Home ম্যারিড লাইফ্ ‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩০

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩০

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩০
‎রঙ্গনা মৈত্র ঊর্মি

‎সকাল ঠিক দশটার দিকে শেখবাড়ির বিশাল লোহার গেটটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
‎রোদের আলো তখন উঠোনজুড়ে সোনালি চাদর বিছিয়ে রেখেছে। আমগাছের পাতার ফাঁক গলে আসা আলো মাটিতে ছোপ ছোপ নকশা এঁকে দিয়েছে। বাড়িটা যেন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে চাইছে, অথচ গতকালের দুর্ঘটনার ভয় এখনও দেয়ালের গায়ে গায়ে লেগে আছে। এমন এক নীরবতা, যেন ঝড় চলে যাওয়ার পরও বাতাস সাহস করে জোরে বইতে পারছে না।

‎গেট দিয়ে প্রথমে ঢুকল ইখতিয়ার।
‎তার এক হাত শক্ত করে ধরা ইশতিয়াকের কাঁধে। আর ইশতিয়াক? ডান পায়ে ব্যান্ডেজ, হাঁটার সময় মুখটা এমন কুঁচকে যাচ্ছে যেন প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবুও ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা হাসি লেগেই আছে।
‎অন্য পাশে হাঁটছে মুগ্ধা। একবার ইশতিয়াকের দিকে তাকাচ্ছে, একবার ইখতিয়ারের দিকে। যেন দুজনের একজনও যদি হোঁচট খায়, সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেলবে। তিনজনকে একসঙ্গে উঠোনে ঢুকতে দেখেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রহিমা বেগমের বুকটা ধক করে উঠল।
‎”আল্লাহ… আইছে!”

‎এক মুহূর্তও দেরি করলেন না তিনি। ঐ বৃদ্ধ বয়সেও প্রায় ছুটে সিঁড়ি নেমে এলেন। তার পেছন পেছন ইন্তিয়া, রাফেয়া, বাড়ির পুরুষ সদস্যরা—মুহূর্তের মধ্যে পুরো উঠোন মানুষে ভরে গেল। রহিমা বেগম কাছে এসেই ইশতিয়াকের দুই গাল ধরে ফেললেন।
‎”আহারে আমার নাতিডা…!”
‎তার চোখে আবারও পানি টলমল করে উঠল। যেন এতক্ষণ পর্যন্ত তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি ছেলেটা সত্যিই সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরবে।ইশতিয়াক সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
‎”দাদি, এমন করো না তো মানুষ ভাবব আমি যুদ্ধ কইরা আইছি।”
‎রহিমা বেগম চোখ রাঙালেন।
‎”চুপ কর। আর একটা কথা কইলে মাথায় বাড়ি দিমু।”

‎ইশতিয়াক ঠোঁট গোল করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই রাফেয়ার চোখ গিয়ে পড়ল ব্যান্ডেজ বাঁধা পায়ে। তিনি দুই হাত কোমরে রেখে বললেন,
‎”বাহ! একদিনেই হিরো হয়ে গেছিস দেখি! মানুষ মোটরসাইকেল চালায়, আর তুই গিয়ে ট্রাকের। সাথে বন্ধুত্ব করতে গেছিস?”
‎উঠোনে চাপা হাসির ঢেউ উঠল। ইশতিয়াক নিরীহ মুখ করে বলল,
‎”আমি তো বন্ধুত্ব করতে যাই নাই চাচি। ট্রাকটাই আমারে জোর করে জড়ায় ধরতে আসছিল।”
‎”ওমা! এখন আবার ট্রাকেরও দোষ!”
‎মুগ্ধা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
‎”চাচি, ট্রাকটারও এখন হয়তো আফসোস হইতেছে।”
‎”ক্যান?”
‎”এইডারে ধাক্কা দিয়া লাভ কী হইছে? নিজেই বোধহয় এখন গ্যারেজে গিয়ে কাঁদছে।”

