সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৮
Raiha Zubair Ripti
জ্যোৎস্না রাত…আকাশে থালার মতো ইয়া বড় চাঁদ। মৃদুমন্দ ঠান্ডা বাতাস। দূর থেকে ভেসে আসা পাখির কিচিরমিচির ডাক। অদ্ভুত রকমের সুন্দর। জানালা দিয়ে শো শো করে বাতাস আসছে সিকান্দারের রুমে। সেই বাতাস ছুঁয়ে দিচ্ছে তাদের সর্বাঙ্গে। সিকান্দার মুনতাহার বাহু ধরে বিছানায় বসালো। তারপর মুনতাহার কপালে তার ডান হাত রেখে কল্যাণ ও বরকতের জন্য দোয়া করে যা সুন্নত।
“ আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা ‘আলাইহি, ওয়া আ’ঊযু বিকা মিন শাররিহা ওয়া মিন শাররি মা জাবালতাহা ‘আলাইহি। ”
যদিও সিকান্দার ভরা মজলিসে মুনতাহার দেনমোহর পরিশোধ করেছিল। তবে সেটা চেকের মাধ্যমে করেছিল। ব্যাংকে নগদ এত অর্থ ছিলো না তখন। যার জন্য সে তুলতে পারে নি। তবে বাসর ঘরে আসার আগে ব্যাংকে গিয়ে তুলে এনেছিল তার এক পরিচিত লোকের মাধ্যমে । আর সেটা আনতে গিয়েই রুমে আসতে তার কিছুটা দেরি হয়েছে। সিকান্দার নিজেও এবার বসলো মুনতাহার পায়ের কাছে। পাশের ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে কালো ব্যাগ টা নিয়ে মুনতাহার কোলের উপর রেখে বলল-
“ আপনার হক আপনি বুঝে নিন এবার মন। ”
মুনতাহা একবার কালো মাঝারি আকারের ব্যাগ তো আরেকবার সিকান্দারের দিকে তাকালো। কিসের হক ঠিক বুঝলো না। সেজন্য প্রশ্ন করলো-
“ কি আছে এতে?”
“ আপনার মোহরানা। আপনার সম্মান। তখন নগদ অর্থ তুলতে না পারায় চেক দিয়েছিলাম। ”
মুনতাহা ব্যাগের চেইন খুলে দেখলো তাতে হাজার হাজার টাকার বান্ডিল। পরক্ষণেই চেইন লাগিয়ে বলল-
“ আমি এই টাকা দিয়ে কি করবো? ”
“ আপনার যা ইচ্ছে তাই করবেন। কারন এগুলো আপনার। আপনার মন মতো খরচ করবেন। ”
“ আমার দরকার নেই এই টাকার। আপনি আছেন। এটাই তো আমার জন্য যথেষ্ট। ”
“ তারপরও এটা আপনার দরকার। ভবিষ্যৎ তো আর আমরা আঁচ করতে পারি না। কখন কি ঘটে বলা যায় না। এটা আপনার সিকিউরিটি হিসেবে কাজ করবে আমার অনুপস্থিতিতে। ”
“ আচ্ছা তাহলে এগুলো আপনার কাছেই রাখুন। এত টাকা আমি কোথায় রাখবো বলুন?”
“ আমি আগামীকাল ব্যাংকে গিয়ে আপনার নামে অ্যাকাউন্ট খুলে দিব তাহলে। সেখানেই রেখে আসবো বরং। ”
“ আচ্ছা ঠিক আছে। একটা কথা শুনুন। ”
“ হু বলুন। ”
“ আপনি উমরাহ করেছেন?”
“ প্রতি বছরই করা হয় আল্লাহর রহমতে। ”
“ এই টাকা গুলো থেকে তাহলে আমাদের উমরাহ-র ব্যবস্থা করুন না। ”
“ সে আপনি না বললেও আমি আপনাকে নিয়ে যেতাম। ”
“ তাহলে তাই হচ্ছে, আমরা উমরাহ পালন করতে যাচ্ছি এ বছর?”
“ ইনশাআল্লাহ। এবার ফ্রেশ হয়ে আসুন দেখি। দু রাকাআত নফল নামাজ আর তাহাজ্জুদ পড়ে ঘুমাতে যাব। ”
যদিও বাসর রাতে দু রাকাআত নফল নামাজ পড়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা মানুষ ফরজ নামাজ আদায় করি না,অথচ দেখা যায় নফল নিয়ে টানাটানি করি বেশি। তবে এটা সুন্দর একটা সুন্নতধর্মী,নফল আমল। এটা অনেকেই বাসর রাতে পড়ে থাকে। তবে এটা ফরজ বা ওয়াজিব নয়, মানে না পড়লে কোনো গুনাহ হবে না। আর সিকান্দার চায় তার সব কিছু আল্লাহর নাম,আল্লাহ কে স্বাক্ষী রেখে শুরু হোক। এই জীবন বানানোই তো হয়েছে তার ইবাদত করার জন্য,প্রতিটি শুভ কাজে তার শুকরিয়া আদায় করার জন্য।
মুনতাহা উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। দোপাট্টা টা খুলে রেখে হিজাবের পিন গুলো খুলতে লাগলো। সিকান্দার উঠে এসে মুনতাহা কে থামিয়ে দিয়ে নিজেই যত্ন সহকারে হিজাব থেকে শুরু করে গয়না গুলো খুলে টেবিলের উপর রাখলো।
মুনতাহা এবার তার ল্যাগেজ টা খুঁজলো। ওখানেই তো তার জামাকাপড় আছে। সিকান্দার মুনতাহা কে চোখে কিছু খুঁজতে দেখে জিজ্ঞেস করলো-
“ কি খুঁজছেন?”
