেবল মাথা নেড়ে জানাল যে সে জানে না। আর্ভিক রহস্য করে বলল
-“চল, গেলেই দেখতে পাবি।”
বাড়ি ফিরে ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তানভীর বিষণ্ণতা নিমেষে উবে গেল। দেখল সেখানে বসে আছেন অভিক সাহেবের বোন পর্ণা দেবী এবং তাঁর দুই ছেলেমেয়ে—পবিত্র ও পেখম। পবিত্রর বয়স কুড়ি, আর পেখমের একুশ; দুজনেই তানভীর চেয়ে বড়। তানভী দ্রুত গিয়ে পর্ণা দেবীকে প্রণাম করল এবং পবিত্র ও পেখমের সঙ্গে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল। পর্ণা দেবী হাসি মুখে বললেন

-“বাবা কত বড় হয়ে গেছিস গুল্লু।”
আর্ভিক সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে আদেশের সুরে তানভী কে বলল,
-“যা, আগে ফ্রেশ হয়ে নে।”
তানভীর আজ আর্ভিকের অবাধ্য হতে ইচ্ছে করল না, সে সুবোধ বালিকার মতো উপরে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে তানভী যখন সবার সাথে গল্পে মশগুল, ঠিক তখনই তৃষাণ পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। তানভী অবাক হয়ে বলল
-“তুই এখনো বাড়ি যাসনি তৃষু? বাবা বলল তোকে সকালে নিয়ে যাবে।”
তৃষাণ আদুরে গলায় বলল
“না রে দিভাই, বাবার সকালে অফিসে কাজ ছিল তাই এখন নিতে আসবে।”
এরপর ওরা সবাই মিলে একসাথে আবার গল্পে মাতল। বিকেলের দিকে রুদ্র বাবু আসতেই পরিবেশটা এক ভিন্ন মাত্রা পেল। অনেক বছর পর পর্ণা দেবীকে দেখে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। পর্ণা ওনার বোনের মতো, তাই স্নেহের স্বরে জিজ্ঞেস করলেন

-“কেমন আছিস রে বোন?”
ভাই-বোনের সেই পুনর্মিলন সবার মনে এক পবিত্ৰ আনন্দ ছড়িয়ে দিল। রাখী রায়চৌধুরী সবার জন্য গরম চা আর নানা রকমের খাবার নিয়ে এলেন। কথায় কথায় অভিক সাহেব একটি প্রস্তাব রাখলেন
-“রুদ্র, গ্রামে তো অনেক বছর হলো যাওয়া হয় না। পৌষ সংক্রান্তির মেলাটা খুব জাঁকজমক হয় তুই তো জানিস। চল না, এবার সবাই মিলে গ্রামের বাড়ি যাই! একটা জমিয়ে পিকনিকও করা যাবে।”
পর্ণা দেবীসহ ছোটরা সবাই উৎসাহিত হয়ে উঠলেও রুদ্র বাবুর চোখেমুখে এক অজানা ভয়ের ছায়া পড়ল। গ্রাম, পুরনো স্মৃতি—সব মিলিয়ে কী এক অজানা আশঙ্কায় তাঁর মন ভারাক্রান্ত হলো। কিছু বলতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু অভিক সাহেব অভয় দিয়ে বললেন