‎পুরো উঠোন হো হো করে হেসে উঠল। ইশতিয়াক ভীষণ আহত হওয়ার অভিনয় করে বুকে হাত রাখল।
‎”ভাবি জান… আমি হাসপাতাল থেকে আসা অসুস্থ মানুষ। আমারে নিয়া এইসব বলছেন? আল্লাহ তোমার বান্দারে দেখ একটু”
‎মুগ্ধা ভ্রু নাচিয়ে বলল,
‎”বাঁচছিস বলেই তো বলতেছি। না বাঁচলে তো আর খোঁচাইতে পারতাম না।”
‎এদিকে ইখতিয়ার এখনও ইশতিয়াককে শক্ত করে ধরে আছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
‎”আস্তে হাঁট। বেশি চাপ দিবি না পায়ে।”
‎কথাটার ভেতর এমন একটা যত্ন ছিল, যা আলাদা করে প্রকাশ করার দরকার পড়ে না। বড় ভাইয়ের হাতটা ঠিক বটগাছের ছায়ার মতো—নিজে কিছু বলে না, কিন্তু রোদটা নিজের গায়ে নিয়ে ছোটদের আগলে রাখে। ইশতিয়াক মুখ টিপে হাসল।
‎”ভাই, সবাই দেখতেছে। এত আদর কইরেন না। আমার ইজ্জত থাকব না।”
‎ইখতিয়ার কোনো উত্তর দিল না। শুধু মাথায় হালকা একটা চাপড় দিল।
‎”চুপচাপ হাঁট। অশ’ভ্য”

‎রাফেয়া সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,
‎”দেখছো ভাবি? এই প্রথম দেখলাম ইশতিয়াক এত শান্ত! দৌড়াদৌড়ি করতে পারছে না, মনে হয় এক্সিডেন্টটা কাজ করছে। কদিন একটু ঠান্ডা হয়ে থাকবে”
‎কথা শেষ হতে না হতেই ইশতিয়াক প্রতিবাদ করে উঠল,
‎”আমি সবসময়ই শান্ত! চাচি, মিছে বলবা না”
‎”হ। তুই শান্ত, আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো ভদ্রলোক।”
‎আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। ইন্তিয়া এতক্ষণ চুপচাপ ছেলেটার মুখ দেখছিলেন। মায়ের চোখ কখনো ভুল করে না। হাসির আড়ালেও তিনি যেন বুঝে গেলেন, ব্যথাটা এখনও আছে। ছেলেটা শুধু কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না।
‎তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ইশতিয়াকের কপালে হাত রাখলেন।
‎”ব্যথা বেশি করছে না তো বাবা?”
‎এই একটুকু প্রশ্নেই ইশতিয়াকের মুখের হাসিটা মুহূর্তের জন্য নরম হয়ে গেল।
‎”সহ্য করা যায়, আম্মু।”

‎ইন্তিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‎”সহ্য করতে হবে কেন? সাবধানে চললেই তো হতো।”
‎ইশতিয়াক মাথা নিচু করে রইল। এই মুহূর্তে দুষ্টুমি করার মতো কোনো উত্তরও খুঁজে পেল না।
‎উঠোনের ওপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে গেল।
‎সেই বাতাসে যেন সবার বুকের জমে থাকা ভারও একটু একটু করে হালকা হয়ে গেল। গতকাল যে ছেলেটাকে নিয়ে সবাই আতঙ্কে ছিল, আজ সে নিজের পায়ে—যদিও বড় ভাইয়ের কাঁধে ভর দিয়ে—বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে।
‎এই দৃশ্যটা যেন খরার পরে প্রথম বৃষ্টির মতো। শুধু মাটি নয়, মানুষের মনও ভিজে উঠল স্বস্তিতে।
‎আর শেখবাড়ির সেই পুরোনো উঠোনে আবারও ফিরে এল বহুদিনের চেনা শব্দ—হাসি, খুনসুটি আর আপনজনদের ভালোবাসার উষ্ণ কোলাহল।
‎দুপুরের রোদ তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। সকালের ব্যস্ততা শেষ হয়ে বাড়িটা এখন অনেকটাই শান্ত। তবু সেই শান্তির ভেতর এখনও গতকালের দুর্ঘটনার আতঙ্কের একটা ক্ষীণ রেশ লেগে আছে। যেন বাড়ির প্রত্যেকটা দেয়াল এখনও মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছে—ছেলেটা অন্তত সুস্থভাবে ফিরে এসেছে।

