মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৩
jannatul firdaus mithila
“ পৃথিবীর আর কোনো সম্পর্কের মূল্য না দিলেও আমি চাইব তুমি অন্তত ঐ মেয়েটার সিঁদুরের মূল্য দিও, যে কিনা বিগত ৮ বছর ধরে তোমার নাম করে নিজের সিঁথিতে মেখে আসছে!”
দৃষ্টিতে আগুন জ্বললো মনস্টারের। চোয়ালের রেখা টানটান, সুদর্শন মুখখানার প্রতিটি নিখুঁত ভাঁজে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কঠিন অনমনীয়তা। দাঁত কপাটির একে-অপরের সাথে সে-কি শক্ত ঘর্ষণ! অদূর থেকে রূঢ় মানবের দাঁত কটমটানোর শব্দ বড্ড কানে বাজছে তৌকির সাহেবের। তবুও তিনি নিরুত্তাপ! ঘাড় নুইয়ে বসে আছেন ফ্লোরে। চোখেমুখে তার এক নিদারুণ কুটিলতা। হয়তো ভেবেই বসেছেন — তার এহেন কথায় কাজ হয়েছে! মনস্টার হয়তো কিছুটা হলেও টলেছে। তবে বোকা মানবের এরুপ চিন্তাভাবনায় এক বালতি জল ঢেলে তক্ষুনি অদূর থেকে ভেসে আসে নির্দয় মানবের দাঁত কিড়মিড় কন্ঠ!
“ তোর এতো দরদ উথলে পড়লে তুই গিয়ে বিয়ে করে ফেল বান্দীর ছেলে! তোর তো আবার অভ্যেস আছে ঘরে একটা আর বাইরে দশটা রাখার। তো যা না বান্দীর ছেলে, গিয়ে কর আরেকটা! শুধু শুধু আমার এখানে এসে নাটক মারাচ্ছিস কেনো? ম’রার পাখনা গজিয়েছে তোর রাস্কেল?”
আচমকা বজ্রপাতের ন্যায় চমকে উঠলেন তৌকির মির্জা। বিস্ময়ে চোখদুটো কেমন গোলগোল করে তাকালেন রূঢ় মানবের পানে। অধরযুগলে সামান্য ফাঁক বেড়েছে মধ্যবয়স্কের। বিস্ময়ের অভিঘাতে কয়েক মুহুর্তের জন্য স্থির হয়েছে বেচারার সচল মস্তিষ্ক। তবে এর স্থায়িত্ব খুব বেশি সময় জুড়ে চললো না। তন্মধ্যেই তৌকির মির্জার সম্বিৎ ফিরল রূঢ় মানবের কঠিন হুংকারে,
“ গেট আউট স্কাউন্ড্রেল!”
এবারে তেতেঁ উঠলেন তৌকির মির্জা। তেলেবেগুনে ছ্যাৎ করে জ্বলে উঠে ক্ষিপ্রতায় দাঁত খিঁচে আওড়ালেন,
“ মুখ সামলে কথা বলো অধীর! আমি তোমার বাবা হই!”
একজন নির্দয় পাষণ্ড, যার কাছে পৃথিবীর কোনো সম্পর্কের মূল্য নামমাত্রও নেই, সে কিনা মান্য করবে তৌকির মির্জাকে? এ যে এক চিরন্তন অবাস্তব ঘটনা! ক্রোধে অন্ধ তৌকির সাহেব বোধহয় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছেন নিজের। আক্রোশে দাঁতে দাঁত চেপে চোখদুটো কুঁচকে যেইনা দৃষ্টি উঁচাবেন ওমনি এক বিকট শব্দ হলো পুরো কামরা জুড়ে। মুহুর্তেই থমকালেন তৌকির সাহেব। মধ্যবয়সী শরীরটা তার হুট করে দুলে উঠল খানিক। হাঁটুতে কেমন তীব্র ব্যথা অনুভূত হচ্ছে! শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজেদের কার্যকারিতা হারাচ্ছে ক্রমশ। তৌকির সাহেব হতবাক! চোখের পলকে তার সঙ্গে হঠাৎ কি হলো কে জানে। বেচারা অবোধের ন্যায় ঘাড় নুইয়ে তাকালেন নিজ পায়ের দিকে। কপাল কুঁচকে হাঁটু অব্ধি ঝাপসা দৃষ্টিযুগল আটকাতেই স্তম্ভিত হলেন তৌকির মির্জা। হাঁটু থেকে একনাগাড়ে গড়াচ্ছে তাজা লহু! এক ভোঁতা চিনচিনে ব্যথায় প্রায় ছিড়েঁ যাচ্ছে হাঁটুর লিগামেন্ট। দূর্বল তৌকির সাহেবের পাদু’টো টলমল। একহাঁটু আহত হওয়ায় অন্য হাঁটুতে খুব একটা জোর দেবার সাধ্যি হয়নি বেচারার।
