সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩৩
Raiha Zubair Ripti
রাতভর মুষলধারে বৃষ্টি হলো। বহু মাসের তৃষ্ণার পর আকাশ যেন এক রাতেই উজাড় করে দিল তার সঞ্চিত রহমত। শুকিয়ে যাওয়া খাল-বিল, পুকুর, ডোবা ধীরে ধীরে পানিতে ভরতে শুরু করল। ফেটে যাওয়া জমির বুক বৃষ্টির পানি শুষে নিচ্ছে তৃষ্ণার্ত মানুষের মতো। কিন্তু এই রহমতের বৃষ্টি বহু বছরের অবহেলায় পড়ে থাকা ছোট্ট মসজিদটির লুকিয়ে থাকা দুর্বলতাগুলোও এক রাতেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
ফজরের আজান ভেসে উঠতেই সিকান্দার ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে রশিদ, জামাল,শফিক সাহেব আর রহিমুদ্দিন মিয়া। কাঁচা রাস্তা কাদায় পিচ্ছিল হয়ে গেছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও তারা সবাই মসজিদের দিকেই যাচ্ছে। মসজিদের সামনে পৌঁছে সিকান্দার থমকে দাঁড়াল। রাতের প্রবল বৃষ্টিতে জরাজীর্ণ মসজিদটির অবস্থা আরও করুণ হয়ে গেছে। মরিচা ধরা টিনের অসংখ্য ফুটো দিয়ে সারারাত পানি চুইয়ে পড়েছে।কাঁচা মাটির মেঝে কাদায় পরিণত হয়েছে। কোথাও হাঁটু সমান না হলেও গোড়ালি ডোবার মতো নরম কাদা। কয়েক জায়গায় মেঝের মাটি ধসে ছোট ছোট গর্ত হয়ে গেছে।বাঁশের একটি খুঁটিও একপাশে হেলে পড়েছে। অজুখানার পাশে জমে আছে বৃষ্টির পানি। মসজিদের ভেতরে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ইতিমধ্যে তার পা কাঁদায় ডুবে আছে। সে সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
” আজ তো নামাজ আদায় করাই কঠিন হয়ে গেল বাবা। দাঁড়ানোর মতো শুকনো জায়গাও অবশিষ্ট নেই। ”
মুসল্লিরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ বলল,
” তাইলে,বাড়ি ফিরা যাই নাকি? মনে অয়, আজ আর জামাত হইবো না।”
সঙ্গে সঙ্গে সিকান্দার মাথা নাড়ল।
” বাড়ি কেনো ফিরে যাবেন? আমাদের নিজ ঘরে একটু সমস্যা হলেই কি আমরা ঘর ছেড়ে চলে যাই? নাকি সমস্যা দূর করার চেষ্টা করি?”
সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইল। সিকান্দার মসজিদের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
” নামাজের ওয়াক্ত চলে গেলে সেটা আর ফিরে আসবে না। আগে আমরা জায়গায় জামাত আদায় করি। তারপর সূর্য উঠলেই সবাই মিলে আল্লাহর ঘরটা ঠিক করব। মসজিদের সামনের উঠোনটা একটু উঁচু। বৃষ্টির পানি সেখানে জমে নেই। কয়েকজন দ্রুত গিয়ে ঘর থেকে পাটি, চট আর মাদুর নিয়ে আসুন। আজ সেখানেই জামাত আদায় করি। ”
কথা শেষ হতেই রশিদ দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটল। জামালও কয়েকজন যুবককে সঙ্গে নিয়ে আশপাশের ঘর থেকে পুরোনো পাটি, চট আর মাদুর এনে বিছিয়ে দিল। অল্প সময়ের মধ্যেই মসজিদের সামনের উঁচু জায়গাটুকু নামাজের উপযোগী হয়ে উঠল। ইমাম সাহেব তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে জামাত আদায় করা যাবে।”
অল্পক্ষণের মধ্যেই তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। “আল্লাহু আকবার।” বৃষ্টিভেজা ভোরে খোলা আকাশের নিচে, ছোট্ট সেই জরাজীর্ণ মসজিদের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গ্রামের মানুষ ফজরের নামাজ আদায় করল। চারদিকে তখনও টুপটাপ বৃষ্টির পানি পড়ছে। দূরে ভেজা গাছের পাতায় বসে পাখিরা ডাকছে। দীর্ঘদিন পর আজ ফজরের জামাতে মানুষের সংখ্যাও ছিল অন্য দিনের তুলনায় অনেক বেশি। নামাজ শেষে কেউ আর বাড়ির দিকে হাঁটল না। একজন মসজিদের এই অবস্থা দেখে বলল,
