Home শুকনো পাতার নূপুর পায়ে শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৯

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৯

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৯
আয়েশা শেখ

চোখ ধাঁধানো আভিজাত্য নিয়ে কুচকুচে নেভি ব্লু রঙের একদম ব্র্যান্ড নিউ মার্সিডিজ-বেঞ্জ এস-ক্লাস গাড়িটা সাই সাই করে ছুটে চলেছে পিচঢালা পথ চিরে। আজ বারিশের শিক্ষকতার প্রথম দিন, মানে আজ থেকেই সে পুরোদমে ক্লাস নেওয়া শুরু করবে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই শোরুম থেকে এই বিলাসবহুল গাড়িটা নিজের নামে করে নিয়ে সোজা কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে সে।
চুলগুলো কপালের ওপর একদম এলোমেলোভাবে লেপ্টে আছে তার। পরনে গাঢ় নীল রঙের প্রিমিয়াম শার্টের ওপরের তিনটা বোতাম খোলা, যার কারণে গলার সুগঠিত পেশি স্পষ্ট। গাড়ির স্পিকারে হাই ভলিউমে বাজছে ‘Gata Only’ গানটা। সেই হিপহপ বিটের তালে তালেই যেন এক হাতে স্টিয়ারিং হুইল ঘুরিয়ে অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে গাড়ি ড্রাইভ করছে সে। সাথে ডান পা-টা এক্সিলারেটরে অনবরত চাপ বাড়িয়েই চলেছে। হুটহাট গিয়ার শিফট করার খসখস শব্দ আর টায়ারের ঘর্ষণে রাস্তা যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। তীব্র গতিতে এঁকেবেঁকে ছুটছে তার গাড়িটা।

ফুটপাতে থাকা পথচারীরা রাস্তায় চলন্ত গাড়িটির এই খামখেয়ালি রূপ দেখে আতঙ্কিত চোখে তাকাচ্ছে; মনে হচ্ছে এই বুঝি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পিষে দেবে কাউকে! কিন্তু বারিশের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ওর মুখাবয়ব একদম থমথমে, দুই ভ্রুর মাঝে সূক্ষ্ম একটা ভাঁজ। এক হাতে স্টিয়ারিং সামলে অন্য হাতটা উইন্ডো সিল্ডের ওপর অলস ভঙ্গিতে ফেলে রেখেছে সে।
কলেজের মূল ফটকের কাছাকাছি আসতেই মার্সিডিজের অবাধ্য গতি আচমকা ব্রেক চেপে গাড়ির স্পিড কমিয়ে আনল সে। নিমিষেই যেন অন্য এক মানুষ সে! একদম শান্ত, ভদ্র আর সুবোধ যুবকের মতো গাড়িটা গেটের ভেতর ঢুকিয়ে পার্কিং জোনে থামাল।
​গাড়ি পার্ক করে সে ড্যাশবোর্ডের আয়নায় নিজের দিকে তাকাল। আয়নায় তাকিয়ে শার্টের খোলা বোতামগুলো একে একে আটকে নিল। শেষ বোতামটি লাগানোর সাথে সাথেই কাপড়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল গলার রুপোলি চেইনটা। শার্টের কলারটা সোজা করে, প্যান্টের বেল্টটা টেনে গাঢ় নীল শার্টটা নিখুঁতভাবে ইন করতেই ওর দীর্ঘ ও টানটান শরীরটার ফিটনেস দ্বিগুণ ফুটে উঠল।
এরপর হাত দিয়ে এলোমেলো চুলগুলো টেনে সেট করে নেয় একদম পেছনের দিকে। সবশেষে পকেট থেকে একটা সাদা ফ্রেমের চশমা বের করে চোখে পরতেই পুরো লুকটা এক সেকেন্ডে বদলে গেল। একটু আগের সেই বেপরোয়া যুবকটি চোখের পলকে রূপান্তরিত হলো এক গম্ভীর, পরিপাটি ব্যক্তিত্বে।
সব ঠিকঠাক​ করে গাড়ি থেকে নেমে লম্বা পদক্ষেপে অফিস রুমের দিকে হাঁটা ধরল সে। কিছু একটা মনে পড়তেই একটু দাড়াল। পকেট থেকে টাই বের করে সেটা বাধতে বাধতে বাকি পথ গেল। চওড়া কাঁধ, সোজা মেরুদণ্ড আর সামনের দিকে রাখা শান্ত, ধারালো দৃষ্টির মাঝে এমন একটা গম্ভীর ভাব ছিল যে, পুরো পরিবেশকে এক লহমায় স্তব্ধ করে দিতে পারে।

​এদিকে কলেজের প্রাঙ্গণে তখন রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেছে। এমন রাজকীয় আর কোটি টাকার গাড়ি থেকে একজন নতুন শিক্ষককে নামতে দেখে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের চোখ চড়কগাছ। বিশেষ করে মেয়ে স্টুডেন্টদের দল যেন পলক ফেলতেই ভুলে গেছে। বারিশের এই তীক্ষ্ণ চোয়াল, ফর্সা গায়ের রঙ, চশমার আড়ালে ঢাকা রহস্যময় চোখ আর গ্রীক মূর্তির মতো সুঠাম শারীরিক গঠন মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশটায় সৃষ্টি করল ভিন্ন আলোড়ন। ক্যাম্পাসের সবগুলো মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নতুন স্যারের দিকে।
_“ ওই দেখ! ইনিই কি নতুন স্যার?”
_​“হ্যাঁ, কালকে ওনাকে অ্যাডমিশন রুমে দেখছিলাম। প্রফেসর ফাইজান বারিশ!”
_“ উফ ভাই, কী ড্যাশিং! জাস্ট লুক অ্যাট হিম! পুরো ক্রাশ মেটেরিয়াল!”
_“ একদম ঠিক বলেছিস। কী হট! হেয়ারস্টাইল আর বডি স্ট্রাকচারটা দেখ, জাস্ট পারফেক্ট! আমি এখন থেকে রোজ কলেজে আসব।”
বারিশ এসব ফিসফিসানিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সোজা অফিস রুমে গিয়ে ঢুকল। সেখানে নিজের আসনে বসে বাকি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে সৌজন্যমূলক কথাবার্তা শেষ করল সে। তারপর কিছুটা এগিয়ে গিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বেশ বিনয়ের সাথে বলল,
_ “স্যার, আমি কলেজ সেকশনে একটা ক্লাস রাখতে চাই।”
প্রিন্সিপাল সাহেব একটু অবাক হয়ে তাকালেন,

