Home ভুলভাল অন্তরাল ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৬

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৬

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৬
মুশফিকা রহমান মৈথি

প্রীতির বিয়ের খবরটা পাওয়া গেলো সকালে নাস্তার সময়। পটনভী মঞ্জিলের সব ঝাকানাকা মার্কা খবর গুলো বিশেষ করে এই ডাইনিং হলেই প্রচার হয়। ইকরাম হলো সেই প্রচারের মুল হোতা। তার কান সবসময় খাড়া। তাই যখন জুলফিকার পটনভীর সাথে তার ভাতিজা এবং প্রীতির বাবা ফরহাদ পটনভী এবং তার বড় দুই ছেলে রফিকুল্লাহ এবং সিরাজুল পটনভী গম্ভীরভাবে আলোচনা করছিলো তখন-ই সে সবটা শুনে। এবং শোনার সাথে সাথে সে ছুটে গেলো কাজিনমহলের কাছে।
কাজিনমহল বড়দের থেকে আলাদা হয়ে বসেছিলো। কাঞ্চন আজকেও চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছে। বড়ফুপু আয়েশা পটনভী সারারাত ঘুমিয়েছেন। শুধু একবার তাকে বাথরুমে নেওয়ার সময় কাঞ্চনকে উঠতে হয়েছিলো। তবুও কাঞ্চন সারা রাত ঘুমায় নি। যখনই চোখ বন্ধ করেছে তখন স্নিগ্ধের সেই উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শ তাকে ঝাকুনি দিয়েছে। এটা খুব বিশ্রী একটা অনুভূতি। আরোও অদ্ভূত এবং বিশ্রী কিছু চিন্তা তার মস্তিষ্ককে গ্রাস করছিলো। সেগুলো মোটেই মুখে প্রকাশ করার মতো না। এতোটা নোংরা তো কাঞ্চন ছিলো না। এই সবকিছুর দায় ওই সিমেন্টের বস্তার।

কাঞ্চন কখনো কল্পনাও করে নি সিমেন্টের বস্তা তাকে সত্যি সত্যি চুমু খাবে। কারণ তাকে সর্বদাই খুব সংযত, মার্জিত এবং সুশ্রী আচারণের ব্যক্তি বলেই জানতো কাঞ্চন। উপর থেকে কাঞ্চনকে সে পছন্দ করে না। এতোকাল তার আচার আচরণে সেটাই তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে। আচ্ছা স্নিগ্ধ কি কখনো তার সাথে সোজা মুখে কথা বলেছে? না বলে নি। পটনভী বংশের সবার মধ্যেই যে নবাবী আভিজাত্য বা গাম্ভীর্য আছে এমন কিন্তু বিষয়টা নয়। ধরে নেওয়া যাক বড়চাচার কথা।
বড়চাচা রফিকুল্লাহ পটনভী ঠিক কি করে এই পটনভী পরিবারে জন্মেছেন সেটা কাঞ্চনকে ভাবায়। তার ভাষা, আচারণ, চালচলন কোনো কিছুই পটনভী পরিবারের মতো নয়। বরং খুব সস্তা ধরণের। সবসময়ে একটা রওয়াব ঝাড়ার পায়তারা করেন তিনি। ছোট ছোট বিষয়ে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন যেন এই বিষয়টা ঘটেছে বলে মঙ্গলগ্রহ থেকে অ্যাস্টেরয়েড পৃথিবীতে এসে পড়েছে এবং তাতে সবার আগে পটনভী মঞ্জিল ধ্বসে যাবে। অথচ বিষয়টা খুব ঠুংকো। পটনভীদের বিশাল ব্যবসা। যদিও ঠিক কি কি ব্যবসা সেটা কাঞ্চনের জানা নেই। তবে এই ব্যবসাতে সবচেয়ে বেশি লস করেছেন বড়চাচা। তার মধ্যে ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট বিষয়টা নেই। একটা হোটেলের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু বানাতে যে টাকার বরাদ্দ ছিলো বড়চাচা তার থেকে তিনগুণ টাকা খরচ করে ফেলেছিলেন। ফলে হোটেলটা আর শুরু করা হয় নি। এই নিয়ে মঞ্জিলে ঝগড়াঝাটিও কম হয় নি। পটনভী পরিবারকে রসুনের একটা পাছা মনে হলেও তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের অভাব নেই।

