ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪৩+৪৪
তানিশা ভট্টাচার্য্য
রায়চৌধুরী এস্টেটের রান্নাঘরটা আজ যেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ, আর তার অঘোষিত সেনাপতি তানভী। উনুনের গনগনে আঁচ আর মশলার ঝাঁঝালো গন্ধে চারিদিক ম ম করছে। তানভী আজকে শাড়ি পড়েছে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম সে শাড়ির আঁচল কোমরে জড়িয়ে লড়াকু ভঙ্গিতে বিশাল কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছে।
কিন্তু আসল নাটকটা জমে উঠেছে রান্নাঘরের দরজার ঠিক বাইরে। আর্ভিক দরজার চৌকাঠের আড়ালে দাঁড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে ভেতরে উঁকি মারছে। ওর হাতে একটা জলের গ্লাস, যেন ও খুব তৃষ্ণার্ত, কিন্তু আসলে ওর নজর তড়তড় করে ফুটতে থাকা মাংসের কড়াই আর ঘর্মাক্ত তানভীর দিকে। তানভী মশলা দিতে গিয়ে একটু কাশতেই আর্ভিক আঁতকে উঠল, সে পা বাড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখনই পিছন থেকে জোড়া আক্রমণ এল।
-“কিরে আর্ভিক? রান্নাঘরের দরজায় অত ভক্তিভরে কী দেখছিস? মা অন্নপূর্ণাকে নাকি?”
প্রেমের গলা শুনে আর্ভিক এমনভাবে চমকে উঠল যেন হাতেনাতে ধরা পড়া চোর। প্রেমের পাশেই দাঁড়িয়ে নীলাদ্রি। সে মুচকি হেসে আর্ভিকের কাঁধে হাত রাখল
-“বলি ভাই, শর্ত তো ছিল তানভী একাই রাঁধবে। তুই কেন এখানে সিআইডি-র মতো নজরদারি করছিস? যা, ও ঘরে গিয়ে বস।”
আর্ভিক গম্ভীর হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল
-“না মানে, ও যদি আবার বেশি নুন দিয়ে ফেলে সব নষ্ট করে দেয়, তাই একটু সাবধান করতে যাচ্ছিলাম। তাছাড়া ধোঁয়ায় ওর খুব কষ্ট হচ্ছে…”
প্রেম আর নীলাদ্রি একে অপরের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে বাঁকা হাসি বিনিময় করল। প্রেম এবার আর্ভিকের অন্য কাঁধে হাত রেখে ওকে ঘোরানোর চেষ্টা করে বলল
-“বউয়ের জন্য এত চিন্তা! আরে বাবা, নুন বেশি হলে আমরা খাব, তোর এত চিন্তা কিসের? আর ধোঁয়া? সে তো রান্নায় হবেই। তুই বরং চল আমাদের সাথে, বাইরের বারান্দায় আড্ডাটা জমাই।”
আর্ভিক কিছুতেই নড়তে চায় না। ও একবার আড়চোখে দেখল তানভী কড়াইয়ের ঢাকনাটা সরাচ্ছে। আর্ভিক মরিয়া হয়ে বলল
-“আরে ভাই ছাড় আমায়, ওটা বড্ড গরম আর ভারি, আমি জাস্ট একটু সাহায্য করে আসছি।”
নীলাদ্রি এবার বেশ জোরেই হেসে ফেলল
-“উফ! আর্ভিক তানভী খুব সুন্দর রান্না করছে, তুই ভেতরে গিয়ে ওর কনফিডেন্স নষ্ট করিস না।”
প্রেম আর নীলাদ্রি দুজনে মিলে প্রায় জোর করেই আর্ভিককে ঠেলতে ঠেলতে বৈঠকখানার দিকে নিয়ে চলল। আর্ভিক বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে রান্নাঘরের দিকে করুণ চোখে তাকাচ্ছিল, যেন তাকে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওদিকে রান্নাঘরে তানভী সবটা আড়ালে শুনে মুখ টিপে হাসছে। শেষ পর্যন্ত আর্ভিককে হার মানতে হলো প্রেমের জোরাজুরিতে, কিন্তু ওর মনটা তখনো রান্নাঘরে পড়ে রইল।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে যখন ডাইনিং টেবিলের রাজকীয় চিনেমাটির বাসনে ধোঁয়া ওঠা মাংস আর সুগন্ধি পোলাও সাজানো হলো, তখন সারা বাড়ি এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মগ্ন। বড়রা সবাই তৃপ্তির হাসি নিয়ে আসন গ্রহণ করলেন। আর্ভিক সবার শেষে এসে বসল। প্রথম গ্রাসটা মুখে তুলেই রাখী রায়চৌধুরী বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বললেন
-“ওরে গুল্লু! তুই তো দেখি আমাদের সবাইকে টেক্কা দিবি! মাংসের মশলাটা যা কষিয়েছিস না, একেবারে যেন পুরনো দিনের সেই ঠাকুরবাড়ির স্বাদ।”
আর্ভিকের ঠাকুমা পাশ থেকে সায় দিয়ে বললেন
-“ঠিক বলেছিস বৌমা, লঙ্কার ঝাল আর নুনটা একেবারে কাঁটায় কাঁটায় হয়েছে। আমাদের বাড়ির লক্ষ্মীটি তো দেখি অন্নপূর্ণা!”
দোয়েল ব্যানার্জী, রুদ্র বাবু, অভিক সাহেব সকলেই তানভীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বড়দের এমন অকুন্ঠ প্রশংসা শুনে তানভীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখে যেন খুশির লাল আভা ফুটে উঠল। ও আড়চোখে আর্ভিকের দিকে তাকাল। আর্ভিক তখন খুব ধীরস্থিরভাবে এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে চিবোচ্ছে। ওর মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, যেন ও খুব গভীর কোনো বিচারকের আসনে বসেছে। প্রেম পাশ থেকে খোঁচা দিয়ে ফিসফিস করে বলল
-“কী রে আর্ভিক? কিছু বল নাকি বউয়ের হাতের রান্না খেয়ে বোবা হয়ে গেলি!”
আর্ভিক খাওয়া থামিয়ে সোজা তানভীর চোখের দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো সময়টা থমকে গেছে। তারপর ওর সেই গম্ভীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুর্লভ হাসি ফুটে উঠল। আর্ভিক মৃদু স্বরে বলল
-“শর্ত তো ছিল তুই রান্না করবি, কিন্তু তুই তো দেখি জাদু করেছিস। মাংসটা সত্যিই খুব নরম হয়েছে আর স্বাদটা… স্বাদটা ঠিক আমার মায়ের হাতের রান্নার মতো হয়েছে।”
আর্ভিকের এই একটি বাক্য তানভীর সারাদিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দিল। বিশেষ করে ওর মায়ের হাতের রান্নার সাথে তুলনা করাটা তানভীর কাছে পৃথিবীর সব পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল।
দুপুরের সেই রাজকীয় ভূরিভোজের পর এস্টেটের একটা বড় ঘরে এখন এক আলসেমির মেলা বসেছে। জানলার সব পর্দাগুলো টেনে দেওয়ায় ঘরটা আবছা অন্ধকারে ডুবে আছে, আর বাইরে ঝিমঝিম রোদে ঘুঘু ডাকছে। এই আয়েশি দুপুরে সবাই মিলে বড় বিছানার ওপর জাঁকিয়ে বসেছে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য।
তৃষাণ বিছানার একপাশে উপুড় হয়ে শুয়ে খুব মন দিয়ে মোবাইলে গেম খেলছে। ওর ঠিক পাশেই রিকি আয়েশ করে চিৎ হয়ে শুয়ে। কিন্তু রিকির বিশ্রামের ধরনটা একটু বিচিত্র। সে আপন মনে তৃষাণের পিঠের ওপর নিজের একটা ভারি পা তুলে দিয়ে দোল খাচ্ছে। তৃষাণ প্রথমটায় গেমের নেশায় কিছু বলেনি, কিন্তু কিছুক্ষণ পর পিঠের ওপর হিমালয় সদৃশ ভার সহ্য করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে মুখ ফেরাল। তৃষাণ দাঁতে দাঁত চেপে রিকির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল
-“আচ্ছা রিকি দাদা, একটা কথা বলি? তিল তিল করে মরা ভালো নাকি একেবারে মরে যাওয়া ভালো?”
রিকি আধা-ঘুমন্ত চোখে হাই তুলে উত্তর দিল
-“উমম…আমার মতে একেবারে মরে যাওয়াই ভালো, ঝামেলা কম।”
তৃষাণ গম্ভীর মুখে বলল
-“তাহলে তোমার আর একটা পা-ও আমার ওপর তুলে দাও। একবারে শেষ হয়ে যাই আমি!”