_ “ কিন্তু ফাইজান, আপনি তো মূলত ভার্সিটি সেকশনের ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের জন্য অ্যাপয়েন্টেড। কলেজের সিলেবাস আর ভার্সিটির লিটারেচার তো আলাদা।”
_“জি স্যার, আমি জানি,” বারিশ মুখে হালকা পেশাদার হাসি ফুটিয়ে বলল, “তবুও আমি চাচ্ছিলাম কলেজ সেকশনের একাদশ শ্রেণির নতুন ব্যাচটার ইংরেজির বেসিক ফাউন্ডেশনটা আমি নিজে তৈরি করে দিই। রুটিনে যদি আমার একটা রেগুলার ইংলিশ ক্লাস অ্যালট করে দেওয়া যেত, খুব ভালো হতো।”
প্রথম দিনেই ফাইজানের এমন আগ্রহ, বিনয়ী আচরণ আর নিজের সাবজেক্টের প্রতি দায়িত্ববোধ দেখে প্রিন্সিপাল সাহেব মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না। সাধারণত তরুণ শিক্ষকেরা জুনিয়র সেকশনে ক্লাস নিতে একটু ইতস্তত করে, কিন্তু তার মতো একজন উচ্চশিক্ষিত এবং যোগ্য যুবক নিজে থেকে কলেজের বাচ্চাদের ইংরেজি শেখানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে—এটা সত্যিই প্রশংসনীয়। চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে, মুখে একটা সন্তুষ্টির হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন,
_ “বেশ, আপনি যখন নিজে থেকে জুনিয়রদের ইংরেজি শেখানোর দায়িত্ব নিতে চাইছেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনার মতো একজন স্কিলড ইংলিশ টিচার পেলে নতুন ব্যাচটারই লাভ। আমি রুটিন কমিটিকে বলে দিচ্ছি।”
বারিশ নম্রভাবে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
_“থ্যাংক ইউ সো মাচ, স্যার। আর যদি অনুমতি দেন, তবে আজ থেকেই প্রথম পিরিয়ডেই ইংরেজি ক্লাসটা আমি নিতে চাই। একদম ফার্স্ট ডে থেকেই ওদের সাথে কমিউনিকেটিভ ইংলিশের সেশনটা শুরু করে দিতে চাচ্ছিলাম।”

প্রিন্সিপাল সাহেব আর দেরি না করে টেবিলের বেল চেপে পিয়নকে ডেকে বললেন,
_“ইলেভেনের ফার্স্ট পিরিয়ডের যে ইংলিশ ক্লাসটা আছে, ওটার প্রক্সি নোটিশে ফাইজান স্যারের নাম দিয়ে দাও। আজ থেকে উনিই ওদের রেগুলার ইংলিশ ক্লাস নেবেন।”
পিয়ন মাথা নেড়ে চলে যেতেই বারিশ প্রিন্সিপাল স্যারকে আরেক দফা ধন্যবাদ জানিয়ে ক্লাসের অ্যাটেনডেন্স খাতাটা হাতে নিল। ঘড়ির কাটায় চোখ রেখে সে বুঝতে পারল, ঠিক পাঁচ মিনিট পরই বেল পড়বে। হুট করেই তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভত এক হাসি ফুটে উঠলো।

অ্যালার্মের কর্কশ শব্দে ঝিলমিলের মাথাটা একদম খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বাজছে তো বাজছেই, থামার কোনো নাম নেই। আধো-ঘুমে হাত বাড়িয়ে ফোনটা কোনোমতে টিপে সাউন্ডটা বন্ধ করল সে। চাদরটা মুড়ি দিয়ে অন্য দিকে ঘুরে মাত্র চোখটা বুজেছে, ঠিক তখনই আবার সেই কানের কাছে ঘ্যানঘ্যানানি! বিরক্ত হয়ে ঝিলমিল আবার বন্ধ করে। কিন্তু ওটা থামার পাত্র না, একটু পর আবার বাজে। বন্ধ করে, আবার বাজে। মেজাজটা চটে গেল ওর। শেষমেশ আর থাকতে না পেরে ধড়ফড় করে বিছানার ওপর উঠে বসল কিশরী।
​আড়মোড়া ভেঙে সামনের দেয়াল ঘড়িটার দিকে চোখ পড়তেই একদম হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল ঝিলমিলের। মাথাটা যেন চক্কর দিয়ে উঠল। ঘড়ির কাঁটায় এখন ঠিক সকাল সাড়ে নয়টা বাজে। অথচ ক্লাস রুটিন অনুযায়ী প্রথম পিরিয়ড শুরু হওয়ার কথাই সাড়ে নয়টায়! তার মানে ক্লাস ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে! তড়িঘড়ি করে ফোনটা হাতে নিতেই দেখল স্ক্রিন জুড়ে ইরানের ছাব্বিশটা মিসড কল ভেসে আছে। আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে এক লাফে বিছানা থেকে নামল সে। ওয়াশরুমে ঢুকে কোনোমতে ব্রাশটা শেষ করেই মুখে চার-পাঁচটা পানির ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে এলো।

