Home মেজর কারদার মেজর কারদার পর্ব ৪৩

মেজর কারদার পর্ব ৪৩

মেজর কারদার পর্ব ৪৩
ফিনারা ঝুমুর

রজনী গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। আজকের রাতের জন্য বরাদ্দকৃত নির্জন ঘরটিতে শান্ত হয়ে বসে রয়েছে মেঘ আর শীর্ষ।
​“মেজর!”
​মেঘের বড্ড চাপা ও বিষাদময় ডাক শুনে শীর্ষ পরম মায়ায় স্ত্রীর দিকে চাইল। মেঘের গায়ে জড়ানো রাজকীয় শাড়িটা কিছুটা এলোমেলো হয়ে পড়েছে, আর ওনার নিজের হাতে যতনে বাঁধাই করে দেওয়া চুলগুলোর অবস্থাও তদ্রূপ বিচ্ছিরি। শীর্ষ আলতো করে মেঘকে নিজের সুঠাম কোলে তুলে এনে বসায়। ওর এলোমেলো চুলগুলোর ভাঁজে নিজের ঠোঁটের আদুরে ছোঁয়া এঁকে দিয়ে নরম গলায় শুধায়,

​“কী হয়েছে, জান? বড্ড খিদে পেয়েছে বুঝি?”
​মেঘ ধীরলয়ে নিজের মাথাটি নাড়িয়ে ‘না’ সূচক সম্মতি জানায়। তারপর শীর্ষর চওড়া বুকে গভীর ভরসায় পিঠ ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।
​“এই নিঝুম ঘরের ভেতর বড্ড দমবন্ধ লাগছে, মেজর সাহেব… আমায় একটু বাইরের খোলা বাতাসে নিয়ে যাবেন, লক্ষ্মীটি?”
​মেঘের এই পরম আকুল চাওয়াটা এক নিমেষে শীর্ষর শক্ত বুকে গভীর দাগ কেটে ফেলে। মেঘকে নিজের দু-হাতের শক্তিশালী ও নিরাপদ ভাঁজে কোলে তুলে নিয়ে সটান ঘর ত্যাগ করে বাইরে বেরিয়ে আসে সে।

​ওদিকে প্রহর নিশ্চুপ হয়ে বসে রয়েছে নিজের নিভৃত ঘরে। আর কিঞ্জা অবশ্য চুপচাপ পড়ে রয়েছে সেই বরাদ্দকৃত গেস্ট রুমটিতে। নিজের এত বড় জেদ পূর্ণ হবার পরও এই জটিল পরিস্থিতিতে অন্তত কোনো উল্টাপাল্টা কাণ্ড ঘটায়নি সে। আর নোমান তো অনেক আগেই কারদার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে—সোজা বাগেরহাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে সে, সেখানে গিয়ে অতীতে ঘটা বেশ কিছু অন্ধকার সত্য ও জট তাকে নিজ দায়িত্বে ছাড়াতে হবে।
​একাকী ঘরের বিষাদময় আঁধারে নিঃসঙ্গ বসে একের পর এক সিগারেট ফুঁকে চলেছে প্রহর। নিকোটিনের কুৎসিত কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে ঘরের এদিক-ওদিক। নিজের নিঃশ্বাসের সাথে বিষাদ উগরে দিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
​“কী অদ্ভুত আর বিষাক্ত এই জমানা! একজনের করা মহাপাপের সাজা আজ অন্য নিষ্পাপ একজনকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে… জন্মদাতা বাবা নিজের রক্তের সন্তানকে সামনে দেখেও চিনতে পারছে না, আর মেয়েটাই বা জানে না কে তার আসল জন্মদাতা! আর শেষমেশ অন্য কারোর পুরোনো পাপের মাশুল আর নির্মম সাজা হিসেবে ছারখার হয়ে গেল তিনটা আস্ত পরিবার!”
​প্রহরের ঘরের বাতাসে ভেসে থাকা কথাগুলো বড্ড ভারী হয়ে আছড়ে পড়ে গুমোট আবহাওয়া জুড়ে। যেন স্বয়ং কুদরতি নিয়তিও এই গূঢ় সত্যের করুণ আর্তি বুঝতে পেরেছে! মায়াবী আকাশখানা এক নিমেষে কালো মেঘে ঢেকে গিয়ে সজোরে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করে। দেখতে দেখতে ঝিরিঝিরি ধারায় অম্বরের বুক চিরে ধরণীর বুকে নামতে শুরু করে বৃষ্টি কন্যারা। যেটুকু আঁধার অবশিষ্ট ছিল, মুষলধারে নামা সেই বৃষ্টি আর অমাবস্যার গভীর আঁধারে যেন আরও গাঢ় হয়ে ঢেকে যায় সমগ্র ধরিত্রীকে।

