Home যে পাখি মন বোঝে না যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৫

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৫

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৫
মুন্নি আক্তার প্রিয়া

আমি জীবনে শেষ কবে এভাবে এতটা অবাক হয়েছি ,ঠিক মনে করতে পারছি না। পায়ের নিচের মাটিটাকেও ভীষণ শূন্য শূন্য আর ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল।
রাহাত ভাই তখনো স্থির আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখেমুখে উত্তর জানার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু আমার মাথা তো ফাঁকা হয়ে আছে। তিনি হয়তো আমার মুখাবয়ব দেখেই বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরেছেন। তাই একটু নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে মুখটা গম্ভীর করে বললেন,
“ঠিক আছে, এখনই কোনো উত্তর দিতে হবে না। রাতে ভাবো। সকালে আমাকে উত্তর জানাবে।”
তিনি চলে যাওয়ার পরও আমি থম মেরে দাঁড়িয়ে আছি। বোঝার চেষ্টা করছি ,এটা স্বপ্ন ছিল নাকি দুঃস্বপ্ন। আমি তো দুঃস্বপ্নতেও কখনো রাহাত ভাইকে নিয়ে ভাবিনি!
অনেক চেষ্টা করেও মাথা থেকে বিষয়টা বের করতে পারছিলাম না। লাইট অফ করে বিছানায় আকাশমুখী হয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম, রাহাত ভাইয়ের আসলে হয়েছেটা কী? তিনি কেন আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন? আমাকে তো তিনি সহ্যই করতে পারেন না। তাহলে হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত? এরকম হাজারও চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেছি আমি নিজেও জানি না। সকালে ঘুম ভেঙেছে হৃদির দরজা ধাক্কানোর শব্দে। অনেক রাত করে ঘুমিয়েছিলাম বলে, আজ উঠতেও দেরি হয়ে গেল। আমি বিছানায় বসেই চিৎকার করে বললাম,

“আসছি।”
ফোনে সময় দেখলাম ক্লাস শুরু হতে আর পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাকি আছে। আমি তড়িঘড়ি করে উঠে আগে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। কোনোরকম ফ্রেশ হয়ে ও কলেজের ইউনিফর্ম পরে রুম থেকে বের হয়েছি। চাচিমনি দেখি খাবারের প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম,
“খাব না চাচিমনি। সময় নেই।”
“এই ডিমটুকু খা।”
বলে চাচিমনি মুখের ভেতর প্রায় আস্ত একটা সেদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দিলেন। মুখ ভরতি ডিম নিয়েই আমি বাইরে চলে এলাম। দেখি যে, রাহাত ভাইয়ের কালো রঙের গাড়িটা আজও দাঁড়িয়ে আছে। লুকিং গ্লাসে আমাকে দেখেই বোধ হয় তিনি বামদিকের দরজাটা খুলে দিলেন গতকালের মতোই। আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, তিনি কী চান।
আমি চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসলাম। অনেক কষ্টে মুখের ডিমটুকু শেষ করে তাকে তার উত্তর দিতে যাব ,তার আগেই তিনি পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বললেন,

“আগে পানি খাও। খাবার গলায় আটকে যাবে।”
এই লোক নির্ঘাত আমাকে অবাক করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যে ব্যক্তি কিনা পারে না শুধু আমাকে খু’ন করে, সে দিচ্ছে এখন পানি এগিয়ে! এত পরিবর্তন?
আমি পানি পান করার পর তিনি নিজেই বললেন,
“এখন কোনো উত্তর দিতে হবে না। হাতে সময় কম। তোমার জন্য আমাকেও আজ দেরি করে বের হতে হয়েছে। তোমার কলেজ ছুটির পর আমি অপেক্ষা করব বাইরে। এখন সিট বেল্ট বেঁধে নাও। গাড়ি স্পিডে চালাব।”
আমি হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছি। এই মানুষটা আমাকে আগে কখনো কলেজেই দিয়ে আসতে যায়নি আর আজ কিনা সে ছুটির পর আমাকে আনতে যাবে? উত্তরের জন্য? আমায় এভাবে নির্বিকার দেখে রাহাত ভাই নিজেই কিছুটা ঝুঁকে কাছে এসে সিট বেল্টটা পরিয়ে দিলেন। আমার এবার নিঃশ্বাস আটকে আসার উপক্রম। এটা কি আসলেই রাহাত ভাই? নাকি তার রূপ ধরে অন্য কেউ এসেছে?