“ আমার ল্যাগেজ টা। ওটাতেই তো আমার জামাকাপড় রাখা আছে। ফ্রেশ হতে বললেন তো। ”
সিকান্দার আলমারির দিকে এগিয়ে গেলো। পাল্লা খুলে সেখান থেকে নীল রঙের একটা সুতি শাড়ি বের করে মুনতাহার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল-
“ এবার যান। ”
মুনতাহার চোখ মুখে বিস্ময়ের ছাপ। আলমারি তে কি করছে এসব? এসব তো তার নয়। বাড়ি থেকে যেগুলো দিয়েছে সেগুলো তো অন্য গুলো।
মুনতাহার চোখ মুখের ভাষা বোধহয় সিকান্দার পড়তে জানে। সেজন্যই মুনতাহা কিছু জিজ্ঞেস না করলেও সিকান্দার বলল-
“ আমার আলমারির অর্ধেক টা আপনার পোশাক দিয়ে ভর্তি। গতকালই শপিংমলে গিয়েছিলাম। তখন কিনে এনেছি। আশা করছি সব গুলোই আপনার পছন্দ হবে। ”
মুনতাহা মাথা নত করে ওয়াশরুমে চলে গেলো। কথা ছিলো হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হবে। কিন্তু মুনতাহা একেবারে গোসল সেরে ওজু করে বের হয়েছে।
মুনতাহা বের হতেই সিকান্দার ও ঢুকলো। সে-ও একেবারে গোসল শেষ করে নেভি ব্লু কালারের ফুল হাতার গেঞ্জি আর অফ হোয়াইট রঙের টাউজার পড়ে বের হলো ওজু করে।
মুনতাহা ভেজা চুল গুলো হাত খোঁপা করে লং রেডিমেড হিজাব টা পড়ে নিলো। সিকান্দার চুল গুলো মুছে সাদা টুপি মাথায় দিয়ে মুনতাহার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ আসুন ম্যাডাম। ”
মুনতাহা সিকান্দারের হাতের উপর হাত রাখলো। সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে তার রুমের সবচেয়ে শান্তি আর পবিত্র জায়গা তার নামাজ ঘরে নিয়ে গেলো সামনের পাতলা পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে। রুমটা অন্ধকার ছিলো। সিকান্দার সুইচ টিপে ড্রিম লাইট জ্বালালো। সাথে সাথে মুনতাহা আবিষ্কার করলো সে কোনো আল্লাহর ঘরে আছে। যেমনটা ছোট বেলায় মসজিদে আমপারা পড়তে গেলে শান্তি পেত। ঠিক তেমনটাই হচ্ছে। চারিদিকে বই, আতর,ক্যালিগ্রাফি পেইন্টিং, ইলেকট্রনিক মোমবাতি, আরো অনেক ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করার মতো অসাধারণ সুন্দর জিনিস। সেগুলোর নাম জানে না মুনতাহা।
সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে নামাজ পড়ার সাইট টায় চলে গেলো। এখানে আগে একটা জায়নামাজ ছিলো। আজ আগপাছ করে বিছানো দুটো জায়নামাজ।
সিকান্দার তার যথাযথ স্থানে এসে দাঁড়ালো। মুনতাহা পেছনে দাঁড়ালো। দু’জনে তাদের এই পবিত্র সম্পর্কের শুরুটা করলো আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। নফল নামাজ শেষে তারা তাহাজ্জুদ টাও পড়ে নিলো। নামাজ শেষে সিকান্দার বিরবির করে কিছু ঠোঁটের কোনো উচ্চারণ করে মুনতাহার মাথা আর শরীরে ফুঁক দেয়।
শেষে সিকান্দার তাক থেকে কুরআন শরীফ আনে। সূরা আল-ফাতিহা,সূরা আল-ইখলাস, সূরা আল-ফালাক,সূরা আন-নাস পড়ে সূরা আল-বাকারার কিছু অংশ পড়া শুরু করে।
মুনতাহা নিজেও পড়ে,তবে আল- বাকারা পড়তে এসে নিজের চোখ আর জোর করে মেলে রাখতে পারলো না। ঘুম আসছে তার। রাতও তো অনেক হলো। মুনতাহা কুরআন শরীফ টা বন্ধ করে সিকান্দারের দিকে তাকিয়ে মিনমিনে গলায় বলল-
“ আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাই? ”
সিকান্দার তাকিয়ে বলল-
“ ঘুমান। ”
মুনতাহা জায়নামাজ দেখিয়ে বলল-
“ এখানে ঘুমাই? আপনার পড়া শেষ হলে ডেকে দিবেন। তখন রুমে গিয়ে শুবো। ”
সিকান্দার তার কোল দেখিয়ে বলল-
“ ইয়্যু ক্যান স্লিপ দ্যেয়ার সুইটহার্ট। আই উইল ক্যারি ইয়্যু। ”
মুনতাহা হিজাব টা খুলে সিকান্দারের কোলে মাথা রাখলো। সচারাচর দেখা যায় এই মুহুর্ত টায় মেয়েদের কোলে ছেলেরা মাথা রেখে শোয়,কিন্তু এটা ব্যতিক্রম হলো। সিকান্দার তার বা হাত দিয়ে মুনতাহার মুখটা জড়িয়ে ধরে যতটুকু বাকি ছিলো পড়া সেটুকু পড়ে নিলো। ততক্ষণে মুনতাহা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। এত সুমধুর গলা সিকান্দারের শুনলেই ঘুম চলে আসে শান্তিতে। সিকান্দার কুরআন শরীফ টা বন্ধ করে রেহালের উপর রেখে একটু দূরে সরিয়ে তাকের উপর রাখলো। তারপর মুনতাহা কে না ডেকে পাঁজা কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। এমনিতেই সারাদিন ধকল গেছে মেয়েটার উপর দিয়ে। একটুও ডেকে তার এই ঘুমটা ভাঙতে ইচ্ছে করলো না। কিছুক্ষণ সূক্ষ্ম ভাবে নজর বুলালো মুনতাহার উপর। মুনতাহা কি বুঝতে পেরেছিল? একটু নড়েচড়ে উঠলো যে! বুঝলে বুঝুক। সিকান্দার সিলিং ফ্যানের দিকে তাকালো। বিরবির করে বলল- “ rab se jo manga pura hua…”
