শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৯
অনামিকা তাহসিন রোজা
ফুটবলের মত মুখ ফুলিয়ে বসে আছে ধারা। চোখ টলমল করছে পানিতে, যেকোনো সময় গড়িয়ে পড়বে নোনাজল। অবশ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হাতে আগে থেকেই তাকে গুটিকয়েক টিস্যু ধরিয়ে দিয়েছে শ্রাবণ শেখ। আজ প্রথমবার ধারাকে না আটকিয়ে তার হাতে টিস্যু দিয়ে কাঁদতে সহযোগিতা করেছে শ্রাবণ। এর একটা বিরাট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। আজ সেই কলেজের প্রিন্সিপালের সাথে আলাপ করেছে তারা। আর ধারা কেও প্রিন্সিপাল বেশ পছন্দ করেছে। এসএসসির কিছু প্রশ্ন করা হলে ধারাও সেগুলো পেরেছে। তাই তিনি অভিভূত হয়েছেন।
বিবেক বিবেচনা করে সামিউল শেখের সুপারিশ মোতাবেক ধারা কে কলেজে ভর্তি করিয়ে নিতে রাজি হয়েছে। তাই সমস্ত ফর্মালিটি পূরণ হলে আগামী মাসেই ধারা কলেজে যেতে পারবে। এতে শ্রাবণ বেশ খুশি হয়েছে। কিন্তু ধারা বাড়িতে আসার পর থেকেই এমন মন খারাপ করে রয়েছে। কারন তার মোটেই ভালো লাগছে না। হ্যাঁ এটা ঠিক যে পড়াশোনা করতে তার ভালো লাগে। কিন্তু স্কুলে যেতে তার মোটেই ভালো লাগত না। বলা যায়, স্কুলে যেতে তার আলস্য ব্যাপারটা ঘাড়ে চাপতো। এবারও কলেজে যেতে নারাজ সে। তাই বাড়িতে আসার পর থেকেই গুনগুনিয়ে বিছানায় বসে বসে কাঁদতে শুরু করেছে বেচারি। অথচ শ্রাবণ শেখ তাকে স্বান্তনা না দিয়ে টিস্যু হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছে— ক্যারি অন! এটা কোনো কথা?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
শ্রাবণ ফ্রেশ হয়ে টি শার্ট, ট্রাউজার পড়ে বাথরুম থেকে বের হলো। মুখ ফুলিয়ে এক কোণে বসে থাকা ধারাকে একপল দেখলো। চুলের গোছা এলোমেলো হয়ে গালে লেগে গেছে, চোখের কোণে জমে আছে চিকচিকে জল। হাতে ধরা টিস্যুগুলো ইতিমধ্যেই ভিজে একরকম কুঁচকে গেছে। ঘরটা অদ্ভুত নীরব, শুধু ধারার মৃদু গুনগুন আর টিস্যুর মচমচ শব্দ। শ্রাবণ দরজার ফ্রেমে ভর দিয়ে কিছুক্ষণ ওকে দেখল। ভেজা চুল থেকে শার্টের কাছে কাঁধে পানি পড়ছে, আর ভেজা গন্ধে ঘরটা যেন একটু নরম হয়ে উঠেছে। তার চোখে মিশে আছে একধরনের প্রশ্রয় আর মৃদু হাসি। শ্রাবণ মুখ চেপে হাসলো, ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল,
—” কলেজে যাওয়ার কথা বললেই এমন কান্নাকাটি কেও করে নাকি? তুমি তো চূড়ান্ত গাধা, ধারা!”
ধারা কোনো উত্তর দিল না, শুধু ঠোঁট গোল করে আরো একবার টিস্যু দিয়ে চোখ মুছল। গলা ভারি হয়ে এসেছে, নাক টেনে বলল,
—” আমি যেতে চাই না। আপনিই যান! ওই ভোরে উঠতে হবে, বইয়ের বোঝা…কত ঝামেলা!”
শ্রাবণ হেসে ফেলল, এবার আর খেপিয়ে না দিয়ে তার পাশে বসল। হাত বাড়িয়ে ধারার মাথার পেছনটা আলতো করে বুলিয়ে দিল। তারপর চোখের কোণে লেগে থাকা নোনাজল আঙুলের ডগায় মুছে দিল।
—”জানো ধারা, মাঝে মাঝে যে জিনিসটা করতে মন চায় না, সেটাই পরে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে আসে। কলেজ শুধু বই পড়ার জায়গা না, নতুন মানুষের সাথে দেখা হবে, নতুন স্বপ্ন জন্ম নেবে। আর আমি চাই তুমি পড়ো। কোনো কিছুতে তুমি যেন পিছিয়ে না পড়ো! তোমাকে সব কিছুতেই সেরা হতে হবে। তোমার বয়সী মেয়েরা কিন্তু এখন সংসার করেনা। তাই তুমিও এখন পড়বে। অত চিন্তা করছো কেনো? আমি তো আছি-ই!”
