Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩০

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩০

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩০
সুরভী আক্তার

বাগানে একপাশে দাঁড়িয়ে অংকুর । বুকে হাত গুটিয়ে অদূরে চেয়ে । পিছু নিঃশব্দে দাঁড়ালো সংগ্রাম । গলা খাঁকারি দিয়ে জানান দিলো নিজের উপস্থিতি সম্পর্কে । ফিরলো না অংকুর । সংগ্রাম পাশে দাঁড়ালো ওর । খানিক চুপ থেকে শুধালো…
” কি হলো ?
অংকুরের পাল্টা প্রশ্ন…
” বিয়ে কবে দিতে পারবেন ?
” কবে করতে চাও ?
” আগামী পরশু । মাকে নিয়ে আসবো ।
” এসো । এসে নিয়ে যেও নিজের বেগম কে ।
” ওর আম্মা আর ভাইজান ?
” তাদের ধার ধারি না আমি !
” তাহলে পরশু আসবো ?
” আজ বললে আজই দিতাম !
” আজ নয়‌, দুটো দিন সময় দিন সুরবালা কে । দুদিন পর আবার আসবো আমি । বাড়িতে সব সামলানোর দায়িত্ব আপনার ! আর আপাতত সুরাবালা কেও…

” আমি বললে বাড়িতে কারোর কোনো আপত্তি থাকবে না । নিশ্চিন্তে থাকো তুমি ।
তপ্ত শ্বাস ফেললো অংকুর । চোখ তুলে একবার তাকালো সুরবালার ঘরের বারান্দার দিকে । আগে মেয়েটাকে ও দু একবার আনমনা অবস্থায় দেখেছিল বারান্দায় । একটু হাসলো ছেলেটা । সেদিকটায় চেয়েই বললো…
” লাল শাড়িতে ওকে বউ সাজিয়ে রাখবেন কিন্তু । বিয়ে করবো , বউকে বউ রুপে না দেখলে ভালো লাগবে না ।
সন্ধ্যার অন্ধকার চারদিকে । সংগ্রামের চাদর গুলো ভাঁজ করে রাখছিল শ্যামা । সংগ্রাম ঘরে ঢুকে ওকে দেখে মুচকি হাসলো । এগোতে এগোতে ডাকলো…

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” বেগম..?
চকিতে ফিরলো শ্যামা । সংগ্রাম কে দেখেই হাসলো একগাল । উত্তর করলো…
” জ্বি…
” একটা খুশির সংবাদ দেই ?
” কি সংবাদ ?
সংগ্রাম বসলো । পা তুলে হেলান দিয়ে আধশোয়া হলো । শ্যামা তড়িঘড়ি করে চাদর গুলো বড় আলমারিতে তুলে রেখে আসলো । উৎসুক হয়ে তাকালো সংগ্রামের দিকে । সংগ্রাম কিছু বলছে না দেখে কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে শুধালো…

” কি হলো , বলুন ?
সংগ্রাম তার বেগমের হাতটা টেনে তাকে বসালো নিজের পাশে । বললো…
” অংকুর কে দেখেছো ?
কপাল কুঁচকে না বোধক মাথা নাড়ালো শ্যামা । অংকুর কে বুঝলো না । শ্যামার অবুঝ ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি দেখে বললো সংগ্রাম…
” শহর থেকে যারা এসেছিলো ‌, মনে নেই ? ওদের মাঝেই একজনের নাম অংকুর । ঐ ঝাঁকড়া চুল ওয়ালা ছেলে টা , দেখো নি ?
” আমি কি করে দেখবো ?
” তহুরা কে দেখলে কি করে ?
” ওকে আপনার সাথে দেখেছিলাম … তাই ভালো ভাবে নজর বুলিয়ে ছিলাম ওর দিকে । আর তেমন কাউকে দেখি নি । দেখলেও লক্ষ্য করি নি তেমন ভাবে…

” আচ্ছা দেখতে হবে না কাউকে । আমাকে দেখলেই হবে শুধু !
তুমি শোনো , বালার বিয়ে ঠিক করেছি আমি !
ঝট করে অক্ষি যুগল‌‌‌ বৃহৎ করলো শ্যামা । ওর সন্দেহ বুঝে সংগ্রাম মাথা নাড়ালো উপর নিচ । বললো আবার…
” অংকুর ছেলে টা মন্দ নয় । ওর চোখে অন্য কিছু দেখেছি আমি । যা তোমার প্রতি আমার চোখে আছে , তা বালার প্রতি ওর চোখেও দেখেছি আমি । বালা ওর কাছেই সুখি হবে আমি নিশ্চিত । দুদিন পর আসবে ও , ওর মাকে নিয়ে । পরিবারে মা ছাড়া কেউ নেই ।
এসে বালা কে নিয়ে যাবে একেবারে… আমি আর সময় পার করতে চাচ্ছি না ।
শ্যামা কিয়ৎকাল থমকে রইলো । শুধালো নরম কন্ঠে…

” বালা , ,, রাজি ?
” রাজি না হলেও এটাই ওকে মানতে হবে ।
” জোর করবেন ওকে ?
” ওকে জোর করতে হবে না আমায় , ও আমার কথার অবাধ্য হবে না জানি ।
” আপনার কথার বাধ্য হতে গিয়ে নিজের মনের অবাধ্য হতে হবে ওকে ! এটা কি ঠিক হবে ?
সংগ্রাম বুঝলো শ্যামার অধিক চিন্তার কারণ । আধশোয়া অবস্থায় ও শ্যামা কে টেনে আনলো নিজের কাছে । শ্যামা কে জড়ালো পিছন থেকে । শ্যামার পিঠ ঠেকেছে সংগ্রামের বুকে । ঘাড় ঘুরিয়ে চিন্তিত মুখে তাকালো শ্যামা । দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সংগ্রাম । বললো মুহুর্ত কয়েক বাদ…