‎সকালেই ইখতিয়ার অফিসে বেরিয়ে গেছে।
‎যাওয়ার আগে অন্তত পাঁচবার ইশতিয়াকের রুমে উঁকি দিয়ে গেছে। একবার কম্বল ঠিক করেছে, একবার বালিশ উঁচু করে দিয়েছে, আবার বলেছে,
‎”নিজে নিজে হাঁটবি না। কিছু লাগলে কাউকে ডাক দিবি।”
‎মুগ্ধা ঠোঁট ফুলিয়ে বলেছিল,
‎”আজ না গেলেও হত। সারারাত একদম ঘুমান নাই।”
‎ইখতিয়ার শুধু মৃদু হেসেছিল। মুগ্ধার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে।বলেছে,
‎”কাজ জমা আছে। তাড়াতাড়ি ফিরব ।”
‎মুগ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। গত রাতের প্রতিটা মুহূর্ত তার চোখে ভাসছে। ইশতিয়াক ঘুমের মধ্যে সামান্য নড়লেই ইখতিয়ার চমকে উঠে বসেছে। কখনও পায়ের দিকে তাকিয়েছে, কখনও ব্যান্ডেজ ঠিক আছে কি না দেখেছে। যেন নিজের ছোট ভাই নয়, কাঁচের তৈরি কোনো মূল্যবান জিনিস আগলে রেখেছে। ঠিক তখনই কলিংবেলের শব্দ ভেসে এল।
‎দরজা খুলতেই মুগ্ধার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‎”আব্বু! আম্মু!”

‎দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রেজোয়ান তালুকদার, পাশে আয়েশা বেগম। তাদের সঙ্গে স্নিগ্ধাও এসেছে। হালকা রঙের সালোয়ার-কামিজে মুখটা আগের মতোই শান্ত, চোখ দুটো নিচের দিকে নত।সবাইকে ভেতরে নিয়ে আসতেই শেখ ইসরায়েল উঠে দাঁড়ালেন।
‎”আসেন ভাইসাহেব, আসেন।”
‎ইসরাফিলও হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রইংরুম গল্পে জমে উঠল। চা, নাস্তা, ফল—আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখল না শেখ পরিবার।
‎কিছুক্ষণ পর আয়েশা বেগম বললেন,
‎”ইশতিয়াকেরে একবার দেখে আসি?”
‎”চল।”
‎মুগ্ধা পথ দেখিয়ে সবাইকে ইশতিয়াকের ঘরে নিয়ে গেল। ইশতিয়াক বিছানায় হেলান দিয়ে বসে মোবাইল দেখছিল। এতজনকে একসঙ্গে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি ফোনটা পাশে রেখে হাসল।
‎”আরে! সবাই আসছেন?”

‎রেজোয়ান তালুকদার এগিয়ে এসে বললেন,
‎”কেমন আছো বাবা?”
‎”আলহামদুলিল্লাহ, অনেক ভালো।”
‎ইসরাফিল ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকালেন।
‎”ভালোই তো! ট্রাকের লগে ধাক্কা খেয়ে এই অবস্থা, তাও হাসি থামে না।”
‎ইশতিয়াক দুষ্টু হেসে বলল,
‎”চাচ্চু, আমি না হাসলে ট্রাকটাই জিতা যেত।”
‎”তাই নাকি? ট্রাক তো হারছে, কিন্তু তোর পা জিততে পারে নাই রে!”
‎ঘরে হাসির ঢেউ বয়ে গেল। এদিকে স্নিগ্ধা চুপচাপ সবার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ একবারের জন্য ইশতিয়াকের ব্যান্ডেজ বাঁধা পায়ের ওপর গিয়ে থেমে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন টনটন করে উঠল। তবে সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। রাফেয়া বেগম স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে মমতা ভরা গলায় বললেন,
‎”মা, শুনলাম সামনে এইচএসসি পরীক্ষা?”
‎স্নিগ্ধা মাথা নাড়ল।
‎”জি চাচি।”