তাড়াহুড়োয় হাত কাঁপছে ওর। ড্রয়ার টেনে নতুন কলেজ ড্রেসের ধবধবে সাদা কামিজ আর সালোয়ারটা বের করে চটজলদি গায়ে গলিয়ে নিল। এরপর কামিজের দুই কাঁধ থেকে ঝুলে থাকা ওড়নাটা বুকের ওপর সুন্দর করে আড়াআড়ি করে টেনে ওড়নার দুই প্রান্ত পিঠের দিক থেকে ঘুরিয়ে এনে কোমরের ঠিক ওপরে বেল্ট দিয়ে নিখুঁত একটা বাঁধন দিতেই পুরো ড্রেসটা ওর শরীরের সাথে সুন্দরভাবে ফিট হয়ে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধার জন্য চিরুনিটা হাতে নেওয়ারও সময় পেল না। আঙুল দিয়েই জট ছাড়িয়ে কোনোমতে টেনেটুনে দুই পাশে দুটো বেণি ঝুলিয়ে দিল সে।
সিঁড়ি দিয়ে একরকম লাফাতে লাফাতে নিচে নামার সময় মাকে ডেকে চিৎকার করে উঠল ঝিলমিল,
_“আম্মু! তোমরা আমাকে ডাকোনি কেন?”
_​“ডাকিনি মানে? তোর ঘরের দরজাটা ভাঙাই শুধু বাদ রেখেছিলাম!” রান্নাঘর থেকে কড়া গলায় জবাব দিলেন নাজমা বেগম।
_​“ধুর! কলেজের প্রথম দিনেই লেট হয়ে গেল!”

​ঝিলমিলের এই এলোমেলো রূপ দেখে নাজমা বেগম চোখ কপালে তুলে বললেন,
_“এমন পাগলের মতো সেজে কেউ কলেজে যায়? চুলগুলোর কী ছিরি করেছিস!”
_​“আহ, চুপ করো তো! একদম সময় নেই।” ডাইনিং টেবিল থেকে একটা পাউরুটির স্লাইস মুখে পুরে দিয়ে সোজা বাইরে দৌড় দিল সে।
​গ্যারেজ থেকে সাইকেলটা বের করেই প্যাডেলে এমন চাপ দিল, যেন রীতিমতো সাইকেল উড়াচ্ছে সে। ঝড়ের গতিতে সাইকেল ছুটছে রাস্তা দিয়ে। কিন্তু অতিরিক্ত তাড়াহুড়োর ফল যা হওয়ার তাই হলো। হঠাৎ রাস্তার একটা ছোট গর্তে চাকা পড়তেই টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে গেল ঝিলমিল। ভাগ্য ভালো যে খুব বেশি ব্যথা পায়নি, তবে সাদা সালোয়ার আর কামিজের হাতায় বেশ কিছুটা কাদা-ময়লা লেগে গেছে।
তবে ​আজ এসব পাত্তা দেওয়ার সময় ওর নেই। চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে জামার ময়লাটা হাত দিয়ে কোনোরকমে ঝেড়ে ফেলেই আবার সাইকেলে উঠে বসল। ​কলেজের গেটে পৌঁছে সাইকেলটা লক করে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এক দৌড়ে নিজের ক্লাসরুমের সামনে এসে দাঁড়াল সে। হাঁপাচ্ছে রীতিমতো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিতেই ওর চোখে পড়ল বারিশকে। বারিশ চাচ্চু ক্লাস নিচ্ছে! ​দৃশ্যটা দেখে ঝিলমিল যেমন অবাক হলো, তেমনি বুকে আটকে থাকা একটা বিশাল শ্বাস যেন স্বস্তিতে বেরিয়ে এলো। বারিশ চাচ্চু তো ভার্সিটিতে ক্লাস নেওয়ার কথা, এখানে কী করছে? তবে যাই হোক, ভালোই হয়েছে। অন্য কোনো বদরাগী স্যার হলে প্রথম দিনেই লেট করার জন্য হয়তো বকুনি খেতে হতো। বারিশ চাচ্চুর ক্লাসে সেই ভয় নেই।

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতেই ঝিলমিল একটু জোরে বলল,
_“ভেতরে আসি, চাচ্চু?”
​ব্যস! মুহূর্তের মধ্যে ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রীর দৃষ্টি ঘুরে পড়ল দরজায় দাঁড়ানো ঝিলমিলের দিকে। ঝিলমিলের অবস্থা দেখে পেছনের বেঞ্চের মুখ টিপে হাসতে শুরু করে দিলো কয়েকজন মেয়ে। কিন্তু ​সবাই তাকালেও বারিশের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে আগের মতোই বোর্ডে লেখায় ব্যস্ত। ​ঝিলমিল ভেবে পেল না বারিশ চাচ্চু শুনতে পায়নি নাকি ইচ্ছে করেই ইগনোর করছে। সে গলাটা একটু উঁচিয়ে আবারও ডাকল,
_“চাচ্চু, আসব?”
​এবারও বারিশ ঘাড় ঘোরাল না । কেমন যেন অসহায় লাগতে শুরু করে ঝিলমিলের। ক্লাসের ভেতর থেকে ইরান চোখ রাঙাচ্ছে। কেন এমন চোখ রাঙাচ্ছে কে জানে। ঝিলমিল একটু ঢোক গিলে বারিশের দিকে তাকিয়ে এবার অন্যভাবে ডাকল,

_“স্যার… আসতে পারি?”
​এবার ঘুরে তাকাল বারিশ। হাতের মার্কার পেনটা ডেস্কে রেখে শান্ত দৃষ্টিতে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জরিপ করল সপ্তদশীকে। তাড়াহুড়োয় বাঁধা দুটো উস্কোখুস্কো বেণি। কপালের সামনের ছোট ছোট চুলগুলো ঘামে লেপ্টে আছে। সাদা ড্রেসের হাতায় আর সালোয়ারে কাদার দাগ। সব মিলিয়ে একদম বিধ্বস্ত একটা অবস্থা!
​বারিশ ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে আসে। তার গম্ভীর মুখ দেখে ঝিলমিল নার্ভাসনেস কাটাতে জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল। কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলতেই বারিশের বরফশীতল কণ্ঠ ভেসে এলো,
_​“তুমি কি বাসা থেকে এসেছ, নাকি ইঁদুরের গর্ত থেকে উঠে এসেছ?”
​কথাটা শোনার পর ক্লাসের সবাই আর হাসি চেপে রাখতে পারল না, হো হো করে হেসে উঠল একসঙ্গে। ঝিলমিল চরম অস্বস্তিতে ক্লাসের সবার দিকে তাকায়। বারিশ একটা কড়া ধমক দিয়ে সবাইকে চুপ করাল। পুরো ক্লাস নিমেষে পিনপতন নীরব। তারপর সে আবারও দৃষ্টি ফেরাল দরজায় দাঁড়ানো রমনীর দিকে। ​ঝিলমিল আমতা আমতা করে বলল,
_ “বাসা থেকেই এসেছি…”
_​“ঠিকি আছে, এই অবস্থায় তো ইঁদুরও তোমাকে তাদের গর্তে এলাও করবে না।”
​অপমানটা গায়ে না মেখেই ঝিলমিল নির্লিপ্ত গলায় বলল,