তৃষাণের বিদ্রূপটা রিকির মাথায় ঢুকল না, বরং সে এটাকে সুযোগ হিসেবে লুফে নিল।
-“আরে, তুই যখন এত করে বলছিস, তখন না বলি কী করে!”
বলতেই দেরি, কিন্তু করতে নয়—রিকি ধপাস করে ওর দ্বিতীয় পা-টাও তৃষাণের পিঠের ওপর তুলে দিল।
-“আআআহ! গেছি রে!”—তৃষাণ এবার ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল।
ওর আর্তনাদে সারা ঘরের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল।
কাছেই তানভী বসে ডায়েরি লিখছিল। তৃষাণের অবস্থা দেখে ও রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করে রিকির দিকে তেড়ে এল।
-“এই বাঁদর! কী করছিস এটা? সর বলছি! আমার ছোট ভাইটাকে কি আজ মেরেই ফেলবি নাকি? তোর এই হাতির মতো পা দুটো কি আর কোথাও রাখার জায়গা পাচ্ছিস না?”
তানভীর ধমক খেয়ে রিকি অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি পা নামিয়ে নিল। ওদিকে তৃষাণ পিঠ ডলতে ডলতে রিকিকে অভিশাপ দিচ্ছে আর তানভী পরম মমতায় ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পিঠ ডলতে ডলতে তৃষাণ হঠাৎ এক রহস্যময় হাসি হেসে রিকির দিকে তাকাল। তারপর রিকির কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল
-“রিকি দাদা, শর্তের কথা মনে আছে তো?”
রিকি একটা লম্বা হাই তুলে বিরক্তিতে মুখটা ভেংচির মতো কুঁচকে বলল
-“উফ! তোর স্মৃতিশক্তি তো দেখি আইস্টাইনের চেয়েও বেশি। এক মুহূর্তও কি শান্তি দিবি না? আচ্ছা বাবা, বলছি, শোন।”
এরপর রিকি গলা খাঁকারি দিয়ে একদম গম্ভীর মুখ করে শুরু করল
-“এক ছিল কাক। ভীষণ তার তেষ্টা পেয়েছে। সে এদিক-ওদিক উড়তে উড়তে দেখল একটা কলসি…”
তৃষাণ চোখ বড় বড় করে আকাশ থেকে পড়ল। এরপর বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলল
-“অ্যাঁ! তৃষ্ণার্ত কাকের গল্প? রিকি দাদা, এটা তো আমি নার্সারিতে পড়েছি! তুমি কি আমায় বাচ্চা পেয়েছ?”
রিকি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বিজ্ঞের মতো বলল
-“আরে বাবা, মূল গল্পটা এক হলেও আমার ভার্সনটা আলাদা। এই কাকটা আসলে মর্ডান কাক। সে নুড়ি পাথর না ফেলে কলসির ভেতর পাইপ ঢুকিয়ে জলের বদলে কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়ার কথা ভাবছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, পাইপটা ছিল ফুটো…”
রিকির এই অদ্ভুত আর গাঁজাখুরি ‘মডার্ন কাকের’ গল্প শুনে তানভী আর বাকিরা হেসেই কূল পাচ্ছিল না। তৃষাণ কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল। শর্ত অনুযায়ী গল্প তো রিকি বলছেই, কিন্তু সেটা যে এমন হাস্যকর এক মোড় নেবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। কিন্তু রিকির গাঁজাখুরি গল্প শুনে তৃষাণ মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারল না। সে বিছানায় পা ঠুকে আবদার ধরল
-“না রিকি দাদা, ওসব ছোটদের গল্প দিয়ে আমাকে ভোলাতে পারবে না। শর্ত অনুযায়ী একটা জম্পেশ রোমাঞ্চকর গল্প বলতে হবে। শুরু করো দেখি!”
রিকি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর গলায় শুরু করল
-“ঠিক আছে, শোন। এক বিশাল ঘন জঙ্গল। চারদিকে থমথমে অন্ধকার। সেই জঙ্গলের সরু পথ দিয়ে একটা প্রকাণ্ড বাঘ আর একটা ধূর্ত শিয়াল পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে। বনের পশুপাখিরা ভয়ে কুঁকড়ে আছে তাদের পায়ের শব্দে…”
এইটুকু বলে রিকি হঠাৎ একদম চুপ হয়ে গেল। ঘরজুড়ে পিনপতন নিস্তব্ধতা। তৃষাণ উত্তেজনায় বালিশটা বুকে চেপে ধরে রিকির মুখের দিকে চেয়ে আছে পরের রোমহর্ষক মোড়টা শোনার জন্য। এক মিনিট কাটে, দুই মিনিট কাটে, রিকি নির্বিকার চিত্তে জানলার বাইরের উড়ন্ত ফড়িং দেখছে।
ধৈর্য হারিয়ে তৃষাণ জিজ্ঞেস করল
-“তারপর? তারপর কী হলো রিকি দাদা? বাঘটা কি শিয়ালটাকে খেয়ে ফেলল? নাকি কোনো শিকার দেখতে পেল?”
রিকি খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল
-“আরে না না, অত তাড়াহুড়ো করিস কেন? ওরা তো এখনো হেঁটেই যাচ্ছে। জঙ্গলটা অনেক বড় তো, পথ আর শেষ হচ্ছে না!”
রিকির এই ‘অনন্ত হাঁটা’র কথা শুনে তৃষাণ কয়েক সেকেন্ড হা করে তাকিয়ে রইল। বিছানার এক পাশে বসে থাকা তানভী আর মেঘাদ্রি ততক্ষণে হাসতে হাসতে বিছানায় লুটিয়ে পড়েছে। তৃষাণ বালিশটা তুলে রিকির দিকে ছুড়ে মেরে চেঁচিয়ে উঠল
-“তোমার এই বাঘ-শিয়াল কি কাল সকাল পর্যন্ত হাঁটতেই থাকবে? এটা কোনো গল্প হলো!”
রিকি তখন আয়েশ করে পাশ ফিরে শুয়ে বলল
-“গল্পে গরু গাছে ওঠে শুনেছিস, আমার বাঘ-শিয়াল না হয় একটু বেশিই হাঁটল! এখন যতক্ষণ না ওদের হাঁটা শেষ হচ্ছে ততক্ষণ আমাকে বিরক্ত করবি না।”
এই বলে রিকি একটু ঘুমাতে যাবে তখনই আর্ভিকের গম্ভীর কিন্তু উৎসাহী গলার স্বর শোনা গেল। দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে আর্ভিক একগাল হেসে বলল
-“কী হলো তোরা এখনো বিছানায় পড়ে আছিস! চটপট রেডি হয়ে নে সবাই, আমরা এখন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসব।”
তৃষাণ এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উত্তেজনায় জিজ্ঞেস করল
-“ঘুরতে যাব? কিন্তু কোথায় ভাইয়া?”