তারপর রুমের লাইট নিভিয়ে দিয়ে মুনতাহার মাথাটা নিজের বুকের উপর চেপে জড়িয়ে ধরে ঘুম দেয়। শান্তির ঘুম ছিলো বোধহয় সিকান্দারের এটা।
সিকান্দারের ঘুম ভাঙলো ভোরের আজান কানে ভেসে আসায়। চোখ মেলে তাকাতেই আবিষ্কার করলো মুনতাহা কে নিয়ে রাতে যেভাবে ঘুমিয়েছিল ঠিক সেভাবেই লেপ্টে আছে বুকে মুনতাহা। তবে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে মুখের উপর পড়ে আছে।
সেই চুল গুলো আলতো করে সরিয়ে কানের পাশে গুঁজে দিলো। কিছুক্ষণ মুনতাহার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল-
“ পাশ ফিরলেই আপনাকে এভাবে দেখতে পাবো, এমন একটা দিনের জন্য আমি এত গুলো বছর অপেক্ষা করেছিলাম মন। ”
তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে ওজু করে ফজরের নামাজটা আদায় করে মুনতাহাকে ডেকে তুলে নামাজ পড়ার জন্য।
মুনতাহা ঘুমঘুম চোখে ওজু করে নামাজটা পড়ে শেষ করতেই সিকান্দার তাকে ঘুমাতে বললো। মুনতাহা তাই করলো। আবার ঘুমিয়ে পড়লো।
সিকান্দারের রুমে নিজের জন্য ব্লাক কফি বানানোর জন্য ইলেকট্রনিক কেটলি আছে। সকালের কফি সে নিজেই বানিয়ে খায়। আজও ব্যতিক্রম নয়। সে কফি বানিয়ে কফির মগ টা নিয়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো। তার একটা অদ্ভুত স্বভাব। আকাশের নিচে দাঁড়ালেই তার চোখ সবসময় ঐ সূদুর নীল তো কখনো কালো মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে থাকে। কারন যখন কোনো বান্দা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে,তখন রবও তাকিয়ে থাকে সেই বান্দার দিকে। সিকান্দার কফির মগে চুমুক বসালো। রব হয়তো এখন জিজ্ঞেস করছে-
“ কি খুশি তো এবার?”
সিকান্দার কফির মগ চেপে ধরে বলল-
“ ভীষণ খুশি আমি ইয়া রব। পৃথিবীর সবচেয়ে খুশি ব্যক্তিটা বোধহয় এখন আমি। ”
পরক্ষনেই আবার ভেসে আসলো-
“ তুমি ভীষণ জেদি আর ঠেটা প্রকৃতির মানুষ সিকান্দার। এমন জেদি, ঠেটা আর একগুঁয়ে মানুষ আমার নিকট খুব কমই আসে। ১৩ টা বছর আমাকে ভীষণ জ্বালিয়েছো। যা তোমার ভাগ্যে আমি লিখি নি, তুমি সেটাও নিয়ে ছেড়েছো আমার থেকে।”
সিকান্দার মুচকি হাঁসলো। মাথা নত করে রবকে বলল-
“ আপনার তো এমন বান্দাই পছন্দ ইয়া রব। যে আপনাকে প্রতি নিয়ত বিরক্ত করবে। আপনার কাছে এটা ওটা চাইবে। কারন আপনিই তো বলেছেন “ হে আমার প্রিয় বান্দারা তোমরা আমার কাছে চাইতে থাকো। চাওয়া থামিও না। তোমাদের ভাগ্যে যা আমি লিখে রাখি নি সেটাও যদি চাও। আমি রব তোমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে সেটাও দিতে সদা প্রস্তুত। তোমরা শুধু চাওয়ার মতো করে চাইতে থাকো আমার কাছে। পূরণ করার দায়িত্ব আমার ” সেজন্যই তো আপনাকে এত বিরক্ত করার পরও আপনি কখনো আমাকে আপনার থেকে আলাদা করেন নি। আপনার কাছে যা চেয়েছি তাই দিয়েছেন। আমার কোনো চাওয়া আপনি অপূর্ণ রাখেন নি ইয়া রব। আপনার রহমতের কারনেই তো মুনতাহা মুন আজ আমার স্ত্রী রূপে আমার ঘরে। তাহলে বলুন কেনো বিরক্ত করবো না আপনাকে? আপনার থেকে কিছু পাওয়ার লোভ কার না নেই? আমি তো ভীষণ লোভী একজন বান্দা আপনার। ”
“ তোমার জীবনে আমার রহমত বর্ষণ হোক বৃষ্টির মতো। ”
মুনতাহার ঘুম ভাঙলো আটটার দিকে। চোখ মেলে পুরো রুমে তাকিয়ে দেখলো সিকান্দার নেই। দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখতেই চোখ কপালে উঠে গেলো। অনেক বেলা হয়ে গেছে তো। সিকান্দার একবার ডাকবে না তাকে? বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হতেই দেখলো সিকান্দার এসেছে রুমে। মুনতাহা কে দেখে সে বলল-
“ ওহ্ উঠে গেছেন আপনি! চলুন তবে ব্রেকফাস্ট করবেন। ”
মুনতাহা টাওয়াল দিয়ে হাত মুখ মুছে বলল-
“ আমাকে ডাকলেন না কেনো? সবাই কি ভাবছে?”