“আমরা কত কী করছি বৃষ্টির লাইগা। কালা মুরগি দিছি, ছাগল দিছি, চাল দিছি, টাকা দিছি। কিন্তু এই আল্লাহর ঘরটার দিকে একবারও তাকাই নাই। পীরের ঘরের টিন নতুন। আর আল্লাহর ঘরের ফুটা টিন! ”
সিকান্দার এ কথা শুনে মসজিদের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আল্লাহ আমাদের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। কিন্তু তাঁর ঘরের এই অবস্থা রেখে আমরা কীভাবে নিশ্চিন্তে চলে যাই? আজকের দিনটা কি আল্লাহর ঘরের জন্য ব্যয় করলে কোনো সমস্যা হবে আপনাদের? মনে রাখবেন, আল্লাহর ঘর ঠিক করা কারও উপকার করা না। এটা আমাদের নিজেদের সৌভাগ্য যে আমরা আল্লাহর ঘরের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। ”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর এক বৃদ্ধ কৃষক লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে এলেন।
“আমি বুড়া মানুষ। বেশি কাজ করতে পারমু না। তবু যতটুকু পারি, করমু।”
বৃদ্ধ কৃষকের কথা শুনে রশিদ বলল, “আমিও আছি ভাই।”
জামাল হাতা গুটিয়ে বলল, “চলেন, আগে কাদা সরাই।”
শফিক সাহেবও এগিয়ে এলেন। এক মধ্য বয়সী কৃষক বললেন, “আমার ঘরে কিছু বাঁশ আছে। আইনা দিচ্ছি।”
ধীরে ধীরে আরও কয়েকজন গ্রামবাসী এগিয়ে এল। কেউ কোদাল দিয়ে কাদা তুলে বাইরে ফেলতে লাগল। কেউ শুকনো মাটি এনে গর্তগুলো ভরাট করল। কয়েকজন যুবক হেলে পড়া বাঁশের খুঁটিটা সোজা করে নতুন করে বেঁধে দিল। কেউ মরিচা ধরা টিনের ফুটোগুলো অস্থায়ীভাবে টিনের টুকরো আর আলকাতরা দিয়ে আটকে দিল, যাতে পরের বৃষ্টিতে অন্তত ভেতরে পানি না পড়ে। তারপর তারা সিদ্ধান্ত নিলো এবার ফলন ভালো হলে ধান বেচার টাকা দিয়ে মসজিদের কাজ ধরবে। নতুন চাল,নতুন খুঁটি লাগাবে। বারান্দা দিবে।
সিকান্দার শুনলো সে কথা। কি উচ্ছ্বাস আনন্দ দেখা গেলো। সিকান্দার কেবল তপ্ত শ্বাস ফেললো। তার কাছে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে সে নিজেই এই দায়িত্ব নিত । আকাশের দিকে চোখ তুলে মনে মনে বলল,
“ইয়া রব… বৃষ্টি দিয়ে আপনি জমিনকে জীবিত করেছেন। এবার এই মানুষগুলোর অন্তরকেও হিদায়াতের আলোয় জীবিত করে দিন। আমীন।”
তবে সকাল গড়াতেই পুরো গ্রামে এখন একটাই আলোচনা।
“সিকান্দার পোলাডার জন্য বৃষ্টি নামছে কত দোয়া করছে! এজন্য মনে অয় আল্লাহ রহমত দিছে। ” আবার কপউ কেউ বলল, “আল্লাহর লগে মনে অয় ওর কন্টাক্ট আছে। নইলে ওয় চাওয়া মাত্রই বৃষ্টি নামে? মনে অয় আল্লাহ ওরে পাডাইছে মানুষ রূপে আমাগোরে সাহায্য করার লাগি।
কিন্তু সবাই এক কথা বলছিল না। চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একজন বলল,
“না না, পীর সাবও তো কইছিল আমল চলতাছে। অইডার বরকতেই হইছে।”
পাশ থেকে আরেকজন মাথা নেড়ে বলল,
“তয় টাকা-পয়সা, কালা মুরগি, ছাগল এইগুলা নেওনের পর সাত-আট মাস বৃষ্টি অইল না ক্যান?”
লোকটা কোনো উত্তর দিতে পারল না।
আরেকজন বলল, “যেই রাইতে মানুষ প্রথমবার আল্লাহর ঘরে রা গিয়া কানলো, ঠিক সেই রাইতেই বৃষ্টি আইল। এইডা ভাবনের বিষয়।”
ওদিকে পীরের আস্তানায় আগের মতো ভিড় নেই। দু-একজন এসে আবার চলে যাচ্ছে। পীরের মুখে আগের সেই আত্মবিশ্বাসও নেই। সে গম্ভীর মুখে বসে থাকতেই কয়েকজন গ্রামবাসী এসে সালাম দিল। পীর নিজেই বলল,
“দেইখলা? আমার আমল কবুল হইছে। আমি না কইছিলাম রহমত আইবো?”
