Home শিউলি ফুল শিউলি ফুল পর্ব ৫

শিউলি ফুল পর্ব ৫

শিউলি ফুল পর্ব ৫
তাজরীন ফাতিহা

উত্তরীয় বাতাস বইছে। উঠোনে মেলে দেয়া কাপড়চোপড় উড়ছে ফড়ফড় করে। সাঁই সাঁই শব্দটা ভোঁতা হয়ে শিউলির কানে বিঁধছে। কিছু মানুষের সুখ খুব কম সময় স্থায়ী হয়। শিউলিকে নির্দ্বিধায় সেইসব মানুষদের কাতারে ফেলা যায় বোধহয়। জানালার কপাট খুলে বাইরে চেয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। তিন সপ্তাহ আগে তার জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। শিউলির সেসব ভাবলেই কান্নারা ঠিকরে বেরোতে চায়। হাউমাউ করে কাঁদতেও পারে না। কাঁদলে পেটে টান পড়ে। শুধু চোখের দুই ধার দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে নিভৃতে। হামিদ গরুকে খাইয়ে দাইয়ে গোসল সেরে ঘরে ঢুকল সেই মুহূর্তে।

“এমনে বইয়া না থাইকা মায়রে কামে সাহাইয্য করলেও তো পারোস। হারাদিন দেহি হইয়া বইয়াই দিন পার করস। আগে তো বাইচ্চা পেডে আছিল, এহন কী হইছে?” গম্ভীর কণ্ঠ।
শিউলি হামিদের কথায় এখন আর রসকষ খুঁজে পায়না। বাচ্চা জন্ম দেয়া কী শিউলির হাতে খোদা ন্যস্ত করেছিলেন? সবাই এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলে শিউলি কোথায় যাবে? স্বামীকেই বা শিউলি কী দোষ দেবে? লোকটা তো তার জন্য যথেষ্ট করেছিল কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না। একটা বাচ্চার জন্য কতবছর প্রহর গুণছে সে অথচ আল্লাহ সেখানেও দিয়ে দিলেন বিরাট প্রশ্নবোধক? কাটা পেট নিয়ে নামতে গেলে ‘ওয়া ওয়া’ শব্দের কান্না কানে বারি খেল। শিউলি থেমে গেল। হামিদ এক পলক চাইল এদিকে। তারপর গায়ে শার্ট জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

শিউলি চোখ মুছে হামিদের সুতির লুঙ্গি ছিঁড়ে পেঁচিয়ে রাখা তুলতুলে কায়াটিকে কোলে তুলল। হাত, পা ছুঁড়ছে মোলায়েম মাংসল পিণ্ডটি। শিউলি যতই দেখে ততই চোখ ভরে আসে। শারীরিক যতই ত্রুটি থাকুক এই মেয়ে তার। শুধু খারাপ লাগে তখনই যখন তার মেয়েকে সবাই ল্যাংড়া বলে। কি সুন্দর নাদুসনুদুস টকটকে লাল চেহারার একটা বাচ্চা কিন্তু শারীরিক ত্রুটির কারণে সেই সৌন্দর্য সকলের কাছে ফিঁকে। তার মেয়ে হাঁটতে পারবে ঠিকই কিন্তু সেটা এক পায়ের সাহায্যে, বাম পায়ের শক্তি যে মহান আল্লাহ তার মেয়েকে দিয়ে এই দুনিয়ায় পাঠাননি। শিউলির আফসোস হয় সেদিন রাতের জন্য। কেন সে অত রাতে বেরিয়েছিল, যদি না বেরোত তার মেয়ে আজ সুস্থ সবল থাকত। সকলে যখন বলে মেয়ে হওয়ার দোষ শিউলির, মেয়ে ল্যাংড়া হওয়ার দোষ শিউলির তখন নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা কাজ করে। হামিদ তো কথাই বন্ধ করে দিয়েছে। লোকটা বেজায় কষ্ট পেয়েছে! শিউলি নিজের মেয়ের নরম গালে গাল ঠেকিয়ে চোখের পানি ছেড়ে বলতে লাগল,

“আমার চাঁন্দের টুকরা, তুই হইলি তোর মায়ের চাঁন্দের আলো।”
বলেই বাচ্চার কান্না থামাতে খাওয়াতে শুরু করল। মেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেই কাটা পেট নিয়ে রান্নাঘরে গেল। হেলেনা পারভীনকে আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। শিউলি নিজ থেকেই তরকারি কুটে রান্না চড়িয়ে দিল। অদৃষ্ট নিয়ে বসে থাকলে তো চলে না, পেটেরও যোগান দেয়া প্রয়োজন।