গভীর নিঝুম রাতে পুরো কারদার বাড়ি একদম থমথমে নিশ্চুপ। বাড়ির কেউ জেগে নেই, চারপাশ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু সেই থমথমে নিস্তব্ধতা হঠাৎ চূর্ণবিচূর্ণ করে ভেসে আসে কারোর যন্ত্রণাকাতর করুণ গোঙানি আর সজোরে চাবুক মারার বীভৎস শব্দ!
​চামড়ার শক্ত বেল্ট দিয়ে অন্ধ আক্রোশে কাউকে বেধড়ক পেটাচ্ছে একজন, আর উন্মাদের মতো চিল চিৎকার করে গজরাচ্ছে,
​“তোকে কে বলেছিল রে ওই মেয়ের অন্ধকার জন্মপরিচয় সবার সামনে ফাঁস করতে, হ্যাঁ? ওই শয়তান তানভীর এসব গোপনীয় তথ্য কীভাবে জানতে পারল? জবাব দে! তুইও কি ওর বাপের সাথে শুয়েছিলি নাকি? রাক্ষসী কোথাও কার!”
​ইচ্ছেমতো আঘাতের পর আঘাতে ভুক্তভোগী মানুষটিকে রক্তাক্ত ও জর্জরিত করে চলেছে সে। পুরো ঘরে হুংকার ছেড়ে রক্তচক্ষু উঁচিয়ে হুমকি দেয়,

​“মনে রাখিস, তোর এই পাপিষ্ঠ চালের কারণে যদি অতীতের চাপা পড়া ইতিহাস আজ আবার নতুন করে সামনে আসে তবে ওই শারমিনের যে করুণ পরিণতি হয়েছিল, তোর কপালেও ঠিক সেটাই ঘটাব আমি!”
​পৈশাচিক আক্রোশ মিটিয়ে তাকে অর্ধমৃত অবস্থায় মেঝেতে ফেলে রেখেই ঘর ছেড়ে হনহন করে স্থান ত্যাগ করে ঘাতক।​চামড়ার বেল্ট দিয়ে অমানুষিক আঘাতের পর আঘাত সহ্য করে মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর হয়ে পড়ে রইল ভুক্তভোগী নারীটি। শরীর ভেঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়, নড়ার মতো বিন্দুমাত্র ক্ষমতাও অবশিষ্ট নেই। নিজের রক্তে ভেজা মুখে এক পরম তাচ্ছিল্য আর বিষাক্ত পরিহাসের হাসি ভেসে ওঠে তার। শুকনো, ফাটা ঠোঁট জোড়া কাঁপিয়ে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,
​“যার জন্য একদিন নিজের ভরা জগৎ-সংসার ত্যাগ করেছিলাম। শেষমেশ সে-ই আজ আমায় অচেনা পর করে দিল! সত্যি— একেই বোধহয় বলে প্রকৃতির অমোঘ বিচার! প্রকৃতি কখনো কারোর হিসাব খালি রাখে না। শতগুণে ফিরিয়ে দেয় তবে আজ আমায় ফেরাল শুধুই অসীম দুঃখ আর তিলে তিলে ধ্বংস হওয়ার অভিশাপ!”
​কথাগুলো শেষ হতেই আবার এক কুৎসিত পরিহাসের হাসি ফুটল তার রক্তাক্ত চেহারায়। চোখের সামনে এক নিমেষে ভেসে উঠল দুই যুগ আগের সেই ভয়ংকর কালরাতের ঘটনা! ভেসে উঠল এক অসহায় মায়ের বাঁচতে চাওয়ার আকুল আর্তনাদ আর চোখ ভর্তি একরাশ আতঙ্ক,