তার গলা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে এলো। চোখে-মুখে পুরুষালি সৌন্দর্য আর ভেজা চুলের সজীবতা মিশে এক অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ধারা আড়চোখে তাকাল, বুকের ভেতরটা হঠাৎই কেঁপে উঠল। অথচ মুখে কিছু বলল না। মুখটা আরো ফুলিয়ে রাখল, মনে হলো তর্ক না করেই অভিমান প্রকাশ করছে।
শ্রাবণ হালকা হেসে টিস্যুর বাক্স থেকে নতুন একটা টিস্যু বের করে ওর হাতে গুঁজে দিল।
—” হয়েছে, কেঁদো না আর। আমি এখন বাইরে যাচ্ছি। একটা কাজ আছে। এসে যেন তোমায় স্বাভাবিক দেখি!”
ধারা মাথা নেড়ে সায় দিল। এমনিতেও তার আজ অন্য একটা কাজ আছে। কেঁদে সময় নষ্ট করতে আগ্রহী নয় সে।
মমিনুর সাহেবের চোখেমুখে কঠোর মনোভাব স্পষ্ট। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তবে তার মনের ভেতরে চলতে থাকা কূট কাচালি টা ধরতে পারল না শ্রাবণ। সেও ভদ্রলোকের সাথে তাল মিলিয়ে পায়ের উপর পা তুলে সোফায় বসে থুতনিতে হাত বুলোচ্ছে। চোখে এঁটে থাকা চশমাটা খুলে হাতে নিলেন মমিনুর সাহেব। ভ্রু উঁচিয়ে তাকালেন শ্রাবণের দিকে,
—” কী চান? ”
শ্রাবণ ঠোঁট উল্টিয়ে সোজা হয়ে বসলো, নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
—” ওইযে বললাম, আপনার মেয়ে কোথায়?”
মমিনুর সাহেব এবার পূর্বের তুলনায় আরেকটু ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। যথাসম্ভব মুখে শক্ত ভাবটা বজায় রেখে বললেন,
—” আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি। যেখানে আমি নিজেই আমার মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছি না, ইভেন থানায় জিডি করেছি, সেখানে আমি কীভাবে জানব আমার মেয়ে কোথায়?”
শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাথে আড়ালে হাসলো খানিকটা। মমিনুর সাহেব চেষ্টা করছেন নিজের যৌবন কালের দাপট দেখিয়ে আগের পরিচয় রূপ বহাল রাখার। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন আজকালকার জেনারেশনের সাথে তিনি মোটেই তাল মেলাতে পারবেন না। ভদ্রলোকের কাছে যা বিরাট বড় কঠিন কাজ, বা অস্বাভাবিক কাজ, সেটা এই যুগের ছেলেমেয়েদের কাছে নিতান্তই স্বাভাবিক! তাই শ্রাবণও জিহানের কাছ থেকে পুরো ব্যপার টা শোনার সাথে সাথে চট করে ফন্দি টা ধরে ফেলেছে। বেচারা আতঙ্কিত জিহান মুনিরাকে নিয়ে চিন্তায় মাথা চালাতে পারেনি। নইলে সেও খুব সহজে পারত।
শ্রাবণ বেশ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলে উঠলো,
—” দেখুন মমিনুর সাহেব, আমি আপনার মেয়ে, মানে মুনিরার বস। আপনি না জানলেও, আমি জানি বাড়ি, অফিস আর জিহানের কাছে ছাড়া আপনার মেয়ের আর যাওয়ার জায়গা নেই। তাই আপনি নিজেও জানেন, ছেলেমানুষী করে আপনি নিজেই আপনার মেয়েকে লুকিয়ে রাখবেন, এটা সম্ভব নয়। অথবা আপনি ভুলে গেছেন যে এখনকার প্রজন্ম আপনার ভাবনার চেয়ে অনেক দ্রুত ফাঁকফোকর ধরে ফেলতে পারে।”
মমিনুর সাহেব চমকে এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি সরালেন, কিন্তু দ্রুতই নিজেকে সামলে নিলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে কণ্ঠ দৃঢ় করলেন,
—” আপনি কী বোঝাতে চাইছেন? আমি নিজে আমার মেয়েকে লুকিয়ে রেখেছি?”