টলতে টলতে একটাসময় হুট করেই পড়ে গেলেন স্বচ্ছ কাঁচের তৈরী ফ্লোরে। অতঃপর শুরু হলো মধ্যবয়স্কের ব্যথাতুর আর্তনাদ! বেচারার কন্ঠে সে-কি জোর! দু’হাতে নিজের আহত হাঁটুখানাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে কাঁদছেন বেচারা। দিনদুনিয়া ভুলেছেন তিনি, ভুলে বসেছেন ঘরে থাকা নির্দয় মানবের উপস্থিতি। আর্ত তৌকির সাহেব যখন নিজ কষ্টে বুদ হয়ে আছেন ঠিক তখনি তার সামান্য কুঁচকে রাখা ললাট বরাবর আচমকা স্পর্শ পেলেন উষ্ণ নল জাতীয় কিছুর। কান্না ভুলে ভড়কালেন তৌকির সাহেব। হতচকিত নেত্রে ঘাড়ের পেছনাংশ কুঁচকে সম্মুখে তাকাতেই কেঁপে উঠলেন তিনি। পাহাড়সম বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী রূঢ় মানব কেমন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার পানে। বাহাতে তার একখানা বিদেশি দামী রিভলবার, যার নল আপাতত তৌকির মির্জার ললাটের কেন্দ্রস্থলে। ট্রিগার রিংয়ে তর্জনী ঢুকিয়ে রেখেছে মুগ্ধ। যেন যে কোনো সময়ই ফায়ার করে দিবে বেয়াদব ছেলে! তৌকির সাহেব স্বর হারালেন। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিললেন ছেলের অলক্ষ্যে। মুখগহ্বরে জিভ নড়ছে তার!
কিন্তু ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে বেরুচ্ছে না শব্দ। রূঢ় মানব ক্রুর হাসলো মধ্যবয়স্কের এহেন করুণ দশা দেখে। হাতের জোরে রিভলবারের লম্বাটে ধাতব নলটা ধীরে ধীরে নামিয়ে আনে লোকটার কপাল বেয়ে নাক তারপর ঠোঁট অব্দি। এদিকে তার এহেন কান্ডে দেহ ছেড়ে পরাণ পাখি ঠুস করে উড়ে যাবার যোগাড় তৌকির সাহেবের। বেচারার দেহখানি কাঁপছে ভীষণ। ঠোঁটদুটো তিরতির করে কাঁপিয়ে যে-ই না তিনি অস্ফুটে কিছু আওড়াবেন ওমনি মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষের রুক্ষ আঙুলগুলো চট করে মুঠোয় চেপে ধরল তৌকির সাহেবের পাইক স্টাইলে থাকা চুলগুলো। অতঃপর রূঢ় মানব এক ঝটকায় মধ্যবয়স্কের মাথাটা খানিক উঁচিয়ে তুলে, তার মুখগহ্বরে জোর করে ঠেলে দিলো বন্দুকের ধাতব নল। মুহুর্তেই জমে গেলেন তৌকির মির্জা! মুখগহ্বরে জোর করে বন্দুকের নল ঢোকানোয় দাঁতের সঙ্গে ঠোঁটের তীব্র ঘর্ষণে ঠোঁটের কার্নিশ ফেটেঁছে তার। সেদিকে থোড়াই খেয়াল করেছে রূঢ় মানব! সে-তো ব্যস্ত নিজ পাগলামিতে। তৌকির সাহেব গোঙাচ্ছেন, চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়াচ্ছেন অশ্রু। অথচ সম্মুখের নির্দয় মানব সাপের ন্যায় হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। বাদামী চোখদুটো তার সে-কি আগুন ঝরাচ্ছে! চোয়ালটা বুঝি এক্ষুণি কটমট করতে করতে ভেঙে পড়বে নিশ্চিত। যুবক হাতের জোর বাড়াচ্ছে ক্রমশ! বন্দুকের নল আর-ও খানিকটা ঠেলে দিতেই তা গিয়ে বাঁধ মানল তৌকির সাহেবের আলজিব বরাবর। সহসা তীব্র যন্ত্রণায় গুঙিয়ে উঠলেন মধ্যবয়স্ক। চোখদুটো কুঁচকে নিতেই কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের কটমট ধ্বনি!