একজন বৃদ্ধ আস্তে করে বললেন,
“হুজুর… কিন্তু আমনে তো কইসিলেন আমনে আর বৃষ্টি আনতে পারবেন না। সব কিসু ছাইড়া দিসিলেন। ঐ পোলা নাকি অভিশাপ। কিন্তু ঐ পোলাই তো কাইন্দা কাইটা দোয়া দুরুদ পইড়া বৃষ্টি আনলো। ”
পীরের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
” কে কইছে তোমারে এসব? ”
” গেরামের মানুস কওয়া বলা করতাছে সব জায়গায়। আসার পথে শুনছি। ”
” ভুল শুনছো। বৃষ্টি আনছি আমি। ঐ পোলার গুণগান গাইবা না খবরদার। দূরে দূরে থাকবা।
বৃদ্ধ আর কথা বাড়ালেন না। কিন্তু তার চোখে আগের সেই অন্ধ বিশ্বাসটুকু আর ছিল না।
এদিকে রহিমুদ্দিন মিয়ার বাড়ির উঠোনে সকাল থেকেই মানুষ আসতে শুরু করেছে। সবার মুখে একটাই আলোচনা। কে সেই মানুষ, যার আগমনের পরই যেন আল্লাহর রহমত হয়ে নেমেছে বহু প্রতীক্ষিত বৃষ্টি? শুকিয়ে যাওয়া গ্রামের বুক জুড়ে আবারও প্রাণ ফিরেছে। তাই কৌতূহল সামলাতে না পেরে সবাই ছুটে এসেছে রহিমুদ্দিন মিয়ার বাড়িতে।
গ্রামের প্রায় সব মানুষকে একই দিকে যেতে দেখে ক্রোধে ফেটে পড়ল পীর। তার চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। এতদিন যে মানুষগুলো তার কথায় উঠত-বসত, আজ তারা সবাই অন্য একজনকে দেখতে ছুটছে! অপমান আর ঈর্ষায় তার বুক জ্বলে উঠল। ফুঁসতে ফুঁসতে সে চেয়ারম্যান বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা ধরল।
মোহনগঞ্জের প্রধান সড়কের পাশেই প্রায় এক বিঘা জমির ওপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় এক পুরোনো দোতলা ভবন। সময়ের ছাপ দেয়ালের গায়ে স্পষ্ট হলেও এখনও তার আভিজাত্যে ভাটা পড়েনি। একসময় এ অঞ্চলের জমিদার ছিলেন এ বাড়ির পূর্বপুরুষেরা। তারা ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। পরবর্তীকালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও এলাকার মানুষের কাছে তাদের পরিবারের প্রভাব ও সম্মান অনেকটাই অটুট রয়েছে। বর্তমানে সেই বংশের উত্তরসূরিই মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।
পীর সাহেব কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করেই মূল ফটক পেরিয়ে অন্দরমহলে প্রবেশ করলেন। বাড়ির কয়েকজন কর্মচারী তাকে দেখে সম্মান জানিয়ে সালাম দিল। কিন্তু তিনি কারও সালামের জবাব দিলেন না। গম্ভীর মুখে শুধু প্রশ্ন করলেন,
“কর্তাবাবু বাড়িতে আছেন?”
একজন কাজের লোক মাথা নেড়ে বলল,
“জি, বাবু বাড়িতেই আছেন।”
আর একটি কথাও না বলে পীর সাহেব দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলার দিকে উঠে গেলেন। দোতলার প্রশস্ত বারান্দা পেরিয়ে পীর সাহেব সোজা চলে এলেন বৈঠকখানার সামনে। দরজাটা আধখোলা। ভেতরে আরামকেদারায় বসে সকালের পত্রিকা পড়ছিলেন চেয়ারম্যান রমেশ রায় চন্দ্র। বয়স ষাটের কাছাকাছি হলেও ব্যক্তিত্বে এখনো দৃঢ়তা স্পষ্ট। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মানুষটির চোখে ছিল মোটা ফ্রেমের চশমা। দরজায় পায়ের শব্দ শুনে তিনি পত্রিকা ভাঁজ করে তাকালেন।পীরকে দেখে শান্ত গলায় বললেন,
” আরে পীর যে! আসো,ভেতরে আসো। দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো। ”
কিন্তু বসার মতো ধৈর্য ছিল না পীরের। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,
” বসার সময় নেই চেয়ারম্যান সাহেব। ”
” মুখটা দেখে তো মনে হচ্ছে ঝড় বয়ে গেছে।”
পীর সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
“ঝড় না, সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
চেয়ারম্যান ভ্রু তুলে বলল,
“বলো দেখি।”
” গ্রামের অবস্থাটা দেখেন। রহিমুদ্দিনের বাড়িতে যে লোকটা এসেছে, তার জন্য আজ পুরো মোহনগঞ্জ পাগল হয়ে গেছে। সবাই বলছে, ওই লোকের বরকতেই নাকি বৃষ্টি হয়েছে। সকাল থেকে আমার দরজায় একটা মানুষও আসেনি। সবাই ছুটেছে ওর কাছে।”
” মানুষ কৌতূহলবশত গেছে। এতে এত রাগারাগির কী আছে? ”
” আপনি ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নিচ্ছেন। আজ যদি ওর কথায় মানুষ চলে, কাল আর আমার কাছে কেউ তাবিজ নিতে আসবে না। আমার কথা কেউ শুনবে না। তখন আপনার চেয়ারম্যানি আর আমার খানকাহ দুটোরই কোনো মূল্য থাকবে না।
রমেশ রায় রায় চোখ সরু হয়ে এলো। কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে ধীরে ধীরে উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দূরে মানুষের ভিড় দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
“এই গ্রামে মানুষের মাথা সবসময় কারও না কারও পায়ের নিচে থাকতে হয়। এতদিন ছিল তোমার নিচে। আর এখন যদি অন্য কারও পায়ের নিচে চলে যায়, তাহলে কাল আমার কথাও কেউ শুনবে না।”
পীর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তাই তো আপনার কাছে এলাম। লোকটাকে এখনই থামাতে হবে।”
চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ক্ষমতা হারানোর ভয় আর ষড়যন্ত্রের ঝিলিক একসঙ্গে খেলা করছে।
“থামানো হবে। তবে লাঠি অস্ত্র দিয়ে নয় মানুষের মুখ দিয়েই।”
পীর কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এলো।
“মানে?”