” অংকুর ওর জন্য একেবারে উপযুক্ত । বালা কে কেউ সামলাতে পারলে অংকুরই পারবে । ধীরে ধীরে বালা অভ্যস্ত হয়ে যাবে । একদিন না একদিন তো কারোর হাতে তুলে দিতেই হতো ওকে । অনেক তো সময় পেরোলো , জীবন থেকে বেশি সময় নষ্ট করতে নেই । যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের ভালোবাসার , ভালো থাকার গন্তব্য খুঁজে নিতে হয় । বালা পারলো না নিজে খুঁজে নিতে , তবে ওকে খুঁজে নিয়েছে একজন । আমি না ওদের মিল করানোর বাহক হলাম ।
শ্যামা এই নিয়ে কথা বাড়ালো না আর । কেনো যেনো ইচ্ছে জাগলো না কথা বাড়ানোর । তবে একই প্রসঙ্গে বললো ও…
” ফুফু আম্মা আর ভাইজান ?

সংগ্রামের মুখো ভঙ্গিমায় পরিবর্তন আসলো খানিক । আজ চৌদ্দ দিন জুনাইদ আল লতিফা জমিদার বাড়িতে নেই । শ্যামা বাদে বাড়ির সবাই জানে ওরা কোথায় । শ্যামা অনেক বার জিজ্ঞেস করেছে সংগ্রাম কে ওদের বিষয়ে , বরাবরই এড়িয়ে গেছে সংগ্রাম । কথার প্রসঙ্গ পাল্টেছে বারবার । হাসপাতাল থেকে আসার পর সেই রাত টুকুতেই এক পলক ওদের দেখেছিল শ্যামা । তাদের হাবভাব একই । হাবভাবে অনীহা বালার প্রতি । যাতে প্রচন্ড বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল শ্যামার মাঝে । নিজের মা এমন ও হতে পারে ? এতোটা নির্দয় ? সামান্য কারণে এতো কিছু ?
এবারো সংগ্রাম এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো শ্যামার কথা । জুনাইদ আর লতিফার কথা শুনলে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে ওর । ও কথা কাটালো । শ্যামা কে শক্ত করে জড়িয়ে ঘাড়ে নাক ঘষে শীতল হাস্কি কন্ঠে বলল….

” আমি তো একটা খুশির খবর দিলাম তোমায় ? তুমি কবে দিচ্ছো ?
শ্যামা বুঝলো না । লতিফা আর জুনাইদের প্রসঙ্গ মাথা থেকে বেরিয়েছে মুহুর্তেই । ও ভ্রু জোড়া কুঁচকে সন্দিহান হয়ে শুধালো….
” আমি কি খবর দেবো ?
হাসলো সংগ্রাম । বরাবরেই ন্যায় হাসি তার । সে তার অবুঝ বেগমের নাকের ডগায় আলতো টোকা মারলো ।
” আপনি এতো অবুঝ কেনো, বেগম ? একটু বুঝদার হলে কি এমন ক্ষতি হয়ে যেতো শুনি ?
” বোঝানোর জন্য তো আপনি আছেন, বুঝিয়ে দিন !
সংগ্রাম তার বেগমের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে খুব কাছ থেকে চোখে চোখ রাখলো । বললো হিম শীতল কন্ঠে…

” তাকে কবে উপহার দেবেন আমায় ? তার বাবা যে তার জন্য অধীর আগ্রহ হারিয়ে ব্যাকুল হয়ে যাচ্ছে…! আমি জানি সময় প্রয়োজন , কিন্তু খুশির সংবাদ টা তো পেতে পারি,তাই না ? এসেছে সে … আমার সুফিয়ানা ?
শ্যামা লাজুক ভঙ্গিতে চোখ নামালো । থতমত খেলো খানিক । শ্যামলা মুখখানা রাঙা হয়ে আসছে লাজুক আভায় । চিকচিক করছে নাকের ডগা । সংগ্রামের তীর্যক দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাইলো ও । এই সম্মুখে এই মুহূর্তে থাকাটা দায় ! শ্যামা ছাড়াতে চাইলো নিজেকে । পারলো না । উল্টে আরো শক্ত করে জড়িয়ে গেলো সংগ্রামের বাঁধনে । সংগ্রাম ব্যাকুল হয়ে শুধালো….

” লজ্জাবতী ডালিয়া আমার…
এতোটা লজ্জা পাবেন না । বলুন না… কবে আসবে সে ?
” জানি না ,, ছাড়ুন তো আমায় !
কোনো রকমে মুখ দিয়ে দুটো বাক্য উচ্চারণ করলো শ্যামা । ইচ্ছে করছে মাটিতে মিশে যেতে । সংগ্রাম ছাড়লো না তবুও ।
” জানেন না তো কে জানে ?
” সে কবে আসবে না আসবে আমি কি করে জানবো ?
” ও আচ্ছা ..
তাহলে আমি বরং তাকেই জিজ্ঞেস করে নেই , কবে আসবে সে !
কথা শেষ করে ঝট করে ছাড়লো শ্যামা কে । হাঁফ ছাড়ল শ্যামা । পুরোপুরি দম ফেলার আগেই সংগ্রাম একটানে নিজের দিকে ঘোরালো ওকে । শ্যামার উদরের কাছে অগ্রসর হয়ে কান পাতলো সেখানে । শ্যামা তাজ্জব । বড় বড় চোখে চেয়ে আছে ও । সংগ্রাম কন্ঠ অধিক নরম করলো , একেবারে ক্ষিন স্বরে শ্যামার উদরে দু’টো টোকা মেরে ডাকলো…

