ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১৫+১৬
তানিশা ভট্টাচার্য্য
তানভী, মেঘাদ্রি আর রিকির কথার মাঝে ক্লাসে একটা ছেলে আসে, তাকে দেখেই সব স্টুডেন্টরা বিশেষ করে তো মেয়েরা এক সাথে হই হই করে উঠলো। রিকি একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল
-“ওই চলে এলেন শিয়ালের দলের প্রধান সর্দার। এবার বাকি সব শিয়াল গুলো হো হো করবে। অসহ্য একটা।”
তানভী রিকি আর মেঘাদ্রিকে জিজ্ঞাসা করল যে কী হচ্ছে এগুলো। রিকি ছেলেটার দিকে হাত দেখিয়ে বলল
-“ওই যে ছেলেটাকে দেখছিস, ওর নাম হল সমগ্ৰ। স্কুলের most popular boy, ছোট থেকে বড় প্রত্যেকটা মেয়ের ক্রাশবয়। ও স্কুলে সব স্টুডেন্টদের কাছে সিকান্দার নামে পরিচিত, কারণ সমগ্ৰ যে চ্যালেঞ্জটা নেয় সেটা যেকোনো মূল্যে করেই ছাড়ে। এছাড়া যেমন রুপ তেমন গুন, কিন্তু ও পড়াশোনা আর চরিত্রের দিক থেকে একদমই খারাপ। যাকে এক কথায় play boy বলা বলা যায়।”
রিকির কথা শেষ হতেই প্রার্থনার ঘন্টা পড়ল। সবাই জায়গা মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ক্লাস শুরু হল। প্রথম ক্লাস ছিল ল্যাঙ্গুয়েজ-এর যেটা মিত্র স্যারের ছিল। তিনি ক্লাসে আসার পর সবাই উঠে দাঁড়াল তিনি সবাইকে বসতে বললেন, তারপর নাম প্রেজেন্ট শুরু করলেন, তারপর তিনি বললেন
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“তানভী ব্যানার্জী!”
তানভী সেটা শুনে উঠে দাঁড়াল, সবাই লাস্ট ডেস্কে থাকা তানভীর দিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনে স্যারের দিকে তাকাল। তানভীর দুইপাশের ডেস্কে বসে থাকা মেঘাদ্রি আর রিকি একে অপরের দিকে তাকিয়ে একবার স্যার আর একবার তানভীর দিকে তাকাল। রিকি মেঘাদ্রি কে ডেকে বলল
-“উফফ!! এবার দেখবি স্যার পড়ানো বাদ দিয়ে তানভীর সাথে প্রশ্ন উত্তর খেলবে।”
মেঘাদ্রি রিকিকে চোখ রাঙিয়ে বলল
-“আস্তে কথা বলতে পারিস না!! না পারলে গলায় সাইলেন্সার লাগাবি, স্যার শুনতে পেলে তোকে আর আস্ত রাখবে না।”
মিত্র স্যার তানভীকে বললেন
-“এদিকে এসো”
তানভী স্যারের কথা মতো গেল। তারপর স্যার জিজ্ঞাসা করলেন
-“বছরের মাঝে এডমিশান করার কারণ কী??”
তানভীর একটু নার্ভাস লাগছিল কিন্তু তার স্বত্বেও খুব সুন্দর করে উওর দিল
-“আসলে স্যার বাবা বিসনেসের জন্য একটু ব্যাস্ত ছিলেন। তারপর কলকাতায় চলে এলাম আর এখানে এডমিশান করালেন।”
তানভীর কথায় স্যার একটু মাথা নাড়িয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলেন
-“তা সামনের মাসেই তো পরীক্ষা, প্রিপারেশন আছে কিছু??”
-“জি স্যার আছে”
তানভীর কথায় স্যার একটু ভ্রু কুঁচকে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে উঠলেন
-“তাহলে কয়েকটা প্রশ্ন করা যাক, দেখি তুমি বলতে পারো কি না। পারলে তো খুব ভালো আর না পারলে ক্লাস থেকে বের হয়ে যাবে।”
স্যারের কথায় সারা ক্লাস হেসে উঠে। স্যার তাদের চুপ করতে বলে,তানভী কে বললেন
-“তো মিস তানভী শুরু করি??”