_ “ঠিকই বলেছেন। এবার কি আমি ভেতরে আসতে পারি?”
_​“ক্লাস শুরু হয়েছে ঠিক ত্রিশ মিনিট আগে,” বারিশ চোখের পলক না ফেলেই বলল।
_​“জি স্যার, বুঝতে পারিনি… কাল থেকে আর হবে না। আমি…”
​ঝিলমিলের কথা শেষ হওয়ার আগেই বারিশ হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে নির্বিকার গলায় বলল,
_“ত্রিশ মিনিট লেট করে এসেছ, তাই ত্রিশবার কান ধরে ওঠবস করে তারপর ক্লাসে ঢুকবে।”
বারিশ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে আবার হোয়াইটবোর্ডের দিকে যেতে শুরু করল। কিশরী এবার সত্যিই রেগে গেল। ভয়-ডর সব ভুলে সে গটগট করে ক্লাসে ঢুকতে ঢুকতে বারিশের পিঠের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
_ “কী বললেন আপনি? মাত্র ত্রিশ মিনিট লেট হয়েছে বলে আমি সবার সামনে কান ধরে ওঠবস করব? পারব না আমি!”

​কথাটা শেষ হতেই বারিশ পেছন ঘুরে বিদ্যুৎ গতিতে ঝিলমিলের দিকে এগোয়। বারিশকে এভাবে তেড়ে আসতে দেখে ঝিলমিলের রাগ মুহূর্তে জল হয়ে গেল। সে ভয়ে পূনরায় পিছাতে পিছাতে আবার আগের জায়গায়, অর্থাৎ দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।
​বারিশ দরজার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
_“বেয়াদবি করলে একদম ত্রিশের জায়গায় ষাট বার কান ধরে ওঠবস করিয়ে, ক্লাস থেকে সোজা বের করে দেব! চুপচাপ যা বলেছি তা করে ক্লাসে এসে বসো।”
​ঝিলমিল এবার করুণ চোখে তাকিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল,
_“আপনি না আমার চাচ্চু?”
_​“চুপ! এখানে এসব চলবে না।”
_​“চাচ্চু, প্লিজ…”
_​“শাটআপ! আমি তোমার বাবার ভাই নই যে সারাক্ষণ এভাবে চাচ্চু চাচ্চু করবে।” বারিশের গলার স্বর নামিয়ে শক্ত করে বলল।
​ঝিলমিল অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলল,

_“আপনি আমাকে সত্যিই সবার সামনে কানে ধরাবেন?”
_​“তুমি কি তাড়াতাড়ি করবে? ক্লাসের সময় চলে যাচ্ছে!” বারিশ হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাগাদা দিল।
​কী-ই বা আর করার আছে ঝিলমিলের। শেষমেশ মাথা নিচু করে সত্যি সত্যিই দুই কানে হাত রাখল সে। ক্লাসের সবাই ঝিলমিলের এই অবস্থা দেখে ফিক করে হাসতে নিয়েও পারল না বারিশের ওই জ্বলন্ত চাউনির জন্য। বারিশ এক ধমকে সবার মনোযোগ আবার বোর্ডের দিকে ঘুরিয়ে দিল। ​এদিকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ঝিলমিল মনে মনে বারিশের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে গুনছে আর কান ধরে ওঠবস করছে—এক, দুই, তিন…।
পাঁচ মিনিটেই কোনো রকম উঠেবসে ত্রিশবার পূরণ করে ফেলল ঝিলমিল। বলল,
_“ হয়েছে স্যার, এবার আসি?”
বারিশ হোয়াইটবোর্ড থেকে চোখ না সরিয়েই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। ​অনুমতি পেতেই ঝিলমিল দ্রুত পায়ে ক্লাসে প্রবেশ করে। কিন্তু তাড়াহুড়োর চোটে যেন আজ ওর কপালটাই খারাপ! ক্লাসের মাঝ বরাবর পৌঁছাতেই ডেস্কের একটা কোণায় পা লেগে আচমকা হোঁচট খেল সে। কিন্তু ঝিলমিল কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে একদম এক দৌড়ে শেষ বেঞ্চে ইরানের পাশের খালি সিটটায় গিয়ে বসল। বারিশ একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে ফের ক্লাসে মনোযোগী নয়।
​এদিকে বান্ধবীর এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে ইরান নিজের কপালে হাত দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

_“কবে ঠিক হবি তুই বল তো? ফার্স্ট দিনেই এই হাল!”
_​“ধ্যাত, বলিস না! গুনে গুনে দশটা অ্যালার্ম সেট করে রেখেছিলাম। অ্যালার্ম ঠিকই বেজেছে, কিন্তু আমার কুত্তা ঘুম আর ভাঙল না!” ঝিলমিল ব্যাগটা বেঞ্চে রাখতে রাখতে ফুঁসে উঠল।
_“এরপর থেকে সকাল পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে বসে থাকবি তুই।”
​ঝিলমিল সেদিকে কান না দিয়ে ক্লাসের সামনের দিকে তাকিয়ে গলার স্বর আরও নামিয়ে বলল,
_ “আচ্ছা, ওসব ছাড়। বারিশ চাচ্চু এখানে কেন ক্লাস নিচ্ছে রে?”
_​“কেন আবার? আমাদের একাদশের রেগুলার ইংরেজি স্যার তো উনিই!”
_​“কীহ! বলিস কী? সত্যিই?”
​ইরান কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ক্লাসের থমথমে পরিবেশ কাঁপিয়ে বারিশের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