—” একদম ঠিক! ”
ফট করে স্বীকার করল শ্রাবণ। এখানে ভাবনার কিছু নেই। এটাই সঠিক, এটাই সত্য। তাই ভনিতা করল না সে। অথচ মমিনুর সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—” ভুল জানেন।”
শ্রাবণ এবার আর হাসল না। সোফার হাতলে আঙুল চালিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
—” প্রমাণ নেই। আর আমি বোঝাতে চাইছি, মুনিরা নিজে থেকে হুট করে হারিয়ে যায়নি। জিহান ও আমি দু’জনেই জানি কিছু গোপন বিষয় আছে, যা আপনি কাউকে জানাননি। ”
মমিনুর সাহেবের চশমা এখনও তার হাতে। তিনি সেটি শক্ত করে চেপে ধরে রাখলেন, যেন চশমার কাঁচের মাধ্যমে নিজের অস্থিরতা ঢেকে দিতে চাইছেন। তার ঠোঁট নড়ে উঠল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হল না। শ্রাবণ মুহূর্তের জন্য মমিনুর সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের গভীরে একটুখানি কাঁপতে দেখা গেলো। ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গ ফুটিয়ে সে হালকা গলায় বলল,
—” আপনার চোখ কিন্তু অন্যকথা বলছে, মমিনুর সাহেব। আপনার কণ্ঠ যতই শক্ত হোক, মুখের এই ছায়া বলছে, আপনি কিছু জানেন।”
মমিনুর সাহেব এবার ঠোঁট কামড়ে নিলেন। তার আঙুল চশমার ডাঁটায় স্নায়বিকভাবে নড়ল। তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে বললেন,
—” আমি আমার মেয়েকে কোথাও লুকাইনি, শ্রাবণ। আমি যদি জানতাম সে কোথায় আছে, থানায় জিডি করতে হতো না আমাকে। তোমরা যা ভাবছো, তা ভুল।”
শ্রাবণ ঠান্ডা গলায় বলল,
—” হয়তো ভুল। আবার হয়তো আংশিক সত্য। আপনার দীর্ঘশ্বাসটা কিন্তু অন্য কিছু বলে গেল।”
মমিনুর সাহেব এবার সামান্য ঝুঁকে, চোখে ক্ষীণ বিরক্তির রেখা টেনে বললেন,
—” দীর্ঘশ্বাস মানেই অপরাধ নয়। আমি চিন্তিত, অস্থির, কিন্তু আমার মেয়ে কোথায় গেছে, আমি সত্যিই জানি না।”
শ্রাবণ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে রইল। ঘরের নিস্তব্ধতায় তার সন্দেহটা আরও ঘনীভূত হলো। তবুও মমিনুর সাহেবের গলায় এক অদ্ভুত আন্তরিকতা আছে, যা শ্রাবণের যুক্তির বিপরীতে গিয়ে তাকে দু’মনের মধ্যে আটকে দিল। হয়তো তিনি সত্যিই জানেন না, অথবা এমন কিছু জানেন যা স্বীকার করতে পারছেন না। শ্রাবণ এবার সামান্য এগিয়ে এসে নরম স্বরে যোগ করল,
—” আপনি জিহান কে শর্ত দিয়েছিলেন যেন মুনিরাকে এক মাস নিজের দায়িত্বে রাখে। দিয়েছিলেন কিনা?’
মমিনুর সাহেব মাথা নাড়লেন,
—” হুম দিয়েছিলাম! ”
—” এমনও তো হতে পারে যে, আপনি ইচ্ছে করে মুনিরাকে লুকিয়ে রেখে জিহানকে হারাতে চাইছেন, ওকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে চাইছেন। এমনটা কি হতে পারে না?”
ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল শ্রাবণ। শ্রাবণের এমন কথায় আবারো দীর্ঘশ্বাস ফেলল মমিনুর সাহেব,
—” আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম। লজিক ঠিকই আছে। তবে পদ্ধতি আলাদা। আমি মুনিরাকে টাকা দেয়া বন্ধ করেছিলাম। ওকে বাড়িতে খেতে দেইনি। কারন দেখতে চেয়েছিলাম ওই ছেলে আমার মেয়েকে চালাতে পারে কিনা। তবে এমন কিছু করতে চাইনি, করিনি। আমি কি গুন্ডা নাকি?”
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে এলো। মমিনুর সাহেবের কঠোর দৃষ্টি এবার সামান্য নরম হলো। একটু দ্বিধা, একটু অভিমান, আর এক অদ্ভুত ভয়ের ছায়া তার মুখে খেলে গেল। শ্রাবণ এবার ঠোঁট কাঁমড়ে দমে গেলো। মমিনুর সাহেবের কথাতেও যুক্তি আছে। এবার আরেকটু গভীর হলো বিষয়টা। তাদের ধারনা মিথ্যা হলে মুনিরা কোথায়?
খানিকক্ষণ আগেই শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে সাদিক। ফেলে রেখে গেছে নিজের প্রাণভোমরা কে। কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল যখন কনিকার চোখের দিকে তাকিয়েছিল সাদিক। কিন্তু সেও নিরুপায়! এখন দূরত্ব না বাড়ালে চিরদিনের জন্য তো দূরত্ব কমানো যাবেনা। কথায় আছে,
—” আজীবনের জন্য কাছে আসতে চাইলে প্রথমে খানিকটা দূরত্ব বাড়াতে হয়!”
তাই প্রকৃতির এই খেলায় সাদিক আর কনিকাকে আলাদা হতে হয়েছে। স্তব্ধ পুকুরে ভেসে যাওয়া শ্যাওলা কে চাইলেই কনিকার জীবনের সাথে তুলনা করা যায়। দুটোই ভেসে যাচ্ছে নিজের মত করে। কোনো গতি নেই, রাস্তা নেই, সীমা নেই। অথচ যাচ্ছে। কনিকা আধভেজা শাড়ি পড়ে পাড়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ পানিতে চিকচিক করছে। খুব করে একা লাগছে এখন তার। জীবনে যেন কেওই নেই। পুরো পৃথিবী টাই এখন ফাঁকা লাগছে। সাদিক কে এভাবে চলে যেতে দেয়া উচিত হলো না মনে হয়। বেচারি কনিকা বুঝতেই পারছে না, সে কীভাবে একা একা থাকবে। এই অপরিচিত জায়গায়? ভয় লাগছে খুব। কিন্তু কান্না করা যাবে না। সে যে সাদিক কে কথা দিয়েছে।
এর মধ্যে আরেকটা কাজ কনিকা করেছে। সে তার প্রাণপ্রিয় ভাইদুটো আর মা-বাবার খোঁজ নিতে এক খালাকে পাঠিয়েছে গ্রামের দিকে। সেদিনের পর থেকে কেনো ও গ্রাম থেকে কোনো খবর আসেনা কে জানে! কনিকার তো খুব জানতে ইচ্ছে করে পরিবারের কথা। ভাইদুটোর কথা খুব মনে পড়ে। এসব ভাবতে ভাবতেই হুট করে কনিকা শুনতে পেলো এক অপরিচিত পুরুষালি কন্ঠ,
—” এই ছেড়ি, কে রে তুই? কী করিস এইখানে?”
কনিকা চমকে পেছনে তাকায়। দেখতে পায়, একটা হ্যাংলা পাতলা ছেলে প্রাণোচ্ছল মুখ নিয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে। কনিকা চিনল না। পুরুষ দেখে শাড়ি ঠিক করে নিয়ে মুখ ভার করে বলল,
—” কে আপনি?”
আগন্তুকের পরনে লুঙ্গি। চোখে মুখে হাসি। পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বললো,
—” আরিব্বাস! ম্যালা সুন্দরী তো! নাম কী রে তোর? হাঙ্গা হইছে নি?”
শুকনো ঢোক গিলল কনিকা। লোকটাকে ভালো মনে হচ্ছে না। বোঝা যায় বয়স ২২-২৩ বছর হবে। তার উপর নজর ভালো লাগছে না। তার মধ্যে পুকুরপাড়ে কনিকা একা। তাই সে পালানোর পথ খুঁজতে খুঁজতে বলল,
—” সরুন সামনে থেকে!”
লোকটা বোধহয় খুশি হলো না। পানির বিটা থু মেরে ফেলল ঘাসপাতা ভর্তি মাটিতে। লুঙ্গি উঁচিয়ে হেঁটে কাছে এসে বলল,
—” সুন্দরী মাইয়াগো এত্ত দেমাগ ক্যান থাকে রে? আমি কি তোরে খাইয়া ফেলতাছি বলদ মাইয়া!”
বলতে বলতেই লোকটার চোখ বিশ্রী ভাবে ছুঁয়ে দিলো কনিকা কে। উপর থেকে নিচ পর্যন্ত খুটিয়ে দেখার চেষ্টা করল কনিকার পুরো শরীর। কনিকার গা গুলিয়ে উঠলো। পুরুষের খারাপ নজর বোঝে সে। কোনোমতে সে পাশ কাটিয়ে বাড়ির দিকে এগোতে থাকলো। এক পর্যায়ে দৌঁড় দিল বাড়ির দিকে। অথচ পেছন থেকে লোলুপ দৃষ্টি টা আরো বেশি তীক্ষ্ণ ঘৃণ্য হয়ে উঠলো। লোকটা ঠোঁটের কাছে হাত বুলিয়ে কা”মুক দৃষ্টি দিয়ে বিড়বিড় করে গালি দিল কনিকা কে, আরো বলল,—মা”ল”টা সেই! প্রতিবারের মত চোখ লেগে থাকলো নিষ্পাপ মেয়েটার শরীরের দিকে। যতদূর দেখা গেলো ততদুর দেখলো সেই জঘন্য চোখজোড়া! এই সাক্ষাৎ হওয়া মোটেই উচিত ছিল না!
রান্নাঘরে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকলো ধারা। একমাত্র উদ্দেশ্য সালমা বেগম কে পটিয়ে রাতের রান্নাটা নিজ হাতে করা। কারন এদিকে শেখ বাড়ির একমাত্র ছেলে আবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে ধারা রান্না করতে যাবে না। এতে নাকি অসাবধানতার কারনে বিপদ ঘটতে পারে। এই বিষয়ে সহমত হয়েছেন বাকি সদস্যেরা। তবে ঠোঁট উল্টিয়েছে ধারা। কারন এমন মন্তব্য নিতান্তই বাচ্চামো। ছোট থেকেই রান্নায় দক্ষ ধারা। হাজারবার হাত পা পুড়িয়েছে সে। টুকটাক ক্ষত তার কাছে এখন ডালভাত। অথচ এই সরল মানুষেরা তাকে বাচ্চা মনে করছে!
এদিকে ধারার উঁকিঝুঁকি টের পেয়েছেন সালমা বেগম। তবুও প্রতিদিনের মত আদর করে কাছে ডাকেননি। বরং মুখ গম্ভীর করে শসা কাটতে ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন তিনি। বেশি কিছু সময় পর ভদ্রমহিলা নিজের পিঠের কাছে কারো অস্তিত্ব টের পেলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন গুটিসুটি মেরে শ্বাশুড়ির শাড়ির আঁচল খুটছে ধারা। চোখেমুখে নিষ্পাপ ভঙ্গিমা দেখে তিনি ফিক করে হেসে ফেললেন,
—” কী হয়েছে? হুম?”
ধারা মিনমিন করে বলল,
—” কী রান্না করছেন মা?”
—” সালাদা করছি। তোর শ্বশুর বিকালে খাবে যে।”
সালমা বেগমের কথায় বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো ধারা। এবার সে আরেকটু এগিয়ে এলো। কিছু বলতে চায় মেয়েটা। কিন্তু বলতে পারছে না। তাকে উশখুশ করতে দেখে সালমা বেগমই বলে উঠলেন,
—” কিছু বলতে চাইলে বলে ফেল।”
ধারা এবার ঠোঁট ভেজালো। এরপর নিজেকে প্রস্তুত করে শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করে বলল,
—” আমায় একটু সাহায্য করবেন মা? না মানে, আমি একটা ছোট্ট কাজ করতে চাচ্ছি। কিন্তু একা একা তো পারব না তাই…
সালমা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
—” সে কি? তাই নাকি? কী এমন কাজ?”