তানভী কিছুটা ভয় পেলেও পরে নিজেকে সাহস যুগিয়ে স্যার কে বলল
-“জি স্যার”
তানভীর কথা শুনে রিকি মেঘাদ্রি কে বলল
-“এই তানভী এটা কি করল। স্যার যা প্রশ্ন করে ক্লাস টপারেরও মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়তে হয়। আর সেখানে তানভী তো…. আমার খুব ভয় লাগছে ও যদি না পারে প্রথম দিনই ওর মান সম্মান সব যাবে।”
-“ভয় তো আমারও হচ্ছে, কিন্তু দেখা যাক কি হয়।”
এরপর মিত্র স্যার এক এক করে প্রায় ১৫ টা প্রশ্ন করলেন, তানভী সব প্রশ্নের উত্তর সঠিক ভাবে দিল। সারা ক্লাস অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে তানভীর দিকে আরেক দিকে তানভীর ওপর স্যার ভীষণ ইমপ্রেস হয়ে গিয়ে বললেন
-“বাহহ!!! খুব সুন্দর, খুব ভালো প্রিপারেশন নিয়েছো, Thank you.
স্যারের কথা শেষ হওয়া মাত্রই বেল বাজল স্যার সবাই কে বললেন
-“আচ্ছা ঠিক আছে আজকের পড়ানোটা কাল কে করিয়ে দেব। আর তোমারা তানভীর সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে নিও।কেউ ঝামেলা করবে না।”
তারপর তানভীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন
-“যাও, তুমি গিয়ে বসে পড়ো। আর আরো ভালো করে পড়াশোনা করবে।”
তানভী মাথা নাড়িয়ে নিজের জায়গায় চলে গেল, স্যার ও বের হয়ে গেলেন। তানভী নিজের ডেস্কে বসে পড়ল, রিকি ওকে বলে
-“আরেহ ভাই, তুই তো কামাল করে দিলি!! প্রশ্ন বিচিত্রা কে ইমপ্রেস করে ফেললি, তোর ট্যালেন্ট আছে বলতে হয়…না হলে কি আর শুধু শুধু আর্ভি…”
রিকির কথা ওখানেই আটকে গেল মেঘাদ্রির চোখ রাঙানি দেখে। রিকির অর্ধেক বলা কথাটা শুনে তানভী ভ্রু কুঁচকে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে গেলে মেঘাদ্রি কথাটা ঘুরিয়ে দিয়ে বলল
-“তানভী এসব প্রশ্নের উত্তর তুই জানলি কি করে, আর্ভিক দাদা কি তোকে পড়াত??”
তানভী উওর দিল
-“বাড়িতে যখন ছিলাম তখন আমার প্রাইভেট টিউটর আমাকে পড়াতেন আর এখন এখানে আর্ভিক ভাই আর প্রাইভেট টিউটর মিলে পড়ান আমাকে।”
-“ওহহ আচ্ছা”
রিসেস টাইমে তানভী মেঘাদ্রি আর রিকি ক্যান্টিনে বসে গল্প করছিল, সেই সময় সমগ্র তার বন্ধুদের কে নিয়ে সেখানে এলো। সমগ্ৰর চোখ গেল তানভীর দিকে,ওর বন্ধুরা ওর কানে কানে কিছু একটা বললে সমগ্ৰ বলে উঠে
-“Ok Done!”
তারপর একটা বাঁকা হাসল।
রিসেসের পর সবাই ক্লাসে এসে বসে যে যর মতো গল্প করছিল। একটু পর একটা ছেলে এসে বলল
-“এই এই সবাই ঠিকঠাক ভাবে বস প্রিন্সিপাল স্যার আর নতুন একজন স্যার এদিকে আসছে।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রিন্সিপাল স্যার আর নতুন একজন স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন। সবাই উঠে দাঁড়াল প্রিন্সিপাল স্যার সবাই কে বসতে বলে বললেন
-“Everyone listen carefully, this is your new account’s teacher Mr. Arvik Roy Chowdhury. Shivasthava sir will not be coming for a few days now. So he will take the class instead.I hope you won’t bother Sir and everyone will be polite.”
তারপর প্রিন্সিপাল স্যার আর্ভিককে বললেন
-“Mr. Arvik Now you can start class.”