-“আরে চিন্তা করিস না, কিচ্ছু হবে না।‌ ওখান থেকে ঘুরে এলে সবার ভালো লাগবে, তাছাড়া মামনি তোজো এরা তো কখনো যায়নি সেখানে। ওদেরও ভালো লাগবে।”
শেষমেশ রুদ্র বাবুও অনিচ্ছাসত্ত্বেও সম্মতি জানালেন।
উপস্থিত সকলের মুখে আনন্দ ফুটে উঠল। সেই মুহূর্তে আর্ভিক বাড়ির বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশ করল, তাকে দেখে তৃষাণ দৌড়ে গেল। আর্ভিক তৃষাণ কে কোলে নিল, তৃষাণ আর্ভিকের গলা জড়িয়ে ধরে উৎসাহিত হয়ে বলল
-“ভাইয়া জানো আমরা সবাই তোমাদের গ্ৰামের বাড়িতে যাচ্ছি।”
তৃষাণের কথাটা শুনে সকলে আনন্দিত চোখে আর্ভিকের দিকে তাকাল। কিন্তু আর্ভিকের অভিব্যক্তির কোনো প্রকার পরিবর্তন হল না বরং তা আরও উদাসীন হয়ে গেল। এই গ্ৰামের সাথে তার এক তিক্ত অতীত জুড়ে আছে। তৃষাণ ভ্রু কুঁচকে আর্ভিকের এমন মুখশ্রী দেখে জিজ্ঞাসা করল
-“কি হল ভাইয়া তুমি খুশি হও নি?”
আর্ভিক তৃষাণ কে কোলে থেকে নামিয়ে বলল
“হুমম”
তারপর সেখানে আর না দাঁড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে রাখী রায়চৌধুরী কে বলল
-“মা এক কাপ কফি পাঠাও তো”
রাখী রায়চৌধুরী ছেলের জন্য কফি বানাতে গেলেন। কিছুক্ষণ পর রুদ্র বাবু তৃষাণ কে নিয়ে সকলের থেকে বিদায় নিলেন।

রাতের নিস্তব্ধতা তখন অভিক সাহেবের বাড়িকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। ডাইনিং টেবিলের ঝাড়লণ্ঠনের মৃদু আলোয় সবাই একসঙ্গে রাতের আহারে বসেছে। বহু বছর পর গ্ৰামে যাওয়ার আমেজ থাকলেও তানভীর মনের ভেতর এক নীরব ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। আর্ভিক আর তানভী মুখোমুখি বসেছে; কিন্তু দুজনের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্বের এক অদৃশ্য দেয়াল। আর্ভিক একধ্যানে নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছে, তার গভীর চোখের অতলে কী ভাবনা লুকানো, তা বোঝার সাধ্য কারোর নেই।
তানভী একবার ভাতের গ্রাস মুখে তুলছে, আর পরক্ষণেই আড়চোখে তাকাচ্ছে আর্ভিকের সেই পাথরের মতো শান্ত মুখের দিকে। বন্ধুদের সেই কথাগুলো বিষাক্ত তীরের মতো তার হৃদয়ে বিঁধছে—”ভালোবাসা মানেই কি তবে এই ব্যাকুলতা?” আর্ভিক তানভীর এই অস্থির চাউনি অনুভব করতে পারছিল, কিন্তু সে কিছুই বলল না। কোনো কথা না বলে, নিস্পৃহভাবে খাওয়া শেষ করে সে টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। একে একে সবাই বিদায় নিল, ডাইনিং রুমটা এক বিষণ্ণ শূন্যতায় ডুবে রইল।

নিজের ঘরের অন্ধকার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে তানভী রাতের আকাশের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল। বিছানায় শুয়েও তার চোখের পাতা এক হতে চাইছিল না। মাথার ভেতর কেবল একটা প্রশ্নই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—”আমি কি তবে সত্যিই আর্ভিক ভাইয়ের প্রেমে পড়েছি? কিন্তু ওনার মনে কী আছে? উনি কি কেবল দায়িত্বের খাতিরে আমাকে আগলে রাখেন, নাকি এই শাসনের আড়ালে অন্য কিছু আছে?”
জানলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া হিমেল হাওয়া তানভীর তপ্ত কপালে পরশ দিয়ে গেল। একদিকে হৃদয়ের গহীন টান, আর অন্যদিকে অনিশ্চয়তার ভয়—এই দুইয়ের দোলাচলে দুলতে দুলতে এক সময় ক্লান্ত সপ্তদশী ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল।

আর্ভিকের ঘরের আবহাওয়া এখন অনেকটা ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতার মতো। তিন কোণে তিনজন বসে একাউন্টেন্সির পরীক্ষা দিচ্ছে—বিছানায় রিকি, সোফায় তানভী, আর পড়ার টেবিলে মেঘাদ্রি। আর্ভিক দশ মিনিটের জন্য বাইরে যাওয়ার আগে গম্ভীর মুখে বলে গেছে,
-“২০ মিনিট পর ফিরছি, সব যেন কমপ্লিট হয়। আর না হলে থাপ্পড় মেরে গালে পাঁচটা আঙুলের দাগ বসিয়ে দেবো।”
অথচ তিনজনেরই খাতা তখন গঙ্গার সাদা বালির মতো খাঁ খাঁ করছে। নীরবতা ভেঙে রিকি বলল
-“আর্ভিক দাদা কি বলতো? অন্তত একদিন আগে তো বলতে পারতো! প্রিপারেশন ছাড়াই কি একাউন্টেন্সি নামানো যায়?”
মেঘাদ্রি নিজের অক্ষমতার রাগটা ঝাড়ল রিকির ওপর। ঝাঁঝালো গলায় বলল