সরফরাজ পটনভী স্নিগ্ধ কিন্তু এমন নয়। বরং সংখ্যালঘু মার্জিত, আভিজাত্য, ব্যক্তিত্বে ভরপুর পটনভীদের একজন স্নিগ্ধ। কাজিনমহলের চল্লিশজনের সবার সাথে সবার সখ্যতা হলেও স্নিগ্ধ নিজেকে সবার থেকে পৃথক করে রেখেছে। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে একটা ভাবগাম্ভীর্যতা ছিলো, যা এই নতুন জেনারেশনের কারোর মধ্যে নেই। কম কথা বলবে, কম মিশবে। একটা ভারীক্কিভাব। কাজিনদের মজার মধ্যে সে কখনোই ঢুকবে না। বিশেষ করে কাঞ্চনদের সমবয়সী কাজিনদের সে কেমন তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে। কপালে তীব্র ভাঁজ, চোখে হেয় দৃষ্টি। যেন স্নিগ্ধ সত্যিকারের নবাব এবং কাঞ্চনেরা তার প্রজা। কথাও বলতে অনীহা এই লোকের।
র‍্যাবে জয়েন করার পর থেকে স্নিগ্ধ তার ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ বদলে ফেললো। সে কাজ পাগল মানুষ। কাজের সময় স্নিগ্ধ একটা হিংস্র বাঘ। এমন অনেক রাত তাকে রক্তস্নাত হয়ে ফিরতে দেখেছে কাঞ্চন। তখন তাকে দেখলে গা ছমছম করতো। রক্তে ইউনিফর্ম ভেজা, চোখের দৃষ্টিতে এক অশরীরীর ছাপ। মনে হতো এর থেকে নিষ্ঠুর, অমানুষ মনে হয় আর নেই। অবশ্য মনে দয়া মায়া থাকলে এনকাউন্টার করা যায় না। স্নিগ্ধ যে ঠিক কতগুলো এনকাউন্টার করেছে তার কোনো হিসেব নেই। সে নিজেও গুনে না। তাকে সবচেয়ে বিশ্রী এবং ভয়ংকর কেসগুলোতেই নিয়োগ করা হয়। এবং এজন্যই তার এতো সুনাম। এইতো বিয়ের দশদিন আগেও তাকে টিভিতে দেখিয়েছিলো। একটা ভয়ংকর খুনীকে ঘরে ঢুকে এনকাউন্টার করলো। সাংঘাতিক মানুষের সাথে থাকতে হলে নিজেকেও সাংঘাতিক হতে হয়। তাই স্নিগ্ধও সাংঘাতিক। সবাই তাকে এড়িয়ে চলে এই স্বভাবের কারণে। কিন্তু দুদিন যাবৎ তার এমন আচারণগুলো খুব বেশি দ্বিধায় ফেলে দিচ্ছে কাঞ্চনকে।