আমাকে পৌঁছে দিয়ে তিনি চলে গিয়েছেন অফিসে। গতকাল রাত থেকে এখন পর্যন্ত বারবার এত বেশি অবাক হচ্ছি যে, একসাথে এত ডোজ নিতে পারছি না। আজ সারাটাদিন আমি ক্লাসেও চুপচাপ রইলাম। বন্ধুরা হাজারবার জিজ্ঞেস করার পরও আসল কারণটা বলিনি। কেননা আমার মনে হয়, ওরা নিজেরাও এত শক্ নিতে পারবে না।
যেহেতু রাহাত ভাই বলেছিল, আজ তিনি আসবেন তাই আমি আজ ছুটির পর ওদের রেখে আগে আগেই বের হয়ে গেছি। বাইরে গিয়ে দেখি, তিনি অলরেডি চলে এসেছেন। আমি দ্রুত গিয়ে চোরের মতো গাড়িতে উঠে বসলাম। কারণ কে আবার কী ভেবে বসে থাকে বলা তো যায় না।
তিনি গাড়ি স্টার্ট দিলেন চুপচাপ। ভালোমন্দ কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। একটা ঠান্ডা জুসের বোতল এগিয়ে দিলেন। আমি আবারও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। তিনি রাস্তার দিকেই তার দৃষ্টি স্থির রেখে বললেন,
“নাও। গরমের মধ্যে ভালো লাগবে।”

আমি জুসটা হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে আছি। তার এত কেয়ার আর নেওয়া যাচ্ছে না। বদহজম হচ্ছে। কারণ আমি তার যত্নে অভ্যস্ত নই। তার থেকে আমি যত্ন ,আদর, ভালোবাসা এসব কিছুই কখনো পাইনি। আমার অবাক হওয়া এখনো বোধ হয় অনেকটা বাকি ছিল।
তিনি হঠাৎ গাড়ির ব্যাকসিট থেকে সূর্যমুখী, লিলি আর গোলাপফুল দিয়ে বানানো একটা ফুলের বুকে এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। এটা এতক্ষণ আমি খেয়ালই করিনি। অবশ্য পেছনেও তাকাইনি আমি। তবে হ্যাঁ, এবার সত্যি সত্যিই আমি জ্ঞান হারাব।
“ফুলে কি অ্যালার্জি আছে?”
তার প্রশ্ন শুনে আমি বোকার মতো করে বললাম,
“কী?”
“বাংলা বোঝো না?”
“বুঝি।”
“তাহলে এক কথা বারবার রিপিট করতে হয় কেন?”