” কেউ আছেন এখানে ? শুনতে পারছেন আমায় ? আমার বেগমের মাঝে কি কারোর অস্তিত্ব আছে ? কেউ এসেছেন তার উদরে ? যদি কেউ থেকে থাকেন তাহলে নিজের উপস্থিতি সম্পর্কে খুব তাড়াতাড়ি বার্তা পাঠান দয়া করে । নিজের আবির্ভাবের লক্ষন দিন আমার বেগম কে । আপনি যে এসেছেন , এটার যেকোনো একটা প্রতিক্রিয়া তো দেখান । নয়তো বুঝবো কি করে ? আপনার জন্য যে আপনার বাবা ব্যাকুল হয়ে যাচ্ছে , ধৈর্য নেই তার । আপনার মুখে বাবা ডাক শুনতে ইচ্ছে জাগছে ভীষণ । ইচ্ছে জাগছে আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে । তাড়াতাড়ি আসুন…
আপনার আবার আসতে তো দশটা মাস সময় লাগবে । আপাতত অন্তত নিজের উপস্থিতি জানান দিন ।
শ্যামা হাসলো ফিক করে । কিসব বলছে এই লোকটা ? সংগ্রাম চোখ তুলে শ্যামার হাসি টুকু দেখলো । বললো…

” আমায় তো কেউ কিছু বললো না বেগম । দেখুন হয়তো এবার আপনাকে তার আগমনী বার্তা পাঠাবে । আর একটু অপেক্ষা করি , কি বলেন ?
শ্যামা মাথা নাড়ালো দুদিকে । কথা শেষ করে ভ্রু নাচালো সংগ্রাম । হাসলো ঠোঁট কামড়ে । শ্যামা ওর চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে নাক টেনে বললো…
” আপনি না একটা পাগল ছোট জমিদার সাহেব । এমন কে করে …?
” আমি করি ,, যেটা কেউ করে না , সেটাই আমি করি বেগম !

সকাল সকাল আজ লতিফার সাক্ষাৎ । তাও শ্যামার সাথে । সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় শ্যামা মুখোমুখি লতিফার । লতিফা এক পলক চেয়েছে শুধু । শ্যামা কে দেখে তাচ্ছিল্যের সহিত চোখ সরিয়েছেন অবিলম্বে । মুখখানা ভার তার । চরম বিভ্রান্তি স্পষ্ট । শ্যামা কে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি উঠতে গেলে ডাকলো শ্যামা…
” ফুফু আম্মা !
কেমন আছেন ?
তড়িতে চোখ মুখ টাটিয়ে চাইলো লতিফা । ঝাঁজালো দৃষ্টি তার । দাঁত পিষলো কটমট করে ।

” দেখতেই তো পারছিস কেমন আছি । আবার আদিখ্যেতা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছিস ?
” কোথায় ছিলেন এতদিন ? দেখিনি তো , তাই জিজ্ঞেস করলাম ?
লতিফা যেন জ্বলে উঠলো আরো বেশি । যে এক ধাপ সিঁড়ি উঠেছিল, সেই ধাপ নামলো । শ্যামার সম্মুখে দাঁড়িয়ে চোখ কুঁচকে তেঁতে উঠল….
” কোথায় ছিলাম জানিস না ? ঢং করিস ? ভালো সাজতে এসেছিস এখানে ! পাগলামো ছেড়ে নাটক শিখেছিস ! শুনিস নি তোর ক্ষ্যাপাটে সংগ্রামের কাছে কোথায় পাঠিয়েছিল আমাদের ? বশ করেছিস তো ওকে , কালো চেহারার যৌবন – জৌলুসে মত্ত করেছিস নিজের প্রতি…
শ্যামা কপাল কুঁচকালো । লতিফার কথা একটুও বোধগম্য হলো না । বরং ঘৃনা মাখা বিরক্তি লাগলো কটাক্ষের স্বরে । নরম কন্ঠ শক্ত করলো শ্যামা …স্পর্ধা দেখালো একটু…

” মুখের ভাষা ঠিক করুন ফুফু আম্মা । আপনার সাথে এসব ভাষা মানায় না । ঘৃণিত লাগে শুনতে !
লতিফা কটমট করে আরো কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই চোখ পড়লো উপরে । পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে নিচে নামছে সংগ্রাম । পেছালো লতিফা । ধাতস্থ করলো নিজেকে । স্বাভাবিক করলো মুখো ভঙ্গিমা । সংগ্রাম ওদের কাছে আসতেই চোখ তুলে তাকালো শ্যামা । শ্যামার দিক থেকে চোখ সরিয়ে লতিফার দিকে তাকালো সংগ্রাম । বললো একটু ব্যাঙ্গ করে স্বাভাবিক কন্ঠে…
” এসেছেন ফুফু আম্মা । আপনার অপেক্ষাতেই ছিলাম । তা ছেলে কোথায় আপনার ? অনেক দিন ধরে দেখিনি প্রাণ প্রিয় ভাইকে । দেখতাম চেহারা খানা একটু ।
আরো দরকার আছে অনেক । এখন এতো কথা না বলি । ঝড় ঝাপটা পেরিয়ে পথ খেটে এসেছেন , একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচে নামুন । ছেলেকেও নামাবেন । নিজের কৃতকর্মের জন্য এতো লজ্জা পেলে চলবে না , বলে দেবেন ছেলেকে ।
যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব নিচে নামুন , কথা আছে । দ্বিতীয় বার যেন ডাকতে না হয় ।
শেষের বাক্য দুটো শক্ত শোনালো । সংগ্রাম লতিফার থেকে মুখ ফিরিয়ে শ্যামার হাত ধরে বললো…