আর্ভিক সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। প্রিন্সিপাল স্যার ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আর্ভিক ঠোঁটের কোণায় হাসি রেখে ক্লাসের প্রত্যেকের দিকে তাকাল তারপর সব শেষে তানভীর দিকে তাকাল।তানভী এতক্ষণ ধরে অবাক হয়ে আর্ভিকে দেখছিল, আর্ভিকের পরনে ছিল একটা মেরুন কালারের শার্ট তার হাতা গোটানো, কালো ফর্মাল প্যান্ট, কালো বুট, লেদারের অ্যানালগ ঘড়ি।
আর্ভিক এবার প্রত্যেক স্টুডেন্টদের কাছে এক এক তাদের নাম জিজ্ঞাসা করল। তারপর পড়ানো শুরু করল আর পড়ানোর ফাঁকে বারবার তানভীর দিকে আরচোখে তাকাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর বেল পড়ল। আর্ভিক সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল
-“Okay, that’s all for today. কালকে সবাই Homework করে নিয়ে আসবে। আর যতটুকু Theory করালাম ভালো করে দেখে আসবে।”
এই বলে আর্ভিক ক্লাস থেকে বের হয়ে গেল। আর্ভিক যেতেই তানভী দেখল আর্ভিক কে নিয়ে সবাই আলোচনা করছিল, মেয়ে গুলো তো সবাই আমার ক্রাশ আমার ক্রাশ করে রীতিমত নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে। তানভী এরপর মেঘাদ্রি আর রিকির দিকে তাকাল তাদের দুজনকে বেশ স্বাভাবিক লাগছিল, যেন তারা সব আগে থেকেই জানত।
গুপ্তা স্যারের ক্লাস শেষে স্কুলের করিডোরে একা দাঁড়িয়ে আছে তানভী, দৃষ্টি তার দূরে ওই আকাশটায় হঠাৎ-ই কারোর কথায় ধ্যান ফিরল তার
-“তানভী! এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস!?”
তানভী পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে আর্ভিক তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তর না পেয়ে আর্ভিক ভ্রু কুঁচকে আবার জিজ্ঞাসা করল
-“কি হল বল, কেন দাঁড়িয়ে আছিস এখানে?”
-“ক্লাসে ভালো লাগছিল না তাই।”
আর্ভিক এবার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে
-“কেন, কেউ কি কিছু বলেছে নাকি শরীর খারাপ লাগছে?”
-“না। এমনি”
তানভী ছোট করে উওর দিল। আর্ভিক দেখল একজন টিচার এদিকেই আসছেন তাই সে স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে তানভী কে বলল
-“ক্লাসে যা”
-“আর্ভিক ভাই!”
তানভী কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই আর্ভিক ধমক দিয়ে বলল
-“you have only 2 minutes, এর মধ্যে যদি ক্লাসে না যাস….”
আর্ভিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই তানভী ক্লাসের দিকে দৌড় দিল। আর্ভিক সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
স্কুল ছুটির পর তানভী মেঘাদ্রি আর রিকি একসঙ্গে এসে স্কুল গেটের কাছে দাঁড়াল, তানভী দেখল ড্রাইভার আঙ্কেল তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে মেঘাদ্রি আর রিকিকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল সেখান থেকে, তারপর গাড়িতে বসে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যে তানভী বাড়ি চলে এলো, লিভিং রুমে আসতেই তানভী দেখল অভিক সাহেব বসে টিভি দেখছেন এবং রাখী রায়চৌধুরী রান্নাঘরে চা করছেন। অফিসের সমস্ত দায়িত্ব আর্ভিক নেওয়ার পর থেকে অভিক সাহেব খুব প্রয়োজন ছাড়া এখন আর অফিসে যান না। তানভী দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে আর্ভিকের মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল
-“বড়মা!”
আর্ভিকের মা পিছনে ফিরে দেখলো তানভী, তিনি একটু হেসে অতি স্নেহের সহিত তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
-“এসে পড়েছিস সোনা! যা আগে রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আয় আমি খাবার বাড়ছি।”
এরপর তানভী রুমে গিয়ে কাবাড থেকে একটা কুর্তি আর জিন্স নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। প্রায় ১০ মিনিট পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো আছড়ে বেঁধে নিল তারপর ব্যাগ গুছিয়ে একেবারে কোচিং যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। তানভীকে রেডি হয়ে নামতে থেকে অভিক সাহেব বললেন
-“মামনি কোথাও যাবে নাকি!”