আর্ভিক পকেটে হাত ঢুকিয়ে আয়েশ করে উত্তর দিল
-“আজ আমরা যাব ডায়মন্ড হারবার নদীর পাড়ের।”
নদীর নাম শুনেই সবার মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। সবাই হইহই করে নিজেদের ঘরের দিকে ছুটল তৈরি হওয়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর যখন সবাই নিচে হলঘরে জড়ো হলো, তানভীকে দেখে আর্ভিকের চোখের মণি দুটো এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তানভীর পরনে আজ একটা চমৎকার আকাশী রঙের ব্যাগি জিন্স আর সাদা রঙের ওপর এথনিক প্রিন্টের একটা কুর্তি। ওর কবজিতে রয়েছে আর্ভিকের দেওয়া সেই স্মার্টওয়াচটা।
অন্যদিকে আর্ভিককেও আজ বেশ মানিয়েছে; ধূসর রঙের একটা ফর্মাল প্যান্টের সাথে সে পরেছে মিউজিক লোকাল ব্র্যান্ডের একটা স্টাইলিশ শার্ট। ওর ব্যক্তিত্বে সবসময়ই একটা গাম্ভীর্য থাকে, কিন্তু আজ ওকে বেশ প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে।
বাড়ির বাইরে তখন দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। রিকি আর তৃষাণ সবার আগে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিট দখল করে নিল। তানভী এসে দেখল সব সিট বুকিং শুধু ড্রাইভিং সিটের পাশের মানে আর্ভিকের পাশের সিটটা খালি। তানভী তৃষাকে গিয়ে বলল
-“তৃষু আর্ভিক ভাইয়ের পাশে গিয়ে বস”
তৃষাণ ডোন্ট কেয়ার ভাব করে বসে রইল। তানভী এবার কিছুটা রেগে গিয়ে বলল
-“তৃষু ৫ মিনিটের মধ্যে ওখানে গিয়ে না বসলে তোকে কী করব আমি নিজেও জানি না।”
-“আর তুই ২ মিনিটের মধ্যে ওখানে গিয়ে না বসলে আমি তোকে কী করব আমি নিজেও জানি না।”
হঠাৎ করে পিছন থেকে আর্ভিকের এমন ধমকানো কন্ঠস্বর শুনে তানভী কিছুটা আঁতকে উঠল। সে আর কিছু না বলে গুটি গুটি পায়ে আর্ভিকের পাশের সিটে বসার জন্য এগিয়ে গেল। আর্ভিক আলতো করে ওর জন্য দরজাটা খুলে ধরল। তানভী সিটে বসে আর্ভিকের দিকে একটা ভেংচি কাটলো। আর্ভিক সেটা দেখে মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল।
মথুরাপুর থেকে ডায়মন্ড হারবারের দূরত্বটুকু পেরোতে ঘড়ির কাঁটায় মোটে পঁয়তাল্লিশটা মিনিট খরচ হলো। ঘড়িতে তখন বেলা সাড়ে তিনটে কি পৌনে চারটে; বিকেলের নরম রোদে মেঠো পথ আর শহরের ঘিঞ্জি গলি পেরিয়ে আর্ভিকরা যখন নদীর পাড়ে এসে থামল, তখন চারপাশ এক মায়াবী আবেশে ঢাকা।
গাড়ি থেকে নামতেই নদীর দিক থেকে আসা এক ঝাপটা কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস সবাইকে যেন নতুন করে জাগিয়ে তুলল। ডায়মন্ড হারবারের নদীর এই বিশাল রূপ দেখে তৃষাণ তো থমকে দাঁড়িয়ে গেল। যতদূর চোখ যায়, কেবল রুপোলি জলের অবিরাম বয়ে চলা। নদীর বুকে ছোট ছোট নৌকা আর দূরে লঞ্চগুলো খেলনার মতো ভাসছে। শহরের কোলাহল এখানে এসে নদীর বিশালতার কাছে হার মেনেছে। নদীর ধারের বাঁধানো পাড়, সারিবদ্ধ গাছপালা, কয়েকটা খাবারের দোকান আর বসার জন্য অনেক সুন্দর কাঠের বেঞ্চ রয়েছে। রিকি গাড়ি থেকে নেমেই দু-হাত ছড়িয়ে দিয়ে শাহরুখ খানের কায়দায় একটা পোস দিয়ে বলল
-“আহ! এই তো জীবন! নদীর হাওয়া, সাথে আমরা আর… আরে তৃষাণ, ওই দেখ ফুচকা!”
বলেই রিকি ছুটল ফুচকার দিকে। ওদিকে সোহাগ আর প্রেম ততক্ষণে নদীর রেলিংয়ে হেলান দিয়ে সেলফি তোলায় ব্যস্ত। রিকি ফুচকা মুখে দিয়ে এক বিচিত্র শব্দ করে উঠল, কারণ লঙ্কার ঝালে ওর কান দিয়ে তখন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ও ছটফট করতে করতে পাশের একজনের হাত থেকে জলের বোতল কেড়ে নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল। পরে জানা গেল, সেটা ছিল এক অচেনা পর্যটকের কোল্ড ড্রিঙ্কস! রিকির এই কাণ্ড দেখে ঋষি আর মেঘাদ্রি হাসতে হাসতে প্রায় লুটিয়ে পড়ল। আর্ভিক কিন্তু এই হুল্লোড়ের মাঝেও শান্ত। ও ধীর পায়ে তানভীর পাশে এসে দাঁড়াল। এরপর আলতো করে বলল
-“কী রে, জায়গাটা পছন্দ হয়েছে?”
তানভী মুগ্ধ চোখে নদীর দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল
-“খুব! মনে হচ্ছে সব ক্লান্তি ধুয়ে যাচ্ছে।”
বিকেলের সূর্যটা তখন দিগন্তের ওপাড়ে ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, নীলাদ্রি এক ঠোঙা বাদাম নিয়ে হাজির তাদের সামনে
-“কী রে লাভ বার্ডস! তোরা কি নদীর ঢেউ গুনবি নাকি বাদাম খাবি?”
আর্ভিক কড়া চোখে তাকাতেই নীলাদ্রি জিভ কেটে এক দৌড়ে চলে গেল। ঋষি আর্ভিককে ডাকলে আর্ভিক তানভীর কাছে থেকে চলে গেল। ঠিক তখনই তানভীর নজর পড়ল তৃষাণের দিকে। ও দেখল, ভিড় থেকে একটু দূরে একটা গাছের তলায় এক অচেনা ব্যক্তির সাথে তৃষাণ কথা বলছে। লোকটার পরনে মলিন পোশাক, কিন্তু চোখেমুখে এক অদ্ভুত তীব্রতা।
তানভী কৌতূহলী হয়ে পা বাড়াল সেদিকে। কাছাকাছি পৌঁছাতেই লোকটার কণ্ঠস্বর ওর কানে এল। লোকটা তৃষাণের কাঁধে হাত রেখে পরম মমতায় বলছে
-“তুই তৃষাণ না দোয়েলদির ছেলে। কেমন আছিস রে ভাগ্নে? কত বড় হয়ে গেছিস!”
‘ভাগ্নে’ শব্দটা কানে যাওয়া মাত্রই তানভী থমকে গেল। ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। ওদের তো কোনো মামা নেই! ছোট থেকে কখনো মামার বাড়িতে যায়নি, মা তো কখনো কোনো ভাইয়ের কথা বলেনি। তাহলে এই অচেনা লোকটা তৃষাণকে ভাগ্নে বলে ডাকছে কেন? তানভী তড়িঘড়ি তৃষাণের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটা এবার মাথা তুলে তানভীর দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কোনো স্নেহ ছিল না, ছিল একরাশ জমে থাকা ঘৃণা আর ক্রোধ। যেন তানভীকে দেখেই ওর ভেতরের কোনো পুরনো ক্ষত দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে। কিন্তু পরক্ষণেই ও তৃষাণের দিকে তাকিয়ে আর্দ্র গলায় জিজ্ঞেস করল
-“তোর মা কেমন আছে রে? খুব দেখতে ইচ্ছে করে দিদিটাকে।”
তানভীর সারা শরীর রি রি করে উঠল। লোকটা কে? কেন ওর মায়ের কথা এভাবে জিজ্ঞেস করছে? ঠিক সেই মুহূর্তে আর্ভিক সেখানে এসে হাজির হলো। ও দূর থেকে তানভী আর তৃষাণকে এক অচেনা লোকের সাথে দেখে দ্রুতপদে এগিয়ে এসেছে।
লোকটি—যার নাম নীলয়—আর্ভিককে দেখে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। কিন্তু আর্ভিকের চিনতে একটুও সময় লাগল না। আর্ভিকের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে গেল। ও কোনো কথা না বলে এক হাতে তৃষাণের আর অন্য হাতে তানভীর হাত শক্ত করে ধরে গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“চল এখান থেকে।”
নীলয় এবার গর্জে উঠল।
-“দাঁড়াও আর্ভিক! আমার ভাগ্নেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? এই মেয়েটার জন্য আমি আমার দিদি আর ভাগ্নের থেকে দূরে থেকেছি। আজ বাধা দেওয়ার তুমি কে?”
আর্ভিক এক পা-ও নড়ল না। ও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নীলয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল
-“সম্পর্ক রক্তে নয় নীলয় বাবু, ভালোবাসা, বিশ্বাস আর সম্মানে হয়। যে মানুষটা নিজের দিদিকে অসময়ে ত্যাগ করে ধুলোয় ফেলে দিয়েছিল, তার মুখে আজ ‘ভাগ্নে’ বা ‘দিদি’ ডাকটা বড্ড বেমানান শোনায়। অতীতে আপনারা যে বিষ ঢেলেছেন, তার ছায়া যেন এই ছোটদের ওপর না পড়ে। আর যদি পড়েছে তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।”
কথাটা বলে আর্ভিক আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ও একপ্রকার হিড়হিড় করে তানভী আর তৃষাণকে নিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। তানভী দেখল আর্ভিকের হাতের মুঠোটা থরথর করে কাঁপছে। তানভীর মাথায় তখন হাজারটা প্রশ্ন—কে এই নীলয়? মা কেন তার কথা বলেনি?