​“আমায় আমার নিষ্পাপ ফুটফুটে রক্তে গড়া মেয়ের কাছে যেতে দাও না, তোদের পায়ে পড়ি! ও, ও যে বড্ড ছোট রে! আমায় ছাড়া যে কিচ্ছু বোঝে না ও!”
​“তুই বেঁচে থাকলে ময়ূরী কোনোদিন মাথা তুলে বাঁচতে পারবে না! তাই তোকে মরতেই হবে, শারমিন! তোকে আজই শেষ হতে হবে!”
​রক্তাক্ত শরীরে সেদিন প্রচণ্ড কাশতে কাশতে কুন্ঠিত হৃদয়ে শেষ আকুতি জানিয়েছিল শারমিন,
​“আমি কথা দিচ্ছি, আমি আমার দুধের শিশুকে নিয়ে অনেক অনেক দূরে চলে যাব! অনেক দূরে। যেখানে তোদের ছায়াও কোনোদিন পৌঁছাবে না! তাও তোরা আমায় শুধু একটু বাঁচতে দে রে।আমায় ছাড়া যে আমার ছোট্ট সোনাটা পুরো পৃথিবীতে একা হয়ে যাবে!”

​কিন্তু সেই নরপশুদের পাষাণ হৃদয় সেদিন একটুও গলেনি! কোনো কথা না শুনে, কোনো আকুতি না মেনে শারমিনকে সজোরে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল সাততলা উঁচু সেই হাসপাতালের ছাদ থেকে!
​পতনের সেই কয়েকটা সেকেন্ডে ছাদ থেকে নিচে পড়ার সময় শারমিনের আর্তচিৎকারের পাশাপাশি বাতাসে ভেসেছিল ওর আতঙ্কিত ও সজল চোখ দুটো। নিজের অকাল মৃত্যুর জন্য নয়, কেবল নিজের একলা হয়ে যাওয়া ফুটফুটে মেয়েটার জন্য বেঁচে থাকার শেষ আকুতি ছিল সেই চোখে!​আর ওদিকে ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে পৈশাচিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল ভুক্তভোগী এই নারী ও ময়ূরী!
​নিচে শক্ত ইটের ওপর প্রচণ্ড জোরে আছড়ে পড়ে মুহূর্তে থেঁতলে গিয়েছিল শারমিনের মাথাটা। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া তাজা কাঁচা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল হাসপাতালের সামনের শুভ্র আঙিনা। সেদিন রাতের সেই অট্টহাসির তোড়ে এক নিমেষে শেষ হয়ে গিয়েছিল এক মমতাময়ী মায়ের বুকভাঙা গল্প আর চিরতরে শেষ হয়ে গিয়েছিল এক নিস্পাপ কচি মেয়ের মায়ের কাছ থেকে চিরদিনের মতো কোলজুড়ে আদর-ভালোবাসা পাওয়ার গল্প!
​তবে মৃত্যুর একদম শেষ মুহূর্তে, ধরণীর আলো নিভে যাওয়ার ঠিক আগের ছটফটানিতেও শারমিনের রক্তে ভেজা ওষ্ঠদ্বয় হতে কেবল একটাই পরম আকুল নাম বের হয়ে এসেছিল,
​“মেঘা, আমার সোনা! চন্দ্রাণু!”
অতীতের সেই রক্তঝরা বীভৎস স্মৃতি স্মৃতিপটে ভেসে উঠতেই নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা, গ্লানি আর বিভীষিকা ফুটে ওঠে ওনার চোখ-মুখে। দু-হাতে নিজের রক্তাক্ত মুখ ঢেকে নিঝুম ঘরের কোণে একা ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি।
​আজ ওনার আর কোনো কূল নেই, কোনো আশ্রয় নেই, পালানোর এতটুকু পথও অবশিষ্ট নেই। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে পাপের বোঝা বইতে বইতে আজ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন ওনার ধ্বংস আর অবধারিত কঠিন মরণ এবার একদম সুনিশ্চিত!