” চলো বেগম…
নিচে নামলো শ্যামা কে নিয়ে । তা দেখে মুখ ঝামটালো লতিফা । বিড়বিড় করতে করতে উঠলো সিঁড়ি বেয়ে ।
খানিক বাদ নিচে বাড়ির সবার উপস্থিতি । বালা আর শ্যামা নেই । অবশেষে বালা কে সাথে করে নিচে নামলো শ্যামা । বালা নতজানু । চোখ মুখ মলিন , শুকনো । কারোর দিকে তাকালো না ও । ওরা দাঁড়াতেই আদেশ ছুঁড়ল সংগ্রাম…
” বালা ,, বস…
শ্যামা বসালো ওকে । মুখোমুখি সংগ্রাম । সে এবার সোজাসুজি কথা তুললো…
” আগামী কাল বালার বিয়ে ! ছোট্ট পরিসরে ঘরোয়া ভাবে বিয়ে হবে । প্রস্তুতি নাও সবাই..
সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল । সবার ধারালো দৃষ্টি একই সাথে নিক্ষেপিত হলো সংগ্রামের দিকে । লতিফা আর জুনাইদের মাঝে বোধহয় কথাটা বেশি প্রভাব ফেলতে পারলো না । বালা টাও চাইলো রয়ে সয়ে । হাসি আছে ঠোঁটের কোণে । আর চোখের কোণে জল চিকচিক ।
লতিফ জোয়ার্দার গলা পরিষ্কার করে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন…

” কি বলছো সংগ্রাম ? বিয়ে মানে ? হঠাৎ …
” হঠাৎই । সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি … আর পাল্টাতে চাই না ! পাত্র যোগ্য , আর পরিচিত ও । আপনি চেনেন তাকে !
” কে সে ? কার কথা বলছিস ?
সালেহার উদ্বিগ্ন প্রশ্ন । সংগ্রাম তাকালো তার দিকে । বললো…
” অংকুর । শহর থেকে যারা এসেছিলো , তাদের মধ্যে একজন ।
কথাটা শুনে বালার চাহনি কাতর হয়ে আসলো আরো । চোখ ভরে উঠলো । দৃষ্টি সরালো মেয়েটা । চোখে পলক পড়তেই পানি গড়ালো টপ করে । রুদ্ধ হয়ে আসা শ্বাস টানলো ।
লতিফ জোয়ার্দার বালা কে একপলক দেখে শুধালেন…

” ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছো তো ?
” কোনো সিদ্ধান্ত না ভেবে নেই নি কখনো । বালার ক্ষেত্রে আরো বেশি ভেবেছি নিশ্চয়ই !
অনেক কথা হলো পরিবারের মাঝে । বালা কে একটা বারও শুধালো না কেউ । কোনো বিষয়েই না । ওর মতামত জানতেও চাইলো না । তাহলে কেনো ডাকলো ওকে নিচে , কেনো নিয়ে আসলো ? বালা বসা থেকে উঠলো তড়িতে । সিঁড়ি বেয়ে ছুটে গেলো নিজের ঘরে । সংগ্রাম ওর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে কথা শেষ করে উঠলো । শ্যামা কে চোখের ইশারায় কিছু বুঝিয়ে পিছু পিছু উঠলো বালার । ঘরে গিয়ে ফোপানোর শব্দ শুনলো মেয়েটার । বারান্দা থেকে আসছে । সংগ্রাম নিঃশব্দে বারান্দায় গিয়ে পেছনে দাঁড়ালো বালার । নীরবে থেকে কিছুক্ষণ কাঁদতে দিলো ওকে । কিছু সময় বাদ ডাকলো…

” বালা ?
তড়িঘড়ি করে কান্না চাপলো মেয়েটা । গিলে ফেলল সব তিক্ত কষ্ট । দুহাতে চোখ মুছে পিছু ফিরলো । মুচকি হাসলো সংগ্রাম কে দেখে । ডাগর চোখের পাপড়ি যুগল ভিজে জবজবে । ফর্সা গাল বেয়ে পানি গড়ানোর চিহ্ন স্পষ্ট । সংগ্রাম এগিয়ে বললো….
” আমাকে বিশ্বাস করিস ?
” অবিশ্বাস করি নি কখনো ! আপনার প্রতি বিশ্বাসের মাত্রা অনেক বেশি সংগ্রাম ভাই ।
” তাহলে কাঁদছিস কেনো ? আমি তোর খারাপ চাই না নিশ্চয়ই ?
” ….
বালা নীরব । সংগ্রামের দৃষ্টিতে দৃষ্টি ওর । আজ আর চোখ সরাচ্ছে না মেয়েটা । সংগ্রাম থেমে বললো…
” তোর সুখের ঠিকানা না হতে পারলেও সুখের ঠিকানা খুঁজে দিলাম আমি । সুখে সুখি হওয়া তোর হাতে । অংকুর তোকে পারবে সুখি করতে , যদি তুই সুখ মেনে নিস তবেই । সারা জীবন তো আর চলবে না এভাবে বল ? কাউকে না কাউকে তো স্থান দিতেই হবে জীবনে ! যে তোকে চায় , তাকে স্থান টা দিলে খারাপ কিসে বল ? জীবনে স্থান পেলে মনে স্থান করে নিতে সময় লাগে না । অংকুর পারবে তোর মনে স্থান করে নিতে । একবার শুধু জীবনে স্থান দিয়ে দেখ..! আমার কথা শুনে দেখ ! শুনবি না আমার কথা ?