চেয়ারম্যান মুচকি হেসে বলল,
“গুজবের চেয়ে ধারালো অস্ত্র আর নেই। আজই খবর ছড়িয়ে দাও লোকটা ভণ্ড, জাদু জানে, মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এসেছে। কয়েকজনকে টাকা দিলেই বাকিটা গ্রাম নিজেই ছড়িয়ে দেবে।”
পীরের মুখে ধীরে ধীরে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
“আপনি না থাকলে এত বুদ্ধি আমার মাথায় আসত না।”
রমেশ রায় চন্দ্র লাঠির মাথায় হাত বুলিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“মনে রেখো, ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে মানুষকে সত্যের চেয়ে ভয় বেশি দেখাতে হয়। আর যে আমাদের প্রভাবের ওপর আঘাত করবে। তাকে মাথা তুলেই দাঁড়াতে দেওয়া যাবে না।”
দুজনের চোখাচোখি হতেই কক্ষজুড়ে নেমে এলো অশুভ নীরবতা। যেন সেই নীরবতার আড়ালেই কোনো অন্ধকার ষড়যন্ত্র জন্ম নিল। কয়েক মুহূর্ত পর দুজনের ঠোঁটেই ফুটে উঠল অর্থবহ এক হাসি। এরপর আর একটি কথাও না বলে পীর সাহেব ঘুরে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেলেন। সিঁড়ির বাঁকে তার মুখোমুখি হলো এক তরুণী। বয়স বড়জোর তেইশ-চব্বিশ। গায়ের রং দুধে-আলতা, টানা চোখ, ধারালো নাক আর মুখজুড়ে অদ্ভুত এক স্থিরতা। কপাল শূন্য, হাতে কোনো শাখা পলা নেই,পরনে সাদা শাড়ি। অথচ বিধবার সেই সাদামাটা সাজও তার ব্যক্তিত্বকে ম্লান করতে পারেনি। মাত্র ছয় মাস আগে রহস্যজনকভাবে মারা যায় তার স্বামী। গভীর রাতে নিজ ঘরে নিথর অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তাকে। চিকিৎসকরা নিশ্চিত কোনো কারণ বলতে পারেননি। কেউ বলেছিল হৃদ্রোগ, কেউ বলেছিল বিষক্রিয়া। মৃত্যুর আসল কারন জানা যায় নি। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই বিনোদিনী বাবার বাড়িতেই রয়েছে। বাইরে থেকে তাকে শান্ত, মার্জিত আর সংযত মনে হলেও, সে ভীষণ রাগী বদমেজাজের স্বভাবের। তার ভেতরের চিন্তাভাবনা কেউ কোনোদিন বুঝে উঠতে পারেনি। গ্রামের লোকজন তাকে ভয় পায়।
পীর সাহেবকে দেখেও তার মুখের কোনো পরিবর্তন হলো না। শুধু একবার শীতল দৃষ্টিতে লোকটাকে মেপে নিল। এই মানুষটাকে সে কখনোই পছন্দ করে না। কারণটা ঠিক ঘৃণা নয়, বরং এক ধরনের বিরক্তি। লোকটার অতিরিক্ত ধর্মীয় ভান, নাটকীয় চালচলন আর মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা তার কাছে অত্যন্ত বিরূপ লাগে। পীর সাহেবের দিকে একবার তাকাল বিনোদিনী।
“বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন?”
পীর সাহেব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন,
“জি।”
“জরুরি কিছু?”
“গ্রামের ব্যাপার।”
“তাই নাকি?”
বিনোদিনীর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। তবে সেই হাসিতে উষ্ণতা ছিল না।
“গ্রামের চিন্তা করতে আপনাকে দেখলে অবাকই লাগে।”
পীর এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আর দাঁড়ালেন না। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে অন্দরমহল পেরিয়ে চলে গেলেন। পীর চলে যেতেই বিনোদিনী বারান্দা থেকে নিচের উঠোনে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে ডাক দিল,
“হরিমতি!”
দৌড়ে এসে দাঁড়াল মধ্যবয়সী দাসী।
“জি, দিদিমণি।”
“পীরটা এত সকালে কেন এসেছিল?”