এতোগুলো বছর সে যা ভেবেছে তা কি ভুল।
এসব চিন্তায় ঘুমাতে পারে নি কাঞ্চন। ফলে এখনো ঝিমুনি আসছে। এরমধ্যে ইকরাম একপ্রকার ছুটে এলো। রিদম আয়েশ করে খিঁচুড়ি আর গরু মাংস খাচ্ছিলো। তার গলায় খাবার আঁটকে গেলো, যখন ইকরাম প্রায় চিঁচিঁ গলায় বললো,
“প্রীতি আপু বিয়ে করে হানিমুনে চলে গেছে। মামারা যাচ্ছে ওকে বেঁধে বাড়িতে আনতে। ফারদিন মামা তো আজকে ওকে ত্যাজ্য কন্যা করবে।”
রিদম মাথায় দুটো বাড়ি দিয়ে নিজের কাঁশি আটকালো। কাঞ্চনের ঝিমুনি আর ঘুমের রেশ কর্পূরের মতো উড়ে গেলো। সে চোখ বড় বড় করে বললো,
“ত্যাজ্য করলে ধরে বেঁধে আনবে কেন?”
“কেন আবার? শাস্তি দিতে! তোমাকে যেমন দিয়েছিলো। তবে প্রীতি আপির শাস্তিটা মনে হয় বেশি হবে। আমার মনে হচ্ছে প্রীতি আপি আসলে তুমিও আরেকদফা শাস্তি খাবে!”
“আমি কেন শাস্তি খাবো! একটা জানকে আর কয়বার শাস্তি দিবে! আমার তো দোষ নেই!”
রিদম এবার উঠে এসে কাঞ্চনের পাশে বসলো। তার কাঁধে হাত রেখে বললো,
“তোকে মনে হয় সম্পত্তি থেকে বাদ দিবে। ইশ কি করলি? একজনের প্রেম কবুতর হতে যেয়ে কি না ফকিন্নি হয়ে গেলি! এজন্যই বলেছিলাম আমার সাথে প্রেম কর। আমার সাথে প্রেম করলে তুই এতো ব্রেইন চালানোর সময়-ই পেতি না!”

“হ্যা, তোর ব্রেইন ওর এসাইনমেন্ট করাতেই চলে যেত। সেই সাথে ওর কুবুদ্ধির ভরপাই করতে করতে তুই কাঙ্গাল হয়ে যেতি!”
বলে উঠলো পৃথুলা। রিদম দাঁত খিঁচিয়ে বললো,
“পিঠের উপর ধাম করে মারবো তোর!”
“আয় মার! বসে আছিস কেন!”
অঞ্জনা চোখের চশমাটা নাকের উপর ঠেলে বললো,
“প্রীতি আপু সত্যি সত্যি প্রেমিকের সাথেই পালিয়েছে।”
“মিথ্যা মিথ্যা কেমনে পালায়!”
পৃথুলার প্রশ্নে অঞ্জনা একটু বিজ্ঞ স্বরে বললো,
“আই থট, না থাক!”
“তোমার থটানিগুলো একটু পেশ করো। আমরাও শুনি।”

অঞ্জনা বলতেই যাবে কিন্তু স্নিগ্ধকে দেখে তার ঠোঁটে কুলুপ এঁটে গেলো। একটা কালো শার্ট, কালো প্যান্ট পড়ে একেবারে ফিট বাবু হয়ে নামলো স্নিগ্ধ। ডান বগলের নিচে ঝুলছে বন্দুক সমেত হোলস্টার। হাতে টাইটানের কালো চেইনের ঘড়ি। খুব দামী একটা পারফিউম দিয়েছে। এসেই দাঁড়ালো ঠিক কাঞ্চনের পেছনে। খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখলো কাঞ্চনের ঘাড়ে রিদমের হাতটা। পৃথুলা বসে ছিলো কাঞ্চনের এক পাশে। পৃথুলার দিকে তাকাতেই সে সুরসুর করে মাথায় সালাম ঠুকে উঠে পড়লো। স্নিগ্ধ বসলো কাঞ্চনের পাশে। বাম হাতে কাঞ্চনের চেয়ারটাকে এক টানে নিজের কাছে নিয়ে আসলো। ফলে রিদম প্রায় পড়েই যাচ্ছিলো। কাঞ্চন হতভম্ব হয়ে গেলো স্নিগ্ধের কাজে। চোখ বড় বড় করে তাকাতেই স্নিগ্ধ বললো,
“চোখ মার্বেলের মত খসে যাবে!”
তারপর ধাঁরালো চোখে তাকালো রিদমের দিকে। রিদম একটা শুকনো ঢোক গিললো। তারপর সোজা হয়ে বসলো। খিঁচুড়িটা প্রায় শেষ। প্লেটে মাংস আর ঝোল পড়ে আছে। পৃথুলাকে উঠতে দেখে বললো,
“একটু খানি মাংস আছে। একটু খিঁচুড়ি..”
কথাটা শেষ হবার আগেই পৃথুলা সুন্দর তার পাতের সম্পূর্ণ মাংসটা খেয়ে বললো,