” আপনি বললে অনলেও ঝাপাতে প্রস্তুত আমি । এটা আর এমন কি ! আমি তো রাজি বিয়েতে । একবারও তো অবাধ্য হোই নি আপনার সিদ্ধান্তে …
” অনলে ঝাপাতে হবে না তোকে । অংকুরের জন্য বউ সাজলেই হবে । ও যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেছে , ফিরে এসে যেন ও তোকে লাল টুকটুকে শাড়ি পরিহিত অবস্থায় নিজের বেগম হিসেবে দেখতে পায় । বউ সাজবি ওর জন্য ?
বালা চোখ সরিয়ে পিছু ফিরে তাকালো । আফসোস লাগলো ভীষণ । সংগ্রাম ওকে বুঝলো না কোনো দিন ! মেয়েটা অবলিলায় সয়ে গেছে সবকিছু , এখন ও সইবে । চোখ বুজলো বালা । শ্বাস ফেললো দীর্ঘ ।
দিন গড়িয়ে রাতটা কাটলো খুব তাড়াতাড়ি । তবে বালার কাছে ছিল নির্ঘুম আর দীর্ঘ । এমন কত শত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে এই কদিনে ।

জমিদার বাড়ি সবসময় আলোক সজ্জায় সজ্জিত । আজ আরো মুখোরিত হলো । ফুলে ফুলে সাজানো হলো পুরো বাড়ি । জমিদার বাড়ির অনুষ্ঠান বলে কথা , ছোট কি করে হয় ? তবে গ্রামে কথা বের হয় নি । বাড়িতেই সবার মাঝে আছে । বাইরের কেউ জানে না এই বিষয়ে । বিকেলের দিকে আসবে অংকুর , তার মাকে নিয়ে ।
বিকেলের আগে সাজানো হয়েছে বালা কে । লাল টকটকে গাঢ় বিয়ের শাড়ি ফর্সা শরীরে ঝকঝক করে ফুটে উঠেছে । চিকচিকে সোনার গহনা গায়ে ভর্তি । হাতে মোটা সোনার বালা । এগুলো সালেহার ,, খানিক আগে সালেহা পড়িয়ে দিয়ে গেলেন ওকে । পড়িয়েই চলে গেছেন , দাঁড়ান নি । নিজেকে আড়াল করে আড়াল করেছেন চাপা কান্না ।
মেয়েটা তার নিজের না হয়েও নিজের ছিলো । সংগ্রাম কান্ড না ঘটালে নিজের করেই রাখতেন সারাজীবন ।

বালার ডাগর চোখ জোড়ায় মোটা করে কাজল টানা । কপালে একখানা লাল টিপ । ঠোঁটে গাঢ় ঠোঁট রঞ্জন । মাঝ বরাবর সিঁথি করে কোমর ছড়ানো চুল আজ খোঁপায় বন্দী । খোঁপাতে গেঁথে রাখা কাঁচা ফুলের মালা । লাল টকটকে ওড়না মাথায় । হালকা সাজ , তবে অসাধারণ । সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে বালার । এক ঝলকেই চোখ ঝলসাবে । বালা অপরুপ , আরো অপরুপা করে সাজানো হয়েছে আজ । সাজিয়েছে শবনম আর শ্যামা । সবশেষে শেষে বালার দিকে কিছু টা মুহূর্ত হাঁ বনে তাকিয়ে রইল দুজনে । বিমূক হয়ে চাওয়া চাওয়ি করলো একে অপরের দিকে । কি সুন্দর লাগছে সুরবালা কে ! কনে কনে আভা মুখশ্রীতে । চোখ দুটো নামানো ওর ।
শবনম চিবুক ধরে মুখখানি উপরে তুললো বালার । মুগ্ধ নয়নে চেয়ে বিস্মিত স্বরে বলল….
” বাহ্,বালা তোমাকে তো খুব সুন্দর লাগছে । একদম লাল টুকটুকে পরী লাগছে । তাই না শ্যামা !
তাল মেলালো শ্যামা ও । একই স্বরে বলল….

” সত্যি বালা । অনেক সুন্দর লাগছে তোমায় ‌। কেউ একবার তাকালে চোখ সরাতেই পারবে না ।
বালা হাসলো কৃত্রিম । হাসিতে উচ্ছাস নেই । বিকেল গড়াচ্ছে । অংকুর আসে নি এখনো । অংকুরের সাথে কাল থেকে না হলেও শতবার কথা হয়েছে সংগ্রামের । বাড়িতে নতুন টেলিফোন এসেছে । হাসপাতাল থেকে ফেরার দিনে সংগ্রাম নিয়ে এসেছিল ।
যোগাযোগ সুবিধা এতে । অংকুরের সাথে যোগাযোগ করতেও অসুবিধা হয় নি । এই তো একটু আগে দুপুরে কথা হলো । অংকুর তখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ওর মা’কে নিয়ে । আসতে আসতে বিকেলের মধ্যভাগ । আবার ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ।

এই আসবে হয়তো !
সংগ্রাম বাইরে টা দেখে বালার ঘরে উঠলো । শ্যামা কে দেখে নি সেই দুপুর থেকে । দুপুর থেকে বালা কে সাজাতে ব্যস্ত ওরা । সংগ্রাম গলা খাঁকারি দিয়ে ঘরে ঢুকলো । আভাস পেয়ে চকিতে তাকালো সবাই । আজ সর্বপ্রথম বালার সাথে চোখাচোখি হলো সংগ্রামের । মেয়েটার বুক খানা ছ্যাঁত করে উঠলো এতেই ‌। সংগ্রাম পলক হীন কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলো । তাকিয়েই এগোলো । বালার সম্মুখে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে দুই আঙ্গুলে ছোট্ট করে চিমটি কাটল বালার কানের লতিতে । কাঁপল মেয়েটা । সংগ্রাম শান্ত স্বরে বলল….
” খুব সুন্দর লাগছে তোকে । একদম বউ বউ ! কারোর যেন নজর না লাগে….
অবশেষে বালার সৌন্দর্য ও চোখে পড়লো সংগ্রামের ! নজর পড়লো , আবার নজর কাটালো ও । স্থায়ী আর রইলো কি ? বালা হাসলো এক চিলতে । লাজুক ভাব আনার চেষ্টা করলো জোর পূর্বক । চোখ নামালো দৃষ্টি আড়াল করে । সংগ্রাম সোজা হয়ে শ্যামা কে দেখে মুচকি হাসলো । বললো সবার উদ্দেশ্যেই…