হামিদ দোকানের পাটাতনে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে চোখের উপর হাত দিয়ে। দোকানের শাটার বন্ধ করে রেখেছে। ইদানীং কোনো কিছুতেই মনোযোগ নেই তার। শিউলিকে নিয়ে সেদিন গভীর রাতে ছুটতে হয়েছিল সদর হাসপাতালে। এত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, শিউলি বারবার বলছিল বাচ্চাটা বাঁচবে তো? তার মনেও কুঁ ডাকছিল বাচ্চাটা বাঁচবে তো! শিউলি বলছিল, মা ও বাচ্চার মধ্যে একজনকে বাঁচানো গেলে বাচ্চাকে যেন বাঁচাতে বলে হামিদ। সেদিন রাতে কোনোরকম ভ্যানগাড়ি জোগাড় করে পারি দিয়েছিল হাসপাতালে। রক্তের জোগাড় করতে ছুটতে হয়েছিল এদিক ওদিক। হাসপাতাল থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল ডোনার নিয়ে আসতে। হামিদ দিগ্বিদিক ছুটেছিল রক্তের জোগাড় করতে। শেষমেষ গ্রামের দুইজনকে পেয়েছিল। বাচ্চা হওয়ার পরেও কয়েকদিন বাচ্চাকে রেখেছিল যেন কিসে। হামিদ নাম বলতে পারবে না সঠিক। আইসি না কি যেন। যদিও সরকারি হাসপাতাল তবে টাকা ভালোই খরচ হয়েছে। তার মতো ছাপোষা মানুষের জন্য সেসব অনেক টাকা। হামিদ আবার কিস্তিতে ঋণ নিয়েছিল গরু কেনার সময়। টাকা পরিশোধ করতে হয় মাসে মাসে। হাত একেবারে ফাঁকাই এখন তার। জীবনের এত যুদ্ধ আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে সন্ন্যাসী হতে পারলে বেশ হতো।

“হামিদ মিয়া, হামিদ মিয়া। দোকানে নাই নাকি?”
বাইরে থেকে ডাক ভেসে আসতেই হামিদ উঠে বসল। দোকানের শাটার উঠিয়ে দেখল মাস্টার কাকা, মকবুল হোসেন। বেঞ্চে বসতে দিয়ে নিজেও বসল।
“তোমারে দেহি পাওয়াই যায়না। হুনলাম মাইয়ার বাপ হইছ, মিষ্টি খাওয়াও না ক্যান?”
হামিদ চায়ের কেটলি থেকে চা ঢেলে কনডেক্স মিল্ক মিশিয়ে মকবুল হোসেনের দিকে বাড়িয়ে দিল। মকবুল হোসেন নিলেন।
“চেহারা এমন ভাইঙ্গা গেছে ক্যা? রাইতে ঘুমাও না ঠিক কইরা? দোকান মোকান বন্ধ কইরা বইয়া রইছ যে?” চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে।
“এমনেই মাস্টার কাকা। কেনাবেচা নাই তেমন। আপনের খবর কন? বাড়ির সবাই ভালা আছে?”
“হ, সবাই ভালা। তয় তোমার কাকি একটু অসুস্থ। দোয়া কইরো। রোগ, শোক পিছু ছাড়েনা। আল্লাহর দেয়া জিনিস কি আর করা।” লম্বা দীর্ঘশ্বাস।
“কাকির লাইগা দোয়া রইল। আইচ্ছা মাস্টার কাকা, কাকি যে এত অসুস্থ থাহে আপনে বিরক্ত হন না?”