‎আয়েশা বেগম হেসে বললেন,
‎”এখন তো সারাক্ষণ বই নিয়াই থাকে।”
‎ইন্তিয়া বললেন,
‎”খুব মন দিয়া পরীক্ষা দিবা। আল্লাহ ভালো রেজাল্ট দিবেন ইনশাআল্লাহ।”
‎স্নিগ্ধা বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিল,
‎”দোয়া করবেন আন্টি।”
‎মুগ্ধা গর্বের হাসি দিয়ে বলল,
‎”ছোটবেলা থেইকাই এমন। পড়তে বসলে ডাকাডাকি করলেও শুনে না।”
‎সবাই হেসে উঠল। ঠিক তখনই ইশতিয়াক হঠাৎ বলে ফেলল,
‎” তোর মতো নাকি? যে পরীক্ষায় ডাব্বা দিবে, ও পড়তে ভালোবাসে,এই জন্যই পরীক্ষা আসলে কেউ ওরে বিরক্ত করে না। ও পড়ার সময় ডিস্টার্ব পছন্দ করে না।”
‎কথাটা শুনে স্নিগ্ধা অবাক হয়ে তাকাল। মুগ্ধার ভ্রু আস্তে করে কুঁচকে গেল। ইশতিয়াক এত আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাটা বলল কীভাবে? স্নিগ্ধা তো এই বাড়িতে আগে কখনও আসেনি। আলাদা করেও কখনও পরিচয় হয়নি। এমন না। ছোট থেকেই চিনে। কিন্তু এতকিছু জানা সম্ভব না।
‎রেজোয়ান তালুকদার মৃদু হেসে বললেন,
‎”ঠিকই বলছো। পড়ার সময় ওরে কেউ ডাকতে পারে না।”

‎ইশতিয়াক বুঝতেই পারল অজান্তেই সে নিজের জন্য ফাঁদ পেতে ফেলেছে। সে আবার হেসে বলল,
‎”পড়ালেখায় সিরিয়াস মানুষ তো এমনই হয়।”
‎মুগ্ধা এবার আড়চোখে ইশতিয়াকের দিকে তাকাল।
‎চোখ দুটো চিকচিক করছে। তার মনে হচ্ছে, এই ছেলেটা কিছু একটা লুকাচ্ছে। ইসরাফিল সুযোগ বুঝে হেসে বললেন,
‎”এই যে, তুই দেখি মেয়েটার পড়াশোনার খবরও রাখস!”
‎ইশতিয়াক থমকে গেল।
‎”না… মানে… এইটা তো… আন্দাজে বললাম।”
‎”বাহ! তোর আন্দাজও দেখি একদম নিশানায় লাগে!”
‎ইশতিয়াক মাথা চুলকাতে গিয়ে মনে পড়ল হাতে ক্যানোলা নেই, কিন্তু পায়ে ব্যথা। অস্বস্তিতে কেবল কাশতে লাগল। ঠিক তখনই ইন্তিয়া ওষুধ আর এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
‎”এই নাও, আগে ওষুধ খা।”
‎ইসরাফিল হেসে বললেন,
‎”হ, আগে ওষুধ খাওয়ান ভাবি। এই পোলার মুখে মাঝে মাঝে সত্য বের হইয়া যায়। এইটারও একটা চিকিৎসা দরকার!”
‎ঘরজুড়ে আবারও হাসির ঝড় উঠল। আর সেই হাসির ভেতর দাঁড়িয়ে মুগ্ধা আড়চোখে সন্দেফ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইশতিয়াক এর দিকে।