আমি আর কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। তিনি চোখ-মুখ কুচকে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। বললেন,
“নেবে নাকি ফেলে দেবো?”
মাথা আমার এতটাই ফাঁকা হয়ে আছে যে, তিনি ঠিক কী নেওয়ার কথা বলছেন ঐটাও আমার মাথাতেই নেই। পরক্ষণেই তার হাতের দিকে তাকিয়ে আমার হুঁশ ফিরল। আলগোছে ফুলগুলোকে নিয়ে আমি কোলের ওপর রাখলাম। তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন,
“প্রিয় ফুল কী তোমার?”
“বেলি।”
তিনি বোধ হয় একটু আহত হলেন আমার উত্তর শুনে। অন্তত তার মুখ দেখে আমার তা-ই মনে হচ্ছে। তবে আমি কৌশলে একটু মিথ্যোও বলেছি। বেলিফুল আমার অবশ্যই পছন্দের ,কিন্তু তিনি বাকি যেই তিনটা ফুল এনেছে সেগুলোও আমার প্রিয় ফুল।
তিনি মুখটা গম্ভীর করে বললেন,
“তোমার ফেসবুকে ম্যাক্সিমাম পোস্ট সূর্যমুখী ও লিলিফুল নিয়ে শেয়ার করা। সেখান থেকেই আইডিয়া করে নিয়েছিলাম, এগুলোই হয়তো তোমার প্রিয় ফুল। আর গোলাপ তো এমনিই ভালোবাসার প্রতিক। তাই সাথে গোলাপও এড করেছি।”,
বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া। এই লোক আমার আইডিও স্টক করে? অথচ আমরা কেউ কারো সাথে ফেসবুকে এড পর্যন্ত নেই।

“বাসায় তো বাকি সবার সাথে চাল ভাজার মতো ফটর ফটর করে কথা বলো ,আমার সামনে এলেই এরকম বোবা হয়ে যাও কেন?” কথাটা তিনি একটু বিরক্ত হয়েই বললেন।
আমি চট করে তাকে চমকে দেওয়ার মতো একটা প্রশ্ন করে বসলাম,
“আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?”
অদ্ভুত! তিনি একটুও চমকালেন না। উলটো আমাকেই প্রশ্ন করলেন,
“তোমার কী মনে হয়?”
“আমার কী মনে হবে? আপনার মন আপনি ভালো জানেন।”
“তোমার মন যদি কিছু না-ই জানে, তবে এই প্রশ্ন কেন করলে?”
“আপনি বললেন গোলাপ ভালোবাসার প্রতিক ,তাই নাকি আমাকে গোলাপ দিয়েছেন। তার মানে তো তাহলে এটাই দাঁড়ায় যে, আপনি আমাকে…”
“আমি তোমাকে? আমি তোমাকে কী?”
রাহাত ভাই প্রশ্নটা করলেন একদম আমার চোখের দিকে তাকিয়ে। আমি রীতিমতো এসির মধ্যেও এখন তরতর করে ঘামছি। তিনি স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে ড্রাইভ করতে করতেই ফের প্রশ্ন করলেন,

“কী হলো? থেমে গেলে কেন? বলো। আমি তোমাকে কী?”
আমি দুহাত মুঠো করে বসে আছি। চোখমুখ শক্ত করে ফাঁকা ঢোক গিলে বললাম,
“আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না।”
তিনি সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ব্রেক কষলেন। বিস্ময়াভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী বললে?”
“আপনি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না।”
“কারণ?”
“কারণ বলতে গেলে অনেক কারণই আছে। আবার বলতে না চাইলে কোনো কারণই নেই।”
“আমি কারণটা জানতে চাই।”
আমি নিশ্চুপ। তিনি নিজেই বললেন,

“সেই কারণটা কি জীবন? ভালোবাসো ওকে তুমি?”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি জীবনকে চিনেন কীভাবে?”
“প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করবে না এখন। আমার প্রশ্নের উত্তর ছিল না এটা। বলো ভালোবাসো জীবনকে?”
“না। ও শুধু আমার ক্লাসমেট হয়। এছাড়া আমার দিক থেকে ওর প্রতি আর কিছুই নেই।”
“গুড। তাহলে আমাকে বিয়ে করতে আপত্তি কোথায় তোমার?”
“আপনি।”
তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন,
“আমি! আমি মানে?”
“আপত্তিটা আপনি নিজেই।”
“এ কথা কেন বললে? আমি কোন দিক দিয়ে কম? তোমার যোগ্য নই আমি?”
“কম না বরং অনেক বেশি। আর এতই বেশি যে আমার নাগালের বাইরে আপনি। আপনি আকাশের চাঁদ। ঐ চাঁদ ছোঁয়ার দুঃসাহস আমার নেই। দিনশেষে আপনার ঐ কথাটা তো তারাদের মতো জ্বলজ্বল করা সত্য ‘আমি আপনাদের বাড়ির আশ্রিতা’। এই কঠিন সত্য আমার প্রাণ থাকতে আমি ভুলতে পারব না।”