হরিমতি চারদিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“দিদিমণি, গ্রামের সবাই আজ রহিমুদ্দিন মিয়ার বাড়িতে ভিড় করছে।”
“কেন?”
“এক যুবক আইছে। নাম নাকি সিকান্দার শাহ্।”
বিনোদিনীর ভ্রু কুঁচকে গেল। ঠোঁটের কোনে আওড়াল সিকান্দার শাহ্!
” শুনছি মানুষ কইতেছে, তার আসার পরই নাকি আল্লাহ বৃষ্টি দিছেন। সেই কথা নিয়াই পীর সাহেব খুব রাগে ছিলেন। তাই বাবুর সঙ্গে দেখা করতে আইছিলেন।”
বিনোদিনী ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার নামটা উচ্চারণ করল, সিকান্দার শাহ্।
হরিমতি কৌতূহল নিয়ে বলল,
“দিদিমণি, শুনছি মানুষটা নাকি খুব ধার্মিক। সবাই তারে একনজর দেখার জন্য পাগল হইয়া গেছে।”
বিনোদিনীর চোখে বিরক্তির ছায়া নেমে এলো।
“এই গ্রামের মানুষও না… আজ একজন, কাল আরেকজন। কাউকে মাথায় তুলতে সময় লাগে না।”
“আপনি দেখবেন ?”
“একজন মুসলমানকে দেখার মতো এত অবসর আমার নেই।”
তার গলায় ছিল শীতল অবজ্ঞা। হরিমতি আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। বিনোদিনী ধীরে ধীরে নিজের কক্ষের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তবে দরজার কাছে গিয়ে অদ্ভুতভাবে একবার থেমে গেল। দূরে গ্রামের মুসলিম পাড়ার দিকে একবার তাকাতেই তার ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট এক তাচ্ছিল্যের রেখা ফুটে উঠল। এ গ্রামের মুসলমানদের সে পছন্দ করে না। খুবই বিরক্ত লাগে। সেখানে সিকান্দার শাহ্ নামের লোকটা নাকি ধার্মিক! তাকে তো আরো অপছন্দ হবে তাহলে তার।
সেদিন বাজার থেকে ফেরার সময় সিকান্দার নিজের জন্য একটি লুঙ্গি, সাদা গেঞ্জি, একটি সাধারণ শার্ট, গামছা ও একজোড়া স্যান্ডেল কিনে আনল। মুনতাহার জন্যও কিনল একটি সাদামাটা রেডিমেড থ্রি-পিস আর একজোড়া স্যান্ডেল। একসময় নামিদামি ব্র্যান্ড ছাড়া সে নিজের কিংবা স্ত্রীর জন্য কিছুই কিনত না। দামি পোশাক, দামি ঘড়ি, দামি জুতা সবই ছিল তাদের নিত্যদিনের জীবনের অংশ। কিন্তু জীবনের চাকা যে সবসময় একরকম ঘোরে না, তা সিকান্দার খুব ভালো করেই জানে। টাকা ছিল বলে একসময় খরচ করেছে। আজ নেই, তাই সামর্থ্যের মধ্যেই জীবনকে গুছিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
এদিকে শিফা রাজশাহীতে ফিরে গেছে। বাবার অসুস্থতা ও অপারেশনের জন্য টানা কয়েকদিন পড়াশোনার বাইরে ছিল সে। সামনে পরীক্ষা। আরও অনুপস্থিত থাকলে ক্ষতি হবে। তাই শফিক সাহেব নিজেই মেয়েকে ফিরে যেতে বলেছেন।
সন্ধ্যা নেমেছে। পশ্চিম আকাশের লাল আভাও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। সিকান্দার মুনতাহার দিকে তাকালো। তার বউ মাশা-আল্লাহ অনেক মেধাবী। মেধাবী না হলে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়? তবে খুব খারাপ লাগলো বউয়ের এখন পড়াশোনা হচ্ছে না বলে। সেজন্য সন্ধ্যার দিকে মুনতাহার কাছে একান্তে একটু বসলো। শান্ত গলায় বলল,
” আপনার কিন্তু পড়াশোনা থেমে থাকবে না মন। আপনি ঢাকায় যাবেন। অনার্স মাস্টার্স কমপ্লিট করবেন। আল্লাহ চাইলে এরপর পিএইচডির জন্য বিদেশেও যাবেন। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা আমি করব।”
কথাগুলো শুনেই মুনতাহার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়! এই দুটি শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার অসংখ্য নির্ঘুম রাত, অগণিত চোখের জল আর অক্লান্ত পরিশ্রম। সে জানে, কত বাধা পেরিয়ে সেখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। যদি চান্স না পেত, হয়তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হতো, কিংবা পরিবারের চাপে পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যেত। অথচ আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা নেমে আসে। সেখানে রয়েছে অসংখ্য তিক্ত স্মৃতি, অপমান, ভয় আর এমন কিছু মুহূর্ত, যেগুলো সে আর কোনোদিন মনে করতে চায় না। চোখের কোণে জমে ওঠা জল দ্রুত আড়াল করে মুনতাহা মৃদু হেসে বলল,
“থাক না এত পড়াশোনা করে কী হবে?”