“ আমার রাজত্বে দাঁড়িয়ে আমার সাথেই মাইন্ড গেম খেলার স্পর্ধা পেলি কোত্থেকে তৌকির মির্জা? আমাকে শ্যামৌপ্তী দেবি মনে করেছিস নাকি বান্দীর ছেলে? যে কি-না তোর ঐ কুটিলতা ধরতে পারবেনা!”
একমুহূর্ত থামল যুবক। ঠোঁটের কোণে আচমকাই এক চিলতে ক্রুর হাসি টেনে ঘাড় নুইয়ে আনলো অদ্ভুতভাবে। অতঃপর তৌকির সাহেবের কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসিয়ে বলল,
“ লিসেন বা’স্টার্ড! বাঘের চোখ ফোঁটার সে যেখান থেকেই শিকার করা শিখুক না কেনো, একটাবার শিকার করা শিখে গেলে সে আর কারো কাছে বাঁধা থাকেনা। সে নিজের দক্ষতাতেই অর্জন করে রুলিং! তখন তার চোখে শুধু শিকার নয়, তার আশেপাশের সবকিছুই হয়ে ওঠে তার একান্ত সাম্রাজ্য! এন্ড টুডে আ’ম দ্য ব্লা’ডি মনস্টার এন্ড দিস ইজ মা’ই ফা’কিং কিংডম। ঐসব প্রতিজ্ঞা-ট্রতিজ্ঞা এন্ড অল দোস ফা’কিং বুলশিট মিন টু মি নাথিং! আমার যা প্রয়োজন ছিল, আমি তা পেয়ে গেছি। গোটা একটা কালো সাম্রাজ্য গড়েছি নিজের নামে এন্ড দ্যাটস অল আই নিডেড। এখন আমার নাম নিয়ে কে মরছে, কে বাঁচছে হু দা ফা’ক কেয়ারস এবাউট দ্যাট? এসব বালছাল নিয়ে আমার সামনে কথা বলতে আসবিনা। ডু ইউ্য গেট মা’ই ওয়ার্ডস বাস্টার্ড?”
ঢোক অব্ধি গেলার মুরোদ নেই তৌকির মির্জার। ঘটে বুদ্ধি থাকলে থোড়াই আর কখনো ম্যানুপুলেট করতে আসবেন মনস্টারকে। তৌকির সাহেব এক জন্মের শিক্ষা পেলেন! তড়িঘড়ি করে মাথা ঝাঁকালেন কোনমতে। মনস্টার বাঁকা হাসলো তা দেখে। তক্ষুনি হাতের জোরে বন্দুকের নলটা মুখগহ্বরেই উঁচিয়ে তুলল নির্দয় মানব। দাঁতে দাঁত চেপে ফের কর্কশ কন্ঠে আওড়াল —
“ নেক্সট টাইম আমার সামনে মুখ খোলার আগে ১০বার ভেবেচিন্তে নিবি বান্দীর ছেলে। হেন্সফোর্থ বেশি তেড়িবেড়ি করলে একদম জ্যান্ত ছুড়েঁ ফেলব শার্কভর্তি বেসমেন্টে। ইউ নো হোয়াট? আজাইরা খেতে খেতে তোর শরীরে চর্বি কিন্তু ভালোই জমেছে। আমার শার্কগুলোর একবেলার খাবার হতে পারলে তুই ম’রে গিয়েও ধন্য হবি।”
ভয়ে তটস্থ তৌকির সাহেব। পলক ফেলতে ভুলে গেলেন চোখের। যুবক একমুহূর্ত কটমটিয়ে চেয়ে রইল তার পানে। পরক্ষণেই এক লহমায় তৌকির সাহেবের মুখগহ্বর থেকে বন্দুকের নলখানা বের করে নিয়ে, পেছালো এক-কদম। কায়দা করে হাতে বন্দুক নাচিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বলল —
“ গেট লস্ট টু দ্য হেল রাস্কেল!”