“চাঁদ যদি নিজে তোমার হাতের মুঠোয় চলে আসে?”
“তবুও সেই চাঁদ আমার চাই না। কারণ আমার বাউন্ডারিটুকু আমি খুব ভালো করেই জানি।”
“ভালোবাসলে সব প্রাচীর ভাঙা যায়, প্রিয়।”
“সমস্যা এটাই যে, আমি আপনাকে ভালোওবাসি না।”
রাহাত ভাই ফ্যালফ্যাল করে অনেক্ক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমার দৃষ্টি তখন জানালার বাইরে। এরপরের রাস্তাটুকু রাহাত ভাই যে কীভাবে ড্রাইভ করে বাড়িতে ফিরলেন তা বোধ করি আমরা কেউই টের পাইনি।

বিকেলের পর থেকে রাহাত ভাইয়ের সাথে আমার আর দেখা হয়নি। আমিও রুম থেকে বের হইনি। সন্ধ্যার নাস্তাও হৃদি রুমে নিয়ে এসেছিল, দুজনে একসাথে খেয়েছি। রাতে ক্লাসের পড়াগুলো দেখছিলাম তখন হৃদি এলো রাতে খাওয়ার জন্য ডাকতে।
আমি গিয়ে দেখি সবাই ইতোমধ্যে খেতে বসে পড়েছে। চাচিমনি খাবার বেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু রাহাত ভাই এখনো আসেনি। আমি চেয়ার টেনে বসব তখন চাচিমনি হৃদিকে জিজ্ঞেস করলেন,
“রাহাতকে ডাকিসনি?”
হৃদি বলল,
“ডেকেছি তো। এখনো আসছে না কেন বুঝতে পারছি না।”
“এই ছেলেকে নিয়ে আমার যত জ্বালা! প্রিয়তা ,যা তো মা গাধাটাকে আরেকবার ডেকে আয়।”
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম,
“আচ্ছা।”
রুমের সামনে গিয়ে দরজা আধভেজানো। তবুও নক করে বললাম,

“চাচিমনি খেতে ডাকে।”
তিনি উঠে এসে দরজা খুললেন। তালগাছের মতো বিশালদেহী বডিটা নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি একবার মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তিনি রাশভারী কণ্ঠে বললেন,
“চলো।”
ডাইনিংরুমে খেতে গিয়ে ঘটে গেল আরেক কাণ্ডকারখানা। চাচ্চু আর চাচিমনি এখনো রাহাত ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে পড়ে আছেন। কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই চাচ্চু বললেন,
“তাহলে কী ভাবলি বিয়ে নিয়ে?”
রাহাত ভাইয়ের কাটকাট উত্তর,
“করব না।”
“এটাই তোর শেষ সিদ্ধান্ত?”
“হ্যাঁ।”
“ঠিক আছে। জন্ম দিয়েছি ,বড়ো করেছি, পড়াশোনা করিয়েছি, মানুষ বানিয়েছি এখন তো নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারো। বাবা-বাবা-মায়ের তো মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই ,দাম নেই।”
“ইমোশোনাল ব্ল্যাকমেইল করছ কেন?”
“ব্ল্যাকমেইল করছি না। সত্যিটা বলছি। বড়ো হলে যে ছেলেমেয়েরা বাবা-মাকে কদর করতে জানে না তা আমি তোমাকে দেখে এখন বুঝতে পারছি।”
চাচ্চুকে কষ্ট পেতে দেখে খারাপ লাগছে। কিন্তু আমারই বা কী করার আছে? চাচ্চু কিছুক্ষণ নির্বিকার থেকে বললেন,
“যাই হোক, তুমি যেহেতু ঐ মেয়েকে বিয়ে করবে না তাহলে আমরা আর কাল ঐ বাসায় যাচ্ছি না। কিন্তু ওরা কাল আসবে আমাদের বাড়িতে।”