“এখন নেই!”
“শয়তান্নি!”
বলতেই পৃথুলা জিভ বের করে ভেঙ্গিয়ে হাটা দিলো। স্নিগ্ধ থাকায় কোনো কথাই হচ্ছে না। সবাই চুপচাপ খেতে লাগলো। রিদমকে বাধ্য হয়েই উঠতে হলো নিজের খাবারের সন্ধানে। কাঞ্চন খেতে পারছে না। তার নাকে বিঁধছে স্নিগ্ধের পারফিউমের গন্ধ। কেমন উডি একটা গন্ধ। তার চেয়ারটা টেনে প্রায় নিজের চেয়ারের সাথে লাগিয়ে ফেলেছে স্নিগ্ধ। তাই অস্বস্তি বেশি হচ্ছে। স্নিগ্ধ আড়চোখে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললো,
“মিসেস পটনভীকে কি আমার খাইয়ে দিতে হবে?”
কাঞ্চনের কপালে তীব্র ভাঁজ পড়লো। চোখ মুখ খিঁচিয়ে বললো,
“আমার হাত আছে!”
“তাহলে খা!”
“আমি কি করবো না করবো সেটা কি এখন থেকে তুমি বলে দিবে?”
“এপারেন্টলি হ্যা!”
“কেন, তুমি কি আমার আব্বা?”
কথাটা একরাশ বিরক্তির সাথেই বললো কাঞ্চন। স্নিগ্ধ একটু থামলো। খুব সূক্ষ্ণ চোখে দেখলো কাঞ্চনকে। একটু বেশি সাহসী হয়ে গেছে কি মেয়েটা! সে হাসলো না। বরং কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,

“আব্বা না, ইউ ক্যান কল মি ড্যাডি!”
কথাটা শুনতেই শরীরটা ঝনঝনিয়ে উঠলো কাঞ্চনের। ফলেই মুখ বিকৃত করে বললো,
“ওয়াক থু!”
বলেই প্লেট নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। থুথু ফেলার জায়গা নেই নয়তো ফেললো। সে উঠে দাঁড়াতেই স্নিগ্ধ তাকে এক টানে বসিয়ে বললো,
“খেয়ে তারপর উঠ!”
“আমার ক্ষুধা নেই!”
“তাও খাবি!”
“আমি খাব না বললাম তো!”
স্নিগ্ধ হিম দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। খুব আস্তে বললো,
“তুই যদি চাস আমি সবার সামনে তোর মুখ চেপে তোকে খাওয়াই, তাহলে বি মাই গেস্ট!”
“একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?”
“মিসেস পটনভী মানেই তো বাড়াবাড়ি, সুতরাং এই বেশি হওয়াটাও ম্যাটার করে না।”
কাঞ্চন চোখ মুখ খিঁচিয়ে তাকালো তার দিকে। কি ভেবে একটু ফিঁচেল হেসে বললো,
“শুনেছো নিশ্চয়ই, তোমার হতে হতে হওয়া বউ যে কি হতে পারলো না, সে বিয়ে করে হানিমুন অবধি চলে গেছে!”