সিকান্দার সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।
” কি হবে মানে? আপনি কি আমার বর্তমান অবস্থা নিয়ে চিন্তিত? ভাবছেন, আমি আর আপনার পড়াশোনার খরচ চালাতে পারব না?এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানেই কাজ শুরু করব। নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করব। আপনার পড়াশোনার দায়িত্ব আমার। আপনি আপাতত ঢাকায় গিয়ে হলে উঠবেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাসার ব্যবস্থা করা যাবে।”
মুনতাহা ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“আর আপনি?”
“আমি এখানেই থাকব। গ্রামের একজনের কয়েক বিঘা জমি দেখেছি। বয়সের কারণে তিনি আর নিজে চাষ করতে পারেন না। জমিটা বর্গা নেওয়ার কথা ভাবছি। দেখি কি চাষ করা যায়। ”
মুনতাহা এবার মাথা নেড়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আমি ঢাকায় যাব না।”
সিকান্দার বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
“কেন?”
“কারণ আমি আমার স্বামীকে রেখে একা এত দূরে কখনোই থাকব না।”
“কিন্তু আপনার পড়াশোনা? আমি চাই না আমার জন্য আপনার পড়াশোনা থেমে থাকুক। ”
“পড়াশোনা করব। অবশ্যই করব। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। আমি আর সেই শহরে ফিরতে চাই না। ওখানে আমার অনেক দুঃসহ স্মৃতি পড়ে আছে। সেই শহর আমাকে আবারও সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেবে। আমি আর পারব না। প্রয়োজন হলে এখানকার কোনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজে ভর্তি হব। তবুও আপনার কাছ ছেড়ে কোথাও যাব না।”
সিকান্দার কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
“ঠিক আছে। তবে একটি শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“যেখানেই পড়ুন না কেন, পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না। আপনার এই মেধাকে নষ্ট হতে দিবেন না।”
মুনতাহার ঠোঁটের কোণে দীর্ঘদিন পর এক টুকরো শান্ত হাসি ফুটে উঠল।
“কথা দিলাম।”
সিকান্দার কিছু অর্থ দিয়ে প্রায় চার বিঘা জমি বর্গা নিলো। সিকান্দার ধান চাষ করবে শুনে রশিদ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
“আপনে ধান চাষ করবেন?”
সিকান্দার হেসে বলল,
” চমকাচ্ছ কেনো? ”
” আমনে না শিক্ষিত মানুস? ”
” শিক্ষিত মানুষরা কি ধান চাষ করে না রশিদ? আমাদের নবী-রাসূলদের অনেকেই নিজের হাতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কৃষিকাজে লজ্জার কিছু নাই। কাজ কাজই। কাজকে কখনো শিক্ষিত অশিক্ষিত বলে আলাদা করা যায় না। ”
অনেকে তার এই কাজে তাকে উৎসাহী করলেও অনেকে নিরুৎসাহিত করতে লাগলো। আড়ালে আবডালে ঠাট্টার সুরে বলতে লাগলো,
” পারবে না। জীবনে কুনো দিন খেতখামারের কাম করসো? করো নাই। নতুন ছেলের আবার চাষবাস! এও বুঝি কৃষকের কাজ! ”
সিকান্দার শুনলো। শোনা শেষে শুধু মুচকি হেঁসে মন থেকে ঝেড়ে ফেললো। সিকান্দার গ্রামের কিছু মানুষের আন্তরিকতা দেখে প্রথমে চমকে উঠলেও পরক্ষণেই তার মন ভার হয়ে গেল। দুদিন আগের একটি ঘটনাই যেন সবকিছু বদলে দিয়েছে। বৃষ্টি নামার কদিন পর বিকেলে গ্রামের এক কৃষক দৌড়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন,
“বাবা, একবার চলো আমাগোর বাড়ি। আমার পোলাডা কেমন জানি করতাসে জ্বরে।
সিকান্দার এক মুহূর্তও দেরি করেনি। লোকটির সঙ্গে ছুটে গিয়েছিল। দেখল, সাত-আট বছরের ছোট্ট একটি ছেলে জ্বরে কাঁপছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ছেলেটির মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শুধু কাঁদছেন। সিকান্দার ছেলেটির কপালে হাত রাখল। জ্বর অনেক বেশি। সে শান্ত গলায় বলল,
“ডাক্তার দেখিয়েছেন?”
মহিলা মাথা নিচু করে বললেন,
“না বাবা। পীর সাব তাবিজ দিছিল। কইছিল ঠিক অইয়া যাইবো। কিন্তু ঠিক তো হইলো না। ”
সিকান্দার খুবই বিরক্ত বোধ করলো। ডক্টরের কাছে না গিয়ে গিয়েছিল পীরের কাছে! হায় খোদা! এত বোকা হয় মানুষ!