নদীর তীরে জমাট বাঁধা সেই অস্বস্তিকর মুহূর্তটা যেন তানভীর মনের আকাশকে কালো মেঘে ঢেকে দিল। আর্ভিক তানভীকে একরকম টেনে নিয়ে এল নদীর ধারের একটা নির্জন বেঞ্চে। দূরে নদীর ঢেউগুলো তখন অন্ধকার বুকে নিয়ে পাড়ে আছড়ে পড়ছে। তানভী নির্বাক, ওর চোখের দৃষ্টি শূন্য। বুকের ভেতর এক অজানা যন্ত্রণার পাহাড় দানা বাঁধছে।
কিছুক্ষণ পর আর্ভিক দু-কাপ ধোঁয়া ওঠা ভাঁড়ের চা নিয়ে এল। একটা কাপ তানভীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ওর পাশে বসে বলল
-“নে, চা-টা খা, দেখবি ভালো লাগবে।”
তানভী চায়ের কাপটা হাতে নিল ঠিকই, কিন্তু ওর গলাটা অভিমানে বুজে এল। কাঁপা কাঁপা স্বরে ও আর্ভিকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল
-“আর্ভিক ভাই, উনি কি সত্যিই আমার মামা? যদি উনি মায়ের নিজের ভাই-ই হন, তবে তৃষাণকে অত ভালোবাসা দিয়ে আমাকে দেখে অমন ঘৃণায় জ্বলে উঠলেন কেন? আমার অপরাধ কী? আমি কি তবে এই পরিবারের কেউ না?”
তানভীর দু-চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তপ্ত চায়ের ভাঁড়ে। ও ফুঁপিয়ে উঠে বলল
-“মা কেন কখনো বলেনি যে আমার এমন একজন মামা আছেন? আর উনিই বা কেন আমাকে দুষছিলেন?”
আর্ভিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও জানত, কিছু সত্যের ভার সইবার সময় এখনো তানভীর হয়নি। ও আলতো করে তানভীর কাঁধে হাত রেখে খুব দৃঢ় অথচ নরম গলায় বলল
-“সব প্রশ্নের উত্তর সময়মতো পাওয়া যায় তানভী। কখনো কখনো অতীত এমন কিছু ক্ষত রেখে যায়, যা বিনা কারণে বর্তমানকে দগ্ধ করে। ওই লোকটার কথা ভেবে নিজের মন খারাপ করিস না। সঠিক সময় এলে তুই নিজেই সব কিছু জানতে পারবি। তবে একটা কথা মনে রাখবি, মানুষের পরিচয় তার আচরণে, তার রক্তে নয়।”
আর্ভিক চায়ের ভাঁড়ে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ায়ি বলল
-“চল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। আকাশ অন্ধকার হচ্ছে, এবার বাড়িতে ফিরতে হবে।”
গাড়িতে ফেরার সারাটা পথ তানভী জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। বাইরের অন্ধকার যেন ওর মনের ভেতরের ধোঁয়াশাকে আরও ঘনীভূত করছে। আর্ভিক গাড়ি চালাতে চালাতে আড়চোখে বারবার তানভীকে দেখছে, আর মনে মনে ভাবছে
“যেদিন সত্যিটা তোর সামনে আসবে সেদিন হয়তো, তোকে সামলানো দায় হয়ে যাবে।”
ডায়মন্ড হারবার থেকে ফেরার পর থেকেই একরাশ কালো মেঘ যেন তানভীর মুখটা ঢেকে রেখেছে। বসার ঘরের সোফায় তানভী পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ বসে আছে। ওর এই অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা নীলাদ্রি আর প্রেমের নজর এড়াল না। প্রেম চুপিচুপি আর্ভিককে ইশারা করে বলল
-“কিরে আর্ভিক, তানভী এমন মনমরা হয়ে বসে আছে কেন? কী হয়েছে ওর?”
আর্ভিক এক মুহূর্ত তানভীর দিকে তাকাল। ও জানে, নদীর ধারের ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা তানভীর মনের গভীরে ক্ষত তৈরি করেছে। পরিস্থিতি হালকা করতে আর্ভিক হুকুমের সুরে সবাইকে বলল
-“অনেক হয়েছে গুমোট ভাব! চল সবাই আজ বাড়ির দালানে আড্ডা দেবো, সাথে গান-বাজনা হবে।”
সন্ধ্যা নেমেছে রায়চৌধুরী এস্টেটের বিশাল খোলা দালানে। চাঁদের রুপোলি আলোয় পুরোনো থামগুলো এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। আর্ভিক রিকিকে বলল ওর গিটারটা নিয়ে আসতে। আর্ভিক যেখানেই যায়, গিটার ওর সঙ্গী হয়। রিকি গিটারটা আনলে আর্ভিক সোফায় বসে থাকা তানভীর পাশে গিয়ে আলতো করে তানভীকে একটা ধাক্কা দিল আর গিটারে ঝঙ্কার তুলে গেয়ে উঠল—
“hans le gaa le ye din na milenge kal
thodee khushiya, hain thode se ye pal
ek baar phir chalee gayee jo ye bahaare
laut ke na aayengee gujaree bahaare”
কিন্তু তানভীর বিষণ্ণতা কাটল না। ও একইভাবে উদাসীন হয়ে বসে রইল। আর্ভিক এবার চোখের ইশারায় সবাইকে নিয়ে দালানের ঠিক মাঝখানে গিয়ে বসল। তৃষাণ ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল
-“কী করবে এবার ভাইয়া?”
আর্ভিক একটা রহস্যময় হাসিতে চোখ মেরে বলল
-“শুধু দেখে যা।”
চাঁদের আলোয় আর্ভিকের মুখটা তখন এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ডুবে আছে। ও গিটারে টুংটাং করে সুর তুলে গেয়ে উঠল তানভীর সবচেয়ে প্রিয় গান—
“Janam janam janam sath chalna yunhi
Qasam tumhe qasam aake milna yahin
Ek jaan hai bhale do badan hon juda
Meri hoke humesha hi rehna
Kabhi na kehna alvida”
চেনা সুর কানে যেতেই তানভীর ভেতরের অভিমানী দেওয়ালটা যেন একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করল। ও মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীর পায়ে দালানের দিকে এগিয়ে এল। আর্ভিক ওকে দেখে গান থামাল না, বরং নিজের বাম হাতটা বাড়িয়ে এক স্নিগ্ধ ডাক দিল। তানভী এসে আর্ভিকের পাশে বসতেই আর্ভিক মুচকি হেসে গানের লয় আরও বাড়িয়ে দিল
“Meri subha ho tumhi
Aur tumhi shaam ho
Tum dard ho tum hi aaram ho
Meri duaaon se aati hai bas yeh sadaa
Meri hoke humesha hi rehna
Kabhi na kehna alvida…
Aa ha ha ha
Aa aa oh oh oh…”
গানের শব্দ আর আর্ভিকের চোখের অসীম প্রশ্রয় তানভীকে যেন এক অন্য জগতে নিয়ে গেল। চাঁদনি রাতে গিটারের তারে তারে আর্ভিক যেন তানভীকে কথা দিচ্ছিল—পৃথিবীর সব রহস্য আর ঝড়ের মাঝেও ও এভাবেই তানভীর ছায়া হয়ে পাশে থাকবে চিরকাল।
পরদিন সকালটা ছিল বেশ ফুরফুরে। জানলার ধারে বসে তানভী আপন মনে ডায়েরির পাতায় সব স্মৃতিগুলো বন্দি করছিল। হঠাৎ ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল তৃষাণ। ওর চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তানভীর হাত ধরে টানতে টানতে তৃষাণ বলতে লাগল
-“দিভাই! তাড়াতাড়ি চল, সর্বনাশ হয়ে গেছে! প্লিজ, এক বার আয়!”
তানভী কলম নামিয়ে রেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
-“কী হয়েছে রে? আর তুই অত ভয় পাচ্ছিস কেন?”
তৃষাণ কোনো উত্তর না দিয়ে ওকে একরকম জোর করেই টেনে নিয়ে গেল ছাদের দিকে। ছাদে পা রাখতেই তানভীর চক্ষু চড়কগাছ! রোদে দেওয়া লেপ-কম্বলগুলোর মধ্যে দুটো লেপ প্রায় পুড়ে ছাই হয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে আর কয়েকটাতে বড় বড় ফুটো হয়ে গেছে। তৃষাণ অপরাধী মুখে একটা আতশ কাঁচ হাতে নিয়ে সেটা তানভী কে দেখিয়ে বলল
-“দিভাই, আমি শুধু রোদ ধরছিলাম, এটা কেন যে এমন করল! আমি কি জানতাম পুড়ে যাবে?”
ঠিক সেই মুহূর্তে রণচণ্ডী মূর্তিতে ছাদে আবির্ভূত হলেন তানভী-তৃষাণের মা, দোয়েল ব্যানার্জী। পোড়া গন্ধ পেয়ে তিনি আগেভাগেই তক্কে তক্কে ছিলেন। তৃষাণের কান ধরে টেনে নিচে নামাতে নামাতে তিনি চেঁচাতে লাগলেন
-“তোর আজ নিস্তার নেই! এই ঠান্ডার মধ্যে লেপ পুড়িয়েছিস? আজ তোকে মেরেই ফেলব!”