“কেন?”
“আমাদের মেয়েকে দেখতে। মেয়ের বড়ো ভাই ডাক্তার। গতবছরই জবে জয়েন করেছে।”
“আব্বু, হৃদি এখনো অনেক ছোটো!”
“প্রিয়তাকে দেখতে আসবে।”
এই পর্যায়ে আমার এবং রাহাত ভাই দুজনেরই জ্ঞান হারানোর উপক্রম। রাহাত ভাই বললেন,
“প্রিয়তাও ছোটো এখনো।”
“জানি। আমাদের ফ্যামিলি ফটো দেখে ওরা প্রিয়তাকে পছন্দ করেছে। চেয়েছিল তাদের মেয়েকে আমাদের বাড়িতে দেবে আর প্রিয়তাকে তাদের ছেলের বউ করে নিয়ে যাবে। কিন্তু তুই তো আর করবি না বিয়ে।”
“তাই বলে তুমি প্রিয়তার কোনো মতামত নেবে না?”
“তুই আমার র’ক্ত হয়েও আমার কদর না করতে পারিস। কিন্তু আমার প্রিয়তা আমার কদর করবে। কীরে মা করবি না?”
আমি নির্বিকার তাকিয়ে আছি। কী জবাব দেবো? চাচ্চু নিজেই বললেন,
“তোর খারাপ আমি কখনো চাইব না এটুকু বিশ্বাস তো করিস আমাকে, মা?”
আমি ওপর-ওপর-নিচ মাথা ঝাকালাম। চাচ্চু বললেন ,
“তাহলে আর কোনো সমস্যা নেই। যদি সব ঠিকঠাক থাকে তাহলে ওরা এখন শুধু আকদটা করে রাখবে। তোর ইন্টার পরীক্ষা শেষ হলে অনুষ্ঠান করে বিয়ে হবে। আর বিয়ের পরও তোকে পড়াশোনা করাবে। তোর ভবিষ্যতের সব দায়িত্ব আমার ওপর। তুই কোনো চিন্তা করিস না।”
পাশ থেকে চাচিমনি বললেন,

“ছেলেও খুব সুন্দর। তোর পাশে খুব মানাবে।”
সত্যি বলতে আমার আর জবাব দেওয়ার মতো কিছুই নেই। কী থেকে যে কী হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কার বিয়ের কথা ছিল, এখন আর কার বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় চলছে। বিয়ে করা না করা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মনের কোথায় যেন একটা খুঁতখুঁত করছে। কেন এমন হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কিন্তু এ কথাও সত্য যে আমি চাচ্চু আর চাচিমনির মুখের ওপর ‘না’ বলতে পারব না।
দোনোমোনো ও মাথায় অজস্র চিন্তা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি রাহাত ভাই অপেক্ষা করছেন। আজকে গাড়ির বাইরেই দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে গম্ভীরমুখে বললেন,
“গাড়িতে উঠে বসো।”

আমি চুপচাপ গাড়িতে বসলাম। রাহাত ভাইও উঠে নিজেই আমাট সিট বেল্ট লাগিয়ে দিলেন। এরপর সর্বোচ্চ স্পিডে ড্রাইভ করতে লাগলেন। এদিকে ভয়ে আমার জান-প্রাণ যায় যায় অবস্থা। আমি চিৎকার করতে করতে বলছি,
“আস্তে গাড়ি চালান। ম’র’বেন নাকি! আস্তে চালান বলছি। আর এদিকে কোথায় যাচ্ছেন? আপনার অফিস ,আমার কলেজ কোনোটাই তো এদিকে না।”
না তিনি গাড়ি আস্তে চালাচ্ছেন, আর না তিনি আমার কথার কোনো জবাব দিচ্ছেন। প্রায় বিশ মিনিট পর এই ঝড় থামল। তিনি ব্রেক করার সাথে সাথে মনে হলো জানে পানি ফিরে পেয়েছি। আমি স্থির হওয়ার চেষ্টা করলেও ,তিনি স্থির হলেন না। প্রায় হুঙ্কার ছুড়ে বললেন,
“তুমি আগে থেকেই জানতে এসব? এজন্যই আমাকে রিজেক্ট করেছ?”

আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম,
“কোন সব?”
“তোমার বিয়ের কথা।”
“আমি কিছুই জানতাম না।”
“মিথ্যা কথা বলবে না একদম আমার সাথে।”
বলেই তিনি কিছু ছবি আমার দিকে ছুঁড়ে মারলেন। একটা ছবি এসে পড়েছে আমার কোলের ওপর। ডাক্তারের সাদা ইউনিফর্ম পরনে ,গলায় স্টেথোস্কোপ। বেশ লম্বা-চওড়া রাহাত ভাইয়ের মতো ,কিন্তু মুখটা রাহাত ভাইয়ের মতো গম্ভীর নয়; হাসি হাসি। অদ্ভুত! এই ছেলের মাঝে আমি রাহাত ভাইকে কেন খুঁজছি!
“ভালো লেগেছে ওকে?”
প্রশ্ন শুনে আমি একটু থমকালাম। জিজ্ঞেস করলাম,

“কে উনি?”
“ড্রামা করবে না খবরদার! নিজের হবু বরকে এখন চিনতে পারছ না?”
“আমি ওনাকে দেখিনি আগে।”
“ছবিও না?”
“না।”
“কিন্তু ঠিকই ঢ্যাংঢ্যাং করতে করতে আকদ করতে রাজি হয়ে যাবে। হবে না রাজি?”
আমি এবারও নিরুত্তর। তিনি প্রায় ধমকের সুরে বললেন,
“কী হলো? কথা বলছ না কেন এখন? বিয়ে করবে ঐ ছেলেকে?”
“চাচ্চু আর চাচিমনি যা চাইবে তা-ই হবে।”
“মানে কী? জীবনটা কি মগের মুল্লুক নাকি? জীবন তোমার ,সিদ্ধান্তও তোমার।”
“কিন্তু এই জীবনটা টিকে আছে তাদের উসিলাতেই। আল্লাহ্ তাদের উসিলায় আমাকে সুন্দর একটা জীবন দিয়েছে, নতুন পরিবার দিয়েছে, ভালো খাচ্ছি ,পড়ছি ,পড়াশোনা করছি। সেই আমি কীভাবে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাব? আর কেনই বা যাব? এমন তো না যে ,তারা যার-যার-তার হাতে আমাকে তুলে দিতে চাচ্ছে। আবার এমনও নয় যে, আমি কাউকে ভালোবাসি।”

“আমি তাহলে বাসায় বলি ,আমি তোমাকে ভালোবাসি বিয়ে করতে চাই?”
“না।”
“না কেন?”
“,তারা যদি মনে করত আপনার সাথেই আমার বিয়ে দেবে তাহলে আমাদের জন্য আলাদা আলাদা পাত্র-পাত্র-পাত্রী খুঁজত না। তারা আমাদের নিয়ে কখনো এভাবে ভাবেনি। এমনকি আমি নিজেও না। আমার জানামতে, আপনার মনেও এমন কিছু ছিল না। হঠাৎ করে আপনার কী হলো কে জানে! যাই হোক, আমি অনুরোধ করব, শুধু শুধু বিষয়টাকে জটিল করবেন না। চাচ্চু ,চাচিমনি যা চাচ্ছে তা করতে দিন।”
“বাহ্! আর আমার কী হবে?”
“নিজের পছন্দে বিয়ে করুন অথবা ঐ মেয়েকেই বিয়ে করুন।”
“ঐ মেয়েকে আমি বিয়ে করব না। আর আমার পছন্দ তুমি।”
আমি চটজলদি কথা ঘোরাতে বললাম,
“ক্লাসে যাব। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
তিনি রাগে স্টিয়ারিং-এর ওপর হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বারি দিয়ে বললেন,
“এখানে আমার জীবন-ম’র’ণ এর হিসাব হচ্ছে। আর তুমি আছো তোমার ক্লাস নিয়ে?”
আমি একটু ভীতু কণ্ঠে বললাম,
“ক্লাসটেস্ট আছে আজ!”
তিনি রাগে-জিদ্দে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বললেন,
“যাও। ক্লাস করো গিয়ে যাও।”