আকাশ চিরে মুষলধারে অঝোর বারিধারা বর্ষিত হচ্ছে সমগ্র প্রান্তরজুড়ে। আর সেই অঝোর বৃষ্টির ধারায় ভিজছে দুটো ব্যাকুল দেহ। ভেজা শাড়ি গায়ে লেপ্টে থাকা মেঘকে নিজের দু-হাতের অতি শক্তিশালী ও নিরাপদ বন্ধনে জড়িয়ে নিজের বুকের সাথে একাত্ম করে মিশিয়ে রেখেছে মেজর শীর্ষ।
​“এখন কিছুটা মনটা ভালো লাগছে, জান?”
​মেঘ আরও গভীর ভরসায় শীর্ষর বুকের ধুকপুকানির সাথে নিজেকে শাঁসিত করে লেপ্টে থাকে। ওর ঘাড়ে জমে থাকা নাম না জানা ভেজা চুলগুলো আলতো হাতে একপাশে সরিয়ে নিয়ে সেই উন্মুক্ত সুকোমল স্থানে নিজের তপ্ত অধর ডুবিয়ে দেয় শীর্ষ।​সেই অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে পুরো শরীর কেঁপে ওঠে মেঘের! আরও শক্ত মুষ্টিতে আঁকড়ে ধরে নিজের পরম আশ্রয়কে।
​শীর্ষ এবার আলতো হাতে মেঘের ভেজা মুখখানা উঁচিয়ে ধরে নিজের অধরের সাথে অধরের গভীর মিলন ঘটায়। মেঘও ক্ষণিকের জন্য পিছপা না হয়ে চরম আবেগে আঁকড়ে ধরে নিজের একান্ত আপন মানুষটাকে!​শীর্ষ অধরের সেই গভীর স্পর্শ ধরে রেখেই ভেজা মিহি কণ্ঠে ব্যাকুল অনুমতি প্রার্থনা করে,

​“মে আই… মাই লাভ, মাই ব্ল্যাক ব্যাট ফ্লাওয়ার?”
​শীর্ষর এমন পূর্ণ অনুমতি ও ভালোবাসায় ভরা সংবেদনশীল প্রশ্নে মেঘ ব্যাকুল হয়ে শীর্ষর পরিহিত ভেজা পাঞ্জাবির কাপড় শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে। শীর্ষ যেন মুহূর্তেই ওর সেই নীরব সমর্থনের পূর্ণ উত্তর পেয়ে যায়!
​সেই বৃষ্টিমুখর নির্জন ছাদে মেঘকে নিজের বাহুডোরে আগলে নিয়ে ধীরলয়ে শুয়ে পড়ে শীর্ষ। পরম সযত্নে সরিয়ে দেয় ভেজা আঁচলখানা, হারিয়ে যায় মেঘের সুকোমল দেহের প্রতিটি ভাঁজে ও উষ্ণতায়। মুষলধারায় নামা বৃষ্টির তীব্রতা আর ঝংকারের সাথে পূর্ণতা পায় দুটি মানব-মানবীর বহু আরাধ্য, গভীর পবিত্র ভালোবাসার! নিঃসংকোচে একে অপরের পরম অস্তিত্বে বিলীন করে নেয় নিজেদের।
​আর ওদের এই অপার্থিব পূর্ণতাকে যেন আরও সুরভিত ও পরিপূর্ণ করতে দূর কোনো এক অচিন প্রান্তর হতে ভেসে আসে মিহি মধুর সুরের অনুরণন—-

মেজর কারদার পর্ব ৪২

​…..হালকা হাওয়ার মতন……
…..চাইছি এসো এখন……
…..করছে তোমায় দেখে…..
…..অল্প বেইমানী মন…..
…..বাঁধবো তোমার সাথে…..
…….আমি আমার জীবন……..

মেজর কারদার পর্ব ৪৪