_​“ক্লাসে আর একটা সাউন্ডও যদি আমি পাই, তবে যে কথা বলবে তাকে সোজা সামনে এনে পুরো পিরিয়ড কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখব!”
​কথাটা তীরের মতো এসে গায়ে লাগতেই ঝিলমিল আর ইরান ঝটপট কথা থামিয়ে দিল। ক্লাসের বাকি সবাইও একদম তটস্থ হয়ে, মেরুদণ্ড সোজা করে যার যার জায়গায় চুপচাপ বসে রইল। পুরো ক্লাসরুমে আবার পিনপতন নীরবতা। কিন্তু হুট করেই ঝিলমিলের মনে পড়ল, নিজের রোল নম্বরটাই প্রেজেন্ট করতে ভুলে গেছে! ​ঝিলমিল আর দেরি না করে একটু ইতস্তত করে বেঞ্চ ছেড়ে দাঁড়িয়ে বেশ নিচু গলায় কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
_ “স্যার, আমার প্রেজেন্টটা একটু দিয়ে দিন।”
​বারিশ উপস্থিতির খাতাটা সামনে টেনে নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে মুখ না তুলেই জিজ্ঞেস করল,
_ “নাম কী তোমার?”
​বারিশের এই প্রশ্নটা শুনে ঝিলমিল ভেতরে ভেতরে রাগে একদম ফেটে পড়ার উপক্রম হলো। নাকটা ফুলে উঠলো তার। এই লোক এত বেশি বেশি কেন করে? এমন ভাব করছে যেন কখনো দেখেইনি ঝিলমিলকে! ঝিলমিলকে চুপ করে থাকতে দেখে বারিশ এবার খাতা থেকে চোখ তুলে সরাসরি ওর দিকে তাকাল।
_“কী হলো? নাম বলো।”
​ঝিলমিল দাঁতে দাঁত চেপে, গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে জবাব দিল,
_ “জাহানারা চৌধুরী ঝিলমিল।”

সন্ধের হালকা আলো-আঁধারিতে জারিফ আর ঝিলমিল দুজনে দু’পাশের ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল।
_“ কলেজে দেখলাম না তোমায়।”
_“ বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম।”
_“ বললেও না আমাকে।”
_“ বললেই কী তুই কী সাথে যেতি?”
_“ না।”
_“ তাহলে?”
_“ আচ্ছা বাদ দাও, তোমার চাচ্চু আমাদের ওখানে চাকরি নিয়েছে কেন?”
_“ সেটা আমিও জানি না। তার যখন যেটা মন চায় সেটাই করে। কিছু বললেই বাসার সবার উপর রেগে যায়। কে জানে হয়তো আমার উপর নজর রাখতেই এসব করছে।”
_“ খুব খারাপ সে। আমাকে আজকে…”

ঝিলমিল কথা সম্পূর্ণ করার আগেই জারিফ থামিয়ে দেয়।
_“ ওয়েট ওয়েট।”
গেইট দিয়ে একটা গাড়ি ঢুকতে দেখে চোখ বড় বড় হয়ে যায় জারিফের।
_“ ওহ মাই গড! হোয়াট আ ওয়ান্ডারফুল কার!”
তাদের বাসার গেট গলে ভেতরে ঢুকছে রাজকীয় গাঢ় নীল রঙের একটা নতুন চকচকে মার্সিডিজ-বেঞ্জ এস-ক্লাস গাড়ি। হেডলাইটের তীব্র আলোয় লনের অন্ধকার কেটে যাচ্ছে। জারিফ অবিশ্বাস্য চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। লনের ঠিক মাঝখানটায় এসে গাড়িটা থামতেই অবাকের চরম সীমায় পৌছে যায় জারিফ। কারণ, চালকের আসনের দরজা খুলে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে নামছে বারিশ!
​চাচাকে এমন এক বিলাসবহুল রাজকীয় গাড়ির মালিক হিসেবে দেখে জারিফ আর ছাদে এক মুহূর্তও টিকতে পারল না। সিঁড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এলো সে। এক দৌড়ে লনে গাড়ির কাছে গিয়ে হাতটা বাড়িয়ে বলল,

_“ এটা কোথায় পেলে চাচ্চু?”
জারিফের হাত গাড়িতে স্পর্শ লাগার আগেই বারিশ ঝট করে জারিফের কব্জি চেপে ধরে ওকে থামিয়ে দিল। ​মুখে কোনো ভাবান্তর না এনে শান্ত গলায় বলল,
_ “ডোন্ট টাচ ইট. ইটস মাই কার.”
​জারিফ নিজের কব্জিটা ছাড়িয়ে নিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল,
_ “আর ইউ কিডিং মি, চাচ্চু? সিরিয়াসলি! এই গাড়ি তুমি আবার কখন কিনলে?”
বারিশ এবার পকেট থেকে মার্সিডিজের চাবিটা বের করে লক করার বোতামে আলতো চাপ দিল। গাড়িটা একটা মৃদু আওয়াজ করে লক হতেই সে জারিফের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিল। ধীরস্থিরভাবে মুখ তুলে সে তাকাল ওপাশের ছাদে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝিলমিলের দিকে। সরাসরি ঝিলমিলের চোখের দিকে তাকিয়ে একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
_​“আজকে।”
বলে সে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল।