“ কি ভাববে সবাই?”
“ এত বেলা হয়ে গেল অথচ আমি রুমে। ”
“ যাদের কমনসেন্সের অভাব আছে তারাই এটা নিয়ে মাথা ঘামাবে। আপনি চলুন। ”
মুনতাহা সিকান্দারের সাথে নিচে আসলো। সবাই বসে আছে ব্রেকফাস্ট করার জন্য। সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে পাশাপাশি চেয়ারে বসলো। অর্নব তাদের সামনেই ওপর সাইডে সিমরানের সাথে বসা। মুনতাহার মাথায় ঘোমটা দেওয়া। অথচ অর্নবের নজর যাচ্ছে বারবার মুনতাহার মাথার দিকে। সে দেখতে চাইছে তার চুল ভেজা কি না। সিকান্দার মুনতাহার প্লেটে খাবার দিয়ে নিজের প্লেটেও নিলো স্যান্ডউইচ।
সেলিম মির্জা মুখে খাবার তুলে বলল-
“ গরু কয়টা এনেছিলে তুমি সিকান্দার? ”
সিকান্দার স্যান্ডউইচে মুখে দিয়ে বলল-
“ ৩ টা। ”
“ মানুষজন তো বেশি দাওয়াত দাও নি। তাহলে এত গরু কেনো? ”
“ আমার ইচ্ছে সেজন্য। ”
“ সব তো তোমার ইচ্ছে তেই হচ্ছে। ”
“ জানেনই যখন তাহলে প্রশ্ন করেন কেনো খামোখা ? ”
“ তোমার নানা বাড়ির সবাই আসছে?”
সিকান্দার এবার বিরক্ত হলো।
“ খাওয়ার সময় এতো কথা কেনো বলেন বলুন তো? বিরক্ত হচ্ছি ভীষণ। প্লিজ থেমে যান। ”
সাইদা মির্জা স্বামীর বাহু চেপে ধরলো। থামতে বললো। সেলিম মির্জা থেমে গেলো। সিকান্দার খেতে খেতে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো অর্নব খাচ্ছে কম,মুনতাহা কে দেখছে বেশি।
সিকান্দার শব্দ করে জুশের গ্লাস টা টেবিলে রেখে বলল-
“ খাওয়া শেষ হয়ে থাকলে উঠে যাও এখান থেকে। বসে আছো কেনো?”
সবার দৃষ্টি সিকান্দার আর অর্নবের দিকে গেলো। অর্নব প্লেটের খাবারে হাত নাড়াচাড়া করে বলল-
“ শেষ হয় নি খাওয়া। ”
“ তাহলে চোখ খাবারে রেখে মাথা নত করে খাও, আমার হাতে চ’ড় খেতে না চাইলে। ”
সাইদা মির্জা রেগে গেলো এমন কথা শুনে।
“ বকছো কেনো তুমি আমার ছেলেটাকে? কি করেছে কি ও?”