-“হুম আঙ্কেল কোচিং আছে”
-“ও আচ্ছা ঠিক আছে তুমি খেয়ে নাও।”
তানভী গিয়ে খাওয়ার টেবিলে বসলো, আর্ভিকের মা তানভীর প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন, তারপর তানভীর পাশে থাকা চেয়ারটা টেনে বসলেন। তানভী এক লোকমা খাবার মুখে দিল, আর্ভিকের মা জিজ্ঞাসা করলেন
-“প্রথম দিন কেমন কাটলো স্কুল?”
-“ভালো”
ছোট করে উত্তর দিয়ে আরেক লোকমা খাবার মুখে দিল, তারপর বলল
-“জানো বড়মা, আর্ভিক ভাই আমাদের স্কুলের নতুন একাউন্টস এর টিচার হিসেবে এসেছেন।”
-“সিনু!”
আর্ভিকের মা ভ্রু কুঁচকে বললেন। তানভী বলল
-“হুমম”
এরই মধ্যে ঋষি কলেজ থেকে ফিরলো। ঋষি তানভীর কাছে গিয়ে বলল
-“বোনু তাড়াতাড়ি খেয়েনে তোকে কোচিংএ পৌঁছে আমাকে অফিস যেতে হবে।”
-“ভাইয়া তুমি মাত্রই তো কলেজ থেকে ফিরলে, খাবে না কিছু? আর তাছাড়া ড্রাইভার আঙ্কেল তো আছেন, উনি আমাকে পৌঁছে দেবেন তুমি অফিসে চলে যাও।”
-“হ্যাঁ,গুল্লু ঠিক বলেছে ঋষি, তুই খেয়ে নে তারপর একটু রেস্ট করে অফিসে বেরিয়ে যা”
মা আর তানভীর কথায় ঋষি উত্তর দিল
-“না না মা কলেজে একটা ফ্রেন্ড এর বার্থডে ছিল সেখানেই খেয়ে এসেছি, আপাতত এখন খিদে নেই। আমি বরং ফ্রেশ হয়ে আসি তারপর বোনুকে নিয়ে যাব।”
-“আচ্ছা তাই যা।”
ঋষি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে গেলেই অভিক সাহেব তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন
-“ঋষি শোনো”
-“হ্যাঁ বাবা বলো”
-“অফিসে কি কিছু হয়েছে তোমাকে এভাবে আর্ভিক ডাকলো?”
ঋষি মৃদু হেসে সহজ সরল ভাবে উত্তর দিলো
-“না না বাবা তেমন কিছু না এমনি ডেকেছে ভাইয়া।”
-ও আচ্ছা সাবধানে যেও।”
ঋষি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে উপরে চলে গেল,কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে তানভীকে বলল
-“বোনু হয়েছে তোর, চল”
-“হ্যাঁ ভাইয়া চলো”
তারপর ঋষি তার বাবা মার থেকে বিদায় নিয়ে তানভীকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।
ঋষি তানভীর কোচিং এর সামনে গাড়ি থামায়, তারপর ঋষি আর তানভী গাড়ি থেকে নেমে দেখলো রিকি আর মেঘাদ্রি সেখানে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল তানভী কে দেখামাত্রই তারা দুজনে এগিয়ে এলো। তানভী এক গাল হেসে ওদেরকে জিজ্ঞাসা করল
-“তোরা এখানে পড়িস?”
দুজনেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো। মেঘাদ্রি আর রিকি দুজনের ঋষিকে দেখে জিজ্ঞাসা করল
-“কেমন আছো দাদা?”
-“ভালো আছি।তোরা কেমন আছিস?”