_​“বাড়িতে গুনে গুনে তিনটে গাড়ি! তুমি আসবে বলে তোমার বাবা সেদিনও তোমার জন্য নতুন একটা গাড়ি কিনে এনেছে। সেটা রেখে চার কোটি বাহাত্তর লাখ টাকা খরচ করে কী মনে করে এই গাড়ি কিনতে গেলে তুমি?”
​বারিশের রুমে ঢুকে বেশ রাগত গলায় কথাগুলো বললেন ঝর্ণা বেগম। বারিশ কোনো জবাব না দিয়ে চুপচাপ নিজের কাজ করতে থাকায় তিনি আরও রেগে গিয়ে বললেন,
_ “উত্তর দাও, তরঙ্গ!”
​সামনে টেবিলের ওপর ল্যাপটপ খোলা বারিশের। সে ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়ে, একদম নির্বিকার ভঙ্গিতেই বলল,
_ “গতকালই তো তুমি বললে, গাড়ি কিনলে মেনে নিতে। তাই কিনেছি। এবার মেনে নাও।”
_​“ওটা আমি রাগের মাথায় মুখের কথা বলেছিলাম! আর তুমি সেটা সত্যি সত্যি…”
_​“নিজের টাকায় কিনেছি। চলে যাও এখান থেকে,” বারিশের কণ্ঠে এবার বরফশীতল কাঠিন্য।
_​“একই কথা বারবার বলবে না। গাড়ি কেনার এতই যখন শখ ছিল, এক কোটি টাকার মধ্যেও তো ভালো গাড়ি কিনতে পারতে। তাই বলে চার-চারটি কোটি টাকা উড়িয়ে দিলে? তুমি কি একটুও বদলাবে না, তরঙ্গ?”
​বারিশ এবার আর কোনো উত্তর দিল না। মায়ের কথাগুলো যেন ওর কানেই পৌঁছাল না, সে আগের মতোই তাকিয়ে রইল ল্যাপটপের স্ক্রিনে।

​_ “কালই ফেরত দিয়ে আসবে গাড়িটা। আমি কোনো কথা শুনব না।”
​বারিশ এবার ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাল।
_“যেটা একবার আমার হয়ে যায়, সেটা হাতছাড়া করার অভ্যাস আমার নেই।”
_​“আমি অতশত বুঝি না, আমি শুধু জানি…”
​ঝর্ণা বেগম কথাটি শেষও করতে পারলেন না। বারিশ হঠাৎ নিজের দুই হাত দিয়ে ল্যাপটপটা এত শক্ত করে চেপে ধরল, যেন এক মুহূর্তের মধ্যে ওটা দুমড়েমুচড়ে ভেঙে ফেলবে। ওর হাতের রগগুলো রাগে ফুলে উঠেছে। ​ছেলের এই মারমুখী নীরবতা দেখে ঝর্ণা বেগমের মুখের কথা মুখেই আটকে গেল। তিনি আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলেন না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

দীঘি আর বারিশের বিয়ের তারিখ একদম ঘনিয়ে এসেছে। আর মাত্র কিছুদিন, তারপরই ওদের চার হাত এক হবে। আজকে দীঘিকে নিয়ে কেনাকাটার জন্য শপিংমলে যাওয়ার কথা বারিশের। যাওয়ার কথা ছিল গতকালই, কিন্তু বারিশের ব্যস্ততার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি।
​এদিকে ঝিলমিলের জীবনের অবস্থা একদম তেজপাতা! কলেজে সে প্রতিদিনই লেট করে পৌঁছায় আর বারিশ তাকে প্রতিদিনই ক্লাসের সামনে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। নিয়মিত এই অপমান সহ্য করতে করতে ঝিলমিলের চামড়াও এখন গণ্ডারের মতো শক্ত হয়ে গেছে, বারিশের কড়া কড়া কথা এখন আর ওর গায়ে লাগে না। ক্লাসের অনেকেই এখন ঝিলমিল আর ইরানের ভালো বন্ধু হয়ে গেছে।
​ঝিলমিলের চুল বেঁধে দিচ্ছেন নূরজাহান বেগম। একদম মাথার তালু থেকে ফ্রেঞ্চ বেণি তুলে দিচ্ছেন তিনি। ঝিলমিলের মনটা ছটফট করছে, সে অস্থির হয়ে বলল,
_ “দাদীমা, এখনো হয়নি? ফুপি তো আমাকে রেখে চলেই যাবে!”
_​“যাবে না রে বোন, যাবে না। এই তো হয়ে গেছে, আর একটুখানি বাকি আছে,” নূরজাহান বেগম পরম মায়ায় নাতনির চুল ওলটপালট করতে করতে বললেন।
​দীঘি পুরোপুরি তৈরি হয়ে নিচে নেমে এসে ঝিলমিলকে তাগাদা দিয়ে বলল,

_ “হয়েছে তোর? কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি!”
​ঝিলমিল এবার ছটফট করে উঠে বলল,
_ “দাদীমা! ছাড়ো এবার।”
​নূরজাহান চৌধুরী আলতো করে শেষ টানটা দিয়ে চুলগুলো ছেড়ে দিলেন। বললেন,
_“শেষ। দেখি তো, কেমন লাগছে আমার সোনাটাকে?”
​ঝিলমিল ঝটপট আয়নায় নিজের মুখটা একবার দেখে নিয়ে পেছন ঘুরল। দাদীমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,
_ “ফিরে আসার পর মন ভরে দেখিও দাদীমা। আমি এখন যাই!”
​বলেই সে দীঘির হাত ধরে একরকম টেনে বাইরে বেরিয়ে গেল। দীঘি আজ একটা কালো রঙের ঢিলেঢালা প্যান্টের সাথে মানানসই লেডিস শার্ট পরেছে। আর ঝিলমিল পরেছে একদম সাধারণ একটা সুতি কুর্তির সাথে জিন্স প্যান্ট। বাইরে লনে বারিশ গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। দীঘি গিয়ে বারিশের পাশের সামনের সিটে বসল, আর ঝিলমিল গিয়ে বসল পেছনের সিটে। ​গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে বারিশ আয়নায় একটু ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের সিটের দিকে তাকায়। তারপর ফের দীঘির দিকে ফিরে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
_“ও কোথায় যাচ্ছে?”
​দীঘি সহজভাবে বলল,