“সত্য বলতে আগে হইতাম। তয় বছর পাঁচেক আগে চিল্লায় গেছিলাম বুঝলা। হেইখানে এক নামকরা হুজুর বয়ান দিছিল, বউয়ের লগে খারাপ ব্যবহার করলে আল্লাহ নারাজ হন। বউ ভুল করলেও হেগো ঠান্ডা মাথায় বুজানি লাগে। স্ত্রী হইল ভালোবাসার মানুষ তাগো লগে রাগ দেহানি ঠিক না। আমগো নবীজি (সা.) তার স্ত্রীগো লগে কোনোদিন খারাপ ব্যবহার করেন নাই। সবসময় তাগো লগে কোমল, সুন্দর আচরণ করতেন, সাহাবীগোও হেইভাবে আচরণ করতে বলতেন। স্ত্রীর সুবিধা, অসুবিধা দেহা স্বামীর দায়িত্ব। বুজলা?”
“হুজুর সাবের বয়ান দেহি আপনেরে বদলায় দিছে মাস্টার কাকা।” অন্যমনস্ক গলা।
“এমনই কইতে গেলে। সবচেয়ে বড় কথা আল্লাহ চাইছে বইলা বদল হইছে। হুজুর সাব তো উছিলা মাত্র। তোমার কাকিরে ছাড়া থাকতে পারিনা এহন আর। বেচারি হারাদিন আমার লাইগা বইয়া থাহে। উডি এহন। বাজার কইরা বাড়ি যাইতে হইব। তোমার মাইয়ারে একদিন দেখতে যামু কিন্তু।”
হামিদ ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি দিল। মকবুল হোসেন চায়ের কাপ রেখে টাকা দিলেন। হামিদ ড্রয়ারে টাকা রেখে দিল।

“তোমারে মন মরা লাগে ক্যান? শরীর খারাপ নি?”
“না, ঠিক আছি।”
“ও আসল কথাই তো জিগাইতে ভুইলা গেলাম। নাতিনের নাম রাখছ কী?”
হামিদ থতমত খেয়ে গেল। বাচ্চার তো কোনো নাম রাখা হয়নি। হামিদ মেয়েকে জন্মের পরে একবার কোলে নিয়েছিল। বাকি সময় শিউলির কাছে ছিল বাচ্চাটা। হামিদ সেভাবে নামের বিষয়ে ভাবেনি তো।টাকার চিন্তায় সারাদিন পার হয় তার। মন মেজাজ বিক্ষিপ্ত থাকে। সেভাবে কিছু ভাবাও হয়নি। মকবুল মিয়া উৎসুক ও জিজ্ঞাসু নজরে চেয়ে আছে তার পানে। হামিদ কোনোরকম মুখে যা এলো তুতলিয়ে জানাল,

“হাসনাহেনা।”
“বউয়ের নামের মতো মাইয়ার নামও ফুলের নামে রাখছ? ভালা। তার পাশাপাশি সুন্দর একখান আরবি নামও রাইখো কিন্তু। হাসনাহেনা নামডা কিন্তু ভারী সুন্দর। এহন উডি হামিদ।”
মকবুল সাহেব চলে গেলেন। হামিদ সাদা পাঞ্জাবি আর মাথায় টুপি পরা হাসিখুশি মানুষটার যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল একদৃষ্টে। যতক্ষণ না দৃষ্টির আড়াল হয় ততক্ষণ চোখদুটো সেদিকেই স্থির ছিল তার। মাথায় অদ্ভুতভাবে ঘুরপাক খেতে লাগল ‘হাসনাহেনা’

হেলেনা পারভীন নাতনিকে কোলে নেননা। তার মতে অপয়া বাচ্চাকে কোলে নিয়ে অভিশাপ কুড়াবে সে? রাতের বেলা বের হয়ে কোন জ্বীন শয়তানের কু নজর লাগিয়ে এনেছে তার ফলেই তো এক পা ল্যাংড়া হলো। বারবার সতর্ক করেছিলেন তিনি। রাত বিরেতে কাউকে না নিয়ে বেরোতে, মাথায় সবসময় ঘোমটা দিয়ে চলতে। গ্রামে এসব জ্বীন শয়তানের কারবার। জামশেদের বউয়ের বাচ্চাগুলো কীভাবে নষ্ট করে ফেলেছে। বারবার সতর্ক করার পরেও শিউলি কোন বুঝে হামিদরে ছাড়া বের হলো? এই নিয়ে হেলেনা পারভীন এক বিন্দুও কথা শোনাতে ছাড়েন না শিউলিকে। তার উপর ছেলে হয়নি। বংশের প্রদীপ আশা করেছিলেন তিনি। তবে একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে ছেলে হয়নি। বংশের প্রদীপ ল্যাংড়া হলে ব্যাপারটা বিশ্রী হতো খুব। ভালো লাগতো না তার। মেয়ের উপর দিয়ে গেছে ব্যাপারটায় একটু ঠাণ্ডা হয়েছেন তিনি।