স্নিগ্ধর চোয়ালটা একটু শক্ত হলো। সে চাইলো না কাঞ্চনের দিকে। কাঞ্চন সুযোগ বুঝে আবার সিংহের মুখে হাত দিয়ে হাড় টানার মত স্নিগ্ধকে খুঁচিয়ে বললো,
“তোমার লাক খারাপ না স্বভাব সেটা তুমি ই জানো তবে তোমার বউভাগ্য কিন্তু সোনা দিয়ে লেখা। একজন অন্যের সাথে পালায়, আরেকজন বিয়ের পরও তোমাকে বর মানে না। ইশ! আমি তোমার জায়গায় হলে কচু গাছে দড়ি দিতাম স্নিগ্ধ ভাই!”
স্নিগ্ধ এবার তার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো। খুব শান্ত গলায় বললো,
“যে আমার বউ হয় নি তাকে নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। তবে যে এখন আমার হালাল বউ, তাকে কি করে আমার সাথে কবর অবধি বেঁধে রাখবো সেই ছক আমি কেঁটে ফেলেছি।”
“আমি বাধ্য হয়ে তোমাকে বিয়ে করেছি।”
“বাধ্য হয়ে আমার বাচ্চার মাও হয়ে যাবি।”
“স্বপ্ন দেখো বসে বসে!”
স্নিগ্ধ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
“যার এমন একটা মার্কামারা বউ আছে তার স্বপ্ন দেখা ছাড়া আর কি গতি!”

কাঞ্চন উঠতে পারলো না তাকে বসেই থাকতে হলো। স্নিগ্ধের খাওয়া শেষ হবার পর সে কাঞ্চনের হাত ছাড়লো। পুরোটা সময় তাকে বসে থাকতে হলো স্নিগ্ধের পাশেই। হাতটা ছাড়া পেতেই সে হনহনিয়ে চলে গেলো। রিদম পানি খেতে হলে আবার এসেছিলো। স্নিগ্ধের সাথে তখন তার চোখাচোখি হল। সে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিলো। উল্টো ঘুরে চলেই যাবে ঠিক তখনই স্নিগ্ধের হিম স্বর কানে এলো,
“কাঞ্চন আগে তোদের বোন ছিলো, এখন সে আমার হালাল ওয়াইফ। সো আমি যেন তার সাথে তোদের ঢলাঢলি না দেখি। মাথায় ছেপে নে কথা টা।”
রিদমের হৃৎপিন্ডটা গলার কাছে চলে এলো। কোনো উত্তর দিতে পারলো না। স্নিগ্ধ ভাইয়ের এমন আচারণ স্বাভাবিক কিন্তু কাঞ্চনের জন্য এমন আচারণ মস্তিষ্ক মেনে নিচ্ছে না।

বৌভাতের জন্য প্রীতির নামে পার্লারে বুকিং ছিলো। কিন্তু কাঞ্চন সরাসরি মানা করে দিয়েছে। সে যাবে না। কারণ সে অন্যের নামে সাজবে না। অন্যের বরকে বিয়ে করেছে সেটাই অনেক। এখন অন্যের বুকিং এ সে সাজবে না। আয়েশা পটনভী নিজের পুত্রবধূকে মাথার দিব্যি দিয়েছেন। আজকে যেন সে একটু বধূর মতো আচরণ করে। ফলে পৃথুলা বললো,
“তোকে আমি সাজিয়ে দিব। এমন সাজাবো যে ভাইয়া ঠাস করে পড়ে যাবে।”
“মরে যাবে এমন অপশন নেই?”
কাঞ্চন দাঁতে দাঁত পিষে বললো। পৃথুলা তাকে একটা চাপড় দিয়ে বললো,
“যা বেডি!”
কাঞ্চনের জন্য একটা পিচ কালারের লেহেঙ্গা কেনা হয়েছে। সে বলেছে সে প্রীতির রিসিপশনের লেহেঙ্গা পড়বে না। আয়েশা পটনভী অবশ্য আরোও অনেকগুলো অর্ডার করেছিলেন। কিন্তু সেগুলো কাঞ্চন ফেরত দিতে বলেছে। তার এই লেহেঙ্গা, শাড়ি, সালোয়ার কামিজ ভালো লাগে না। সে তার ঢোলা মোবাইল প্যান্ট, এক্সেল সাইজের টিশার্ট এবং স্কার্ফেই কম্ফোর্টেবল। কিন্তু এরা কেউ বুঝলে তো। গা কুটকুট করে– কথাটা বারবার করে বললেও কেউ শুনে না। অবশ্য এই লেহেঙ্গাটা গা কুটকুট করছে না। প্রথমে ভেবেছিলো স্নিগ্ধভাই বুঝি প্রীতি আপুর জন্যই ওমন লেহেঙ্গা বিশেষভাবে বানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তার ধারণা বদলালো। এই কেরামতি অবশ্যই সরফরাজ পটনভী স্নিগ্ধের নয়। এই ক্রেডিট তার বড়ফুপুর।