কেমন অদ্ভুত লোক! এমন জায়গায় গাড়ি থামিয়েছে, যেই রাস্তা আমি চিনিই না। আশেপাশে দোকানপাট, গাড়ি ,মানুষ কিছুই নেই। আমি যাব কীভাবে? তবে সে যখন এত কিছু না ভেবেই আমাকে এভাবে একা তাড়িয়ে দিচ্ছে, তাহলে বেশ! গুগল ম্যাপ থাকতে আর চিন্তা কীসের?
আমি গাড়ি থেকে দুই পা দিয়ে নামতেই পা দপ করে পড়েছে কাঁদার ভেতর। সারে সর্বনাশ একদম যাকে বলে! উনি গাড়ি থামানোর আর জায়গা পায়নি? একদম কাঁদার পাশেই থামাতে হলো? গা স্যাঁতসেঁতে করছে এখন আমার। নড়তে চড়তেও পারছি না। এই অবস্থায় আমি হাঁটব কী করে? পা দুটো একদম কাঁদাতে ডুবে গেছে।
আমাকে এভাবে ঝিম মেরে বসে থাকতে দেখে রাহাত ভাই হয়তো কিছু আন্দাজ করতে পেরেছেন। জিজ্ঞেস করলেন,
“এনিথিং রং?”

আমি নিরব হয়ে বসে আছি। তিনি গাড়ি থেকে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। কোমরে দুহাত গুঁজে আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন,
“চুপ করে বসে থাকো।”
আমি কাঠের পুতুলের মতো চুপ করে বসেই আছি। তিনি গাড়ি থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে এসেছেন। আমি হাত বাড়ালাম বোতলটা নেওয়ার জন্য। তিনি হাঁটু মুড়ে রাস্তায় বসে নিজের হাতে ডলে ডলে পানি দিয়ে কাদাগুলো ধুয়ে দিচ্ছেন। এই পর্যন্ত তিনি আমাকে যতবার অবাক করেছেন সবচেয়ে বেশি অবাক বোধ আমি আজ হয়েছি। আমি কল্পনাও করিনি তিনি আমার পায়ে হাত দিয়ে কাদা পরিষ্কার করে দেবেন। ভেবেছিলাম, পানির বোতল আমাকে দিয়ে বলবেন পা ধুয়ে নিতে।

পা পরিষ্কার করা শেষ হলে ,পকেট থেকে টিস্যু বের করে আগে পা মুছে দিলেন আমার। এরপর জুতাগুলো মুছে দিয়ে পরিয়ে দিলেন। যদি সত্যি বলি, তাহলে আজ শুধু আমি অবাকই হইনি বরং অনক বেশি ইমপ্রেসও হয়ে গেছি।
খালি পানির বোতলটা গাড়িতে রেখে তিনি ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গান ছাড়লেন। গানের সঙ্গে সঙ্গে আবার তাল মিলিয়ে গাইছেন,

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৪

“সইতে পারব না হারানোর ব্যথা,
বলে তো দিয়েছি আমি হৃদয়ের কথা।”
আচ্ছা, লাইনটা কি তিনি কোনোভাবে আমাকে ডেডিকেট করলেন?

যে পাখি মন বোঝে না পর্ব ৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here