“ আপনার ছেলেকে জিজ্ঞেস করুন কি করেছে। বেলেহাজপনার সব কিছু পাড় করে ফেলছে রাস্কেল টা। ”
অর্নব আধখাওয়া খাবার প্লেটে রেখেই চলে গেলো। সেটা দেখে সাইদা মির্জা বলল-
“ আমার ছেলেটাকে কি ঠিকমতো খেতেও দিবে না নাকি? না খেয়েই চলে গেলো। তোমার এসব অভদ্রতামি একদম করবে না আমাদের সামনে। সিমরান খাবার টা নিয়ে যাও রুমে। ”
সিমরান খাবার নিয়ে চলে গেলো। সিকান্দার মুনতাহার খাওয়া শেষ হতেই সুনেহরা কে বলল-
“ মুনতাহা কে আমার রুমে নিয়ে যাও। একটু পর পার্লারের লোক আসবে। ”
সুনেহরা তাই করলো। পেছন পেছন দাদিমাও গেলো। সিকান্দার বাহিরে বাগানে এসে দুপুরের রান্নার আয়োজন কতদূর তা দেখে তদারকি করতে লাগলো।
বাগানে তিনটে সাইটে তিন ধরনের মানুষের জন্য খাবারের জায়গা করা হয়েছে। এক সাইটে পুরুষ জন। অন্য সাইটে মহিলাগণ আর অন্য সাইটে এতিম বাচ্চাদের জন্য। ছয়- থেকে সাত হাড়ি খাবার রান্না করা হয়েছে প্রতিটি আইটেমের।
যোহরের আজান দিতেই সিকান্দার রুমে আসে গোসল করে নামাজ পড়ার জন্য। রুমে ঢুকেই দেখে পেয়াজ কালার শাড়ি হিজাব দোপাট্টায় পুরো তৈরি মুনতাহাকে। পার্লারের মেয়ে গুলো চলে গেছে। রুমে আছে দাদি। সিকান্দার আলমারি থেকে ওয়ালিমার জন্য কেনা পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার পথে শুনলো,তার দাদি মুনতাহা কে ভীষণ জ্বালাচ্ছে এটা ওটা জিজ্ঞেস করে। মুনতাহা ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। আগের দিনের মানুষ তো,মুখে কিছু আটকাচ্ছে না। সিকান্দার ওয়াশরুমের দরজার কাছে গিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল-
“ আমার স্ত্রী কে লজ্জায় ফেলার অধিকার কেবল আমার দাদিজান। তাই দয়া করে তাকে কোনো কিছু বলে লজ্জায় ফেলবেন না। আর আপনার কথা গুলো টু মাচ ব্যক্তিগত। প্লিজ ডোন্ট ডু দ্যিস। ”
মনোয়ারা মির্জা নাতির কথা শুনে মুখ বাঁকিয়ে বলল-
“ কথায় কথায় ইংরেজি কইবি না খবরদার। তোর ভালার লাইগাই তো তোর বউয়ের শিখায় পড়ায় দিতাছি যাতে তোর কষ্ট কম হয়। আমার বিয়ার সময়ও তো আমারে এমনে শিখায় দিছিলো, আমার দাদি শ্বাশুড়ি। ”
“ আমি কি বাচ্চা মেয়ে বিয়ে করছি দাদাজানের মতো? ”
“ বাচ্চা মাইয়া বিয়া করস নাই,তাইলে বউরে ছোঁস নাই ক্যান এখনও? ”
“ ছুঁই নি এমন টা কেনো মনে হলো আপনার?”
“ তোর বউয়ের চুল শুকনা আছিলো। ”
“ বউ ছোঁয়া মানে কি শুধু ওসব দাদিজান? সারা রাত আমার বুকেই ছিলো আপনার নাতবউ। তার সংস্পর্শেই ছিলাম। আর দিন তো পালিয়ে যাচ্ছে না। গতকালই তো বিয়ে করলাম। সময় দেওয়া উচিত সম্পর্কে। ”
“ তোর দাদায় তো আমারে বিয়ার রাইতেই যাইত্তা ধরছি….”
সিকান্দার থামিয়ে দিলো মনোয়ারা মির্জা কে।
“ দাদিজান থামবেন আপনি? রেডি হন। আপনার বান্ধবী আসছে। ”
“ হোসনেআরা আসতাছে!”
“ হ্যাঁ। ”
দাদিজান চলে গেলো। সিকান্দার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল-
“ কিছু মনে করবেন না দাদিজানের কথায় মন। আগের দিনের মানুষ তো,তার উপর বয়স হয়েছে। তাদের ন্যাচারই এটা। ”
সিকান্দার গোসল করে রেডি হয়ে জোহরের নামাজ পড়ে। এরমধ্যেই ও বাড়ি থেকে সবাই চলে আসে। সাথে সিকান্দারের নানি বাড়ির সকলেও। ইলাও আসে। ইলা মুনতাহার সাথে রুমে থাকে। সিকান্দার নিচে চলে আসে। মামা মামি নানি সিকান্দার কে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলো। এ-ও বললো তাদের বাড়িতে বউমাকে নিয়ে যেতে। সেই যে ১৪ বছর আগে গিয়েছিল। তারপর এখনো যায় নি। নানি মামিরা মুনতাহা কে দেখতে ভেতরে চলে গেলো। ময়না বেগম একবার গিয়ে দেখে আসলেন মেয়েকে। মুনতাহা একবার কেবল আড়চোখে দেখেছিল। তারপর আর ভুলেও তাকায় নি। ময়না বেগম ভালোমন্দ কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। মুনতাহাও যেচে কিছু বললো না।
সেলিম মির্জার রাজনীতির সহকর্মীরা আসেন ওয়ালিমাতে। বাহির টা গাড়ি আর বডিগার্ড দিয়ে ভরে গেছে। সেলিম মির্জা সিকান্দার কে ডেকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সিকান্দার সবাইকে সালাম দিলো। অর্থমন্ত্রী সিকান্দারের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলল-
“ তুমিই আসছো তাহলে রাজনীতি তে! ওয়েলকাম তোমাকে ইয়াং ম্যান। ”
সিকান্দার সন্তপর্ণে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
“ আপনার কোথাও মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছে। আমি রাজনীতি তে যোগ দিচ্ছি না। আমি কেবল উনার বিজনেসে ঢুকছি একজন সিও হিসেবে। ”
তারা বোধহয় অবাক হলো। সেলিম মির্জা গতকাল ও বলেছিল ছেলে রাজনীতি তে ঢুকবে। কিন্তু ছেলের মুখে তো তারা অন্য কথা শুনছে। সিকান্দার তাদের খাওয়ার দিকটায় নিয়ে গেলো।
মহিলা যারা এসেছে তাদের মহিলাদের খাওয়ার ওদিকটায় পাঠানো হলো। সেলিম মির্জা বাহির টায় দাঁড়ানো।
খাওয়ার মাঝে হুট করে বাহির থেকে শোরগোলের আওয়াজ শুনে সেলিম মির্জা গেটের দিকে তাকালো। দেখলো দলে দলে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ভেতরে ঢুকার চষ্টা করছে। সিকিউরিটি গার্ড বাঁধা দিচ্ছে। সিকান্দার সেটা দেখেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বাচ্চা দের কে এক এক করে ঢুকালো।
তাদের সকলের পড়নে নতুন জামাকাপড়। সেলিম মির্জা এগিয়ে এসে সিকান্দার কে জিজ্ঞেস করলো-
“ কারা এরা?”