” ওরা এসে পড়েছে হয়তো । আর কিছুক্ষণ । মৌলভী,কাজি , সবাই এসে গেছেন । শুধু বিয়ে পড়িয়েই চলে যাবে ওরা , নিয়ে যাবে বালা কে ।
শ্যামার মুখখানা নুইয়ে আসলো । শবনম ও আহত করলো দৃষ্টি । তবে হাসলো বালা ।
সন্ধ্যা গড়াচ্ছে । আঁধার নামছে চারদিকে । সংগ্রাম পায়চারি করছে অন্দরের বাইরে । লতিফ জোয়ার্দার পাশেই তার আসনে বসে । মুখ খানাতে এক রাশ চিন্তার ছাপ । ছোট হয়ে এসেছে মুখশ্রী । সংগ্রাম কতবার টেলি যোগাযোগ করার চেষ্টা করলো । সফল হলো না । টেলিফোনে পেলো না অংকুর কে । এতক্ষণে তো ওদের আসার কথা , কিন্তু এখনো দেখা নেই । ছটফট অবস্থা সংগ্রামের । কুল পাচ্ছে না কোনো দিকে । এখনো নেই কেনো অংকুর ? যোগাযোগের আর কোনো সূত্র নেই । কি হয়েছে, কোথায় আছে এখনো ওরা কে জানে ? রাস্তায় কোনো বিপদ ঘটলো কি না তাও সন্দিহান । সংগ্রাম ঘামছে , শ্বাস ফেলছে ঘনঘন । চিবুক বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে ওর । সালেহা বেরোলেন অন্দর থেকে । বালা এখনো ঘরে । মেয়েটা সেই কখন থেকে সেজে গুজে বসে আছে অপেক্ষায় । অতিথি শালার বাইরে মৌলভী আর কাজিও উদ্বিগ্ন । এভাবে এতক্ষণ ধরে বসে থাকা দায় , বিরক্তিকর তাদের কাছে । জমিদার হওয়ায় কিছু বলতেও পারছেন না তারা ।
সালেহা আতঙ্কিত হয়ে দম হারিয়ে শুধালেন….

” সংগ্রাম ,, কি হলো ? আর কতো দেরি ? এখনো আসছে না কেনো কেউ ? রাত নামছে তো । আরো কখন আসবে ?
সংগ্রাম থমকালো এক জায়গায় । স্বাভাবিক করলো নিজেকে । উত্তর না করে অন্দরে ঢুকলো সবাইকে উপেক্ষা করে । ফের যোগাযোগের চেষ্টা করলো । পারলো না । ওষ্ঠ জোড়া শুকিয়ে আসছে ওর । লতিফ জোয়ার্দার , সালেহা , আতিয়া বেগম , সবাই ওর দিকেই তাকিয়ে । সময় গড়াচ্ছে তো গড়াচ্ছে । থেমে নেই । শিরদাঁড়া বেয়ে শিরশির করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে সংগ্রামের । চিন্তার মাত্রা বাড়ছে । তবুও অংকুর কে ভুল বুঝে একটা খারাপ ধারনাও মাথায় আসছে না । সংগ্রাম সোফায় বসল ধপ করে । এতক্ষণেও সবকিছু নীরব দেখে এবার ঘর ছেড়ে বেরোলো শ্যামা । সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে নিচে সবার উদগ্রীব মুখায়ব দেখলো । আতিয়া বেগম সংগ্রামের পাশে বসে শান্ত কন্ঠে শুধালেন…

” দাদু ভাই ,, কি হইছে ? নতুন জামাই আহে না ক্যান এহনো ? বিয়া হইবো না ? মাইয়াডা কখন থাইকা সাইজা গুইজা বইসা আছে । দেরি হইয়া যাইতাছে তো ! আর কখন আইবো হেরা…?
সংগ্রামের তবুও উত্তর না দেখে সালেহা বিব্রত হলো এবার । খানিক উঁচু গলায় বললেন তিনি….
” সংগ্রাম ,, কথার উত্তর দিচ্ছিস না কেনো ? কি হয়েছে , কিছু তো বলবি ? বিয়ে দিতে তো চেয়েছিলি মেয়েটার । এখন কথা বলছিস না কেনো ?
সংগ্রাম ঢোক গিললো । মাথা এলোমেলো । শ্যামা তাজ্জব বনে দাঁড়িয়ে সিঁড়ির নিচে । লতিফ জোয়ার্দার বসলেন ছেলের পাশে । একই প্রশ্ন করলেন ভেজা গলায়….
” সংগ্রাম ,, কিছু বলছো না কেনো ? কি হয়েছে ? এখনো আসছে না কেনো ওরা ? এতক্ষণে তো এসে যাওয়ার কথা ! কোনো সমস্যা হয়েছে ?
এবার কথা ফুটলো সংগ্রামের মুখে ।