ভড়কালেন তৌকির সাহেব। অসহায়ের ন্যায় একদফা দৃষ্টিপাত করলেন নিজের আহত হাঁটুর ক্ষতে। এহেন আহতাবস্থায় কিভাবে কক্ষ ছেড়ে বের হবেন তিনি? দাঁড়াবেন-ই বা কিভাবে? তাছাড়া বের না হয়েও যে উপায় নেই। ছেলেটা হয়েছে বড্ড উম্মাদ। নিজ প্রয়োজনে সবাইকে ব্যবহার করা শেষে দ্বিতীয় ছুঁড়ে ফেলতেও সেকেন্ড খানেক সময় নেয় না। অথচ ক’দিন আগেই এ ছেলে বাংলাদেশ গিয়ে সবার সামনে তাকে ড্যাড, ড্যাড করে মাথায় তুললো। অবশ্য সেটাও ছিল তার প্রয়োজন! প্রয়োজন শেষ, গুরত্বও শেষ। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন তৌকির সাহেব। কোনরূপ বাড়তি উপায়ন্তর না পেয়ে, অবশেষে ফ্লোরে দু’হাত ভর দিয়ে শরীরখানা ঠেলতে ঠেলতে এগোলেন দরজার দিকে।
ফ্লোরের একটা লম্বাটে অংশ ভিজে গিয়েছে তৌকির সাহেবের লহুতে। মানুষটা শরীর হেঁচড়ে হেঁচড়ে চলে গেলেন ঘর থেকে। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই মুগ্ধের। সে দাঁড়িয়ে আছে স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালখানার সামনে। কাঁচের তৈরী দেয়ালখানা ট্রান্সপারেন্ট! অদূরের মেঘেদের আড়ালে হুটহাট উঁকি দেয়া পাহাড়ের কোল স্পষ্ট চক্ষুগোচর। যুবক স্থির দৃষ্টে তাকিয়ে আছে বাইরে। ধারালো চোয়ালের রেখা টানটান তার। মুখখানায় ঝুলে আছে এক অদ্ভুত চাপা রাগ। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া রয়েসয়ে বেরুচ্ছে বাদামী ঠোঁটের ফাঁকফোকঁর দিয়ে। তার মানসপটে হুটহাট ভাসছে কিছু টুকরো টুকরো দৃশ্য। সবটাই সপ্তদশীকে নিয়ে! একবার দেখা যাচ্ছে — সপ্তদশী হাসছে। আরেকবার দেখা যাচ্ছে সপ্তদশী ছুটছে। যুবক আনমনে তাকিয়ে দেখছে সব। নিজের এহেন দৃশ্যমান মানসপটে বড্ড বিরক্ত সে। তার মস্তিষ্ক মোটেও চাচ্ছেনা সে মাহি’কে দেখুক। অথচ চোখগুলো যে কি বেয়াদব! ইদানীং একটু বেশি-ই বেয়াদবি করছে তার সঙ্গে। যুবক অতিষ্ঠ এপর্যায়ে। ঠোঁট গলিয়ে অস্ফুটে বিরক্তিকর শব্দ তুলে যে-ই না দেয়ালের সামনে থেকে কদম সরাবে ওমনি তার কানে বেজে উঠল মাহি’র কন্ঠ!
“ আপনি একটা বিস্ট!”
থমকায় মুগ্ধ! হৃদয়ের অদ্ভুত দোলাচালে আচমকা ঘাড় বাকিয়ে তাকালো কাঁচের দেয়ালে। সেথায় মাহি’র আদুরে মুখখানা স্পষ্ট। গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে আছে তার পানে। যুবক কুঁচকানো চোখে তাকিয়ে রইলো একমুহূর্ত। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত করে কর্কশ কন্ঠে আওড়াল,
“ কি সমস্যা তোর হুম? পিছু ডাকছিস কেনো?”
মানসপটে ভাসমান সপ্তদশী খিলখিল করে হাসছে এবার। বোধহয় মনস্টারের ওমন কথায় বড্ড মজা পেয়েছে সে। এদিকে তার এহেন হাসি দেখে কপালের কুঁচকান রেখা আরও গঢ় হলো যুবকের। দাঁত খিঁচে ফের ধমকে বলল,
“ হাসছিস কেনো বান্দীর মেয়ে? যা এখান থেকে বলছি! আমার তোকে দেখতে ইচ্ছে করে না।”
সপ্তদশী ভ্রু কুঁচকায় এপর্যায়ে। ঠোঁট দুটো সামান্য ফুলিয়ে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠে —
“ সত্যি? চলে যাব?”