“ আমার অতিথি। ”
“ তোমার অতিথি মানে!”
সাইদা মির্জা পেছন থেকে এসে বললেন-
“ তোমার ছেলে রাস্তার অসহায় গরীব ছেলেমেয়ে দের দাওয়াত দিয়েছে তার বিয়েতে। শুধু কি তাই? পরনে যে এদের নতুন জামাকাপড় দেখছো। সেগুলোও কিনে দিছে। মানে ভাবতে পারছো কতটা অধপতন হয়েছে ওর? বাড়িতে কত নামি-দামি লোক এসেছে ও জানে না? জেনেও এমনটা করলো তোমাকে সকলের সামনে অপমান করার জন্য। টাকা বেশি হয়েছে ওর। ভুল জায়গায় খরচ করছে বারবার। ”
“ সিকান্দার তুমি এটা কি করলে! খাওয়ানোর ইচ্ছে যখন ছিলোই তাহলে রাস্তাতেই খাওয়াতে। বাড়ির ভেতরে কেনো খাওয়ালে? লোকজন দেখছে অবাক হয়ে। আমার মান সম্মান তুমি সব শেষ করে দিচ্ছ। ”
সিকান্দার বাচ্চাদের কে চেয়ারে বসিয়ে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বলল-
“ আপনি আমার অতিথিদের অপমান করছেন। আমি কিন্তু আপনার অতিথিদের অপমান করি নি। সো বিহেব ইওর সেল্ফ। আপনার গলার স্বর বাড়লে আমারটাও বাড়বে। আর আমার গলার স্বর বাড়লে কি হবে নিশ্চয়ই জানেন? আমার কাজ আমাকে করতে দিন। আপনি নিজের কাজ করুন গিয়ে। ”
সেলিম মির্জা গেটের দিকে তাকালো। আরো বাচ্চা কাচ্চা আসছে। সে কি কোনো ভোজনালয় খুলছে নাকি? এলাকার সব ছেলেপেলে কে বোধহয় দাওয়াত দিয়েছে এই বেয়াদব। জনদরদী যত্তসব।
“ এদের কে খাইয়ে কি লাভ? বিনা টাকায় খেয়ে যাবে। লস ছাড়া আর কি হচ্ছে? এত ভালো মানুষি কেনো দেখাচ্ছো নিজের ক্ষতি করে? ”
“ আপনি সব জায়গায় টাকার লাভ খুঁজেন কেনো? তবে হ্যাঁ আমার এখানে অবশ্যই লাভ আছে। আমার এই কাজে আমার রব যে খুশি। এটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় লাভ বুঝেছেন? এবার আসুন। আপনাকে আসুন বলতে বলতে মুখ ব্যথা হয়ে যাবে দেখছি। ”
সাইদা মির্জা টেনে নিয়ে গেলো স্বামী কে। অর্থমন্ত্রী বিয়ে বাড়িতে বাচ্চা ছেলেমেয়ে দেখে সেলিম মির্জা কে জিজ্ঞেস করলো-
“ এরা এখানে কেনো?”
সেলিম মির্জা নিজের মতো করে বলল-
“ রাজনীতি তে ঢুকবে আমার ছেলে। সেজন্য আগে থেকেই এসব প্র্যাকটিস করে রাখা ভালো না? তাই আর কি…”
“ কিন্তু তোমার ছেলে তো বললো রাজনীতি করবে না। ”
“ ওর হুটহাট মুড সুয়িং হয়। সিরিয়াসলি নিও না তো। ”
ইলা নিচে খেতে নেমে এসে বাচ্চাদের এই বিষয়টা শুনলো। শোনামাত্রই খাওয়া শেষে মুনতাহা কে জানালো। মুনতাহা চমকালো। এই প্রথম এমন কিছু দেখলো শুনলো যে কেউ তার ওয়ালিমা তে রাস্তার দুঃস্থ এতিম বাচ্চাদের জামাকাপড় আর খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে।
সিকান্দারের মামি নানি দাদি মুনতাহাকে খাওয়ার জন্য নিচে নিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু সিকান্দারের তরফ থেকে নিষেধাজ্ঞা আসলো। রুমেই খাবে মুনতাহা। বাহিরে আসতে পারবে না। বাহিরে বিভিন্ন ধরনের মানুষ আছে। সিকান্দার মুনতাহার খাবার টা রুমে পাঠিয়ে দিলো। সুনেহরা কে বললো মুনতাহার দিকটা দেখার জন্য। সুনেহরা ভাইয়ের রুমে এসে খাবার টা বিছানায় রেখে মুনতাহাকে খেতে বলল। মুনতাহা জিজ্ঞেস করলো-
“ উনি খেয়েছেন?”