-“আমরাও ভালো আছি”
তানভী ঋষিকে বলল
-“ভাইয়া তোমর দেরি হয়ে যাচ্ছে তুমি চলে যাও রিকি আর মেঘাদ্রির সাথে আমি এখানে আছি। তাছাড়া একটু পরেই তো আমরা কোচিং এর ভেতরে ঢুকে যাব।”
-“ঠিক আছে। আর শোন কোচিং শেষ হয়ে গেলে অপেক্ষা করবি। একা একা আসার চেষ্টা করবি না।”
তানভী হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো, তারপর ঋষি সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে সবকিছুই দুটো চোখ দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল ।
কোচিং শুরু হয়েছে প্রায় ৩০ মিনিট হলো, রিকি মেঘাদ্রি আর তানভী তিন জনে পাশাপাশি বসেছিল। কিন্তু তানভী কিছুতেই পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না কারণ, সমগ্র কোচিং শুরু হওয়া থেকেই তার দিকে বারবার তাকাচ্ছে। তানভী মেঘাদ্রিকে ডেকে বলল
-“এই! এই দেখ না ওই ছেলেটা কি নাম বললি যেন… হ্যাঁ সমগ্র, কেমন একটা ভাবে তখন থেকে বারবার তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমার খুব অস্বস্তি লাগছে।”
তানভীর কোথায় মেঘাদ্রি একবার সমগ্রর দিকে তাকালো, মেঘাদ্রির চোখে চোখ পড়তেই সমগ্র সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল। মেঘাদ্রি এবার তানভীর দিকে তাকিয়ে বলল
-“তাকাস না ওদিকে তুই পড়ায় মন দে।”
কোচিং শেষ হয়েছে ১০ মিনিট হল। মেঘাদ্রির বাড়ি অনেকটা দূরে রাত হয়ে যাবে বলে সে অটো ধরে চলে গেল, রিকির বাড়ি কোচিং থেকে মাত্র ৫ মিনিটের দূরত্বে, তাই সে হেঁটে চলে গেল, আর তানভী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর গাড়ি আসতেই তানভী গাড়িতে উঠে গেল তারপর বাড়ি পৌঁছে গেল।
খাবার টেবিলে বসে আছেন অভিক সাহেব আর তানভী আর্ভিকের মা তাদের কে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন। আর্ভিক অফিস থেকে এসে একেবারে খেয়ে রুমে চলে গেছে। ঋষি এসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে তানভীকে বলল
-“বোনু খাওয়ার পর ভাইয়ার রুমে যাস তো তোকে ডেকেছে।”
কথাটা শোনা মাত্রই যেন তানভীর গলায় খাবার আটকে গেল। আর্ভিকের রুমে যাওয়া আর তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ করতে যাওয়া তার কাছে দুটোই সমান। তানভী অনেক কষ্টে মুখে থাকা খাবারটা গিলে ঋষিকে জিজ্ঞাসা করল
-“কেন ভাইয়া ?”
ঋষি একটুখানি খাওয়ার মুখে দিয়ে সহজ সরল ভাবে উত্তর দিল
-“জানিনা রে ভাইয়া তোকে কি কারণে ডেকেছে, তুই যানা গেলেই দেখতে পাবি।”
⋆꙳❅*°⋆❆.ೃ࿔*:・*❆ ₊⋆
৫ মিনিট ধরে তানভী আর্ভিকের রুমের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর আর্ভিক ভিতর থেকে বিরক্ত মিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠল
-“মূর্তির মত বাইরে দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে আয়। রুমের দরজা খোলাই আছে।”
তানভী অবাক হয়ে ভাবল যে তাকে দেখতে পেলো কি করে তারপর আস্তে আস্তে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে এসে তানভী দেখল রুমের লাইট অফ শুধু একটা ড্রিমলাইট জ্বলছে আর বিছানায় হেলান দিয়ে এক পাশে বসে আর্ভিক ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছে। তানভীর উপস্থিতি বুঝতে পেরে আর্ভিক ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে তাকে বলল
-“লাইট অন কর”
আর্ভিকের কথা মতো তানভীর লাইট অন করল। তারপর আর্ভিক তানভীকে বলল
-“ক্লাসে যে Homework আর Theory গুলো দিয়েছিলাম করেছিস।”
তানভীর ভয়ে ভয়ে বলল
-“ন..না। আ…আসলে স্কুল থেকে এসেই তো কোচিংএ গিয়েছিলাম, রা…রাতে করে নেব।”
-“ভালোভাবে কথা বলতে পারিস না? কথা বলতে গেলে কথা আটকায় কেন, Next time থেকে এরকম হলে তুলে এক আছাড় মারবো। Mind it.”