-“চুপ করবি? নিজে তো লবডঙ্কা পারিস, আবার বড় বড় কথা!”
রিকি মুখটা বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলল
-“হুমমম্! উনি তো একেবারে ব্যালেন্স শিট মিলিয়ে উদ্ধার করে দিচ্ছেন!”
কথাটা শেষ হতে না হতেই মেঘাদ্রি হাতের পেনটা রকেটের গতিতে ছুড়ে মারল রিকির দিকে। রিকি মাথা সরিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারল না। কপালে পেনটা ‘ঠক’ করে লাগল, সে যখন চেঁচাতে যাবে, তখনই সোফা থেকে অভিভাবকের মতো তানভী বলে উঠে
-“এই, থামবি তোরা? আর্ভিক ভাই দেখলে কিন্তু তিনজন কে তুলে আছাড় মেরে হাড়গোড় আর আস্ত রাখবেন না।”
মেঘাদ্রি এবার তানভীর দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করল
-“আচ্ছা তানভী, সিনু দাদা আমাদের হুট করে এই শনির দশা—মানে পরীক্ষা দিতে ডাকল কেন বলতো?”
তানভী কাঁচুমাচু হয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,

-“আসলে… আমিই বলেছিলাম।”
রিকি আর মেঘাদ্রি সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল
-“কী!”
তানভী আমতা আমতা করে বলল
-“আজকে সকালে আর্ভিক ভাই হুট করে এসে বললেন বিকালে একটা টেস্ট নেব। প্রিপারেশন আমার জিরো। ভাবলাম একা বকা খেয়ে কী হবে? তোদের সাথে নিয়ে খেলে বকাটা অন্তত ভাগাভাগি হবে। তাই আর্ভিক ভাই কে বললাম আমি একা পরীক্ষা দেব না… রিকি আর মেঘাদ্রি যদি পরীক্ষা দেয় তাহলে দেব। সরি রে!”
রিকি আর মেঘাদ্রি একে অপরের দিকে তাকাল। রাগে আর বিস্ময়ে ওদের বাকশক্তি তখন নিখোঁজ। রিকি অনেক কষ্টে মুখ খুলে বলল
-“তোর ওই ‘সরি’ টা দিয়ে কি এখন ডেবিট-ক্রেডিট মেলাবো? তুই তো আস্ত একটা কালপ্রিট!”
মেঘাদ্রি খাতাটা মুড়িয়ে বলল
-“শোন তানভী, সিনু দাদা আসার আগে তোকে যদি আমি আজ মার্ডার করি, আদালত আমাকে নির্দোষ ঘোষণা করবে। তুই তো দেখি একটা আস্ত ব্যাক্টেরিয়া। বন্ধুত্বের নামে তো দেখছি আমাদের একদম যমালয়ে পাঠিয়ে দিলি!”
তাদের কথার মাঝখানে দরজা খোলার শব্দে তিনজনের হৃৎপিণ্ড যেন গলায় এসে ঠেকল। তিনজনের মনে হলো যমরাজ বুঝি স্বয়ং এসে উপস্থিত হয়েছেন। আর্ভিক রুমে ঢুকতেই ওরা এমন মুখ করে তাকাল যেন সবেমাত্র এক বাটি নিমপাতা খেয়ে উঠেছে। আর্ভিক রুম জুড়ে একবার পায়চারি করল, তারপর হাতের ঘড়িতে শেষবারের মতো সময় দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল

-“সময় শেষ। খাতাগুলো জমা কর।”
আর্ভিক গিয়ে বসল বিছানায় রিকির পাশে। রিকি যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু আর্ভিক ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল
-“আরে বোস, পালাচ্ছিস কেন?”
রিকি কাঁচুমাচু হয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। তোতলামি করে বলল
-“না… না দাদা, আমি আসলে দাঁড়িয়ে থাকতে খুব ভালোবাসি।”
তানভী আর মেঘাদ্রি কাঁপাকাঁপা হাতে খাতাগুলো আর্ভিকের দিকে এগিয়ে দিল। খাতা তিনটে খুলেই আর্ভিকের ভ্রু কুঁচকে কপালে উঠে গেল। রিকির খাতা একদম মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। মেঘাদ্রি যে থিওরিটা লিখেছে, তার অর্থ স্বয়ং বিধাতাও বুঝবেন কি না সন্দেহ। আর তানভীর ব্যালেন্স শিটের দুই পাশ যেন আকাশ আর পাতাল।
আর্ভিক খাতাগুলো বন্ধ করে একটা মিষ্টি কিন্তু অপমানজনক হাসি হাসল। তারপর প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল

-“বাহ! তোদের মেধা দেখে তো আমার চোখে জল চলে আসছে। তোরা যে এত বড় মাপের শিল্পী, সেটা আজ বুঝতে পারলাম। রিকি তো সাদা খাতা জমা দিয়ে নীরব প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আর মেঘাদ্রির থিওরি? এটা পড়লে খোদ একাউন্টেন্সির জনকও হার্ট অ্যাটাক করতেন।”
এরপর তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“সাব্বাস তানভী! তোর ব্যালেন্স শিটের দুই পাশ তো দেখি উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরু। এদের জীবনেও মিলন হবে না। তুই কি অংক করেছিস না কি বিচ্ছেদ নাটক লিখেছিস? তোর ব্যালেন্স শিটের এক পাশ যদি কাশ্মীর হয়, অন্য পাশ তো দেখি কন্যাকুমারী!”
এবার মেঘাদ্রি আর রিকির দিকে ফিরে সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল
-“তোদের তিনজনের গ্রুপের নাম যেন কী? ওহ হ্যাঁ, ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’! নামটা শুনে ভেবেছিলাম তোরা বোধহয় পড়াশোনায় খুব খতরনাক। কিন্তু তোদের এই পারফরম্যান্স দেখে তো মনে হচ্ছে নামটা পাল্টে ‘গাধা গ্রুপ’ রাখলে বেশ মানাত। তোদের পার্সোনালিটির সাথে নামটা বেশ দারুণ যেত। যদিও তোদের গাধা বললে আবার গাধাদের অপমান করা হবে।”

শেষে খাতাগুলো দড়াম করে টেবিলের ওপর ফেলে আর্ভিক বলল
-“শোন, আমি গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে আসব, তারপর আবার তোদের টেস্ট নেব। সেদিনও যদি তোরা কিছু না পারিস, তবে মনে রাখিস, কোনো অংক মিলুক আর না মিলুক, তোদের প্রত্যেকের মাথা আমি এই ক্যালকুলেটর দিয়ে ভেঙে ঠিকই মিলিয়ে দেব। এখন বিদায় হ!”
আর্ভিক সোফায় গা এলিয়ে দিতেই রিকি চনমনে গলায় বলে উঠল
-“দাদা, তুমি গ্রামের বাড়ি যাচ্ছ?”
তানভী পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলল ‘আর্ভিক ভাই এমনিতেই রেগে আছেন, তার ওপর রিকি এমন অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছে উনি না আবার রিকিকে আছাড় দেন’। কিন্তু তানভী কে অবাক করে দিয়ে আর্ভিক শান্ত স্বরে বলল
-“হ্যাঁ, আমরা সবাই যাচ্ছি পরশুদিন।”
তানভী যেন আকাশ থেকে পড়ল। মনের ভেতর উঁকি দিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন—’বাবা! রাবণটা কবে থেকে এত ভালো হয়ে গেল?’
রিকি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল

-“তানভী তুই কী লাকি রে! শহরের মেয়ে হয়ে গ্ৰাম দেখার সুযোগ পাচ্ছিস। গ্রাম নাকি খুব সুন্দর হয়, বিশেষ করে এই শীতকালে। আমার সব আত্মীয়ের বাড়ি কলকাতায়, তাই কোনোদিন গ্রাম দেখাই হলো না।”
মেঘাদ্রিও পাশ থেকে সায় দিয়ে বলল
-“আমারও খুব ইচ্ছা, কিন্তু কপাল!”
আর্ভিক কিছু ভেবে নিয়ে ওদের কে বলল
-“যা, এখন বাড়ি গিয়ে প্যাকিং কর। পরশু বেরোতে হবে।”
রিকি আর মেঘাদ্রি হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। গ্ৰামে যাবে ওনারা অথচ প্যাকিং করতে বলছে ওদের? রিকি আমতা আমতা করে জিজ্ঞাসা করে
-“আমরা প্যাকিং করব কেন?”
আর্ভিক তাচ্ছিল্যের সুরে বলল
“এই জন্যই তোদের গাধা বলি! তোরাও আমাদের সাথে যাচ্ছিস। প্রেম আর নীলাদ্রিকে কাল রাতে বলেছি। ওরা হয়তো তোদের বলেনি। এখন যা, পরশু সকালেই রওনা দেব।”
আনন্দে ডগমগ হয়ে রিকি আর মেঘাদ্রি এক ছুটে যে যার বাড়ির দিকে রওনা দিল। তানভীও নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিল, এমন সময় আর্ভিক বলে উঠল
-“দাঁড়া তানভী! তৈরি হয়ে আয়, আমার সাথে বেরোতে হবে।”
তানভী থমকে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে কারণ জানতে চাইল। আর্ভিক কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু শান্ত অথচ কড়া গলায় বলল
-“you have only 10 minutes”
তানভী আর দ্বিতীয় বাক্য খরচ করার সাহস পেল না, ঝড়ের গতিতে নিজের রুমের দিকে ছুটল।

কেনাকাটার পর্ব শেষে আর্ভিক তানভীকে একটা আইসক্রিম কিনে দিল। আইসক্রিমের কামড়ে তানভী যখন পরম তৃপ্তিতে মশগুল, তখনই আর্ভিক ওকে নিয়ে ঢুকল এক মস্ত বড় ঘুড়ির দোকানে। সেখান থেকে প্রায় হাজার পিস ঘুড়ি কেনা দেখে তানভী থতমত খেয়ে বলল
-“এত ঘুড়ি দিয়ে কী করবেন আর্ভিক ভাই?”
আর্ভিক নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল
-“ঘুড়ি দিয়ে মানুষ কী করে?”
তানভী বোকার মতো বলল
-“উড়ায়!”
আর্ভিক পাল্টা জবাব দিল
-“তাহলে জানিস যখন, তখন প্রশ্ন করছিস কেন?”
তানভী তবুও বিড়বিড় করল,
-“কিন্তু তাই বলে হাজার পিস!”
আর্ভিক ধমক দিয়ে বলল
-“কথা কম বল, গিয়ে বাইকের কাছে দাঁড়া।”
তানভী আইসক্রিমে মজে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল, এমন সময় বেপরোয়া এক গাড়ি আরেকটু হলে ওকে প্রায় পিষে দিচ্ছিল। আর্ভিক বিদ্যুৎবেগে তানভীর হাত টেনে ধরল। রাগে ফেটে পড়ে আর্ভিক বলল
-“রাস্তা পার হতে শিখিস নি??”
আর্ভিক আর তানভীকে একা ছাড়ল না, হাত শক্ত করে ধরে বাইকের কাছে নিয়ে এল। তারপর দোকানে গিয়ে টাকা পরিশোধ করে ঘুড়ি গুলো নিয়ে বাইক স্টার্ট দিল।