সুনেহরা বিছানায় বসে বলল-
“ না বোধহয়, ভাইয়া বাচ্চা গুলোকে খাওয়াচ্ছে। সবার শেষে হয়তো খাবে। তুমি খেয়ে নাও। ভাইয়া খেয়ে নিতে বলছে। ”
মুনতাহা খেতে আরম্ভ করলো। সুনেহরা ফেসবুক স্ক্রোল করছিলো। আর তখনই হোয়াটসঅ্যাপ থেকে ভিডিও কল আসে শিফার। শিফাদের যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু শিফা যাবে না বলে তার বাবা মাও আর যেতে চায় নি অতদূর।
শিফা সুনেহরার সাথে কথা বলতে বলতে একসময় খেয়াল করলো মুনতাহা কে। সুনেহরা ফোন ঘুরিয়েছিল। সেসময় দেখলো মুনতাহা খাবার খাচ্ছে। বউয়ের সাজ দেখেই চিনে ফেললো ওটাই সে। আর তখনই সিকান্দারের গলার স্বর শুনতে পেলে। মুহূর্তে বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো তার। তড়িঘড়ি করে ফোন কে’টে দিলো। চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে তার বুকটায়। প্রিয় মানুষের বিয়েটা কি মেনে নেওয়ার মতো? মুনতাহারও কি সেদিন কষ্ট হয়েছিল এমন যেদিন অর্নব সিমরান কে বিয়ে করেছিল। শিফা ফোন কেটে দেওয়ায় সুনেহরা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো তার ভাই এসেছে। সুনেহরা চলে গেলো। সিকান্দার ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে পাশে বসলো। একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার গোসলে ঢুকবে। মুনতাহা জিজ্ঞেস করলো-
“ খেয়েছেন?”
সিকান্দার দু দিকে মাথা নাড়িয়ে না জানালো।
“ এখনও খান নি কেনো? কত বেলা হয়েছে। আপনি নিজে না খেয়ে আমার জন্য খাবার পাঠিয়ে দিছেন। ”
“ সময় পাই নি খাওয়ার। ”
মুনতাহা প্লেটের দিকে তাকালো। অর্ধেক খাবার খেয়েছে। বাকি অর্ধেকটা দেখিয়ে বলল-
“ আপনার অসুবিধা না থাকলে আমি খাইয়ে দিব?”
সিকান্দার মুখ বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
“ দিন। ”
মুনতাহা খাইয়ে দিলো সিকান্দার কে। খাওয়ার সময় বলল-
“ শুনলাম রাস্তার এতিম বাচ্চাদের জন্য নতুন জামাকাপড় আর খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন? আমি এমন টা এই প্রথম নিজের বিয়েতে শুনলাম,দেখলাম। সবাই তো শুধু আত্মীয় দের দাওয়াত দেয়। ”
সিকান্দার পানি খেয়ে বলল-
“ আমার যদি সাধ্য থাকতো তাহলে আপনাকে পাওয়ার আনন্দে শুধু এলাকার না দুনিয়ার সকল দুস্থ এতিম বাচ্চাদের জন্য আমি নতুন জামাকাপড় আর খাওয়ার ব্যবস্থা করতাম প্রিয়তমা…”
মুনতাহার হাত থেমে গেলো। সিকান্দার উঠে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল-
“ বাকিটা আপনি খেয়ে নিন মন। আমাকে ফ্রেশ হতে হবে। ”
মুনতাহা খাবার টা শেষ করলো। বাহিরে ইলা বাগানে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ফটো তুলবে এজন্য। কিন্তু কাকে দিয়ে তোলাবে? মুনতাহার ননদ সুনেহরা আর লাবম্য একা একাই ছবি তুলছে একে ওপরের টা। ইলার বলতেপ অস্বস্তি লাগছে। শেষ মেষ ইলা নাদিম কে দেখতে পেয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল-
“ ভাইয়া একটা হেল্প করুন না। ”
নাদিম কাঠি দিয়ে দাঁতে আঁটকে থাকা মাংস ছাড়াচ্ছিল। ইলার এই কথা শুনে বলল-
“ কি হেল্প আপু? ”
ইলা আপু ডাক শুনে চোখ ছোট ছোট করে বলল-
“ আমি আপনার ছোট। আপু বলে কেনো আমাকে বড় বানাচ্ছেন? সে যাক গে, আমার কয়েকটা ছবি তুলে দিন না। ”
নাদিমের কপালে দুটো ভাজ পড়লো।
“ আপনার ছবি আমি কেনো তুলে দিব? ”
“ তুলে দেওয়ার মতো কেউ নেই বলে। ”
“ কেউ নেই বলে কি আমাকেই চোখে পড়লো আপনার! প্রতি পিস যদি ১০ টাকা করে দেন তাহলে তুলে দিতে পারি। তা না হলে দুঃখিত সময় নেই হাতে। আমি ব্যস্ত। ”
ইলার রাগ উঠলো এই কথা শুনে।
“ কয়েকটা ছবি তুলে দিবেন সেজন্য আবার টাকাও চাচ্ছেন! কি লোভী আপনি! ”
“ যা ভাবার ভাবুন গিয়ে। পার পিস ১০ টাকা করে দিলে বলুন ছবি তুলে দিচ্ছি। ”
“ আচ্ছা আচ্ছা দিব। সুন্দর করে তুলে দিবেন। ”
নাদিম ইলার ফোনটা নিয়ে বলল-
“ ফটোগ্রাফির জন্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া আমি। ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট। ”
ইলা অবাক হয়ে বলল-
“ আসলেই?”