‎কারেন্ট চলে যাওয়ার পর পুরো বাড়িটা যেন এক অন্যরকম নীরবতায় ডুবে গেছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, মাঝেমধ্যে গাছের পাতায় বাতাসের মৃদু সরসর শব্দ—সব মিলিয়ে রাতটাকে আরও গভীর, আরও মায়াময় করে তুলেছে।
‎কয়েকটা দিন নীরবে কেটে গেছে।
‎ইশতিয়াকের পায়ের ক্ষত এখন অনেকটাই শুকিয়ে এসেছে। আগের মতো ব্যথায় মুখ কুঁচকে যায় না, তবু নিজে নিজে উঠে দাঁড়ানোর অনুমতি এখনও নেই। শেখবাড়ির সবাই তাকে ঘিরেই থাকে। কেউ ওষুধ দেয়, কেউ ফল কেটে দেয়, কেউ আবার জোর করে বিশ্রাম করায়।
‎অন্যদিকে ইখতিয়ারের জীবন যেন আবার কর্মব্যস্ততার স্রোতে ভেসে গেছে। টানা কয়েকদিন অফিসে না যাওয়ার ফল এখন তাকে প্রতিদিনই দিতে হচ্ছে। সকালবেলা বেরিয়ে গেলে রাত না হলে ফেরার সুযোগ মেলে না। তবু দিনের ফাঁকে ফাঁকে একাধিকবার ফোন আসে। কখনও শুধু জানতে চায় মুগ্ধা খেয়েছে কি না, কখনও জানতে চায় ইশতিয়াক ওষুধ নিয়েছে কি না।
‎এই ছোট ছোট খোঁজগুলোই মুগ্ধার কাছে বিশাল বড় ভালোবাসা। রাতে যত ক্লান্ত হয়েই ফিরুক, একটা অভ্যাস কিন্তু একটুও বদলায়নি ইখতিয়ারের।
‎ঘুমানোর আগে মুগ্ধাকে বুকের কাছে টেনে নেওয়া।
‎সেই আলিঙ্গনে কোনো তাড়াহুড়ো থাকে না, কোনো বাড়াবাড়ি থাকে না। থাকে শুধু সারাদিনের ক্লান্তি মুছে দেওয়ার এক নিঃশব্দ চেষ্টা। যেন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ফেরা এক পথিক অবশেষে নিজের ঠিকানাটা খুঁজে পেয়েছে।
‎ঘরের ভেতর গুমোট গরম। বই বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে মুগ্ধা। পরনে হালকা নীল রঙের টি-শার্ট, মেরুন প্লাজো। গলায় কালো ওড়নাটা আলগাভাবে ঝুলছে। চুলগুলো উঁচু করে খোঁপা করা। বাতাসে কানের পাশে নেমে আসা দু-একটা এলোমেলো চুল বারবার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে।
‎হাতে বড় একটা চিপসের প্যাকেট।

‎বিকেলে ইশতিয়াকের এক বন্ধু দেখতে এসে এটা দিয়ে গিয়েছিল। ইশতিয়াক নিজের ভাগটাও নির্দ্বিধায় মুগ্ধার হাতে তুলে দিয়েছে। অবশ্য সে না দিলেও ফল একই হতো—মুগ্ধা ঠিকই কোনো না কোনো অজুহাতে প্যাকেটটা নিজের দখলে নিয়ে নিত। রেলিংয়ের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে তাতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে চিপস খেতে লাগল সে।
‎ঠান্ডা বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে দিনের সব ক্লান্তি একটু একটু করে উড়ে যাচ্ছে।
‎ঠিক তখনই…
‎কোনো শব্দ ছাড়াই পেছন থেকে দুটো ঠান্ডা হাত এসে টি-শার্টের ভেদ করে আলতো করে তার কোমরের কাছে থেমে গেল।
‎অপ্রত্যাশিত স্পর্শে মুগ্ধার পুরো শরীর কেঁপে উঠল।
‎নিঃশ্বাসটা বুকের ভেতর আটকে গেল। পরের মুহূর্তেই পরিচিত এক উষ্ণতা পিঠে মিশে গেল।
‎ইখতিয়ার।
‎মুগ্ধা চোখ বন্ধ করে ফেলল। ঠান্ডা হাতের বিপরীতে মানুষটার বুকের উষ্ণতা যেন শীতের রাতে জ্বালানো আগুনের মতো।
‎এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীর আর সব শব্দ মিলিয়ে গেল।
‎ইখতিয়ার পেছন থেকে জাপ্টে ধরলো মুগ্ধাকে। হাত তার মুগ্ধার নগ্ন উদরে। মুগ্ধা আবেশে চোখ বন্ধ করে আছে। ইখতিয়ার থুতনি রাখল মুগ্ধার কাধে। মুগ্ধা পূণরায় কেপে উঠল। পাথর বনে গেছে যেন সে। চোখ বন্ধ করে আছে আবেশে।