“রোগ হলে চিকিৎসা নেওয়াও প্রয়োজন। আল্লাহ যেমন রোগ দেন, তেমনি তার শিফার ব্যবস্থাও সৃষ্টি করে রেখেছেন। শুধু তাবিজের ওপর ভরসা করে বসে থাকা ঠিক নয়। রোগ হলে চিকিৎসাও করাতে হয়। আমাদের রাসূল ﷺ নিজেও চিকিৎসা গ্রহণ করতে বলেছেন। অসুস্থ হলে আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন, সাথে চিকিৎসাও করাবেন। শুধু দোয়া করে বসে থাকবেন না, আবার শুধু ওষুধের ওপরও ভরসা করবেন না। দুটোই করবেন।”
সিকান্দার ছেলেটির মাথায় আলতো করে হাত রাখল। তারপর রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত শিফার দোয়া পড়ল,
“আল্লাহুম্মা রব্বান্-নাস, আযহিবিল বা’স, ইশফি আন্তাশ-শাফি, লা শিফা’আ ইল্লা শিফাউক, শিফা’আঁ লা ইউগাদিরু সাকামা।”
অর্থ: “হে আল্লাহ! হে মানবজাতির প্রতিপালক! আপনি এই কষ্ট ও রোগ দূর করে দিন। আপনিই শিফাদানকারী। আপনার দেওয়া শিফা ছাড়া কোনো শিফা নেই। এমন পূর্ণাঙ্গ শিফা দান করুন, যার পরে আর কোনো রোগ-ব্যাধি অবশিষ্ট না থাকে।”
তারপর সে পরিষ্কার কাপড়ে ঠান্ডা পানি ভিজিয়ে কপালে রাখতে বলল। যতটা সম্ভব শরীর ঠান্ডা রাখার পরামর্শ দিল। তারপর নিজের কাছে থাকা জ্বরের ওষুধের একটি ডোজ শিশুটির বাবার হাতে দিয়ে বলল,
“সময়মতো এটা খাওয়ান। ভোর হলেই স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। চিকিৎসায় দেরি করবেন না।”
পরদিন সকাল নাগাদ শিশুটির জ্বর অনেকটাই কমে গেল। দুপুরের মধ্যে সে চোখ খুলে পানি চাইলো। বিকেলে তাকে পাশের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু গ্রামের মানুষ ঘটনাটিকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করল। কেউ কেউ বলল,”সিকান্দারের দোয়াতেই পোলাডা ভালো অইছে। ও আল্লাহর খুব প্রিয় বান্দা। ওর দোয়া সরাসরি কবুল অয়।এমন মানুষ গেরামে অহন পর্যন্ত আসে নাই। আল্লাহ ওরে পাডাইসে। আল্লাহর লগে ওর যোগাযোগ আছে। ”
এসব কথাবার্তা কানে আসলে সিকান্দার ভীষণ আহত হয়। বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। একদিন মসজিদের সামনে কয়েকজনকে ডেকে সে বলল,
“আপনারা আমার সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করছেন কেনো? আমি অসাধারণ বা আপনাদের ভাবনার মতো তেমন কেউই নই। আপনারা ভুল করছেন। আমি আপনাদেরই মতো একজন সাধারণ মানুষ। আমার নিজের কোনো ক্ষমতা নেই। ”
” তোমার দোয়াতেই তো পোলাডা ভালো অইল। হেইদিন বৃষ্টিও নামলো। ”
” না চাচা। আল্লাহ তাকে সুস্থ করেছেন। আর বাচ্চাটার চিকিৎসাও হয়েছে। যদি চিকিৎসা না করাতো, তাহলে কী হতো আমরা কেউ জানি না। আর সেদিন বৃষ্টি নেমেছে আল্লাহর হুকুমেই। আমি তো একা দোয়া করি নি। দোয়া প্রত্যেক মুমিনই করতে পারে। একজন বাবা তার সন্তানের জন্য দোয়া করতে পারেন, একজন মা পারেন, একজন কৃষক পারেন, একজন শ্রমিকও পারেন। আল্লাহ বান্দার তাকওয়া ও আন্তরিকতা দেখেন, পরিচয় বা খ্যাতি নয়। ”
আরেকজন বললেন,
“তয় আল্লাহ তোমার কথাই বেশি শোনেন।”
সিকান্দার মাথা নেড়ে বলল,
“এ কথাও বলবেন না। আল্লাহ তাঁর সব বান্দার দোয়া শোনেন। কেউ দ্রুত ফল পায়, কেউ পরে পায়, আবার কোনো দোয়ার প্রতিদান আখিরাতের জন্য রেখে দেন। এটা সম্পূর্ণ তাঁর হিকমত। আজ আমাকে বড় ভাবছেন, কাল অন্য কাউকে ভাববেন। এভাবে মানুষকে এমন জায়গায় বসাবেন না, যে জায়গার হক একমাত্র আল্লাহর। যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসেন, তাহলে আমার কথা মানুন অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যান, আর আল্লাহর কাছেই শিফা প্রার্থনা করুন। কোনো পীরের কাছে যাবেন না। কোনো পীরের উপর আল্লাহর চাইতে বেশি বিশ্বাস রাখবেন না। আপনারা আমার গুনগান না গেয়ে আমার,আমাদের রবের গুনগান গান। এই সকল প্রশংসার দাবিদার আমাদের রব। ”