শিউলি চোখের পানি মুছে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরা শিশুটিকে মন প্রাণ ভরে দেখে। নয় মাস গর্ভে রেখেছে এই প্রাণটিকে। তাকে কেউ কটু কথা বললে, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলে শিউলির কলিজায় রক্তক্ষরণ হয়। মনে হয় সারা দুনিয়া তছনছ করে ফেলতে। এই তামাম দুনিয়া অস্বীকার করলেও শিউলি কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবে না তার অংশকে। তার বড় সাধের নাড়ি ছেঁড়া ধন এই নাজুক তুলতুলে শরীরটি। সবাই অবহেলা করলেও শিউলির কষ্ট লাগেনা তবে স্বামীর নির্লিপ্ত আচরণ শিউলিকে বুকভাঙা কষ্টে ভাসিয়ে দেয়। সবাই নাহয় দূরের। বাপ হয়ে মেয়েকে একবারও ভালোভাবে চেয়ে দেখেনা, এটাই শিউলিকে বড্ড পোড়ায়। শুধু মেয়ে আর শারীরিক ত্রুটি আছে বলে কোনো বাচ্চাকে বুঝি বাপ এভাবে দূরে সরিয়ে রাখে? শিউলির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করলেও তার নির্লিপ্ত আচরণ শিউলিকে আঘাত করে তা কি ঐ বদমেজাজি, রাগী মানুষটা বোঝেনা? শিউলির দুঃখ কেউ বুঝতে চায়না কেন? আল্লাহ কি তাকে দুঃখ, কষ্ট দিয়ে পাঠাননি? সবার কষ্ট পাওয়ার অধিকার আছে, শুধু শিউলি ছাড়া? এ কেমন ইনসাফ আল্লাহ্? টপটপ করে অশ্রু ঝরছে, আসমানের দিকে চেয়ে বোবা অভিযোগ করে চলেছে শিউলি নামক বাড়ির বউটি।

বাচ্চা কেঁদে ওঠায় শিউলি চোখ মুছল। তার শরীর ভেজা অনুভূত হচ্ছে। বুঝতে পারল মেয়ে তার কাজ সেরে ফেলেছে। নিজেকে শক্ত করে মেয়েকে বুকে চেপে ধরে আওড়াল,
“শুধু তোর লাইগা, তোর মায়রে শক্ত থাকোন লাগব। দুনিয়ার তামাম মানুষের লগে তোর মায় লড়তে পারব শুধু তোর লাইগা। আমার মানিক, যক্ষের ধন তুই আমার। তোর বাপরে আমগো লাগব না। তুই বড় হইলে আমরা মা, মেয়ে মিইলা তোর বাপরে সিধা করমু।”
বাচ্চাটা ‘ওয়া ওয়া’ শব্দে মায়ের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করল। শিউলি আবারও কেঁদে উঠল। তার এইটুকু মাসুম দুধের শিশুকে কেউ অবহেলা করলে তার বুক পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বাচ্চাটা সব কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছে। শিউলি নিমা পরিয়ে রাখে মেয়েকে। একগাদা সকালে ধুয়ে দিয়েছিল। বাইরে থেকে আনতে হবে। মেয়েকে পরিষ্কার করিয়ে উদোম কোলে নিলো। বাচ্চাটা দুই হাত আর এক পা নাড়াচ্ছে। বাম পাটা অচল। এটা দেখলেই শিউলির এত কান্না পায়!
“তোর বাপ হইল বদ বাপ।” ভাঙা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠ।

সেই মুহূর্তে হামিদ গলা খাঁকারির শব্দ এল পেছন থেকে। শিউলি থতমত খেয়ে চোখের পানি মুছে মেয়েকে বিছানার মাঝে রেখে অধোয়া কাপড়ের বোল নিয়ে বাইরে গেল মেয়ের জন্য পরিষ্কার কাপড় আনতে। হামিদ শার্ট খুলতে খুলতে আড়চোখে বাচ্চাটিকে দেখছে। বাচ্চাটা এক আঙুল মুখে পুরে তার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে রেখেছে। পিটপিট নজরে হামিদকে পর্যবেক্ষণ করছে। হামিদ বাইরে চেয়ে দেখল শিউলি কলপাড়ে যাচ্ছে বোল নিয়ে। হামিদ এগিয়ে এসে খাটে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েকে একবার দেখে আবারও চাইল। বাচ্চাটা পিটপিট করে এখনো তার দিকেই চেয়ে।
“এদিকে কী?”
“আ..আ..আ..” গার্গলের মতো শব্দ করছে বাচ্চাটা।
মেয়ের সাথে হামিদের প্রথম কথপোকথন এইটুকুই। শিউলিকে আসতে দেখে আবারও আলনার কাছে চলে গেল হামিদ। শিউলি মেয়েকে কোলে নিয়ে নিমা পরিয়ে গলায় পাউডার দিয়ে দিল। সাথে কপালে ভরাট করে কাজল পরিয়ে দিল। হামিদ সবকিছুই আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করছে। কেন যেন তার এসব দেখতে খারাপ লাগছে না।