যুবক বেশ করে চাইলো মেয়েটাকে মুখের ওপর না বলে দিবে। জবাব গুছিয়েছে সে, গলা অব্ধি আওয়াজও এসেছে তার। তবে মাঝপথেই গলাটায় আবার কি হলো কে জানে! কেমন হুট করেই কথাটুকু আঁটকে নিলো আপনা-আপনি। যুবক ভারী অবাক হলো নিজ কান্ডে। খানিকটা বিরক্তিতে ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে গোটাকতক ভাঁজ ফেলে ধীর পায়ে এগোলো দেয়ালের পানে। কিয়তক্ষন মেয়েটার হাসি হাসি মুখপানে স্থির দৃষ্টে চেয়ে থাকতেই গোটানো ভ্রু-দ্বয় আপনা-আপনি শিথিল হতে লাগল তার। কঠিন মুখাবয়ব থেকে একমুহূর্তেই সরে গেল সকল বিরক্তি। যুবক সমুদ্রের ন্যায় শান্ত এপর্যায়ে। নিজ অজান্তে দেয়ালের ওপর একহাত তুলে যেই-না সপ্তদশীর প্রতিচ্ছবিকে ছুঁতে যাবে, ঠিক তখনি যুবকের মানসপটে দেয়ালের অপর পাশে আচমকা ফুটেঁ উঠল এক অপ্সরার র*ক্তাক্ত নিথর দেহ! পাদু’টোয় আলতা রাঙানো তার, কপালে বধূর সাজ। সহসা ঝটকা খেল যুবক। তক্ষুনি হতভম্বতায় পিছিয়ে গেল দু-কদম। যুবকের অস্থিরতা বাড়ছে এবার। চোখদুটো হয়েছে ঝাপসা। মাথাটায় বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে যুবকের! কানদুটো চট করে চেপে ধরেছে দু’হাতে। যুবকের কানে বাজছে চিৎকার! এক বাচ্চা ছেলের আত্মচিৎকার।
কেউ একজন পেটাচ্ছে ছেলেটাকে। বাচ্চাটা ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে অথচ কতগুলো পাষণ্ড বাচ্চাকে শুধু শুধু মা’রছে! মুগ্ধ অস্থির! নিজের বোধ হারিয়ে কাঁপছে ভীষণ। একহাত সামান্য উঁচিয়ে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আনমনে বলে যাচ্ছে — ওকে খাবার দাও! ওকে মে’রো না। আরে! ও ম’রে যাচ্ছে তো। শুনছেনা কেউ! বাচ্চাটার কান্না এখনো শুনতে পাচ্ছে মুগ্ধ। সে কেমন টলতে টলতে হুট করেই বসে পড়ল মেঝেতে। দু’হাতে নিজের বলিষ্ঠ দেহটা খানিক ঝাপটে রেখে কাতরাচ্ছে যুবক। কিন্তু কান্ড দেখো! যুবকের কষ্ট থোড়াই কমছে তাতে। মুগ্ধ আর সময় নষ্ট করেনি। তক্ষুনি কাঁপতে কাঁপতে ছুটে গেল নিজ ডেস্কে।
ঝাপসা চোখে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এদিক-ওদিক খোঁজা খুঁজি চালিয়ে অবশেষে হাতে পায় একখানা সিরিঞ্জসহ তরলের শিশি! মুগ্ধ তড়িঘড়ি করে সিরিঞ্জের ডগা উম্মুক্ত করল। অতঃপর কাঁপত্রয়ী হাতে শিশি থেকে সিরিঞ্জে তরল পুরিয়ে তৎক্ষনাৎ নিজ বাহাতে সিরিঞ্জের সুচঁ ঢুকিয়ে ক্ষ্যান্ত হন যুবক। মুহুর্তেই তার সর্বাঙ্গ জুড়ে চলতে লাগল অনিয়ন্ত্রিত কম্পন। মস্তিষ্কটা এতক্ষণে শান্ত হচ্ছে তার। কানে বাজা কান্নাগুলো ধীরে ধীরে গায়েব হচ্ছে। যুবক স্থির এপর্যায়ে! মাতালের ন্যায় ঢুলতে ঢুলতে আচমকা নিজের পাহাড়সম দেহটা নিয়ে ধপ করে পড়ে গেল ফ্লোরে। এবার আর নিজ থেকে উঠে যাবার প্রয়াস চালায়নি মুগ্ধ। উল্টো এক অদ্ভুত স্বস্তিতে নিজ চোখদুটো বুঁজতে বুঁজতে আওড়াল —