সিকান্দার যতই বোঝানোর চেষ্টা করুক, গ্রামের মানুষের বিশ্বাস এত সহজে বদলানোর নয়। বছরের পর বছর ধরে বুকের গভীরে শেকড় গেড়ে বসে থাকা কুসংস্কার কি আর দু-এক দিনের কথায় উপড়ে ফেলা যায়? তারা ভণ্ড পীরের ওপর থেকে আস্থা হারাতে শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই শূন্যস্থানেই অজান্তে বসিয়ে দিচ্ছে সিকান্দারকে। মানুষটা বদলাচ্ছে, অথচ বিশ্বাসের ভিত্তিটাই বদলাচ্ছে না।
একসময় একে একে সবাই মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেল। চারপাশে আবার নীরবতা নেমে এলো। ভেজা মাটির গন্ধে বাতাস ভারী। টিনের কার্নিশ বেয়ে এখনো টুপটাপ করে বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ছে।
সিকান্দার ধীরে ধীরে মসজিদের উঠোনে এসে দাঁড়াল। মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। সেই আকাশের ওপারেই তো তাঁর রব যিনি অন্তরের অদৃশ্য কথাও শুনে নেন, না বলা আর্তনাদও জানেন।
তার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। দুই হাত ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠল। চোখ দুটো মুহূর্তেই অশ্রুতে ভরে গেল। কাঁপা কণ্ঠে সে বলতে শুরু করল,
“ইয়া রব আজ আমার অন্তর ভয়ে কাঁপছে। এই মানুষগুলো এতদিন এক ভণ্ড মানুষের ওপর ভরসা করে ভুল করেছে। আজ তারা সেই একই ভুল আমার ক্ষেত্রে করতে শুরু করেছে। হে আমার রব, দয়া করে আমাকে আরেকটি কুসংস্কারের কেন্দ্র বানাবেন না। আমার মাধ্যমে যদি কেউ আপনাকে ভুলে যায়, তবে আমার এই জীবন,আমার এই দাওয়াত বৃথা।
ইয়া রব তাদের অন্তরকে আমার থেকে ফিরিয়ে আপনার দিকে ফিরিয়ে দিন। তাদের হৃদয়ে যদি আমার জন্য অতিরিক্ত কোনো সম্মান জন্ম নিয়ে থাকে, তবে সেটাকে আপনার মহত্ত্বের সামনে নত করে দিন। তাদের শিখিয়ে দিন কোনো মানুষ অলৌকিক নয়, কোনো বান্দা রহমতের মালিক নয়, কোনো সৃষ্টি আপনার ক্ষমতার অংশীদার নয়। এ সম্মান, এ মর্যাদা, এ বিশ্বাস সবই তো আপনার প্রাপ্য। মানুষ ভুল করে অজ্ঞতাবশত সেগুলো আমার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। আমি তো তাদেরই মতো একজন দুর্বল বান্দা। আমার নিজের কোনো শক্তি নেই, কোনো ক্ষমতা নেই। ইয়া রব, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আমার নিজের কোনো ক্ষমতা নেই। আমি কারও রোগ ভালো করতে পারি না, কারও রিজিক বাড়াতে পারি না, আকাশ থেকে একফোঁটা বৃষ্টিও নামাতে পারি না। এই গ্রামের মানুষ বহু বছর এক মানুষের ওপর নির্ভর করে ভুল করেছে। তারা যেন সেই একই ভুল আমার ক্ষেত্রেও না করে। আমার অন্তরে রিয়া, অহংকার, আত্মতৃপ্তি এসবের একটি কণাও যেন জায়গা না পায়। মানুষ যদি আমাকে আসমানে তুলতে চায়, আপনি আমাকে আমার প্রকৃত পরিচয় স্মরণ করিয়ে দিন। আমি আপনারই এক দুর্বল, অসহায় বান্দা, যে প্রতিটি নিঃশ্বাসেও আপনার মুখাপেক্ষী।
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৩২
হে পরওয়ারদিগার, যদি আমার মাধ্যমে মানুষের ঈমান বাড়ে, তবে আমাকে কবুল করুন। আর যদি আমার কারণে তারা আবার একজন মানুষকে অসাধারণ ভেবে বসে, তবে আমাকে আড়াল করে দিন। কিন্তু তাদেরকে সত্য থেকে আড়াল করবেন না। এই গ্রামের বুক থেকে কুসংস্কারের শেকড় উপড়ে ফেলুন। তাদের এমন ঈমান দিন, যাতে তারা বিপদে কোনো পীরকে নয়, কোনো তান্ত্রিককে নয়, কোনো সিকান্দারকেও নয়। সবার আগে শুধু আপনাকেই ডাকে।
আমীন।
ইয়া রব্বাল আলামীন।”