নিচে বৈঠকখানায় তখন বেশ আড্ডা জমেছে। অভিক সাহেবের মা আয়েশ করে পান চিবোচ্ছেন, আর্ভিক আর বড়রা চা খাচ্ছেন। দোয়েল ব্যানার্জী তৃষাণকে মারতে যাবেন তখনই অভিক সাহেবের মা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন
-“খবরদার দোয়েল! আমার নাতির গায়ে যদি একটাও মার পড়েছে, তবে তোর খবর আছে! বাচ্চা মানুষ দুষ্টুমি করবে না তো কি তোরা করবি?”
তৃষাণ সুযোগ বুঝে এক দৌড়ে গিয়ে ঠাকুমাকে জাপ্টে ধরল। ঠাকুমা আদুরে গলায় বললেন
-“নাতি বাবু, আমার কাছে এসো। লেপ-কম্বল আবার বানানো যাবে, তাই বলে এমন সোনার টুকরো ছেলেকে কেউ মারে?”
দোয়েল ব্যানার্জী অসহায়ের মতো বললেন
-“সইমা, ওকে অত মাথায় তুলো না!”
ঠাকুমা ওসব কথায় কান না দিয়ে তৃষাণকে নিয়ে অন্দরমহলে চললেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন
-“চলো দাদু ভাই, তোমাকে দু-বয়ম নাড়ু দেব, কাউকে দেবে না তুমি একাই খাবে।”
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, তৃষাণ সোফায় জাঁকিয়ে বসে আয়েশ করে নাড়ু খাচ্ছে। রিকি গন্ধে গন্ধে সেখানে হাজির।
-“কিরে! একা একা খাচ্ছিস? আমাকে দুটো দে না!”
তৃষাণ চোখ পাকিয়ে বলল
-“আগে কালকের ওই বাঘ-শিয়ালের গল্পের বাকিটা বলো, তবে দেব।”
রিকি নাড়ুর লোভে কাঁচুমাচু হয়ে বলল
-“আচ্ছা বাবা বলব, আগে নাড়ু তো দে!”
তৃষাণ গুনে গুনে মাত্র দুটো নাড়ু ওর হাতে দিল। রিকি আঁতকে উঠে বলল
-“মাত্র দুটো? তুই এত কিপটে কবে থেকে হলি?”
তৃষাণ নির্বিকার ভাবে বলল
-“আগে গল্প শেষ করো, তারপর আরও পাবে।”
রিকি নাড়ু দুটো মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল
-“আরে বাবা, গল্পের বাঘ আর শিয়াল তো এখনো হেঁটেই যাচ্ছে! জঙ্গলটা কি ছোট নাকি? তাদের হাঁটা এখনো শেষ হয়নি!”
তৃষাণ এবার রেগে অগ্নিশর্মা!
-“কী! আবার সেই এক কথা? আমার নাড়ু ফেরত দাও!”
বলে ও রিকির পিছনে তাড়া করল। সারা ঘরে যখন নাড়ু আর গল্পের রেশ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি চলছে, তখন আর্ভিক আর বাকিরা হেসেই খুন। আর্ভিক তৃষাণকে টেনে নিয়ে বলল
-“আহ্ তোজো! ছাড় না ওকে, তোর কাছে তো আরও অনেক আছে, সেখান থেকেই খা না!”
রায়চৌধুরী এস্টেটে বিদায়ের সুর বাজতে আর মাত্র দু-দিন বাকি। হাতে আছে আজকের এই অলস বিকেল আর আগামীকালকের সেই বহু প্রতীক্ষিত ‘পিকনিক’। পরদিন দুপুরেই আবার শহরের ব্যস্ততায় ফিরে যাওয়ার পালা, তাই শেষ মুহূর্তের আনন্দটুকু নিংড়ে নিতে সবাই মিলে পা বাড়াল বাড়ির পাশের বিশাল সবুজ মাঠটার দিকে।
তৃষাণের মেজাজ আজ সপ্তমে। সে একপ্রকার জবরদস্তি করে আর্ভিকের চওড়া পিঠে চড়েছে। মাঠে পৌঁছাতেই ব্যাট-বল নিয়ে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। রিকি আজ আম্পায়ার হওয়ার বৃথা চেষ্টা করলেও ওকে জোর করে ফিল্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। খেলা শুরু হতেই হাসির লহর উঠল।
আর্ভিক যখন বল করতে এল, রিকি ক্রিজে দাঁড়িয়ে ব্যাট না ঘুরিয়ে অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করল। আর্ভিকের এক বাউন্সারে রিকি ভয়ে ব্যাট ফেলে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল, যেন আকাশ থেকে কামানের গোলা ধেয়ে আসছে!
খেলার উত্তেজনার মাঝে এক অদ্ভুত শান্ত মুহূর্ত তৈরি হলো। ফিল্ডিং করার সময় মাঠের এক কোণে আর্ভিক আর তানভী একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। পড়ন্ত সূর্যের সোনাঝরা আলো তানভীর মুখে এসে পড়তেই আর্ভিক পলকহীন চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ফাঁকা মাঠে বাতাসের ঝাপটায় তানভীর অবাধ্য চুলগুলো বারবার চোখে আসছিল, আর্ভিক আলতো করে নিজের আঙুল দিয়ে সেগুলো কানের পিছে গুজে দিল। সর্ষে ক্ষেতের দিক থেকে আসা মিঠে হাওয়ায় ওদের দুজনের মৌন চাওনি যেন এক অলিখিত উপন্যাসের পাতা লিখে ফেলল। দূরে রিকিদের চিৎকার তখন এক অস্পষ্ট গুঞ্জন মাত্র।
খেলা শেষে ফেরার পথেও তৃষাণ আঠার মতো আর্ভিকের পিঠে চেপে বসল। রিকি হাপাতে হাপাতে টিপ্পনী কাটল
-“কিরে তৃষাণ! তুই কি কোনো আলুর বস্তা যে সারাক্ষণ আর্ভিক দাদার পিঠেই থাকবি? নাম এবার!”
তৃষাণ আর্ভিকের কাঁধে মুখটা রেখে একগাল হেসে একটা জুতসই স্যাভেজ উত্তর দিল
-“আমি আলুর বস্তা হই বা সোনার টুকরো, আমার এই ভিআইপি ট্রান্সপোর্টটা তো আর তোমার কপালে নেই! যার পিঠে চেপেছি সে যখন কিছু বলছে না, তখন চুনোপুঁটিদের এত কথা কিসের?”
তৃষাণের এই জবাবে রিকি হাঁ করে তাকিয়ে রইল, আর আর্ভিক সহ বাকি সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
ভোর সাড়ে চারটে। আকাশ তখনও কালচে নীল চাদরে ঢাকা, কিন্তু রায়চৌধুরী এস্টেটের অন্দরমহলে উৎসবের দামামা বেজে উঠেছে। আজ রায়দীঘির নদীতে লঞ্চে পিকনিক—এক রোমাঞ্চকর জলযাত্রার হাতছানি। রায়দীঘির সুবিশাল নদীর বুকে ভেসে বেড়ানো, লঞ্চেই রান্নাবান্না আর সেখানে খাওয়া দাওয়া,আর নির্জন কোনো চরে ঘুরে বেড়ানো, এই ভাবনায় সবার চোখে ঘুম উধাও।
নিচে বড় বড় গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের কুয়াশাভেজা বাতাসে এক অদ্ভুত তাজা ঘ্রাণ। রিকি, তানভী, তৃষাণ, মেঘাদ্রি, প্রেম, সোহাগ, পেখম আর পবিত্র—সবাই যেন একেকটা জীবন্ত বাজি! উত্তেজনায় টগবগ করছে তারা। বাড়ির সামনে যখন সবাই জমায়েত হয়েছে, ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। তৃষাণ উত্তেজনায় একটা লাফ দিতে গিয়ে ধপাস করে পা ফেলল পাশের এক জমা হওয়া কাদা আর শিশির ভেজা ঘাসের ওপর। সেই কাদা ছিটকে গিয়ে লাগল তানভীর দুধসাদা ব্র্যান্ড নিউ বুট জুতোটায়। তানভী আঁতকে উঠে ধমক দিয়ে বলল
-“তৃষু! একি করলি? পুরো জুতোটা নষ্ট করে দিলি তো!”