” জানি না আব্বা । বুঝতে পারছি না ।
” বুঝতে পারছিস না মানে ? কি বুঝতে পারছিস না ? এখনো কোনো আসে নি ওরা ? আর কখন আসবে ? কার সাথে বিয়ে ঠিক করেছিলি তুই বালার ? কান্ড জ্ঞান হীন সে ? সময়ের মূল্য বোঝে না ? তুই তো বুঝিস ? রাত গড়িয়ে যাচ্ছে , আর কখন সময় জ্ঞান হবে ওদের ?
শবনম ও নিচে নামলো এবার । পাশে দাঁড়ালো শ্যামার । বালা ঘরে একা । সংগ্রাম শান্ত থেকে বললো….
” আর একটু অপেক্ষা করি,, ওরা আসবে । নিশ্চয়ই আসবে । হয়তো কোথাও আটকে গেছে…
কথা অনুযায়ী আরো সময় পেরোল । রাত্রি পেরোলো দশটা । অন্দরে সবাই নিস্তেজ হয়ে বসে । বিয়ে হয় নি এখনো , আসে নি বর , অংকুর আসে নি । কেনো আসলো না ? জানা নেই , খোঁজ নেই । সংগ্রাম লোক পাঠিয়েছিল গ্রাম পেরিয়ে অদূর পর্যন্ত । কোনো খবর পাওয়া যায় নি ।
সংগ্রাম কিংকর্তব্য বিমূঢ় । দেখে মনে হচ্ছে ঠান্ডা মাথায় বসে আছে । তবে ঝড় বইছে ভেতর ভেতর । অংকুরের প্রতি অবিশ্বাস এখনো আসেনি । কিছু তো হয়েছে ! নয়তো এমনটা তো হওয়ার নয় । অংকুর আসতো , ঠিক আসতো । কিন্তু আসলো না । কেনো ?
পিনপতন সকল নীরবতা ভেঙে সালেহা ধরা গলায় বলে উঠলো….

” অনেক তো বড় মুখ করলি সংগ্রাম ! কি হবে এখন ? বিয়ে হলো না মেয়েটার ! বিয়ে হবে না ?
সংগ্রাম ধক্ করে উঠলো । কাজি,মৌলভী কে ফেরত পাঠানো হয়েছে ।
সালেহা একটু থেমে আবারো বললেন…
” ভেবেচিন্তে তো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলি , তাহলে সিদ্ধান্ত ভুল বেরোলো কি করে ? ভুল মানুষ কে বালার জন্য বাছলি কি করে তুই ?
” ভুল নয় আম্মা , অংকুর ভুল নয় । ও আসবে । আমার বিশ্বাস ও আসবে…
” আর কবে ?
লতিফ জোয়ার্দারের শান্ত প্রশ্নের উত্তর করতে পারলো না সংগ্রাম । বালা টা যে সিঁড়ির একদম উপরে নিঃশব্দে ঘাপটি মেরে হাঁটু জড়িয়ে বসে আছে , কেউ দেখেনি ওকে । কারোর নজর একবারও যায় নি ওদিকে । সবার নজরের আড়ালে মেয়েটা নিঃশব্দে চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে একা একা । হাঁটুতে মাথা কাত করে রেখে ও চেয়ে আছে এক দৃষ্টে সংগ্রামের পানে । ফিকড়ে উঠে নাক টানলো বালা । এতেই শব্দ হলো একটু । সকলের নীরবতার মাঝে শব্দটা প্রকট শোনালো । শ্যামা , শবনম সহ চকিতে চাইলো সবাই । বালা কে দেখে আঁতকে উঠলো সবাই । সালেহা অস্ফুটে বিড়বিড় করলো…

” বালা…
সবার দৃষ্টি নিজের দিকে দেখে ভরাট চোখে হাসলো মেয়েটা । মাথা তুলে এক চোখ মুছলো । উঠে দাঁড়াতেই চুড়ি গুলো একে অপরের সাথে টোকা লেগে শব্দ হলো একটু । মেয়েটা নিস্তেজ পায়ে এগোলো নিজের ঘরের দিকে । সংগ্রাম বসা থেকে উঠলো ঝট করে । দ্রুত পায়ে ছুটলো বালার পিছু পিছু । বালার ধীর গতির সাথে পাল্লা দিতে অসুবিধা হলো না । বালা ঘরে ঢুকে দরজা চাপাতে গেলে আটকে দিলো সংগ্রাম । দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো । বললো…
” দরজা দিচ্ছিলি কেনো ?
” দিচ্ছিলাম না তো , চাপাচ্ছিলাম একটু !
সংগ্রামের গোল দৃষ্টি । বালার ভরাট চোখে ঝাপসা দেখাচ্ছে । পানি গড়াতেই পরিষ্কার হলো চোখ । বললো মেয়েটা…
” ভয় পেলেন নাকি সংগ্রাম ভাই ? ভেবেছেন মরার জন্য দরজা দিচ্ছি ? চিন্তা করবেন না , নিজে নিজে মরবো না আমি । আমার এখনো দেখার আছে- জীবন আমাকে কোন কোন বাকে নিয়ে যায় ! আরো কতো কি ঘটবে আমার সাথে , সেসব না দেখে মরি কি করে ? মরবো না আমি ।

” বালা…?
” বলুন সংগ্রাম ভাই… আর কি বলবেন বলুন । আপনার মুখ থেকে যেকোনো কথা শুনতে খুব ভালো লাগে আমার !
মেয়েটার কম্পিত গলা । খুব সহজেই কথা বলছে ও । সংগ্রাম চোখ নামিয়ে ঢোক গিললো । শান্ত বালা এই সুযোগে আরো কয়েক ফোঁটা পানি বিসর্জন দিলো চোখ থেকে । সংগ্রাম তাকালো , বললো…
” অংকুর আসবে বালা….
রাত টুকু পেরোক , আমি খোঁজ নেবো ও কেনো আসতে পারে নি !
বালা ঠোঁট উল্টালো এবার । ভেঙে আসলো পুরোপুরি । বুক খানা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে । শ্বাস আটকে আসছে । মেয়েটা কেঁপে উঠলো । ধরা গলায় বুলি ফুটালো…..