“ আর অল্প কিছু দিন মা! এরপর? এরপর তোমার সাথেই বিসর্জন দিব ওকে। ওর বাপের সামনে ওকে জ্যা’ন্ত পোড়াব আমি। সব্বাইকে মে’রে ফেলব! ঐ বান্দীর মেয়েকে মে’রে ফেল…”
বাকিটা আর বলা হলোনা যুবকের! তার আগেই চোখদুটো তার মুদে গেল আপনা-আপনি।
কাঁদতে ব্যস্ত সপ্তদশী। দু’হাটুঁর ভাঁজে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কাঁদছে বোকা মেয়ে। পাশ থেকে কিউটি কেমন লম্ফঝম্প দিচ্ছে! বোধহয় প্রিয় সখার কান্নার কারণ খুঁজতে তৎপর বোবা প্রাণী। সপ্তদশী মুখ তুলছেনা। কান্নার তোড়ে ক্ষনে ক্ষনে কাঁপছে তার ক্ষুদ্র দেহটা। মাহি যখন নিজ দুঃখবিলাসে মত্ত ঠিক তখনি দরজার কাছ থেকে ভেসে এলো এক সুমধুর পরিচিত কন্ঠ!
“ আসব?”
তরুণীর স্নিগ্ধ কন্ঠস্বর কর্ণকুহরে প্রবেশ করলেও হেলদোল দেখা দেয়নি সপ্তদশীর মাঝে। সে আগের ন্যায় মুখ লুকিয়ে কাঁদছে বেশ। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মিলা অনুমতির অপেক্ষায় রইলো না। নিজ উদ্যোগে গুনে গুনে পা ফেলে এগিয়ে গেল জানালার কাছের কাউচের পানে। একমুহূর্ত গম্ভীর মুখে সপ্তদশীকে আপাদমস্তক পরোখ করে পরক্ষণেই ফের চাপা স্বরে ডাকল —
“ কথা বলবে না মুনলাইট?”
কথায় বুঝি কাজ হলো। সপ্তদশী ধীরে ধীরে মাথা তুলে চাইল সম্মুখে। আর ওমনি ভড়কায় মিলা! সপ্তদশীর কোমল মুখখানার কাঁদতে কাঁদতে সে-কি বেহাল দশা হয়েছে। চোখদুটো ফুলে আকার ধরেছে দ্বিগুণ! মুখটা হয়েছে পাকা টমেটোর ন্যায় লাল। মিলা উদ্বিগ্ন হলো তক্ষুনি। কোনরূপ বাছ-বিচার না করে সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল কাউচে। মাহির পানে অস্থির দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বিচলিত কন্ঠে আওড়াল —
“ কি হয়েছে তোমার মুনলাইট? এভাবে কাঁদছ কেন?”
নাক টানল মাহি। ওপরের ঠোঁটখানা খানিক ফুলিয়ে মোটা মোটা কন্ঠে জবাব দিলো —
“ ভালো লাগছেনা আর! ইচ্ছে করছে ম’রে যেতে।”
দৃষ্টিতে এক পশলা আহত ভাবসাব নামল মিলার। মনঃক্ষুণ্ন হলো মেয়েটার অসহায়ত্ব দেখে। সে কেমন আলগোছে চোখ নুইয়ে বিড়বিড় করল —
“ এজন্যই তো চেয়েছিলাম, তুমি যেন চলে যাও এখান থেকে।”
হতভম্ব মাহি! যারপরনাই অবাক হলো মিলার কথায়। বিস্ময়ে চোখ তুলল কপালে। কান্না ভুলে হতবাক কন্ঠে শুধালো,
“ তার মানে? তুমি জানতে সব?”
রয়েসয়ে চোখ তুলে তাকায় মিলা। মুখখানায় এক অদ্ভুত রহস্য টেনে চাপা স্বরে বলে,
“ তোমাকে আমার অনেককিছু বলার আছে মুনলাইট কিন্তু এখানে না। তুমি আমার ঘরে চলো!”