নিজের শখের জুতোটার অবস্থা দেখে তানভীর চোখমুখ তখন বিরক্তি আর অভিমানে কালো হয়ে গেল। ঠিক সেই সময় ভিড় চিরে দেবদূতের মতো এগিয়ে এল আর্ভিক। ওর শান্ত গাম্ভীর্য যেন ভোরের কুয়াশাকেও হার মানায়। আর্ভিক তানভীর সামনে গিয়ে ও কোনো কথা না বলে হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর হাতের ইশারায় তানভীকে ওর কাদা মাখা পা-টা নিজের হাঁটুর ওপর রাখার ইঙ্গিত দিল। তানভী অপ্রস্তুত হয়ে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল
-“আরে আর্ভিক ভাই, কী করছেন? আমি পরিষ্কার করে নিচ্ছি…”
কিন্তু আর্ভিক নাছোড়বান্দা। ও মৃদু জোর করে তানভীর পা-টা নিজের হাঁটুর ওপর টেনে নিল। পকেট থেকে একটা ধবধবে সাদা রুমাল বার করল আর্ভিক—ওর আভিজাত্যের মতোই সেই রুমালটাও নিখুঁত। এরপর পরম যত্নে ও খুব ধীরে ধীরে তানভীর বুট থেকে কাদার প্রতিটি দাগ মুছে দিতে শুরু করল। আশেপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। তানভী নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিল—ওর সেই কঠিন আর গম্ভীর আর্ভিক ভাই কীভাবে নির্দ্বিধায় কাদামাখা জুতোর সামনে মাথা নত করে বসে আছে।
পরিষ্কার করা শেষ হলে আর্ভিক এবার মুখ তুলে সরাসরি তানভীর চোখের দিকে তাকাল। সেই রুপোলি ভোরের আলোয় দুজনের চার চোখ এক হলো। আর্ভিকের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল, যেন ও মনে মনে বলছে
—’তোর সব সমস্যার সমাধান আমার কাছে আছে।’
ঠিক তখনই রুদ্র বাবু আর অভিক সাহেবের হাঁকডাক শোনা গেল
-“কিরে! সবাই গাড়িতে ওঠ এবার, দেরি হয়ে যাচ্ছে!”
আর্ভিক উঠে দাঁড়িয়ে রুমালটা পকেটে পুরে নিল। আর্ভিকের এই জাদুকরী ছোঁয়ায় তানভীর বিরক্তি তো দূর হলোই, বরং এক অজানা ভালোলাগায় ওর মনটা ভরে গেল। সবাই হইহই করে গাড়িতে গিয়ে উঠল, আর সেই ভোরের আলো-আঁধারিতে শুরু হলো রায়দীঘির অভিমুখে এক রঙিন যাত্রা।
গাড়ির চাকা থামতেই খোলা বাতাসের ঘ্রাণ এসে লাগল সবার নাকে। গাড়ি যেখানে পার্ক করা হয়েছে, সেখান থেকে নদীঘাট অব্দি বড়জোর পাঁচ-সাত মিনিটের পথ। সরু মেঠো রাস্তা দিয়ে হইহই করতে করতে এগিয়ে চলেছে রিকি-তৃষাণের দলবল। কিন্তু সবার শেষে, কিছুটা ধীর পায়ে হাঁটছে আর্ভিক আর তানভী।
সকালের সেই কাণ্ডটা তানভীর মনের ভেতর বারবার দোলা দিচ্ছে। আর্ভিকের মতো একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ওর নোংরা জুতো পরিষ্কার করতে এভাবে হাঁটু গেড়ে বসতে পারে, এটা সে ভাবতেও পারেনি। কিছুটা অপরাধবোধ আর একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে তানভী আলতো করে আর্ভিকের পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল
-“আর্ভিক ভাই, জুতোটা কেন পরিষ্কার করতে গেলেন? আপনার দামী প্যান্টটা তো কাদা লেগে নোংরা হয়ে গেল, আর সাদা রুমালটাও তো পুরো নষ্ট হয়ে গেল…”
আর্ভিক থমকে দাঁড়াল। ভোরের স্নিগ্ধ আলো ওর তীক্ষ্ণ মুখাবয়বে এসে পড়েছে। আর্ভিক সরাসরি কোনো উত্তর দিল না, কিন্তু ওর মনের গভীরে তখন এক অদ্ভুত কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—”রুমালের দাগ ধুয়ে মুছে ফেলা যায় তানভী, কিন্তু তোর ওই সুন্দর মুখটার ওপর বিরক্তির মেঘ আমি সইতে পারি না। তোর সামান্য অস্বস্তি দূর করার জন্য যদি আমার সবটুকু আভিজাত্যও ধুলোয় মেশাতে হয়, আমি তাতেও রাজি।”
অবশ্য মুখে ও এত কিছু বলল না। কেবল এক চিলতে রহস্যময় হাসি খেলে গেল ওর ঠোঁটে। সে শান্ত গলায় বলল,
-“দেরি হয়ে যাচ্ছে, পা চালা তাড়াতাড়ি।”
আর্ভিকের এই সংক্ষিপ্ত নীরবতা যেন হাজারটা ডায়ালগের চেয়েও বেশি কথা বলে দিল। কিছুক্ষণ হাঁটতেই চোখের সামনে উন্মোচিত হলো রায়দীঘির নদীর বিশাল রূপ। নদীর ঘাটে ঢেউগুলো ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়ছে। ভোরের কুয়াশা তখনো নদীর বুক থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, যেন জলরাশি এক পাতলা মসলিনের চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। দূরে ওদের জন্য অপেক্ষারত লঞ্চটি চোখে পড়ল। লঞ্চের সারেং ঘাটে এসে হাঁক দিল
-“আসুন কর্তাবাবুরা! সব তৈরি।”
একে একে সবাই লঞ্চে উঠতে শুরু করল। রিকি আর প্রেম একে অপরকে টেনে তুলছে, তৃষাণ তো উত্তেজনায় আগেই এক লাফে ডেকে পৌঁছে গেছে। আর্ভিক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বড়দের সাবধানে উঠতে সাহায্য করল। সব শেষে ও হাত বাড়িয়ে দিল তানভীর দিকে। সেই শক্ত হাতের ওপর ভরসা রেখে তানভী যখন লঞ্চের কাঠের ডেকে পা রাখল, তখন নদীর শীতল বাতাস ওর ওড়না উড়িয়ে দিয়ে গেল। ইঞ্জিনের ভটভট শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে লঞ্চটা যখন ধীরে ধীরে ঘাট ছাড়ল, তখন নদীর মাঝখানে এক রুপোলি জলরেখা তৈরি হলো। দু-পাশে ঘন ম্যানগ্রোভ আর মাঝখানে শান্ত জলরাশি এক অনন্ত জলযাত্রার সূচনায় সবাই মেতে উঠল নতুন উদ্দীপনায়।
লঞ্চের ইঞ্জিনটা হালকা কম্পন তুলে রায়দীঘির নদীর বুক চিরে এগোতে শুরু করল, শীতের সকালের মিঠে রোদে নদীর জল হীরের কুচির মতো ঝিকমিকিয়ে উঠল। জানুয়ারি মাসের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, কিন্তু লঞ্চের ভেতর তখন এক উষ্ণ আবেশ। ডেক-এর ওপর আরাম করে বসতেই ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড়ে করে এল গরম গরম মালাই-চা আর ফ্রুট কেক। মাঝনদীতে ঠান্ডায় এই চায়ের প্রথম চুমুকটা যেন অমৃতের মতো লাগল সবার কাছে।
চা শেষ হতেই রিকি আর তৃষাণের হইচই শুরু হলো। এই লঞ্চটা যেন এক ভাসমান রাজপ্রাসাদ। সাদা ধবধবে দোতলা এই বিলাসবহুল লঞ্চের ওপরতলায় ওঠার জন্য কাঠের মসৃণ সিঁড়ি। ওপরে উঠে দেখা গেল সারি সারি আরামদায়ক চেয়ার পাতা, চারপাশটা খোলা—যেখান থেকে নদীর দু-পারের ম্যানগ্রোভ আর উড়ন্ত গাঙচিলদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সবাই যখন সেই নীল জলরাশির মায়ায় মগ্ন, তখনই আর্ভিক গলার স্বর উঁচিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
-“সবাই একটু শুনুন! আজকের এই জলযাত্রা শুধু পিকনিকের জন্য নয়। আজ আমাদের রুদ্র আঙ্কেল আর দোয়েল কাকিমনির বিবাহ বার্ষিকী!”
আর্ভিকের এই ঘোষণায় লঞ্চ জুড়ে করতালির রোল উঠল। রুদ্র বাবু আর দোয়েল ব্যানার্জী একে অপরের দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসলেন। ছোট একটা টেবিলের ওপর রাখা একটা বিশাল রেড ভেলভেট কেক সবার সামনে আনা হলো। নদীর মাঝখানে, ইঞ্জিনের ছান্দিক শব্দের তালে তালে দুজনে মিলে ছুরি চালালেন কেকের ওপর। তানভী মুগ্ধ হয়ে দেখছিল ওর বাবা-মায়ের সেই অমলিন হাসি—আজকের দিনটা যেন রূপকথার মতো শুরু হলো। তানভী নিজেও ভুলে গিয়েছিল যে আজ তার বাবা মায়ের বিবাহ বার্ষিকী কিন্তু আর্ভিক ভাই সেটা মনে রেখে এভাবে সেলিব্রেট করবে সেটা সে ভাবতে পারেনি।
কেক কাটার রেশ কাটতে না কাটতেই এল প্রাতরাশ। ধোঁয়া ওঠা গরম গরম কড়াইশুঁটির কচুরি, ঝাল ঝাল আলুর দম, আর সাথে একটা করে ডিম সেদ্ধ। কিন্তু আসল চমক ছিল শেষে—জয়নগরের খাঁটি নলেন গুড়ের মোয়া আর রসে টইটম্বুর নরম তুলতুলে নলেন গুড়ের রসগোল্লা।
খাওয়া-দাওয়ার মাঝেই শুরু হলো নাচের আসর আর রসিকতা। কিছুক্ষণ পরই ট্রে-তে করে এল মচমচে গরম চিকেন পকোড়া আর মুচমুচে ফিশ ফ্রাই। আর্ভিক তানভীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল
-“কেমন লাগছে মেরি অন্নপূর্ণা?”