চৌধুরী নিবাস, ঘড়িতে তখন সন্ধ্যে ৬টা বাজে। রাখী রায়চৌধুরী পর্ণা দেবী নিজেদের রুমে গ্রামে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছাতে ব্যাস্ত। ঋষি তার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেছে। অভিক সাহেব রুমের বেলকনিতে আরাম কেদারায় বসে চা খাচ্ছিলেন। নিচে বসার ঘরে সোফায় বসে পেখম আর পবিত্র টিভি দেখছিল, হাজার পিস ঘুড়ি হাতে আর্ভিক কে ঢুকতে দেখে পেখম আর পবিত্রর চোখ তো চড়কগাছ! পবিত্র অবাক হয়ে প্রশ্ন করল
-“ভাইয়া, এত ঘুড়ি দিয়ে কী হবে?”
আর্ভিক হালকা হেসে উত্তর দিল
-“ওখানে পৌষ সংক্রান্তির গঙ্গাস্নানের মেলায় দুদিন ধরে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব হয়। ওই জন্যই একবারে নিয়ে নিলাম।”
এই বলে ঘুড়ির বান্ডিলগুলো বগলদাবা করে নিজের রুমে চলে গেল। এদিকে ঝক্কি সামলে তানভী একটু আয়েশ করে পেখমের সাথে গল্প জমাবে ভেবেছিল, কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই আর্ভিক পেছন না ফিরে কড়া গলায় আদেশ দিল
-“তানভী, গল্প ছেড়ে এখন চুপচাপ গিয়ে পড়তে বস।”
আর্ভিকের সেই অমোঘ নির্দেশ শুনে তানভীর গল্প করার শখ নিমেষেই কর্পূরের মতো উবে গেল।

পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন সকাল বেলা। অভিক সাহেব ও রুদ্র বাবুর পরিবারসহ সকলে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িতে লাগেজ তোলা নিয়ে ব্যস্ততার মাঝেই মেঘাদ্রি, নীলাদ্রি ও সোহাগ এসে পৌঁছালেও দেখা নেই শুধু প্রেম আর রিকির। সকাল সাতটায় রওনা দেওয়ার কথা থাকলেও ঘড়ির কাঁটা যখন দশটা ছুঁইছুঁই, তখন উদয় হলো সেই কাঙ্ক্ষিত দুই মক্কেলের।
তাদের দেখামাত্রই আর্ভিক রাগী গলায় গর্জে উঠল
-“তোদের ঘড়িতে মনে হয় সবে সাতটা বাজছে, তাই না? আমাদের ঘড়িতে কিন্তু দশটা! এতক্ষণ কী করছিলি তোরা?”
সোহাগ ঝাঁঝালো স্বরে টিপ্পনী কাটল
-“আর বলবেন না আর্ভিক দাদা! এই ছেলে এত কেয়ারলেস…যে কি বলব। কে যে একে আইপিএস অফিসার বানিয়েছে, ভগবান জানে। !”
সোহাগের কথায় হাসির রোল উঠল সবার মাঝে।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৩৭+৩৮

অভিক সাহেব তাড়া দিলে সবাই একে একে গাড়িতে উঠে পড়ল। সোহাগ কটমট করে তাকালে প্রেম একটা বোকা হাসি দিয়ে লাগেজ তুলে গাড়িতে উঠল। এরপর তিনটি গাড়ি ছুটল মথুরাপুর গ্রামের উদ্দেশ্যে।
প্রথম গাড়িতে রুদ্র বাবু, দোয়েল ব্যানার্জী, অভিক সাহেব, রাখী রায়চৌধুরী ও পর্ণা দেবী। দ্বিতীয় গাড়িতে ঋষি, নীলাদ্রি, প্রেম, সোহাগ আর পবিত্র। তৃতীয় গাড়িতে আর্ভিক, তানভী, রিকি, মেঘাদ্রি, পেখম আর তৃষাণ।
ড্রাইভিং সিটে আর্ভিক। তার পাশের সিটে বসে তৃষাণ একমনে গেম খেলছে। আর্ভিক ড্রাইভ করতে করতে মাঝে মাঝেই লুকিং গ্লাসে পেছনে বসা তানভীকে দেখছিল। হঠাৎ আয়নায় দুজনের চোখাচোখি হতেই আর্ভিক দ্রুত চোখ সরিয়ে গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দিল, আর তানভী লজ্জায় মাথা নিচু করল। ট্রাফিকের জন্য প্রায় চার ঘণ্টা দেরিতে হলেও অবশেষে শহর ছাড়িয়ে স্নিগ্ধ মাটির গন্ধে ঘেরা সেই গ্রামে পৌঁছাল সবাই।

ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪১+৪২