শুকনো ঢোক গিলে মাহি। মুখো অভিব্যাক্তিতে অবিশ্বাস্যের ছাপ তার। তা বেশ বুঝল মিলা! পরক্ষণেই মাহি’কে অবাক করে দিয়ে আচমকা শান্ত কন্ঠে বলল,
“ তোমার পাসপোর্ট রেডি মুনলাইট। সবকিছু ঠিক থাকলে আর তুমি আরেকটু সাহস করলে অচিরেই এই জেলখানা থেকে পালাতে পারবে তুমি। বিশ্বাস করো! বেঁচে থাকার জন্য এটাই তোমার শেষ পথ।”
“ কিসের শেষ পথ?”
হকচকিয়ে ওঠে মিলা এবং মাহি। কথার মাঝে ওমন হুটহাট ব্যাঘাত হিসেবে গম্ভীর কন্ঠ কানে যেতেই দরজার পানে চমকে তাকায় দু’জন। আর ওমনি দেখতে পায় — এডউইনের গম্ভীর মুখখানা। মিলা তৎক্ষনাৎ কাচুমাচু ভাব ধরল। মাথাটা আলগোছে নুইয়ে নিয়ে কুলুপ টানল মুখে। মাহি ঢোক গিলছে বারংবার। ঘাড় বাকিয়ে মিলার পানে দৃষ্টিপাত করে নিজেও মাথা নুইয়ে নেয় পরক্ষণে। এদিকে এডউইন কেমন কপাল গোছালো। চোখেমুখে একরাশ সন্দিগ্ধ ভাব টেনে কাঠকাঠ কন্ঠে আওড়াল,
“ আজ রাত ১০টার পর ভুলেও কেউ ঘর ছেড়ে বের হবেন না। আই সেইড, ভুলেও না!”
এহেন কথায় সন্দেহের ভাঁজ পড়ল সপ্তদশীর কপালে। মনের কোণে উত্থাপিত হলো একরাশ প্রশ্ন। সে কেমন হড়বড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেই যাবে ওমনি তার হাতদুটো খপ করে চেপে ধরে মিলা। মাহি থমকায় এবারেও। ভ্রু কুঁচকে দৃষ্টি নিচু করে তাকালো নিজ হাতে। মিলা কেমন শক্ত করে চেপে রেখেছে তার হাতদুটো যে নিরবে মেয়েটাকে বারণ করছে সে। মাহি চুপ রইল বিচক্ষণতা দেখিয়ে। পাশ থেকে মিলা তখন শান্ত কন্ঠে এডউইনকে বলল,
“ আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন এডউইন! আজ রাতে কেউ বের হবে না ঘর থেকে। কেউ বলতে কেউ না!”
এডউইনের নিগূঢ় প্রতীকী ঠোঁটযুগলে আচমকা দেখা গেল এক রহস্যময় বাঁকা হাসি। দৃষ্টি চোখা করে মিলার পানে তাকায় সে। একমুহূর্ত গম্ভীর থেকে পরক্ষণেই বলে ওঠে,
“ দেখা যাবে!”
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ! সম্পূর্ণ কক্ষজুড়ে মোমবাতির হলদেটে আলোর ঝলকানি! সিলিং এর কেন্দ্রস্থলে ঝুলছে বড়ো একখানা কাঁচের ঝাড়বাতি। মোমবাতির হলদেটে আলোয় ঝাড়বাতিটা কেমন চিকচিক করছে দেখো! সম্পূর্ণ কক্ষ জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্পন্দতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
রাত ১২ টা বেজে ১৫ মিনিট!