তানভী মুচকি হেসে পকোড়ার প্লেটটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল, আর্ভিক সেখান থেকে একটা পকোড়া মুখে দিল। নদীর নোনা বাতাস, প্রিয়জনদের খিলখিল হাসি আর জিভে জল আনা সব খাবারের গন্ধে রায়দীঘির নদীর বুক চিরে লঞ্চটা যখন গভীর অরণ্যের দিকে এগোচ্ছে, তখন তানভীর মনে হলো সময়ের ঘড়িটা যদি এখানেই থমকে যেত!
কিছুক্ষণ পর লঞ্চটা যখন ধীরলয়ে নদীর এক বিস্তীর্ণ বালুচরে এসে থামলো, তখন দুপুরের সোনাঝরা রোদ বালির ওপর পড়ে হীরের মতো ঝিলমিল করছে। লঞ্চের নোঙর ফেলতেই আর্ভিক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে একে একে সবাইকে নামাতে শুরু করল। তানভীর হাতটা যখন আর্ভিকের শক্ত মুঠোয় ধরা পড়ল, তখন নদীর নোনা বাতাসের ঝাপটায় তানভীর অবাধ্য চুলগুলো আর্ভিকের মুখে এসে পড়ল। আর্ভিক আলতো করে তানভীকে বালুচরে নামিয়ে দিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়াল—চারপাশে খোলা আকাশ আর দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির মাঝে যেন এক টুকরো নির্জন স্বর্গ।
তৃষাণ তো নেমেই উন্মাদ! বিশাল নদী দেখে ওর উত্তেজনার বাঁধ ভেঙে গেছে। জুতো খুলে এক দৌড়ে ও জলের কিনারায় গিয়ে নামতে চাইল স্নান করার জন্য। কিন্তু ঠিক তখনই দোয়েল ব্যানার্জীর কড়া শাসন ধেয়ে এল
-“তোজো! একদম না! ভোরে স্নান করে এসেছিস, এখন আবার জলে নামলে নির্ঘাত জ্বর বাঁধাবি। তাছাড়া সাথে কোনো বাড়তি জামাকাপড়ও নেই, চুপচাপ উঠে আয় বলছি!”
মায়ের ধমক খেয়ে তৃষাণের মুখটা মেঘলা আকাশের মতো কালো হয়ে গেল। ও মাথা নিচু করে ফিরে আসছিল, কিন্তু আর্ভিকের নজর এড়াল না সেই বিষণ্ণতা। আর্ভিক মুচকি হেসে এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় তৃষাণকে কোলে তুলে নিল।
-“কী হলো তোজো বাবু? মন খারাপ? চলো, আমরা ব্যাডমিন্টন খেলব।”
তৃষাণ অবাক হয়ে বলল
-“কিন্তু ভাইয়া, র্যাকেট নেই খেলব কীভাবে?”
আর্ভিক ওর নাকে একটা টোকা দিয়ে হিন্দি ছবির কায়দায় বলে উঠল
-“আরে, যব আর্ভিক ভাইয়া হ্যায় সাথ, তব চিন্তা কি কেয়া বাত!”
আর্ভিক লঞ্চ থেকে জোড়া র্যাকেট আর শাটলকক নিয়ে এল। নেটের বদলে নিজেদের জুতো দিয়েই একটা আলগা বাউন্ডারি বানিয়ে শুরু হলো এক অদ্ভুত মজার খেলা। রিকি তৃষাণের পাশে এসে দাঁড়াল। তৃষাণ র্যাকেট ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ বলে উঠল
-“রিকি দাদা! সেই বাঘ-শিয়ালের গল্পের শেষটা এবার বলো না!”
রিকি নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল
-“আরে বাবা, ওই যে বললাম, ওরা এখনো হেঁটেই যাচ্ছে। জঙ্গলটা বড্ড বড় তো!”
তৃষাণ এবার রাগে চিৎকার করে উঠল
-“থাক! তোমাকে আর গল্প বলতে হবে না!”
রিকি অমনি একগাল হেসে হাততালি দিয়ে বলল
-“আরে বাঁচলাম! আমি তো এটাই চেয়েছিলাম যে তুই বিরক্ত হয়ে বলবি আর গল্প বলতে হবে না!”
তৃষাণ বুঝতে পারল ও রিকির জালে পা দিয়েছে। ও র্যাকেট ফেলে রিকিকে ধরার জন্য তেড়ে গেল, আর রিকিও প্রাণপণে বালির ওপর দিয়ে দৌড়াতে লাগল। আর্ভিক দূরে দাঁড়িয়ে ছোটদের এই খুনসুটি দেখছিল আর হাসছিল।
হঠাৎ তার চোখ গেল তানভীর দিকে। একটু দূরে তানভী তখন আপন মনে বালুচরে ঝিনুক কুড়োতে ব্যস্ত। ও যখন ছোট বাচ্চার মতো হড়বড়িয়ে এদিক-ওদিক ছুটছে আর এক একটা রঙিন ঝিনুক পেয়ে বিজয়ীর হাসি হাসছে, আর্ভিক দূর থেকে মুগ্ধ চোখে সেই দৃশ্যটা দেখছে। তানভীর এই নিষ্পাপ চপলতা ওর হৃদয়ের কোনো এক গভীরে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল।
ঘণ্টাখানেক পর সবাই আবার লঞ্চে ফিরে এল। দুপুরের ভোজের আয়োজন তখন একদম তৈরি। লঞ্চের দোতলায় সারি সারি চেয়ারে সবাই বসল হাত-মুখ ধুয়ে। মেনুটা ছিল নিখাদ বাঙালি আভিজাত্যে ভরপুর। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, মাছের মাথা দিয়ে সোনা মুগের ডাল, কুড়মুড়ে আলু ভাজা আর মুচমুচে বেগুনি। এরপর পাতে পড়ল নারিকেলের দুধে ডোবানো চিংড়ি মাছের মালাইকারি আর ঝাল ঝাল কাতলা কালিয়া। মাংসের পর্বে যখন কষা মাটন এল, তখন তানভীর জন্য স্পেশাল ভাবে এল দেশি মুরগির লাল ঝোল—কারণ ও মাটন ছোঁয় না। শেষ পাতে চাটনি, পাপড় আর মিষ্টি খেয়ে এক পরম তৃপ্তির ঢেকুর তুলল সবাই।
খাওয়ার পর লঞ্চের ডেকে গা এলিয়ে দিয়ে সবাই যখন একটু বিশ্রামের আমেজে মগ্ন, তখন নদীর শীতল হাওয়ায় সবার দু-চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এল। রিকি তৃষাণের পাশে শুয়ে বলল
-“আচ্ছা তৃষাণ, এই নদীটা কতটা গভীর বলতো?”