কথাটা শুনেই তানভী আরো ভয় পেয়ে গেল। তারপর আর্ভিক স্বভাব সুলভ গম্ভীর কন্ঠে বলল
-“Homework আর Theory পড়া না করে যদি তুই স্কুলে কাল গিয়েছিস, আমি নিজেও জানিনা তোর সাথে কি করব। যা এখন রুমে যা।”
আর্ভিকের কথা শেষ হতেই তানভী এক দৌড়ে রুমে চলে গেল। রুমে এসে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, তারপর বলল
-” কি ভয়ংকর লোক রে বাবা বলে নাকি তুলে আছাড় মারবে। এই লোকটা আসলেই একটা…”
তানভীর চোখ গেল বিছানার উপর রাখা একটা নতুন গিটার আর কিছু ড্রয়িং-এর জিনিসের ওপর। সে সেখানে গিয়ে ভাবল যে কে আনল এগুলো,
তারপর তার মনে পড়ল সেই দিনের কথা, ওই দিন আর্ভিকের সাথে বাইকে করে কোচিং-এ ভর্তি হতে যাওয়ার সময় আর্ভিক কে সে বলেছিল যে সে বাড়ি যাবে গিটার আর ড্রইং-এর জিনিস গুলো আনতে। সেদিন আর্ভিক কিছু না বললেও আজ তাকে নতুন একটা গিটার আর নতুন সব ড্রইং-এর জিনিস এনে দিয়েছে।
তানভী ভাবল কালকে আর্ভিক কে এর জন্য একটা Thank you জানাবে। তারপর সে গিয়ে পড়তে বসল। পড়া শেষ করে তানভী রুমের আলো ওফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোনটা নিয়ে ফেসবুকটা ওপেন করল। হঠাৎ তার কাছে একটা ফ্রেন্ড সাজেশান এল ‘Arvik Roychowdhury’ নামে, সে কিছু একটা ভেবে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল, সঙ্গে সঙ্গে তার ফোনে নোটিফিকেশন এল ‘Arvik Roychowdhury accept your friend request’. তানভী এবার কি কিছুটা অবাক হল যে রিকোয়েস্ট দেওয়ার সাথে সাথেই অ্যাকসেপ্ট করে নিল। তারপর তানভী আর্ভিকের প্রোফাইলে গেল, সে গিয়ে দেখল তার ফ্রেন্ড লিস্টে সবাই ছেলে আর তানভী ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই। এরপর আর্ভিকের প্রোফাইল স্ক্রোল করতে করতে তানভীর চোখ আটকায় একটা আর্ভিকের পোস্টে। পোস্টটা ছিল আর্ভিকের একটা হাসি মাখা ছবি, নেভি ব্লু কালারের শার্ট তার হাতা গোটানো, ওপরের দুটো বোতাম খোলা আর ক্রিম কালারের একটা প্যান্ট পরা ছিল, হাতে ছিল একটা লেদারের ঘড়ি, চুল গুলো এলোমেলো। আর ক্যাপশন ছিল
“বেজে উঠে সুর হৃদয় বীনায় যখন তুমি আসো ;
মিথ্যে করেই বলতে না হয়, আমায় ভালোবাসো…”
তানভী মুগ্ধ নয়নে পোস্টটা দেখে বলল
-“এই লোক হাসলে এত সুন্দর লাগে! জানতাম না তো”
তারপর ম্যাসেজের অপশনে গিয়ে ভয়ে ভয়ে একটা ম্যাসেজ পাঠালো আর্ভিক কে। মুহূর্তের মধ্যে ম্যাসেজটা দেখল আর্ভিক কিন্তু কোনো রিপ্লাই করল না। তানভী এবার ‘Thank you’ বলে একটা ম্যাসেজ পাঠালো সেটাও সঙ্গে সঙ্গে দেখল আর্ভিক কিন্তু এবারেও কোনো রিপ্লাই দিল না, তানভী আবার কিছু একটা টাইপিং করতে নিলে আর্ভিকের একটা ম্যাসেজ আসে
ব্যাকুল হৃদয়ের প্রনয়িনী পর্ব ১৩+১৪
-“You have only 2 minutes. এর মধ্যে যদি ফোন রেখে না ঘুমিয়ে পড়িস, তাহলে এই রুম থেকে ওই রুমে গিয়ে তুলে এক আছাড় দেবো। Mind it.”
এইরকম ম্যাসেজ দেখে তানভী তখনই তাড়াতাড়ি অফলাইন হয়ে ফোন রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