নাদিম শার্টের কলার ঠিক করে একটু ভাব ধরে বলল-
“ ইয়েস। ”
ইলা একের পর এক পোস দিলো। বোধহয় ৪০-৫০ টা ছবি তোলা শেষে অধিক উৎফুল্লতা নিয়ে ইলা এসেছিল ছবি গুলো দেখতে। তার ধারণা ছিলো ছবিগুলো হয়তো অনেক সুন্দর উঠেছে। কিন্তু নাহ্ তার ধারণা ভুল। একটা ছবিও সুন্দর হয় নি। কোনোটার মাথা নেই,কোনোটায় চোখ বন্ধ করা,কোনোটায় ইলাকে অটিস্টিক টেরা লাগছে,কোনোটায় মুখ ল্যাবরা চ্যাবরা হয়ে গেছে।
ইলা ছবিগুলো দেখে রেগে বলল-
“ এসব কি তুলছেন? এমন ফালতু হাত নিয়ে অ্যাওয়ার্ড পান কি করে? এগুলো কোনো জাতের ছবি? ”
নাদিম ফোন টা নিয়ে ছবি গুলো দেখে বলল-
“ সুন্দরই তো হয়েছে ছবি গুলো। পুরাই এস্টেথিক ভাইব দিচ্ছে। ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে আপলোড দিবেন আর দেখবেন হুরহুর করে রিচ পাবেন। ক্যাপশনে অবশ্যই আমাকে ম্যানশন করে দিবেন। তা না হলে জিজ্ঞেস করবে কে তুলে দিয়েছে ছবি গুলা। সবার জানা উচিৎ চেনা উচিৎ আমাকে। যাই হোক পারপিস ছবি তোলার টাকা গুলো এখন মওকুফ করে দিলাম। পরে একদিন আইসক্রিম খাইয়ে শোধ করে দিয়েন। যা গরম পড়েছে। এখন আসি। ”
নাদিম চলে গেলো। ইলার শরীর জ্বলে যাচ্ছে। ছাতার মাথার ছবি তুলে দিছে জাউরায়। আইসক্রিম তোর পিঠে উপর দিবে ইলা জাউরা বেডা। তোর বউ তোকে এই ছবি তুলে দিতে না পারার যন্ত্রণায় ডিভোর্স দিয়ে দিবে দেখিস।
সিকান্দার ফ্রেশ হয়ে অফ হোয়াইট শার্ট পড়ে। কনুই অব্দি হাতা গুটিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল গুলো মুছতে শুরু করে টাওয়াল দিয়ে। মোছার সময় খেয়াল করলো একবার মুনতাহা কে। চুপচাপ বসে আছে। সিকান্দার চুল মুছা শেষ হলে তা হাতের সাহায্যে সেট করতে করতে উঁচু গলায় গাইছে-
“ সোনা বউ শুনছো নি গো…
সোনা বউ শুনছো নি..
নিতে আইলে নাইয়র যাইবা নি.…”
মুনতাহা মাথা নত করে বসে ছিলো। আজ ওবাড়িতে নাকি তাকে যেতে হবে। মুনতাহা যেতে চায় না ও বাড়িতে। সেজন্য সিকান্দারের কথাটা শুনেই মুনতাহা নত গলায় বলল-
“ আমি ওবাড়িতে যাব না। ”
সিকান্দার সাথে সাথে পেছন ফিরলো। গাওয়া থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ কিছু বললেন?
“ হু। ”
“ আবার বলুন। শুনি নি। ”
“ আমি ও বাড়িতে যাব না। আমাকে নিতে চাইলে আপনি মানা করে দিবেন। বলবেন আপনার বউকে আপনি যেতে দিবেন না। পুরুষ মানুষ বউ ছাড়া থাকতে পারে না। ”
সিকান্দার হেঁসে ফেলে এই কথা শুনে। সিকান্দার তো ভেবেছিল মুনতাহা হয়তো চলে যাবে নিতে চাইলে। তবে বউ তো দেখি নিজ থেকেই যেতে চাইছে না। আবার শিখিয়ে পড়িয়ে দিচ্ছে কি কি বলতে হবে তাকে! সিকান্দার হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বলল-
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ৭
“ আপনি চান আমি এসব বলি সকলের সামনে?”
“ হু। ”
“ সত্যি চান?”
“ হুম। ”
সিকান্দার ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে চোখ টিপে বললো-
“ বেশ,আমার কোনো আপত্তি নেই। আপনি যা যা বলেছেন আমি তাই তাই বলবো। তাই তাই…. ”