হামিদকে ভাত বেড়ে দিতেই এক লোকমা মুখে পুরে আর খেতে পারল না সে। শিউলি দেখল হামিদ একটা একটা করে ভাতের দানা উঠাচ্ছে। জিজ্ঞেস করবে, কোনো সমস্যা কিনা? কিন্তু ভয় করছে যদি রাগারাগি করে? চোখ মুখ ফুলে অস্বাভাবিক লাগছে লোকটাকে। কোনো কিছু নিয়ে অত্যাধিক চিন্তায় আছে কি?
“তরকারি ভালা হয় নাই?”
“হু।”
শুধু একটা হু এর বিপরীতে শিউলির কী বলা উচিত বুঝতে পারছে না সে। কোনরকম দায়সারা ভাবে উত্তর দিল। শিউলির আগের হামিদকে বড্ড মনে পড়ে। লোকটা হম্বিতম্বি দেখালেও কথা তো বলতো। এখন তো তাও বলেনা। কেমন যেন চুপচাপ, নির্লিপ্ত হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে তো শিউলির মনে হয় হামিদ এই দুনিয়ারই বাসিন্দা না।

বিছানায় শোয়া মাত্রই হামিদ ঘুমিয়ে পড়েছে। শিউলি খেয়াল করেছে লোকটা এখন বিছানায় শুলেই ঘুমিয়ে যায়। আগে কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে, শিউলির সাথে সাংসারিক আলাপ সেরে এরপর ঘুমাতো আর এখন? শিউলিকে তো জেগে থাকতে হয়। বাচ্চাটা ঘুমায় না। একটু পর পর জেগে উঠে কান্না করে। শিউলিকে সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে মেয়েকে দেখতে হয়। এখনই হাঁপিয়ে গেছে বেচারি। কবে যে তার মেয়ে বড় হবে! মেয়েকে মাঝে রেখে দুইপাশে দুইজন ঘুমাচ্ছে। হামিদ উল্টো ফিরে শুয়ে আছে। শিউলি হামিদের পিঠ দেখছে আর চিৎ হয়ে শোয়া মেয়ের উপর আলতো হাত ওঠানামা করছে। মেয়ে ঘুমের ঘোরে কেঁদে উঠতেই শিউলি কান্না থামাতে নানা কথা বলে। এই যেমন এখন বলছে,

“কান্দে না আমার মানিক। মা তোরে কত আদর করি! তোর আব্বায় তোরে আদর করে না? কষ্ট পাইস না, তোর বাপে মেলা ভালা মানুষ। খালি কষ্টে নিজের দুঃখের কতা কইতে পারে না। তোরে খুব ভালা পায়। আমার টুনটুন পাখি।” মেয়ের পেটে নাক দিয়ে ঘষে।
এমন আরও নানা কথা বলে মেয়েকে শান্ত করে সারাদিনের ক্লান্তিতে দুচোখ বুজল শিউলি। হামিদ শিউলির প্রত্যেকটা কথাই শুনেছে। রাতে ঘুম হয়না ইদানিং। শিউলিকে চুপ হয়ে যেতে দেখে বুঝল ঘুমিয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে ঘুরে মেয়ের পানে চাইল। অনেকক্ষণ চেয়ে মেয়ের ছোট্ট এক আঙুল ধরে ফিসফিস করে বলল,

শিউলি ফুল পর্ব ৪

“আমার হাসনাহেনা।”
বাচ্চাটা কেঁপে নড়ে উঠল সেই মুহূর্তেই। হামিদের মনে হলো বাচ্চাটা সবই শুনেছে, বুঝতে পেরেছে। কত ছোট নরম একটা শরীর! মেয়ের অচল পায়ের দিকে চেয়ে হামিদের অজান্তেই চোখে পানি চলে এল। ফটাফট উল্টো পাশ ফিরে চোখের পানি আটকালো। ব্যাঙ ডাকছে বাইরে। রিরি শব্দ হচ্ছে। রিরি শব্দটা একসময় ‘ঋণ ঋণ’ হয়ে হামিদের কানে ঢুকে বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে গেল।

শিউলি ফুল পর্ব ৬