একজোড়া টলমল কদম আচমকা শক্ত হাতে দুয়ার খুলে কক্ষে ঢুকল। শরীর ঢুলছে বেশ! পাদু’টোর মালিক কেমন ঢুলতে ঢুলতে এগোচ্ছে ভেতরে। হাতে তার একখানা বিদেশি হুইস্কির বোতল। বাহাতে বারবার বোতল তুলে ঢোকে ঢোকে গিলছে হুইস্কি। যুবকের গায়ে জড়ানো একখানা সফেদ রঙা বাবুয়ানা কুর্তা। মিলিয়ে পড়েছে লাল-খয়েরি রঙা ঢেউ খেলানো ধূতি। গলায় গোল করে পেচিয়ে রাখা একখানা কাতান শাড়ি। কলকাতার বিখ্যাত আদি-ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের কাতান শাড়ি! যুবক আজ বড্ড গোছালো৷ তবে চুলগুলো আজও এলোমেলো তার। যুবকের বাদামী চোখদুটো এদিক-ওদিক নিজেদের দৃষ্টি লুকচ্ছে। সম্মুখের বিশাল দেয়ালে একখানা হাতে আকাঁ পোট্রের্ট পেইন্টিং, গোল্ড ফ্রেমে বাঁধানো! ছবিতে নিখুঁত হাতে আকাঁ এক নারীকে। তাকে যে শুধু নারী বললে ভুল হবে! এ যে এক অপ্সরা! ছবিতে বিশাল এক গদিতে বসে আছেন তিনি।
চেহারায় সে-কি দীপ্তি ছড়াচ্ছে তার। হাঁটু সমান মেঘরাশির ন্যায় চুলগুলো খুলে রাখা, গায়ে জড়ানো একখানা ইন্ডিয়ান কাতান শাড়ি। অপ্সরার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক অমায়িক হাসি। তিনি হাত উঁচিয়ে ডাকছেন বোধহয় কাউকে। একটা ছোট্ট বাচ্চা, এইতো বয়স বোধহয় চার-পাঁচেক হবে, সে কি সুন্দর আজ্ঞাকারীর ন্যায় মায়ের পায়ের সামনে দু’পা ভাঁজ করে বসে আছে। একদৃষ্টে সে দেখে যাচ্ছে তার অপরূপা মা’কে। যুবক রয়েসয়ে নিজের বাদামী দৃষ্টিজোড়া তাক করল অদূরের দেয়াল জুড়ে ঝুলন্ত ছবির পানে। মুহুর্তেই অপরাধীর ন্যায় জিভে দাঁত কাটল যুবক। এক অদ্ভুত ভঙ্গিমায় মুচকি হাসতেই তার বাদামী চোখদুটোও কেমন হেসে উঠল তার সঙ্গে। যুবক আজ নিজের চিরচেনা শক্ত খোলস ছেড়ে সাধারণ হয়ে উঠেছে। এই একটিরাত! বছরের শুধুমাত্র এই একটিরাতের জন্য সে শ্যাডো মনস্টার থেকে অধীর রায়ে আবির্ভূত হয়। আজও হলো তাই। অধীর দুপা ভাঁজ করে বসল মেঝেতে। হাতের হুইস্কির বোতলটা শব্দ করে রাখল পাশে। পরক্ষণে ছবির ঐ অপরুপার পানে তাকিয়ে অপরাধী কন্ঠে বলতে লাগল —
“ সবসময় খেতে খেতে অভস্ত্য তো! না খেলে মাথা ঠিক থাকে না আম্মা। আপনার সামনে খাচ্ছি তাই আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি!”
থামলেন যুবক! আলতো হাতে মাথা চুলকে কথা গোছাতে তৎপর হলো বেশ। বুকটা কাঁপছে তার। কি থেকে কি বলবে তাও খুঁজছে সে। কিয়তক্ষন নিরবতায় কাটল যুবকের সময়। পরক্ষণে সে কেমন ঢোক গিলতে গিলতে তাকালো মায়ের ছবির পানে। একমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই ছলছল হয়ে গেল তার অক্ষিপুট। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়াতে লাগল —
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩২ (২)
“ নিষ্পাপ মায়ের শাস্তি যদি ছেলেকে দেওয়া হয়, তাহলে দোষী বাবার শাস্তি কেন তার মেয়েকে দেয়া যাবে না আম্মা? আমার মনে হয় না আমি ভুল করছি! তাহলে ওকে মে’রে ফেলতে পারছিনা কেন? ওকে মা-রার জন্য বন্দুক তুললেই বুক কাপেঁ কেনো আম্মা? নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয় কেন? আম্মা! একটু বলবেন আম্মা?”

lkjh
😊😊😊😊
আপু পরের পর্ব দেন তাড়াতাড়ি 🤨😌💖💐💐💐
Apu golpota khub khub beshi sundor hocche taratari porer part ta die diyo….!
আপু নেক্সট পার্ট টা তাড়াতাড়ি দেন প্লিজ 🥹🥹
Apu next part ta daw na plss ar wait korte partesina ….khub ei sundor hocche pls next part daw..🥺🥺
Apu kkn diben golpota ar kotokkon 🙂…wait tw korte partecina