বৌভাতের অনুষ্ঠান শুরু পনেরো মিনিট আগে কাঞ্চনকে নিয়ে স্টেজে বসানো হলো। স্নিগ্ধ এখনো ফিরে নি। তাই একাই বসতে হলো। ক্যামেরাম্যান পরপর ছবি তুলতে ব্যস্ত। কাঞ্চনও পোজ দিয়ে ছবি তুলছে। ফ্রি ফ্রি মডেল হওয়ার সুযোগ কে হাতছাড়া করে! স্নিগ্ধ আসলে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে।
কাঞ্চনকে লাগছেও পুতুলের মতো। খুব ভারী মেকাপ করে দেয় নি পৃথুলা। গহনাও খুব ভারী না। আয়েশা পটনভীর বিয়ের একটা সীতা হার এবং একটা কণ্ঠহার পরানো হয়েছে কাঞ্চনকে। আরোও পরাতে চেয়েছিলো, কিন্তু কাঞ্চন বলেছে,
“সোনার দোকান সাজার ইচ্ছে নেই আমার। বেশি করলে আমি এসব পরবো না।”
লেহেঙ্গার পিচ রঙটা গায়ে মিশে আছে কাঞ্চনের। আরোও বেশি মায়াবী লাগছে যেন গোলগাল মুখশ্রীযুক্ত মেয়েটাকে। ক্যামেরাম্যান ছবি তুলতে তুলতে বললেন,
“অপূর্ব লাগছে কিন্তু আপনাকে!”
“অন্যের বউকে অপূর্ব বলাটা খুব ভালো ম্যানারস না!”

ভারী স্বর কানে আসতেই ক্যামেরাম্যান নড়ে চড়ে উঠলো। কাঞ্চনের মুখ ভচকে গেলো। চলে এসেছেন সিমেন্টের বস্তা। একটা সাদা শেরওয়ানী পড়েছেন বান্দা। নবাবী চালের জন্য নাকি দৈহিক গড়ণের কারণে জানা নেই তবে পাকিস্তানি মডেলের মতো দেখাচ্ছে স্নিগ্ধকে। এসে সে বসলো ঠিক কাঞ্চনের পাশে। তার হাত চেপে ধরে খুব গম্ভীর স্বরে আদেশ করলো ক্যামেরাম্যানকে,
“এবার ছবি তুলুন। আর ছবিগুলো যেন সুন্দর হয়। মিসেস পটনভীর যেন আফসোস না থাকে!”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৫

কিন্তু আফসোসটা হলো বৌভাতের অনুষ্ঠানের শেষে। যখন ফরহাদ চাচার কথায় প্রীতি এবং তার স্বামী আফনানকে একপ্রকার তুলে আনা হলো। প্রীতিকে যখন শাস্তির জন্য জুলফিকার পটনভীর সামনে হাজির করা হলো তখন প্রীতি সুন্দরভাবে মিথ্যে বললো,
“এখানে শুধু আমার বা স্নিগ্ধ ভাইয়ের জীবন জড়িত ছিলো না। ছিলো আরোও দুজনের জীবন। আমি যেমন আফনানকে ভালোবাসি বলে তার সাথে পালিয়েছি। তেমন কাঞ্চনও স্নিগ্ধ ভাইকে ভালোবাসে বলেই আমাকে পালাতে সাহায্য করেছে।”

ভুলভাল অন্তরাল পর্ব ৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here