তৃষাণ একটু বিরক্তি নিয়ে বলে
-“তোমাকে জলে ফেলে দি, তুমি গিয়ে মেপে এসো।”
এই বলে তৃষাণ রিকির দিকে পিঠ করে শুয়ে ঘুমিয়ে যায়।বিকেলের ম্লান আলো নদীর জলরাশির ওপর ঝরে পড়ছে। লঞ্চের ইঞ্জিন তখন একঘেয়ে ছন্দে তটরেখার দিকে এগোচ্ছে যেখান থেকে তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেদিকে। দুপুরের তৃপ্তিদায়ক আহার আর এক পশলা হালকা ঘুমের পর সবাই আবার চনমনে। লঞ্চের নীচতলার ডেকের একেবারে অগ্রভাগে, যেখানে জল কেটে এগিয়ে যাওয়ার শব্দটা সবথেকে স্পষ্ট শোনা যায়, সেখানে একা রেলিং ধরে বসে ছিল তানভী। বাতাসের ঝাপটায় ওর খোলা চুলগুলো উড়ছে, আর পড়ন্ত সূর্যের শেষ রক্তিম আভা ওর স্নিগ্ধ মুখে এসে লেগেছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল কোনো এক জলপরীর স্বপ্নিল প্রতিচ্ছবি, যে কেবল জলের ঢেউয়ের ভেতরেই নিজের ফেলে আসা গল্প খুঁজছে।
আর্ভিক নিঃশব্দে এগিয়ে এল। ওর হাতে দু-কাপ ধোঁয়া ওঠা আদা-চা। তানভী এতটাই অন্যমনস্ক ছিল যে পাশে আর্ভিকের উপস্থিতি ও টেরই পায়নি। আর্ভিক মন্ত্রমুগ্ধের মতো কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়ে রইল তানভীর দিকে। গোধূলির এই মায়াবী আলোয় তানভীকে যেন এক অলীক মানবী বলে ভ্রম হচ্ছিল। ওর শান্ত দু-চোখে নদীর বিশালতা আর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে উদাসীনতা আর্ভিককে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছিল। যেন কোনো এক অদৃশ্য বাঁধন ওকে বারবার বলছে—এই দৃশ্যটা যেন কোনোদিন শেষ না হয়।
কিছুক্ষণ পর নিজের বামপাশে কারোর অস্তিত্ব অনুভব করতেই তানভী ঘাড় ফেরাল। আর্ভিকের সেই স্থির এবং গভীর দৃষ্টির মুখোমুখি হতেই তানভীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। আর্ভিক মৃদু হেসে এক কাপ চা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল। তানভীও কোনো কথা না বলে পরম আবেশে সেই চা টা নিয়ে এক চুমুক দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে উদয় হলো দুরন্ত তৃষাণ। ও আর্ভিকের হাত ধরে ঝুলে পড়ে আবদার করল
-“আর্ভিক ভাইয়া! এমন সুন্দর সন্ধ্যায় একটা গান হবে না? প্লিজ, একটা গান গাও না!”
লঞ্চের ওপরে বসা বড়রাও তখন সমস্বরে সায় দিলেন। রাখী রায়চৌধুরী, পর্ণা দেবী আর দোয়েল ব্যানার্জী একগাল হেসে বললেন
-“হ্যাঁ সিনু, একটা গান ধর তো! এমন পরিবেশে তোর গান না হলে আড্ডাটা জমবে না।”
এরপর রিকি, প্রেম, নীলাদ্রি, পবিত্র,পেখম—সবাই তখন এক জোট হয়ে আর্ভিককে ঘিরে ধরল। আর্ভিক একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল
-“আরে ভাই, আমি তো গিটার আনিনি! যন্ত্র ছাড়া কি গান জমে?”
তৃষাণ তখন জিভ কেটে একগাল হেসে পাশ থেকে গিটারটা বার করে বলল
-“তুমি আমায় ভাবলে কী? আসার সময় আমি ওটা লুকিয়ে এনেছিলাম। আমি জানতাম এই আবদারটা উঠবেই!”
আর্ভিক অবাক হয়ে ওর মাথায় একটা টোকা দিয়ে বলল
-“তুই তো দেখছি সবার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে!”
তানভী এবার আর্ভিকের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলল
-“গাইবেন না একটা গান?”
তানভীর সেই অনুরোধে যেন জাদুর কাঠি ছিল। আর্ভিক আর না বলতে পারল না। ও গিটারটা হাতে নিয়ে টুংটাং করে সুর তুলল
“Har shyam aankhon par
Tera aanchal lehraye
Har raat yaadon ki
Baarat le aaye
Main saans leta hoon
Teri khushboo aati hai
Ek mehka mehka sa
Paigham laati hai
Meri dil ki dhadkan bhi
Tere geet gaati hai
Pal pal dil ke pas tum rehti ho…..”
নদীর শান্ত জলরাশি আর ইঞ্জিনের শব্দের মাঝে গিটারে ঝঙ্কার উঠল। আর্ভিক গাইল না, ও যেন সুরের মোহজালে চারপাশটা বেঁধে ফেলল। ওর ভরাট কণ্ঠস্বর যখন বাতাসের সাথে মিশে নদীর ওপর ছড়িয়ে পড়ল, তখন মনে হলো সময়টা স্তব্ধ হয়ে গেছে।
তানভী আর্ভিকের ঠিক পাশেই বসে ছিল। গিটারে আর্ভিকের আঙুলের নিপুণ কারিকুরি আর গায়কীর সেই মাদকতা তানভীকে ক্রমশ আবিষ্ট করে ফেলল। ও মুগ্ধ চোখে আর্ভিকের সেই তীক্ষ্ণ নাক আর গভীর চোখের চাহনির দিকে তাকিয়ে রইল। আর্ভিকও গানের ফাঁকে ফাঁকে তানভীর চোখের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন ওই গানটা ও কেবল তানভীর জন্যই গাইছে। প্রেম আর সোহাগ তখন ওপরের ডেক থেকে নিচু হয়ে এই রোমান্টিক দৃশ্যটা দেখছিল আর মিটিমিটি হাসছিল। নদীর সেই সন্ধ্যায়, নোনা হাওয়া আর আর্ভিকের সুরের জাদুতে রায়চৌধুরী এস্টেটের এই বনভোজন এক অসামান্য মহাকাব্যে পরিণত হলো।
লঞ্চ যখন ঘাটে এল, তখন রায়দীঘির বুকে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর নদীর জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তৈরি করেছে। সারাদিনের হুল্লোড়, আর কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার পর সবার শরীরেই তখন ক্লান্তির ছোঁয়া। পা ফেলার মতো জোরালো শক্তি যেন কারো অবশিষ্ট নেই। অবসন্ন শরীরে সবাই টলতে টলতে মেঠোপথ ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে চলল।
গাড়িতে ওঠার পর মুহূর্তেই পরিবেশটা নিঝুম হয়ে গেল। তানভী বসেছিল মেঘাদ্রি আর আর্ভিকের মাঝখানে। ওর দু-চোখে তখন রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছে। গাড়ির মৃদু দুলুনিতে ওর মাথাটা বারবার ঝুলে পড়ছিল। পাশে বসা আর্ভিক আড়চোখে সেটা খেয়াল করল। ও খুব সন্তর্পণে, অত্যন্ত যত্নে তানভীর মাথাটা টেনে নিজের কাঁধের ওপর স্থির করে দিল, যাতে ঘুমের ঘোরে ওর কোনো কষ্ট না হয়। তন্দ্রাচ্ছন্ন তানভী অবচেতনেই যেন এক পরম আশ্রয় খুঁজে পেল; আর্ভিকের কাঁধে মাথা রেখে ওর ঘুমটা আরও গভীর হলো। সেই স্তব্ধ রাতে গাড়ির ভেতরের মৃদু আলোয় আর্ভিক শুধু নির্নিমেষ চেয়ে রইল ওর পাশে ঘুমানো তানভীর মায়াবী মুখটার দিকে।
রায়চৌধুরী এস্টেটে যখন গাড়ি পৌঁছাল, তখন সবার দেহমন এতটাই ক্লান্ত যে খাওয়ার নাম শুনলেই যেন পাহাড়সমান বোঝা মনে হচ্ছে। কিন্তু অভিক সাহেবের মায়ের কড়া নির্দেশ—এক গ্রাস না খেয়ে কেউ বিছানায় যেতে পারবে না। অগত্যা অনিচ্ছাসত্ত্বেও সবাই ডাইনিং টেবিলে বসলো এবং সামান্য কিছু মুখে দিয়েই যে যার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
পরের দিন দুপুরের রোদটা যেন একটু বেশিই ফিকে মনে হচ্ছে। আজ বিদায়ের পালা। খাওয়া-দাওয়ার পর যখন সবাই কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, তখন রায়চৌধুরী এস্টেটের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা অভিক সাহেবের মায়ের চোখে জল। কত বছর পর এই নিঝুম বাড়িটা আবার প্রাণের স্পন্দনে জেগে উঠেছিল, আজ আবার সেই শূন্যতা। উনি তৃষাণ আর তানভীর হাতে বড় বড় বয়াম ভর্তি নাড়ু আর আচার ধরিয়ে দিলেন—যাতে শহরের যান্ত্রিকতায় গিয়েও তারা এই গ্রামের স্বাদটা ভুলে না যায়। তারপর তৃষাণ আর তানভীকে জড়িয়ে ধরে বলেন
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ৪১+৪২
-“দাদুভাই, দিদিভাই আবার আসিস”
গাড়ি যখন সদর দরজা পেরিয়ে হাইওয়ের দিকে মোড় নিল, তানভী জানলার কাঁচ দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল পেছনের দিকে। ধুলোমাখা রাস্তা, সেই পুরনো থামওয়ালা বাড়ি আর ঠাকুমার অস্পষ্ট হয়ে আসা অবয়ব—সবই যেন এক উপন্যাসের শেষ পাতা। যেতে তো হবেই, কারণ ফেরার তাগিদেই তো মানুষ ঘর ছাড়ে। কিন্তু প্রত্যেকের মনের কোণে রায়দীঘির নদীর নোনা বাতাস আর রায়চৌধুরী বাড়ির সেই মায়াবী দিনগুলো এক অমলিন স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।