_“কেন? আমাদের সাথে শপিং-এ যাচ্ছে।”
_​“কিন্তু কেন?” বারিশের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি।
​ঝিলমিল পেছনের সিট থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে এসে চওড়া একটা হাসি দিয়ে বলল,
_“জ্বালাতে যাচ্ছি আপনাদের! কেন ফুপা, কোনো সমস্যা?”
​বারিশ পেছন ঘুরে ঝিলমিলের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন পারলে এখনই ওকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
_“না।”
_​“তাহলে আর দেরি না করে গাড়ি স্টার্ট করুন!” বেশ হুকুম দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল কিশরী।
​এদিকে ঝিলমিলের মুখে ফুপা ডাক শুনে দীঘি চোখ পাকিয়ে ওর দিকে তাকাল। এখনো বিয়েই হলো না, আর এর মধ্যেই ফুপা ডাকা শুরু! তবে ঝিলমেল সেসব চোখের ইশারাকে পাত্তা না দিয়ে দীঘির দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ফুপি, শোনো।”
_​“বল, কী বলবি?”
_​“বিয়ের পর তোমার এই হাজবেন্ডকে বলবে মানুষের সাথে ব্যবহারটা যেন একটু ভালো করে।”
​দীঘি ফিসফিসিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
_ “তুই কি একটু চুপ থাকবি, ঝিলমিল?”
_​“থাকব, তবে একটা শর্তে।”
_​“কী শর্ত?”

​_“শপিংমলে গিয়ে তুমি নিজের জন্য যা যা কিনবে, আমাকেও ঠিক সেই জিনিসগুলো কিনে দিতে হবে।”
_“আচ্ছা বাবা আচ্ছা, তোকে সব কিনে দেব। তুই দয়া করে এখন চুপ থাক।”
_​“ওকে, ডান!” ঝিলমিল মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকার ভঙ্গি করল।
​বারিশ গাড়ি চালাতে চালাতে লুকিং মিররে বারবার পেছনের সিটে বসা ঝিলমিলকে দেখছিল আর ভেতরে ভেতরে রাগ সামলাতে দাঁত কামড়াচ্ছিল। শপিংমলে পৌঁছানো মাত্রই বারিশকে পেছনে ফেলে দীঘিকে নিয়ে আগে আগে ছুটল ঝিলমিল। সে যতগুলো দোকানে ঢুকছে, সবগুলোতে একদম হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিচ্ছে। কাপড়চোপড় টেনে টুনে সেলসম্যানদের অস্থির করে তুলছে।
​বারিশ তার জীবনে কোনোদিন মেয়েদের সাথে কেনাকাটা করতে আসেনি। আজকে এসে যে সে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছে, তা প্রতি মুহূর্তে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বারিশের কেনাকাটায় আগ্রহ নেই কোনো। দীঘির তো আরও ইচ্ছে নেই। তার মনের ভেতর, চোখের সামনে বারবার শুধু তাহসিনের মুখটা ভেসে উঠছে। তবুও এই ছটফটে ঝিলমিলটার জোরাজুরিতে ওর পছন্দ মতোই দীঘি একে একে সবকিছু কিনে নিল।
​বিয়ের কেনাকাটা তো আর একটা-দুটো নয়, প্রচুর জিনিসপত্র। দেখতে দেখতে সারাদিন গড়িয়ে সন্ধে নেমে এলো। কেনাকাটা প্রায় শেষ করে দীঘি একটু ওয়াশরুমের দিকে গেল। শপিংমলের একটা নিরিবিলি করিডোরে বারিশ আর ঝিলমিল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। বারিশের দু’হাত ভর্তি দামি দামি ব্র্যান্ডের শপিং ব্যাগ। ​ঝিলমিল হঠাৎ বারিশের হাতের একটা বিশেষ ব্যাগের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল গলায় বলে উঠল,

_ “আপনার বিয়ের শেরওয়ানিটা কিন্তু অনেক সুন্দর হয়েছে ফুপা! ওটা আমিই পছন্দ করে দিয়েছি। দেখবেন, বিয়ের দিন আপনাকে অনেক সুন্দর লাগবে।”
​ঝিলমিলের কথা শেষ হওয়া মাত্রই বারিশ আর নিজেকে সামলাতে না পেরে, শপিং ব্যাগ সমেত বিদ্যুৎ গতিতে এক পা এগিয়ে এসে নিজের শরীর দ্বারা ঝিলমিলকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
​চোখ দুটো রাগে রক্তিম হয়ে গেছে। সে ঝিলমিলের একদম মুখের কাছে নিজের মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল,
_“কীসের ফুপা হ্যাঁ? বিয়ে হয়েছে আমাদের এখনো? শোনো যাওয়ার পথে যদি আর একটা শব্দও তোমার এই মুখ দিয়ে বের হয়েছে, তবে দোকান থেকে সুপার গ্লু কিনে এনে তোমার ঠোঁটে লাগিয়ে দেব! বলো, আরও কথা বলবে?”

​বারিশের এই আচমকা আক্রমণ আর বাঘের মতো চাউনি দেখে ঝিলমিলের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠে। সে ভয়ে চোখ বড় বড় করে দু’পাশে জোরে জোরে মাথা নাড়ল। না, সে আর একটা কথাও বলবে না!
বারিশের দেওয়া হুমকির পর ঝিলমিল মুখে কুলুপ আঁটল ঠিকই, কিন্তু নিজের স্বভাব তো আর পুরোপুরি বদলে ফেলা যায় না! বারিশের গাড়িটাকে বানিয়ে দিলো সে চলন্ত রেস্তোরাঁ।
দীঘি ফিরে আসতেই ঝিলমিল চুপচাপ গিয়ে পেছনের সিটে বসে। ​তবে মুখ বন্ধ রাখলেও পেটের ক্ষুধা তো আর বন্ধ রাখা যায় না! এই রাবিশ স্যার সারাদিনে এক বোতল পানি পর্যন্ত খাওয়ায়নি ওদের। শপিংমলের ভেতর অত ছোটাছুটি করার পর ঝিলমিলের বেশ ভালো রকম খিদে পেয়েছে।
গাড়ি কিছুদূর এগোতেই রাস্তার পাশে একটা ফুডকোর্ট দেখে ঝিলমিল আর লোভ সামলাতে পারল না। সে দীঘির পিঠে আলতো টোকা দিয়ে হাত দিয়ে ইশারা করল ফুডকোর্টের দিকে। মুখে কিছু বলল না, শুধু দুই ঠোঁট চেপে ধরে পেটে হাত দিয়ে ক্ষুধার্ত একটা মুখভঙ্গি করল। ​দীঘি ওর ইশারা বুঝতে পেরে বারিশের দিকে তাকিয়ে বলল,