‎ইখতিয়ার মুচকি হাসল। ওষ্ঠ গুজল মুগ্ধার গলার কাছের তিলটাতে। মেয়েটা আর পারল না। হাত শিথিল হয়ে আসল তার। হাত থেকে চিপসটা পড়ে গেল। উঠানে পড়েছে হয়তো। শব্দ হলো কিঞ্চিত।
‎ইখতিয়ার এখনো একই অবস্থায় অবস্থানরত। তিলটা যেন তার শত্রু। দাঁতের সাহায্য পিষ্ঠে দিতে চাইল তাকে। মুগ্ধা ঢোঁক গিলল। মুগ্ধা উল্টো ঘুরে জড়িয়ে ধরল ইখতিয়ারকে। ইখতিয়ারের টিশার্টের। পেছনের অংশ খামচে ধরল। ইখতিয়ার দুষ্টু হাসলো। এক হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল মুগ্ধার বাঁকানো কোমড়। অন্য হাত দিয়ে মুগ্ধার থুতনি টেনে সামনে আনলো। পর্যবেক্ষণ করল পুরো মুখে। মুগ্ধার চোখ বন্ধ। লাজুকতার ছায়া তার মুখ জুড়ে। ইখতিয়ার চাতক পাখির ন্যায় মুগ্ধার ওষ্ঠের দিকে তাকিয়ে রইল। না! আর পারা গেল না। ঢোক গিলল ইখতিয়ার। গলার এডামস্ আ্যাপেল টা ওঠা নামা করল সুসজ্জিত, আর্কষনীয় পর্যায়ে।
‎কাটল কিছুক্ষণ। মুগ্ধার গলায় এক হাত রেখে প্রিয়নারীর ওষ্ঠে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো। পুরুষালি ওষ্ঠের ছোঁয়া পেতেই নাজুক মেয়েটি কেঁপে উঠলো। শিহরণ বয়ে গেল তার শিরদাঁড়া দিয়ে। মেয়েলি স্বভাবসুলভ সরে যেতে চাইল। পারল আর কি? শক্ত করে ধরে রাখল ইখতিয়ার। যতক্ষণ না শান্তি মেলে..

‎মুগ্ধা হাঁপাতে হাঁপাতে বুকে হাত রাখল। বুক তার রেলগাড়ি চালাচ্ছে যেন। আর ইখতিয়ার? হাপালেও এখনো ঘোর লাগা দৃষ্টি তার মুগ্ধার দিকে। বলে না? জাতে মাতাল তালে ঠিক। অমনই। সে চাইছে আজ কিছু হোক! খুব আরাধ্য কিছু। যা ছাড়া সবে অপূর্ণভাব । যেই ভাবা সেই কাজ। অমনি কোলে তুলে নিলো মুগ্ধা কে। আচমকা এমন হওয়ায় ভয়ে ইখতিয়ারের বুকের কাছে খামছে ধরল মুগ্ধা। নোখ বিধে গেল ইখতিয়ারের পশমাবৃত বুকে। রা কাটল না ইখতিয়ার। মুগ্ধাকে বিছানায় আলতো করে শুয়ে দিলো। মুগ্ধা চোখ খিচে বন্ধ করে আছে। শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে তার। হয়তো ভয়ে, কিংবা কিছুর আশঙ্কায়।
‎ইখতিয়ার ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইল। ঘরের মৃদু আলোতে মুগ্ধাকে তার অপরূপ তরঙ্গীনি মনে হলো। তেমনি ওঠানামা চলছে মুগ্ধার দেহের। ইখতিয়ারের বুকের মাঝে ডিমডিম বাজছে। চোখেমুখে একঝাঁক কামু’কতা। ইখতিয়ার দ্রুত হাতে বেলকনির দরজা দিয়ে এলো। বন্ধ করল ঘরে আলো আসার শেষ অবলম্বনটুকু। তারপর?

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ২৯

‎তারপর শান্ত গম্ভীর ইখতিয়ার হয়ে উঠলো অধৈর্য, উন্মাদ, বন্য যুবক। পুরো নিরাবতার ঘরজুড়ে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আছড়ে পড়ল। কংক্রিটের ঘরের প্রতিটা ইট, ইলেকট্রনিক, কিংবা জড়বস্তু সাক্ষী হলো এক নতুন গল্পের। এক জোড়া দম্পতির নতুন আবেশের। কিংবা পরিপূর্ণতার ঝলকানির।
‎অথচ দূর থেকে মৃদু আওয়াজে ভেসে আসছে এক মেয়েলি স্বর,
‎“বাতাসে গুনগুন…এসেছে ফাগুন
‎বুঝিনি…তোমার, শুধু ছোঁয়ায়….
‎এত যে আগুন”

‎ম্যারিড লাইফ্ পর্ব ৩১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here