” আমার জীবন টা এই কদিনে কেমন অন্যরকম হয়ে ,তাই না গেলো সংগ্রাম ভাই । আগে তো এমন ছিল না আমার জীবন , তাহলে এখন কেন এমন হলো ?
সংগ্রাম বলছে না কিছু । বালা টা ভেঙে যাচ্ছে । চিৎকার করে ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে । আশেপাশে কেউ নেই । শ্যামা ও নেই । থাকলে একটু আছড়ে পড়ে মাথা গোঁজা যেত ওর বুকে । জড়িয়ে ধরে গুমড়ে কাঁদা যেত । মা তো থেকেও নেই , অলকার মতো মা নেই ওর । যে মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে শান্তনা দেবে । কোলে মাথা রেখে হাত বুলিয়ে দেবে চুলের ভাঁজে ।
বালা কেমন করে যেন বললো….

” আমাকে একবার জড়িয়ে ধরবেন সংগ্রাম ভাই , স্নেহ দিয়ে , একবার শুধু । আমার না খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে সংগ্রাম ভাই । কাঁদতে দেবেন আমায়… ? আপনার বুকে মাথা রেখে কাঁদতাম একটু… আমার না আর এভাবে কাঁদার শক্তি নেই…
সংগ্রাম নড়লো না একটুও । জড়ালো না বালা কে । মেয়েটা অপেক্ষায় রইলো কিছুক্ষণ । আশাহত হয়ে বোকার মতো হাসলো । বসলো পিছনে পিছিয়ে । চোখের অবাধ সমুদ্র থেকে ঝর্নার ন্যায় পানি গড়াচ্ছে । সংগ্রামের বোধহয় একটু ও মায়া হলো না । হলে হয়তো এভাবে শক্ত পাথরের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো না । বালা বিলাপ করে হাসলো । নিজেকে দেখিয়ে বললো…

” এই দেখুন সংগ্রাম ভাই , আজ আমি লাল শাড়িতে বউ সেজেছি । কিন্তু আপনার জন্য না , আপনার কথায় অন্য কারোর জন্য বউ সাজলাম আজ । কিন্তু দেখুন যার জন্য বউ সাজলাম সে আসলো না আমায় নিতে । আপনার বউ সাজার স্বপ্ন তো আমি নিজে দেখেছিলাম, সেই স্বপ্ন ভাঙ্গলো, আপনার বউ সাজার স্বপ্ন দেখে অন্য কাউকে বউ রুপে দেখতে হলো আপনার । কিন্তু সে ? সে তো আমায় স্বপ্ন দেখালো , তাহলে স্বপ্ন দেখিয়ে নিজেই সেই স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিলো কেনো সে ? কেনো আসলো না সে ? আমি তো আর স্বপ্ন দেখতে চাই নি ! কাউকে জড়াতে চাই নি জীবনে । উনি কেন স্বপ্ন দেখালো আমায় ?

আমি আবার হারলাম সংগ্রাম ভাই , হেরে গেলাম আমি, হেরে গেলো আমার সৌন্দর্য । বলেছিলেন না লাল শাড়িতে বউ সেজে খুব সুন্দর লাগছে আমায় ? আজ আপনি আমার সৌন্দর্য দেখলেন অথচ আজ যার দেখার কথা ছিলো সে দেখলো না । সেও ফাঁকি দিলো আমায় । কেউ ভালোবাসলো না আমায় , আমি কারোর ভালোবাসার যোগ্য নোই সংগ্রাম ভাই , কেউ আসে না আমায় ভালোবাসতে । কেউ না….
একসাথে এতো গুলো কথা শেষ করে দুহাতে মাথা চেপে ধরে ডুকরে উঠলো মেয়েটা । কেঁদে উঠলো হাউমাউ করে । শ্যামা দরজার বাইরে , ভেজা করুন চোখে তাকিয়ে মেয়েটার সব আহাজারি শুনলো ও । সংগ্রাম হুট করে পিছনে তাকালো । শ্যামার উপস্থিতি বুঝে তাকিয়েছে । শ্যামা সজল চোখে চেয়ে মৃদু ইশারা করলো ওকে । সংগ্রাম দাঁড়ালো না আর ।

বালার সম্মুখে এক হাঁটু মুড়ে বসে ওর দুহাত আগলে ধরলো । জবজবে ভেজা দুচোখ মুছিয়ে দিলো নিজ হাতে । এতোটা স্পর্শ স্বজ্ঞানে কখনো পায় নি বালা । মেয়েটা কান্না চেপে থমকালো এক মুহুর্ত । সংগ্রাম ওর দুগাল নিজের দুহাতের আজলে নিয়ে মোলায়েম স্বরে বললো….
” তোকে যে ভালোবাসবে , সে আসবে । সবকিছু পেরিয়ে সে আসবে । একান্ত তোর জন্যই আসবে সে । তাকে যে সুরবালার কাছে আসতেই হবে , দায় রেখে গেছে সে ।
রাজপুত্র আসবে আমার সুরবালা রাজকন্যা কে নিয়ে যাওয়ার জন্য । ছুটে আসবে সে । টগবগিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আসবে সে দেখিস…
মেয়েটা হেসে ফেললো । মনে হলো এক মুহুর্তে ভুললো সব কষ্ট । আর কোনো দুঃখ নেই ওর । ফের বললো সংগ্রাম….

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ২৯

” অংকুর আসবে বালা ….তোর কাছে আসবে ও । ওকে বলবো… আমার এই ছোট্ট রাজকন্যার সব কষ্ট যেন নিজের বুকে আগলে দূর করে দেয় । রাজকন্যা কে যেন নিজের রাজ রাণী করে রাখে সে…
সকাল টা হতে দে…. ও কেনো আসলো না আমি খোঁজ নেবো । ওকে খুঁজে নিয়ে আসবো তোর কাছে ।
” জোর করবেন সংগ্রাম ভাই ? যে আমার দায়িত্ব নিতে চায় না তার ঘাড়ে জোর করে চাপাবেন আমায় ? তার যদি আমার কাছে আসার হতো তাহলে সে নিশ্চয়ই আসতো ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩১