সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৮
Raiha Zubair Ripti
মির্জা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে হসপিটালে এসেছে। পরিচিত সেই মহিলা ডক্টর কে দিয়ে মুনতাহার হাতটা দেখিয়েছে। মহিলা ডক্টর টা মুনতাহার হাতটা দেখে তাতে মলম লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে কয়েকটা ঔষধ লিখে দিলো। আর জ্বরের কারনে হাতে স্যালাইন দেওয়া হলো। সেই রাতটা সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে হসপিটালেই কাটালো। সকালে সিকান্দার বিল পরিশোধ করতে গিয়ে দেখলো ডক্টরের ফী সহ ঔষধপত্র নিয়ে মোট পাঁচ হাজার টাকার মতো বিল হয়েছে । মানিব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে সিকান্দার রিসিপশনের ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। ছেলেটা কার্ড টা নিয়ে মেশিনে ঢুকিয়ে টাকা কাটতে গিয়ে দেখলো কার্ডে এক টাকাও নেই।Transaction Failed. সেজন্য ছেলেটা কার্ড ফেরত দিয়ে বলল,
“ স্যার, সম্ভবত আপনার অ্যাকাউন্টে কোনো সমস্যা হয়েছে। বোধহয় টাকা নেই। ”
সিকান্দার ছেলেটার এমন কথা শুনে চমকালো। কি বলছে কি এই ছেলে? কার্ডে টাকা নেই মানে?
“ আপনাদের মেশিন ঠিক আছে তো? ”
ছেলেটা মেশিন এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ আপনি চেক করে দেখুন বিশ্বাস না হলে। ”
সিকান্দার কার্ডটা মেশিনে শো করে দেখলো সত্যি টাকা নেই। মানিব্যাগ থেকে আরো দুটো কার্ড বের করলো। সেগুলো মেশিনে ঢুকাতেই, সেম কাহিনি হলো৷ নাহ্ একটা কার্ডের ভেতর টাকা নেই৷ তিনটা কার্ডের ভেতর কম করে হলেও দশ লাখের মতো টাকা ছিলো। আর সেখানে কি না কার্ড বলছে এক পয়সাও নেই!
সিকান্দার ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো,
“ বিকাশে পেমেন্ট করা যাবে? ”
ছেলেটা পাশে থাকা বিলবোর্ড টা দেখিয়ে দিলো। সিকান্দার স্ক্যান করে টাকা পাঠাতে গিয়ে দেখলো টাকা যাচ্ছে না। অ্যাকাউন্ট চেক করে দেখলো তার বিকাশেও টাকা নেই! তার সব একাউন্টের টাকা কোথায় গেলো? তাহলে কি তাহলে ফ্রিজ করে দিয়েছে সেলিম মির্জা?
সিকান্দার পকেট আর মানিব্যাগ খুঁজে দশ হাজারের মতো টাকা পেলো। সেখান থেকে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিল পরিশোধ করে। বিকেলের দিকে মুনতাহা সুস্থ হলে,জ্বর কমে গেলে তাকে নিয়ে সিকান্দার হসপিটাল থেকে বেরিয়ে যায়।
হসপিটাল থেকে বেরিয়ে মুনতাহার ডান হাতটা ধরে রিকশায় উঠে বসলো। তার বা হাতে মুনতাহার ঔষধ। মুনতাহা জিজ্ঞেস করলো,
“ কোথায় যাচ্ছি এখন আমরা?”
সিকান্দার ঘাড় ফিরিয়ে একবার তাকালো মুনতাহার দিকে। তারপর দৃষ্টি সামনে রেখে বলল,
“ গুলশানে। মায়ের ফ্ল্যাটে। ”
রিকশা ছুটে চলছে গুলশানের দিকে। এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দশ তালা একটা বিল্ডিং পড়ে সামনে। মেইন রোড থেকে দেখা যায় সেটা। বিল্ডিং টার মূল ফটকের সামনে বড় বড় করে লেখা মির্জা ভিলা। এই সেই দশ তালা বিল্ডিং, যেটা সিকান্দারের মায়ের কবরের উপর দাঁড় করানো। যখনই সে এই রাস্তা দিয়ে মায়ের ফ্ল্যাটের দিকে যায় তখনই এই বিল্ডিং টা তার নজরে আসে। সিকান্দার তাকিয়ে থাকতে পারে না। তার শরীর অবস হয়ে যায়। বুক ভারী হয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। নজরে আসতেই তার শরীর জমে গেলো। চোখ লাল হয়ে গেলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসলো। সে নজর শরীরে ফেললো তৎক্ষনাৎ।
আচ্ছা এই দশ তালা বিল্ডিং এ থাকা লোকজন কি জানে এই বাড়িটা একজন মানুষের কবরের উপর ভর করে বানানো? জানলে কি ওদেরও এমন শরীর অসার হয়ে আসতো? বুক ভারী হতো? বুকে অসহ্য ব্যথা হতো? কম করে হলেও তো একশো জনের উপরে মানুষ থাকে এই বিল্ডিং এ। ওরা হয়তো কখনোই জানবে না এই চিরন্তন সত্য টা।
রিকশা টা সিকান্দারের মায়ের ফ্ল্যাটের সামনে এসে থামতেই সিকান্দার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলো মুনতাহা কে নিয়ে। ফটকের সামনে এসে দাঁড়াতেই অপরিচিত এক দারোয়ান দেখতে পেলো। এই দারোয়ান নতুন। আগে কখনো দেখে নি সিকান্দার। তাদের দুজনকে দেখে দারোয়ান জিজ্ঞেস করলো,
“ কি চাই? ”
“ আমি সিকান্দার। গেটটা খুলুন। ”
দারোয়ান গেট তো খুললোই না বরং বলল,
“ আপনি কে সেইটা কি আমি শুনতে চাইছি? এই গেট খোলা যাইবো না। এই বাড়ি এহন সরকারের হেফাজতে আছে। মানুষ তো দূরে থাক একটা কাকপক্ষীরও ঢোকা নিষেধ। যান যান আপনারা চইল্লা যান। ডিস্টার্ব কইরেন না। ”
সিকান্দার আর মুনতাহা কে ঢুকতেই দিলো না আর সেই বাড়িতে। রাতও হয়ে আসছে। মুনতাহাকে নিয়ে তো এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা সম্ভব না। সেজন্য সিকান্দার বাসা খোঁজা শুরু করলো গুলশান থেকে বেরিয়ে আশেপাশে। হঠাৎ করে পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠায় বের করে দেখে নাদিমের কল।
সালমান মির্জাদের বাড়িতে এ খবর ইতিমধ্যে চলে গেছে। নাদিম সব শুনে সিকান্দার কে ফোন করে। সিকান্দার রিসিভ করতেই নাদিম বলে উঠলো,
“ এ্যাই তুই এখন কোথায়? কি শুনলাম আমি এসব? তোকে আর মুনতাহা কে নাকি চাচা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে? ”
“ বের করে দেয় নি। আমি নিজ থেকেই বেরিয়ে এসেছি। এখন বাসা খুঁজছি থাকার জন্য। ”
“ বাসা খুঁজছিস মানে? এই আমরা কি মরে গেছি? আমাদের বাড়িতে আয়। ”
মুনতাহা সিকান্দারের বাহু খামচে ধরলো। তার চোখ মুখ বলে দিচ্ছে সে ঐ বাড়িতে যাবে না৷ এতদিন যায় নি। আর এখন বিপদে আছে বলে এখন যাবে! বিষয়টা খুব খারাপ দেখায়। সে চায় না মায়ের সংসারে আর যেতে। সিকান্দার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলল,
“ সেলিম মির্জা ফোন দিয়েছিল তোদের? ”
দিয়েছিল। সেলিম মির্জা ফোন দিয়ে রীতিমত শাসিয়েছে তাদের। বলেছে তারা যদি ওদের দুজন কে এ বাড়িতে থাকতে দেয় তাহলে নাদিমের চাকরি চলে যাবে সাথে সালমান মির্জার ও। তখন সংসার চালাবে কি করে? আর সিমরান তো এখনো মির্জা বাড়ির বউ৷ তার উপর অত্যাচার করতেও দুবার ভাববে না। নাদিম তারপরও পাত্তা দেয় নি সেই কথাকে। আগে সিকান্দার কে এই ঝামেলা থেকে উদ্ধার তো করুক। পরের টা পরে দেখা যাবে।
ময়না বেগম ফোনটা নাদিমের হাত থেকে কেঁড়ে নিলেন। দু’জনের ফোনই লাউডস্পিকারে।
“ হ্যাঁ দিয়েছিল। তোমার বাবা ফোন দিয়ে রীতিমত হুমকি দিয়েছে। তোমাদের দুজন কে যদি এ বাড়িতে আশ্রয় দেই তাহলে নাদিমের চাকরি চলে যাবে সাথে তোমার চাচারও। শুধু তাই নয় সাথে এও বলেছে যে ওবাড়িতে তারা সিমরানের উপরও অত্যাচার শুরু করবে। চিনো তো তোমার ভাই অর্নব কে৷ সে কেমন? একটা টু শব্দও করবে না বউয়ের সাইড নিয়ে। সব শুনার পর যদি তোমার এখন ইচ্ছে হয় আসার তাহলে আসো। বাঁধা নেই। ”
মুনতাহার রাগ হলো,কষ্ট হলো মায়ের থেকে এমন কথা শুনে। মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের সাথে কোন মা এভাবে কথা বলে? এমন ভাবে কথা বলছে যেন মনে হচ্ছে সিকান্দার যেচে পড়ে ফোন দিয়ে তাদের থাকার কথা বলেছিল। সিকান্দারের হাত থেকে ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে কেটে দিতে দিতে বলল,,
“ দরকার হলে না খেয়ে থাকবো। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। মরে যাব তারপরও উনার বাড়িতে উনার সংসারে আমরা যাব না। ”
সিকান্দার কাটতে দিলো না ফোনটা। নিয়ে নিলো। সিকান্দার ফোন নিয়ে নেওয়ায় মুনতাহা বলল,
“ উনাকে বলে দিন। আমরা যাব না ঐ বাড়িতে। উনি যেন নিশ্চিন্তে থাকে। ”
সিকান্দারের কানে এখনো বাজছে আশ্রয় শব্দটা। তারচেয়েও বেশি খারাপ লাগলো মুনতাহার জন্য। উনি সর্বপ্রথম মুনতাহার ভালোমন্দের খোঁজ খবর না নিয়ে শুরুতেই ওসব বলে বসলো! একটু জিজ্ঞেস করতো অন্তত। মুনতাহার তো একটু ভালো লাগতো এতে। কিন্তু নাহ্ উনি জিজ্ঞেস করলেন না। উনি কি জানেন গতকাল রাত থেকে তার মেয়েটা হসপিটালে ছিলো? জানলে কি জিজ্ঞেস করতো? ফোনটা কানে নিয়েই সর্বপ্রথম বলতো, “ আমার মেয়েটা কেমন আছে সিকান্দার? ” হয়তো বলতেন না। সিকান্দার গম্ভীর গলায় বলল,
“ আমি মাঝেমধ্যে আপনাকে সাইদা মির্জার সাথে গুলিয়ে ফেলতাম। কেনো গুলিয়ে ফেলতাম তা আজ বুঝতে পারলাম। উনি না হয় সৎ মা ছিলো। আমার সাথে ওমন ব্যবহার করাটা স্বাভাবিকই ছিলো। কিন্তু আপনার তো নিজের মেয়ে মুনতাহা। আপনি তো আপন মা৷ তারপরও কি করে পারেন এমন ব্যবহার করতে? জানি না আপনাদের আল্লাহ তায়ালা কি দিয়ে বানিয়েছে। জানতেও চাই না৷ তবে নিশ্চিন্তে থাকুন আপনি। আমি বা আমার স্ত্রী আপনাদের বাড়িতে কখনোই যাব না। ”
সিকান্দার কেটে দিলো ফোন টা। নাদিম ঝাড়া দিয়ে ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“ আপনার না হয় আপনার মেয়েকে নিয়ে চিন্তা হয় না। কিন্তু আমার ভাইকে নিয়ে তো আমার চিন্তা হয়।আপনি কোন সাহসে এসব বললেন? আপনি রোজগার করেন? ওর আসলে কি আপনার টা খেতো? এই বাড়ি কি আপনার? তাহলে আপনি কেনো ওদের এসব বললেন? বাবা,বাবা। ”
ছেলের ডাক শুনে সালমান মির্জা রুমে ঢুকলেন। বাবা কে দেখেই নাদিম রেগেমেগে বলল,
“ তোমার বউ এসব কেনো বললো? ”
“ কি বলেছে? ”
নাদিম সবটা খুলে বললো৷ সবটা শোনা শেষে তপ্ত এক শ্বাস ফেললো সে। এতক্ষণ এসব নিয়েই ভাবছিলেন তিনি৷ তাদের চাকরি চলে গেলেও সমস্যা ছিলো না৷ কিন্তু তার আদরের মেয়ে সিমরান! মুনতাহা কে আগলে রাখার জন্য তো সিকান্দার আছে৷ কিন্তু তার মেয়ের জন্য দুটো কথা বলার জন্য তো অর্নব নেই। এখন তো মেয়েটা তার দেশেও নেই। দেশের বাহিরে। সেলিম মির্জা কে দিয়ে তো ভরসা নেই৷ ক্ষতি করেই ফেলতে পারে। সে দেশে থেকে কিভাবে তার বিদেশে থাকা মেয়েটাকে আগলে রাখতো? সালমান মির্জা একটু না অনেকটাই স্বার্থপর হলেন নিজের মেয়ের জন্য। এরজন্য পৃথিবী তাকে বলবে সৎ বাবা। সালমান মির্জা তা শুনবেন মাথা নুইয়ে।
ছেলের জবাবের উত্তর না দিয়ে তিনি চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। নাদিম কয়েকবার ফোন দিলো সিকান্দার কে। সিকান্দার রিসিভ করে নি আর।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা একটা বাসা ভাড়া পেলো। মাসিক ভাড়া সাত হাজার টাকা। মাস শেষ হতে আর দুদিন বাকি ছিলো। তারা আজ রাত থেকেই থাকতে চাইলে বাড়িওয়ালা মানা করলো না। পোশাক আশাক দেখে তো ভালো ঘরেরই মনে হয়েছে। চারতলার সেই রুমে ঢুকতেই বাড়িওয়ালা জিজ্ঞেস করলো,
“ আপনাদের জিনিসপত্র কোথায়? ”
“ দু’দিনের ভেতর নিয়ে আসবো। ”
“ খাবেন না রাতে? ”
“ জ্বি খাবার আনতে যাব এখন। ”
“ এত রাতে বাহিরে গিয়ে এখন আর খাবার আনার দরকার নেই। আমাদের সাথেই আজ রাতের খাবারটা খেয়ে নিন। ”
সিকান্দার না করলেও তিনি শুনলো না। প্লেটে করে খাবার দিয়ে গেলো। সিকান্দার মুনতাহা সেই খাবার খেয়ে নিলো। খাবার খাওয়া শেষে সিকান্দার মুনতাহা কে ঔষধ খাইয়ে দিয়ে হাতের ব্যান্ডেজ টা খুলে পূনরায় মলম লাগিয়ে নতুন ব্যান্ডেজ করে দিলো।
পুরো রুম ফাঁকা। নেই আরামদায়ক খাট,নরম বেডশিট বালিশ। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে দু’জন। রুমে একটা লাইট ছিলো। ওটা নিভিয়ে রেখেছে। মুনতাহার মাথা সিকান্দারের কাঁধে। আর সিকান্দার এক হাত দিয়ে আগলে ধরে রেখেছে তাকে। আকাশে আজ চাঁদের আলো ঝলমল করছে। সেই আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছে তাদের সর্বাঙ্গে। প্রকৃতি আজ তাদের মতোই সর্বস্বান্ত। সিকান্দার মুনতাহার পুড়ে যাওয়া হাতের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বলল,
“ আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো মুখ আমার নেই মন। আপনার আজকের এই অবস্থার জন্য কেবল আমিই দায়ী। আমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না । আমি আপনাকে সুখের কথা বলে দুঃখী করে দিয়েছি। সিকান্দার শাহ্ একজন কাপুরুষ। সে তার স্ত্রীর জন্য কোনো স্ট্যান্ডই নিতে পারে নি। ”
মুনতাহা সাথে সাথে মাথা তুলে তাকালো সিকান্দারের দিকে। তারপরই তার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“ খবরদার, একদম কাপুরষ বলবেন না নিজেকে। আপনি যদি কাপুরুষ হন তাহলে যারা সত্যি কারের অর্থে কাপুরুষ তাদের কি বলে আখ্যায়িত করবে? আপনি আমার কাছে বীরপুরুষ। ক’জন পারে তার স্ত্রী কে নিয়ে বাবা মায়ের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে এক কাপড়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে? আপনি পেরেছেন। ক্ষমা তো আমার চাওয়া উচিৎ। না আপনি আমাকে বিয়ে করতেন আর না আপনাকে সব ছেড়ে ছুঁড়ে আমার হাত ধরে বেরিয়ে আসতে হতো। আপনার আজকের এই অবস্থার জন্য তো আমি দায়ী। আমি জানি আমার স্বামী একজন বুদ্ধিমান মানুষ। সে ভেবেচিন্তেই কাজ করে। আর সে সেটারই পরিচয় দিয়েছে। আর আমি এটাও খুব ভালো মতো জানি যে আপনার কাছে সবার আগে মুনতাহা মুনের সুখ। সেজন্যই তো গয়না গাটি,জিনিসপত্র আমার কথা ভেবেই ওভাবে নিশ্চুপে ছেড়ে এসেছেন। কথা-কাটাকাটি করেন নি।
ওখানে দাঁড়িয়ে অসুস্থ স্ত্রী কে নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো ভুলও করেন নি। আমি আপনি খুব ভালো করেই জানি আপনার বাবার ক্ষমতা আছে মিথ্যা অভিযোগে আপনাকে জেলে ভরে রাখার৷ সত্য কে মিথ্যা আর মিথ্যা কে সত্য করার। তখন কি হতো আমার? আমি কি কোর্টকাছারি বুঝি? আপনাকে ছাড়িয়ে আনতে পারতাম? জামিন কি পেতাম খুব সহজে আপনার? আমার জীবন টা তো বিভীষিকাময় করে ছাড়তো। তার উপর তো তখন মানসিক শারিরীক দুভাবেই অত্যাচার করা হতো। আপনি জেলের ভেতর থাকতেন বিনা দোষে। আর আমি বাহিরে থেকে ধুঁকে ধুঁকে মরতাম। আপনি এই সব দিক ভেবেই অসহায়ত্ব টাকে বরন করে নিয়েছিলেন । দুনিয়া আপনাকে এই তুচ্ছ কারনে কাপুরষ বললেও আমি জানি আমার স্বামীর এই নীরবতার পেছনে লুকিয়ে ছিল কেবল মুনতাহা মুনের ভালোমন্দ। দুনিয়া কি বলে তাতাে আমার কিছু যায় আসে না। আমি জানি আমার স্বামী কেমন৷ আমার তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিৎ আপনার কাছে আমাকে ভালোবাসার জন্য। এই বোকা-সোকা ইন্ট্রোভার্ট মুনতাহা মুনের জন্য আপনার চাইতে বেস্ট এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই৷ সিকান্দার শাহ্ মোটেও কাপুরুষ না৷ সে বীরপুরুষ। সে তার স্ত্রী কে ভালোবাসে নিজের সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার মতো সুপুরুষ। তার তুলনা কারো সাথেই হয় না। সৃষ্টি কর্তা তাকে যত্নসহকারে সৃষ্টি করেছেন আমার মতো অসহায় এক ভাগ্যবতী কে আগলে রাখার জন্য। অ্যাম ব্লেসড। ”
সিকান্দার মুনতাহা কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বুকের সাথে৷ পৃথিবী দেখো সিকান্দার শাহ্ কোনো ভুল মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করে নি। তুমি খোদ পৃথিবী সিকান্দারের বিরুদ্ধে চলে গেলেও তার মুনতাহা মুন কখনোই তার বিরুদ্ধে যাবে না। তার মুনতাহা মুন তাকে বুঝতে শুরু করেছে। চিনতে শুরু করেছে। কারন তার বলা একটি কথাও ভুল না৷ সিকান্দার এই সব কিছু ভেবেই ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। কথা-কাটাকাটি করে সময় নষ্ট করলে তার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হতো। আর তাকে সত্যি সত্যি জেলে চলে যেতে হতো। তখন মুনতাহার দেখভাল কে করতো? কোথায় না কোথায় ঠাঁই হতো তার মনের কে জানে! সিকান্দার তো বাড়ি থেকে বের হয়েই সর্বপ্রথম তাকে নিয়ে হসপিটালে গিয়েছিল। স্ত্রীর চিকিৎসা করিয়েছ তারপর বাকিসব করছে৷ সিকান্দার চলে গেলে সেটুকুও জুটতো না।
দু’জন মিলে রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষ করে ঘুমের প্রস্তুতি নিলো৷ সিকান্দার দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে ছিলো আর মুনতাহা তার কোলে মাথা রেখে ঠান্ডা ফ্লোরে শুয়ে ছিলো।
সকালে আরেক মসিবত এসে কড়া নাড়লো সিকান্দারের দোরগোড়ায়। তখন সিকান্দার কেবলই ফজরের নামাজ টা শেষ করেছে। দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে খুলতেই বাড়িওয়ালা কে দেখলো। সালাম দিলো। বাড়িওয়ালা সালামের জবব দিয়ে ভেতরে ঢুকে বলল তাদের বাসা ছেড়ে চলে যেত। রুম ভাড়া দিবে না।
কথাটা শুনে সিকান্দার চমকালেও। কিছুক্ষণ চুপ থেকে কারন টা জিজ্ঞেস করলে বাড়িওয়ালা বলল- গতকাল রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফোন দিয়েছিল৷ তিনিই বলেছেন সে যদি তাদের থাকতে দেয় তাহলে তার জায়গায় ঝামেলা আছে দেখিয়ে বাড়ি ভাঙার ব্যবস্থা করবে। আর তিনি চান না তার শেষ সম্বল এই বাড়িটা অপরিচিত দুই ছেলেমেয়ের জন্য ভেঙে যাক। তার মতো ছোটখাটো মানুষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে পারবে না৷ তাদের হাত অনেকদূর পর্যন্ত লম্বা।
সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার আগে অবশ্য ভাড়া দিতে চেয়েছিল৷ কিন্তু বাড়িওয়ালা নেয় নি। তারা একটা হোটেলে খাবার খেয়ে ফের বাড়ি খুঁজতে শুরু করলো। আর এবার যতগুলো বাড়িতে ঢুকেছে সব গুলো বাড়িই সিকান্দারের মুখ দেখা মাত্রই মানা করে দিচ্ছে।
হাহ্ সেলিম মির্জা সিকান্দারের জীবনটা নরক বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো তারা। কোথা থেকে হুট করে নাদিম দৌড়ে এসে সিকান্দার কে জড়িয়ে ধরে বলল –
“ পর করে দিলি আমায় এভাবে? তোর বোন বিয়ে করতে চেয়েছিলাম নাকি? ”
সিকান্দার সময় নিয়ে ছাড়ালো নাদিম কে। গম্ভীর গলায় বলল,
“ তুই এখানে যে? চাচা চাচি জানলে রাগ করবে না? ”
“ তাদের ধার ধারে কে? আমাদের বাড়িতে তো আসবি না বললি। বাসা খুঁজে পেয়েছিস? ”
“ পেয়েছিলাম। তোর চাচা ক্ষমতা প্রয়োগ করে বের করে দিলো। এখন কোথাওই খুঁজে পাচ্ছি না রুম। ”
“ আমি একটা থাকার ব্যবস্থা করছি তোদের জন্য। ”
“ কোথায়? ”
“ আমার অফিসের এক কলিগের বাসা। ও একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে এক রুমের। ”
সিকান্দারের ভ্রু কুঁচকে আসলো।
“ আমি মুনতাহা কে নিয়ে তোর কলিগের বাসায় থাকবো এক রুমে? ”
“ আরে না, একটা না দুটো থাকার ব্যবস্থা করেছি। তুই ওখানে থাকবি। আর মুনতাহা অন্য জায়গায়। ”
“ মুনতাহা অন্য জায়গায় থাকবে মানে? কোথায় থাকবে? ”
মেইন রাস্তা দিয়ে আসা চলন্ত একটা রিকশা থামলো তাদের থেকে কিছুটা সামনে। নাদিম সেদিকটা ইশারা করে বলল,
“ মিস ঢিলার বাসায় থাকবে মুনতাহা। ”
ইলা রিকশা থেকে নেমে ভাড়া দিয়ে দৌড়ে হেঁটে এসে মুনতাহা কে জড়িয়ে ধরলো। এই মেয়েটা এত কষ্টে আছে অথচ তাকে জানালোও না!
চারজন মিলে বসলো একটা ক্যাফেতে। সেখানেই ডিসকাশন হলো মুনতাহা ইলার সাথে থাকছে। আর সিকান্দার নাদিমের কলিগের সাথে। আপাতত কদিন এভাবেই থাকুক। তারপর একত্রে থাকার ব্যবস্থা করবে তারা। সিকান্দার মুনতাহা প্রথমে রাজি হয় নি। কিন্তু ইলা নাদিম তাদের এমন জোড়াজুড়ি করলো যে রাজি হতে হলো। সিকান্দার একটা অটো ডেকে মুনতাহা আর ইলাকে ইলা দের বাসার সামনে নামিয়ে বিদায় জানিয়ে নাদিমের সাথে ওর কলিগের বাড়িতে গেলো।
ইলা মুনতাহাকে নিয়ে তার বাড়িতে ঢোকার পর ইলার বাবা মা খুব আদর যত্ন করলো মুনতাহার৷ ইলার মুখে খুব গল্প শুনেছে মুনতাহার৷ একটা মায়া কাজ করতো সবসময়।
নাদিম সিকান্দার কে তার কলিগের বাসায় রেখে তার কলিগ সুবহান কে বলল দেখাশোনা করতে৷ কোনো অসুবিধা হলে যেন নাদিম কে কল করে জানায়৷ সুবহান বললো সমস্যা হবে না।
মুনতাহার তো ফোন নেই। ইলার ফোন থেকেই মুনতাহা সিকান্দার কে ফোন দিয়ে কথা বার্তা। একটা দিন তাদের ভালোই গেলো। সুবহান সকালে চলে গেলে সিকান্দার পুরো ফ্ল্যাটে একটা থাকে। সেই সময় সে আগে ব্যাংকে চলে গেলো। সমস্যাগুলোর সমাধান করা প্রয়োজন। শাখা ব্যবস্থাপকের কক্ষে বসে প্রায় আধাঘণ্টা তর্ক করেও কোনো লাভ হলো না।
“আমার অ্যাকাউন্টে প্রায় দশ লক্ষ টাকা ছিল। আমার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে বত্রিশ লক্ষেরও বেশি ছিল। একদিনের মধ্যে সব টাকা কোথায় গেল?”
ম্যানেজার কম্পিউটারের স্ক্রিনে তাকিয়ে বললেন,
“স্যার, আমাদের সিস্টেমে যা দেখাচ্ছে আমরা সেটাই বলতে পারবো।”
“সিস্টেমে কী দেখাচ্ছে?”
“ আপনার অ্যাকাউন্টগুলো বর্তমানে রেস্ট্রিকটেড অবস্থায় আছে।”
“রেস্ট্রিকটেড মানে?”
“আপনি কোনো ধরনের লেনদেন করতে পারবেন না।”
সিকান্দার ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“কিসের ভিত্তিতে?”
“সেটা আমরা জানি না স্যার।”
“জানেন না মানে? এটা আমার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট। আমার উপার্জিত টাকা। কোন অভিযোগে বন্ধ করা হয়েছে?”
“আপনার অ্যাকাউন্টের টাকাগুলো নির্দিষ্ট অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় স্থানান্তর করা হয়েছে।”
সিকান্দারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
” প্রথমে বললেন রেস্ট্রিকটেড, লেনদেন করতে পারবো না৷ তার মানে আমার অ্যাকাউন্টে টাকা ছিলো আপনাদের কথাতেই তা স্পষ্ট আর এখন বলছেন আমার টাকা গুলো নির্দিষ্ট অনুমোদিত প্রক্রিয়া স্থানান্তর করা হয়েছে। সেটা কার অনুমোদনে?”
“সেটা আমাদের জানানো হয়নি।”
” বলতে নিষেধ করা হয়েছে? এটা সরাসরি আর্থিক জালিয়াতি। আমি অ্যাকাউন্ট হোল্ডার। আমার অনুমতি ছাড়া কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থ উধাও হয়ে গেছে।”
ম্যানেজার এবার অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন।
“আমাদের কাছে যে নির্দেশনা এসেছে, আমরা সেটাই অনুসরণ করছি।”
“নির্দেশনা কোথা থেকে এসেছে?”
“সেটা প্রকাশ করার অনুমতি নেই।”
সিকান্দারের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছিল।
“ দেখুন, আমি এই অ্যাকাউন্টের মালিক। আমার পরিচয়পত্র আছে, কাগজপত্র আছে, সব বৈধ নথি আছে। আপনারা কোন আইনে আমার টাকা আটকে রেখেছেন?”
ম্যানেজার এবার গলা শক্ত করলেন।
“স্যার, আপনি দয়া করে আদালতের শরণাপন্ন হন। আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই।”
“সিদ্ধান্ত? এটা আপনাদের সিদ্ধান্ত না। কারো নির্দেশে কাজ করছেন আপনারা।”
“আমি এ বিষয়ে আর কিছু বলতে পারবো না।”
সিকান্দার নিজের সব নথি টেবিলের উপর রেখে একের পর এক প্রমাণ দেখাতে লাগলো। অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট, লেনদেনের হিসাব, পরিচয়পত্র সব।
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কেউ সেগুলো দেখারও প্রয়োজন মনে করলো না। মনে হচ্ছিল সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া হয়েছে। এখানে সে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হতে এসেছে। শেষ পর্যন্ত ম্যানেজার একটাই কথা বললেন,
“আপনি কোর্টে যান স্যার। আমরা কিছু করতে পারবো না।”
রাগে, অপমানে সিকান্দারের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
ব্যাংক থেকে বেরিয়ে আসার পর সে থানায় গেলো৷ কিছুদিন আগেই যেই অফিসারের সাথে তার সখ্যতা গড়েছিল,তার সাথে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করলো। সব শুনে লোকটা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইলো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
“তুমি কি সত্যিই বুঝতে পারছো না তোমার বিরুদ্ধে কে নেমেছে?”
সিকান্দার স্থির চোখে তাকালো।
“আমি শুধু জানতে চাই, আইনি উপায়ে এর সমাধান সম্ভব কি না।”
লোকটা তিক্ত হাসলো।
“আইন?”
“হ্যাঁ। আমি যদি প্রমাণ দিই?”
“প্রমাণ? সিকান্দার, তোমার সমস্যা হলো তুমি এখনও ভাবছো এটা আইনগত লড়াই।”
“তাহলে?”
“এটা ক্ষমতার লড়াই।” লোকটা চেয়ার ছেড়ে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। “তুমি কোর্টে যাবে। তারা তারিখ দেবে।”
“তারপর?”
“আরেকটা তারিখ।”
“তারপর?”
“আরেকটা।”
সিকান্দার চুপ। লোকটা ফিরে তাকালো।
“তুমি উকিলের কাছে যাবে। কেউ তোমার মামলা নিতে চাইবে না। যারা নেবে তারা ফাইল ঘুরাবে। সময় নষ্ট করবে। আশা দেবে। তারপর হাত তুলে বসে থাকবে।”
“কিন্তু আমার প্রমাণ? সেগুলোর কোনো মূল্য নেই? আমার পরিশ্রমে ইনকাম করা টাকা পয়সা। আমার স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা৷ সব আমি এভাবে ছেড়ে দিব?”
“ শোনো সিকান্দার এ ছাড়া তোমার আর কোনো উপায় নেই। তোমার তো চাকরিও নেই এখন। এই দেশে অনেক সময় প্রমাণ সত্যকে জেতায় না। প্রমাণ কেবল ফাইলের ভেতর পড়ে থাকে।তোমার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধী নামেনি, সিকান্দার। তোমার বিরুদ্ধে নেমেছে এমন একজন মানুষ, যার একটা ফোন কলে মানুষ চাকরি হারায়, পদ হারায়, এমনকি জীবনটাও হারায়। তোমাকে কখনো ন্যায়বিচার দেওয়া হবে না। তোমাকে শুধু ঘোরানো হবে। এক অফিস থেকে আরেক অফিসে। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে। যতদিন না তুমি ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দাও। যদি সম্ভব হয় তাহলে তোমার বাবার কথা শুনো। ”
সিকান্দার দাঁড়িয়ে গেলো। শক্ত মুখে বলল,
“ কখনোই না। আমি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবো। যদি না পারি তাহলে যাকাত হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেলিম মির্জা কে আমি আমার সব টাকাপয়সা দান করে দিয়েছি বলে উল্লেখ করবো। এই অপমান টা তিনি আজীবন মনে রাখবে। তাকে কেউ এতগুলো টাকা যাকাত হিসেবে দিয়েছে। খুবই দূর্দশা তার সেজন্য। ”
সিকান্দার বেরিয়ে গিয়ে উকিলদের কাছে গেলো। তারাও এই সেম কথাই বললো। সিকান্দার সত্যি সত্যি সেলিম মির্জা কে যাকাত হিসেবে দান করে দিলো টাকা গুলো। কত মানুষকেই তো সিকান্দার যাকাত দিয়েছে।
কথাটা সেলিম মির্জার কানে যেতেই যেন বোয়াল মাছের মতো লাফিয়ে উঠলো। কতবড় সাহস বলে কি না যাকাত দিয়েছে!
সিকান্দার এক বিকেলে মুনতাহার সাথে দেখা করে ফ্ল্যাটে আসলো। আজ তাড়াতাড়ি সুবহান কে ফ্ল্যাটে দেখে একটু অবাক হলো। দরজা খোলা। ছেলেটা উল্টো ঘুরে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। সিকান্দার এগিয়ে যেতেই শুনতে পেলো সুবহান নাদিম কে ফোন কলে বলছে,
“ নাদিম ভাই আপনার কাজিনের জন্য আমার চাকরিটা চলে যেতে বসেছে। আপনি প্লিজ তার অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করুন৷ আপনি তো জানেন আমার অসুস্থ একটা মা আছে। এই চাকরি টা আমার জন্য কত জরুরী। বস আজ লাঞ্চ টাইমে ডেকে নিয়ে এই কথা গুলো বলেছে। আপনারা চাচার কাজ হয়তো। ”
নাদিম দেখছি বলে ফোনটা কেটে দিলো। সুবহান সিকান্দার কে দেখার আগেই সিকান্দার বের হলো বাসা থেকে। বিকেলটা বাহিরে কাটিয়ে সন্ধ্যার দিকে বাজার হাতে করে আসলো। সুবহান কোনো কথা বললো না। সিকান্দার সেগুলো রান্না ঘরে রেখে রুমে আসলো৷ সুবহান বেরিয়ে গেলো। সিকান্দার ম্লান হাসলো। টেবিল থেকে একটা কাগজ কলম নিয়ে সুবহানের উদ্দেশ্যে দুটো কথা লিখে বেরিয়ে চলে গেলো বাসা থেকে।
মুনতাহা কে জানালো না এই বিষয়টা। সিকান্দার গিয়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদে গিয়ে বসলো।
ইলা মুনতাহাকে নিয়ে জোর করে আজ ভার্সিটি তে নিয়ে গিয়েছিল। সিকান্দার বলেছিল যেতে। বলা বাহুল্য মুনতাহা এখন পরপুরুষের সামনে বেপর্দায় চলা ফেরা করে না। ইলার বাবার সামনে ভুলেও সে মুখ দেখিয়ে যায় নি। এখান থেকেই হয়তো মুনতাহার জীবনযাপনের আরো কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে।
আজ বাড়ি ফেরার পর মুনতাহা যখন গোসল করতে গেলো তখন ইলার বাবা আসলেন বাসায়। বিধ্বস্ত মুখ। ইলাকে নিজের রুমে ডেকে বললেন, আজ সেলিম মির্জা এসেছিল ভার্সিটি তে। অফিস রুমে ডেকে নিয়ে তাকে হুমকি দিয়ে বলেছেন সে যদি মুনতাহা মুন কে তাদের বাসায় রাখে তাহলে সেলিম মির্জা তার চাকরি কেঁড়ে নিবে৷ সেই সাথে বাড়ি ছাড়া করবে। এই একজনের উপার্জন দিয়ে তাদের সংসার চলে৷ চাকরি চলে গেলে তো পথে নামতে হবে৷ ইলা যেন মুনতাহা কে চলে যেতে বলে।
ইলার কান্না পেলো বাবার এই কথা শুনে। কোন মুখে সে মুনতাহাকে চলে যেতে বলবে? মেয়েটাতো আসতেই চায় নি৷ ইলাই জোর করে নিয়ে আসছে।
ইলার অবশ্য কষ্ট করে বলতে হয় নি। মুনতাহাই রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনে ফেলেছিল। রুমে এসে ইলার ফোনটা নিয়ে সিকান্দার কে ফোন করে বলল, সিকান্দার যেন এসে নিয়ে যায় তাকে। কারো বাসায় তাদের থাকতে হবে না। তারা রাস্তায় থাকবে৷ তারপর তাদের জন্য কারো কোনো সমস্যা না হোক। নিজেদের ঝামেলার প্রভাব অন্যদের উপর এসে না গড়াক।
সিকান্দার ফোন কল পাওয়ার সাথে সাথে এসে সন্ধ্যার সময় সে তার স্ত্রী কে নিয়ে গেলো। ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে গেলো ইলার পরিবারের কাছে। অনেক করেছেন তারা আপন না হয়েও। এটুকুই বা করে কজন? ইলা লজ্জায় মুখ তুলে তাকাতেও পারে নি। ইলা তারপরও জিজ্ঞেস করলো,
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ২৭
“ এখন আপনারা কোথায় থাকবেন ভাইয়া? ”
সিকান্দার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ দেখি আমার রব আমাদের কোথায় রাখেন। তিনি নিশ্চয়ই উত্তম পরিকল্পনাকারী। ঠিক মাথা গোঁজার আশ্রয় জুটিয়েই দিবেন আমাদের। কি ঠিক বললাম তো মন? ”
মুনতাহার শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সিকান্দারের হাত টা। একটুও ভুল নেই তার স্বামীর কথায়। ঠিক মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলিয়ে দিবে তাদের রব।