_“বারিশ, গাড়িটা একটু থামাও তো। ঝিলমিলের বোধহয় খিদে পেয়েছে, কিছু একটা কিনবে।”
​বারিশ লুকিং মিররে সপ্তদশীর দিকে তাকাতেই দেখল সে একদম নিরীহ মুখে বসে আছে। সে নিঃশব্দে গাড়িটা চাপাল রাস্তার পাশে। ঝিলমিল ঝটপট গাড়ি থেকে নেমে ফুচকা আর আইসক্রিম কিনে বেশ খুশি মনে গাড়িতে ফিরে এলো। গাড়ির ভেতর বসেই সে আয়েশ করে ফুচকা খাওয়া শুরু করে। দামি লেদার সিটের ওপর টক পানি গুলো পড়ছে সেদিকে মেয়েটার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। গাড়ি আবারও নিজ গন্তব্যে চলছে। ফুচকা শেষ হতে না হতেই ঝিলমিলের নজর পড়ল রাস্তার ওপারের একটা কফি শপের দিকে।
পূনরায় ঝিলমিল খামচে ধরল দীঘির হাত। এবারও মুখে কোনো রা নেই, শুধু জানালার বাইরে কফি শপের সাইনবোর্ডের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে রইল। ​দীঘি আবার বলল,

_ “বারিশ, গাড়িটা আরেকবার থামাও। ও একটু কফি খাবে।”
​দাঁতে দাঁত চেপে গাড়ি সাইড করে বারিশ। ঝিলমিল এবার গাড়ি থেকে নেমে বড় এক মগ কোল্ড কফি আর সাথে দুটো বড় চিজ বার্গার নিয়ে গাড়িতে উঠল।
বার্গারের চিজ আর সস তার আঙুল বেয়ে মার্সিডিজের সিটের ওপর পড়ছে। এবারও কোনো দিক না তাকিয়ে খেতে লাগল মেয়েটা। বারিশ তখন আয়নায় ওর দিকে এমনভাবে তাকাল যেন পারলে এখনই ওকে গাড়ি থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।

গাড়ি আবারও স্টার্ট করেছে বারিশ। এবার অন্তত সোজা বাড়ি পৌঁছানো যাবে। কিন্তু বারিশের সেই স্বস্তি টিকল না বেশিক্ষন। গাড়ি যখন তাদের এলাকার কাছাকাছি চলে এসেছে, ঠিক তখনই ঝিলমিলের চোখ আটকাল রাস্তার ধারের একটা চটপটির দোকানের দিকে। ওর মনটা কেমন যেন চটপটির জন্য আনচান করে উঠল। এটা সে পার্সেল করে নিয়ে যাবে। ঘুমানোর আগে খেয়ে ঘুমোবে।
​ঝিলমিল এবার দীঘির কাঁধে বারবার মৃদু ধাক্কা দিয়ে জানালার বাইরে চটপটির দোকানটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মুখে কোনো কথা না বলে, শুধু চোখ দুটো দিয়ে আকুল এক মিনতি ফুটিয়ে তুলল সে।
​দীঘি পেছনের দিকে ঘুরে শাশানোর মতো করে তাকাল। ঝিলমিল ইশারায় বোঝালো এবারই শেষ। তপ্ত শ্বাস ফেলে দীঘি বারিশের দিকে ফিরে বেশ নরম গলায় বলল,

_“ বারিশ, আর একটা বার গাড়িটা একটু সাইড করো। ও চটপটি নেবে।”
​স্টিয়ারিং ধরা হাত দুটো শক্ত হয়ে গেল বারিশের। বুকের ভেতর রাগের অগ্নিকুণ্ড যেন দাউদাউ করে জ্বলছে। চার কোটি বাহাত্তর লাখ টাকার একটা ব্র্যান্ড নিউ মার্সিডিজ গাড়িকে এই মেয়েটা গত এক ঘণ্টায় চলন্ত সস্তা হোটেল বানিয়ে ছেড়েছে! লুকিং মিররে সে ঝিলমিলের দিকে এমন এক জোড়া অগ্নিদৃষ্টি ছুড়ল, যেন সেই চোখ দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া সম্ভব।
​চরম রাগ মনের ভেতর চেপে বারিশ ঝটকা মেরে ব্রেক কষে গাড়িটা রাস্তার পাশে থামায়। ঝিলমিল দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে চলে গেল চটপটি পার্সেল করতে। আর বারিশ স্টিয়ারিংয়ের ওপর দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে মনে মনে বলে,

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ৮

_ ‘এই মেয়ে মানুষ নয়, এই মেয়ে একটা আপদ! আই উইস, এর মুখটা যদি সত্যিই আমি সুপার গ্লু দিয়ে আজীবনের জন্য আটকে দিতে পারতাম!’
দীঘি আর ঝিলমিলকে ওদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজের বাড়ির লনে এসে যখন বারিশ গাড়িটা থামাল, তখন রাত বেশ গভীর। পেছনের দরজা খুলে ব্যাগ গুলো নেওয়ার সময় দেখল সিটের মধ্যে সস, টক পানি লেগে আছে। সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। কয়েক সেকেন্ড ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর, বারিশ একটা ভারী শ্বাস টানে। তারপর ড্যাশবোর্ড থেকে টিস্যু বক্সটা টেনে নিয়ে কয়েকটা টিস্যু ছিঁড়ে বের করে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে সে সিটের ওপর পড়ে একে একে সস আর টক পানির দাগগুলো ঘষে ঘষে মুছে ফেলে।

শুকনো পাতার নূপুর পায়ে পর্ব ১০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here