ধারা ঠোঁট চেপে বলল,
—” ওই আর কি। তেমন কিছু না। শুধু…আমায় শাড়ি পড়িয়ে দিতে হবে।”
এক নিঃশ্বাসে বলে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করল ধারা। এই কথাটা বলতে গলা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। ভীষণ লজ্জা লাগছে। কিন্তু কিছু করার নেই। সে নিজে নিজে শাড়ি পড়তে পারেনা। সালমা বেগম হতবাক হয়ে চোখ বড় করে তাকালেন ধারার দিকে। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ব্যর্থ হলেন। বুঝলেন না, হুট করে কেনো মেয়েটা শাড়ি পড়তে চাইছে। এক সেকেন্ডের জন্য অভিজ্ঞ সালমা বেগম ধরতেই পারলেন না যে তার পিচ্চি বউমা ফট করে বড় হয়ে গিয়ে ঝট করে ভদ্রমহিলারই ছেলেকে বশে আনতে শাড়ি পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আকাশটা মনে হয় না হুট করেই মেঘলা ধারন করেছে। যদিও দুপুরের পর থেকেই আকাশে মেঘের আনাগোনা টের পাওয়া যাচ্ছিল। সেই রেশ ধরেই সন্ধ্যা পেরিয়ে যেতেই আরো বিরাটাকার ধারন করল পুরো আকাশ। মেঘেরা নিজেদের মত করে জায়গা করে নিলো। চারিদিকে সন্ধ্যার অন্ধকারের সাথে মেঘছায়ার অন্ধকারে ঢেকে গেলো। সেই আকাশের নিচেই এক রমণীর মুগ্ধতার দৃষ্টি ঘায়েল করল আকাশের মেঘদের।
বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার খোলা চুল, মায়াবী মুগ্ধ হওয়া চোখ, মেঘের মতই নরম ঠোঁট, তারার মত জ্বলজ্বল করা নিষ্পাপ মুখ বিস্ময়ের সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো আকাশে, পাঠিয়ে দিল মেঘের খামে। আজ অনেকদিন পর এমন মেঘলা আকাশের সাক্ষাৎ পেয়েছে মেয়েটা। গ্রামে তো বহুত দিন পেয়েছে, বহুত সময়, সুযোগ পেয়েছে। তাই তো শত দুঃখের মাঝেও বৃষ্টি ছিল ধারার একমাত্র মন ভালো করার ঔষধ, একমাত্র সঙ্গী। মাঝে মাঝে মনে হয় বৃষ্টির সাথে ধারার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক। নাহলে কি ধারার মনমতো আজ বৃষ্টির আসে?
এইতো মেঘলা আকাশটা ডাক তুলছে। তারমানে ধারার প্রার্থনা বিফলে যাবে না। খুব তাড়াতাড়ি ঝরঝর করে বৃষ্টি নামবে। খিলখিল করে খুশিতে হেসে উঠলো ধারা। বারান্দা থেকে একটা কাঠগোলাপ হাতে নিয়ে দৌঁড় দেয় ঘরের দিকে। রিনঝিন করে শব্দ হয় পায়ে থাকা নুপুরজোড়া। হ্যাঁ, আজ ধারা নুপুর পড়েছে। অনেকদিন পর পায়ে নুপুরের ধ্বনি তুলেছে। হাতেও পড়েছে রঙিন চুড়ি। আগেও তো এসব পড়ত সে। কিন্তু কাঠখোট্টা শ্রাবণ শেখ তো সেই সময় এগুলো সহ্য করতো না। আজ বোধহয় বিরক্ত হবে না, তাই না? ধারা আনমনেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো মেঘেদের কাছে। মেঘেরা গর্জন তুলে না জানি কী বোঝাতে চাইলো।
ধারা দৌঁড়ে আলমারির কাছে ছুটে এলো। হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে বের করলো সেই কাঙ্ক্ষিত একটা আকাশী রঙের শাড়ি। এই শাড়িটায় একটা বিশেষত্ব আছে। খুব স্নিগ্ধ! ধারা শাড়িতে বুকে চেপে ধরল। আবারো মুখ তুলল আকাশের দিকে। মনে মনে জিজ্ঞেস করল,
—” এই শাড়িটা পড়লে শেখ সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে তো? খুশি হবে তো?”
মেঘেরা কি আর সঠিক উত্তর জানে? কী জানি? জানতেও পারে। তাই তো আগের চেয়েও জোরে গর্জন তুলে জানিয়ে দিলো,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২৮
—” খুশি হবে মানে? শ্রাবণ শেখ আজ খু”ন হবে!”
বাতাসের তীব্র ঝড়ো গতির চোটে উত্তর টা উড়ে উড়ে ধারার কর্ণকুহর ভেদ করতেই মেয়েটা আবারো খিলখিলিয়ে উঠল। আজ কেনো যেন ধারা ভীষন
হাসছে। কেনো হাসছে? জানা নেই। সে শুধু এটুকু জানে, সে আজ ভীষন খুশি! আর এই খুশির কারন হলো শ্রাবণ শেখ।
